শুক্রবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

সতীদাহ প্রথা ও রাজা রামমোহন রায় || রানা চক্রবর্তী

সম্রাট আকবরের অনিচ্ছা সত্বেও কিন্তু নিজের ইচ্ছায় একজন হিন্দু রানী নিজের স্বামীর সাথে সহমরণে চলেছেন। ১৬১০ খ্রীস্টাব্দে চিত্রকর মোহাম্মদ রিজার আঁকা ছবি। ছবি সৌজন্যে- ব্রিটিশ লাইব্রেরী আর্কাইভ।


সমাজ সংস্কারক রাজা রামমোহন রায়ের ১৮৫তম মৃত্যুবার্ষিকী (মৃত্যু- ২৭শে সেপ্টেম্বর ১৮৩৩ সাল, স্ট্যেপেলটন, ব্রিস্টল, ইংল্যান্ড) তে শ্রদ্ধার্ঘ্য
পুরানো সেই দিনের কথা: সতীদাহ প্রথা ও রাজ রামমোহন রায়- 

● সতীদাহ প্রথা কি? সতীদাহ প্রথা হচ্ছে হিন্দু ধর্মাবলম্বী বিধবা নারীদের স্বামীর চিতায় সহমরণে বা আত্মহুতি দেবার ঐতিহাসিক প্রথা, যা রাজা রামমোহন রায়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বন্ধ হয়।

● ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: গুপ্ত সাম্রাজ্যের (খৃষ্টাব্দ ৪০০) পূর্ব হতেই এ প্রথার প্রচলন সম্পর্কে ঐতিহাসিক ভিত্তি পাওয়া যায়। গ্রিক দিগ্বিজয়ী সম্রাট আলেকজান্ডারের সাথে ভারতে এসেছিলেন ক্যাসান্ড্রিয়ার ঐতিহাসিক এরিস্টোবুলুস। তিনি টাক্সিলা (তক্ষশীলা) শহরে সতীদাহ প্রথার ঘটনা তার লেখনিতে সংরক্ষণ করেছিলেন। গ্রিক জেনারেল ইউমেনেস এর এক ভারতীয় সৈন্যের মৃত্যুতে তার দুই স্ত্রীই স্বত:প্রণোদিত হয়ে সহমরণে যায়; এ ঘটনা ঘটে খৃষ্ট পূর্বাব্দ ৩১৬ সালে।
মূলতঃ স্বত:প্রণোদিত হয়েই পতির মৃত্যুতে স্ত্রী অগ্নিতে আত্মাহুতি দিত। পৌরাণিক কাহিনীতে এ আত্মাহুতি অতিমাত্রায় শোকের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই দেখা হত। মহাভারত অনুসারে পাণ্ডুর দ্বিতীয় স্ত্রী মাদ্রী সহমরণে যান কারণ মাদ্রী মনে করেছিলেন পান্ডুর মৃত্যুর জন্য তিনি দায়ী যেহূতু পান্ডুকে যৌনসহবাসে মৃত্যুদন্ডের অভিশাপ দেওয়া হয়েছিল। রাজপুতানায় "জহর ব্রত" প্রচলিত যাতে কোন শহর দখল হবার পূর্বেই পুরনারীরা আত্মসম্মান রক্ষার্থে আগুনে ঝাঁপ (বা জহর বা বিষ) দিয়ে স্বেছায় মৃত্যুবরণ করতেন, যা সতীদাহের অনুরূপ। কিন্তু কালক্রমে বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে হিন্দু স্ত্রীকে সহমরণএ বাধ্য করা হত। বিশেষ করে কোন ধনী লোকের মৃত্যুর সম্পত্তি অধিকার করার লোভে তার আত্মীয়রা তার সদ্যবিধবা স্ত্রীকে ধরে বেঁধে, ঢাক-ঢোলের শব্দ দ্বারা তার কান্নার আওয়াজকে চাপা দিয়ে তার স্বামীর সাথে চিতায় শুইয়ে পুড়িয়ে মারতো।

১৮২৯ সালের ডিসেম্বর ৪-এ বৃটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীতে সতিদাহ প্রথাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল ঘোষণা করা হয়। এসময় বেঙ্গলের গভর্ণর ছিলেন লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক। অবশ্য এ আইনী কার্যক্রম গৃহীত হয় মূলতঃ রাজা রামমোহন রায়ের সামাজিক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতেই। এই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিলে মামলা করা হয় । প্রিভি কাউন্সিল ১৮৩২ সালে বেঙ্গলের গভর্ণর লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংকের ১৮২৯ এর আদেশ বহাল রাখেন। খুব অল্পসময়ের মধ্যে ভারতের অন্যান্য কোম্পানী অঞ্চলেও সতীদাহ প্রথাকে বাতিল ঘোষণা করা হয়।
পাশ্চাত্যের গবেষকদের অনেকের মাঝে দ্বন্দ্ব থাকলেও ভারতীয় বেদ ভাষ্যকারগণদের মতে বেদে সতীদাহের উল্লেখ নেই। বরং স্বামীর মৃত্যুর পর পুনর্বিবাহের ব্যাপারেই তাঁরা মত দিয়েছেন। এ বিষয়ে অথর্ববেদের দুটি মন্ত্র প্রণিধানযোগ্য:

অথর্ববেদ ১৮.৩.১
ইয়ং নারী পতি লোকং বৃণানা নিপদ্যত উপত্ব্য মর্ন্ত্য প্রেতম্। ধর্মং পুরাণমনু পালয়ন্তী তস্ম্যৈ প্রজাং দ্রবিণং চেহ ধেহি।।

অর্থঃ হে মনুষ্য! এই স্ত্রী পুনর্বিবাহের আকাঙ্খা করিয়া মৃত পতির পরে তোমার নিকট আসিয়াছে। সে সনাতন ধর্মকে পালন করিয়া যাতে সন্তানাদি এবং সুখভোগ করতে পারে।

অথর্ববেদ ১৮.৩.২ (এই মন্ত্রটি ঋগবেদ ১০.১৮.৮ এ ও আছে)
উদীষর্ব নার্ষ্যভি জীবলোকং গতাসুমেতমুপশেষ এহি। হস্তাগ্রাভস্য দিধিষোস্তবেদং পত্যুর্জনিত্বমভি সংবভূব।।

অর্থঃ হে নারী! মৃত পতির শোকে অচল হয়ে লাভ কি?বাস্তব জীবনে ফিরে এস। পুনরায় তোমার পাণিগ্রহনকারী পতির সাথে তোমার আবার পত্নীত্ব তৈরী হবে।

সতীদাহ প্রথা ছিল হিন্দু ধর্মান্ধতার এক নিষ্ঠুর পৈশাচিক প্রথা। ধর্মের দোহাই দিয়ে মৃত স্বামীর জ্বলন্ত চিতার আগুনে স্ত্রীকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হতো। ব্রিটিশ শাসন প্রবর্তনের পর ওয়ারেন হেস্টিংস কয়েকজন ব্রাহ্মণের সাহায্যে হিন্দু আইন সংকলন করেছিলেন তাতে সতীদাহ প্রথার মাহাত্ম্য বর্ণনা করে বলা হয়েছে, "পতির চিতায় পড়ে মরলে সতী সাধ্বী মানুষের গায়ে যত লোম, ততো বছর অর্থাৎ সাড়ে তিন কোটি বছর পতি সহ সুখে স্বর্গে বাস করবে। তার পতির পিতৃমাতৃ উভয় কূলের তিন পুরুষ পাপ মুক্ত হবে। সহমরণের মত পত্নীর আর কোন মহৎ কর্তব্য নেই। এ জন্মে এটি অবহেলা করলে পর জন্মে তার পশু জন্ম হবে।" ১৮২২ সালে ২০ মার্চ সংখ্যা সামাচার দর্পণে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভারতবর্ষে সতীদাহের ঘটনা ১৮১৫ সালে ৩৮০, ১৮১৬ সালে ৪৪২, ১৮১৭ সালে ৬৯৬টি, এসব সতীদের বেশিভাগেরি বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর এবং তার কমও অনেকের ছিল। ১৮১৫ থেকে ১৮২৮ সালের মধ্যে কেবল মাত্র অবিভক্ত বাংলায় ৮,১৩৪টি সতীদাহের ঘটনা ঘটে। উল্লেখযোগ্য অমানবিক ঘটনা ঘটে ১৮১৮-১৮২০ সালের মধ্য যারা সতী হয়েছিল। এদের মধ্য তিনজনের বয়স ছিল মাত্র ৮ বছর। বাকি ৪৩ জনের বয়স ছিল নয় বছর থেকে ষোল বছরের মধ্যে। রাজা রামমোহন রায়ের নেতৃত্বে সতীদাহ প্রথার বিলোপ সাধনের জন্য আন্দোলন শুরু হয় এবং ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর লর্ড ব্যান্টিঙ্ক সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ আইন প্রণয়ন করেন এবং এর বিরুদ্ধে দন্ডাদেশ জারি করেন। এর বিরুদ্ধে প্রাচীন পন্থি গোঁড়া হিন্দু সমাজ প্রতিবাদ করেন। হেস্টিংস তাদের প্রত্যাখ্যান করেন। তারা পরবর্তীতে বিলেতের প্রিভি কাউন্সিলে আপিল করেন। রাজা রামমোহন রায় বিভিন্ন যুক্তিতর্কের সাহায্যে সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদের পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করেন। এর ফলে চরমপন্থি হিন্দুদের আপিল বরখাস্ত হয় এবং চিরদিনের জন্য সতীদাহ প্রথা বন্ধ হয়।

সমস্ত প্রথা রীতিনীতি ও যুগ বিশেষের আইন-কানুনের পিছনে থাকে ঐতিহাসিক ঘটনাবলী। ইতিহাস বাদ দিয়ে তার বিচার করলে অবিচার করা হয় তাই সতীদাহ প্রথার বিষয়ে বলতে গেলে পূর্বাপর কিছু অবস্থা না বললে তা বুঝা কঠিন হবে বলেই সেই সময়ের অবস্থার অবতারনা করতে হচ্ছে। ভারতের ইতিহাস আধুনিক কালের মত লিপিবদ্ধ করা নেই। ভারতের ও হিন্দু ধর্মের ইতিহাস জানতে হলে সেই সময়ের ধর্ম ও সাহিত্য গ্রন্থ কিছু স্থাপনা ও প্রত্নতাত্মিক নিদর্শনের উপরে নির্ভর করতে হয়।
ভারতের সনাতন ধর্ম পরবর্তিতে যা হিন্দু ধর্ম নামে প্রচারিত ও প্রচলিত হচ্ছে সেই দ্রাবিড়দের সময় হতে। তখনকার দ্রাবিড়রা ছিল মাতৃ পুজারক। কিন্তু তারা তা মূর্তি পূজার মাধ্যমে করত কিনা তার কোন নিদর্শন পাওয়া যায় নি। পরবর্তিতে আর্যরা পিতৃ পুজা শুরু করে। অর্থাৎ দ্রাবিড়িরা ঈশ্বরকে দেখত মাতৃ শক্তি রূপে আর্যরা দেখা শুরু করে পিতৃ শক্তি ও মাতৃ শক্তি উভয় রূপে।
প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রে সতীদাহ প্রথা নামে কোন শব্দের উপস্থিতি পাওয়া যায় না, তবে সহমরন শব্দ ও তার প্রয়োগ দেখা যায়। আপনারা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন সতীদাহ ও সহমরন এক শব্দ বা প্রতিশব্দও নয়।
১৩০০ শতাব্দিতে অশিক্ষত আলাউদ্দিন খিলজী (সম্রাট জালাল উদ্দিন খিলজীর মৃত ভাইয়ের ছেলে ) ছিলেন ভারতের সম্রাট। তিনি সাম্রাজ্য পরিচালনার জন্য আরব থেকে কিছু ইসলামী আইন বিশ্বেষজ্ঞ আনয়ন করেন। সেই সময়ে অমুসলিম প্রজাদের জন্য ২টি কর আইনের জন্ম হয়
১) নজর-এ –এ মরেচা
২) নজর-এ-বেওয়া।

১ ) নজর-এ –এ মরেচা: অমুসলিম প্রজাদের ছেলে বা মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার পারমিশানের নেওয়ার জন্য কর।
২ ) নজর-এ-বেওয়া:  অমুসলিম প্রজাদের কোন নারী নিঃসন্তান অবস্থায় বিধবা হইলে তাহাকে স্বামী বা পিতার গৃহে রাখিবার জন্য বার্ষিক কর।
এই দুই করের জন্য নির্দিষ্ট কোন অর্থের পরিমাপ ছিল না, সেই সময়ের পরগনার দেওয়ান বা কাজী যাহা ধার্য করিতেন প্রজারা তাহাই দিতে বাধ্য থাকিত। যাহারা সেই অর্থ দিতে অসমর্থ হইত, তাহাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হতো বা সেই কন্যা বা বধুকে বাজেয়াপ্ত করে হাউলিতে চালান করা হতো। এই সকল নারীকে যে সুরক্ষিত বাড়ীতে রাখা হতো তাহার নাম “হাউলি “বা “হাভেলী”।
এই হাভেলীতে থাকা অবস্থায় সেই নারীদের যে বাচ্চা হতো সেই বাচ্চাদের নাম হতো “ নজরতরপের বাচ্চা”। সেই বাচ্চা ছেলে হলে তাকে ধর্ম শিক্ষা ও অস্ত্র শিক্ষা দিয়ে সেনাবাহীনিতে নিয়োগ দেওয়া হতো। আর মেয়ে বাচ্চা হলে তাদেরকে নর্তকী হিসাবে প্রস্তুত করা হতো।
নজরে বেওয়া সম্মন্ধ্যে আবার ভিন্ন কাহিনীও জনশ্রুতি হিসাবে কিংবদন্তি আছে যে , কুমারী ও বিধবাদের সন্তান সম্ভবা বা সন্তান প্রসব হলেই কেবল তাদেরকে এই কর প্রদান করতে হতো। আর না দিতে পারলেই সেই মা ও বাচ্চা সহ হাউলীতে পাঠানো হতো। পরিশেষে সেই বাচ্চা ছেলে হলে সৈনিক মেয়ে হলে নর্তকী হিসাবে ভবিতব্য নির্ধারন হতো।
এছাড়াও দীনেশ চন্দ্র সেন তার “বৃহৎ বঙ্গ পুর্বোক্ত” গ্রন্থ এবং “প্রাগুরু” নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, “যে কোন রমনী ভাল নাচিতে ও গাহিতে পারিতেন তাহলে তার রক্ষে ছিল না । ময়মনসিংহ জেলার মুসলমান নবাবের নিযুক্ত এক শ্রেনীর লোক ছিল, যাদের উপাধি ছিল “সিন্ধুকী”। হিন্দু ঘরের রূপবতী ও গুনবতী রমনীদের ঠিকানা নবাব সরকারে জানিয়ে দেওয়াই তাদের কাজ ছিল। এর বিনিময়ে তারা বিস্তর জায়গীর পাইতেন”।
“আবার কোন কোন সময় নবাবের লোকেরা বা সেই জায়গীরের লোকেরা বিভিন্ন যায়গায় ঘুরা ফিরা করতেন। তারা হিন্দুদের প্রাপ্ত বয়স্কা সুন্দরী কুমারী পাইলেন বল পুর্বক ধরিয়া লইয়া যাইত”।
যাইহোক, সেই সময়ে বিভিন্ন অত্যাচার ও অনাচারের হাত থেকে বাচার জন্য “গৌরীদান” প্রথা চালু হয়। অর্থাৎ ঋতুমতি হওয়ার পুর্বেই বিয়ে দেওয়া প্রথাই গৌরীদান প্রথা। অথচ এই ভারতে স্বয়ংবর বিবাহের প্রথা চালু ছিল। মেয়ে আমন্ত্রিতদের মধ্য থেকে নিজের পছন্দ মত ছেলেকে বিয়ে করার পদ্ধতিই “স্বয়ংবর” প্রথা। কালের প্রভাবে স্বয়ংবর বিবাহ প্রথার ভারতে শুরু হয় গৌরীদান প্রথার বিবাহ পদ্ধতি।
অর্থাৎ কুমারি মাতা হওয়া ও নবাবের লোলুপ দৃস্টির হাত থেকে বাচার জন্য শুরু হয়েছিল গৌরীদান প্রথা। আর বিধবা মাতা ও সুন্দরী বিধবাদের প্রতি মুসলিম জায়গীর ও নবাবের কুদৃস্টি / “নজরে বেওয়ার” হাত থেকে বাচার জন্য হিন্দু সমাজপতিরা সতীদাহ প্রথার প্রবর্তন করেছিলেন বলেই জানা যায়।
এটা সত্য যে, ব্রাম্মনদের মতো অনেক সাধারন মানুষের নিকটও এই সতীদাহ প্রথা একটি অবশ্যপালনীয় ধর্মিয় অনুষ্ঠানে পরিনত হয়েছিল। আর তাই একদল যখন স্বামীহীন গৃহবধুকে সাদা শাড়ী পড়িয়ে, চুল কেটে, আতপ চাল খাইয়ে অনাকর্ষনীয় করে তুলতে তৎপর ছিল, অপর দিকে অন্যদল তখনো তার প্রিয় আত্মীয়টিকে মৃত্যুর করুন মুখে ঠেলে দিতে অনুতকন্ঠিত হতো। এই বিষয়ে ক্ষিতিশ চন্দ্র মৌলিক বলেন – "জনস্বার্থ বিরোধী বা অপ্রয়োজনীয় প্রথা যদি কেহ জনসমাজের উপর চাপিয়ে দেন, তবে সে প্রথা অল্প দিনেই লোপ পায়। ব্রাম্মনরা যে সকল বন্ধনী দিয়া সমাজকে বাধিয়া ফেলিলেন, তাহা আপদকালের জন্য বিধান – তাহা সর্বকালের জন্য নয়। জ্বর হইলে রুগীর ভাত খাওয়া বন্ধ হয়, পায়ে ঘা হইলে পঙ্খীরাজ ঘোড়াকেও দৌড়াইতে দেওয়া হয় না। তাহা কোন মতেই সর্বকালের জন্য নয়।" অথচ শুধু সময়ের প্রয়োজনেই এই অমানবিক প্রথা প্রায় ৫০০ বছর হিন্দু সমাজে প্রচলিত ছিল। পরবর্তি ইতিহাস সকলেরই জানা।
প্রাচীনকালে বিভিন্ন পরিব্রাজকদের ভ্রমন বৃত্তান্তে সতীদাহের উল্লেখ আমরা পাই। অলবিরুনির ভ্রমন বৃত্তান্ত পড়ে আমরা জানতে পারি যে তিনি গঙ্গানদীর পারে শ্মশান গুলোতে নিয়মিত সতীদাহ হতে দেখেছেন।

"মোহাচ্ছন্ন মন্ত্র উচ্চারিত হচ্ছে। পুরোহিত গন ভীষন ব্যাস্ত।  শয্যা প্রস্তুত। কাঠের গুড়ির উপর শুয়ে আছে স্বামী। কাঠের গুড়ির মাঝে চন্দন কাঠও আছে। চন্দন কাঠ, ধুপ এর গন্ধ, ধোয়া, কাছা দেয়া ধুতি পরা খালি গায়ের মন্ত্রকের মুখের মন্ত্র, ব্যাস্ত সমস্ত চিতায় আগুন দেয়ার মানুষজনের উল্লাসিত পদক্ষেপ, চিতাকে ঘিয়ে দাঁড়ানো বড় সড় একটা ভিড়ের সার্কেল, নদী পারের শ্মশান ঘাটকে আলাদা পরিবেশ এনে দিয়েছে। সুষমাকে কয়েকজন ধরে নিয়ে আসছে। স্বামীর পাশেই যে শয্যা আজ তাঁর। ঘোরের মধ্যে থাকা অনিচ্ছুক সুষমা চলৎশক্তিহীন অবস্থায় এগিয়ে যাচ্ছে শয্যার দিকে। এটিই তাঁর স্বামীর সাথে জাগতিক শেষ শয্যা। জোড় করে শুইয়ে দিয়ে দড়ি দিয়ে হাত পা বাঁধা হয়েছে তাঁর। এরপর শুকনো কাঠে আগুন।
হরি হরি বোল, হরি বোল- দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠলো। সুষমার চিৎকার বাঁচাও বাঁচাও। মায়ের কান্না শুনে সুষমার পাঁচ বছরের মেয়ে চিৎকার করছে। কেউ সুষমাকে বাঁচাতে এলো না। কেন বাঁচাবে ? এটিই তো নিয়ম। হাত পায়ের দড়ি কিছুক্ষণের মধ্যে পুড়ে যায়। অগ্নি দগ্ধ শরীর নিয়ে সুষমা লাফ দিয়ে নামে চিতা থেকে। দৌড়ে পালাচ্ছে । বেশী দূর যেতে পারেনা সুষমা। এত বড় বিদ্রোহ , এত বড় অনাচার ? মন্ত্র পড়া বাদ দিয়ে একজন পুরোহিত  সুষমার দিকে ছুড়ে মারে পাথর। মাথায় আঘাত পেয়ে সুষমা পরে যায় মাটিতে। আগত ধর্মীয় রীতি রক্ষায় সংকল্পবদ্ধ মানুষ পিটিয়ে অচেতন করে সুষমা। পিটিয়ে মেরে ফেলা যাবেনা, তাতে যে সহমরণ হবে না।
অচেতন সুষমাকে হাত পা ধরে তুলে নিয়ে এসে চিতায় নিক্ষেপ করা হলো। সতী মা কি জয় ধ্বনিতে আকাশ প্রকম্পিত। বংশ সম্প্রদায় এবং পরিবারের গর্ব হয়ে থাকে সে ‘সহমরণের একজন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে। নেপালের সুষমা তোমার অনিচ্ছায় তুমি পরিবারের অনুকরনীয় দৃষ্টান্ত হয়ে রইলে।"

১৮১৮—১৯, রামমোহন রায় দুটি বই পাবলিশ করেন:
ক) সহমরণ বিষয়।। প্রবর্ত্তক ও নিবর্ত্তকের সম্বাদ এবং
খ) সহমরণ বিষয়ে ।। প্রবর্ত্তক ও নিবর্ত্তকের দ্বিতীয় সম্বাদ।

দশ বছর পরে, ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক (লর্ড: ১৮২৮–৩৫) বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে সতীদাহ নিষিদ্ধ করেন। এর আগে রামমোহন একটি আবেদন করছিলেন; সেই আবেদনে সাড়া দিয়েই সতীদাহ নিষিদ্ধ করা হয়; ফলে পরবর্তীকালের ইতিহাস সমাজসংস্কারে রামমোহনের কৃতিত্ব হিসাবেই হাজির করে এটিকে।

কিন্তু ঘটনা এমন সরল ছিলো না; সতীদাহ আগে থেকেই নিষিদ্ধ ছিলো এবং তারও আগে নিষিদ্ধ হয়েছিল।

সতীদাহের বিরুদ্ধে মুসলিম শাসকদের কঠোর মনোভাব- দিল্লি সুলতানি রাজত্বকালে সতীদাহ প্রথার জন্য যাতে বিধবাকে বাধ্য না করা হয় তাই সতীর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে সতীদাহ প্রথা সম্পাদন করার রীতি ছিল। যদিও পরে এটি একটি প্রথানুগামিতার রূপ নেয়। মুঘল সম্রাটরা স্থানীয় চলিত প্রথায় সাধারণত অন্তর্ভুক্ত হতেন না কিন্তু তারা এই প্রথা বন্ধের ব্যাপারে সচেষ্ট ছিলেন। মুঘল সম্রাট হুমায়ুন (১৫০৮-১৫৫৬) সর্বপ্রথম সতীদাহের বিরুদ্ধে রাজকীয় হুকুম দেন। এরপর সম্রাট আকবর (১৫৪২-১৬০৫) সতীদাহ আটকানোর জন্য সরকারীভাবে আদেশ জারি করেন যে, কোন নারী, প্রধান পুলিশ কর্মকর্তার সুনির্দিষ্ট অনুমতি ছাড়া সতীদাহ প্রথা পালন করতে পারবেন না। এছাড়াও এই প্রথা রদের জন্য তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের অধিকার দেন যা তারা যতদিন সম্ভব ততদিন সতীর দাহের সিদ্ধান্তে বিলম্ব করতে পারেন। বিধবাদেরকে উত্তরবেতন, উপহার, পুনর্বাসন ইতাদি সাহায্য দিয়েও এই প্রথা না পালনে উৎসাহিত করা হত। ফরাসি বণিক এবং ভ্রমণকারী তাভেরনিয়ের লেখা থেকে জানা যায় যে, সম্রাট শাহ জাহানের রাজত্বে সঙ্গে শিশু আছে এমন বিধবাদেরকে কোনমতেই পুড়িয়ে মারতে দেওয়া হত না এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে, গভর্নররা তড়িঘড়ি সতীদাহের অনুমতি দিতেন না, কিন্তু ঘুষ দিয়ে করান যেত।

১৮১৩ সালের ২০ এপ্রিল সতীদাহ নিষিদ্ধ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। একই সাথে সহমরণকে আইনীভাবে রিকগনাইজ করে। নিষেধাজ্ঞায় বলা হয়, ১৬ বছরের নিচে বিধবা হলে, গর্ভবতী অবস্থায় হলে বা দুগ্ধপোষ্য শিশুর মা বিধবা–এনারা সহমরণে যেতে পারবে না; এবং নেশাদ্রব্য সেবন বা জোরারোপের মাধ্যমে স্বামীর চিতায় বিধবাকে পোড়ানো যাবে না; সহমরণের একমাত্র বৈধ উপায় বিধবার উইল; বিধবার ইচ্ছা ভিন্ন কোন উপায় নাই আর। বিধবার ‘উইল’ জিনিসটা এইখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ; ইংরেজ তথা ইউরোপীয় অনুমান ছিলো সহমরণ হয় না আসলে, ওইটা সতীদাহ। অর্থাৎ বিধবা স্বেচ্ছায় চিতায় ওঠে না, বা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো বাঁচা; বিধবার উপর থেকে বাইরের—পরিবারের, ধর্মবেত্তাদের, সমাজের চাপ সরানো গেলে বিধবারা মৃত স্বামীর চিতায় পুড়তে উঠবে না; এই কারণেই ইংরেজ-এর কাছে এটি সহমরণ না, সতীদাহ (বার্নিং উইডো বা সতী/Suttee)। সহমরণের সময়ে উলুধ্বনির মাধ্যমে জীবন্ত পুড়তে থাকা বিধবার আর্তচিৎকার গোপন করা হয় বলে ভাবতো ইংরেজরা। বা বিধবাকে দড়ি দিয়ে বেধে দেওয়া হতো যাতে আগুনের যন্ত্রণায় উঠে দৌঁড় দিতে না পারে, কেউ মুক্ত হয় গেলে যাতে ঠেকাতে পারে সেজন্য চারপাশে লাঠি নিয়ে লোক খাড়াইয়া থাকতো। পরবর্তীকালের বাঙালি ঐতিহাসিকরাও এই ধারনা থেকেই ইতিহাস লিখছেন; সহমরণ হিসাবে না হয়ে সতীদাহ হিসাবেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারলো এই কারণে।
কিন্ত বিধবার উইল বিষয়ক এই ধারনা পুরাই ভুল প্রমাণিত হয় পরে। বাস্তবে দেখা গেলো ১৮১৩ সালের পরে সহমরণের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হইয়া উঠলো; দ্য হিন্দুজ: অ্যান অল্টারনেটিভ হিস্টি বইতে ওয়েন্ডি ডনিজার জানাইছেন, ১৮১৫ – ১৮১৮ তিনবছরে সহমরণের সংখ্যা ৮৩৯, আগের তিনবছরে এই সংখ্যা ছিলো ৩৭৮; দ্বিগুণেরও বেশি। সেসময়ে প্রকাশিত সমাচার দর্পণের পরিসংখ্যানের সাথে যদিও পুরো মেলে না ডনিজারের হিসাব; অবশ্য দুইটা পরিসংখ্যানের সময়কালে একটু ভিন্নতা আছে।
১৮১৮ সাল থেকে প্রকাশিত হওয়া সংবাদপত্রে স্বেচ্ছায় মৃত স্বামীর চিতায় আরোহণের মাধ্যমে হিন্দু বিধবাদের সহমরণের খবর পাওয়া যায় প্রচুর; এসব খবরে ম্যাজিস্ট্রেট বা দারোগার বিধবাকে বোঝানো, বাচ্চাদের কথা ভাবতে বলা ইত্যাদির মাধ্যমে বিধবাদের নিরস্ত করার চেষ্টার কথা জানা যায়; ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি পেতে দুইদিন লাগলে সেই দুইদিন দাহ না করে ঘরে রাখা এবং পরে বিধবার সহমরণ—এমন খবরও পাওয়া যায়।
১৮১৩ সালের নিষেধাজ্ঞায় আরো একটা ধারা ছিলো: হিন্দু শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত/ব্রাহ্মণ যেইখানে সহমরণ বারণ বলে মত দেবেন, সেখানেও সহমরণ হতে পারবে না। রামমোহন এই ধারায় বলা হিন্দু শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত/ব্রাহ্মণের মত দেবার কাজটিই করছেন আসলে। লক্ষ্য করার বিষয় হলো, সহমরণ রোধে রামমোহনের সামাজিক/বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা শুরুর আগেই সহমরণ নিবারণে ইংরেজের সবিশেষ চেষ্টা চলছিলো; রামমোহন ইংরেজের প্রজেক্ট আগাইয়া নিচ্ছেন। এখনো আমরা বিভিন্ন সরকারি এজেন্ডা আগাইয়া নেবার জন্য বুদ্ধিজীবী ভাড়া করতে দেখি অবশ্য।

ইংরেজের জন্য সহমরণ বোঝা খুব সোজা ছিলো না; ইউরোপ জুড়ে ডাইনী নিধন তখনো খুবই টাটকা স্মৃতি; হিন্দু বিধবাদের তাঁরা ইউরোপের ‘ডাইনী’ হিসাবেই বুঝতো সম্ভবতঃ। সে কারণেই মনে হয় সহমরণ তাদের কাছে ‘উইডো বার্নিং’ বা পোড়াইয়া মারা বা ‘সতীদাহ’; স্বেচ্ছায় চিতায় যাওয়া আসলে কেবলি নেশাদ্রব্যের সাময়িক হিতাহিত জ্ঞানশূন্যতা। ইংরেজের কাছে চড়ক পূজার ব্যাখ্যাও মনে হয় এমনই ছিলো। হিন্দু বিধবাদের বাঁচানো ইংরেজের বিশেষ এজেন্ডা হওয়া নেটিভের জীবনের প্রতি ইংরেজের মায়া হিসাবে দেখা মুশকিল; কেননা, আগে পরে নীল চাষ বা দুর্ভিক্ষে নেটিভরা মারা যাওয়ায় ইংরেজরা বিশেষ তাড়িত হয় নাই। ইউরোপের মধ্যযুগে ইংরেজরা যে আর নাই সেইটা প্রমাণ করার সহজ উপায় হিন্দু বিধবাদের বাঁচানো; নিজের প্রতি ইংরেজের নৈতিক সন্দেহ দূর করার সোজা রাস্তা এইটাই।
এদিকে রামমোহন বেশ ইন্টারেস্টিং আলোচনা করেন সহমরণ নিয়া; তাঁর আলোচনায় সহমরণের কতগুলি কারণ পাওয়া যায়। তিনি একে সহমরণই বলছেন, সতীদাহ না। হিন্দু বিধবা স্বেচ্ছায় স্বামীর চিতায় যাচ্ছে, তাঁর মতে হিন্দু ধর্মের মাননীয় শাস্ত্রগুলি সহমরণের বিপক্ষে; হিন্দু বিধবাদের বরং ব্রহ্মচর্যে বাকি জীবন কাটাতে হবে। যুক্তি দিচ্ছেন তিনি যে, সহমরণ লোভের কাজ, ব্রহ্মচর্য ত্যাগের; স্বর্গে স্বামীর সঙ্গ পাবার লোভে বিধবা সহমরণে যাচ্ছে; এবং এটি আত্মহত্যা; শাস্ত্রে আত্মহত্যা পাপ।
রামমোহনের আরেকটা অকাট্য যুক্তি হলো—সহমরণে নির্বাণ লাভ হয় না নারীর; নির্বাণ কী? এইটা বৌদ্ধধর্মের নির্বাণ না ঠিক; এইটা হলো ‘যোনী’ থেকে মুক্তি লাভ। স্বামীর চিতায় মরলে স্বর্গে স্বামীসুখ পাবে ঠিক, কিন্তু তাতে করে পরজন্মে আবার নারীজন্মই হবে; কেননা সহমরণে নির্বাণ তথা ‘যোনী’ থেকে মুক্তির কোন বিধান নাই শাস্ত্রে। ‘যোনী’ থেকে মুক্তির জন্য নারীকে কঠিন ব্রহ্মচর্যে বিধবাজীবন পার করতে হবে। অর্থাৎ রামমোহন অভিশপ্ত নারীজন্ম থেকে মুক্তির জন্য নারীকে সহমরণে যাইতে মানা করছেন। হাউ ইন্টারেস্টিং!

১৯৩২ (আশ্বিন ১৩৩৯) সালে ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘সংবাদপত্রে সেকালের কথা ।। প্রথম খণ্ড’ প্রকাশিত হয়। এই বইতে প্রধানতঃ মার্শম্যানের সম্পাদনায় শ্রীরামপুরের মিশনারি থেকে ১৮১৮ সালে প্রকাশিত ‘সমাচার দর্পণ (১৮১৮—১৮৩০)’ থেকে শিক্ষা, সমাজ, ধর্ম, সাহিত্য বিষয়ের সংবাদগুলি সংকলন করেন সম্পাদক। ‘সমাচার দর্পণ’-এ সহমরণ নিয়ে বেশ কিছু খবর প্রকাশিত হয়। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, মার্শম্যান সম্পাদক হলেও পত্রিকার খবর লেখালেখির কাজ করতেন হিন্দু পণ্ডিতরা। শুরুতে বলা কয়েকটা বিষয়ের ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে হিন্দু পণ্ডিতদের এই ভূমিকা থেকে। যেমন, সহমরণ বিষয়ের খবরগুলি প্রায় সবই বিধবাদের স্বেচ্ছায় স্বামীর চিতায় যাওয়ার বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে। ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের নিরস্ত করার নানাবিধ চেষ্টার পরেও বিধবারা স্বামীর চিতায় যাচ্ছেন খবরগুলিতে। কোন জোরাজুরি বা নেশাদ্রব্য খাওয়ানো হচ্ছে না। মৃত ব্রাহ্মণের ৩২ বউয়ের মধ্যে চারজন একসাথে অভিন্ন স্বামীর চিতায় মরছেন—এমন খবরও আছে।
সমাচার দর্পণে প্রকাশিত সহমরণের খবরগুলি সহমরণকে উৎসাহিত করতো; ধর্ম ও নারীর জয়গানের ভাব আছে এগুলিতে। অনুমান করি, খবরগুলি ছিলো ১৮১৩ সালের সহমরণ বিষয়ক আইনের প্রতিক্রিয়া; সে হিসাবে বলা যায়, হিন্দু বিধবারাই ইংরেজবিরোধী আন্দোলনের প্রথম দিককার শহিদ। সহমরণের খবরগুলিতে সম্ভবতঃ ভারতবর্ষে জাতীয়তাবাদ বিকশিত হবার কিছু লক্ষণও পাওয়া যাবে; অর্থাৎ সহমরণই শুরুর দিককার জাতীয়তাবাদী তৎপরতা! এর বাইরে সহমরণের পক্ষে-বিপক্ষে দুয়েকটা চিঠিও প্রকাশিত হইছিলো। পক্ষের একটি চিঠিতে রামমোহনকে অহিন্দু হিসাবে ইঙ্গিত করা হচ্ছে; রামমোহন বৈষ্ণব কুলোদ্ভূত বলে তাঁর মতামত হিন্দুদের বেলায় অপ্রযোজ্য বলে দাবি করা হচ্ছে। একদিকে সম্পাদক মার্শম্যান, অন্যদিকে হিন্দু পণ্ডিত—এইভাবে সহমরণের বিপক্ষ-পক্ষে ভাগাভাগি ছিলো সম্ভবতঃ। খবরগুলির আরেকটা লক্ষণীয় দিক ছিলো; সহমরণের সবগুলিই মোটামুটি ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণীদের খবর। নিম্নবর্ণের হিন্দুদের সহমরণের কোন খবর প্রকাশিত হয় নাই।
১৮২৯ সালে ‘সতীদাহ’ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার পরে রামমোহন ও রবীন্দ্রনাথের দাদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর সহ কোলকাতার চার বিশিষ্ট নাগরিক উইলিয়াম বেন্টিংক-এর সাথে দেখা করার খবরও প্রকাশিত হইছিলো। নিষেধাজ্ঞার পরে ইংল্যন্ডে আপীল করার জন্য সভা করার খবর পাওয়া যাচ্ছে সমাচার দর্পণে। আরো জানা যায়, আপীল করার পরামর্শও লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক-এর; তিনি পত্রিকা মারফত জানান যে, এ বিষয়ে কেউ আপীল করলে তিনি সানন্দে ইংল্যন্ডে পৌঁছাবেন সেটি।

এখানে সমাচার দর্পণ থেকে সহমরণের কিছু খবর এবং একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হলো। ইউরোপীয়দের আঁকা সহমরণের বহু পেইন্টিং আছে; প্রথম পেইন্টিং পাওয়া যায় ডাচ প্রোটেস্টান্ট বণিক Jan Huyghen van Linschoten (১৫৬৩–১৬১১)-এর ১৫৯৬ সালে প্রকাশিত Itinerario: Voyage ofte Schipvaert van Jan Huygen van Linschoten naer Dost ofte portugaels Indien বইতে।

সমাচার দর্পণে প্রকাশিত সহমরণ বিষয়ক খবর:

২৭ মার্চ ১৮১৯ ।। ১৫ চৈত্র ১২২৫
সহমরণ। শহর কলিকাতার এক ব্রাহ্মণ মরিয়াছেন অল্পবয়স্কা তাহার স্ত্রী সহগমন করিয়াছে আমরা শুনিয়াছি যে দুই দিনপর্য্যন্ত আপন মৃত স্বামীকে রাখিয়া তৃতীয় দিন সহগমন করিয়াছে এত বিলম্বে সহগমন করিতে পূর্ব্বে শুনি নাই। তাহার কারণ এই স্ত্রীর বয়স বিবেচনা করাতে এত কাল বিলম্ব হইল। কথক বৎসর হইল শ্রীশ্রীযুত নানাদেশীয় মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিতেরদের নিকটে হিন্দুশাস্ত্রানুসারে সহগমন বিষয়ে যথার্থ ব্যবস্থা লইয়া আজ্ঞা দিয়াছেন যে ষোড়শবর্ষন্যূন বয়স্কা কিম্বা গর্ভবতী কিম্বা যাহার অতিশিশু বালক থাকে সে স্ত্রী সহগমন করিতে পাইবেক না।
এবং হিন্দুশাস্ত্রে ইহাও কহে যে সহমরণাদিরুপ কর্ম্মে নির্ব্বাণ মুক্তি হইতে পারে না কিন্তু সুখ ভোগমাত্র হয়। অতএব হিন্দুশাস্ত্রের মতে নির্ব্বাণসাধন কর্ম্মেরি প্রশংসা করিয়াছেন।
অধিক সহমরণ বাঙ্গালা দেশে হয় পশ্চিম দেশে তাহার চতুর্থাংশও হয় না এবং বাঙ্গালার মধ্যে ও কলিকাতার কোট আপীলের অধীন জিলাতে অধিক হয় আরো হিন্দুস্থানে যত সহমরণ হয় তাহার সাত অংশের একাংশ কেবল জিলা হুগলিতে হয়।

৭ এপ্রিল ১৮২১ ।। ২৬ চৈত্র ১২২৭
সহমরণ।–গত মহাবারুণী যোগে উড়িষ্যা প্রদেশের অনেক লোক গঙ্গাস্নানে আসিয়াছিল তাহার মধ্যে মো বাঁশবাড়িয়া গ্রামে এক ব্যক্তি আপন স্ত্রী প্রভৃতি পরিজন সমেত রহিয়াছিল দৈবাৎ শনিবারে গঙ্গাস্নান করিয়া সেই রাত্রিতে তাহার পীড়া হইয়া প্রাণ ত্যাগ হইল। পরদিন রবিবার তাহার স্ত্রী সহমরণে যাইতে নিশ্চয় করিয়া ঐ মোকামে গঙ্গাতীরে চারিদিকে চারি হস্ত প্রমাণে এক কুণ্ড কাটাইল ও ঐ কুণ্ড কাষ্ঠ ও চন্দন কাষ্ঠ ও ধুনা ও আর ২ সুগন্ধি মসালাতে পূর্ণ করিয়া তাহাতে অগ্নি সংযোগ করিল। পরে ঐ কুণ্ডের অগ্নি অত্যন্ত প্রজ্বলিত হইল দেখিয়া আপন মৃত স্বামির শরীর ঐ প্রজ্বলৎ কুণ্ডে ণিক্ষেপ করিল। অনন্তর ঐ স্ত্রী গঙ্গাস্নান করিয়া ও সূর্য্যার্ঘ্য দিয়া এক হাঁড়ী ঘৃত কক্ষদেশে করিয়া ঐ অগ্নিকুণ্ডে ঝম্প দিয়া পড়িল এবং তক্ষণাৎ ভস্মসাৎ হইল তাহার আত্মীয় লোকেরা হরিধ্বনি করিতে লাগিল।
এতাদৃশ সহমরণ ব্যবহার এতদ্দেশে নাই তৎপ্রযুক্ত বিশেষ করিয়া লিখা গেল।

২৩ মার্চ ১৮২২ ।। ১১ চৈত্র ১২২৮
সহমরণ।–কলিকাতার অন্তঃপাতি কোঠের সাহেবেরা সহমরণ বিষয়ক এই রিপোর্ট শ্রীশ্রীযুত বড় সাহেবের নিকটে পাঠাইয়াছিলেন।
সন ১৮১৫ সাল ১৮১৬ সাল ১৮১৭ সাল সন
কলিকাতার অন্তঃপাতি ২৫৩ ২৮৯ ৪৪১ 
ঢাকা ৩১ ২৪ ৫২ 
মুরশেদাবাদ ১১ ২২ ৪২ 
পাটনা ২০ ২৯ ৩৯ 
বানারস ৪৮ ৬৫ ১০৩ 
বরেলী ১৭ ১৩ ১৯ 
 ৩৮০ ৪৪২ ৬৯৬ 

১৫ নভেম্বর ১৮২৩ ।। ৯ অগ্রহায়ণ ১২৩০
সহমরণ ।।– মোং কোন নগর গ্রামের কমলাকান্ত চট্টোপাধ্যায় নামে এক ব্যক্তি কুলীন ব্রাহ্মণ সর্ব্ব সুদ্ধা বত্রিশ বিবাহ করিয়াছিলেন তাহার মধ্যে তাহার জীবদবস্থাতে দশ স্ত্রী লোকান্তরগতা হইয়াছিল বাইশ স্ত্রী বর্ত্তমানা ছিল। তাহারদের মধ্যে কেবল দুই স্ত্রী তাহার নিজ বাটীতে ছিল আর সকলে স্ব ২ পিত্রালয়ে ছিল। ২১ কার্ত্তিক বুধবার ঐ চট্টোপাধ্যায় পরলোক প্রাপ্ত হইলে তাহার সকল শ্বশুর বাটীতে অতি ত্বরায় তাহার মৃত্যু সম্বাদ পাঠান গেল তাহাতে কলিকাতার এক স্ত্রী ও বাঁসবাড়ীয়ার এক স্ত্রী নিকটস্থা দুই স্ত্রী এই চারিজন সহমরণোদ্যতা হইল। পরে সেখানকার দারোগা এই বিষয় সদর রিপোর্ট করিয়া সদর হইতে হুকুম আনাইতে দুই দিবস গত হইল পরে ২৩ কার্ত্তিক শুক্রবার তৃতীয় দিবসের মধ্যাহ্নকালে হুকুম আইলে ঐ চারি জন পতিব্রতা সহমরণ করিয়াছে। এই স্ত্রীরদের বয়ঃক্রম ত্রিশ বৎসর অবধি পঞ্চাশ বৎসর পর্য্যন্ত হইবেক।

২৭ এপ্রিল ১৮২২ ।। ১৬ বৈশাখ ১২২৯
সহগমন।।–ওলাওঠা রোগে অনেক বাঙ্গালি মরিয়াছে তাহার মধ্যে ঐ [গয়া] মোকামে এক ব্রাহ্মণ মরিলে তাহার স্ত্রী সহগমনে উদ্যতা হইল তাহাতে গয়ার জজ শ্রীযুত মেং কিরিষ্টফর স্মিথ সাহেব গিয়া তাহাকে অনেক নিষেধ করিলেন তাহাতে সে ব্রাহ্মণী আপন অঙ্গুলী অগ্নিতে দগ্ধ করিয়া পরীক্ষা দেখাইল তাহা দেখিয়া জজ সাহেব আজ্ঞা দিলেন যে তোমার যে ইচ্ছা তাহা করহ। পরে সে স্ত্রী সহগমন করিল।

১৩ নভেম্বর ১৮২৪ ।। ২৯ কার্ত্তিক ১২৩১
সহগমন।–লখিপুরনিবাসি আনন্দচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়নামক এক জন প্রধান লোক রোগবিশেষে আপন আয়ুঃশেষ জানিয়া কালীঘাটে আগমনপূর্ব্বক সুরধুনী তীরে তিন দিবস বাস করিয়া সাময়িক বিহিত ক্রিয়ায় কালক্ষেপণানন্তর ১৭ কার্ত্তিক সোমবার রাত্রিকালে প্রাণ ত্যাগ করিয়াছেন। এঁহার বয়ঃক্রম ৬৭ বৎসর হইয়াছিল তাঁহার স্ধ্বী স্ত্রী স্বামির মরণে মৃত্যু শ্রেয়ো জানিয়া তৎসহগামিনী হইয়াছেন। সং কৌং

২৭ আগষ্ট ১৮২৪ ।। ১৩ ভাদ্র ১২৩২
সহগমন।।–সিমল্যানিবাসি ফকিরচন্দ্র বসু ১ ভাদ্র সোমবার ওলাওঠারোগে পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হইয়াছেন। ইহার বয়ঃক্রম প্রায় ৩৬ বৎসর হইয়াছিলো তাঁহার সাধ্বী স্ত্রী শ্যামবাজারনিবাসি শ্রীমদনমোহন সেনের কন্যা তাঁহার বয়ঃক্রম ন্যূনাতিরেক ২২ বৎসর হইবেক এবং সন্তান হয় নাই। ঐ পতিব্রতা স্ত্রী রাজাজ্ঞানুরোধে দুই দিবস অপেক্ষা করিয়া বুধবার প্রাতে সুরের বাজারের নিকট সুরধুনী তীরে স্বামিশবসহ জ্বলচ্চিতারোহণপূর্ব্বক ইহলোক পরিত্যাগ পুরঃসর পরলোক গমন করিয়াছে।

সতীদাহ প্রথা হচ্ছে হিন্দু ধর্মাবলম্বী বিধবা নারীদের স্বামীর চিতায় সহমরণে বা আত্মহুতি দেবার ঐতিহাসিক প্রথা। এই প্রথা একসময়ে হিন্দুনারীদের ঘাড়ের উপর জব্বরভাবে চেপে বসেছিল। এখন সেই প্রথা এক্কেবারে বন্ধ হয়ে গেছে একথা বুকে টোকা মেরে বলার কলজে আমার কোথায় ! আশির দশকে সেই রূপ কানোয়ারের কথা মনে আছে ? তাই এ লেখার উপস্থাপনের প্রাসঙ্গিকতা আছে বইকি ! ইতিহাসটাকে নতুন করে দেখা প্রয়োজন।
আর নতুন ইতিহাস লেখার সময় নাটের গুরু কে খুঁজবেন না ? কারা সতীদাহ বা স্বামীর চিতায় বিধবা স্ত্রীর সহমরণ প্রথা জিইয়ে রেখেছিল ? কারাই-বা এই অমানবিক সহমরণকে নির্মূল করার জন্য সদিচ্ছা প্রয়োগ করেছিল ? 
দাক্ষায়ণী বা সতী   হিন্দুধর্মে বৈবাহিক সুখ ও দীর্ঘ দাম্পত্যজীবনের দেবী। হিন্দু নারীরা সাধারণত স্বামীর দীর্ঘায়ু কামনায় সতীর পূজা করে থাকেন। সতী দেবীর এক রূপ। তিনি শিবের প্রথমা স্ত্রী। হিন্দু পুরাণ অনুসারে তিনি তপস্বীর জীবনযাত্রা থেকে শিবকে বের করে আনেন এবং গৃহী করেন। দক্ষযজ্ঞের সময় স্বামীর অসম্মান সহ্য করতে না পেরে তিনি প্রাণত্যাগ করেন। পরে হিমালয়ের গৃহে কন্যা পার্বতীর রূপে জন্ম নিয়ে পুনরায় শিবকে বিবাহ করেন।
দাক্ষায়ণীর অপরাপর নামগুলি হল উমা, অপর্ণা, শিবকামিনী ইত্যাদি। ললিতা সহস্রনাম স্তোত্রে তাঁর এক সহস্র নাম লিখিত হয়েছে।
সতীর আত্মত্যাগের অনুকরণে হিন্দুধর্মে সতীদাহ প্রথা প্রবর্তিত হয়েছিল অনেকে মনে করেন। এই প্রথানুসারে স্বামীর মৃত্যুর পর হিন্দু বিধবারা স্বামীর চিতায় আরোহণ করে প্রাণ বিসর্জন দিতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর “সতী” কবিতায় লিখেছেন –
সতীলোকে বসি আছে কত পতিব্রতা,
পুরাণে উজ্জ্বল আছে যাঁহাদের কথা।
আরো আছে শত লক্ষ অজ্ঞাতনামিনী
খ্যাতিহীনা কীর্তিহীনা কত-না কামিনী--
কেহ ছিল রাজসৌধে কেহ পর্ণঘরে,
কেহ ছিল সোহাগিনী কেহ অনাদরে;
শুধু প্রীতি ঢালি দিয়া মুছি লয়ে নাম
চলিয়া এসেছে তারা ছাড়ি মর্তধাম।
তারি মাঝে বসি আছে পতিতা রমণী
মর্তে কলঙ্কিনী, স্বর্গে সতীশিরোমণি।
হেরি তারে সতীগর্বে গরবিনী যত
সাধ্বীগণ লাজে শির করে অবনত।
তুমি কী জানিবে বার্তা, অন্তর্যামী যিনি
তিনিই জানেন তার সতীত্বকাহিনী।
গুপ্ত সাম্রাজ্যের আগে থেকেই এ প্রথার প্রচলন সম্পর্কে ঐতিহাসিক ভিত্তি পাওয়া যায়। গ্রিক দিগ্বিজয়ী সম্রাট আলেকজান্ডারের সাথে ভারতে এসেছিলেন ক্যাসান্ড্রিয়ার ঐতিহাসিক অ্যারিস্টোবুলুস। তিনি তক্ষশীলা শহরে সতীদাহ প্রথার ঘটনা তার লিখনিতে সংরক্ষণ করেছিলেন। গ্রিক জেনারেল ইউমেনেসের এক ভারতীয় সৈন্যের মৃত্যুতে তার দুই স্ত্রীই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সহমরণে যান;এ ঘটনা ঘটে ৩১৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে  ।
মূলত স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই পতির মৃত্যুতে স্ত্রী অগ্নিতে আত্মাহুতি দিত –একথা বারবার বলার চেষ্টা হয়েছে পেটুয়া ইতিহাসগুলোতে। পৌরাণিক কাহিনিতে এই আত্মাহুতি অতিমাত্রায় শোকের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই দেখা হত। মহাভারতে পাণ্ডুর স্ত্রী মাদ্রি সহমরণে যান (কিন্তু কুন্তী যাননি,অর্থাৎ মাদ্রি স্বেছায় যান এ কাহিনিও ফাঁদা হয়েছে)। রাজপুতানায় "জহর ব্রত" প্রচলিত হয়েছিল যাতে কোনো শহর দখল হওয়ার পূর্বেই পুরনারীরা আত্মসম্মান রক্ষার্থে আগুনে ঝাঁপ (জহর বা বিষ) দিয়ে স্বেছায় মৃত্যুবরণ করতেন,যা সতীদাহের অনুরূপ বলে অনেকে দাবি তোলেন। বলেন সতীদাহ প্রথা রাজপুতরাই চালু করেছিল। পরে এই বিষ নাকি পুরো অখণ্ড এবং বৃহৎ ভারতে ছাড়িয়ে পড়েছিল। কালক্রমে বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে হিন্দু স্ত্রীকে সহমরণে বাধ্য করা হত। বিশেষ করে কোনো ধনী লোকের মৃত্যুর সম্পত্তি অধিকার করার লোভে তার আত্মীয়রা তার সদ্যবিধবা স্ত্রীকে ধরে বেঁধে,ঢাক-ঢোলের শব্দ দ্বারা তার কান্নার আওয়াজকে চাপা দিয়ে তার স্বামীর সাথে চিতায় শুইয়ে পুড়িয়ে মারত। আর এ ঘটনা ঘটানোর ইন্ধন জোগাত “বর্ণশ্রেষ্ঠ”ব্রাহ্মণরাই। তাঁদের চরম উৎসাহেই এই প্রথা মহিরূহের আকার ধারণ করেছিল। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে এখনও অনেক ব্রাহ্মণ বা ধর্মগুরুরা এই নৃশংস (ক্রিমিনাল অফেন্স !) প্রথা মর্মে মর্মে সমর্থন করার সাহস পায়।রাষ্ট্র নীরব দর্শকের ভূমিকায়।অবাক হই না, একসময় তো হিন্দু রাজারাই এই ব্যবস্থাকে কখনো প্রত্যক্ষ কখনো-বা পরোক্ষে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।

আচ্ছা আমরা কি দেখে নিতে পারি হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থে সতীদাহের কোনো নির্দেশ বা সমর্থন আছে কি না ! চলুন -- মধ্যযুগে যখন ধর্মব্যবসায়ী এবং বিদেশিদের চক্রান্তে সনাতন ধর্মালম্বীদের বেদজ্ঞান হয়ে পড়েছিল অতি দুষ্প্রাপ্য তখন সমাজে অনুপ্রবেশ করে সতীদাহ প্রথা নামক ঘৃণ্য প্রথা।এ ছাড়াও বিধবা নারীদেরকেও পুনরায় বিয়ের সুযোগ না থাকায় অনেক নিপীড়িত হতে হয়,তারা যেন ছিল এক বোঝা। তবে রামমোহন রায় এবং বিদ্যাসাগরদের মতো মহান ব্যক্তিত্বরা বেদের মাধ্যমে এসব প্রথাকে ভুল প্রমাণ করেন এবং হিন্দুসমাজ রক্ষা পায় এক কলঙ্কজনক অধ্যায় থেকে। অধুনা কিছু লোক বেদের কিছু মন্ত্রের রেফারেন্স দেয় সতীদাহ প্রথার পক্ষে। তারা অথর্ববেদ (১৮.১.১-২) রেফারেন্স দেয়। মজার বিষয় হল রেফারেন্সটা দেখলেই বোঝা যায় যে তারা জীবনেও এই মন্ত্রগুলো পড়েনি। কারণ দেখা যায় যে ওই মন্ত্র দুইটি সতীদাহ প্রথাকে সমর্থন তো দুরে থাক,বরং স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর সুখী জীবন নিশ্চিত করতে বলেছে এবং প্রয়োজনে পুনরায় বিয়ে করার অনুমতি দিয়েছে। দেখা যাক বেদ এর মন্ত্রগুলো-
ইয়ং নারী পতি লোকং বৃণানা নিপদ্যত উপত্ব্য মর্ন্ত্য প্রেতম্।
ধর্মং পুরাণমনু পালয়ন্তী তস্ম্যৈ প্রজাং দ্রবিণং চেহ ধেহি।।(অথর্ববেদ ১৮.১.৩)

(মর্ত্য-হে মনুষ্য,ইয়ং নারী-এই স্ত্রী,পতিলোকম- ¬পতিলোককে অর্থাৎ বৈবাহিক অবস্থাকে,বৃণনা- ¬কামনা করিয়া,প্রেতম-মৃ¬ত পতির,অনু-পরে,উপ ¬ ত্বা-তোমার নিকট,নিপদ্যতে-আসিতেছে,পুরাণম-সনাতন,ধর্ম্মম-ধর্মকে,পালয়ন্তী-পালন করিয়া,তস্য-তাহা¬র জন্য,ইহ-এই লোকে,প্রজাম্-সন্তানকে,দ্রবিণং- ¬এবং ধনকে,ধেহি-ধারণ করাও)

অর্থাৎ,হে মনুষ্য! এই স্ত্রী পুনর্বিবাহের আকাঙ্খা করিয়া মৃত পতির পরে তোমার নিকট আসিয়াছে। সে সনাতন ধর্মকে পালন করিয়া যাতে সন্তানাদি এবং সুখভোগ করতে পারে।

অন্যত্র একই ভাবে এ বলা হয়েছে-
ইয়ং নারী পতিলোকং বৃণানা নিপদ্যত উপত্বা মর্ত্য প্রেতম।
বিশ্বং পুরাণ মনু পালয়ন্তী তস্যৈ প্রজাং দ্রবিণং চেহ ধেহি।।(তৈত্তিরীয় আরণ্যক ৬.১.৩)

অর্থাৎ,হে মনুষ্য!মৃত পতির এই স্ত্রী তোমার ভার্যা। সে পতিগৃহ সুখের কামনা করিয়া মৃত পতির পরে তোমাকে প্রাপ্ত হইয়াছে।কীরূপভাবে? অনাদি কাল হইতে সম্পূর্ণ স্ত্রী ধর্মকে পালন করিয়া। সেই পত্নীকে তুমি সন্তানাদি এবং ধনসম্পত্তি সহ সুখ নিশ্চিত কর।

পরের মন্ত্রটি দেখি,
অথর্ববেদ ১৮.৩.২(এই মন্ত্রটি ঋগবেদ ১০.১৮.৮ এ ও আছে)

উদীষর্ব নার্ষ্যভি জীবলোকংগতাসুমেতমুপশেষ এহি।
হস্তাগ্রাভস্য দিধিষোস্তবেদং পত্যুর্জনিত্বমভি সংবভূব।।

নারী-হে স্ত্রী! তুমি,এতত্ গতাসুম্-এই গতপ্রাণ পতির ,উপশেষে-শয়ন করিয়া আছ(মায়া ধরে আছ),জীবলোকং অভি উদীর্থ-(মায়া ত্যগ করে)বাস্তবতায় ফিরে এস(জীবলোকে),তব- ¬তোমার,হস্তগ্রাভস্য দিধিষোঃ-পাণিগ্রহণকারী,পত্যুঃ-পতির সঙ্গে,ইদং জনিত্বম-আবার পত্নীত্ব,অভি সংবভুব-সৃষ্টি হল

অর্থাৎ,হে নারী! মৃত পতির শোকে অচল হয়ে লাভ কী?বাস্তব জীবনে ফিরে এসো।পুনরায় তোমার পাণিগ্রহনকারী পতির সাথে তোমার আবার পত্নীত্ব তৈরী হবে।

সায়নভাষ্যে এই মন্ত্রের অর্থ দেখা যায় এরকম-
"হে মৃতপতীর পত্নী!জীবিত পুত্রপৌত্রের লোক অর্থাৎ  গৃহের কামনা করে শোক ত্যাগ করো।মৃত পতির মায়া ত্যগ করো।তোমার পাণিগ্রহণকারী পতির স্ত্রী হইবার ইচ্ছায় তুমি নিশ্চিতরূপে অনুসরণ করো।

প্রায় একইভাবে তৈত্তিরীয় আরণ্যক-এ বলা হয়েছে (৬.১.১৪)।

"হে নারী!তুমি এই মৃতপতির মায়ায় আবদ্ধ হয়ে আছ। এই মায়াত্যাগ করো।পুনরায় পতি কামনা করো এবং পাণিগ্রহণকারী বিবাহের অভিলাষী এই পতিকে জায়াত্বের সহিত প্রাপ্ত হও"

অর্থাৎ, মন্ত্র দুটিতে সতীদাহ প্রথার কোনো কথাই নেই, বরং স্বামীমৃত্যুর পর স্ত্রীকে শোকে মুহ্যমান হয়ে না পড়ে শোকত্যাগ করে স্বাভাবিক জীবন শুরু করতে বলা হয়েছে এবং প্রয়োজনে পুনরায় বিবাহ করার অনুমতি দিয়েছে।
সেকি, ধর্মে সমর্থন নেই ! তাহলে এত বড়ো নৃশংস ঘটনা শত শত বছর ব্যাপী সংঘটিত হল কীসের জোরে ? আসুন, অন্বেষণ করি-- হিন্দু সমাজে প্রচলিত বর্বর সতীদাহ প্রথা নিয়ে কিছু বললে তখন কিছু হিন্দু মুমিন(!) দাবি করে যে এটি একটি কুসংস্কার, ধর্মগ্রন্থে এমন কিছু বলা নেই। তাদের জন্য আজকের এই পোস্ট।
অধিকাংশ ধার্মিকরা যে তাদের ধর্মগ্রন্থ না পড়েই অন্ধভাবে বিশ্বাস করে সেটা তেমন অস্বাভাবিক নয়। কারণ কেউ ধর্মগ্রন্থ বুঝে পড়লে তার নাস্তিকতা ঠেকায় কার সাধ্যি।
হিন্দুরা সম্প্রদায়গণ যেসব গ্রন্থকে তাদের পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ বলে সম্মান প্রদর্শন করে , ঈশ্বরের বাণী বলে পুজোর সময় শ্লোক আওড়ায়, সেইসব গ্রন্থেই এ বর্বর প্রথার উল্লেখ রয়েছে। রেফারেন্স হিসাবে কয়েকটি সোর্স উল্লেখ করা যেতে পারে :
(১) অথর্ববেদ : “আমরা মৃতের বধু হওয়ার জন্য জীবিত নারীকে নীত হতে দেখেছি।” (১৮/৩/১,৩)।
(২)পরাশর সংহিতা : “মানুষের শরীরে সাড়ে তিন কোটি লোম থাকে, যে নারী মৃত্যুতেও তার স্বামীকে অনুগমন করে, সে স্বামীর সঙ্গে ৩৩ বৎসরই স্বর্গবাস করে।” (৪:২৮)
(৩) দক্ষ সংহিতা : “যে সতী নারী স্বামীর মৃত্যুর পর অগ্নিতে প্রবেশ করে সে স্বর্গে পূজা পায়”।(৪:১৮-১৯)।
(৪) দক্ষ সংহিতা : “যে নারী স্বামীর চিতায় আত্মোৎসর্গ করে সে তার পিতৃকুল, স্বামীকুল উভয়কেই পবিত্র করে।”(৫:১৬০)। যেমন করে সাপুড়ে সাপকে তার গর্ত থেকে টেনে বার করে তেমনভাবে সতী তার স্বামীকে নরক থেকে আকর্ষণ করে এবং সুখে থাকে।
(৫) ব্রহ্মপুরাণ : “যদি স্বামীর প্রবাসে মৃত্যু হয়ে থাকে তবে স্ত্রীর কর্তব্য স্বামীর পাদুকা বুকে ধরে অগ্নিপ্রবেশ করা।”
(৬) মহাভারতের মৌষল পর্বে, কৃষ্ণের মৃত্যুর পর তাঁর চার স্ত্রী রুক্ষিণী, রোহিণী, ভদ্রা এবং মদিরা তাঁর চিতায় সহমৃতা হয়েছিলেন। এমন কি বসুদেবের আট পত্নীও তাঁর মৃত্যুর পরে সহমরণে গিয়েছিলেন।
পাণ্ডু দেহত্যাগ করলে তার দ্বিতীয় স্ত্রী মাদ্রী তাঁর চিতায় সহমৃতা হয়েছিলেন।
(৭) ব্যাসস্মৃতি বলছে, চিতায় বিধবা নারী তার স্বামীর মৃতদেহে আলিঙ্গন করবেন অথবা তার মস্তকমুণ্ডন করবেন। (২:৫৫)।
(৮) ষষ্ঠশতকের বরাহমিহির তার বৃহৎসংহিতায় বলেন, “অহো নারীর প্রেম কি সুদৃঢ়, তারা স্বামীর দেহক্রোড়ে নিয়ে অগ্নিতে প্রবেশ করে।” (৭৪:২৩)।
(৯) রামায়ণেও আমরা দেখি,রাবণের কাছে বন্দি থাকাকালে সীতার “সতীত্ব” ঠিক ছিল কী-না সেটা জানার জন্য অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। সেটা ভগবান রামও অনুমোদন করে দেন! অথচ,রামের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো অধিকার কারও ছিল না!
ধর্মের বাণী সবসময় ফানি হয় না, কোনো- কোনো সময় নিষ্ঠুরও হয়।
কোনো-কোনো ঐতিহাসিকগণ মনে করেন, সতীদাহ প্রথা ভারতে মুসলিমদের আগমনের পর থেকে এবং মুসলিমদের কারণেই সৃষ্টি হয়েছে,এর আগে ভারতে এই অমানবিক প্রথা ছিল না!
আবার কেউ কেউ মনে করেন, গুপ্ত সাম্রাজ্যের  আগে থেকেই ভারতবর্ষে সতীদাহ প্রথার প্রচলন ছিল। প্রাচীন সতীদাহ প্রথার উদাহারণ পাওয়া যায় অন্তর্লিখিত স্মারক পাথরগুলিতে। এ পর্যন্ত সবচেয়ে প্রাচীন স্মারক পাথর পাওয়া যায় মধ্যপ্রদেশে,কিন্তু সব থেকে বড়ো আকারের সংগ্রহ পাওয়া যায় রাজস্থানে। এই স্মারক পাথরগুলিকে সতী স্মারক পাথর বলা হত যেগুলি পুজো করার বস্তু ছিল [Shakuntala Rao Shastri, Women in the Sacred Laws – The later law books (1960)]। ডাইয়োডরাস সিকুলাস (Diodorus Siculus) নামক গ্রিক ঐতিহাসিকের খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকের পাঞ্জাব বিষয়ক লেখায়ও সতীদাহ প্রথার বিবরণ পাওয়া যায় [Doniger, Wendy (2009). The Hindus: An Alternative History. Penguin Books. p. 611]। তাছাড়া, আলেকজান্ডারের সাথে ভারতে বেড়াতে আসা ক্যাসান্ড্রিয়ার ইতিহাসবিদ এরিস্টোবুলুসও সতীদাহ প্রথার বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন। খ্রিস্ট পূর্বাব্দ ৩১৬ সালের দিকে একজন ভারতীয় সেনার মৃত্যুতে তার দুই স্ত্রীই স্বপ্রণোদিত হয়ে সহমরণে যায় [Strabo 15.1.30, 62; Diodorus Siculus 19.33; "Sati Was Started For Preserving Caste" Dr. K. Jamanadas]। (সূত্র: উইকিপিডিয়া)

এ ছাড়াও আরও অনেক লেখকের অনেক ধরনের বক্তব্য আছে। ফলে সতীদাহ প্রথাকে ভারতবর্ষে ইসলামের আগমনের সাথে মিলিয়ে ফেলা অসৎ উদ্দেশ্য ছাড়া আর কিছুই নয় বলে মনে করেন কেউ কেউ। অমানবিক সতীদাহ প্রথা নির্মূলীকরণে মুসলিমদের আইনানুগ কোনো অবদান ছিল কি না, সেটাও একটু খতিয়ে দেখা দরকার। আমরা একবার চোখ বুলিয়ে নিতে পারি :১. সতীদাহ প্রথা বন্ধের প্রথম সরকারি প্রচেষ্টা মুসলিমরা করেছিলেন। মুহাম্মদ বিন তুঘলক সর্বপ্রথম এই প্রথা বন্ধের চেষ্টা চালিয়ে ছিলেন। [L. C. Nand, Women in Delhi Sultanate, Vohra Publishers and Distributors Allahabad 1989] ২. মুঘল সম্রাটদের মধ্যে যারা সতীদাহ প্রথা বন্ধ করতে চেয়েছিলেন,তাদের মধ্যে হুমায়ুন স্থানীয় হিন্দুদের প্রতিবাদের মুখে পড়েছিলেন। [Central Sati Act – An analysis by Maja Daruwala is an advocate practising in the Delhi High Court. Courtsy: The Lawyers January 1988. The web site is called "People's Union for Civil Liberties"] ৩. অনেক সময় মুঘল প্রসাশন থেকে বিধবা মহিলাদের পেনশন বা উপহার দেয়া হত সতীদাহ না করার জন্য। ৪. শিশুদের এই প্রথা থেকে রক্ষা করা হয়েছিল। সম্রাট শাহজাহানের সময় নিয়ম ছিল কোনো অবস্থাতেই যেসব মহিলাদের সন্তান আছে তাদের দাহ হতে দেওয়া হবে না। [XVII. "Economic and Social Developments under the Mughals" from Muslim Civilization in India by S. M. Ikram edited by Ainslie T. Embree New York: Columbia University Press, 1964. This page maintained by Prof. Frances Pritchett, Columbia University] ৫. সব থেকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয় সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়। ১৬৬৩ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি রুল জারি করেন, যে কোনো পরিস্থিতিতে মুঘল কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত দেশের কোথাও সতীদাহ ঘটতে সরকারি অনুমতি দেয়া হবে না। ইউরোপীয় পর্যটকদের বর্ণনা অনুযায়ী সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলের শেষের দিকে সতীদাহ প্রথা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, শুধু রাজাদের স্ত্রীরা ব্যতীত। [XVII. "Economic and Social Developments under the Mughals" from Muslim Civilization in India by S. M. Ikram edited by Ainslie T. Embree New York: Columbia University Press, 1964. This page maintained by Prof. Frances Pritchett, Columbia University]

লর্ড বেন্টিঙ্ক ১৮২৯ সালে সতীদাহ প্রথাটা নিষিদ্ধ করলেও ব্রাক্ষণবাড়িয়ার পাশে আগরতলা যেটা ত্রিপুরা প্রদেশের রাজধানী সেইখানে কিন্তু ১৯০০ সাল পর্যন্ত সতীদাহ প্রথা চলছিল। ভেবেছিলাম ভারতবর্ষে সর্বশেষ সতীদাহ প্রথা সর্বশেষ বন্ধ হয়েছিল এই আগরতলা রাজ্যে। কিন্তু তা আর হল কই ! ১৯৮৭ সালের ৪ সেপ্টম্বর আমরা আবার শিহরিত হলাম। রূপ কানোয়ার নামে এক ১৮ বছর বয়সি রাজস্থানি তরুণীর স্বামীর চিতায় সহমরণ !(Roop Kanwar (c. 1969 – 4 September 1987) was a Rajput who was immolated on 4 September 1987 at Deorala village of Sikar district in Rajasthan, India. At the time of her death, she was 18 years old and had been married for eight months to Maal Singh Shekhawat, who had died a day earlier at age 24, and had no children.
Several thousand people attended the sati event. After her death, Roop Kanwar was hailed as a sati mata – a "sati" mother, or pure mother. The event quickly produced a public outcry in urban centres, pitting a modern Indian ideology against a traditional one. The incident led first to state level laws to prevent such incidents, then the central government's Commission of Sati (Prevention) Act.
News reports of the incident present conflicting stories about the degree to which Kanwar's death was voluntary. Some news reports claim Kanwar was forced to her death by other attendees present. At the same time, there are contradictory reports which claim that Roop Kanwar told her brother-in-law to light the pyre when she was ready, supporting the possibility that she was at least resigned to undergoing sati, if not willing.
The original inquiries resulted in 45 people being charged with her murder; these were acquitted. A much-publicized later investigation led to the arrest of a large number of people from Deorala, said to have been present in the ceremony, or participants in it. Eventually, 11 people, including state politicians, were charged with glorification of sati. On 31 January 2004 a special court in Jaipur acquitted all of the 11 accused in the case.-- Wikipedia)

প্রকৃতপক্ষে, রাজা রামমোহন রায় তাঁর এক বৌদিকে জোরপূর্বক সতী বানানোর ঘটনা দেখে ১৮১২ সালের দিকে সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন শুরু করেন। তার আগ পর্যন্ত হিন্দুসমাজ সংস্কারকদের মধ্য থেকে সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে প্রথম আওয়াজ তুলেছিলে বর্ধমান নিবাসী রূপেন্দ্র নাথ বন্দোপাধ্যায়, যিনি হটি বিদ্যালঙ্কারের বাবা ছিলেন । রামমোহনের জন্মের ৭০ বছর আগে তিনি বেশ কয়েকটি সতীদাহ আটকেছিলেন । অন্যের ঘরে যখন আগুন লাগছিল তখন সবাই চোখ বুজে ছিল ধর্মের ভয়ে, যখন নিজের ঘরেই সেই আগুনের আঁচটা লাগল কিছু একটা করতে হবে ভাব মনকে গ্রাস করে নিল। ফলে রাজা রামমোহন রায়ের সাথে সাথে আপামর হিন্দুসমাজ কোনোভাবেই এই প্রথা নির্মূলের কৃতিত্ব দাবি করতে পারে না, এককভাবে তো নয়ই। এখনও সুযোগ দেওয়া হলে বর্ণ হিন্দুদের মধ্যে সতীদাহ প্রথা আবার শুরু হতে পারে , বিশেষ করে ভারতে। কারণ, এই প্রথার পুনঃপ্রচলনে ও একে টিকিয়ে রাখতে ভারতীয় এক শ্রেণির বর্ণ হিন্দুরাই ছিল সবচেয়ে অগ্রগামী। রূপ কানোয়ারের মৃত্যুর পর যেভাবে ভারতের “স্বামী” বা “গুরুজি”বা “হিন্দুমৌলবাদী” জাতীয় ব্যক্তিরা সহমরণের পক্ষে যে বিবৃতি দিচ্ছিলেন তা শুনে খুবই আতঙ্কিত হতে হয়। এইসব গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়লরা এরকম বিবৃতি দিতে থাকল তখন রাষ্ট্র শুধুই সব দেখল এবং সব শুনল।কিন্তু বড়োই নির্বিকার !১৮২৯ সালের দিকে ব্রিটিশ শাসনামলে এই প্রথার বিরুদ্ধে পুনরায় আইন করা হলেও পরবর্তীতে সতীদাহের কিছু ঘটনার খবর পাওয়া যায়।

প্রায় দেড়শ বছর আগে কীর্তিপাশা জমিদার পুত্র রাজকুমার কে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়। স্ত্রী নিজেকে সতী প্রমান করতে স্বামীর সঙ্গে জ্বলন্ত শ্মশানে সহমরন যায়।

ভারতবর্ষের সংস্কৃতি, সাহিত্য, সমাজে 'সতী' শব্দের একটা আলাদা মাহাত্ম্য আছে, অভিনব বৈচিত্র আছে। সাহিত্যের কথা এখন নাহয় বাদই দিলাম, কিন্তু সো কলড সংস্কৃতি বা সমাজ কোনো মেয়েকে সতী ভাবতে খুব ভালোবাসে। আর সতী যদি সে না হয় তবে দূরে সরাতে ক্ষীনমাত্র দ্বিধা করে না।

নারীর ওপর নিপীড়ন চিরকালই হয়েছে ধর্মের নামে। প্রকৃতপক্ষে পুরুষের স্বার্থে। পৌনে ২০০ বছর আগে রামমোহন রায় আরও লিখেছিলেন: 
‘বিবাহের সময় স্ত্রীকে অর্দ্ধাঙ্গিনী বলিয়া স্বীকার করেন কিন্তু তাহাদের সহিত পশুর অধিক ব্যবহার করেন। স্বামীর গৃহে প্রায় সকলের পত্নী দাস্যবৃত্তি করে অর্থাৎ অতি প্রাতে কি শীতকালে কি বর্ষাতে স্থান মার্জ্জন, ভোজনাদি পাত্র মার্জ্জন, গৃহ লেপনাদি তাবৎ কর্ম্ম করিয়া থাকে এবং বৃহৎ পরিবারের সূপকারের কর্ম্ম বিনা বেতনে দিবসে ও রাত্রিতে করে।...এ সকলই স্ত্রীলোকেরা ধর্ম্মভয়ে সহ্য করে, আর সকলের ভোজন হইলে ব্যঞ্জনাদি উদর পূরণের অযোগ্য যৎকিঞ্চিৎ অবশিষ্ট থাকে তাহা সন্তোষপূর্ব্বক আহার করিয়া কাল যাপন করে। ...যাহার স্বামী দুই তিন স্ত্রীকে লইয়া গার্হস্থ্য করে তাহারা দিবারাত্রি মনস্তাপ ও কলহের ভাজন হয়। কখনো স্বামী এক স্ত্রীর পক্ষ হইয়া অন্য স্ত্রীকে সর্ব্বদা তাড়ন করে, আবার কেহ কেহ সামান্য ত্রুটি পাইলে বা বিনা কারণে সন্দেহবশতঃ স্ত্রীকে চোরের তাড়ণা করে (অর্থাৎ চোরের ন্যায় প্রহার করে) অনেক স্ত্রীই ধর্ম্মভয়ে এ সকলই সহ্য করে।’
নারীর মর্যাদা রক্ষায় হিন্দুসমাজের সংস্কারকেরা প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যে দীর্ঘ লড়াই করেছেন। তাতে নারী নির্যাতন, বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ প্রভৃতি অভিশাপ থেকে সমাজ অনেকখানি মুক্তি পেয়েছে। নারীশিক্ষা ব্যাপক বিস্তারিত হয়েছে, নারীকে পর্দার কারাগার থেকে বের করে আনা হয়েছে, সমাজের সব ক্ষেত্রে নারী তার মেধা ও প্রতিভার পরিচয় দিচ্ছে। এখন দরকার নারীর অগ্রযাত্রার পথকে আরও সহজ করা। যেসব বাধা এখনো আছে তা তার সামনে থেকে সরিয়ে ফেলা। সব ধর্মের নেতাদেরই উচিত তাদের পূর্বসূরিদের ভুল স্বীকার করে নারীর চলার পথকে আরও সহজ করা। “

(তথ্যসূত্র: আনন্দলোক-আচার্য সুভাষ শাস্ত্রী পৃঃ-৭৭, বৈদিক সাহিত্য কেন্দ্র, যশোর

ATHARVA VEDA, vol. II, page 552, English translation by Dr. Tulsi Ram

ATHARVA VEDA, vol. II, page 553, English translation by Dr. Tulsi Ram

Central Sati Act - An analysis by Maja Daruwala is an advocate practising in the Delhi High Court. Courtsy: The Lawyers January 1988.

Economic and Social Developments under the Mughals" from Muslim Civilization in India by S. M. Ikram edited by Ainslie T. Embree New York: Columbia University Press, 1964. This page maintained by Prof. Frances Pritchett, Columbia University)

কোন মন্তব্য নেই:

পরকীয়া প্রতিবেদন || যাদব কুমার পান্ডে

পরকীয়া নিয়ে আর কিছু লিখব না ভেবেছিলাম। কিন্তু এই একটা ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন ফেসবুক পোষ্টে এত বেশি বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে যে একজন সচেতন নাগরিক...