Friday, 24 May 2019

ইতিহাসে ও সাহিত্যে বাঙালির খাদ্যাভ্যাস এবং বাঙালির হেঁসেলে পর্তুগিজ প্রভাব ।। রানা চক্রবর্তী

● ছবিতে - বাঙালির পাতের চির নবীন শুক্তো।

■ পদ্মপুরাণে বেহুলার বিয়ের নিরামিষ খাবারের মধ্যে শুক্তোর উল্লেখ পাওয়া যায়। ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলেও বাইশ রকমের নিরামিষ পদের মধ্যে শুক্তুনিকে পাওয়া যায়।
মঙ্গলকাব্য ও বৈষ্ণবসাহিত্যে এই রান্নাটির বহুবার উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমানে 'শুক্তো' বলতে যেমন উচ্ছে, করলা, পল্‌তা, নিম, সিম, বেগুন প্রভৃতি সবজির তিক্ত ব্যঞ্জনকে বোঝায়, প্রাচীনকালে তা ছিল না। একালের শুক্তোকে সেকালে 'তিতো' বলা হত।
সেকালে 'শুক্তা' রান্না করা হত- বেগুন, কাঁচা কুমড়ো, কাঁচকলা, মোচা এই সবজিগুলি গুঁড়ো বা বাটা মসলা অথবা বেসনের সঙ্গে বেশ ভালো করে মেখে বা নেড়ে নিয়ে ঘন 'পিঠালি' মিশিয়ে রান্না করা হত। পরে হিং, জিরা ও মেথি দিয়ে ঘিয়ে সাঁতলিয়ে নামাতে হত।
কিন্তু 'চৈতন্যচরিতামৃতে' সুকুতা, শুকুতা বা সুক্তা বলতে একধরণের শুকনো পাতাকে বলা হয়েছে। এটি ছিল আম-নাশক। সম্ভবত এটি ছিল শুকনো তিতো পাটপাতা। রাঘব পণ্ডিত মহাপ্রভুর জন্য নীলাচলে যেসব জিনিস নিয়ে গিয়েছিলেন তার মধ্যে এই দ্রব্যটিও ছিল।
আবার 'সুকুতা' বলতে সেই সময় শুকনো শাকের ব্যঞ্জনকেও বোঝাত।



বাঙালির চিরকালের পরিচয় ‘ভেতো বাঙালি’। অর্থাৎ যাদের প্রধান খাদ্য হলো ভাত। প্রাচীনকালে গরিব বাঙালির মুখে শোনা যেত দুঃখের কাঁদুনী, ‘হাড়িত ভাত নাহি নিতি আবেশী’ (চর্যাপদ)। মানে ‘ঘরে ভাত নেই তবু অতিথির আসা যাওয়ার কমতি নেই’। তবে ধনী-নির্ধন সব বাঙালির প্রিয় খাদ্য গরম ভাতে গাওয়া ঘি। যারা দিন আনে দিন খায়, তাঁদের চরম প্রাপ্তি হলো — পান্তা ভাতে বাইগন পোড়া। পণ্ডিতরা বলেন, প্রকৃত বাঙালির মনমতো খাবার ছিল কলাপাতায় ‘ওগ্গারা ভত্তা গাইক ঘিত্তা’, অর্থাৎ গাওয়া ঘি আর ফেনা ভাত। দুধ আর সরু চাল মিশিয়ে পায়েস বড়মানুষের প্রিয় খাদ্য।

‘নৈষধী চরিত’ - এর রচয়িতা শ্রী হর্ষ দ্বাদশ শতকের কবি (অনুবাদক ড. করুণাসিন্ধু দাস, কলকাতা, ১৯৮২)। এই কাব্যকথায় খাদ্যের বৈচিত্র্য এবং রন্ধনশিল্পীদের নৈপুণ্যের অনেক তথ্য রয়েছে, তবে শ্রী হর্ষের দেয়া ভাতের বর্ণনাটিও উপভোগ করার মতো — লোকেরা সাগ্রহে ভাত খেলেন, তাতে ধোঁয়া উঠছিল, ভাত মোটেই ভাঙ্গা নয়, গোটা, পরস্পর আলাদা, কোমল ভাব হারায়নি, সুস্বাদু, সাদা, সরু, সুগন্ধযুক্ত। এরকম ভাত রাঁধাতে এলেম দরকার, যে ভাত রান্না এখনও বাঙালি গৃহিণীদের নৈপুণ্যের পরীক্ষা স্বরূপ এবং এই পরীক্ষায় সফল হলে ভোজনরসিকের বাহবা মেলে পরীক্ষার্থীর। শ্রী হর্ষের উপমা ক্ষমতা প্রশংসনীয়। বাঙালি জেনে খুশি হবেন যে, তার লেখায় তাদের আরেকটি প্রিয় খাবার দইকে বলা হয়েছে, ‘অমৃতের হ্রদ থেকে তুলে আনা পাঁকের মতো...।’

পর্তুগিজ এক পর্যটক তার ভ্রমণকাহিনীতে লিখেছেন, ‘ইউরোপের তুলনায় বাংলার ভাত সুস্বাদু। বিশেষত এর সুঘ্রাণ। রান্নার পর এর নিখুঁত সূক্ষ্মতা আর অমায়িক সুবাস চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে, মনে হয় কে যেন বাতাসে কয়েক ধরনের সুগন্ধি ছড়িয়ে দিয়েছে।’

আবার আগের প্রসঙ্গে ফিরে যাই, ভাত খাওয়া হতো কী দিয়ে? খাওয়া হতো শাক এবং অন্যান্য ব্যঞ্জন দিয়ে। দরিদ্র ও পল্লী অঞ্চলের মানুষের প্রধান খাদ্যই ছিল শাক-ভাত। নালিতা বা পাটশাকের উল্লেখ আছে ‘প্রাকৃত পৈঙ্গল’-এ। মইলি বা মৌরলা মাছ বাঙালির প্রিয় খাদ্য।

তবে শাক ছাড়াও অন্য ব্যঞ্জনের কমতি ছিল না মোটেই, বিশেষ করে বিয়েবাড়ির খাদ্যে। এত রকম তরকারি দেয়া হতো যে, সবগুলো চেখে দেখা সম্ভব হতো না। এটা নাকি সে যুগের কন্যাপক্ষের চালাকি ছিল। তরকারি খেয়ে পেট ভরিয়ে ফেললে মাছ-মাংস কম খাওয়া হবে। কী ধরনের তরকারি ব্যবহার করা হতো তার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যাবে বিজয় গুপ্তের ‘মনসামঙ্গল’ অথবা অন্যান্য মঙ্গলকাব্যে।

পদ্মপুরাণে বেহুলার বিয়ের নিরামিষ খাবারের মধ্যে শুক্তোর উল্লেখ পাওয়া যায়। ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলেও বাইশ রকমের নিরামিষ পদের মধ্যে শুক্তুনিকে পাওয়া যায়।
মঙ্গলকাব্য ও বৈষ্ণবসাহিত্যে এই রান্নাটির বহুবার উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমানে 'শুক্তো' বলতে যেমন উচ্ছে, করলা, পল্‌তা, নিম, সিম, বেগুন প্রভৃতি সবজির তিক্ত ব্যঞ্জনকে বোঝায়, প্রাচীনকালে তা ছিল না। একালের শুক্তোকে সেকালে 'তিতো' বলা হত।
সেকালে 'শুক্তা' রান্না করা হত- বেগুন, কাঁচা কুমড়ো, কাঁচকলা, মোচা এই সবজিগুলি গুঁড়ো বা বাটা মসলা অথবা বেসমের সঙ্গে বেশ ভালো করে মেখে বা নেড়ে নিয়ে ঘন 'পিঠালি' মিশিয়ে রান্না করা হত। পরে হিং, জিরা ও মেথি দিয়ে ঘিয়ে সাঁতলিয়ে নামাতে হত।
কিন্তু 'চৈতন্যচরিতামৃতে' সুকুতা, শুকুতা বা সুক্তা বলতে একধরণের শুকনো পাতাকে বলা হয়েছে। এটি ছিল আম-নাশক। সম্ভবত এটি ছিল শুকনো তিতো পাটপাতা। রাঘব পণ্ডিত মহাপ্রভুর জন্য নীলাচলে যেসব জিনিস নিয়ে গিয়েছিলেন তার মধ্যে এই দ্রব্যটিও ছিল।
আবার 'সুকুতা' বলতে সেই সময় শুকনো শাকের ব্যঞ্জনকেও বোঝাত।

বাঙালির আনুষ্ঠানিক ভোজে নাকি খাদ্য অপচয়ের চূড়ান্ত হতো — এমন কথা লিখে গিয়েছেন চীনা পরিব্রাজক ইিসং। তার দেখা ব্যঞ্জনের তালিকায় রয়েছে দই আর রাই সরষে দিয়ে রান্না করা পদ। যা খেয়ে অতিথিদের মাথা ঝাঁকাতে ও মাথা চাপড়াতে হতো তীব্র ঝালের আক্রমণে।

প্রাচীন বাঙালির প্রিয় খাদ্য ছিল হরিণের মাংস। সম্ভবত এজন্যই চর্যাপদে লেখা হয়েছে — 'আপনা মাংসে হরিণা বৈরী'। হরিণের মাংস সুস্বাদু বলে সবাই বনে এসে আগে হরিণ মারত।

বাঙালির বিয়ের ভোজে হরিণের মাংস অনিবার্যভাবে অতিথিদের পাতে পরিবেশিত হতো। সঙ্গে থাকত ছাগ ও পাখির মাংস। বাঙালিদের মধ্যে আর্যদের মতো গোমাংস খাওয়ার চল ছিল না। তাই বিকল্প হিসেবে রাখা হতো মাংসের স্বাদযুক্ত সুস্বাদু ব্যঞ্জন, কচি কাঁঠালকে এখনও হিন্দু সমাজে বলা হয় ‘গাছ পাঁঠা’। শেষ পাতে মিষ্টি আর দই। পায়েস বা পরমান্ন খাওয়ার তাগিদ থাকত শুধু বড়লোকদের। আর আহারের পর মসলাযুক্ত পানের খিলি।

ভাত ও মাছ চীন, জাপান, বার্মা, পূর্ব-দক্ষিণ এশিয়ার দেশ-দীপপুঞ্জ ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশে চিরকালই প্রধান খাদ্য। মাংসের প্রতি বিরাগ বাঙালির কোনোদিনই ছিল না। কালকেতুর শিকার করা পশুমাংস ব্যাধ রমণী ফুল্লরা বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাত। কালে কালে উত্তর ভারতে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবে মাংস আহার নিষিদ্ধ হয়।

আর্য-ব্রাহ্মণ ভারত ক্রমেই নিরামিষ আহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে এই প্রবণতা আংশিক কার্যকর হয়েছিল। বহুদিন আমিষ খাওয়ার অভ্যাস থাকায় বাঙালির নিরামিষ খাবারে মুখ দিতে বেশ সময় লেগেছিল।

এই গেল ডাল-ভাতের কথা। এবার মৎস্য ভোজের দিকে মন দেওয়া যাক। কথায় বলে, মাছের নামে গাছও হা করে। বাঙালি সাধারণত স্বল্প কথায় খাওয়ার উল্লেখ করে তখন বলে ‘ডাল-ভাত’ নাহয় ‘দুধ-ভাত’ কিংবা ‘মাছ-ভাত’। মাছ-ভাত সম্পর্কে মঙ্গলকাব্যগুলোতে রয়েছে মাছ ও মাছ রান্নার প্রসঙ্গের ছড়াছড়ি। আর মাছের ব্যাপারে বরাবরই পূর্ববাংলা বিখ্যাত। কারণ এখানে ছিল মাছের রাজত্ব। কে না জানেন নদী-নালা, বিল-ঝিল, হাওড়-বাওড়ের সোনালি সুতায় বোনা পূর্ববঙ্গ যেন এক মছলী কাঁথার মাঠ। বিজয় গুপ্ত কিংবা দ্বিজ বংশীদাসের (দুজনই পূর্ব বাংলার মানুষ) বর্ণনা থেকে সামান্য উদ্ধৃতি দিলে স্পষ্ট হবে পূর্ব বাংলার মাছ ও মাছের রন্ধনবৈচিত্র্যের ব্যাপ্তি —

‘মনসামঙ্গল’-এ বরিশালের বিজয়গুপ্ত লিখেছেন,

"রান্ধি নিরামিষ ব্যঞ্জন হলো হরষিত।
মেস্যর ব্যঞ্জন রান্ধে হয়ে সচকিত
মৎস্য মাংস কুটিয়া থুইল ভাগ ভাগ।

রোহিত মৎস্য দিয়া রান্ধে কলকাতার আগ
মাগুর মৎস্য দিয়া রান্ধে গিমা গাচ গাচ
ঝাঁঝ কটু তৈলে রান্ধে খরসুল মাছ
ভিতরে মরিচ-গুঁড়া বাহিরে জড়ায় সূত।

তৈলে পাক করি রান্ধে চিঙড়ির মাথা
ভাজিল রোহিত আর চিতলের কোল।
কৈ মৎস্য দিয়া রান্ধে মরিচের ঝোল
ডুম ডুম করিয়া ছেঁচিয়া দিল টই।

ছাইল খসাইয়া রান্ধে বাইন মেস্যর কৈ...
বারমাসি বেগুনেতে শৌল-মেস্যর মাথা।..." ইত্যাদি।

ময়মনসিংহের দ্বিজ বংশীদাস তাঁর ‘মনসামঙ্গল’-এ লিখেছেন,

"নিরামিষ রান্ধে সব ঘৃতে সম্ভারিয়া।
মেস্যর ব্যঞ্জন রান্ধে তৈল পাক দিয়া

বড় বড় কই মৎস্য, ঘন ঘন আঞ্জি
জিরা লঙ্গ মাখিয়া তুলিল তৈলে ভাজি।
কাতলের কোল ভাজে, মাগুরের চাকি।

চিতলের কোল ভাজে রসবাস মাখি
ইলিশ তলিত করে, বাচা ও ভাঙ্গনা।

শউলের খণ্ড ভাজে আর শউল পোনা
বড় বড় ইচা মৎস্য করিল তলিত।

রিঠা পুঠা ভাজিলেক তৈলের সহিত
বেত আগ পলিয়া চুঁচরা মৎস্য দিয়া।

শক্ত ব্যঞ্জন রান্ধে আদা বাটিয়া
পাবদা মৎস্য দিয়া রান্ধে নালিতার ঝোল।

পুরান কুমড়া দিয়া রোহিতের কোল..." ইত্যাদি।

এবার পশ্চিমবঙ্গের প্রসঙ্গে আসি। এখানকার মানুষও সমান মৎস্যপ্রেমী, যদিও প্রাপ্তিযোগে হেরফের অবশ্যই রয়েছে। ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’-এ (রচনাকাল: ১৭৫২ - ৫৩ খ্ৰীস্টাব্দ) চোখে পড়ে ভবানন্দ মজুমদারের স্ত্রী পদ্মমুখী ব্রাহ্মণ ভোজনের জন্য রাঁধতে বসেছেন —

"নিরামিষ তেইশ রাঁধিলা অনায়াসে
আরম্ভিলা বিবিধ রন্ধন মৎস্য মাসে।

কাতলা ভেটুক কই কাল ভাজা কে
শিক-পোড়া ঝুরি কাঁঠালের বীজে ঝোল।

ঝাল ঝোল ভাজা রান্ধে চিতল ফলুই
কই মাগুরের ঝোল ভিন্ন ভাজে কই।

ময়া সোনা খড়কীর ঝোল ভাজা সার
চিঙ্গড়ির ঝোল ভাজা অমৃতের তার।

কণ্ঠা দিয়া রান্ধে কই কাতলার মুড়া
তিত দিয়া পচা মাছ রান্ধিলেক গুড়া।

আম দিয়া ষোল মাসে ঝোল চড়চড়ি
আড়ি রান্ধে আদারসে দিয়া ফুলবড়ি।

রুই কাতলার তৈলে রান্ধে তৈল শাক
মাছের ডিমের বড়া মৃতে দেয় ডাক।

বাচার করিল ঝোল খয়রার ভাজা
অমৃত অধিক বলে অমৃতের রাজা

সুমাছ বাছের বাছ আর মাস যত
ঝাল ঝোল চড়চড়ি ভাজা কৈল কত।

বড়া কিছু সিদ্ধ কিছু কাছিমের ডিম
গঙ্গাফল তার নাম অমৃত অসীম।’ ... ইত্যাদি।

‘চৈতন্য চর্বিতামৃত’-এর লেখক কৃষ্ণদাস কবিরাজের বিবরণ অনুসারে শ্রীক্ষেত্রে সার্বভৌম ভট্টাচার্য্যের বাড়িতে চৈতন্যদেব কেমন নিরামিষ রান্না অন্নের আহার করেছিলেন সংক্ষেপে তা শোনা যাক —

"বর্তিসা কলার এক আঙ্গেটিয়া পাত,
ঊণ্ডারিত তিন মান তণ্ডুলের ভাত।

পীত সুগন্ধি ঘৃতে অন্ন সিক্ত কৈল,
চারিদিকে পাতে ঘৃত বাহিয়া চলিল।

কেয়া পাতের খোলা ডোঙ্গা সারি সারি,
চারিদিকে ধরিয়াছে নানা ব্যঞ্জন ভরি।

দশবিধ শাক নিম্ব তিক্ত শুক্তার ঝোল,
মরিচের ঝালে ছেড়াবড়ি বড়া ঘোল।

দুগ্ধতুম্বী, দুগ্ধ কুষ্মাণ্ড, বেশারী নাফরা,
মোচা ঘণ্ট, মোচা ভাজা, বিবিধ শাকেরা।

ফুল বড়ি ফল মূলে বিবিধ প্রকার,
বৃদ্ধ কুষ্মাণ্ড বড়ির ব্যঞ্জন অপার।

নব নিম্ব পত্র সহ ভ্রষ্ট বার্তকি,
ফুল বড়ি, পটোল ভাজা কুষ্মাণ্ড মানচাকী।" ... ইত্যাদি।

একসময় বাঙালির কাছে খিচুড়ি ও ইলিশ ছিল অভিন্ন। এখন সাধারণ বাঙালির সে যুগ আর নেই। বাঙালির ট্যাকের করুণ দশা এতদিনে জানা হয়ে গেছে পদ্মার ইলিশকুলের, তাই তারা উড়ে চলেছে নতুন অজানা সব ঠিকানায়। কিন্তু অভাগা বাঙালিকে একেবারে ছেড়ে যায়নি। পুষ্টিকর বলকর খিচুড়ির সহচর জোগাতে রন্ধন পটিয়সী বাঙালি বধূরা যেসব পদ আবিষ্কার করেছেন, তার সংখ্যা অনেক। ইলিশ সবসময় না জুটলেও কুছ পরোয়া নেহি। সাধ্যের মধ্যে রয়েছে বেগুনভাজা, বেসন দিয়ে কুমড়া বা বেগুন অথবা বাঙালি মধ্যবিত্তের চির সখা ডিমের ওমলেট—যাকে আমরা ছেলেবেলায় বলতে শুনেছি মামলেট। অবাঙালিরা নাকি খিচুড়ির সঙ্গে পাপড়, আচার বা দই খায়। বাঙালিরা নিরুপায় হয়ে পাপড়ে হাত দিলেও খিচুড়ি সঙ্গে দই-আচার কদাপি নয় — নৈব নৈব চ।

ভোজন রসিক বাঙালি জেনে খুশি হবে সম্রাট জাহাঙ্গীরের বিত্তবৈভবের কোনো কমতি না থাকলেও তার প্রিয় খাবার ছিল মাংস বা মাছ নয়, গুজরাটি খিচুড়ি। তাঁর পিতা সম্রাট আকবরেরও  পোলাও ছেড়ে খিচুড়ির স্বাদ গ্রহণে অরুচি ছিল না। তবে সারা উপমহাদেশ জানে, বাঙালির অন্যতম প্রিয় খাদ্য হলো খিচুড়ি। পৃথিবীর যেখানেই বাঙালি বসতি রয়েছে, সেখানে খিচুড়ি অবশ্যই মিলবে। এক মুঠো চাল, এক মুঠো ডাল মিশিয়ে নিয়ে হাঁড়ি চড়ালেই হয়ে গেল খিচুড়ি। তীর্থ যাত্রীদের জন্য সবচেয়ে কম ঝামেলার খাবার। প্রজ্ঞা সুন্দরী দেবীর বিখ্যাত রান্নার বইয়ের সেই বিখ্যাত পঙক্তির দিকে আর একবার তাকানো যাক,

"সৈন্যের গুণে যেমন সেনাপতির খ্যাতি বর্ধিত হয়, সেই রূপ আনুষাঙ্গিক খাদ্যের গুণে প্রধান খাদ্য সমাধিক রুচিকর হইয়া ওঠে। খিচুড়ির এই আনুষাঙ্গিক খাদ্যের মধ্যে তখনও প্রধান হলো ইলিশ। আরও নির্দিষ্ট করে বললে ইলিশ ভাজা। গলা খিচুড়ি আর ভুনা খিচুড়ি উভয়ই বাঙালির অন্যতম প্রিয়।"

আর বর্ষাকাল এলেই বাঙালি মাত্রই একটি নির্ভেজাল খিচুড়ি-প্রেমিক হয়ে ওঠেন — সেই খিচুড়ি আমিষ বা নিরামিষ যাই হোক না কেন। ‘মনসামঙ্গল’-এ আছে ডাবের জলে দিয়ে রান্না করা মুগের ডালের খিচুড়ি খেতে চেয়েছিলেন পার্বতীর কাছে স্বয়ং শিব। কৈলাসে তো নারকেল গাছ নেই যে ডাব পাওয়া যাবে। ‘মনসামঙ্গল’-এর লেখক বিজয় গুপ্ত জন্মেছেন বরিশালে, যেখানে সারা বছরই অঢেল নারকেল ও ডাব সুলভ ও সহজলভ্য। ফলে বিজয় গুপ্তের পক্ষে ডাবের জল দিয়ে খিচুড়ি রান্নার রেসিপি উল্লেখ খুব অন্যায্য নয়।

সংস্কৃতে খিচুড়ির আর এক নাম কৃশর; অর্থাৎ তিল, মুগ ডাল ও চালে ঘৃতপক্ক অন্ন।

চাল ও ডালের মিশ্রণে এক ধরনের খাবার তৈরির কথা ভারতের প্রাচীন লেখায় পাওয়া যায়। খিচুড়িকে ব্যাখ্যা করতে প্রধানত দু’টি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কৃসারান্না ও খিচ্ছা। ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ অনুযায়ী ভারতে চাল ও ডাল এক সঙ্গে খাওয়ার প্রচলন ছিল। যদিও, চাল, ডাল আলাদাও খাওয়া হত সেই সময়। চাণক্যের লেখাতেও মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের আমলে চাল, ডালের মিশ্রণে খিচুড়ি খাওয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়। সুষম আহারের কথা প্রসঙ্গে চাণক্য লিখেছেন, এক প্রস্থ চাল (৬০০ গ্রাম মতো) ও সিকি প্রস্থ ডাল, ১/৬২ প্রস্থ নুন ও ১/১৬ প্রস্থ ঘি তৈরি খাবারই হল সুষম আহার। গ্রিক পরিব্রাজক মেগাস্থিনিসের লেখাতেও চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের রাজসভার হেঁশেলে চাল, ডাল এক সঙ্গে মিশিয়ে রান্নার উল্লেখ পাওয়া যায়।

পঞ্চদশ শতকে রুশ পরিব্রাজক নিকিতিনের লেখাতে দক্ষিণ ভারতে চাল-ডাল মিশিয়ে খাওয়ার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। সপ্তদশ শতকে ফরাসি পরিব্রাজক তাভেরনিয়ের লিখেছেন, সে সময় ভারতের প্রায় সব বাড়িতেই ‘খিচুড়ি’ খাওয়ার রেওয়াজ ছিল।

মুঘল হেঁশেলেও বিশেষ স্থান ছিল খিচুড়ির। বাবর বা হুমায়ুনের সময়ে খিচুড়ির উল্লেখ পাওয়া না গেলেও আকবরের সময় থেকে মুঘল হেঁশেলে খিচুড়ির উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রসঙ্গত, আকবরই ছিলেন প্রথম মুঘল বাদশা যিনি জন্মসূত্রে ভারতীয়। রাজকীয় হেঁশেলে বিভিন্ন প্রকার খিচু়ড়ি রান্নার কথা লিখেছেন আকবরের মন্ত্রী ও ঐতিহাসিক আবুল ফজল। আইন-ই-আকবরিতে বিভিন্ন প্রকার খিচুড়ির রেসিপিও পাওয়া যায়। এমনকী, ‘বীরবলের খিচুড়ি’ নামে একটি মজার গল্পেরও উল্লেখ পাওয়া যায় ওই বইয়ে।

মুঘল হেঁশেলে জাহাঙ্গিরের প্রিয় বিশেষ ধরনের খিচু়ড়ি তৈরি করা হত বলেও জানা যায়। পেস্তা, কিসমিস দিয়ে তৈরি সেই খিচুড়িকে জাহাঙ্গির আদর করে নাম দিয়েছিলেন ‘লাজিজান’। আবার আওরঙ্গজেবের প্রিয় ‘আলমগিরি খিচড়ি’র কথাও জানা যায়। যেখানে নাকি চাল, ডালের সঙ্গে মেশানো হত বিভিন্ন প্রকার মাছ, ডিম।

রাজকীয় খাবার হিসেবে হায়দরাবাদের নিজামের হেঁশেলেও জনপ্রিয় হয়েছিল খিচুড়ি। সেই খিচুড়ির পরতে পরতে খোঁজ মিলত সুস্বাদু মাংসের কিমার। ১৯ শতকে ভারতের এই লোভনীয় খাবার ইংল্যান্ডের দরবারে নিয়ে গিয়েছিলেন ব্রিটিশরা। জনপ্রিয় ইংলিশ ব্রেকফাস্ট হয়ে ওঠে ‘কেদেগিরি।'

ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’-এ দেখি মোগলাই খানা বাঙালির বিশেষ করে হিন্দু বাঙালির ঘরেও ঢুকে পড়েছে —

"কচি ছাগ মৃগ মাংসে ঝোল ঝাল রসা
কালিয়া দোল্মা বাঘা সেকিচ সমসা
অন্য মাংস শিক ভাজা কাবাব কবিয়া
রান্ধিলেন মুড়া আগে মসলা পুরিলা"।
(কালী প্রসন্ন ৫৯)

বাংলার আকাশে বাতাসে দিল্লি, আগ্রা, লখনৌর পাকশালার সৌরভ। এ হাওয়ার স্থানীয় উৎস মুর্শিদাবাদ, ঢাকা, কৃষ্ণনগর ও বর্ধমানের রাজবাড়ি এবং কলির শহর কলকাতায় গড়ে ওঠা দেদার হোটেল, কফি হাউস আর রেস্তোরাঁ। সেখানে যেমন ইউরোপীয় খাদ্য মেলে, তেমনি মেলে দেশীয় অর্থাৎ মোঘলাই নানা ডিস।

একটু পরে বঙ্কিমচন্দ্র থেকে জানা গেল ফাউল কারিও ঢুকে পড়েছে হিন্দুর হোটেলে। নদের ফটিক চাঁদ, এখন আর মালপো ভোগে তেমন আস্থা নেই তার, ফাউল কারি ঠিকমতো তরিবত হলো কি না এ নিয়ে তাঁর বেজায় দুশ্চিন্তা। কিন্তু বঙ্কিমের খাদ্য রুচির একটু পরিবর্তন পাওয়া যাবে ‘আনন্দমঠ’-এ।

"আহার্য্য বস্তু তার উপকরণের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে পরিবেশনকারীর স্নেহরস। জীবানন্দ ক্ষুধার্ত — নিমি তাঁকে খেতে দিচ্ছে — নিমি পিঁড়ি পাতিয়া মল্লিকা ফুলের মতো পরিষ্কার অন্ন, কাঁচা কলাইয়ের ডাল, জঙ্গুলে ডুমুরের ডালনা, পুকুরের রুই মাছের ঝোল এবং দুগ্ধ আনিয়া জীবানন্দকে খাইতে দিল।"

যবে দেখা দেয় সেবা মার্ধুযে ছোঁয়া, তখন সে হয় কি অনির্বচনীয়! পরিবেশনকারিণী ও পরিবেশিত ভোজ্যের অপরূপ সংযোগের বিবরণ রয়েছে বাংলা সাহিত্যে। শরৎচন্দ্র এ ব্যাপারে নমস্য লেখক। আনন্দ আর শ্রীকান্তকে রাজলক্ষ্মীর খাওয়ানোর বিবরণ একবার নয়, বারবার পাঠ্য। এর পরেই নাম করতে হয় তারাশঙ্কর, বনফুল ও বিভূতিভূষণের।

রবীন্দ্রনাথকে বাদ দেয়ার কোনো উপায় তিনি আমাদের জন্য ছেড়ে যাননি, ‘নৌকাডুবি’ উপন্যাসের কমলা-রমেশের স্টিমার যাত্রার বিচিত্র সরসতা পাঠকের জন্য ভুলবার নয়। কমলার রন্ধন নৈপুণ্য এবং রমেশের সংগ্রহ ক্ষমতা মিলে সে এক রসঘন পরিস্থিতি। সজনে ডাটা, লাউডগা, বেগুন, কুমড়োফুল, রুইমাছ — সব মিলিয়ে সে এক কাণ্ড! ‘নৌকাডুবি’ উপন্যাসের সম্পর্ক-জটিলতার স্টিমার যাত্রার এই বর্ণনা ক্ষুধা-উদ্রেককারী এক ঝলক নদীর হাওয়া যেন।

তবে দ্রুত রুচি পালটে যাচ্ছে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। উচ্চবর্গের পরিবারগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে পোশাক-আশাক, সাহিত্য, চিন্তাচর্চায় এমনকি খাদ্যরুচিতে পর্যন্ত রয়েছে মোঘল প্রভাব। ১৮৩৪ সাল পর্যন্ত ফারসি ছিল আদালতের ভাষা। সেটা ইউলিয়াম বেন্টিংকের আমল। সুতরাং ফারসি ছিল বিদ্যালয়ের ভাষা। এমনকি বাঙালি মেয়ের ব্রত কথায় দেখা গেছে। প্রচণ্ড আগ্রহে তাঁর প্রার্থনা,

"আরশি
আরশি
আমার স্বামী যেন পড়ে ফারসি।"

ভারতচন্দ্র তো কালিয়া কোফতা, শিক কাবাবের কথা আগেই বলেছেন তার ‘অন্নদামঙ্গল’-এ। কালীপ্রসন্ন বন্দোপাধ্যায় ‘মধ্যযুগের বাঙলা’য় তার এক বন্ধুকে উদ্ধৃত করছেন। পরিস্থিতি দেখে তিনি মন্তব্য করতে বাধ্য হয়েছেন —

"কোর্মা, কোপ্তা, কারি, কাটলেট প্রভৃতি কাবাবাদি ব্যঞ্জনের প্রকোপে বুঝিবা ঝাল ঝোল দালনা চড়চড়ি আর বাঙালি বাবুর মুখে রুচিবে না।"

কথাটা অতিশয়োক্তির মতো শোনালেও উনিশ শতকের শহরগুলোর উচ্চবিত্তের পরিবারে অন্তত পরিস্থিতি অনেকটা এরকমই ছিল। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ, গোয়ালন্দ, বরিশাল, খুলনায় স্টিমার সার্ভিস চালু হলে সেই স্টিমারে প্রথম শ্রেণির ডাইনিং রুমে ইংরেজি খাবার; বিশেষ করে পুডিং বা ক্যারামেল কাস্টার্ড আস্বাদন করার সুযোগ অনেক বাঙালি পরিবারের একাধিক বার হয়েছিল। এই যোগাযোগব্যবস্থার ফলে অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলেও কিছু মোঘলাই ও ইংরেজি ডিসের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল বললে ভুল বলা হবে না। রাজধানীর সম্ভ্রান্ত বাঙালিরা হিন্দু-মুসলিম উভয়েই বাড়িতে সাহেব-মেমদের আপ্যায়ন করতে শুরু করেন। সাহেবি খানা আনা হয় বড় বড় হোটেল থেকে। ইয়ং বেঙ্গলরাও পিছিয়ে রইলেন না, তাঁরাও সোৎসাহে হানা দিতে লাগলেন সাহেবি হোটেলে। বাংলায় দেখা দিল ভিনদেশি খানার জন্য কাড়াকাড়ি। ভিনদেশি বলতে একদিকে ইংরেজি খানা, অন্যদিকে মোঘলাই তথা উত্তর ভারতীয়। শেষ পর্যন্ত মনে হয় ইংরেজি বনাম মোঘলাইয়ের লড়াইয়ে বিজয়ী হয়েছিল মোঘলাই খানা। লখনৌর বাদশাহ কলকাতার মেটিয়া বুরুজে নির্বাসিত হলে তিনি প্রায় পুরো লখনৌ শহরটি সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। ফলে সংগীত, নৃত্যের প্রসার হলো দ্রুত, সঙ্গে লখনৌর বিখ্যাত বিরিয়ানি, পান, পোশাক ও নানা বিলাসিতা কলকাতাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। বাঙালি খাদ্য রুচিতেও এর প্রভাব পড়ল বিশেষ করে কলকাতা, ঢাকার মুসলিম পরিবারে। এখনও সেই গৌরব অস্তমিত হয়নি। ঢাকার কাচ্চি বিরিয়ানি হলো সেই প্রভাবের ফল, যা আজ মরক্কো-জর্দানের রাজপরিবারের ভোজে সমাদৃত। বাঙাল কার্টুন পত্রিকা ‘বসন্তক’-এর আমুদে মন্তব্য,

"হোটেল হইতে খানা আনিয়া ভবনে
খাওয়াই প্রাণের বন্ধুগণে সযতনে
কী জানে রাঁধিতে যত দেশি রাঁধুনিতে
জানে থোড় কচু ঘেচু কেবল রাঁধিতে।"

মুসলিমদের প্রভাবের ফলে মধ্যযুগের বাঙালি সমাজের কিছু অংশে নতুন ধরনের খাবারের প্রচলন হয়েছিল। বহিরাগত সুলতান, নবাব, আমির-ওমরাহরা উত্তর ভারত, ইরান এবং পশ্চিম মধ্য এশিয়া থেকে ভিন্ন ধরনের খাদ্যের ঐতিহ্য ও উপকরণ নিয়ে এসেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ বলা —লুচি-পরোটা শব্দদুটির প্রথমটি প্রাচীন ভারতীয় খাবার — কড়াইয়ে ভাজতে হয় —পরোটা মুসলিম প্রভাবের ফসল, ভাজা হয় তাওয়ায়। তাওয়া ও তন্দুর—দুটি উপকরণই মুসলিমদের বাংলাদেশে আগমনের ফসল। এসব মুসলিম প্রভাবিত খাবারের কোনো কোনোটাই দেশীয় গরিব মুসলিমদের মধ্যে প্রথমে ছড়িয়ে পড়ে বলে গবেষক গোলাম মুরশিদ অনুমান করেন। এছাড়া যে ধনী হিন্দুরা ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন অথবা কাজকর্মসূত্রে মুসলিম শাসকদের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এসেছিলেন, তাঁরাও ধীরে ধীরে বহিরাগত শাসকদের খাবারের কিছু কিছু অংশ গ্রহণ করেছিলেন। তবে এর জন্য যে কয়েক শতাব্দী লেগেছিল — এমনটি মনে করা স্বাভাবিক, কারণ ভারতচন্দ্রের আগে মোঘলাই খাবারের উল্লেখ কোনো অমুসলিম কবির লেখায় পাওয়া যায় না। অর্থাৎ ভারতচন্দ্রের সময়ের আগে পর্যন্ত মুসলিম খাবার হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বাঙালি সমাজে প্রবেশ করেনি বলেই অনুমেয়।

মুসলিমরা আরও একটি বস্তু সঙ্গে এনেছিলেন — যা থেকে তাঁরা পনির তৈরি করতেন। দই, ঘি, ছানা, মিষ্টি হিন্দু ময়রারা তৈরি করলেও বাংলাদেশে তখন পনির শুধুমাত্র মুসলিম কারিগররাই তৈরি করতেন। তখনও এটি মুসলিমদের একচেটিয়া।

মুসলিম শাসকরা তরমুজ-খরমুজ প্রভৃতি ফলও নিয়ে এসেছিলেন। কিছু নতুন খাবারের প্রচলন পর্তুগিজদের সঙ্গেও হয়েছিল। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো গোল আলু। মধ্যযুগের বাঙালির ভাতের থালা নিরালু — অর্থাৎ আলুহীন। পর্তুগিজরা ইউরোপ থেকে আলু এদেশে নিয়ে আসে। কলকাতা-ঢাকা-মুর্শিদাবাদের কথা যেমনই হোক, বাংলার গ্রামাঞ্চলে আলু পৌঁছেছিল অনেক পরে। বিভূতিভূষণ ‘ইছামতী’ উপন্যাসে আলু পান কলকাতায়, ওখান থেকে তাঁর গ্রামে আলু নিয়ে এলে হুড়ুস্থূল পড়ে গিয়েছিল।

আলুর চেয়েও আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ বা অভূতপূর্ব উপকরণ পর্তুগিজরা আমদানি করেন, তা হলো মরিচ আর তামাক। যা বাংলাদেশের লোক লুফে নিয়েছিল। এবং দ্রুত তা সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি — তিনটি সম্ভবত পর্তুগিজরা এদেশে এনেছিল। কারণ পর্তুগিজ ভাষায় এদের বলা হয় কোবি — যা থেকে বাংলা কপি, ফুলকপি ইত্যাদি। কথায় বলে একজন কী খায়, তা থেকে বলে দেয়া যায় সে কী রকম মানুষ। বুদ্ধদেব বসু তাঁর বাংলা খাবার নিয়ে লিখতে গিয়ে বলেছেন,

"রবীন্দ্রনাথের ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসে মধুসূদন ধনাঢ্য ব্যক্তি রুপার থালায় খেলেও তাঁর দৈনন্দিন খাদ্য হলো কলাইয়ের ডাল, কাটা চচ্চড়ি, তেঁতুলের অম্বল এবং মস্তবড় বাটি ভরতি চিনি মেশানো দুধ। এইভাবে রবীন্দ্রনাথ বুঝিয়ে দিলেন বেচারা কুমুদিনী তার বায়বীয় ধরন-ধারণ নিয়ে কী রকম শক্ত লোকের পাল্লায় পড়েছে।"

বাঙালির প্রধান খাবার বলতে পাতে ধোঁয়া ওঠা সাদা ভাত। সেই খাবারের গুণগানই করেছিলেন পর্তুগিজ পর্যটকরা। কানাডিয়ান লেখিকা ও ভারতীয় খাবার বিশেষজ্ঞ কলিন টেইলর সেন তার ‘বাঙালি রান্নায় পর্তুগিজ প্রভাব’ নামক প্রবন্ধে বলেছেন বাঙালির খাদ্যাভ্যাস নিয়ে। পাশাপাশি ১৬ শতকে ভিনদেশী বণিকদের হাত ধরে এ অঞ্চলে প্রবেশ করা বিভিন্ন ধরনের ফলমূল-মসলা কীভাবে প্রভাবিত ও পরিবর্তন যোগ করেছে, বাঙালির নিত্য আহারে তা নিয়ে দারুণ সব তথ্য তুলে ধরেছেন তিনি। লেখিকার সে প্রবন্ধের সংক্ষিপ্ত অংশ —

সমুদ্রপথ ধরে এ অঞ্চলে পর্তুগিজ বণিকদের আগমনকাল ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে অর্থাৎ নাবিক বার্থোলোমিউ দিয়াজের কালিকট বন্দরের পূর্ব উপকূলের পা রাখার ৩৩ বছর পর। বাংলায় তখন মুসলিম লোদি রাজবংশের শাসনকাল, যদিও ১৫৭৬ সালে মোঘলদের কাছে নিজেদের ক্ষমতা হারায় তাঁরা। যদিও বাবরের কাছে পানিপথের যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদির পরাজয় কিংবা এ অঞ্চলে মোগলদের ক্ষমতা দখলের ইতিহাস দখল করে আছে অতীতের দিনপঞ্জি, তবে একই সঙ্গে রয়েছে মজার সব গল্পও। আর তা হলো বাঙালির হেঁসেলে পর্তুগিজ খাবারের উপস্থিতি।

শুরু থেকেই বাংলা পরিচিত সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে, এর প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য আর প্রতুলতা বোঝাতে বাংলাকে ডাকা হতো ‘ভারতের জন্নাত’ হিসেবে। এখানকার উন্নত বীজের ধান, সুগন্ধি চাল, উন্নত মানের তুলাসহ অন্যান্য কৃষিজাত পণ্য যা কিনা উৎকর্ষের প্রতীক হয়ে দ্বার খুলে দিয়েছে বিলাসী বাণিজ্যের, তাই তো দীর্ঘকাল ধরে পোশাক আর মসলার মতো অভিজাত পণ্যের বিকিকিনির কেন্দ্র ছিল এ অঞ্চল। আর সত্তরের দশকের ঢাকার মসলিনের কদর ও কেচ্ছা দুটোই চর্চিত ইউরোপে। তবে সেসব প্রসঙ্গে না গিয়ে আজ বরং বাঙালির পাত আর পেটপূজার গল্প বলা যাক।

তৎকালীন বাংলার রাজধানী ছিল গৌড়, আর এর প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র বলতে চট্টগ্রাম। বর্তমানের কলকাতার প্রাচীন নাম ছিল কলিকাতা, হুগলি নদীর তীরে গড়ে ওঠা এ গ্রামটি তখনো কিন্তু বসতি কিংবা বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গুরুত্ব পেতে শুরু করেনি।

১৫৮০ সালে সম্রাট আকবর হুগলি নদীর তীরে পর্তুগিজদের বসতি গড়ার অনুমতি দিলে কালেক্রমে এ স্থানটি বিভিন্ন ধরনের পণ্য কেনাবেচার খুচরা বাজার হিসেবে বেশ পরিচিত লাভ করে। সস্তা দামে পণ্য কিনতে ভারতের পাশাপাশি চীন, মালাক্কা আর ফিলিপাইনের বণিকরা ভিড় জমাতে শুরু করেন এখানে। বিশেষ করে বাংলা থেকে অল্প মূল্যে পণ্য ক্রয়ের সুযোগ হাতছাড়া করতেন না এসব বণিক। এ বাজার থেকে স্বল্পমূল্যে পণ্য কিনে বিভিন্ন বন্দরে তা চড়া দামে বিক্রি করতেন তাঁরা। প্রথম দিকে শুধু বর্ষা ঋতুতে পর্তুগিজ ব্যবসায়ীরা এ অঞ্চলে ভিড় জমাতেন পণ্য কেনাবেচার উদ্দেশ্যে, বর্ষা শেষ হলে তাঁরা ফিরে যেতেন গোয়ায়। তবে শেষ পর্যন্ত পর্তুগিজ বণিকরা আস্তানা গড়েন বাংলায়।

বলা হয় ১৬৭০ সালের দিকে বাংলায় প্রায় ২০ হাজার পর্তুগিজ অধিবাসীর বসবাস ছিল, যার মধ্যে অর্ধেকই তাদের বসতি গড়েছিল হুগলিতে আর বাকিরা থাকত সাতগাঁও (পর্তুগিজরা এ জায়গাটির নাম দেয় পোর্তো গ্রান্দে), চট্টগ্রাম, বানজা, ঢাকাসহ আরো কয়েকটি স্থানে।

এদের জীবনযাপন ঘিরে ছিল আভিজাত্যের উপস্থিতি। শরীরে শোভা পেত নবাবি সাজের ধোপদুরস্ত পোশাক। সেবক, বাবুর্চি থেকে শুরু করে ভিন্ন ভিন্ন কাজের জন্য আলাদা লোক থাকত তাঁদের চারপাশে। ডজনখানেক সেবাদাসী আর চাকর রাখত পর্তুগিজরা, যাদের কাজ হতো বিভিন্ন ধরনের মিষ্টান্ন আর আচার তৈরি করা। বিশেষ করে আম, কমলা থেকে মিষ্টান্ন তৈরি করত তাঁরা। বলে রাখা ভালো, খেতে সুস্বাদু ওই খাবার দিয়ে বাঙালির মন জয় করতে খুব একটা কালক্ষেপণ করতে হয়নি তাঁদের। কিছু দিনের মধ্যেই বাঙালির বিভিন্ন অনুষ্ঠান আর উৎসবে খাবার তালিকায় জায়গা করে নেয় ওইসব খাবার। বিশেষ করে পর্তুগিজ বেকারির রুটি, কেক আর বিভিন্ন ধরনের পেস্ট্রি; খেতে মিষ্টি আর দারুণ সব স্বাদের ওই কেক-পেস্ট্রি মুখে পুরে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছে ভোজনরসিক বাঙালি।

ভাতের পাশাপাশি বাঙালি গৃহস্থের পাতের অন্যতম খাবার বলতে রুটি, ফল, সবজি, দুধ, দুগ্ধজাত সামগ্রী যেমন দই, ঘি। একটু অসচ্ছল পরিবারকে হয়তো আপস করতে হতো হরেক রকমের ফল, দুধ কিংবা ঘিয়ের সঙ্গে। তবে তাঁদের রোজকার খাদ্যতালিকায় জায়গা নিয়মিতই ছিল ভাত আর সবুজ শাকসবজি।

তৎকালীন ভারতের অন্য অঞ্চলের ব্রাহ্মণরা যেখানে ভাতের থালায় মাছ-মাংসের উপস্থিতিকে ধর্মনষ্ট বলে জ্ঞান করতেন, তখন কিন্তু এ অঞ্চলের ব্রাহ্মণদের খাবার তালিকায় ঠিকই জায়গা পেত আমিষজাতীয় খাবার। এ অঞ্চলের মাছ-মাংসের সহজপ্রাপ্যতা এই খাদ্যভাসের অন্যতম কারণ বলেই মনে করেন কলিন টেইলর সেন।

ভারতের অন্যান্য অংশের গোঁড়া হিন্দুরা কিন্তু আমিষের পাশাপাশি বাদ রাখতেন পেঁয়াজ, রসুন কিংবা মাশরুমজাতীয় খাবার। বাধ্যবাধকতা ছিল মাছের ক্ষেত্রেও। কী ধরনের মাছ কখন খাওয়া যাবে নিয়ম ছিল সেখানেও। তবে বাঙালি ব্রাহ্মণ বাবুরা জিভের স্বাদের সঙ্গে খুব একটা আপস করেনি।

একটু অতীতে ফেরা যাক। নবম ও দশম শতকে বাংলা সমৃদ্ধ ছিল হরেক রকমের শস্য-ফলে। এ অঞ্চলের মাটিতেই জন্মেছে ৪০ ধরনের ধান, ৬০ রকমের ফল আর ১২০ প্রজাতির বেশি শাকসবজি। এর মধ্যে ছিল শশা, গাজর, বিভিন্ন ধরনের লাউ, বেগুন, রসুন, মেথি, মুলা, মাশরুম, ইত্যাদি। আর ফলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য তরমুজ, কলা, আম, লেবু, আমলকী, কমলা (শোনা যায় খ্রিস্টীয় আমলে চীন অথবা ইন্দোনেশিয়া থেকেই কমলার আগমন এ অঞ্চলে), নাশপতি (এটি প্রথমে চীনারা পরিচয় করিয়ে দেয় বাংলায়), আঙ্গুর আর পিচজাতীয় ফল, কুল, বাদাম, আখরোট, নারকেল, ডালিমসহ আরো অনেক ধরনের ফল, যা কিনা কোনোভাবেই পাশ্চাত্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়।

এবার আসা যাক, রান্নার উপকরণ প্রসঙ্গে। ১২ শতক পর্যন্ত বাঙালি রান্নার মসলা বলতে হলুদ, আদা, সরিষা, লং পিপার (লম্বা পিপুল), পেস্তাবাদাম, হিং আর লেবু। একসময় লং পিপারের জায়গা দখল করে নেয় কালো গোলমরিচ, পরবর্তী সময়ে আগমন সস্তা কাঁচামরিচের, যা কিনা বাংলার মাটিতেই বিস্তারলাভ করে ব্যাপক পরিসরে। মসলা ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বাংলায় প্রবেশ দারুচিনি, এলাচ ও লবঙ্গের।

ভাজা-পোড়া থেকে তরকারি রান্নায় নানা পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটানো হয়েছে বাঙালির হেঁসেল ঘরে। সেখানে রান্নার অন্যতম উপকরণ হয়ে এসেছে ঘি, তবে বিলাসী এ দ্রব্যটির ব্যবহার খানিকটা ব্যয়বহুল বলে এর পরিবর্তে জায়গা করে নিয়েছে সরিষা কিংবা তিলের তেল। আর মিষ্টিজাতীয় খাবারের প্রতি এখানকার অধিবাসীর আগ্রহটা অশৈশবের। প্রাচীন আমল থেকেই বাংলাসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে চিনি তৈরি হতো। বিশেষ করে আখ বা ইক্ষুর রস কিংবা বিট ও ম্যাপল থেকে তৈরি হতো সুমিষ্ট এ দানাদার পদার্থটি। সংস্কৃতিতে চিনিকে বলা হয় শর্করা। তবে বাংলায় চিনি নামেই পরিচিত ছিল মিষ্টিজাতীয় এ উপাদানটির। দুধ কিংবা দুগ্ধজাত বিভিন্ন খাবার তৈরিতে ব্যবহার হতো এ চিনি। তবে চিনি নামটি এসেছে কিন্তু চায়না শব্দ থেকে।

আলু, টমেটো কিংবা কাঁচামরিচ ছাড়া কি বাঙালি কোনো খাবারের পদ কল্পনা করা যায়? রোজকার রান্নার এ উপকরণের সঙ্গে কিন্তু পর্তুগিজদের হাত ধরে বাঙালির পরিচয়। পরবর্তী সময়ে ভাতের সঙ্গে তরকারির অন্যতম উপাদান এ সবজিগুলো। মাছের ঝোলে আলুর সঙ্গে একখানা টমেটো কিংবা মসলাদার মাংসে সাদা গোলআলু ছাড়া ভোজ অসমাপ্ত বাঙালি কর্তাবাবুদের। তাই বিদেশ বিভূঁই থেকে আসা এ সবজিগুলো কখন যে হেঁসেলের তাকে জায়গা করে নিয়েছে তার খোঁজ কে রাখে।

লেখিকার মতে, আইরিশদের পর বিশ্বের অন্য জাতিদের মধ্যে খাবার হিসেবে আলুর কদর করে বাঙালিরাই। অন্য প্রচলিত ফল আর সবজির মধ্যে ঢেঁড়স, মিষ্টি আলু, বেগুন, পেয়ারা আর পেঁপের সঙ্গে বাঙালির পরিচয় পর্তুগিজদের বরাতেই। সে সময় চীনাবাদাম বা কাজুবাদাম কখনই প্রধান খাবারের সঙ্গে খাওয়ার প্রচলন ছিল না বাংলায়। তবে মহারাষ্ট্র কিংবা কেরালায় কিন্তু চীনাবাদামের সঙ্গে আলু ভাজি অথবা চিংড়ির তরকারিতে কাজুবাদাম দেয়ার প্রচলন ছিল।

মারাঠিরা আলুকে, এর পর্তুগিজ নাম ‘বাটাটা’ বলেই ডাকত। গুজরাটিরা কর্নফ্লাওয়ার দিয়ে রুটি তৈরি করত কিংবা মহারাষ্ট্রে তরকারিতেও মিশিয়ে দেয়া হতো ভুট্টাদানা। কেবল বাংলাতেই এ খাবারটি ভিন্নভাবে খাওয়ার প্রচলন। ভুট্টা থেকে দানাগুলো আলাদা করে সঙ্গে একটু তেল আর কাঁচামরিচ মাখিয়ে তৈরি করা হয় এ খাবার। বেশির ভাগ সময় এ খাবারটি কেনা হতো রাস্তার পাশের বিক্রেতার কাছ থেকে।

বাঙালি হিন্দু বাবুদের খাবার টেবিলে সপ্তাহে একটু শুক্তা না হলে চলে না। তিতা এ খাবারটি নাকি ক্ষুধা উদ্দীপকের কাজ করে। মুলা, আলু, মটরশুঁটি, করলাযোগে রান্না করা এ পদে অন্যসব সবজি পরিবর্তন হলেও আলু ছাড়া চলে না। শোনা যায়, ভাতের সঙ্গে শুক্তা আর ডাল না হলে ভোজ পূর্ণ হয় না তাঁদের। আর ডালের স্বাদ বাড়াতে যোগ করা হয় টমেটো। বাঙালি রান্নায় পর্তুগিজ প্রভাব এমনই। পোস্ত রান্নার কথাই ধরা যাক। আলু ছাড়া পোস্ত— এটা চিন্তাই করতে পারেন না রাঁধুনিরা। কিংবা চিংড়ি মাছের সঙ্গে লাউ, মাছের ঝোলে আলু কিংবা বেগুন।

এ তো হেঁসেল-বৃত্তান্ত। মিষ্টি থেকে চাটনি তৈরিতেও বাঙালিকে প্রভাবিত করেছে পর্তুগিজরা। আপেল, আম কিংবা আনারস দিয়ে যেমন জেলি তৈরি করা হয় তেমনি খাবার হিসেবে টমেটোর চাটনির জনপ্রিয়তা রয়েছে এ অঞ্চলে। কেবল খাবার নয়, পর্তুগিজদের কাছ থেকে খাবার সংরক্ষণের বিভিন্ন কৌশলও আয়ত্ব করেছে বাঙালি। বিশেষ করে আচার সংরক্ষণ পদ্ধতি।

তাই বাঙালি খাবারে পর্তুগিজ প্রভাব গভীর ও স্থায়ী। পর্তুগিজদের সুদূরপ্রসারী বাণিজ্য প্রথার হাত ধরে আফ্রিকা থেকে শুরু করে ওশেনিয়া, এশিয়ায় পৌঁছে বিভিন্ন ধরনের ফল আর সবজি। আলু, টমেটো, লংকা, ঢেঁড়স, ভুট্টা, পেঁপে, আনারস, কাজুবাদাম, চীনাবাদাম, পেয়ারা আর তামাকের সঙ্গে ভারতীয়দের পরিচয় পর্তুগিজদের মাধ্যমে। আর বাংলায় দুধ থেকে ছানা ও দই প্রস্তুতের কৌশলটিও শিখিয়েছে ওই পর্তুগিজরা; যা কিনা পরবর্তী সময়ে বাংলার মিষ্টান্ন শিল্প বিকাশে সহায়তা করে।

খাদ্য গবেষক শ্রী গোপাল হালদার মনে করেন, জমিদার-তালুকদারদের পঙিক্ত ভোজন ছাড়িয়ে ইংরেজ আমলে শিক্ষিত বাঙালি শ্রেণি একটি রস ও রুচির মাপকাঠি তৈরি করেছিল, কিন্তু তা রয়ে গেছে পারিবারিক গণ্ডির মধ্যে। কারণ মধ্যবিত্ত সমাজের সীমাবদ্ধ আদান-প্রদানের মধ্যেই গড়ে উঠেছিল সেই বাঙালি ভোজনরীতি। তিনি মনে করতেন, বাঙালি খাওয়ার ব্যাপারে ‘না-গ্রহণ না-বর্জন’ নীতিতে সহনশীল। বাঙালি বাড়ির নিমন্ত্রণে প্রথমে আদি-অকৃত্রিম শাক, তারপর আসবে মোগলাই পোলাও, কোর্মা, কাবাব এবং শেষে আসবে ইংরেজি-বাঙালি পর্বে চপ-কাটলেট থেকে আইসক্রিম পর্যন্ত। লিখেছেন —

"নিমন্ত্রণ তো নয়, এ বাঙালির ইতিহাস... বাঙালির নিমন্ত্রণে আজ নিমন্ত্রিত হয় বাঙালি অতিথির তিন জন্মের তিন সত্তা। সেই আদি জন্মের গেঁয়ো বাঙালি সত্তা, তার মধ্যজন্মের আধা-মুসলমানি সত্তা, আর তার ইংরেজি আমলের আধা-ঔপনিবেশিক সত্তা। কিন্তু সত্তা যত বিচিত্র হোক, হায়, উদর মাত্র একটি।"

মিষ্টান্ন প্রিয় বাঙালির জীবনের মিষ্টির প্রভাব সুবিদিত। সুসংবাদে মিষ্টি, আতিথ্যে মিষ্টি, ভদ্রতায় মিষ্টি, বিয়েশাদি-কুলখানিতে মিষ্টি। সংবাদ আনতে মিষ্টি নিয়ে যাবার বহুল প্রথা সংবাদকেই সন্দেশে রূপান্তরিত করেছে। একসময় বাড়ির মেয়েরাই বেশির ভাগ মিষ্টি তৈরি করতেন। পিঠে তৈরিতে বাংলার মেয়েরা দৈহিক পরিশ্রম আর মনের আনন্দ মিশিয়ে ফেলেন। একসময় ঢাকায় পিঠেওয়ালি মহিলারা... বাড়ি বাড়ি গিয়ে পিঠে বিক্রি করতেন। পিঠে বিক্রির সঙ্গে নানা ধরনের মজার মজার গল্পও শুনিয়ে আসতেন বিনি পয়সায়। দেবী ঘোষ তাঁর বইয়ে লিখেছেন যে, ‘পূর্ব বাংলার পিঠে তৈরির বৈচিত্র্য পশ্চিম বাংলার তুলনায় বেশি। পূর্ব বাংলার বিশেষ বৈশিষ্ট্য আসলে পিঠে (চিতই পিঠা)।’

বাঙালি ঘরে নানা অসুবিধার মধ্যে মেয়েদের রান্না করতে হয়। দরিদ্র সংসারে মেয়েরা প্রিয়জনের মুখে অন্ন তুলে দিতে গভীর সঙ্কটে পড়েন। জ্বালানির সঙ্কট, চাল সহজে সিদ্ধ হয় না, অথচ খাওয়ার সময় পেরিয়ে যায়, বাড়ির পুরুষরা অসন্তুষ্ট হয়। চট্টগ্রামের একটি চটকা গানে শাশুড়ি ও বধূর এমন সঙ্কটের ছবি ফুটে উঠেছে।

"মাইজান বউয়ে তাহার উপর চড়াইয়া দিছে ডাইল।
বাড়ির মানুষ শুইনা কত দিবার লাইগছে গাইল
বেলা হৈল দুপুর গেল ডাইল গলে না হায়।

নতুন ইষ্টির ছামনে এহন ক্যামন দেয়ন যায়
ত্যক্ত হৈয়া মাইজান বউয়ে ডাইলে মারে ঘাও।

চরকা যেমন ঘ্যাগর ঘ্যাগর কইরবার লৈল রাও
ভাসুরে করে কিচির মিচির দেওরে করে রাগ।

ফোঁটা তিলক কাইটা হউড় সাইজা বইছে বাঘ" ...

সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর ভোজন বিষয়ে নিজস্ব ধারণা ও বাঙালির ভোজন বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করেছেন তাঁর ‘জলে ডাঙ্গায়’ বইয়ে, তিনি বলেছেন,

"আমরা তেতো, নোনা, ঝাল, টক, মিষ্টি — এই পাঁচ রস দিয়ে ভোজন সমাপন করি। ইংরেজ খায় মিষ্টি আর নোনা, ঝাল সামান্য, টক তার চেয়েও কম এবং তেতো জিনিস যে খাওয়া যায়, ইংরেজের সেটা জানা নেই। তাই ইংরেজি রান্না আমাদের কাছে ভোঁতা ও বিস্বাদ বলে মনে হয়। অবশ্য ইংরেজ ভালো কেক-পেস্ট্রি-পুডিং বানাতে জানে—তাও সে শিখেছে ইতালিয়ানদের কাছ থেকে এবং একথাও বলব, আমাদের সন্দেশ-রসগোল্লার তুলনায় এসব জিনিস এমন কী, যে নাম শুনে মূর্ছা যাব।"

পশ্চিমবঙ্গের রান্না ও বাংলাদেশের রান্নার পার্থক্য নিয়ে মুজতবা আলীর সরস মন্তব্যটি শোনা যাক। বাংলাদেশের রান্নায় ঝালের প্রাচুর্য, পশ্চিমবঙ্গের রান্নায় চিনির। এই বিষয়টাকে আরও সরস করতে তিনি একজনের মন্তব্য তুলে ধরেছেন — সে ব্যক্তি বলেছেন — মাই মোটর কার ইজ সাউন্ড ইন এভরি পার্ট, একসেপ্ট অন দি হর্ন — ঠিক সে রকম পশ্চিমবঙ্গের রান্নাতে ‘সুগার ইন এভরিথিং একসেপ্ট ইন রসগোল্লা’।

মাছ-ভাত-শাকসবজির মতো দৈনন্দিন খাবারের বেলায় হিন্দু এবং দেশীয় মুসলমানদের রান্নায় বিশেষ পার্থক্য ছিল বলে মনে হয় না। তবে হিন্দু বাড়ির রান্নায় হিঙ্গের ব্যবহার দেশীয় মুসলিম পরিবারে তেমন দেখা যায় না। হিন্দু বাড়ির রন্ধনপ্রণালিতে ফোঁড়ন ব্যবহারের প্রবণতা বাঙালি মুসলিম পরিবারের চেয়ে বেশি। তবে মাংসের ব্যাপারে পার্থক্য প্রচুর। মুসলমানদের মধ্যে মাংস খাবার চলন বেশি — গরুর মাংস তো খেতেনই; মুরগি ও ছাগল বা খাসির মাংসের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। মুকুন্দবাবুর লেখায় আমরা দেখেছি মুরগি ও ছাগল জবাহ করে মোল্লা পারিশ্রমিক নিচ্ছেন — এ থেকে মুসলিমদের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সাধারণ বাঙালি হিন্দুর কিছু পার্থক্য অনুমান করা সম্ভব। তবে ছাগল, হরিণ, কচ্ছপসহ নানা প্রাণীর মাংস খেতে পছন্দ করতেন তাঁরা।

উপরের খাদ্য তালিকাটি প্রধানত অবস্থাপন্ন মানুষদের প্রসঙ্গে বলা হলো। পাশাপাশি বৃহত্তর সমাজে সেকালেও গরিবদের খাবার ছিল পান্তাভাত। তবে ইলিশ পান্তা তাঁদের সাধ্যের বাইরে ছিল। পাদ্রি সিবান্তিয়ান মানরিক ষোলো শতাব্দীতে বঙ্গদেশে ভ্রমণ করেছিলেন বেশ কয়েকবার। তিনি লিখে গেছেন যে গরিবরা নুন আর শাক দিয়ে ভাত খেতেন। প্রায় একই সময়ে মুকুন্দরাম দরিদ্র ব্যাধ কালকেতুর খাবারের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা থেকে সাধারণ মানুষের খাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। কালকেতুর কপালে জুটত খুদের জাউ, সঙ্গে লাউ দিয়ে রান্না মুসুর ডাল, ওল কচু, করঞ্জা আর আমড়া। দই পেলে কালকেতুর তৃপ্তি পুরো হতো। তবে গরিবের পাতে দই মিলত কদাচিৎ। ঘোল-মাঠাও জনপ্রিয় ছিল। কোনো কোনো গবেষক মনে করেন, মাঠা মুসলিম অভিযাত্রীরা বঙ্গদেশে এনেছিলেন। খাওয়ার শেষে পান-সুপারি এবং মৌরি খাওয়ার ব্যাপক প্রচলন ছিল।

বাঙালির স্বাদ গ্রহণের বিশিষ্টতায় সরষে প্রীতি উন্নত স্থান গ্রহণ করেছিল সরষে বাটা দিয়ে মাছ, পাতুরি, চচ্চড়ির স্বাদের বৈচিত্র্য বাঙালি মাত্রই জানা। কাসুন্দির কথা সরষে প্রসঙ্গে না বললে চলে না। সৈয়দ মুজতবা আলী তার সরষে প্রীতির পরিচয় দিয়েছেন ‘বাঙালী মেনু’ নিবন্ধে (৫৪)। তিনি লিখেছেন, ‘মাছের সঙ্গে সর্ষে, যেন রবীন্দ্রসংগীতে কথার সঙ্গে সুরের মিলন।’ নিতান্ত সন্দেশ-রসগোল্লা ছাড়া তিনি নাকি সব খাবারের সঙ্গে সরষে খাবার কথা বলেছেন। বিলিতি মাস্টার্ডের চেয়ে দেশি কাসুন্দি ছিল তাঁর প্রিয়। কাসুন্দিতে থাকে মিঠে কড়া মোলায়েম ঝাঁঝ আর বিলিতি মাস্টার্ডে বদখত মিষ্টি মিষ্টি ভাব।

মুজতবা আলী বহু দেশ ঘুরেছিলেন, বহু ধরনের রান্না খেয়েছেন। আরব দেশ ভ্রমণের সময় মুরগি মোসাল্লম, শিক কাবাব, শামি কাবাবের স্বাদ পেয়েছেন। জাহাজে ঘুরে বেড়াবার সময় আইরিশ ফুড আর ইতালিয়ান ম্যাকারনি খেয়ে পেটে কড়া পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু প্রাণ কাঁদছিল — চারটি আতপ চাল, উচ্ছে ভাজা, সোনামুগের ডাল, পটল ভাজা আর মাছের ঝোলের জন্য।

কায়রোতে গেলেন, সেখানে দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা Fool’s Restaurant মানে আহাম্মকের রেস্তোরাঁ। পরে বুঝলেন এ দোকানে উত্তম শিম বিচি বিক্রি করা হয়। ফুল অর্থ ‘বিন’ অর্থাৎ শিমের বিচি।

বাঙালি জীবনে খাওয়ার সাধ আর বঞ্চনা ছড়িয়ে আছে দৈনন্দিন জীবনের পরতে পরতে। সম্পন্নের ভাগ্যে সহজেই জোটে ভালো খাবার। দরিদ্র তো ক্ষুধা নিবৃত্তি করতেই জানে না, নিমন্ত্রণের অধিকার রাখে না। ‘পথের পাঁচালী’তে অপুর পূর্বপুরুষের সমৃদ্ধির দিন গত হয়েছে বহুদিন। অপু বাবার সঙ্গে সম্পন্ন গৃহে খাবারের যে আপ্যায়ন পেয়েছিল তাতে তাঁদের ঘরের দৈন্য সম্পর্কে একটা ধারণা জন্মে। অপুকে মোহনভোগ খেতে দিয়েছিল তাঁরা। সেই মোহনভোগে ঘিয়ের পরিমাণ এত বেশি ছিল যে অপুর আঙুলে মাখামাখি হয়ে যায়। তাঁর মনে পড়ে, মায়ের কাছে মোহন ভোগ খেতে চাইলে

"শুধু সুজির জলে সিদ্ধ করিয়া একটু গুড় মিশাইয়া পুলটিসের মতো এক দ্রব্য তৈয়ার করিয়ে ছেলেকে আদর করিয়া খাইতে দেয়।"

আজকের মোহন ভোগ আর মায়ের তৈরি মোহনভোগের সঙ্গে অপু তফাৎ করতে পেরেও সে দরিদ্র মায়ের প্রতি করুণা ও সহানুভূতিতে পূর্ণ হয়ে গেল।

"খাইতে বসিয়া বারবার তাহার মনে হইতেছিল অর্থাৎ তাহার দিদি এরকম খাইতে পায় নাই কখনো।"

সুস্বাদু খাবার তাঁকে সুখের বদলে দুঃখ এনে দেয়।

এবার একটি হালকা করুণ গল্প দিয়ে বাঙালির খাদ্যবিলাস শেষ করি। গল্পটি পাওয়া গেছে অভিনব গুপ্তর ‘জেনো বাসনার সেরা বাসা রসনায়’ থেকে।

পড়তি অবস্থার মুসলমান জমিদার। সেদিন তাঁর খাবারের সংস্থান মাত্র দুটি ক্ষুদ্র মাছ, তাও বিড়ালে নিয়ে গেছে। নকুল এসে বন্ধু পরিবৃত জমিদার সাহেবকে খাবার দিল —

"বিল্লি খাঁ আকে মছলী মহল লুট লিয়া।"

জমিদার সাহেব বললেন —

"তুম জলদি মসুর খাঁ কো বোলাও।"

আলু যেখানে এমন পড়তি সংসারে দুর্লভ, সেখানে কচুর দম আর আমড়ার টকই বিকল্প খাদ্য। তাঁর ছদ্মবেশী ভাষা—

"ভুঁই আন্ডা কি কাবাব, আউর আসমান গোলা (আমড়া) কি চাটনি।"

বঞ্চনা ঢাকার জন্যও কত না প্রচেষ্টা অভাগা এদেশে!

 


(তথ্যসূত্র:
১- বাঙালির রান্নায় পর্তুগিজ প্রভাব, কলিন টেইলর সেন।
২- আনন্দবাজার পত্রিকা, ৪ঠা নভেম্বর ২০১৭ সাল।
৩- বাঙালির রন্ধনশিল্প, রাধা চক্রবর্তী, অঙ্কুর প্রকাশনী।
৪- সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র, বিনয় ঘোষ, প্রকাশ ভবন।
৫- উইকিপিডিয়া।
৬- Indian Food: A Historical Companion by K. T. Achaya.
৭- Feasts and Fasts: A History of Food in India by Colleen Taylor Sen.
৮- Curry: A Global History by Colleen Taylor Sen.
৯- The Story of Our Food by K. T. Achaya.
১০- বাংলাপিডিয়া।
১১- http://nobinkontho.blogspot.com/2017/08/blog-post_18.html?m=1
১২- http://bonikbarta.net/bangla/news/2016-04-22/73263/%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%99%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%BF-%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A7%81%E0%A6%97%E0%A6%BF%E0%A6%9C-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%AC--/)

No comments:

ভারতকন্যা: কি দিয়েছিলেন ও কি পেয়েছিলেন ।। রানা চক্রবর্তী

  স্বামী বিবেকানন্দের মানসকন্যা ভগিনী নিবেদিতার পূর্বের নাম – মিস মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল। ধর্মযাজক পিতা স্যামুয়েল রিচমন্ড ও মাতা ই...