আমরা বিশ্বাস করি, সম্পাদনার অধিকারী একমাত্র স্রষ্টা নিজে

বুধবার, ১৭ মে, ২০১৭

ধর্মের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ - ৩ || দারা চৌধুরী




বহুঈশ্বরবাদ ধর্ম (খ্রীঃপূঃ ৫০০০ - ৬০০ খ্রিষ্টাব্দ) 
-------------------------------------------------------------------
সময়ের বিবর্তনে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ সাধন হতে লাগল। মানুষ ততদিনে প্রকৃতির অনেক প্রতিকূলতাকে জয় করতে শিখেছে, জীবজন্তু কে পরাস্ত করতেও শিখে গেছে। ফলে পশুপূজা ও প্রকৃতি পূজা একটু একটু করে ক্ষয় পেতে থাকল। টোটেম ও পরিবর্তিত হয়ে সামাজিক রুপ পরিগ্রহ করল। কিন্তু তারপরও মানুষের আয়ত্বের বাইরে রয়ে গেল অনেক কিছুই। তখন প্রতিটি সমস্যা বা অনায়ত্বে থাকা বিষয়াবলীর জন্য একজন একজন পৃথক ঈশ্বরের ভাবনা চলে আসতে লাগল। এবং তাদের জন্য নানা পার্বণ তৈরী হতে লাগল। হিন্দু ধর্ম, প্রাচীন গ্রীক ধর্ম,, রোমান ধর্ম, প্রাচীন চীন ধর্ম এইরুপ ধর্মের মধ্যে পড়ে। 

ঠিক একই সময়ে বিভিন্ন গোষ্ঠী বা কওমের মধ্যে তুলনামুলকভাবে কিছু কিছু বুদ্ধিমান লোকের আর্বিভাব হয়। তারা গোষ্ঠী বা কওমের মধ্যে নিজেকে নেতা বা অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এসব নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ ওরসিপ বা পূজো-প্রার্থণার দায়িত্ব একাই নিতো। তারা মুরব্বী বা অভিভাবক হিসেবে নিজেদের কওমের মধ্যে নানাবিধ দাবি খাটাতো। নিজ বুদ্ধি বলে ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাদের অসুখ বিসুখ, জীন, ভূত ডাইনীদের নজর না লাগার জন্য নানাবিধ পথ্যাদি ও উপায় বাৎলে দিতো। জীবনের অভিজ্ঞতায় ঝড় বৃষ্টি খরা ইত্যাদির ইঙ্গিত ও কিছু কিছু ভবিষ্যদ্বাণী খয়রাত করে গোষ্ঠীর মধ্যে একজন জ্ঞানী ব্যক্তি হিসেবে সম্মান পেতো। এছাড়া বিপদ আপদ না আসার জন্য নানাবিদ তন্ত্র মন্ত্র, পূজো প্রার্থণা এসব ছিল তাদের মৌলিক দায়িত্ব। এভাবে যুগ ও সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এরা হয়ে উঠলো এক শ্রেণীর অঘোষিত নেতা। 

কোনো দেবতার দ্বারা সাহায্য লাভ কিংবা কোনো অপশক্তির বিরুদ্ধে কখন কি ভাবে মোকাবেলা করতে হবে তার দায়ভাগ তাদের উপর গুরু দায়িত্ব হিসেবে অর্পিত হলো। বিনিময়ে সেই ব্যক্তি সমাজের নানাবিধ সুযোগ সুবিধাও হাতিয়ে নিতে থাকলো। প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর একখানা উপাসনালয় বা দেবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য আর কোন বাধা থাকবেনা। কোন কাজে পাপ, কোন কাজে পুণ্য, কোন কাজ না হলে শক্তিমান দেবতা বিপদ দেবেন এবং কি কি কাজে তিনি খুশি হয়ে পুরস্কার দেবেন তার সব অনুশীলন এই দেবালয় থেকে শুরু হলো। কেউ কেউ পাহাড়ের গুহাকে ধ্যানের উপাসনা হিসেবে বেছে নিতেন। এভাবে নিজ বুদ্ধি বলে শুরু হলো আরেকটি নীরব সাম্রাজ্যের জয় যাত্রা। 

আদিরুপকীয় ধর্ম (খ্রিঃপূঃ ৪০০০ - ১৫০০ খ্রি্ষ্টাব্দ)
--------------------------------------------------------------------
পরবর্তীকালে ওরশীপ বা পূজা পার্বনের সাথে কিছু নীতিকথা, মানবিক আচরণের কথা যুক্ত করে এটিকে আরো অধিকতর মানবিক ও গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টাও চলল। কেউ কেউ বহু ঈশ্বরতার জটিল অংককে আরো সরল করার নিমিত্তে সব কিছুর জন্য একজনকেই ঘোষণা করে দিয়ে একেশ্বরবাদ প্রচার করতে লাগল। ফলে আব্রাহামিক ধর্মের আবির্ভাব ঘটে যার হাত ধরে পরবর্তীতে ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব ঘটে। একটু অদলবদল করে বিভিন্ন নামে আরো ধর্মেরও উন্মেষ হয়। যেমন- কনফুসিয়াস, শিন্তো ধর্ম, তাও ধর্ম, জৈনধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম। এই ধর্মগুলি যদিও আব্রাহামীয় ধর্মেরও আগে কিন্তু এখানে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অনেকটা গৌণ করে দিয়ে মানুষের কর্মকে বড় করে দেখিয়ে কর্মফল কে আবর্তিত করে নানাবিধ সুখ ও শাস্তির কথা বিধৃত হয়েছে। এবং উল্লেখিত অন্য ধর্মগুলিও একেশ্বরবাদী ধর্ম হলেও এর প্রসার আব্রাহামীয় ধর্মের মত না হওয়ায় এটিই প্রথম একেশ্বরবাদ ধর্ম হিসাবে স্বীকৃত হয়ে আছে।এখানে আরো একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, যদিও আব্রাহামীয় ধর্ম নিজেদের একেশ্বরবাদী দাবি করলেও তাদের কিছু কিছু বিশ্বাস আবার বহুশ্বরবাদীতা বা দ্বিত্ববাদীতার ইঙ্গিত বহন করে। যেমন - এন্জেলদের ধারণা, যেখানে গড কিছু কর্ম করার ক্ষমতা তাদের হাতে অর্পণ করেছেন যা মূলত বহুঈশ্বরবাদী হিন্দু ধর্মের দেবীদের সাথে তুলনীয়। আবার শয়তান এর ধারণা জরথুস্তদের দ্বিত্ববাদী আহরিমান ও আহোরা মাজদারই নকল মনে হয়। 



এই সময়ে আবির্ভূত এই ধর্মগুলির আবার একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো সমাজে প্রতিষ্ঠা পাওয়া ধর্মগুরুরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের জন্য নিজেদের মধ্যে নানা সময়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্র ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে জনগনের মধ্যে বিস্তার লাভ করে। রাষ্টের বিভিন্ন শক্তি তখন তার রক্ষাকবচ হয়ে তার স্থায়িত্ব দীর্ঘায়িত করতে প্রভাবকের দায়িত্ব পালন করে। এবং এটাও সত্য যে, রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলে ব্যর্থ ধর্মগুলো ক্রমশ অপসৃত হয়ে যেতে থাকে। ফলে চোখে পড়ার মত লোক সমর্থন নেওয়া ধর্মের সংখ্যা কমে মাত্র হাতে গোনা কয়েকটিতে দাড়িয়েছে। 

অধুনা বিশ্বে যদিও উপাসনালয় ভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার দেশের সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকটিমাত্র, তবুও রাজনীতি ও সমাজনীতির উপর এর প্রভাব এখনো ব্যপক। এক যদিও এই বড় ধর্ম গুলির মধ্যে নানা উপদলীয় ও উপগোত্রীয় ভাগে বিভক্ত হয়ে বস্তুত একই ধর্মকেই বহুধা ধর্মের রুপ দিয়েছে।
একই সাথে এটিও এ ধর্মগুলি (আদিরূপকীয় ধর্ম) র জন্য সত্য যে এই কালটিতে বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতি সাধন হওয়ায় এই ধর্মগুলিকে ঘিরে যে সকল আচার অনুষ্ঠান গোড়াতে শুরু হয়েছিল, কালের বিবর্তনে তার অধিকাংশ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। নয়তো ক্ষয়িষ্ণু আকারে সংখ্যা লঘিষ্ঠ মানুষের মাঝে অবস্থান করছে। এই সময়ে এই ধর্মগুলি বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচতে বিজ্ঞানের নানাবিধ আবিষ্কার, তত্ত্ব ও তথ্যের সাথে অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিজেদের সামঞ্জস্য ঘটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে এই ধর্মগুলি হয়ে উঠছে অনুষ্ঠান সর্বস্ব, বিবর্তিত বিশ্বাস নিয়ে, অথবা একই বিষয়ের নানাবিধ ব্যাখ্যা সম্বলিত হয়ে। 

বিকল্পিত ধর্ম ( ১৫০০ সাল- অদ্যাবধি) 
------------------------------------------------------
পনেরো শ' সালের পর পৃথিবীতে অনেক মতবাদ, আদর্শ ও দর্শণের আবির্ভাব ঘটলেও এসবের প্রচারকরা নিজেদেরকে অবতার কিংবা ঈশ্বর পুত্র ইত্যাদি দাবি করেন নাই । এর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেওয়া যদিও দুরুহ, তবে এটি ধরে নেয়া যায় যে, মানুষের সচেতনতা ও জ্ঞানের যে উৎকর্ষতা হয়েছে, এতে বিনা বাক্যব্যয়ে, বিনা বাধায়, বিনা যুক্তিতে তা মেনে নেবে এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ। একই সাথে এখানে প্রায় প্রতিটি ধর্মে এক ধরণে্র জঙ্গী ও উগ্রবাদী গোষ্ঠী তৎপর, যাদের কাজ হচ্ছে নতুন কোন ধর্মীয় মতবাদ প্রচার করলে তার বিরুদ্ধে সহিংস প্রতিবাদ থেকে শুরু করে গুপ্তহত্যা সবই করতে প্রস্তুত থাকে। ফলে নতুন কোন ধর্ম প্রচারে সহসা কেউ আর আগ্রহী হবে না, এটাই স্বাভাবিক।বাহাই, শিখ, ইয়াজিদী, সালাফী, কাদিয়ানী ইত্যাদি এ সময়ের বিকল্পিত ধর্মের উদাহরণ।

কোন মন্তব্য নেই:

পহেলা বৈশাখ : বাঙালির সার্বজনীন ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব।। অনাবিল সেনগুপ্ত

পহেলা বৈশাখ  বাংলা সনের প্রথম দিন। এই দিনটি দুই বাংলায় নববর্ষ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।  এটি বাঙালির একটি সর্বজনীন লোকউৎসব। এদিন আনন্দঘন ...