Friday, 29 March 2019

বিজেপি (BJP) এবং ২০১৯ লোকসভা নির্বাচন ।। ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়


বিজেপি এবং ২০১৯ লোকসভা নির্বাচন নিয়ে কিছু কথা। যদি আপনারা একটু সময় দিয়ে পড়েন, এবং এই আলোচনায় যোগ দেন, আমি কৃতজ্ঞ থাকবো। এই আলোচনাটা হওয়া দরকার। আর দু-এক মাসের মধ্যেই একশো কুড়ি কোটি মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে যাবে। আমার, আপনার, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের। ভেবে দেখুন। সংক্ষিপ্তভাবে, তিন বা চার অংশে ভাগ করে লিখছি।


প্রথম পর্যায়

কলকাতায়, পশ্চিমবঙ্গে, ভারতে অথবা এখানে আমেরিকায় অনেকেই আছেন যাঁরা মোটেই ধর্মান্ধ নন, বা ঘৃণা অথবা হিংসাতেও বিশ্বাস করেন না। এবং খুব সাধারণ মানুষ -- পুরুষ অথবা নারী। এবং ভালো মানুষ। সৎ, পরিশ্রমী, ধৈর্যশীল ইত্যাদি। বন্ধু, পরিবার, পরিজন নিয়ে থাকেন। রাজনীতির ব্যবসা করেন না। কেউ হয়তো শিল্পী। কেউ ওকালতি করেন। কেউ অফিসে চাকরি করেন, বা কলকারখানায় কাজ করেন। কেউ ছাত্রছাত্রী। কেউ শিক্ষক-শিক্ষিকা। এদের মধ্যে অনেকেই বিজেপির সমর্থক এখন। আমি তাঁদের কারুর কারুর সঙ্গে কথা বলি, এবং বোঝার চেষ্টা করি কেন তাঁরা বিজেপিকে সমর্থন করেন। 

আমার প্রশ্নের যে উত্তরগুলো পাই তাকে কয়েকটা ভাগে ভাগ করা যায়। 

(১) কংগ্রেস, গান্ধী পরিবার, সিপিএম এবং তৃণমূলের দীর্ঘ অপশাসনে তাঁরা বিরক্ত এবং হতাশ তাঁরা মনে করেন বিজেপিই একমাত্র উত্তর। কারণ হলো, তাঁরা ভায়োলেন্স দেখে দেখে, আর পার্টিবাজি ও গুণ্ডামির রাজনীতি দেখে দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের বাইরের রাজ্যগুলোতে তাঁরা মুলায়ম সিং, লালুপ্রসাদ, ইত্যাদিদের শাসন দেখেছেন, এবং জাতের রাজনীতি দেখে দেখে বিরক্ত হয়েছেন। তাঁরা মনে করেন, বিজেপির একটা আপাত-পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি আছে। এই পার্টিগুলোর এবং কংগ্রেসের যেটা নেই। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর, বা গোধরার ঘটনার পর যে ভয়াবহ দাঙ্গা বিজেপি ও তার সহযোগী দলগুলো ঘটিয়েছিল, যেভাবে মুসলমান নিধন হয়েছিল, তা এখন অতীতের স্মৃতি। বেশির ভাগ মানুষ অতীতের অন্ধকার মন থেকে মুছে ফেলতে চান। তাছাড়া, যেহেতু তেমন কোনো বিজেপি নেতা বা নেত্রীকে জেলে যেতে হয়নি, বা মিডিয়াতে তাদের ভূমিকা নিয়ে তেমন কোনো আলোচনাও হয়নি, ফলে মানুষের ধারণা হয়েছে, তারা সেসব গণহত্যায় যুক্ত ছিলো না। ঠিক যেমন, ইন্দিরা গান্ধী হত্যার পরে কংগ্রেসীরা যে শিখ গণহত্যা করেছিল, তাতে যারা দোষী ছিল, তাদের কোনো শাস্তি না হওয়াতে তাদের অপরাধের কথা মানুষ ভুলে গেছে। পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম বা তৃণমূলও তাই। 

(২) এবারে আমি যখন তাঁদের বলি বিজয় মাল্য, নীরব মোদী, আম্বানি, আদানি অথবা এইধরণের অতি বিশাল দুর্নীতির কথা, কিংবা সাম্প্রতিককালে রাফায়েল-জাতীয় কেলেঙ্কারির কথা, তাঁরা চুপ করে থাকেন। আমি যখন তাঁদের বলি উত্তরপ্রদেশে আদিত্য যোগীর গুণ্ডাবাহিনী বা ঘাতকের দলের কথা, তাঁরা ঠিক বুঝতে পারেননা। আমি তাঁদের কারুকে কারুকে নিউ ইয়র্ক টাইমস জাতীয় আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে যোগীর ঘাতকবাহিনী এবং দাঙ্গার রাজনীতি সম্পর্কিত গবেষণামূলক দীর্ঘ রিপোর্ট পাঠিয়েছি। তাঁরা পড়তে চাননা। কারণ, তাঁরা বিশ্বাস করতে চাননা বিজেপি এখন ভারতে সবচেয়ে বেশি ভায়োলেন্স-রাজনীতির পার্টি। তাঁরা মিডিয়াতে কখনো এসব কথা দেখেননা, ফলে একটা ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গেছে, যে ধারণা তাঁদের মনে একধরণের শান্তি দেয়। সেই শান্তি তাঁরা ভঙ্গ করতে চাননা।

(৩) বিজেপিকে এখন সমর্থন করা, বা অতীতে ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেসকে সমর্থন করা -- এতে রাজনীতি যতটা আছে, আমার মতে তার চেয়েও বেশি আছে একটা অদ্ভুত গণ-সাইকোলজি। ইন্দিরা গান্ধী যদি জরুরি অবস্থা জারি না করতেন, তাহলে হাজার দুর্নীতি, হিংসা, ব্যর্থতা এবং পুলিশ মিলিটারির খুন ও নির্যাতন সত্ত্বেও, এবং চরম দারিদ্র্য শোষণ বঞ্চনার রাজনীতি সত্ত্বেও তিনি নির্বাচনে হারতেন না। এখন, বিজেপির পালা। বিজেপির কোনো বিশাল মাপের নেতা যদি না কোনো বড় কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন, অথবা মূর্খ ও হঠকারি কোনো কাজ করে না বসেন, গত পাঁচ বছরের অর্থনৈতিক ব্যর্থতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, নারীনির্যাতন বা মুসলমান নিধন বা দলিতদের আরো বেশি করে পদদলিত করার ইতিহাস -- সাধারণ মানুষকে (মূলতঃ হিন্দু মেজরিটি ভোটার যারা ভারতের ৮০ শতাংশ) বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট দিতে বাধ্য করবে না। তার ওপরে আছে ভোটের ঠিক আগেই পুলওয়ামা ও বালাকোট নামক দারুণ দাবার চাল। 


দ্বিতীয় পর্যায় - "মুসলমান মানেই ভারতের শত্রু।"

আমার অনেক বন্ধু আছে, যারা মোটেই হিন্দু ধর্মান্ধ নয়। একেবারেই নয়। সত্যি কথা বলতে, আমি যখন ৬ বছর বয়েস থেকে ২২ বছর বয়েস পর্যন্ত আর এস এস এবং বিজেপি (তখনকার জনসঙ্ঘ) করতাম, এবং ওদের ছাত্র ফ্রন্ট এবিভিপির পশ্চিমবঙ্গ সম্পাদক ছিলাম, আর হিল্লি দিল্লি করে বেড়াতাম, এসব বন্ধুরা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করতো। স্কটিশ চার্চ স্কুলের শেষ বছরগুলোতে টিফিনের সময়ে টেবিল বাজিয়ে স্লোগান দিতো, "পার্থ ব্যানার্জী ... বাজপাখি।" কারণ, আমার এবং আমার বাবার বাজপেয়ী প্রীতি। 

এরা কেউ ধর্মান্ধও ছিল না, এবং এখনো নেই। কিন্তু এখন পাশার দান উল্টে গেছে। এখন আমি আর এস এস ও বিজেপি বিরোধী, এবং ওরা সমর্থক। 

এই সমর্থনের পিছনে অর্থনীতির আলোচনা, বিশ্বায়নের আলোচনা, পরিবেশ দূষণ, আম্বানি-আদানি-বিজয় মাল্য-রাফায়েল, গোধরা-বাবরি মসজিদ দাঙ্গা, বজরং দলের বেগুসরাই গণহত্যা, অথবা আর এস এস-বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নারীবিদ্বেষ বা মন্দিরে মেয়েদের ঢুকতে না দেওয়া -- এসব আলোচনা আর একেবারেই প্রাসঙ্গিক নয়। মুসলমান মানেই দেশের শত্রু, এবং সন্ত্রাসী, অন্ততপক্ষে সন্ত্রাসীদের গোপন সমর্থক -- এই বদ্ধমূল ধারণাই বিজেপিকে ভোট দেওয়ার কারণ।

ট্রাম্প নামক দানবকে সমর্থন, গান্ধীহত্যা ও নাথুরাম গডসে, আর এস এস'এর হিটলার প্রীতি -- এসব আলোচনা আর কেউ করতেই চায়না। এখন, আমি নিজেও ওদের সঙ্গে থাকার সময়ে মুসলমানবিদ্বেষী ছিলাম। আমার স্মৃতিকথা ঘটিকাহিনিতে আমি একেবারে শৈশবেই বন্ধু চঞ্চল আহমেদের ছাতা কেমন করে ভেঙে দিয়েছিলাম বিনা কারণে, তার বর্ণনা আছে। এই বিদ্বেষ ঠিক কেমন করে আমার মধ্যে এসেছিলো, আমি বলতে পারবোনা। কিন্তু আমি জানি, আমার বাবা যিনি আর এস এস'এর নামকরা কর্মী ছিলেন, বাজপেয়ীর একেবারে কাছের বন্ধু ছিলেন, এবং গান্ধীহত্যার পর জেল খেটেছিলেন এবং জেল থেকে বেরিয়ে এসে কখনো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দেখেননি (অর্থাৎ সোজা বাংলায় আমার মা আধপেটা খেয়ে থাকতেন), সেই জিতেন্দ্রনাথ এবং সংঘের ভেতরকার পরিবেশই আমাকে মুসলমান-বিদ্বেষী করে তুলেছিল। 

কিন্তু দেখুন, আমার বাবা একেবারেই ভায়োলেন্টলি মুসলমান-বিদ্বেষী ছিলেন না। খুনের রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন না। তার জন্যে ওদের অন্য লোক ছিল। এখন তাদের সংখ্যা দশগুণ বেড়ে গেছে। আর আমি তো কলকাতায় বড় হওয়া, রাস্তায়-পাড়ায় আড্ডা দিয়ে ক্যারম-ক্রিকেট-ফুটবল খেলে, বাংলা সিনেমা দেখে আর বাংলা গানের পোকা হয়ে বড় হওয়া একটা ছেলে। বিদ্বেষ মুছে গেছে খুব তাড়াতাড়ি তখনই। 

অনেক, অনেক লিখেছি এই বিষয়ে -- আমার বইগুলোতে, হাজার পত্রপত্রিকায়, ব্লগে, আমার নতুন তৈরী করা মিডিয়া humanitycollege.org-এ। তাই এখানে সংক্ষেপে লিখছি। বাকিটা আপনারা লিখুন। শেয়ার করুন। সবাইকে ভাবতে, আলোচনা করতে আহ্বান করুন। এছাড়া আর কোনো রাস্তা নেই সামনে। 

অর্থাৎ ব্যাপারটা হলো, মানুষের মনের মধ্যে যে বিদ্বেষ ও হিংসার বীজ আছে, তাকে অনুকূল পরিবেশ ও জলহাওয়া বিষবৃক্ষে পরিণত করে। কিন্তু যদি মুক্ত চেতনা, এবং ভয়বিহীন শিক্ষা ও বিশ্লেষণের পরিবেশ সৃষ্টি করা যায়, তাহলে মানুষ প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে পারে। তখন তারা বোঝে, কোন রাজনীতি আসল বাস্তব সমস্যাগুলো থেকে মানুষের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্যে এই ঘৃণার ও যুদ্ধের রাজনীতি তৈরী করছে। আমার গুরু নোম চমস্কি যাকে বলেছেন, "ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট।" 

অর্থাৎ, একটা গণ-হিস্টিরিয়া তৈরী করা। মোদী, বিজেপি, এবিভিপির জেটলি, গোধরার অমিত শা, বাবরির আদভানি (বাবার বন্ধু), অথবা গৌরী লঙ্কেশ, পানেসর, কালবুর্গির হত্যাকারীদের মেন্টর'রা জনসম্মতি উৎপাদন করেছে তাদের প্রফিট-মিডিয়া ও আই টি সেলের সাহায্যে -- মুসলমান মানেই শত্রু, সমাজবাদ মানেই বিদেশী তত্ত্ব, আর ইন্টেলেকচুয়াল মানেই দেশদ্রোহী।

বিশ্লেষণহীন আনুগত্য শুধু পার্টির প্রতি, বা কোনো প্রধানমন্ত্রী বা নেতা-নেত্রীর প্রতিই হয়না। হয় একটা স্থিতাবস্থার ধোঁকাবাজির পক্ষেও। যেখানে গুরুতর সমস্যার কারণগুলো মিডিয়াতে বিশ্লেষণ করা একেবারেই নিষেধ, সেখানে সাধারণ মানুষ শত্রু বলে চিহ্নিত করবে কাকে? 

আমি ক্লাস ফোরে পড়ার সময়ে শত্রু চিহ্নিত করেছিলাম বাঙালি মুসলমান চঞ্চল আহমেদকে। আমি ক্রোধে অন্ধ ছিলাম। ভাবিনি এই চঞ্চল আমার কীই বা ক্ষতি করেছে? ভাবিনি, চঞ্চল তো রবীন্দ্রসঙ্গীতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল পর পর দু'বছর। বিষবৃক্ষের ফল খেয়ে আমার চোখ অন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। 

তারপর বহুকাল ধরে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মিশর, আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ইথিওপিয়া, প্যালেস্টাইন, সেনেগাল, মালি, ইরান আরো হাজার দেশের মুসলমানদের খুব কাছ থেকে দেখলাম। তখন মনে হলো আরো বেশি করে এই ঘৃণার ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট প্রোডাকশনের কথা।

পলিটিক্স অফ হেট্ কথাটা ভালো করে বুঝলাম। হিটলার, ট্রাম্প, মোদী -- সবাইকে বুঝলাম। কেউ কম, কেউ বেশি। 

তারপর কাছ থেকে দেখলাম রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, অদিতি মহসীন, তারেক মাসুদ, লালন ফকির, মৌলানা ভাসানী, আরজ আলী মাতুব্বর, বিসমিল্লা খাঁ, আমির খাঁ, আর আমার গুরুর গুরু কেরামত উল্লাকে। আর হাজার বাংলাদেশী বন্ধুর, পাকিস্তানী বন্ধুর বাড়ি গিয়ে খুব কাছ থেকে তাদের দেখলাম। বিষবৃক্ষের বিষফলের এ্যান্টিডোট। অন্ধ চোখ আবার জেগে উঠলো। 

আসলে, সত্য কঠিন। কঠিনকে ভালোবাসতে হয়, কারণ সে কখনো করে না বঞ্চনা। কবিগুরু বহুকাল আগেই বলে গেছেন।
মানুষ যদি নিজেকে নিজে প্রোপাগাণ্ডার আফিং খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখে, আর ভুল শত্রু চিহ্নিত করে ভুল সিদ্ধান্ত নেয় ভোটের বাক্সে, তাহলে তার মৃত্যু রোধ করবে কে?


তৃতীয় পর্যায় -- আর এস এস (RSS) ব্যাপারটা আসলে কী? খায়, না মাথায় দেয়?

আমি আর এস এস বা রাষ্ট্রীয় স্বয়মসেবক সংঘ নামক ফ্যাসিস্ট সংগঠনে ছিলাম পনেরো ষোলো বছর। শুধু ছিলাম না। নেতা ছিলাম। রাইজিং স্টার। আর এস এসের ছাত্র সংগঠন বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) আমি ছিলাম পশ্চিমবঙ্গ সেক্রেটারি। ওদের সঙ্গে থাকলে আজ এম পি কিংবা মন্ত্রী হতাম। 

ভাগ্যিস থাকিনি! ফ্যাসিস্ট পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপির লোকসভা সদস্য! যে রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়, আর হাজার মুসলমান বন্ধুর বাড়ি যায়। মার্কিন শ্রমিক ইউনিয়নের কলেজে পড়ায়। সেটাই জীবিকা। নিউ ইয়র্কে ব্ল্যাকদের পাড়ায় থাকে। ইমিগ্রেন্টদের বাঁচানোর চেষ্টা করে জেল বা খুনের হাত থেকে। সে ফ্যাসিস্ট!

তখন জানতাম না, আর এস এস ও হিন্দু মহাসভার নাথুরাম গডসে মহাত্মা গান্ধীকে খুন করেছিল। জানতাম না, রবীন্দ্রনাথকে ওরা ঘৃণা করতো। জানতাম না, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে ওরা শতহস্ত দূরে ছিল। জানতাম না, বাংলা ভাষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতি ওদের কাছে সম্পূর্ণ গৌণ। 

জানতাম না, মেয়েদের ওরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক মনে করে। এবং নিম্নবর্ণের মানুষদের তৃতীয় শ্রেণীর। মুসলমানদের ও সোশ্যালিস্টদের- যাক, সে কথা আর বললামনা। 

পরে জেনেছি। এবং বেরিয়ে এসেছি ঘৃণাভরে। 

কিন্তু সেসব দিন অন্যরকম ছিল। আমার কলকাতার বন্ধুরা হাসতো। কাছের বন্ধুরা মজা করতো। দূরের বন্ধুরা টিটকিরি দিতো। ওদের হিটলার স্টাইলের মিলিটারি কায়দা নকল করতো। হাতটাকে ব্র্যাকেটের মতো বুকের ওপর আড়াআড়ি রেখে মাথা ঝুঁকিয়ে স্যালুট করতো আমাকে। 

তখন আমিও জানতাম না, আর ওরাও জানতো না, এসব স্যালুট বাঙালি চরিত্রের সঙ্গে মেলেনা। ভারতীয় চরিত্রের সঙ্গেও মেলেনা। নাৎজি জার্মানিতে ব্রাউন শার্ট এবং গেস্টাপো বাহিনীর নানা আচার আচরণ, এবং রাজনৈতিক কৌশল আর এস এস রপ্ত করেছে, এবং উগ্রবাদী হিন্দুত্বর মোড়কে ভারতবর্ষে ছড়িয়ে দিয়েছে একটু একটু করে। 

RSS সুপ্রিম নেতা গুরুজী গোলওয়ালকার আমাকে সামনে বসিয়ে অনেক উপদেশ দিয়েছেন একবার। বানিয়ে বলছিনা। এসব কথা আমার বাংলা ও ইংরিজি স্মৃতিকথা-মূলক বইতে আছে। আমি জানতাম না, এই গুরুজী যাঁর ছবি আমাদের ঘরের দেওয়ালে বাবা ফ্রেমে বাঁধিয়ে টাঙিয়ে রাখতেন- ডাক্তারজি ও গুরুজী (ঠিক কমিউনিস্টদের বাড়িতে মার্কস ও লেনিনের ছবি টাঙিয়ে রাখার মতন) -- সেই গুরুজী হিটলারের উপাসক ছিলেন, এবং অদ্ভুত, অবিশ্বাস্য সব রেসিস্ট (racist) কথাবার্তা প্রকাশ্যে বলে গেছেন। 

আমার ধারণা, আমার বাবা জিতেন্দ্রনাথও ঠিকমতো সেসব হৃদয়ঙ্গম করেননি। যদিও তিনি ছিলেন বাজপেয়ীর, শ্যামাপ্রসাদের কাছের লোক। 

সঙ্ঘের অসংখ্য কর্মী ও নেতাকে আমি চিনতাম। ব্যক্তিগতভাবে জানতাম। তাদের বেশির ভাগ লোক পড়াশোনা করা লোক নয়। ভালো লোক হয়তো। দেশপ্রেমিক -- অবশ্যই ওদের দৃষ্টিভঙ্গিতে। ভীষণ আন্তরিক, কর্মঠ, এবং নিবেদিতপ্রাণ। তখন তাই ছিল -- ঠিক কমিউনিস্টদের মতনই। কিন্তু, ইন্টেলেকচুয়াল দিকটা একেবারেই ভোঁতা। বেশির ভাগ ভলান্টিয়ার -- স্বয়ংসেবক -- পড়াশোনায় মা গঙ্গা। দু চারটে শার্প ছেলেও ছিল। 

মরতে মরতে বেঁচে গেছি বেশ কয়েকবার। একবার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সমর্থনের কারণে, এবং ২৫শে মার্চের গণহত্যার বিরুদ্ধে স্কুলের সব বন্ধুকে কালো ব্যাজ পরানোর কারণে আমি নকশালদের "অতি স্নেহের পাত্র" হয়ে পড়েছিলাম। তারা আমাকে খুঁজছিলো। আমি পালিয়ে পালিয়ে থেকেছিলাম কিছুদিন। তারপর, জরুরি অবস্থার সময়ে আমি যখন জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলনে গোপনে কাজ করছিলাম, তখন ইন্দিরা গান্ধীর পুলিশ আমাকে ধরতে পারলে -- ওই যেমন লিখেছি আমার স্মৃতিকথা ঘটিকাহিনিতে -- পশ্চাদ্দেশে ইয়ে ঢুকিয়ে দিতো। এখন আবার শুনি, দেখি, আর এস এস ও বিজেপির হিংস্র ছেলেপিলে নোংরা কুৎসিত কথাবার্তা লিখছে এই ফেসবুকে, এবং আমার জন্মকাহিনী নিয়েও নানা প্রশ্ন তুলছে। 

সে যাই হোক। ওরাও আমার ইতিহাস জানেনা। আর, লাইক দেওয়া পাবলিকও না। শূণ্যগর্ভে অদ্ভুত ঘৃণা, হিংসা, উদাসীনতা এবং বুদ্ধিহীনতার খেলা চলছে। সে সময়ে আর এস এস সার্কেলে যে মস্তিষ্কহীনতা দেখেছি, তা এখন সর্বগ্রাসী, সর্বব্যাপী। ঠিক যেমন সে সময়ে হিন্দি সিনেমার জনপ্রিয়তা ছিল "রিকশাঅলা ক্লাসের মধ্যে," এখন পুরো দেশ আর সমাজটাই ইন্টেলেকচুয়াল দিক থেকে "রিকশাঅলা ক্লাস" হয়ে গেছে।
(আবার রিকশাঅলা ক্লাস বলতেই কিছু সমালোচনা শুনতে হবে জানি। তাই, কোট চিহ্নর মধ্যে দিয়েছি।) 

বুদ্ধিজীবিতা এখন উপহাসের বস্তু। একটা জাতি যখন ধ্বংসের পথে তলিয়ে যায় দ্রুত, তার যে নিশ্চিত চিহ্নগুলো থাকে, তার একটা হলো এই বুদ্ধিহীনতার উত্থান, এবং বুদ্ধিজীবিতার পতন।

এই আর এস এস হলো প্রথমে জনসঙ্ঘ ও পরে বিজেপির আসল সৃষ্টিকারী, এবং চালিকা শক্তি। মোদী, জেটলি, শাহ, গড়কড়ি, বিহারের সুশীল মোদী, এবং আজকের মিডিয়া-আলোকধন্য অসংখ্য বিজেপি নেতাই আর এস এস থেকে আসা। মোদী ১, মোদী ২, এবং জেটলি এবিভিপি থেকে আসা। ঠিক যেমন আমাকে পশ্চিমবঙ্গ আর এস এস প্রথমে এবিভিপি, এবং পরে বিজেপির প্রতিনিধি করে দিল্লি পাঠিয়েছিল জনতা পার্টির প্রথম সমাবেশে। 

আর এস এস একটি ফ্যাসিস্ট সংগঠন। তার বড় বড় নেতারা সবাই হিটলার বা ট্রাম্পের মডেলেই রাজনীতি করছে। এবং ভবিষ্যতেও করবে। 

আপনারা ঠিক করুন, তাদের সম্পর্কে ভালো করে জানতে চান কি না।

No comments:

অবিভক্ত বঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মের ইতিবৃত্ত, উত্থান ও পতন - এক অজানা ইতিহাস ।। রানা চক্রবর্তী

● ছবিতে - অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান (৯৮২ খ্রিস্টাব্দ - ১০৫৪ খ্রিস্টাব্দ)। বৌদ্ধধর্ম প্রচারে ও প্রসারে এই বঙ্গ সন্তানের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।...