নাস্তিকতা কি ।। আমিরুল ইসলাম চৌধুরী (দারা চৌধুরী)

পর্ব:০১

নাস্তিকতা কাকে বলে?

হালে ফেসবুক ও সোশ্যাল মিডিয়ার আলোচনার একটি বড় অংশ দখল করে নিয়েছে আস্তিকতা বনাম নাস্তিকতা বিতর্ক। আসলে নাস্তিকতা কি, কি তার সংজ্ঞা, কি তার পরিচয়, আমরা সবাই কি তা জানি? নাকি বুঝে না বুঝেই নাস্তিকতা, নাস্তিকতা বলে হৈ চৈ করছি?

নাস্তিক ও আস্তিক শব্দ দুটি এসেছে মূলত বৈদিক যুগের ভারতীয় দর্শনে ব্যবহৃত দুটি শব্দ। এটি কোন আরবি শব্দ নয়, অতএব আরবি গ্রন্থ সমূহে এরকম শব্দ থাকার প্রশ্নই ওঠেনা। এমনকি আরবি কুফর শব্দটিও এর প্রতিশব্দ নয়। বস্তুত যা ঈমান ও ইসলামের বিপরীত তা-ই হলো ‘কুফর’। কুফরের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে- ঢেকে রাখা, আচ্ছাদিত করা, গোপন করা, অস্বীকার করা, অকৃতজ্ঞতা জানানো। আর ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় কুফর হলো- ইসলামের অত্যাবশ্যকীয়, সুস্পষ্ট, সর্বজনবিদিত বিষয়াবলিকে অস্বীকার করা অথবা তন্মধ্য থেকে কোনো একটি বিষয় অস্বীকার করা। 

হিন্দু দর্শন হলো প্রাচীন ভারতে উদ্ভূত একগুচ্ছ দর্শনের একটি সমষ্টি। মূল ধারার হিন্দু দর্শনের মধ্যে ছয়টি দার্শনিক শাখা (ষড়দর্শন) বিদ্যমান। এগুলি হল: সাংখ্য, যোগ, ন্যায়, বৈশেষিক, মীমাংসা ও বেদান্ত। প্রাচীন বেদকে জ্ঞানের প্রামাণ্য ও গুরুত্বপূর্ণ উৎস রূপে সাধারণরূপে স্বীকার করা হয় ব'লে এ ষড়দর্শনকে আস্তিক দর্শনও বলা হয়।।

প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতে আরও কয়েকটি দার্শনিক শাখার উদ্ভব ঘটেছিল যেগুলি বেদকে অস্বীকার করে কিছুটা একই ধরনের দার্শনিক ধারণা প্রচার করেছিল। এগুলিকে নাস্তিক দর্শন বলা হয়। ভারতীয় নাস্তিক দর্শনগুলি হল:  বৌদ্ধধর্ম, জৈনধর্ম, চার্বাক, আজীবক ও অন্যান্য অবৈদিক শাস্ত্রসমূহ। এই সংজ্ঞা মতে মুসলিম, খ্রিস্টান, পারসিয়ান সবাই নাস্তিক (ন অস্তি বেদান্ত)। 

ইংরেজিতে Atheism শব্দটির ব্যবহার খুব বেশি দিনের নয়। মূলত Atheism পদবাচ্য এসেছে  ফরাসি athéisme, থেকে এবং ইংরেজিতে ১৫৮৭ সালে তা প্রতীয়মান হয়। ইংরেজি ‘atheist’ শব্দটি এসেছে (ফরাসী athée) থেকে, যার অর্থ- "সেসব মানুষ, যাঁরা ঈশ্বরের অস্তিত্বকে প্রত্যাখান করে"। ইংরেজিতে এই শব্দের ব্যবহার খুঁজে পাওয়া যায় ১৫৬৬ সালের পূর্বভাগে এবং ১৫৭১ সালে। Atheist শব্দটি ব্যবহারিকভাবে ঈশ্বরবিহীন হিসেবে আখ্যা পায় ১৫৭৭ সালে। এখানে দেখা যাচ্ছে Atheism’ও নাস্তিকতার শুদ্ধ প্রতিশব্দ নয়।

কিন্তু বর্তমানে ধর্মবিশ্বাসী মানুষেরা শুধু ঈশ্বরের অস্তিত্বে অবিশ্বাসী নয়, নিজ ধর্মের কুসংস্কার ও অপসংস্কৃতির  বিরুদ্ধে বললেও তাঁকে নাস্তিক আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে (যদি সে ঈশ্বর বিশ্বাসী হয়, তারপরও)। নাস্তিক শব্দটিকে বিস্তৃত করতে করতে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যে- “আপনি যদি বিশ্বাস না করেন যে গোমূত্র পান করলে করোনা সারে” অথবা মাছির এক ডানায় রোগ জীবাণু এবং অন্য ডানায় প্রতিষেধক রহিয়াছে”, তাহলেও আপনি নাস্তিক হয়ে যাবেন। এমনকি আপনি যদি রামবাবু বাটপারের বা মুফতি ইব্রাহিম টাউটের বিরোধিতা করেন, তাহলেও আপনি নাস্তিক বলে আখ্যায়িত হয়ে যাবেন।

যাইহোক যে যেভাবেই বলুক না কেন নাস্তিকতা (অন্যান্য নাম: নিরীশ্বরবাদ, নাস্তিক্যবাদ) একটি দর্শনের নাম যাতে ঈশ্বর বা স্রষ্টার অস্তিত্বকে স্বীকার করা হয়না এবং সম্পূর্ণ ভৌত ও প্রাকৃতিক উপায়ে প্রকৃতির ব্যাখ্যা দেয়া হয়। অন্য কথায় আস্তিকতার বর্জনকেই নাস্তিকতা বলা যায়। নাস্তিকতা কোন বিশেষ বিশ্বাস নয় বরং এটা প্রচলিত অপ্রমাণিত বিষয়ের প্রতি অবিশ্বাস এবং যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। বিশ্বাসকে খণ্ডন নয় বরং বিশ্বাসের অনুপস্থিতিই এখানে মুখ্য।


পর্ব:০২

নাস্তিকতা কোন ধরণের দর্শন? 

দর্শনের সবচেয়ে মৌলিক ও প্রাথমিক মতবাদ হলো ভাববাদ ও বস্তুবাদ। জ্ঞানবাদ (epistemology), নীতিবিদ্যা (ethics), যুক্তিবিদ্যা (logic), অধিবিদ্যা (metaphysics) ইত্যাদি এসেছে আরো অনেক পরে। 

আমাদের চারপাশের জগতের যেসব অস্তিত্ত্ব/বস্তু বা বস্তুকণা আমরা পর্যবেক্ষণ করি বস্তুবাদ অনুযায়ী তারা যেকোন প্রকার চেতনা নিরপেক্ষ। যে দার্শনিক ধারায় ধরে নেওয়া হয় যে পৃথিবী বস্তুগত, তার অস্তিত্ব আছে বিষয়গতভাবে, চৈতন্যের বাইরে ও চৈতন্য-নিরপেক্ষভাবে, বস্তুই মুখ্য, তা কারো দ্বারা সৃষ্টি হয়নি এবং আছে চিরন্তন ভাবে তাহাই বস্তুবাদ। উল্টোভাবে- চৈতন্য, চিন্তন হল বস্তুরই একটি গুণধর্ম এবং পৃথিবী ও তার নিয়মগুলি জ্ঞেয়। বস্তুবাদ ভাববাদের বিরোধী। ভাববাদে ধারণা করা হয় চৈতন্য হতে বস্তুর উদ্ভব, চেতনা দ্বারা প্রভাবিত এবং চেতনার সাথে সম্পৃক্ত। এখানে ঈশ্বর চেতনারই আরেক রূপ। 

বস্তুবাদ অনুসারে, মানুষ তথা জীবজগত প্রাণহীন বস্তুজগৎ থেকেই উদ্ভূত হয়েছিল। প্রাণের বিবর্তনের বিশেষ এক পর্যায়ে প্রাণিদের মধ্যে স্নায়ুতন্ত্রের উন্মেষ ঘটে এবং ঘটনাচক্রে বৃহৎ-মস্তিস্ক-সম্পন্ন (অপেক্ষাকৃত বেশী ঘণত্ব সম্পন্ন) মানুষ প্রজাতির উদ্ভব ঘটে। মানুষের বিবর্তনের  সাথে সাথে মানবচিন্তা ও চেতনার উন্মেষ ঘটে। কেবলমাত্র মানুষের মস্তিস্কের পক্ষেই  উন্নত  সাধারণ ধারনা সৃষ্টির তথা চেতনা অর্জনের  সক্ষমতা আছে। বরং বস্তু তার সম্পর্কে সচেতনতা উন্মেষের বহুপূর্ব থেকে অস্তিত্বশীল ছিল, চেতনা বিলুপ্ত হবার পরেও তা থাকবে। বস্তু, মন বা চেতনা থেকে  তৈরী নয় বা উপজাত নয় বরং চেতনা হ’ল বস্তুর সর্বোচ্চ উৎপাদন বা উপজাত বিষয়। ধারণাসমূহ আমাদের চারপাশের স্বাধীন (চেতনা-নিরপেক্ষ) বস্তু-জগতের প্রতিফলন ছাড়া আর কিছু নয়। দর্পনে প্রতিফলিত বস্তু তার অস্তিত্বের জন্য প্রতিফলিত প্রতিবিম্বের উপর নির্ভর করে না। সহজ করে বললে, মানুষ বা অন্যান্য বস্তু ঈশ্বরের তৈরি নয়, বরং ঈশ্বর মানুষের তৈরি, মস্তিষ্কজাত উৎপাদন। এঙ্গেলসের ভাষায়- “সকল ধারণা  অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া, যা বাস্তবতার সঠিক অথবা বিকৃত প্রতিফলন মাত্র।” অথবা মার্ক্সের ভাষায় বলা যায়- “জীবন চেতনা দিয়ে নির্ধারিত হয় না বরং চেতনাই জীবন দ্বারা নির্ধারিত হয়।”

বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গির এক সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। প্রাচীন গ্রিসের এনাক্সোগোরাস (খ্রিস্টপূর্ব ৫০০-৪২৮ অব্দ) এবং ডেমোক্রিটাস (খ্রিস্টপূর্ব ৪৬০-৩৭০ অব্দ) বস্তুবাদী ধারণা পোষণ করতেন। প্রাচীন ভারতে চার্বাকও (খ্রিস্টপূর্ব ৭ম অথবা ৮ম শতাব্দি) বস্তুবাদী দার্শনিক। ভারতীয় দর্শনের বিকাশের সমগ্র কাল জুড়ে আধ্যাত্মিক দর্শনের সমান্তরালে বস্তুবাদী দর্শনের অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু, সমাজ বিকাশের নানা ঘনঘটায় তা পূর্ণতা পেতে পারেনি। তেমনি  প্রাচীন গ্রিসের পতনের পর, এই যৌক্তিক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি একটি বিরাট ঐতিহাসিক কালপর্ব জুড়ে বিস্মৃতপ্রায় হয়ে যায়। খ্রিস্টীয় মধ্যযুগের পতনের পথ ধরে চিন্তার নবজাগরণের মধ্যদিয়ে দর্শন এবং প্রকৃতিবিজ্ঞানের পুণর্জন্ম হওয়ার পরই কেবল এ দৃষ্টিভঙ্গির পুন:আবির্ভাব ঘটে।

সপ্তদশ শতক থেকে ইংল্যান্ড হয়ে ওঠে আধুনিক বস্তুবাদের নিজস্ব-ভূমি। মার্ক্স লিখেছেন- “ইংরেজ বস্তুবাদের যথার্থ আদি-পুরুষ হলেন বেকন।” ফ্রান্সিস বেকনের (১৫৬১-১৬২৬) বস্তুবাদ থমাস হবসের (অভিজ্ঞতাবাদের প্রবক্তা) (১৫৮৮-১৬৭৯) হাতে সুশৃঙ্খল ও আরো বিকশিত হয়। হবসের ধারনাসমুহ জন লকের (১৬৩২-১৭০৪) হাতে আরো বিকাশ লাভ করে। শেষোক্তজন ভাবতে পেরেছিলেন যে, বস্তর পক্ষে চিন্তার ক্ষমতাকে ধারন করা সম্ভব। স্নায়ুবিজ্ঞানে এটা তো স্বতঃসিদ্ধ ভাবে প্রমাণিত যে, চিন্তা-চেতন-মনন কোষের অভ্যন্তরে সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও অন্যান্য পদার্থের আয়নের স্থানান্তরের ফলে সৃষ্ট বৈদ্যুতিক বিভব বৈ কিছুই নয়। 

বুর্জোয়া বিকাশ ও বিজ্ঞানের মহৎ অগ্রগতি বিশেষত বলবিদ্যা, যন্ত্রকৌশলবিদ্যা, জোতির্বিজ্ঞান ও ঔষধবিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে মানবচিন্তার উপর্যুক্ত অগ্রগতির সমগামীতা কোন আকস্মিক ঘটনা ছিলোনা। এই চিন্তকদের ধারাবাহিকতায় অষ্টাদশ শতাব্দির ফরাসি বস্তুবাদী দার্শনিক সম্প্রদায় এক্ষেত্রে এক ব্যাপক সাফল্য অর্জন করে, যাদের মধ্য সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন রেনে দেকার্তে (বুদ্ধিবাদের জনক) (১৫৯৬-১৬৫০ খ্রিস্টাব্দ)। এ বস্তুবাদী দর্শন তাঁর ধারাবাহিকতায় হলবাখ (১৭২৩ -১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দ) ও হেলভেটিয়াসের হাতে এক বিপ্লবী দর্শনে উন্নীত হয়। হলবাখ লিখেছেন- “বিশ্বব্রহ্মাণ্ড হলো সকল কিছুর (সকল পদার্থের) এক ব্যাপক ঐক্য। কাজেই, সর্বক্ষেত্রে এটি আমাদের কেবল গতির মধ্যেকার বস্তু বা গতিশীল বস্তুরই মুখোমুখি করে।” এদের এই বস্তুবাদী ও যুক্তিবাদী চিন্তা ১৭৮৯ সালের মহান ফরাসি বিপ্লবের মর্মবস্তুতে পরিণত হয়েছিল। এ সকল বস্তুবাদী চিন্তকরা জগতবহির্ভূত বা বাহ্যিক- জগতাতিরিক্ত কোনপ্রকার কর্তৃত্ব স্বীকার করতেননা। ধর্ম থেকে প্রকৃতি-বিজ্ঞান, সমাজ থেকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান- এককথায় সকল কিছুকেই এরা অনুসন্ধানী সমালোচনার বিষয়ে পরিনত করেছিলেন। মূলত এই বস্তুবাদী দর্শনই ঈশ্বরের অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জের মুখে ছুঁড়ে ফেলে, এবং নাস্তিকতার উন্মেষ ঘটায়।



পর্ব:০৩

নাস্তিকতার সাথে ধর্মের সম্পর্ক কি?

নাস্তিকতার সাথে ধর্মের সম্পর্কের বিষয়টি বেশ জটিল। ইতিপূর্বেই আমরা দেখেছি ধর্ম যেমন আস্তিক্যবাদী হতে পারে (যেমন- হিন্দু ধর্ম, মুসলিম ধর্ম, ইহুদি ধর্ম, খ্রিস্টান ধর্ম ইত্যাদি) আবার নাস্তিক্যবাদী ধর্মও আছে (যেমন- বৌদ্ধ ধর্ম, জৈন ধর্ম) ইত্যাদি। আবার এমনকি হিন্দুধর্মের চার্বাক’রা নাস্তিক, তবুও হিন্দু। অর্থাৎ ধার্মিক হয়েও কেউ কেউ নাস্তিক হতে পারে আবার আস্তিক হয়েও কেউ কেউ নিধার্মিক হতে পারে।

আরেকটি বুদ্ধিবাদী সম্প্রদায় রয়েছে যাঁরা মনে করে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অবশ্যই একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন। কিন্তু তাঁরা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে সেই সৃষ্টিকর্তার বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেন যা প্রচলিত সব ধর্ম থেকেই আলাদা। তাঁদের এই ধারণাসমূহ অবশ্য খুঁজলে দেখা যায় এগুলো আর কিছুই নয় লক, হিউম, বার্কলে, দেকার্ত, স্পেনসার বা স্পিনোজার দর্শনের কারো না কারোর সাথে মিলে যায়। তবে এদের মূল কথা একটিই, সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব থাকলেও ধর্ম হচ্ছে ভুয়া। 

ধর্ম প্রচারকরাও একপ্রকার আস্তিক্যবাদী দার্শনিক, কিন্তু ক্লাসিক্যাল দার্শনিকের সাথে এদের তফাৎ হলো এরা এই দর্শনের প্রচারের মাধ্যমে মানব জাতিকে বিভক্ত করে নিজের দাপটকে পাকাপোক্ত করেছেন। এবং তাঁর মতামতই সেরা বলে অন্যসকল ধর্মীয় মতামতকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছেন। শুধু তাই নয় দর্শন মেনে নেয়ার পাশাপাশি কিছু আচার অনুষ্ঠান পালনকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যা ঈশ্বর বিশ্বাসী (ভাববাদী দর্শন) পণ্ডিত দার্শনিকেরা (এরিস্টোটল, প্লেটো, রবি ঠাকুর, গান্ধীজী ইত্যাদি) করার প্রয়াস কখনো করেননি।

আরেকটি ক্ষেত্রে নাস্তিকদের তথা বুদ্ধিবাদী আস্তিকদের সাথেও ধর্মের বিরোধটা খুব প্রকট হয়েছে যখন ধর্ম, ভাববাদী দর্শনকে আরো অনেক বিশ্বাসের সাথে নিজেকে যুক্ত করে নিয়েছে (ফেরেশতা, শয়তান, জিন, পরকাল, স্বর্গ, নরক ইত্যাদি)। যেগুলোর বেশিরভাগই অদৃশ্য ও অপ্রমাণিত যুক্তিহীন বিশ্বাস। রবীন্দ্রনাথ, লালন, এরিস্টোটল কিংবা আইনস্টাইনেরও নিজস্ব ঈশ্বর ছিল, যাঁরা ছিল উদার, ক্ষমাশীল, অহিংস ও প্রজ্ঞাময়। যাঁরা ধর্মীয় ঈশ্বরের ন্যায় নিষ্ঠুর, প্রতিহিংসাপরায়ন বা অভিশাপ বর্ষণকারী নয়। ফলে ঈশ্বর স্তুতি-স্তব শোনার জন্য মুখিয়ে আছেন, ধর্মের এরকম প্রচারকে ওরা অসম্ভবই মনে করে। ফলে ধর্মের রিচুয়াল গুলো মানতে এঁরা দ্বিধাগ্রস্ত হয়। যদি দয়াময় ঈশ্বর বলে কেউ থেকে থাকেন তাঁরও প্রথম চাওয়া হচ্ছে মানুষ ও জীবজগতের কল্যাণ, পূজা অর্চনা নয়। 

ধর্মের প্রার্থনার সাথেও ওঁরা দ্বিমত পোষণ করে এই জন্য যে, অনেকেই বলেন বা আমরা সকল মুসলমানরা বলে থাকি যে আল্লাহ আমাদের মনের খবর জানেন। আমরা কি কি চাই আর কেন চাই তা আল্লাহই সব চেয়ে বেশি জানে। তাই যদি হয়, তাহলে আল্লাহর কাছে হাত তুলে দোয়া করে চাওয়ার কি দরকার? আল্লাহর কাছে তা গ্রহনযোগ্য মনে হলে আমাদের চাহিদা মুহুর্তের মধ্যে পুরন হয়ে যাবার কথা, তাই না...? মনে করেন যে- আল্লাহ জানেন যে, তাঁর অমুক বান্দার এই মূহুর্তে এমন একটা চাকরি দরকার যা সে করতে অনেক বেশি আগ্রহী। তাইলে তো আল্লাহ গ্রহন করলেই সাথে সাথে তাঁর চাওয়া পূর্ণ হয়ে যায়। সুতরাং আল্লাহ কি সব জানার পরেও তোমার মুখ থেকে তোমার চাওয়ার কথা শুনার অপেক্ষায় বসে থাকবেন? তাহলে বেপারটা এমন যে আমার সামনে এক ফকির, তাঁর হাতে একটা থালা, দেখেই আমি বুঝতে পেরেছি যে তাঁর টাকা দরকার। কিন্তু আমি তাকে কোন টাকা দিবোনা যতক্ষণ পর্যন্ত না সে আমার কাছে এসে ভিক্ষে চায়। এটা একটা নিছক মানবিক চাওয়া, ঈশ্বরের চাওয়া হতে পারেনা।

এই রকম ধর্মহীন ঈশ্বরের (আস্তিকতার) সাথে নাস্তিকতার নাকি কোন বিরোধ নেই, নাস্তিকরা তাই বলে থাকে। এমন ঈশ্বরের হাতে নিজেকে সমর্পণ করতে ব্যক্তিগত যেকোনো পূজা নৈবেদ্য বা ইবাদতের সাথেও কোন সংঘাত নেই; যদি না তা জোর করে অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা না করা হয়। নাস্তিকদের মূল বিরোধ ধর্মের সাথে, যাঁরা মানুষকে বিভক্ত করে, ঘৃণা ছড়িয়ে পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে, নিপীড়ন মূলক আচরণ ধর্মের নামে চাপিয়ে দেয়।



পর্ব:০৪

নাস্তিকতা ও সামাজিক বন্ধন!!!

ফেসবুকে প্রায়শই নাস্তিকদের সম্পর্কে জানতে (নাকি বিষোদগার করতে) এমন সব প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়া হয় যেন এঁরা ভিনগ্রহের কোন জীব নয়তো পতিতালয়ের মতো কোন বিচ্ছিন্ন সামাজিক মানুষ। 

বিষয়টি খুবই হাস্যকর মনে হয় সবার কাছে। প্রথম যে প্রশ্নটি করা হয়-

(১) তোমরা সামাজিক আচার অনুষ্ঠান পালন কর কেন? কিসের জন্য?

-আস্তিক নাস্তিক সবাই একই সমাজের মানুষ। সমাজের প্রচলিত নিয়ম কানুন কোন কিছুরই বাইরে নয় সে। ফলে সমাজের মধ্যে প্রচলিত নিয়ম যা কল্যাণকর-সুন্দর-উন্নত (নিদেনপক্ষে ক্ষতিকর নয় একেবারেই) তা না মানার কি কারণ থাকতে পারে? শুনেছি নাস্তিকরা বলে, নাস্তিকতার মধ্যে গোঁড়ামি-জেদ-মৌলবাদীতার কোন সুযোগ নেই। তাই নাস্তিকরা আদর্শ ছাড়া অন্য কোনো বিষয় নিয়ে অযথা গোঁ ধরেনা।

মায়ের চাওয়া ছেলে অন্তত শুক্রবারে মসজিদে যাক। গেলে মা খুশি হন। সেজন্য অনেকেই যায়। তাঁদের ভাষায় মসজিদ বা নামাজ নিরর্থক, কিন্তু মা, মায়ের খুশি নিরর্থক নয়। মুসলিম প্রেমিকা জেদ ধরেছে কলেমা পড়তেই হবে তাকে বিয়ে করতে চাইলে। যিনি নাস্তিক তিনি গোঁ নাও ধরতে পারেন। তাঁর যুক্তি একটি বাক্য উচ্চারণ করলে যদি ভালবাসার মানুষটি খুশি হয়, পড়ে নেবো সমস্যা কি। যেখানে ওকে পাবার জন্য জীবন বাজি রাখতে পারি, সেখানে একটি বাক্য তো তুচ্ছ।

নাস্তিকরা বলে, নাস্তিকতা ধর্মের মতো কচুপাতার পানি নয় যে সামান্য টোকাতেই ঝরে পড়ে যায়। ধর্মে যেমন সামান্য ছুঁলে বা গোমাংস জোর করে খাইয়ে দিলেই পঞ্চাশ বছরের জাত নিমেষেই চলে যায়, শব্দের একটু এদিকওদিক হলেই সত্তুর বছরের ঈমান এক সেকেন্ডে চলে যায়, নাস্তিকতা সেই ছুৎমার্গের অনেক উপর বলেই নাস্তিকদের দাবি। তবে হ্যাঁ, সমাজের কুসংস্কার ও বিদ্বেষ প্রসূত নিয়ম বা সংস্কারের বিরোধিতা নাস্তিকেরা বরাবরই করে থাকে। যদিও সমাজের অনেক ধার্মিকরাও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কথা বলে, তবে তাঁদের এই প্রতিবাদের সীমাবদ্ধতা হল, ধর্মের মধ্যকার কুসংস্কার ও অন্যায়ের বেলায় এরা বোবাকালা হয়ে যায়, যা নাস্তিকরা হয়না। ধর্মের বিরুদ্ধে গেলেও এঁরা বিরোধিতা সর্বদাই উচ্চকিত।

দ্বিতীয় যেই হাস্যকর প্রশ্নটি ছুড়ে দেওয়া হয় নাস্তিকদের দিকে-

(২) আপনি যদি ধর্ম বিশ্বাস না’ই করেন, তবে আপনার ধর্মীয় নামটি পাল্টাননা কেন? 

-আচ্ছা নাম পাল্টানো কি কঠিন কাজ? পাল্টালে তো পাল্টাতেই পারে। কত প্রজ্ঞা দেবনাথ নিমেষেই ফাতেমা খাতুন হয়ে যায়, তপন ভট্টাচার্য তপন মাহমুদ হয়ে যায় কত সহজে। কথা হল নাস্তিক সেটা পাল্টাবে কেন? কারণ ধর্ম নামের মধ্যেও ধর্মের গন্ধ খুঁজে বেড়ায়, খাবারের মাঝে ধর্ম খুঁজে বেড়ায়, এমনকি টয়লেটের মধ্যেও ধর্ম খুঁজে বেড়ায় (প্যান বা কমোডটি উত্তর দক্ষিণ হতে হবে)। নাস্তিকতা কি এই সকল হাস্যকর বিষয়ের মধ্যে নাস্তিকতা খুঁজে বেড়ায়? আর প্রশ্নটি করার পূর্বে আমাদের ভেবে দেখা উচিত বাপ-দাদার পৌত্তলিক ধর্ম ত্যাগ করার পর নবী করিম (সাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত ওসমান (রাঃ) কি পিতা মাতার দেওয়া পৌত্তলিক নাম প্রত্যাখ্যান করেছিলেন? অথবা ইব্রাহিম (আঃ) কি তাঁর পৌত্তলিক পিতা আজর/তারাহর দেওয়া নাম ফেলে দিয়েছিলেন? মনে রাখতে হবে নাস্তিকতার কোন 'বাইবেল' নাই, যুক্তির শাণিত ধারই এঁদের 'বাইবেল'।

তৃতীয় যে প্রশ্নটি নাস্তিকদের করা হয়, তা হলো-

(৩) তোমরা ধর্মীয় উৎসবে কেন যোগ দাও?

-তার মূল কারণ নাস্তিকদের নিজস্ব কোন উৎসব নাই। দীর্ঘদিন সমাজে ধর্মের রাজত্ব কায়েম থাকার ফলে বেশিরভাগ উৎসব হয়ে গেছে ধর্মকেন্দ্রিক। অথচ বিনোদনের প্রয়োজন আছে জীবনে। সুতরাং এঁরা স্রেফ বিনোদনের জন্যই উৎসবে যোগ দেয়, এর পিছনে কোন ধর্মীয় ভাব গাম্ভীর্য থাকেনা, ধর্মীয় রীতিনীতির ধারও ধারে না। এটাও ঠিক ধর্মীয় উৎসবের চাইতে অসাম্প্রদায়িক উৎসবে (বৈশাখী উৎসব, রবীন্দ্র নজরুল জয়ন্তী, স্বাধীনতা দিবস ইত্যাদি) অংশ নিতে ওঁরা বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এবং রাষ্ট্রে এইরকম উৎসব যত বেশি বেশি হবে, উৎসব তত বেশি অংশীদারি হবে, মানবিক হবে। 

(৪) তোমরা কেন ধর্মীয় রীতিতে বিয়ে কর, ছেলেদের খৎনা করাও কেন, সালাম দাও কেন, ইফতার খাও কেন, কবর দাও কেন ইত্যাদি সব প্রশ্নের উত্তরও এখানেই নিহিত। যা কিছু ভালো (সমাজে প্রচলিত সব কিছুই খারাপ এমন কথা পাগলেও বলবেনা) তার উৎস যাহাই হোক না কেন নাস্তিকতা হয়ত তা নিজের মধ্যে ধারণ করার মত উদারতা বহন করে। তার সাথে বিরোধ করে অযথা সমাজে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করেনা, করতে চায়না। তবে এসব প্রশ্ন নাস্তিকদের করার পূর্বে আমাদের মনে রাখতে হবে, মহান আল্লাহ্ সুবহানাতাআলা’ও ইসলাম ধর্মে ইহুদিদের প্রচলিত অনেক রিচুয়ালস অনুমোদনে কার্পণ্য করেননি। যেমন- অজু, আজান, সালাম, সিয়াম, পর্দাপ্রথা, খতনা ইত্যাদি। আমাদের প্রিয় নবী করিম (সাঃ)’ও ইসলাম পূর্ব পৌত্তলিকদের হজ্জ্বের সকল প্রথা একদম বিলুপ্ত করেননি (সাতপাক, কোরবানি, পাথরচুমু, সাফা মারোয়া সাঈ ইত্যাদি)। যেগুলো গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছিল, নবীজী (দঃ) তা গ্রহণ করতে কার্পণ্য করেননি।



পর্ব:০৫
নাস্তিকতা ও নৈতিকতা!!!

আরেকটি মজার ভাবনা আছে ধার্মিকদের কাছে- এঁদের ধারণা পৃথিবীতে মানুষ মন্দ কাজ করেনা কেবল ঈশ্বরের ভয়ে। আর নৈতিকতা তৈরি করেছে ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থ। 

অথচ আমরা যদি সাধারণ চোখেই দেখি, এটা স্পষ্ট যে, ধার্মিকেরা করেনা পৃথিবীতে এমন কোন অপরাধ নাই। আপনি জেলখানায় যান দেখবেন সেখানে ৯৯% কয়েদি ও হাজতি কোন না কোন ধর্মের অনুসারী। শুধু তাই নয় বাংলাদেশের দিকেই তাকিয়ে দেখুন, কথায় কথায় নব্বই ভাগ মুসলমানের দেশ বলে গর্ব করা মুসলিমদের অপরাধের বহর দেখে জানোয়াররাও হেসে কুল পায়না। আর যদি পরিসংখ্যানের দিকে লক্ষ্য করেন- দেখবেন যে দেশে ধর্মের আচার যত বেশি সে দেশে অপরাধও তত বেশি। নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড ইত্যাদি দেশে শতকরা ষাট থেকে সত্তর ভাগ মানুষ নাস্তিক। অথচ সেখানে অপরাধের সংখ্যা এত কম যে জেলখানাগুলি একে একে বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। তার মানেই হচ্ছে ধর্মের তথাকথিত পাপ-পুণ্যের শাস্তির ভয় বা মৃত্যুর পর প্রাপ্তির লোভ খুব বেশি কার্যকর নয়।

তবে এ কথাও ঠিক নয় যে, নাস্তিক হলেই মানুষ সৎ ও ভালো মানুষ হবে। নাস্তিকদের মধ্যেও অনেক অসৎ লোভী মানুষ আছে, সংখ্যায় কম বলে খুব একটা দৃষ্টিগোচর হয়না। কিন্তু সৎ হবার সাথে আস্তিকতা বা নাস্তিকতার কোন সম্পর্ক নাই। আগেই বলেছি এরা সততা বা নৈতিকতা শিক্ষা দেয়না। নৈতিকতা এবং মানবতা এগুলো মানুষ প্রথম শিখে সমাজ, ধর্ম ও পরিবার থেকে। তারপর শিখে নীতিবিদ্যা, দর্শন ও সমাজ বিদ্যা থেকে। আর মানুষ অন্যায় থেকে বিরত থাকে মূলত আইন-শাসন ও বিচারের ভয়ে। দ্বিতীয়ত বিবেক ও মূল্যবোধ থেকে। এটা ধর্মের এক ধরণের জোরজবরদস্তি মূলক প্রচার যে ধর্ম থেকে নৈতিকতা এসেছে।

নীতিশাস্ত্র অনেক পুরোনো, খ্রিস্টপূর্ব কয়েক সহস্র বছর আগেও নীতিশাস্ত্রের দেখা মেলে। মানুষ যখন মোটামুটি বনবাঁদার ছেড়ে গোষ্ঠীভিত্তিক সমাজের সৃষ্টি করে তখনই নৈতিকতা ও বিধিনিষেধের প্রয়োজন পড়ে। তখন সমাজের শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে নিজেদের মধ্যেই কিছু অলিখিত চুক্তি করে নেয়। তখন থেকেই শুরু হয় নীতি নৈতিকতার। জ্যাঁ জ্যাক রুশোর Social Contact Theory দেখে নিতে পারেন। সামাজিক চুক্তি নামে বইটি বাংলায়ও পাওয়া যায়। ধর্ম এসেছে তারও অনেক পরে। আর বিধিবদ্ধ ধর্মের ইতিহাস তো সেদিনের। বরং ধর্ম নিজেই সমাজে প্রচলিত এইসব নিয়ম চুরি করে নিয়ে প্রভুর বাণী বলে চালিয়ে দিয়েছে এবং সার্বজনীন নৈতিকতাকে গোষ্ঠীভিত্তিক করে মানুষে মানুষে বিভেদ বাড়িয়ে দিয়েছে। মোট কথা নৈতিকতা ও মানবতা বিহীন আস্তিক নাস্তিক সকলের নিকটই সততা ও ন্যায় পরায়ণতা নিরাপদ নয়।

এমনকি ধর্ম নিজে অনেক অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নৈতিকতার মোড়কে বিকিয়েছে। শিশু বিবাহ, নারীকে অসম্মানিত করা, বিধর্মীদের প্রতি ঘৃণা, ধর্মত্যাগীদের হত্যা সহ নানাবিধ নিষ্ঠুরতা ধর্ম দ্বারা বৈধতা পেয়েছে। একটি প্রশ্ন/হেইট ইচ্ছাকৃতভাবে নাস্তিকদের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হয়- ‘তোরা তো মা বোনের সাথে সেক্স করিস’। এই কথাটি বলার মূল কারণ প্রশ্নকর্তা বা দাবিকারীর নিজের মাথার ভিতর 'মা বোনের সাথে সেক্স' এই ভাবনাটি নিয়ত ঘুরপাক খায়। নাহলে চরিত্রের এতো সব উপাদান থাকতে কেবল একটি উপাদান কেন তাঁর কাছে মূখ্য হয়ে উঠে? ওরা মনে করে, ধর্ম ওদেরকে না করেছে বলে ওরা ঐ কাজটি করেনা। নাস্তিকরা যেহেতু ধর্ম মানেনা তাই ওরা এটি করে বেড়ায়। এর দ্বারা প্রকারান্তরে সে নিজেই স্বীকার করে নিচ্ছে ধর্মের নিষেধাজ্ঞা না থাকলে সে অবলীলায় তা করত। 

ধর্মের নিষেধাজ্ঞা নয় Incest এর প্রতি মানুষের অনীহা Basic Negative Instinct এর মধ্যে পড়ে। যার সাথে জড়িয়ে আছে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ, যা ধর্মের নিজস্ব সম্পত্তি নয়, ছিনতাই করা ভাবনা। মিশরের Pharaoh, যাঁরা বোন বিয়ে করত (যা থেকে Pharaoh Complex এসেছে), কিংবা Caligula যে মায়ের সাথে সঙ্গম করত, এরা কেউই নাস্তিক ছিলেননা। সবাই ধার্মিক ছিলেন। হিন্দুধর্মের দেবতাদের মধ্যে Incest এর ছড়াছড়ি। ভাইবোনের বিয়ে ইসলামের প্রথম নবী হযরত আদম (আঃ) এর সন্তানদের মধ্যে ছিল। মুসলমানেরা First Cousin বিয়ে করতে পারে যা তৎকালীন আরবে Incest হিসেবে গণ্য ছিল। এখনো পৃথিবীর বেশিরভাগ ধর্ম সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। আর নিজ কন্যাকে ধর্ষণ, ভাতিজিকে ধর্ষণ, নাতনি ধর্ষণের ছবিগুলি যে পত্রিকায় একদিন দুদিন পরেই আসে ওরা কি ধর্মহীন? লেবাস দেখে তো অন্য কিছু মনে হয়।




পর্ব:০৬
নাস্তিকতা কি ফ্যাশন? 

নাস্তিকতা একটা ফ্যাশন। এমন বাক্যটি ফেসবুকে এবং দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন আড্ডায় একটি সুপরিচিত বাক্য। বিশেষ করে মডারেট মুসলিমরা এই অপবাদটি বেশি দিয়ে থাকে। সেদিন দেখলাম আমাদের এক নাস্তিক (?) বন্ধুও এমন অভিযোগ করেছেন। আসলে যাঁরা এমনটি বলে থাকেন, তাঁরা ফ্যাশন শব্দের অর্থ না বুঝেই হয়তো এমনটি বলেন। আসুন প্রথমেই আমরা জেনে নিই ফ্যাশন কাকে বলে-
Fashion is a popular aesthetic expression at a particular time, place and in a specific context, especially in  clothing, footwear,  lifestyle, accessories, makeup, hairstyle, and body proportions. 
অর্থাৎ ফ্যাশন হচ্ছে একটি জনপ্রিয় প্রচলন এবং জনপ্রিয়তার জন্যই ওটা মানুষের মধ্যে গৃহীত হয়। সেই নিরিখে নাস্তিকতা কি জনপ্রিয় কোন অর্থেই? অবশ্যই না। এটি ভীষণ অ-জনপ্রিয় একটি বিষয়, শুধু অ-জনপ্রিয়’ই নয়, ঘৃণিতও বটে বিশেষ করে এই সমাজে। সুতরাং যাঁরা ভাবে নাস্তিকতা একটা ফ্যাশন তাঁরা অবাস্তব কথা বলছেন।

তাহলে কি নাস্তিকতা একটা ট্রেন্ড? চলুন ট্রেন্ড কি এই বিষয়টি পর্যালোচনা করি। উইকিপিডিয়া বলছে- Whereas a trend often connotes a peculiar aesthetic expression by majority and often lasting shorter than a season। তাহলে তর্কের খাতিরে বললে বলা যেতে পারে পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে এটি একটা ট্রেন্ড আকারে এসেছিল যখন স্কুল কলেজের প্রায় সব ছেলেমেয়েরাই নিজেদেরকে অবিশ্বাসী ও সাম্যবাদী হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করত। এখন যেমন চলছে ধার্মিক হবার ট্রেন্ড। এটিও বৃহৎ জনগোষ্ঠীর নিরিখেই বিশ্লেষিত। অতএব সেই অর্থে এটি ট্রেন্ডও নয়। তাহলে নাস্তিকতা কি? 

আমার দৃষ্টিতে মূলত নাস্তিকতা একটা প্যাশন (Passion)। সত্যের সন্ধানে নিরন্তর ছুটে চলা এক সংশয়ীর দুঃসাহসিক অভিযান। এই অভিযানে কোন অর্থ নেই, লাভালাভ নেই, নেই কোন খ্যাতি বা যশ। মুক্তমনা’রা দু’চার কথা লিখে শখ করে নয়। সে জানে এই লেখার জন্য ওর জীবনের শেষ আলো নিভে যেতে পারে যেকোনো সময়। সমাজচ্যূত হতে পারে, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে, বঞ্চিত হতে পারে ন্যূনতম সম্মান থেকে। লাইক কমেন্টসের জন্যও লেখেনা। এগুলো লেখার লাইক অর্ধ হাজারেও পৌঁছে না, ইসলামের নামে ডাহা মিথ্যা লিখলেও কয়েক লাখ ফলোয়ার তৈরি হয়ে যায় নিমেষেই। তবুও লেখে, প্রচার করে। যাতে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে এগিয়ে যায় সমাজ ও রাষ্ট্র। 

এটাও ঠিক, শুধুমাত্র নাস্তিকতা নয়, সমাজ, ধর্ম ও রাষ্ট্রের সকল অসঙ্গতি ও নিপীড়নের বিরুদ্ধেও বলতে হবে। চিনে নিতে হবে ভাল ও মন্দের পার্থক্য, জানতে হবে নৈতিকতা ও মানবতার আসল মর্মার্থ। নয়তো এই প্যাশন হবে মূল্যহীন, প্রসবিত হবে অশ্বডিম্ব।

আরেকটি কথা, নাস্তিকতা কোন ধর্ম না, এর কোন গোষ্ঠীবদ্ধতা নেই, নেই কোন রাজনৈতিক সংগঠন। এঁরা রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে চায়না। এরা বাস্তব, অস্তিত্বশীল এক চিরন্তন বাস্তবতা। সবকালে, সব স্থানে, সকল জাতিগোষ্ঠীর মধ্যেই এঁরা আছে, থাকবে। এঁদের সংখ্যা নিরূপণ দুরূহ কাজ। ধার্মিকের খড়্গ যতদিন উদ্ধত থাকবে এর সঠিক সংখ্যা ততদিন নিরূপিত হবে না। ফলে নামাজীদের মাঝে, কথায় কথায় আল্লাহু আকবর, মাশাআল্লা, সুবহানাল্লা, জয় শ্রীরাম বলা মানুষদের মধ্যেও নাস্তিক আছে। মাদ্রাসা-মসজিদ-ধর্মশালায়’ও নাস্তিক আছে। এবং আপনি যত প্রকারেই দমন করেননা কেন এঁদের উৎপত্তি কখনো বন্ধ হবেনা। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি নিয়ে ভাবতে গিয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতে করতে কখন যে নিজের অজান্তেই নাস্তিকতায় ঢুকে পড়ে নিজেও বলতে পারেনা। 

পণ্ডিত মহলে যেমন নাস্তিক আছে, স্বল্প শিক্ষিত মানুষের মাঝেও নাস্তিক আছে। যার কারণে সৌদিআরব, ইরান, আফগানিস্তানের মত কট্টর মৌলবাদীদের দেশেও অনেক নাস্তিক আছে। তবে সারাদিন, সবসময়, সবকিছুতেই ধর্ম অথবা নাস্তিকতা কপচানো একটা মানসিক রোগ ছাড়া কিছুই না।




পর্ব:০৭
নাস্তিকতা কি হিংসা ছড়ায়? 

একটি অভিযোগ প্রায়শই নাস্তিকদের বিরুদ্ধে আনা হয়- ধর্মানুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ। কিভাবে নাস্তিকেরা আঘাত হানে? কথা বলার মাধ্যমে। কি কথা বলে? ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে, তাঁর অস্তিত্ব নেই-এর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে। এটা কিভাবে আঘাত হতে পারে, দয়া করে বলবেন কি? (বিঃ দ্রঃ- যাঁরা ঈশ্বরকে গালাগালি করে, অযথা ধর্ম প্রচারকদেরকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে অথবা অশ্লীল ভাষায় কথা বলে তাদেরকে এই প্রসঙ্গে আনবেন না। অবশ্য সংখ্যায় এরা খুব বেশিও না)। 

তাঁদের বক্তব্য, আপনি ঈশ্বর বিশ্বাসী নন ভাল কথা, এটা প্রচার করতে হবে কেন? আপনার বিশ্বাস আপনার ভিতরে রাখুন। এখন নাস্তিক যদি আপনাকে বলে, আপনি ঈশ্বর বিশ্বাস করেন ঠিক আছে, এটা প্রচার করতে হবে কেন? আপনার বিশ্বাস আপনার ভিতরে রাখুন। সেটা কি আস্তিক বাবাজি মেনে নেবেন? নেবেন না। অর্থাৎ মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেবল আস্তিকদের থাকবে, নাস্তিকদের নয়! কারণ ওরা সংখ্যাগুরু। বিবেককে প্রশ্ন করে দেখুন তো, আপনার বিবেক কি বলে? নাস্তিক তাঁর ভাবনা প্রচার করলে যদি আমাদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত হানে, আমাদের ভাবনার প্রচারে কেন ওঁদের নাস্তিকানুভূতিতে আঘাত হানবে না? অনুভূতি কি কেবল আস্তিকদেরই আছে, নাস্তিকদের নাই? তাহলে?

এটা তো চোখের সামনেই দেখা যায়, বিভিন্ন ধর্ম প্রচারকদের বক্তব্যে কিভাবে সরাসরি নাস্তিকদের হত্যা করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধর্ম গ্রন্থের রেফারেন্স দেয়া হয়। তাহলে ঘৃণা ও হিংসা ছড়ায় কারা? পৃথিবীতে শুধু নিজের মত প্রকাশের জন্যে, ধার্মিকদের হাতে যে পরিমাণ নাস্তিক ও মুক্তবুদ্ধির মানুষ নিহত হয়েছে (কখনো সরাসরি, কখনো গুপ্তহত্যা, কখনো বিচারের নামে) তার নিযুতাংশও কি নিহত হয়েছে নাস্তিকদের হাতে? বরং এক ধর্মের আস্তিকদের সাথে দাঙ্গা বেঁধেছে অন্য ধর্মের আস্তিকদের। যাকে ওরা নাম দিয়েছে ধর্মযুদ্ধ। পৃথিবীতে এ যাবৎকালে ধর্মযুদ্ধের কারণে যে পরিমাণ মানুষ নিহত হয়েছে, সমস্ত মহামারী বা প্রাকৃতিক দুর্যোগেও তত মানুষ মারা যায় নি। শুধু ধর্মের যুদ্ধ নয়, পৃথিবীর দু’দুটি বিশ্বযুদ্ধের নায়করা তো ক্যাথলিক খ্রিষ্টান, জাপানে বোমা বর্ষণের হুকুম দাতা ট্রুম্যান কি নাস্তিক? বা বোমা বর্ষণকারী? ধর্ষণ, লুট, অগ্নিসংযোগের ঘটনা না হয় বাদই দিলাম।

শুধু তাই নয় এখনো পৃথিবীতে যে সংকটগুলি চলমান (সিরিয়া সংকট, কাতার সমস্যা, ফিলিস্তিনিদের সমস্যা, রোহিঙ্গা সমস্যা, আফগান সংকট, কাশ্মীর সমস্যা, ইয়েমেনের যুদ্ধ) সবকিছুর সাথেই ধর্ম প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। তার উপর আছে একই ধর্মের ভিতরে দলীয় ও উপদলীয় কোন্দল। যাকে ঘিরে লাঠালাঠি, মারামারি, খুনোখুনি হরহামেশাই দেখছি এই বাংলাদেশ, পাকিস্তানে। 

নাস্তিকতায় যাঁরা উদ্বুদ্ধ তাঁরা সংখ্যায় কম। পৃথিবীতে মাত্র বিশ ত্রিশ কোটি নাস্তিক আছে। কারণ শিশু জন্ম নেবার সাথে সাথে আস্তিক হয়েই ক্রমশ বড় হয়। ধর্মের যেমন লাখো লাখো ক্যানভাসার আছে, যাঁরা প্রতিনিয়ত শিশুর কানে ধর্মের 'অমৃত বাণী' ঢালে, নাস্তিকতার সেই প্রচেষ্টা নাই। চাইলেও সে সুযোগ কখনো দেয়া হবেনা। পৃথিবীতে হাজার হাজার ধর্মীয় পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল থাকলেও একটি নাস্তিক চ্যানেল বা পত্রিকা নাই। তাই যাঁরা নাস্তিক হয় তাঁদের নাস্তিক হতে হয় (বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই) পড়াশোনা করে, নয়তো স্বশিক্ষিত হয়ে। নিজের ভেতরের কৌতূহলী বিবেকটিকে জাগ্রত করে। বরং মৃত্যু পরবর্তী জীবনের সকল প্রকার লোভকে পায়ে ঠেলে দিয়ে। ফলে স্বভাবতই এঁদের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকই হয়ে উঠতে হয় বিবেকবান, পরমসহিষ্ণু, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের ধারক ও বাহক হয়ে।

আর নাস্তিকেরা মানুষ খুন করবে কোন প্ররোচনায় বা প্রলোভনে? তাঁকে তো কেউ খুনের বদলে স্বর্গ প্রাপ্তির লোভ দেখাচ্ছেনা, এবং কেউ এখানে দু'টাকা বিনিয়োগও করবেনা। কারণ এখানে ইনভেস্ট করলে বিনিয়োগকারীর লাভ কি? এমন তো নয় যে এ টাকা পরকালে সত্তর গুন বেশি হয়ে তাঁর কাছে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে বা তাঁকে সহস্র পুণ্য প্রদান করা হবে। ধর্মকে কেন্দ্র করে যেমন লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বা বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে (পূজা, পার্বন, উৎসব, পারলৌকিক ক্রিয়া, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, তীর্থ দর্শন, ধর্মগৃহ ইত্যাদি ইত্যাদি), নাস্তিকতাকে ঘিরে এর কিছুই নাই। সেই অর্থে নাস্তিকতা হলো ফহিন্নির ঘরের ফহিন্নি, ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার মত হুদাই লাফায়। 

সুতরাং হিংসা ছড়িয়ে, যুদ্ধ বাঁধাবার মত শক্তি নাস্তিকদের হবেও না, প্রয়োজনও নাই। কারণ তাঁদের কোন রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ নেই, রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলেরও ইচ্ছে নেই। এঁদের পিছনে কেউ নেই, থাকলেও ভোটের আগে সবাই কেটে পড়ে। কিছু কিছু বিদেশি মানবাধিকার সংগঠন নাস্তিকদের প্রতি সামাজিক, ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে এটি খুব শক্তিশালী হয়ে উঠেনা। নাস্তিকতা বা বস্তুবাদ স্রেফ একটি মতবাদ, এর বেশি কিছু নয়। নাস্তিকরা চায় সে যেন তাঁর ভাবনাটি অন্যান্য মতবাদের মতোই মুখ খুলে বলতে পারে, নিজের পরিচয়টুকু নির্বিঘ্নে দিতে পারে।





পর্ব:০৮
নাস্তিকতা কি হতাশার জন্ম দেয়? 

একটি জাহাজ, মহাসমুদ্রে ভাসমান। ইঞ্জিন বিকল, চতুর্দিকের আকাশ কালো করে প্রচন্ড  ঝড় উঠেছে জাহাজ টলায়মান, ক্রমশ নিমজ্জমান। জাহাজের বিশ্বাসী মানুষগুলি যাঁর যাঁর বিধাতাকে ডাকছে তাঁদের সামনে একটি আশা জাগানিয়া আলো আছে, ওরা হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছেনা। আর যাঁরা অবিশ্বাসী? হতাশায় অন্ধকারে ক্রমশ ডুবতে থাকবে, ডুবতে থাকবে, ডুবতে থাকবে; কারণ তাঁর সামনে এমন কোন ঈশ্বর নেই। ইহাই  বিশ্বাসের সুফল, এভাবেই বিশ্বাসীরা শান্তিতে থাকে, প্রশান্তিতে মৃত্যুবরণ করে।

একজন বিশ্বাসী এমনি করে তাঁর বিশ্বাসের পক্ষে 
সুন্দর করে যুক্তি তুলে ধরে।

একদিন এক নাস্তিক তাঁকে জিজ্ঞেস করল,
>আপনি কি কখনো এমন জীবন-মৃত্যুর সংকটপূর্ণ মোহনায় তরী বেয়েছেন, মানে পড়েছেন কি?
সে বললো,
-না, আমার হৃদয়ে এমন অনুরণনই বাজে। আপনি বলুন আমার এমনতর ভাবনা কি একেবারেই অমূলক?
>আচ্ছা তাঁর আগে আপনি আমাকে জানিয়ে দিন তো, বিশ্বাসীরা তাদের আপন আপন প্রভু নাম বসে বসে আহলাদিত চিত্তে জপ করতেই থাকবে, নাকি জাহাজের নিরাপদ অংশে পৌঁছুবার জন্য 
দৌড়াতেও থাকবে?
-সেখানে যাবার জন্য অবশ্যই চেষ্টা করবে।
>তারা কি সবার সাথে প্রতিযোগিতায় নেমে জাহাজের জীবনতরী (lifebouy/boat/jacket ) সংগ্রহ করবে, নাকি করবেনা?
-তাতো করবেই।
>তাদের চেহারায় উৎকন্ঠা, উদ্বিগ্নতার ছাপ 
পরিলক্ষিত হবে কি হবেনা? কেউ কেউ বিলাপ করে কাঁদবে কি কাঁদবেনা?
-কেউ কেউ তো অবশ্যই কাঁদবে। চেহারায় উৎকন্ঠার ছাপ থাকাটাই স্বাভাবিক।
>বাঁচার জন্য আপ্রান ছুটাছুটি, বাঁচার উপায়সমূহ 
নিয়ে কাড়াকাড়ি, ক্রন্দন, উদ্বেগ-উৎকন্ঠা কি  সমর্পিত প্রাণ বা প্রশান্তির প্রমাণ বহন করে? এগুলি একই সাথে তো অবিশ্বাসীদের মাঝেও থাকবে, তাহলে পার্থক্য কোথায় পেলেন, আব্বা হুজুর? এখানে শান্তি কোথায় দেখলেন, নিশ্চিত ভরসাই বা কোথায় দেখলেন বাবু মশাই?
-তবুও সে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করে, তাঁর পায়ে নিজেকে সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্তভাবে মরতে পারবে।
>শুনেন, মৃত্যু মৃত্যুই। সঁপে দেওয়া মৃত্যু বা নির্লিপ্ত উদাস নয়নে মৃত্যুর মাঝে কোনই তফাৎ নেই। তবুও আপনি ঐ কথাটি ঠিক বলেন নাই।

বিশ্বাসী- কোন কথাটি?
অবিশ্বাসী> ঐ যে, ‘সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্তভাবে মরতে 
পারবে’ -সেই কথাটি।
-কি রকম?
>শোনেন ব্রাদার, মৃত্যু পরবর্তী বিচারের ভাবনা, তারপর শাস্তি হিসাবে নৃশংস সব প্রক্রিয়া কোন বিশ্বাসীকেই শান্তিতে মৃত্যুবরণ করতে দিতে পারেনা। শুধু মৃত্যু কেন, জীবনযাপনেও নিয়ত যে ভয়ের তাড়নায় তাড়িত সে কোনদিন সুখানুভূতি পেতে পারেনা। সে সর্বদাই হতাশায় নিমজ্জিত থাকে। মাথার উপর যাঁর মৃত্যুদন্ড সে কি স্বস্তিতে দিন কাটাতে পারে? দেখেননা কি এক অযাচিত 
নরকের ভয়ে, তা থেকে বাঁচার কি প্রাণান্তকর চেষ্টায় কি রকম লিপ্ত সবাই!
-কিন্তু প্রাপ্তির সম্ভাবনার কথাও তো বলা আছে।
>আছে, তবে শাস্তির তুলনায় তা নিতান্তই 
ক্ষুদ্র। প্রাপ্যতার সম্ভাবনাও অনেক কম। বাহাত্তর  ভাগের এক ভাগ মাত্র। আর প্রাপ্তিগুলোও বড্ড সেকেলে। আগ্রহ জন্মায়না কারো একেবারেই।
-হুম। হতে পারে কারো কারো বেলায়।
>যাঁদের আধুনিক জীবন যাপনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচয় আছে, তাঁরা লোভাতুর হবেনা নিশ্চিত থাকতে পারেন। সহস্রাধিক বছরের পুরনো জীবনযাত্রায় বেকুব ছাড়া কেউ ফিরে যেতে চাইবেনা।

অবিশ্বাসী- আমার যে আরও বলার ছিল কিছু।
বিশ্বাসী- (রাগতস্বরে) বলে ফেলুন। আপনি তো   আবার সবজান্তা রামপ্রসাদ।
>ধরুন, যাঁরা (বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী উভয়েই) 
বেঁচে যাবে এ যাত্রায়, তাঁরা কি করবে পরক্ষণে, কি করতে পারেন ধারণা?
-(আরও ত্যক্তবিরক্ত গলায়) বলেন বলেন, আপনিই বলেন।
>বিশ্বাসীরা বিধাতাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে ছুটবে যাঁর যাঁর উপাসনালয়ে। হয়ত তথায় বিধাতারই সৃষ্টি কোন প্রাণীকে হত্যা করবে তাঁর উদ্দেশ্যে। সদকা দেবে।
-আর আপনারা?
>আমরা না, অবিশ্বাসীদের বেশিরভাগই ঢুকবে গবেষণাগারে। কিভাবে ঝড় মোকাবেলা করা যায়, ঝড় সহিষ্ণু জাহাজ বানানো যায়, ডুবে যাওয়া জাহাজে ক্যাজুয়ালিটি আরো কমানো যায় সেই 
প্রচেষ্টায় পূর্ণোদ্যমে গবেষণায় নেমে পড়বে। হতাশা নয়, আশা নিয়ে যে সে অবশ্যই সফল হবে। এভাবেই এরা পৃথিবীকে প্রতিনিয়ত পূর্বের চাইতে আরও সহজতর, কল্যাণকর, আরামদায়ক করে চলেছে। 

এবার কি বুঝলেন বলুন। আর শেষ কথা হল, যে আশা করে, না পেলে হতাশাগ্রস্ত হয়। নাস্তিকরা তো এখানে কল্পিত কারো সাহায্য প্রত্যাশাই করেনি, হতাশার প্রশ্ন এখানে আসে কিভাবে?

আস্তিক- (দৃঢ় কন্ঠে) এতে এটাই প্রমাণিত হল যে, বিশ্বাসীরাই শান্তিতে আছে।
নাস্তিক- পায়ে পরলাম, কানে ধরলাম আমারে মাফ কইরা দেওন যায়না গুরু! এখানে এখন আমি সত্যি সত্যিই হতাশ।।।


পর্ব:০৯
বস্তুবাদের প্রকারভেদ

আমরা একদম শুরুর দিকেই আলোচনা করেছিলাম যে, নাস্তিকতা শব্দটি ক্ল্যাসিক্যাল দর্শনের কোন টার্ম নয়। দর্শনে যেটি বস্তুবাদ (Materialism), তারই ব্যবহারিক একটি শব্দ হলো নাস্তিকতা বা  নিরীশ্বরবাদ। ভাববাদীদের মত বস্তুবাদের হাজার হাজার বিভাজন না থাকলেও বস্তুবাদীদের মনন ও মনোভাবকে বিশ্লেষণ করলে তিন ধরণের বস্তুবাদের সন্ধান মিলে। অবশ্য এইভাবে দেখলে ভাবাদীদেরকেও একইরকম ভাবে বিভক্ত করা যায়। কিন্তু ভাববাদীরা ধর্মের আচার পালনের মাধ্যমে নিজেদেরকে নিজেরাই এতো ভাবে বিভক্ত করে নিয়েছে যে নতুন ভাবে বিভক্ত করার আর প্রয়োজন নেই। যাইহোক তিন ধরনের বস্তুবাদ হলো- 
ক) ইতর বস্তুবাদ (Vulgar Materialism)
খ) যান্ত্রিক বস্তুবাদ (Mechanical Materialism)
গ) মানবিক বস্তুবাদ (Humane Materialism)
চতুর্থ আরেকটি বস্তুবাদের কথা দর্শন শাস্ত্রে প্রায়ই আলোচনায় উঠে আসে, সেটি হলো কার্ল মার্কস কর্তৃক প্রণীত দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ (Dialectic Materialism)। তবে সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পার্সপেক্টিভ  হওয়ায় এখানে আলোচনা করা হবেনা।

ক) ইতর বস্তুবাদ (Vulgar Materialism)- 
একটি বিষয়ে নাস্তিকদের মধ্যে এক ধরণের অহংকার আছে যে, নাস্তিকরা সবাই খুব শিক্ষিত, জ্ঞানী ও সর্বোপরি মানবতাবাদী হয়। কিন্তু বিষয়টি এত সরল করে বলা যাবে না। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে বেশিরভাগ নাস্তিক শিক্ষিত ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন হয়। বিশেষ করে ইউরোপের রেনেসাঁ আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে যে বস্তুবাদের উদ্ভব হয়েছে তাঁকে মানবিক না হয়ে উপায় নাই। ফেসবুকের নাস্তিকদের মধ্যে এমন টাউট বাটপারের সন্ধান আমাদের মাঝে মাঝেই মেলে।বস্তুবাদীরা যেহেতু ঈশ্বর ও ঈশ্বর কর্তৃক ইহলৌকিক ও পারলৌকিক বিচারে বিশ্বাস রাখে না, তাই তাঁরা কখনো কখনো চরম হিংস্র ও নৃশংস হয়ে উঠতে পারে। যদি না তাকে নৈতিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত করা না যায়। এদেরকে ইতর বস্তুবাদী বলে আখ্যায়িত করা হয়। সিরিয়াল কিলার, দস্যু, নারী নিপীড়কদের মধ্যে এমন নাস্তিক থাকতে পারে, যার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। 

খ) যান্ত্রিক বস্তুবাদ (Mechanical Materialism)-
সাধারণত পুঁজিবাদী লুটেরা ধনিক শ্রেণীর মধ্যে এসব বস্তুবাদীদের দেখা মেলে। এরা ইতর বস্তুবাদীদের মত জঘন্য অপরাধে হয়ত জড়িয়ে পড়ে না, কিন্তু মানুষ ও সমাজের প্রতি এরা কোন দায়বদ্ধতা বোধ করে না। রাষ্ট্রীয় আইনের আওতায় শোষণ ও শাসনের মাধ্যমে যতটুকু সম্পদ অর্জন ও ভোগ বিলাস করা যায়, তা করতে এরা কার্পণ্য করে না। শোষণ-লুটপাট বৈধ করতে সমাজে কিছু দান খয়রাত হয়ত এরা করে, কিন্তু সমাজের শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে এবং তার মূলোৎপাটন করতে ওরা সচেষ্ট হয় না। বরং এই ধরণের সকল সংগ্রামের ওরা সরাসরি বিরোধিতা করে। বর্তমান সময়ের ও  ফেসবুকের বেশিরভাগ নাস্তিকই যান্ত্রিক বস্তুবাদী। সারাদিন, সারাক্ষণ নাস্তিকতা নিয়ে উচ্চকিত হলেও সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে এদের দারুণ চুলকানি।

গ) মানবিক বস্তুবাদ (Humane Materialism)-
এই সকল বস্তুবাদীদের মধ্যে বস্তুবাদ ও মানবিকতাবাদ একইসঙ্গে গ্রো করে। বস্তুবাদের সাথে সাথে ওঁদের মধ্যে নৈতিকতা চমৎকার ভাবে ডেভেলপ করে। ফলে অনৈতিক কোন কিছু এঁদের মধ্যে দানা বাঁধতে পারে না। সমগ্র মানব জাতির মঙ্গলের জন্য এঁরা নিবেদিত হয়, দর্শনের সাথে সাথে এঁরা শোষণ ও বৈষম্য বিলোপ করে এক অখণ্ড মানবিক সমাজ গঠনে সচেষ্ট হয়, আন্দোলন সংগ্রাম করে, জীবন দান করে। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সাথে জড়িত মানুষেরা এই শ্রেণীর হয়ে থাকে। কারণ কমিউনিজমের লড়াইটা শুধু ধর্মবাদীদের বিরুদ্ধে নয়, পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে। পুঁজিবাদের বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে ভাববাদেরও বিলুপ্তি ঘটে। কারণ মার্কসবাদের আরেকটি অন্যতম অনুষঙ্গ হচ্ছে বস্তুবাদ। এই মানবিক বস্তুবাদীদের প্রায় সকলেই উচ্চ শিক্ষিত এবং মুক্তমনা হয়ে থাকে। বস্তুবাদীদের মধ্যে মানবিক বস্তুবাদীদের সংখ্যাই বেশি। তাই আমরা বস্তুবাদ বলতে মানবিক বস্তুবাদকেই বুঝি। 
(সমাপ্ত)।

Post a comment

0 Comments