Thursday, 10 January 2019

বাঙালীর সার্কাস - কালের বিবর্তনে হারাতে বসা এক বিনোদন মাধ্যমের ইতিকথা || রানা চক্রবর্তী

● ছবিতে: প্রফেসর প্রিয়নাথ বসুর গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের জিমন্যাস্টদের পিরামিড এক্ট। এঁরা সকলেই বাঙালি ছিলেন। ১৮৯০ এর দশকের ছবি।

'এন্টারটেইনমেন্ট’ বা বিনোদন শব্দটি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর কাছে ভিন্নরূপে ধরা দেয়।বিনোদনের কোনো নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া নেই। দেখা ও শোনার যুগলবন্দীতে ভালো লাগার কিছুটা সময় অতিবাহিত করার অন্য আরেক নামই বিনোদন। এই বিনোদনের মাধ্যম সর্বদা পরিবর্তনশীল। সময়ের পরিবর্তনে এমন মাধ্যমগুলো প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়ে চলেছে। বিনোদনের এমনই এক প্রাচীনতম মাধ্যম হলো সার্কাস, যা বহু বছর হতে চলে আসলেও, আজ এর উত্তরণ অন্তিম সূর্যাস্তের দিকে ঢলে পড়েছে।

সার্কাস শব্দটি মূলত একটি ইংরেজি শব্দ। ১৪শ’ সালে ইংরেজি ভাষায় প্রথম এর ব্যবহার হয়। আবার এই ইংরেজি ‘সার্কাস’ আসলে ল্যাটিন Circus থেকে উদ্ভূত হয়েছে। এই ল্যাটিন শব্দটি আবার গ্রীক শব্দ Kirkos থেকে এসেছে, যার মানে একটা গোলাকার ক্রীড়াচক্র, যাকে ঘিরে দর্শকদের বসার ব্যবস্থা থাকে। সার্কাস মূলত একদল বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়, যারা নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম দ্বারা নিজেদের দক্ষ করে গড়ে তোলে এবং নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানের দিন তাদের দক্ষতা জাহির করে।

সার্কাসে অনেক ধরনের খেলা দেখানো হয় বলে বেশ প্রশস্ত জায়গা নিয়েই এর প্রদর্শনী চলে। পুরো কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে বড় ধরনের তাঁবু ব্যবহার করা হয়, যা ‘বিগ টপ’ নামে পরিচিত। সার্কাসের আকার সাধারণত গোলাকৃতি হয়ে থাকে। মাঝখানের গোলাকৃতি মঞ্চ যেটি ‘রিং’ নামে পরিচিত, সেখানে সকল খেলার প্রদর্শনী হয়ে থাকে। যিনি সমগ্র অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন তাকে রিংমাস্টার বলা হয়।

সার্কাসের ইতিহাস কিন্তু বেশ পুরনো। বহু প্রাচীনকাল থেকেই রোম, মিশর ও গ্রিসের বিভিন্ন শহরে সার্কাসের খেলা দেখানো হতো। তখন যদিও একে সার্কাস বলা হতো না, তবে মূল বিষয় ছিল একই। সেই সময়কার সার্কাস এখনকার মতো এত আড়ম্বড়পূর্ণও ছিল না। তখনকার দিনে সার্কাস বলতে ছোটখাট আগুনের খেলা, লাঠি ঘোরানো, দড়ি খেলা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো, ভারোত্তোলন ইত্যাদি দেখানো হতো। এর পাশাপাশি ছিল কিছু জন্তু-জানোয়ারের প্রদর্শনী, যা আজকের দিনের চিড়িয়াখানার চাইতে বেশি কিছু নয়।

সম্রাট জুলিয়াস সিজারের আমলে রোমে প্রথম রাষ্ট্রীয়ভাবে সার্কাস প্রদর্শন করা হয়। আর এই সার্কাস পরিচালনা করে তখনকার বৃহত্তম সার্কাসদল ‘ম্যাক্সিমাস’। দুই লক্ষের বেশি লোকের ধারণক্ষমতা সম্পন্ন চত্বর পাথর দিয়ে ঘেরাও করে নির্মাণ করা হয় সার্কাসের ক্ষেত্র। এরপর থেকে সার্কাসের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে এবং ধীরে ধীরে আঞ্চলিক মেলাগুলোতেও সার্কাস প্রদর্শনী শুরু হয়।

আঠারো শতকের দিকে এসে সার্কাসের চেহারা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে থাকে। আর এই পরিবর্তনের কর্ণধার হলেন ইংল্যান্ডের ফিলিপ অ্যাসলো। মূলত তার হাত ধরেই আধুনিক সার্কাসের যাত্রাপথ শুরু হয়। বর্তমান সার্কাসের অনেক জনপ্রিয় খেলা ছিল তার সৃষ্টি। ফিলিপের হাত ধরে সার্কাসের পুরো চেহারাই পাল্টে যায়।

আঠারো শতকের শেষ দিকে তিনি একটা ছোট্ট ঘোড়সওয়ারির দল নিয়ে ছুটন্ত ঘোড়ার পিঠে চড়ে একটা গোলাকার ক্রীড়াক্ষেত্রে নানারকমের আশ্চর্য খেলা দেখাতে শুরু করলেন। এই খেলা খুব অল্প দিনের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠল। তিনি যে বৃত্তাকার ক্রীড়াভূমি ব্যবহার করতেন, তাকেই মূলত বলা হতো রিং। সেই থেকে সার্কাসের ক্রীড়াক্ষেত্র বলতেই ‘রিং’ শব্দটির প্রচলন শুরু হয়।

এরপর থেকে সার্কাসের প্রসার ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ফিলিপের এক সহকারী চার্লস হিউজেস সমসাময়িককালে রাশিয়াতে সার্কাস দেখানো শুরু করেন। এ সময় ইউরোপীয় সার্কাস দলের প্রায় সবারই নানা শহরে স্থায়ী খেলার মাঠ ছিল।

১৭৮০ সালের শেষ দিকে সার্কাস প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পদার্পণ করে জন বিল রিকেটস-এর হাত ধরে। তিনি ১৭৯৩ সালের ৩রা এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়াতে একটি প্রদর্শনী করেন, যেটিকে সার্কাসের ইতিহাসে প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্রদর্শনী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই শো এতোই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন পর্যন্ত শো দেখতে আসেন।

কালের পরিবর্তনে সার্কাসে নিত্য নতুন আইডিয়ার খেলা এবং দুঃসাহসী খেলার আগমন ঘটতে থাকে। আইজ্যাক ভ্যান অ্যামবুর্গ নামের এর মার্কিনী পেশায় একজন খুব নামকরা বন্যজন্তু শিক্ষক ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন খুব দুঃসাহসী। পৃথিবীতে সর্বপ্রথম তিনিই সিংহের মুখের ভেতর নিজের মাথা ঢুকিয়ে নিরাপদে মাথা বের করার খেলা দেখিয়ে সার্কাসের খেলার পুরো দৃশ্যপট পাল্টে দিয়েছিলেন।

১৮৫৯ সালের দিকে সার্কাসে এক নতুন খেলার প্রচলন ঘটে যার নাম ‘ফ্লায়িং ট্রাপিজ’। ট্রাপিজ হলো এক ধরনের দড়িখেলা, যা বহু অনুশীলন ও শারীরিক কসরতের মাধ্যমে আয়ত্ত করতে হয়। আর ফ্লায়িং ট্রাপিজ হলো দড়ির সাহায্যে একস্থান থেকে অন্যস্থানে উড়ার খেলা। জুল লিয়টার্ড নামক এক ফরাসি প্রথম এই খেলার আবিষ্কার করেন।

সেই একই বছর জুন মাসে আরেক অসাধ্য সাধন করে চারিদিকে তোলপাড় ফেলে দিয়েছিলেন চার্লেস ব্লন্ডিন নামে আরেক ফরাসি। তিনি শক্ত দড়ির উপর হাঁটতে পারতেন খুব অনায়াসে। কিন্তু তার চিন্তাভাবনা ছিল দুর্ধর্ষ কিছু করে দেখানোর। তিনিই প্রথম আমেরিকা ও কানাডা সীমান্তে ১১ কিলোমিটার দূরত্ব বিশিষ্ট ‘দি নায়াগ্রা জর্জ’ একটি সরু দড়ির উপর হেঁটে পার হন। আর সেই থেকে তার খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

ব্রিটিশদের হাত ধরেই ভারতীয় উপমহাদেশে সার্কাসের গোড়াপত্তন হয়। ১৮৭৯ সালে রোমান উইলিয়াম সিরিন একটি ইতালিয়ান সার্কাস দল নিয়ে উপস্থিত হন ভারতের কেরালা রাজ্যে। সেখানে তিনি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন যে, সারা ভারতে তার দলের কোনো খেলা নকল করে দেখানোর মতো উপযুক্ত কেউ নেই। এ চ্যালেঞ্জ মহারাষ্ট্রের রাজা কুরুওয়ানদানের আত্মসম্মানে আঘাত করে। তখন তিনি উইলিয়ামের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। তিনি তার অশ্ব প্রশিক্ষক এবং আরো দুই শিষ্যকে নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে বিভিন্ন খেলায় দক্ষতা অর্জন করেন এবং উইলিয়ামের সার্কাস দলের প্রদর্শিত খেলা একে একে নকল করে দেখান। ভেঙে দেন রোমানের অহঙ্কার। এরপর এ তিন ভারতীয় মিলে প্রতিষ্ঠা করেন একটি সার্কাস দল। শুধু দল গঠনই নয়, প্রতিষ্ঠা করেন সার্কাস স্কুল। যে কারণে ভারতের কেরালাকে উপমহাদেশের সার্কাস ইতিহাসের পূণ্যভূমি বলা হয়।

কলকাতার পার্ক সার্কাস ময়দানে প্রায় প্রত্যেক বছর নিয়ম করে দেখানো হতো রাশিয়ান সার্কাস। এই জায়গার নামকরণও ওই সার্কাস প্রদর্শনকে ঘিরেই। সেই থেকেই শুরু করে নব্বইয়ের দশকের শেষ দিক পর্যন্তও প্রতি বছরের শীতের আমেজ জমিয়ে রাখতো পার্ক সার্কাস ময়দান।

তৎকালীন পাকিস্তানের ‘লাকি ইরানি সার্কাস’ হলো খুব নামকরা একটি সার্কাস দল। এই দলটি দেশটির বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে সার্কাস খেলা দেখায়। পাকিস্তানে এমন কয়েক প্রজন্ম পাওয়া যাবে যাদের কাছে বিনোদনের অন্যতম উপাদান ছিল লাকি ইরানির সার্কাস। বংশ পরম্পরায় আজও এই সার্কাস দলটি টিকে আছে।

বাংলাদেশে ১৯০৫ সালে ‘দি লায়ন সার্কাস’ নামে প্রথম একটি সার্কাস দল গঠিত হয়। ১৯৭০ সালে দলটির নাম পরিবর্তিত হয়ে হয় ‘দি সাধনা লায়ন সার্কাস’। বাংলাদেশের সার্কাস দলগুলোতে সাধারণত জীবজন্তুর খেলা এবং মানুষের চোখ দিয়ে রড বাঁকানো, ভারোত্তোলন, এক চাকা, দু’চাকা, লোহার খাঁচা ও কূপের মধ্যে মোটরসাইকেল চালানোসহ নানা খেলা দেখানো হতো।

স্বাধীনতা পূর্বকালে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ সালে পর্যন্ত এদেশে বেশকিছু দল প্রায় নিয়মিতভাবে সার্কাস প্রদর্শনী করতো। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো– রাধিকা মোহন মোদকের ‘দি বেবি সার্কাস’, সাতক্ষীরার জুড়ান কর্মকারের ‘দি আজাদ সার্কাস’, ১৯৪৭ সালে গঠিত বরিশালের লক্ষণদাসের ‘দি রয়েল পাকিস্তান সার্কাস’, বনমালি মোদকের ‘দি ইস্ট পাকিস্তান সার্কাস’, নারায়ণগঞ্জে রাধানাথ সরকারের ‘দি আর এন ডল ড্যান্স সার্কাস’, নবাবগঞ্জে কার্তিক সরকারের ‘লক্ষীনারায়ণ সার্কাস’ ও সাধুদাসের ‘দি লায়ন সার্কাস’, ১৯৬৫ সালে গঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এমএ সামাদের ‘দি সেভেন স্টার সার্কাস’ ও ‘দি নিউ স্টার সার্কাস’ এবং ১৯৬৮ সালে গঠিত রংপুরে আলী আকবরের ‘দি রওশন সার্কাস’।

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে এদেশে যে সকল সার্কাস দল গঠিত হয়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বগুড়া-মহাস্থানগড়ের আব্দুস সাত্তারের ‘দি বুলবুল সার্কাস’, বরিশালের বীরেনচন্দ্র দাসের ‘দি রয়েল সার্কাস’, ফেনির সুনীল চন্দ্র পালের ‘দি সবুজ বাংলা সার্কাস’, সাতক্ষীরার ‘দি সুন্দরবন সার্কাস’, নারায়ণগঞ্জের মুকুলের ‘দি কাঞ্চন সার্কাস’, চট্টগ্রামের আনোয়ার খানের ‘দি কোহিনূর সার্কাস’, সৈয়দপুরের আকবর শেখের ‘দি রওশন সার্কাস, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এমএ সামাদের ‘দি নিউ স্টার সার্কাস’, আব্দুল বশিরের ‘দি ন্যাশনাল সার্কাস’, ঢাকা-নবাবগঞ্জের নিরঞ্জন সরকারের ‘দি লায়ন সার্কাস’, ঢাকা-বর্ধনপাড়ার রতন সরকারের ‘দি রাজমহল সার্কাস’, শৈলেন বাবুর ‘নিউ সবুজ বাংলা সার্কাস’ এবং ঢাকার কেরানীগঞ্জের বসন্তকুমার মোদকের ‘দি সোনার বাংলা সার্কাস’।

কালের প্রবাহে বিনোদনের মাধ্যমে এসেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন বিনোদন মাধ্যমগুলোর জৌলুশ। যুগের সাথে তাল মেলাতে না পারার কারণে আর বন্যপ্রাণী রক্ষা আইন ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠার কারণে বিলুপ্তির পথে এই প্রাচীন সংস্কৃতি। এইতো কিছুদিন আগেও আমরা মেলায় গেলে দেখতে পেতাম, মেলার সবচাইতে বেশি জায়গা জুড়ে রয়েছে সার্কাসের তাঁবু। আবার টেলিভিশনের পর্দায় বিদেশি সার্কাস দেখার আগ্রহও কোনো অংশে কম ছিল না। কিন্তু সময় আজ অনেক পরিবর্তিত। বিনোদনের এই মাধ্যমটি এখন মানুষের মুখে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের উপকরণ। তাই আজকের লেখায় রইল আধুনিকতার মেরুকরণে হারিয়ে যেতে বসা সার্কাসকে কিছুটা হলেও খুঁজে পাওয়ার অভিব্যক্তি।

সেই ছোটবেলায়  থেকেই দেখে আসছি  কলকাতায় শীতের মরসুমের অন্যতম আকর্ষণ হল সার্কাস। এখন যে সমস্ত সার্কাস কলকাতায় আসে, তাদের কলাকুশলীদের মধ্যে বাঙালী কেউ আছেন কিনা জানি না, কিন্তু একসময়ে এক বঙ্গসন্তানের হাতে গড়া একটা সার্কাস দল সারা ভারতের খ্যাতি কুড়িয়ে ছিল। সেই অধ্যায়ের কথা আমরা অনেকেই আজ বিস্মৃত হয়েছি।

কলকাতায় সর্বপ্রথম উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি উইলসন্স গ্রেট ওয়ার্ল্ড সার্কাস খেলা দেখাতে আসে। এরপর আরো দুচারটে ইউরোপীয় দল খেলা দেখিয়ে যায়। বাঙালীর সার্কাসে প্রথম পদক্ষেপ ঘটে হিন্দুমেলার প্রতিষ্ঠাতা শ্রী নবগোপাল মিত্রের হাত ধরে। ন্যাশনাল সার্কাস নামের সে সার্কাস প্রথমে খেলা দেখাতো ঠনঠনিয়ায়,পরে নবগোপাল বাবুর বাড়িতে উঠে যায়। জন্তু জানোয়ার বলতে ছিলো মাত্র একটি টাট্টু ঘোড়া, মুলতঃ নানা প্রকার জিমন্যাস্টিকসের খেলাই দেখানো হত।

আনুমানিক ১৮৮৩ সালে, আবেল নামে উইলসন্স সার্কাসের একজন প্রাক্তন খেলোয়াড় ও আরও দু-চারজন ইউরোপীয়কে সঙ্গে করে নবগোপাল মিত্রের জামাই রাজেন্দ্রলাল সিংহ  ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাস’ খোলেন, মির্জাপুরে শামিয়ানা টাঙিয়ে সার্কাস দেখানো হতো।

তবে বাঙালীর সার্কাস রূপ পায় শ্রী প্রিয়নাথ বসুর হাতে। প্রিয়নাথ বসু চব্বিশ পরগনার ছোট জাগুলিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন, তাঁর পিতা মনমোহন বসু হিন্দুমেলার অন্যতম সংগঠক ছিলেন। কবি এবং নাট্যকার শ্রী মনমোহন বসুর নাটক ন্যাশনাল থিয়েটারে অভিনীত হতো, বহু গানও তিনি রচনা করেন।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে আহিরীটোলা অঞ্চলের গৌরহরি মুখোপাধ্যায় নামে এক ব্যায়ামশিক্ষক কলকাতার বহু জায়গায় জিমনাস্টিকসের আখড়া স্থাপন করেন। সবকটি তাঁর একার পক্ষে দেখাশোনা করা সম্ভব হতো না বলে তিনি এর মধ্যে কয়েকটার ভার নিজের ছাত্রদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে একজন হলেন শ্রী প্রিয়নাথ বসু।

প্রিয়নাথ বসু পরে নিজের স্বতন্ত্র আখড়া স্থাপন করেন, যার প্রথমটি ছিলো নিজের বাড়ির কাছে, কর্ণওয়লিস স্ট্রীটে। এ‌ই একটি থেকে সিমলে (বর্তমানের বিবেকানন্দ রোড) থেকে নেবুতলা (সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার) পর্যন্ত গোটা পঞ্চাশেক আখড়া সৃষ্টি হয় – এর প্র্ত্যেকটিতে প্রিয়নাথ ব্যয়াম শেখাতেন।

পড়াশোনায় মন নে‌ই দেখে মনমোহন বসু ছেলেকে গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজে ভর্তি করে দেন, কিন্তু সেখানেও প্রিয়নাথের মন বসে না । তিনি কলকাতায় সার্কাস এলে‌ই দেখতে যেতেন আর মনে মনে নিজের সার্কাস দল খোলার স্বপ্ন দেখতেন।

কিন্তু দল বানাবো বললে‌ই হয় না, তার জন্যে মূলধন চা‌ই। জিমনাস্টিকসকে পেশা করাকে মনমোহনের সায় ছিলো না, তিনি সাহায্য করতে রাজী হলেন না, সুতরাং বাড়ির মেয়েদের থেকে আর এপাশ ওপাশ থেকে কিছু টাকা যোগাড় করে জিমনাস্টিকসের দল নিয়ে প্রিয়নাথ বাড়ি ছাড়লেন।

সার্কাস বলা চলে না, কারণ তাঁবু নে‌ই, গ্যালারী নে‌ই, জন্তু-জানোয়ার নে‌ই। বসার ব্যবস্থা বলতে বাঁশের মাচা অথবা মাটিতে পাতা চাটাই। আলোর বন্দোবস্ত হতো বাঁশের মাথায় সরা বসিয়ে, তার মধ্যে কাঁকর, ছাই ইত্যাদির সঙ্গে কেরোসিন মিশিয়ে তাতে আগুন জ্বালিয়ে। খেলা বলতে শুধু‌ই জিমনাস্টিকস।  কিন্তু তাই নিয়ে‌ই প্রিয়নাথ মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বীরভূম, বাঁকুড়া, নানা জেলায় জমিদার বাড়িতে খেলা দেখিয়ে কিছু রোজগার করলেন।

কলকাতায় ফিরে প্রিয়নাথ রোজগারের টাকা পয়সা দিয়ে তাঁবু ইত্যাদি কিছু সরঞ্জাম কিনলেন, দু-একজন আরো খেলোয়াড় যোগাড় করলেন, একজন হিসেবরক্ষক নিযুক্ত করলেন, আর দলের নাম দিলেন "Professor Bose’s Great Bengal Circus"। সেটা ১৮৮৭ সালের কোন একটি সময়।

প্রিয়নাথ বসু কোনদিন অধ্যাপনা করেন নি, তবে এ‌ই ‘প্রফেসর’  কোথা থেকে এলো? জনশ্রুতি, কোন এক উৎসবে বড়লাট ডাফেরিন প্রিয়নাথের আখাড়ার ছেলেদের খেলা দেখে, আনন্দিত হয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘Who is the Proffessor?‘। প্রফেসর নামের উৎপত্তি নাকি সেখান থেকে‌ই।

গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস নানা লড়ায়ের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে স্বীকৃতি লাভ করে। প্রথমে বাংলার নানা জায়গায খেলা দেখিয়ে, ধীরে ধীরে উত্তর ও পশ্চিম ভারতে খেলা দেখতে শুরু করে। ১৮৯৬ সালে গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস গোয়ালিয়রের মহারাজার জয়বিলাস প্যালেসে খেলা দেখায়। সে‌ই বছরই নভেম্বর মাসে রেওয়ার মহারাজা সার্কাস দেখে খুশী হযে দুটি বাঘ উপহার দেন। তার আগে গ্রেট বেঙ্গল  সার্কাসে বাঘ ছিলো না।

ক্রমশঃ কয়েক বছরের মধ্যে‌ই গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস সারা ভারতে প্রসিদ্ধ হযে পড়ে, এবং এমন খুব কম‌ই করদ রাজ্য সে সময় ছিলো যেখানে খেলা দেখায় নি। ভারত ছাড়াও শ্রীলংকা, পেনাং, সিঙ্গাপুর, জাভা, নানা জায়গায় গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস খেলা দেখায়।

গ্রেট ইণ্ডিয়ান সার্কাস আর প্রিয়নাথ বসুর  গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস প্রায় এক‌ই সময়ে তাদের যাত্রা শুরু করলেও, দুটির মধ্যে একটা গুনগত ফারাক ছিল। গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাসের অংশীদার রাজেন্দ্রলাল সিংহ বাঙালী হলে‌ও, তার পরিচালনার ভার ছিল বিদেশী আবেলের ওপর। খেলোয়াড়দের মধ্যেও অনেকে ছিলেন বিদেশী। অন্যদিকে প্রিয়নাথ বসুর  গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের পরিকল্পনা, পরিচালনা সবের মূলে‌ই একজন বাঙালী, খেলোয়াড়রাও সব ভারতীয়। এই কারণে পরবর্তী কালে এ‌ই সার্কাস আর শুধুমাত্র সার্কাস বলে‌ই গণ্য থাকে‌নি, বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে যখন জাতীয়াতাবাদী চেতনা রূপ পাচ্ছে, তখন বাঙালীর গর্বের বস্তু হয়ে ওঠে। দেশীয় সংবাদপত্রও গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের প্রভূত প্রশংসা করে তাতে যোগ দেয়। দুটি উদাহরণ,

"The Circus has been doing splendid service in its own way to the country" ( শ্রী অরবিন্দ ঘোষের বন্দেমাতরম পত্রিকা, ৮ই জানুয়ারি ১৯০৮ সাল)।

"The Circus is indeed the pride of the Bengalees." (হিন্দু পেট্রিয়ট, ২৮ শে ডিসেম্বর ১৯০৮ সাল)।

এবার সার্কাসের ইতিহাস থেকে নজর সরিয়ে গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের দু-একজন সদস্যের কথা বলব। স্বল্প পরিসরে সবার কথা বলার সম্ভব নয় , তবে তা‌ই বলে যাঁরা বাকি পড়লেন তাঁরা কোন অংশে ছোট নন।

প্রথমে যাঁর কথা সশ্রদ্ধ মনে স্মরণ করব, তিনি একজন মহিলা, নাম সুশীলাসুন্দরী। একজোড়া বাঘ নিয়ে খেলা দেখাতেন, খালি হাতে খাঁচায় ঢুকতেন, হাতে একটা সামান্য লাঠি পর্যন্ত থাকতো না। খেলা দেখাতে দেখাতে বাঘের গালে চুমু খেতেন। বাঘের খেলা ছাড়াও ট্র্যাপিজ আর জিমন্যাস্টিকসের খেলাও দেখাতেন। এছাড়াও আরো একটা বিপজ্জনক খেলা দেখাতেন – তাঁকে মাটিতে সমাধি দেওয়া হত, তারপর একটা ঘোড়ার খেলা দেখানো হয়ে গেলে আবার মাটি খুঁড়ে তোলা হত।  একবার খেলা দেখানোর সময়ে প্রচণ্ড ঝড়ে সব লন্ডভণ্ড হয়ে যায়, যে যেদিকে পারে ছুটে পালায়, সুশীলা মাটিতে সমাধিস্ত ছিলেন, তাঁর কথা কারোর মনে ছিল না। দুর্যোগ মিটে যাবার পর খেয়াল হতে সবাই মিলে খোঁজাখুঁজি শুরু করতে দেখতে পেলেন সুশীলা একটা খুঁটির গায়ে হেলান দিয়ে শুয়ে কাঁপছেন, তার পা দুটো তখনো মাটির মধ্যে। কারোর সাহায্যের  অপেক্ষা না রেখে সুশীলা নিজের চেষ্টায় মাটি ঠেলে বেরিয়ে এসেছেন। একবার একটা নতুন বাঘ নিয়ে খেলা দেখানোর সময়ে বাঘ তাঁকে আক্রমণ করে, ওঠার ক্ষমতা ছিলো না, রক্তাক্ত শরীরে গড়িযে কোন মতে বাঘের নাগাল থেকে বেরিয়ে আসেন। সমস্ত শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিলো, কলকাতায় এনে মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা করানো হয়, সুস্থ হতে একবছর লেগেছিল। দুঃখের কথা এমন একজন মহিলা, যিনি একশো বছর আগেকার রক্ষণশীল সমাজের সমস্ত বেড়া ভেঙে আক্ষরিক অর্থে বাঘের সাথে খেলতেন তাঁর কথা আমরা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছি। আমার অক্ষমতা, আমি এনার ব্যাপরে আরো বেশি কিছু জানতে পারি নি।

গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের একজন নামকরা জিমন্যাস্ট ছিলেন শ্রী পান্নালাল বর্দ্ধন। প্রিয়নাথ বসুর শিষ্য এ‌ই জিমন্যাস্টের বিশেষত্ব ছিল হরাইজেন্টাল বারের খেলা। প্রিয়নাথ বসুর নিজের কথায়, ব্যাক ফ্লাইং এবং ডবল সমার্সল্টে এনার মত দক্ষ খেলোয়াড় তখনকার দিনে ইংরেজদের মধ্যেও বিরল ছিল। ১৯০০ সালে প্যারিস এক্সিবিশনে মতিলাল নেহরু যে কলাকুশলীদের টিম পাঠান তার মধ্যে ইনিও ছিলেন। এঁর আর একটি গুণ ছিলো, ইনি ভালো ক্ল্যারিওনেট বাজাতেন।

যাঁর কথা বলে শেষ করব, তাঁর নাম যাদুকর গণপতি চক্রবর্তী। ইনি সার্কাসে যোগ দেন  বিজ্ঞাপনের ছবি আঁকার জন্যে, কিন্তু অল্প সময়ে তাঁর প্রতিভা প্রিয়নাথ বসুর নজরে আসে। সাধরনতঃ ম্যাজিসিয়ানরা স্টেজের ওপর ম্যাজিক দেখান, দর্শকেরা থাকেন অনেক দূরে, স্টেজের সামনে। কিন্তু গণপতি সার্কাস রিঙের খোলা জায়গায়, যার তিনদিকে দর্শক আছে, সেখানে খেলা দেখাতেন। এনার একটি প্রসিদ্ধ খেলা ছিল ‘Illuision Box‘। গণপতিকে পিছ্মোড়া করে বেঁধে একটা থলেতে পুরে, থলের মুখ বেঁধে একটা কাঠের বাক্সে পুরে, বাক্সটাকে দড়ি দিয়ে আস্টেপৃষ্ঠে বাঁধা হত, আর তাতে একটা তালা লাগিয়ে চাবিটা কোনো দর্শককে দিয়ে দেওয়া হতো।  এরপর বাক্সের ওপর তবলা আর আর একটা ঘন্টা রেখে দিয়ে বাক্সের চারপাশে পর্দা ফেলে দেওয়া হতো। এবার দর্শকদের মধ্যে কেউ কোন তালের নাম বললে পর্দার পেছনে তবলা সে‌ই তালে বেজে উঠত। খেলার শেষ অংশে ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে গণপতি পর্দার বাইরে আসতেন, আর দর্শকদের কাছ থেকে নানা রকম জিনিস,  যেমন, চশমা, ভিজিটিং কার্ড, আংটি ইত্যাদি সংগ্রহ করে বাক্সটা তিনবার প্রদক্ষিণ করে পর্দা তুলে ভেতরে ঢুকে পড়তেন। সাথে সাথে পর্দা তুলে দেখা যেত গণপতি ভিতরে নে‌ই। বাক্স খুললে ভেতরে থলিতে পোরা গণপতিকে পাওয়া যেত, সঙ্গে দর্শকদের থেকে  সংগৃহীত জিনিষপত্র।  তাঁর আর একটা খেলা ছিলো 'Illusion Tree'। গনপতিকে হাতে হাতকড়া, পায়ে বেড়ি পরিয়ে শেকলে দিয়ে একটা ক্রুশের সঙ্গে বেঁধে সামনে একটা হারমনিয়াম রেখে চারদিকে পর্দা ফেলে দেওয়া হত। এবার এক-দুই-তিন বলা মাত্র পর্দার ভিতরে হারমোনিয়াম বেজে উঠত। বাজনার শেষে আবার এক-দুই-তিন বলার সাথে সাথে পর্দা তুলে দেখা যেত গণপতি শেকলে আগের মত‌ই বাঁধা রয়েছেন।

বাঙালীর সার্কাস বাঙালীর উদ্যমশীলতার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু কোন অজানা কারণে আমরা আজ এর কথা সম্পূর্ণরূপে ভুলে গেছি। শুধু তাই নয় দুঃখের কথা ‘সার্কাস’ কথাটা এখন বাঙলা ভাষায় একটা শ্লেষাত্মক রূপ পেয়েছে।

তথ্যসূত্র:
১- An Album of Indian Big Tops: (History of Indian Circus) by Sreedharan Champad.
২- Circus Day (1866 - 1944) by George.

No comments:

চীন ভ্রমণের ডায়েরী ।। বিনিতা সাহা

নতুন কোনো শহরে ঘুম থেকে জাগা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আনন্দের অনুভূতি আমার কাছে। কিন্তু রাতের ১২.৩০ এর ফ্লাইটের কথা শুনলেই আমার ভ্রমণের আ...