Wednesday, 5 February 2020

ম্যাজিক ও রহস্যের নাম উইলিয়ম শেক্সপিয়র'।। রানা চক্রবর্তী




আজ থেকে ঠিক ৪৫০ বছর আগে ২৬ এপ্রিল, ১৫৬৪ সালে স্ট্র্যাটফোর্ড আপন এভন-এর ভিকার (যাজক) লাতিনে নথি লিখেছিলেন, ‘জুলিয়েলমুস ফিলিউস ইয়োহানেস সাক্সপেরে’। অর্থাৎ ‘জন শেক্সপিয়রের সন্তান উইলিয়ম’। জন ও মেরি শেক্সপিয়রের প্রথম দুই সন্তান ছিল কন্যা, এবং তাঁদের একজন শৈশবে ও আর এক জন আঁতুড়েই মারা যায়। উইলিয়ম ছিলেন ওঁদের তৃতীয় সন্তান এবং প্রথম পুত্র। উইলিয়মেরও বাঁচার সঙ্কট কম ছিল না। সে কথায় যাবার আগে জাতকের জন্মদিনটাই ঠিক করে নেওয়া যাক। এখনও মান্য করা হয় এমন একটি বিবৃতিতে ই.কে.চেম্বার্স লিখেছিলেন: ‘উইলিয়মের সত্যিকার জন্মদিনটা জানা যায়নি। একটা বিশ্বাস আছে যে তারিখটা ২৩ এপ্রিল, ঠিক যে তারিখে ১৬১৬-তে ওঁর মৃত্যু হয়। ধারণাটা অষ্টাদশ শতকের এক ঐতিহাসিক ভুলের উপর দাঁড়িয়ে।’

খুবই সম্ভব যে শেক্সপিয়রের জন্ম ২১, ২২ বা ২৩ এপ্রিলের কোনও একটি দিন, তবে ২৩-এ ফেললে জন্ম ও মৃত্যু একই দিনে পড়ে বেশ নাট্য সঞ্চার হয়।

২৩শে এপ্রিলে মৃত্যুর আগে বেশ ভুগেছিলেন শেক্সপিয়র, সম্ভবত টাইফয়েডে। চমৎকার যত্নআত্তির জন্য মৃত্যু একটু দেরিতে হয় এবং কষ্টটাও বাড়ে। সেকালে টাইফয়েড মানেই সমানে মাথাব্যথা, ক্লান্তি, নিদ্রাহীনতা, জলতেষ্টা আর অস্বস্তি। মুখটাও শুকিয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছিল। সেটা আঁচ করা যায় ওঁর ডেথ মাস্ক থেকে সম্ভবত গড়া হোলি ট্রিনিটি চার্চে ওঁর মূর্তি দেখে।

মৃত্যুকালে শেক্সপিয়র তো সাহিত্যের বিস্ময় হয়েই গেছেন, ক’দিন বাদেই সমকালীন প্রতিভা বেন জনসন লিখেও দিলেন ‘হি ওয়জ নট অফ অ্যান এজ, বাট ফর অল টাইম!’

এবার ভাবা যাক, জগদ্বাসীর কী কপালটাই না পুড়ত, সাহিত্যলোকে কী ট্র্যাজেডিটাই না ঘটত যদি এই ট্র্যাজেডিয়ান জন্মাতেই না পারতেন। যার সমূহ সম্ভাবনা ছিল সে সময়টায়।

ইংল্যান্ডে সে বড় সুখের সময় নয়। স্ট্র্যাটফোর্ডে তিন দিনের উইলিয়মের নাম লিখেছেন যখন ভিকার জন ব্রেচগার্ডল, তখন সেখান থেকে মাত্র দু’দিনের ঘোড়ার গাড়ির দূরত্বে শিশুরা অহরহ মারা যাচ্ছে প্লেগে।

সেই ঐতিহাসিক ব্ল্যাক ডেথ-এর পর দেশের নানা জায়গাই ফের এক বীভৎস প্লেগের থাবায়। যখন উইলিয়ম জন্মাচ্ছে তখন মা মেরি শেক্সপিয়রের শহর ওই রোগের যাত্রাপথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। প্লেগ ক্রমশ উত্তরে চড়ছে।

১৪ই মার্চ চড়াও হল স্ট্র্যাটফোর্ডে। যাজক ব্রেচগার্ডল-এর বোন সিসেলি মারা গেলেন। দোরগোড়ায় যখন মৃত্যু, যাজকের দুশ্চিন্তা বাড়ল শহরের চেম্বার্লেন অর্থাৎ রাজসরকার জন শেক্সপিয়রকে নিয়ে। বেচারির দু’দুটি সন্তান অকালে গত, বৌটি সন্তানসম্ভবা, যে কোনও দিন প্রসব করবে, তারপর?

শিশুটি বাঁচল, প্লেগ পার করল, বড় হয়ে উইলিয়ম শেক্সপিয়র হল। কালে কালে যে নামটি দুটি জিনিসের সমার্থক হয়ে উঠল। এক, ইংরেজি ভাষা। দুই, সাহিত্য।

গত শতাব্দীর শেষে ‘টাইম’ পত্রিকা বিশ্ব জুড়ে এক মত যাচাই করে জানায় যে, দুনিয়ার মতে গত সহস্রাব্দের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকারের নাম উইলিয়ম শেক্সপিয়র। এই ভোটাভুটি না হলেও কারও সেটা জানতে বাকি ছিল না।
                           
কবি, নাট্যকার বা অভিনেতা— যে পরিচয়েই আপনি তাঁকে মনে রাখুন না কেন উইলিয়াম শেক্সপিয়ার শুধুমাত্র পাঠ্যবইয়ে আটকে থাকা ব্যক্তিত্ব নন। ১৬১৬-এর ২৩শে এপ্রিল তাঁর মৃত্যু হয়। এতদিন পরেও সেই ইংরেজকে সসম্মানে মনে রেখেছে গোটা বিশ্ব। কিন্তু যে অমোঘ প্রশ্ন শেক্সপিয়ারকে নিয়ে আজও তাড়া করে বেড়ায়, সেটা হল, তিনি কি মহিলা ছিলেন? বক্তব্যের সমর্থনে বিভিন্ন সময় ঐতিহাসিকরা বেশ কিছু তথ্য প্রকাশ করেছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত শেক্সপিয়ার আদৌ মহিলা ছিলেন কী না তা প্রমাণ করা যায়নি। বরং মনে করা হয়, এমিলিয়া বাসানো ল্যানিয়ার নামে এক মহিলা ছিলেন শেক্সপিয়ার যাবতীয় লেখনীর নেপথ্যে। কবির হয়ে কলম ধরেছিলেন এমিনিয়া। যদিও তা প্রকাশ পেত শেক্সপিয়ারের নামেই।

শেক্সপিয়ার কি সমকামী ছিলেন?

ইতিহাসবিদরা বলেন, তাঁর নাটক বা সনেটে এই আভাস পাওয়া যায় যে, শেক্সপিয়ার ছেলেদের বেশি পছন্দ করতেন। বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শেক্সপিয়ার ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক মাইকেল ডবসনের কথায়, ‘‘সে সময় ‘স্ট্রেট’ বা ‘গে’ সম্বন্ধে আলাদা কোনও ক্যাটেগরি ছিল না। শেক্সপিয়ারের সনেটে এমন অনেক ইঙ্গিত রয়েছে, যেখানে অল্পবয়সী পুরুষদের তিনি সেক্সি বলেছেন। ফলে এই প্রশ্নটা একেবারে উড়িয়েও দেওয়া যায় না।’’
                          
লন্ডন, ১৫৯৩। টেমস নদীর দক্ষিণে একটি এলাকা। বদ্যির চেম্বারে কাউচে আধশোয়া হয়ে নাট্যকার উইলিয়ম শেক্সপিয়র। সাপ্তাহিক কনফেশন-এ এসেছেন তিনি। আমাদের ভাষ্যে মনস্তত্ত্ববিদ-থেরাপিস্টের কাছে। খুব হ্যান্ডসাম উইল। নরম গোঁফ-দাড়ি, ঢেউখেলানো বাদামি চুল। মায়াবী চোখে লেগে আছে স্বপ্ন। সে কী! বইয়ের পাতায় বা পোস্টারে যে শেক্সপিয়রকে দেখা যায়, ঠান্ডা, বিষয়ী চোখে মেপে নিচ্ছেন জগৎটাকে, সেই যে ট্রেডমার্কা চওড়া কপাল এবং টাকওয়ালা, তিনি কই? এই উইলের বয়স তো সবে ঊনত্রিশ, তারুণ্যের দীপ্তিমাখা তাঁর মুখ। কিন্তু বেজায় বিমর্ষ কবি। ‘রাইটার্স ব্লক’ হয়েছে তাঁর। কিছু কাল যাবৎ লেখনী স্তব্ধ। কারণ, প্রেরণাদাত্রী মানসী নেই তাঁর হতভাগ্য জীবনে। শিল্পী পুরুষের চাহিদার হালহকিকত সম্পর্কে ওয়াকিবহাল বুদ্ধিমান থেরাপিস্ট স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন। ও, এই ব্যাপার! উপদেশ দেন, এই রোগের একটাই উপশম। চুটিয়ে প্রেম। এক্কেবারে রোম্যান্সে ভরপুর, উষ্ণ, মধুর, যৌন-প্রেম।

এই ভাবেই শুরু হয় জন ম্যাডেন পরিচালিত শেক্সপিয়র ইন লাভ (১৯৯৮) সিনেমা। সিনেমার প্লট একেবারেই হলিউডি রোম্যান্টিক ধাঁচার— ভায়োলা ডি লেসপ্‌স নাম্নী এক সুন্দরী, বিদুষী, ধনী কন্যা আর দরিদ্র কিন্তু উঠতি কবি-নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়রের গোপন লাগামছাড়া প্রেম। ফিল্মের প্লটে, প্রেমের ফলে চাঙ্গা হয়ে ওঠে মনমরা উইল। উদ্দাম প্রেমের জোয়ারে তরতরিয়ে চলে নাট্যকারের মনপবনের নাও, আর লেখা হতে থাকে ‘রোমিয়ো অ্যান্ড জুলিয়েট’। সিনেমায়, রোমিয়ো অ্যান্ড জুলিয়েট নাটকের অবিস্মরণীয় কিছু মুহূর্ত ও প্রেমের পঙ্‌ক্তি ব্যবহার করে টম স্টপার্ড ও জন ম্যাডেন দর্শককে পরিবেশন করেন চমকদার একটি খেলা: শেক্সপিয়রের প্রেমের অভিজ্ঞতা থেকেই সৃষ্টি হচ্ছে রোমিয়ো অ্যান্ড জুলিয়েট। না হলে কী করেই বা ওই অপূর্ব কোমল রোম্যান্টিক ভালবাসার অভিব্যক্তি সম্ভব?

যুক্তিটি প্রায় অকাট্য মনে হচ্ছে? আসলে শিল্প যে শিল্পীর জীবনেরই অনুগামী। এই বোধের সূত্র উনিশ শতকে রোম্যান্টিক কবি-সমালোচকদের। এমন কথা শুনলে ষোড়শ বা সপ্তদশ শতকের শিল্পীরা হেসে কুটোপাটি হতেন। নেচার বা প্রকৃতি নিশ্চয়ই বড় প্রেরণা, কিন্তু একই রকম গুরুত্ব আর্ট বা শিল্পের। অর্থাৎ শিল্পীর অনুপ্রেরণা হতেই পারে অন্য একটি শিল্পবস্তু। তা সে কবিতা, নাটক, মহাকাব্য, ছবি বা মূর্তি যা-ই হোক না কেন। তাকে নিজের করে নেওয়ার জন্য লাগে শিক্ষা, লাগে অধ্যবসায়। যেমন হয়েছিল শেক্সপিয়রের ক্ষেত্রে।
                           
২৬শে এপ্রিল ১৫৬৪-এ স্ট্র্যাটফোর্ডে জন ও মেরির প্রথম সন্তান উইলিয়াম শেক্সপিয়রকে সম্ভবত গ্রামার স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়। গ্রিক না হলেও সেখানে লাতিন পড়া হত। অতএব ইয়‌ং উইল-এর পাঠ্যক্রমে বিখ্যাত হিউম্যানিস্ট স্কলার ইরাসমাস, ওভিডের মেটামরফসিস, সেনেকার ট্র্যাজেডি, প্লটাসের কমেডি নিশ্চিত ছিল। এ ছাড়াও তিনি পড়েছিলেন রোমান ইতিহাসবেত্তা প্লুটার্কের গ্রিক ও রোমানদের ‘লাইভস’। পড়ার পদ্ধতিটা এখনকার মতো নয়। পাঠ্য থেকে শিক্ষণীয় যা কিছু, তাকে অনুবাদ ও অনুকরণের মাধ্যমে আত্মস্থ করা। এটাই হয়ে উঠেছিল কবি-নাট্যকার হিসেবে উইলিয়ামের আসল শিক্ষানবিশির জায়গা। কঠিন কিতাব পড়া ছাড়া ছিল ‘কমনপ্লেস বুক’— এক ধরনের নোটখাতা যাতে টুকে রাখা হত লাগসই বাক্যবন্ধ, যা প্রয়োজনে ঝটিতি ব্যবহার করে ফেলা যেত। সুতরাং অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজের চৌকাঠ না ডিঙোলেও শেক্সপিয়র নিজের রসদ সংগ্রহ করে নিতে পেরেছিলেন। স্কুল পাশ এবং ১৫৮০-এর শেষ দিকে লন্ডন আসার মধ্যে আট বছরের বড় অ্যান হ্যাথাওয়ের সঙ্গে তড়িঘড়ি বিয়ে, এবং তিন সন্তানের বাবা হয়েছেন শেক্সপিয়র। কিন্তু আর কী কাজকম্ম করেছিলেন তার হদিশ নেই। এর পরেই ভাগ্যান্বেষণে লন্ডন চলে যান উইল।

সেখানে থিয়েটার ব্যবসার রমরমা। প্রবল প্রতাপান্বিত মহারানি এলিজাবেথ নিজে নানা ধরনের ‘পারফরমেন্স’ করতে এবং নাটক দেখতে বড্ড ভালবাসতেন। নিজের সভায় হামেশাই ডেকে পাঠাতেন এই সব অভিনেতাদের, নিজের মনোরঞ্জনের জন্য। কিন্তু সেই সময় আমজনতার জন্য তৈরি হয়েছে পাবলিক থিয়েটার। টেমস নদীর দক্ষিণ পাড়ে, ব্যাঙ্কসাইড অঞ্চলে জমে উঠেছে একটা থিয়েটার পাড়া, অন্যটি নদীর উত্তরে, ভদ্দরলোকের পাড়া থেকে একটু দূরে, শহরের রক্ষণাবেক্ষণকারী কর্তামশাইদের চোখরাঙানির বাইরে, শোরডিচ এলাকায়।

দূরে, কারণ থিয়েটারকে মোটেই ভাল নজরে দেখেন না শহরের কর্তাব্যক্তিরা। তাঁদের বক্তব্য, যত রকমের অজাত-কুজাত-ছোটলোকেরাই দাপিয়ে বেড়ায় এই সব থিয়েটার মহলে। মালিকের পরিচয় না থাকলেই তো নটুয়াগুলোকে দু’ঘা দিয়ে জেলে পুরে দেওয়া যায়। তার উপর আছে বেশ্যাদের আনাগোনা। আর সবচেয়ে বজ্জাতি যেটা: বাচ্চা ছেলেগুলোকে নাটকের নারী চরিত্র সাজায়। সরু গলায় ইনিয়েবিনিয়ে কথা বলে, মেয়েলি ছলাকলা করে। তার পর তাদের সঙ্গেই কত পিরিতির ঢ‌ং!
                            
ইংল্যান্ডে রেনেসাঁস-এর সময়ে স্টেজে মেয়েদের অভিনয়ে বারণ নিয়ে বেশ একটা মজা আছে ‘শেক্সপিয়র ইন লাভ’ সিনেমায়। নাট্যকলার অনুরাগিণী ভায়োলা ছেলে সেজে রোমিয়ো চরিত্রের অডিশনে এসে উপস্থিত হয়। তার অভিনয় ক্ষমতা ও চেহারা দেখে চমৎকৃত উইল প্রথমে এই ছদ্মবেশী নারীর প্রেমে পড়ে, তার পর জানতে পারে তার পরিচয়। ভায়োলা শুধু অভিনয় করতে চেয়েছিল তার প্রিয় নাট্যকারের চরিত্র হয়ে। কিন্তু ধরা যাক নিজেই নাট্যকার হতে চায় এমন কোনও মেয়ে?  মনে পড়ে যায়, ১৯২৮-এ দেওয়া, ‘আ রুম অব ওয়ান্স ওন’ নামের একটি ভাষণে ভার্জিনিয়া উল্‌ফ সৃষ্টি করেছিলেন জুডিথ নামে শেক্সপিয়রের এক কাল্পনিক বোনের কথা। সে উইলের মতোই বুদ্ধিমতী, সৃষ্টিশীল। উইলের মতোই সে কবিতা আর নাটক লিখতে চায়, এবং স্বপ্ন দেখে, দাদার মতোই একটা কেরিয়ার গড়ে নেবে। এক রাতে লন্ডনে পালায় সে। কিন্তু হায়, তার কি সে সুযোগ মিলতে পারে! সে তো অল্পবয়সি একটি মেয়ে; খানিক বিদ্রুপ, ঠাট্টা ইত্যাদির পর নাটকের ম্যানেজার নিক গ্রিনের ‘দয়া’ হয়। তার কিছু মাস বাদে গর্ভবতী হয়ে জুডিথ আত্মহত্যা করে এক রাতে। উল্‌ফ লেখেন ‘কে অনুমান করবে কবির হৃদয়ের তীব্র টানাপড়েন, তার কষ্ট ও রাগ, যখন তাকে দুমড়ে মুচড়ে আটকে ফেলা হয়েছে নারীর শরীরের মধ্যে!’

নিজের নাটকে, বিশেষ করে কমেডিতে শেক্সপিয়র এমন সব প্লট তৈরি করতেন যেখানে মেয়ে চরিত্ররা (যারা আদতে বাচ্চা ছেলে) আবার পুরুষের ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারে। যেমন ‘অ্যাজ ইউ লাইক ইট’ নাটকে রোজালিন্ড চরিত্রটি প্রায় পুরোটা সময় অল্পবয়সি ছেলে হয়েই কাটায়, নাম নেয় গ্যানিমিড, দেবতা জুপিটারের প্রেমিক। এই ছদ্মবেশেই সে নায়ক অরল্যান্ডোর সঙ্গে নিপুণ ভাবে প্রেম করে। সাধে রেগে যেতেন পিউরিটানরা? আরে এ তো আদতে পুরুষ আর কচি ছেলের লটঘট! কোনও রাখঢাকের বালাই নেই।

তবে তাঁদের সাবধানবাণী দর্শকের ভিড় আটকাতে অক্ষম। অনেক মাথা খাটিয়ে বানানো হয়েছে মনোরঞ্জনের এই নতুন স্থাপত্য। লোকজন তখন দেবতা, হুরি-পরি যেমন মানে, তেমনই শয়তান, ডাইনি, ডেভিলেও বিশ্বাস রাখে। তাই রঙ্গমঞ্চটি স্বর্গ, মর্ত, পাতাল— এই তিন ভাগে বিভক্ত। স্টেজের তিন দিক ঘিরে দর্শকের আসন; উপর মহলের কর্তাবাবু অর্থাৎ আর্ল, ডিউক, বড়লোক জ্ঞানী-গুণীদের জন্য দামি সিট। আর নিচু তলার, খেটে খাওয়া মানুষজন, যারা স্টেজ ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকে, সেই ‘গ্রাউন্ডলিং’-দের জন্য এক পেনি দামের টিকিট।

এ হেন থিয়েটার জগতে এসে পড়লেন স্ট্র্যাটফোর্ডের ছেলে। কারা যেন চাউর করেছিল, প্রথম দিকে থিয়েটারে বড়লোক সাহেবসুবোদের ঘোড়ার দেখভাল করতেন উইল। সেটা মনে হয় গালগপ্পো। আসলে আমাদের স্বভাবটাই ও রকম। যে নাট্যকার এমন অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনি বানায়, তাঁর নিজের জীবনটা পানসে হলে কি মানায়?
                          
তখন প্রতি সপ্তাহে দর্শকদের মনোরঞ্জনের চাহিদা মেটাতে করতে হয় প্রায় তিন-চারটে নাটক। সবই চটজলদি পাবলিক খাবে কি না, সেই চিন্তা মাথায় রেখে। অনেকে মিলে একটাই নাটক লেখা, যাকে বলে ‘কোলাবরেশন’, তা-ও হত হামেশাই। হয়তো সেই কাজেই হাত মকশো করতেন উইল। সেখানে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিত নাট্যকারদের কমতি নেই। আছেন জন লিলি, জর্জ পিল, টমাস ন্যাশ, রবার্ট গ্রিন এবং সেই সময়ে শ্রেষ্ঠ নাট্যকার হিসেবে খ্যাতির তুঙ্গে যিনি—শেক্সপিয়রের সমসাময়িক ক্রিস্টোফার মার্লো। এক ‘ইউনিভার্সিটি উইট’ রবার্ট গ্রিন, বেজায় খাপ্পা হয়েছিলেন শেক্সপিয়রের ওপর। গাল দিয়েছিলেন, ‘আমাদের ধার করা পালকে সজ্জিত কাক’ বলে। অথচ দু-তিন বছরের মধ্যেই ষষ্ঠ হেনরিকে নিয়ে তিনটে নাটক ও খান তিনেক কমেডি লিখে ফেলেছেন শেক্সপিয়র। সবগুলোই হাউসফুল। আর শিক্ষা ও প্রতিভা সত্ত্বেও পয়সাকড়ির মুখ দেখেননি ইউনিভার্সিটি উইট-দের অনেকেই। কেবল স্টেজের ম্যানেজার, শেয়ার হোল্ডার আর রিচার্ড বারবেজ-এর মতো কিছু তারকা অভিনেতাই মোটা অঙ্কের অর্থ আয় করেন। আর লেখকদের প্যামফ্লেট ছাপাতে হয়। রোগে ভুগে মরতে হয়।

চোখের সামনে নাট্যকার-লেখকদের এই দৈন্যদশা দেখেছিলেন বলেই কি শেক্সপিয়র ১৫৯৯-এ নিজে ‘লর্ড চেম্বারলেন্স মেন’ বলে নট্ট কোম্পানিতে শেয়ার কিনতে শুরু করেছিলেন? যাতে নিজের পরিশ্রমের মূল্য থেকে কেউ বঞ্চিত না করতে পারে তাঁকে? গ্লোব থিয়েটার, যেখানে অভিনীত হত তাঁর অধিকাংশ নাটক, সেখানেও হিসেবি ছিলেন উইল। টাকাপয়সার ব্যাপারে সাবধানী শেক্সপিয়র কোন ব্যবসায় লগ্নি করতে হয় তা বিলক্ষণ বুঝতেন। তাই নিজের গাঁ-ঘর স্ট্র্যাটফোর্ডে জমিজমা আর কটেজ কিনে তাড়াতাড়ি অবসর গ্রহণ করেছিলেন? শোনা যায়, শেক্সপিয়র নাকি সুদে টাকা ধার দিতেন, আর কিঞ্চিৎ মামলাবাজও ছিলেন।

তবু আমরা তো বিশ্বাস করতে চাই, শেক্সপিয়র তাঁর শেষ নাটক ‘দ্য টেম্পেস্ট’-এর সেই রাজা প্রস্পেরো, প্রকৃতিকে এবং দ্বীপের বাসিন্দাদের যে আপন জাদুতে  মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। তাই প্রস্পেরোর বিদায়বাণী ‘লেট ইয়োর ইন্ডালজেন্সেস সেট মি ফ্রি’-কেই আমরা দর্শকদের উদ্দেশে শেক্সপিয়রের টা টা বলে ভাবতে ভালবাসি।
                           
শেক্সপিয়র সব মিলিয়ে সাঁইত্রিশটা নাটক লিখেছিলেন। কী নেই তাতে? যমজ চরিত্র নিয়ে মশকরা, মুখরা নারীকে বশ করা, গাধার মুখোশ পরা গেঁয়ো লোকের সঙ্গে পরিদের রানির প্রেম, বীভৎস খুন, ধর্ষণের পর জিভ এবং হাত কেটে ফেলা, মহাযুদ্ধ, রাজদ্রোহ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, ইডিপাস কমপ্লেক্সে ভুগে মা’র প্রতি বিষোদ্গার, বাবাকে নৃশংস ভাবে অন্ধ করে দেওয়া, গর্ভবতী স্ত্রীকে পরপুরুষের সঙ্গে লিপ্ত বলে সন্দেহ, কী না আছে তাতে! এই নাটকের সব চরিত্র— নায়ক, নায়িকা, ভিলেন— সবাইকেই তো তিনিই সৃষ্টি করেছিলেন। তার মানে, এই চরিত্রদের বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তাদের মতো করে ভাবা বা ব্যবহার করা কল্পনা করতে হয়েছিল তাঁকে!

এই নিয়েই চমৎকার লিখেছেন আর্জেন্টিনার লেখক হোর্হে লুই বোর্হেস। ‘ইতিহাসে আছে যে মৃত্যুর কিছু আগে বা পরে শেক্সপিয়র নিজেকে ঈশ্বরের সন্নিকটে দেখতে পেলেন। এবং বললেন ‘আমি, যে এত মানুষ হয়েছি, এখন, হয়তো বা বৃথাই, শুধু এক জন হতে চাই। আমি হতে চাই’। তখন ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে দিয়ে ভেসে এল ঈশ্বরের বাণী ‘হে আমার শেক্সপিয়র, আমিও কোনও একক ব্যক্তি নই। আমি পৃথিবীটাকে স্বপ্ন দেখেছি, ঠিক যেমন তুমি স্বপ্ন দেখেছ নিজের কাজের মধ্যে। আমার স্বপ্নের অনেক ফর্মের মধ্যে তুমিও আছ। আমারই মতো যে আদতে অনেক, কিন্তু কেউ নয়’। ‘এভরিথিং অ্যান্ড নাথিং’—সেই কাহিনির নাম দিয়েছিলেন বোর্হেস।
                            
শেক্সপিয়র বাস্তবিকই একটা রূপকথার মতো। গবেষণার তো শেষ নেই ওঁর জীবন ও কাজ নিয়ে, তবে যতই জানা যায় ততই যেন রহস্য বাড়ে। সব চেয়ে বড় রহস্য এই যে, এই চারশ’ বছরেও ওঁর সাঁইত্রিশ নাটক, একশ’ চুয়ান্ন সনেট এবং ছ’টি কবিতাগুচ্ছের কোত্থাও কোনওখানে বয়সের ন্যূনতম ছায়া বা ছোঁওয়া পড়ল না।

এখনও পৃথিবীর কোথাও কিছু নতুন দেখলে যেমন কিছু অলস মস্তিষ্কের মানুষ মধ্যযুগীয় ভবিষ্যদ্বক্তা নোস্ত্রাদামুসের লেখাপত্তর ঘাঁটেন, তেমনি গভীর, মননশীল মানুষরা ফিরে যান শেক্সপিয়রে, দেখতে ওই বিষয় ও পরিস্থিতি বোঝাতে এভনের কবি কিছু বলে গেছেন কিনা। প্রায়শ খুঁজে পানও, কারণ মনের গভীরে খননকার্যে এমন মেধা পৃথিবী বড় একটা দেখেনি।

রহস্যের সঙ্গে সঙ্গে অপূর্ব সব রোমাঞ্চও ঘিরে আছে কবির জীবনে। ওঁকে আঁতুড়ে প্লেগ নেয়নি, এতেই জগতের সৌভাগ্যের ইতি? কেন, শেক্সপিয়রের এত এত কাজ যে শেষ অবধি অক্ষত রইল, এই বা কম সৌভাগ্য কী?

তাঁর সময়ের রচনার কত কিছুই যে হারিয়ে নিশ্চিহ্ন হল তার কি কোনও হিসেব আছে? বলা হচ্ছে ১৫৬০ সাল থেকে (ওঁর জন্মের চারশ বছর আগে) ১৬৪২ সাল অবধি (ওঁর মৃত্যুর ছাব্বিশ বছর পর) যত যা নাটক লেখা হয়েছিল তার মাত্র এক ষষ্ঠাংশ আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে।

শেক্সপিয়রকে যে আমরা পুরোটাই পেয়ে গেলাম তার কারণ দু’টো। এক, কবির কপাল (আমাদেরও), আর দুই, এতই সফল ও জনপ্রিয় তাঁর কাজ।

আরেকটি কারণও কিন্তু আছে। শেক্সপিয়রের জন্মের সময় থেকে পরের পঞ্চাশ বছরে ইংল্যান্ডের জনসংখ্যা তিরিশ লক্ষ থেকে বেড়ে পঁয়তাল্লিশ লক্ষে দাঁড়ায়। তাতে নাটকমনস্ক, বোঝদার দর্শকেরও একটা লক্ষণীয় বৃদ্ধি ঘটে।
                           
লন্ডন শহরও শেক্সপিয়রের জীবনে সরস্বতী ও লক্ষ্মীর মিলিত আশীর্বাদের মতো হয়েছিল। বলা বাহুল্য, বাণিজ্যের চাপ এবং ওজনদার, মেধাবী নাটকের দাবি দুটিই ওঁর উপর সমান ভাবে রেখে গেছে লন্ডন। নাটকের অভিনেতাদের কাজের পরিধি ও সেই কাজের সূক্ষ্মতা বাড়াতেও গোটা কর্মজীবনে তিনি নতুন, নতুন অভিজ্ঞতা ও চিন্তা নিয়ে নাড়াচাড়া করে গেছেন।

তাঁর জীবনীর পর জীবনী ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে যে, জীবনের তাবৎ পরিস্থিতি থেকে তিনি ক্রমান্বয়ে অন্তর্দৃষ্টি ও বিচার অর্জন করেছেন। মগজের ওঁর এই অনিঃশেষ উর্বরতাকে পাঠক, দর্শক ও অভিনেতারা কেবলই ‘অলৌকিক’ বলে থেমে পড়েননি, চেয়েছেন শৈল্পিক ও বৌদ্ধিক শক্তির চুড়ান্ত মিলন হিসেবে ব্যাখ্যা করতে।

আর তার পরেও যে প্রশ্ন ও রহস্যের সমাধান হল না তা তো উনবিংশ শতকের কবি ও সমালোচক ম্যাথু আর্নল্ড-এর ওঁকে নিয়ে সনেটেই ভাস্বর: ‘আদার্স অ্যাবাইড আওয়ার কোয়েশ্চেন, দাও আর্ট ফ্রি/ উই আস্ক অ্যান্ড আস্ক, দাও স্মাইলেস্ট অ্যান্ড আর্ট স্টিল/ আউটটপিং নলেজ।’ (‘আর সবাই আমাদের প্রশ্নের মুখে, তুমি স্বাধীন/ আমাদের শুধু জিজ্ঞাসা আর জিজ্ঞাসা,/ আর তুমি? জ্ঞানসীমার উর্ধ্বে কোথাও/ স্মিতমুখে স্থির।’)

এই জ্ঞানসীমার ঊর্ধ্বে ওঠার সিঁড়িটা যে কী পৃথিবী সেই থেকে ভেবেই চলেছে। এত যাঁর নায়ক ও নায়িকা, খলনায়ক ও শয়তান, এত প্রেম, এত প্রেমিক, পোর্শিয়ার তর্কবিচার, রিচার্ড দ্য থার্ডের চক্রান্ত, হ্যামলেটের দ্বন্দ্ব, লেডি ম্যাকবেথের ক্রূর হিসেবনিকেশ, ওথেলোর ঈর্ষা, রোমিও-জুলিয়েটের নিষিদ্ধ মিলন কিংবা কিং লিয়রের করুণ দর্প....এই এত সব আসে কোত্থেকে, কী পড়াশুনো, কোন সংসর্গে, এর কী নিষ্পত্তি আমরা পাচ্ছি?

কবির ওই বহুচর্চিত ‘স্মল ল্যাটিন, লেস গ্রিক’ (সামান্য লাতিন, আরও কম গ্রিক) দিয়ে কী করে ‘জুলিয়াস সিজার’ বা ‘টাইমন অফ অ্যাথেন্স’ ফলে এ এক ব্রহ্মজিজ্ঞাসার মতো। রাফায়েল হলিনশেড-এর ‘ক্রনিকলস’ নামের ঐতিহাসিক গল্পমালা থেকে কী ভাবে ম্যাকবেথ নাটক ও চরিত্র বেরোয়, বাজারচলতি নাটক, লোকমুখে ধরা রহস্যকাহিনি বা প্রাচীন বৃত্তান্ত থেকে কী ভাবে উদ্ধার হয় ‘হ্যামলেট’ বা ‘কিং লিয়র’ এ অনুমান করাও মুশকিল।
                         
শেক্সপিয়র কী পেলেন এবং তা নিয়ে অবশেষে কী করলেন, এই চিন্তাভাবনা থেকেই একটা শাস্ত্র দাঁড়িয়ে গেছে। আমরা বরং ওঁর জীবনের দিকেই একটু তাকালে পারি।

এটা সত্যি, যে শেক্সপিয়র কোন রচনার কোনখানে যে তিনি নিজে অবতীর্ণ এ রহস্য রহস্যই রইবে। যদিও সমগ্র রচনাবলি জুড়ে সেই এক তিনিই তো নানা চরিত্রে, নানা সুরে, নানা মনে, নানা রকমে কথা বলে যাচ্ছেন, সেখানে তাঁর জীবনের প্রলেপ কোথায়? এই সব যোগাযোগ, সংসর্গ নিয়েও শাস্ত্র গড়ে উঠেছে।

দুটি গল্প বলি।

শেক্সপিয়রের এগারো বছরের ছেলে হ্যামনেট (নামটা তাঁর প্রসিদ্ধতম নায়কের মতো শোনায় না?) মারা গেল।

অথচ বেন জনসনের মতো পুত্রশোকে কোনও রকম কাব্য করার দিকেই তিনি গেলেন না, যদিও মাঝেসাঝে বলা হয় যে ৩৭ নং সনেটে ‘অ্যাজ আ ডেক্রেপিট ফাদার টেকস ডিলাইট...’ (যেমন কোনও জীর্ণ পিতা হর্ষ পান....) তিনি নাকি ছেলের কথাই বলছেন। কে জানে!

তবে হ্যামলেটের মৃত্যুর বছরখানেকের মধ্যে স্ত্রী ও দুই কন্যাকে পল্লির পুরোনো গির্জার মুখোমুখি বড়সড় বাড়িতে নিয়ে ওঠেন। স্ট্র্যাটফোর্ডের দ্বিতীয় বৃহৎ মকানটির জন্য কবিকে দাম গুনতে হয়েছিল ১২০ পাউন্ড। সময়ের বিচারে বেশ মোটা টাকা। অবশ্য ১৫৯৭-৯৮ সালে কবির অবস্থা খুবই ভাল। ‘নিউ প্লেস’ বাড়িটার সমস্যাও ছিল। দু’টো খুনের ইতিহাস সেখানে।

হিসেব করে নির্দয় খুনের যে চিত্র আঁকলেন শেক্সপিয়র তাঁর লেডি ম্যাকবেথ চরিত্রে, তাতে কিছুটা কি ছায়াপাত নিউ প্লেস-এর দুটি খুনের প্রথমটায়?

রাজা অষ্টম হেনরির ডাক্তার টমাস বেন্টলি ভাড়ায় থাকতেন বাড়িটায়। বাড়ির মালিক ক্লপটন থাকতেন ইতালিতে। তো ডক্টর বেন্টলি মারা যেতে দেখভালের অভাবে করুণ হাল হল বাড়ির। এই সুযোগে ১৫৬৩ নাগাদ বাড়িটা কব্জা করল জনৈক উইলিয়ম বট।

পাড়ার মুচি হোয়েলার-এর জবানি মতে বট তার কন্যাকে ওই বছরেই খুন করে ওখানে। কেন এবং কী করে? বলা হচ্ছে যে ইসাবেলার স্বামীর সম্পত্তি ছিল বাড়িটা এবং ওর বাবা বট বহুত চালাকি করে একটা দলিল নকল করে, যেখানে বলা হল যে ইসাবেলা যদি নিঃসন্তান থেকে মারা যায় তাহলে সম্পত্তি যাবে ওর বাবা উইলিয়ম বট-এর হাতে। স্বামীর দখলে নয়।

মুচি হোয়েলার স্বচক্ষে দেখেছিল বট পানীয়ে বিষ মিশিয়ে মেয়েকে খুন করছে। বৃত্তান্তটা আরও ক’জন সমর্থন করেছিল, কিন্তু খুনের মামলা রুজু হয়নি। কারণ ইসাবেলার স্বামী টের পেয়েছিল যে শ্বশুর বট তাহলে ওকে আইনের গেরোয় গেরোয় সর্বস্বান্ত করে ছাড়বে। বট বাড়িটা বিক্রি করেছিল উইলিয়ম আন্ডারহিলকে। যাঁর পুত্র, যাঁরও নাম উইলিয়ম আন্ডারহিল, বাড়িটা বেচলেন শেক্সপিয়রকে। বিক্রেতা আন্ডারহিল একেবারেই সুবিধের লোক ছিলেন না, তবে তাঁর অপ্রাপ্তবয়স্ক পুত্র ফুক বজ্জাতিতে বাপকে ছাড়ায়। সে বিষ খাইয়ে বাপকে মারল এবং দাবি করল বাবা মৌখিক ভাবে জমি, বাড়ি সব তাকে দিয়ে গেছেন।

১৫৯৯-এ ফুক আন্ডারহিল-এর (তত দিনে প্রাপ্তবয়স্ক) ফাঁসি হল এবং ১৬০২-এ তার ভাই হার্কিউলিসের হাত থেকে শেক্সপিয়র অবশেষে বাড়ির ন্যায্য কাগজপত্র হাতে পেলেন। ভোগান্তি পোহাতে হল প্রচুর, কিন্তু কবির আসল লাভটা অন্যখানে।

বট ও আন্ডারহিলের কেচ্ছাকাণ্ড থেকে তিনি গার্হস্থ্যখুনের আদিম আক্রোশ ও অন্তর্লীন ঘৃণাস্রোতের ছবি পাচ্ছিলেন। ঘটনার যা-যা তিনি জানতে পেরেছিলেন বট এবং আন্ডারহিল সংক্রান্ত সে সবকে তিনি এক মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা দিলেন তাঁর প্রসিদ্ধতম এবং সম্ভবত, সেরা নাটক ‘হ্যামলেট’-এ যা লেখা হল একেবারে ওই সময়েই, ১৫৯৯-১৬০০ খ্রি।

‘হ্যামলেট’-এর খুনগুলো ঠিক ওভিদ পাঠ থেকে উঠে আসে না, কবির ‘টাইটাস অ্যান্ড্রোনিকাস’ নাটকের খুনের মতো হয় না। বরং সাক্ষাৎ অভিজ্ঞতা আর অতুলনীয় বিচার ও কল্পনাশক্তির মিশেলে এক দুরন্ত বাস্তব হয়ে ওঠে।

অফুরান অর্থ, কূটার্থ, স্ববিরোধ, চূড়ান্ত ও বিহ্বলকর সৌন্দর্যে আচ্ছন্ন ‘হ্যামলেট’ কিন্তু বহু ঝুঁকি নিয়ে গড়া এক সৌধের মতো। দর্শককে বিভ্রান্ত করেও প্রথম থেকেই বিপুল জনপ্রিয় এই নাটক। যার মধ্যে বোদ্ধারা থেকে থেকে ব্যক্তি শেক্সপিয়রের স্বর শুনতে পেয়েছেন। নানা নাট্যে ইস্কুলজীবন, প্রেম, বিবাহ, নাট্যমহল ইত্যাদির বাস্তব ছোঁওয়ার পাশাপাশি ‘হ্যামলেট’-এ অন্তত খুনের বাড়ি নিউ প্লেস-এর অনুপ্রবেশ নিয়ে ভাবার কিন্তু যথেষ্ট কারণ।
                            
অবশ্য শেক্সপিয়র নিয়ে ভাবার জন্য মালকোঁচা বেঁধে মাঠে নামার উদ্যোগ নিতে হয় না কোনও দেশেই। শিশুকাল থেকেই সব দেশের ছেলে-মেয়েরা শুনে আসে যে সেরা প্রেমের গল্প ‘রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট’, সেরা খুনের গল্প ‘ম্যাকবেথ’, সেরা ভূত ও গোয়েন্দা গল্প ‘হ্যামলেট’ এবং সব চেয়ে কষ্টের গল্প ‘কিং লিয়র’। দেশে দেশে বুলিতে বুলিতে রক্তে রক্তে শেক্সপিয়র।

আসল কথাটা হল ম্যাজিক। এই যে ওঁর ম্যাকবেথকে অবলম্বন করে হিন্দি ছবি হল ‘মকবুল’ কী ‘ওথেলো’ অবলম্বনে হল ‘ওম্কারা’, সেখানেও তো সেই সাড়ে চারশো বছর বয়সি সাহেবের ম্যাজিক। কিংবা পরিণত বয়সে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বাংলায় ‘রাজা লিয়র’ করে দুনিয়াকে তাক খাইয়ে দেওয়া। কবির কালে রিচার্ড বার্বেজ যে কত বড় অভিনেতা তা ধরা পড়ত কী করে ‘কিং লিয়র’ লেখা না হলে? তেমনি বাংলায়ও সৌমিত্রর পূর্ণ আত্মপ্রকাশের জন্য দরকার ছিল একটা ‘রাজা লিয়র’।

শেক্সপিয়র বলেই না কথা! এত বৈচিত্র, গভীরতা, সংরাগ তাঁর বাণীতে যে তাঁদের কোনও অটল মূর্তি রচনা হবার নয়। মানুষের মনের মতোই ওঁর কথামালা, সারাক্ষণ বদলে বদলে অভিনব হচ্ছে। চারশ’ বছর ধরে এক অপরূপ সমকালীন লেখক। ইদানীং তো আরও এক সামাজিক লক্ষণ ধরা পড়ছে নিজের সময়ের আধুনিকতাকে ব্যাখ্যা করতে শেক্সপিয়রে ফিরতে হচ্ছে। বাজ লুরম্যান যেমন আজকের প্রেমের ছবি ফোটাতে লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও-কে নিয়ে তুললেন নয়া আঙ্গিকে ‘রোমিও জুলিয়েট’।

তাঁর সিনেমায় দু’দুবার শেক্সপিয়রে আশ্রয় নিয়েছিলেন সিনেমার ‘শেক্সপিয়র’ আকিরা কুরোসাওয়া। কেরিয়ারের প্রথম ভাগে ম্যাকবেথকে জাপানি আদলে গড়ে ‘থ্রোন অফ ব্লাড’-এ। আর ফিল্ম জীবনের প্রান্তে এসে ‘কিং লিয়র’ অবলম্বনে ‘রান’ ছবিতে। হায়, হায়, কী ভয়ানক সুন্দর, মর্মভেদী ও মহৎ কাজ যার প্রশংসার শেষ দূরে থাক, শুরুই করা যায় না।

লরেন্স ওলিভিয়ে, জন গিলগুড, পল স্কোফিল্ড, রিচার্ড বার্টন বা পিটার ও টুল-এর শেক্সপিয়র অভিনয় দেখে যা হয় সেটাই ন্যায্য প্রতিক্রিয়া। প্রথমে স্তম্ভিত হওয়া, পরে শয়নে স্বপনে সেই দৃশ্যে, সেই ধ্বনিতে, সেই রহস্যে ফিরে যাওয়া।

এই ফেরার একটা গল্প বলা যাক। লন্ডনের থিয়েটার হলে হ্যামলেটের ভূমিকায় নেমেছেন রিচার্ড বার্টন। মাঝে মাঝেই সংলাপ বলতে গিয়ে খেয়াল করছেন যে হলের প্রথম সারির থেকে কে এক জন অতি মৃদু স্বরে ওঁর সঙ্গে সংলাপ গেয়ে যাচ্ছেন। এতটাই নিখুঁত ও সুরে যে ভেতরে ভেতরে হয়তো তারিফও করে ফেলেছেন। শো শেষে গ্রিনরুমে এসে খবর পেলেন যে কণ্ঠস্বরটি ছিল স্যর উইনস্টন চার্চিলের।
                             
আজও তাঁর পাঠকের সংখ্যা অগণিত। কিন্তু ঠিক কী রকম দেখতে ছিলেন তিনি, তা নিয়ে রহস্য রয়েই গিয়েছে। এ বার সেই রহস্য ভেদ করা যাবে বলে সাম্প্রতিক অতীতে দাবি করেছিলেন ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ্‌ মার্ক গ্রিফিথস। গ্রিফিথসের দাবি ছিল, ষোড়শ শতকের উদ্ভিদ-সংক্রান্ত একটি বইয়ে তিনি ‘আবিষ্কার’ করেছেন শেক্সপিয়রের জীবদ্দশার একটি ছবি! সেই ছবি প্রকাশিতও হয়েছিল একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায়। পত্রিকার সম্পাদক মার্ক হেজও জানিয়েছিলেন, এটি শেক্সপিয়রের এক মাত্র প্রামাণ্য ছবি বলেই তাঁরা মনে করছেন। গ্রিফিথস জানিয়েছিলেন, শেক্সপিয়রের যখন ৩৩ বছর বয়স, তখন ছবিটি আঁকা হয়েছিল। পেশায় উদ্ভিদবিদ্ মার্ক জানিয়েছিলেন, উদ্ভিদবিদ্‌ জন গেরাদের একটি জীবনীগ্রন্থ নিয়ে গবেষণা করার সময়ই কয়েকটি বিশেষ ধরনের নকশা নজরে আসে তাঁর। ১৪৮৪ পৃষ্ঠার বইটির প্রথম পাতায় উইলিয়াম রজার্সের এই কারুকার্য পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। তাঁর দাবি ছিল, প্রথমে সেগুলি কাল্পনিক মনে হলেও পরে চারটি ছবি এবং বিভিন্ন ফুলের নকশার হেঁয়ালি সমাধান করেন তিনি। ওই নকশাগুলির সঙ্গে তিনি শেক্সপিয়রের কবিতা ‘ভেনাস ও অ্যাডোনিস’ এবং নাটক ‘টাইটাস অ্যানড্রনিকাসে’র অনুষঙ্গও খুঁজে পেয়েছেন বলে তিনি জানিয়েছিলেন।
                          ©️রানা চক্রবর্তী©️
অবশ্য মৃত্যুর পরেও রহস্য কিন্তু পিছু ছাড়েনি শেক্সপিয়রের। জানা গিয়েছিল তাঁর কবরে থাকা দেহাবশেষের মধ্যে তাঁর মাথার খুলিটিই নাকি দীর্ঘদিন ধরে ছিল না! তাঁর কফিনে তা হলে, খুলি ছাড়াই শুয়ে রয়েছেন শেক্সপিয়র? প্রায় আড়াইশো বছর ধরে? ২২০ বছরেরও বেশি আগে চুরি হয়ে গিয়েছিল ‘রাজকোষে’? থুড়ি, যাঁর-তাঁর নয়। চুরি হয়ে গিয়েছিল শেক্সপিয়রের কফিনে? আর তা যে সে চুরিও নয়। একেবারে খুলি চুরি!

সেই চুরির ‘খবর’ খুব ছোট্ট করে বেরিয়েছিল ‘আরগোসি’ নামে একটা ম্যাগাজিনে, ১৮৭৯ সালে। তাতে বলা হয়েছিল, ওই খুলিটা চুরি করা হয়েছিল ১৭৯৪ সালে। কিন্তু সে খবরে কেউ তেমন আমল দেননি। কিন্তু, সেই ‘খবর’টা একেবারেই সত্যি ছিল। এমনটাই পরে সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছিলেন স্ট্যাফোর্ডশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক কেভিন কল্‌স এবং ভূ-পদার্থবিদ এরিকা উৎসি। ব্রিটেনের স্ট্র্যাটফোর্ডে হোলি ট্রিনিটি চার্চের প্রাঙ্গণে যেখানে সমাহিত করা হয়েছিল শেক্সপিয়রকে, সেখানে ওপর থেকে মাটি ফুঁড়ে ঢোকা রাডার (জিপিআর) দিয়ে গবেষকরা দেখেছিলেন, কফিনে শেক্সপিয়রের মাথার বিকৃতি ধরা পড়েছে। গবেষকদের দাবি ছিল, শেক্সপিয়রের খুলিটা চুরি হয়েছিল বলেই তাঁর মাথার ওই বিকৃতি হয়েছিল।

শেক্সপিয়রের মৃত্যুর ৪০০ বছর পূর্তির সময় এই সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারটি নিয়ে একটি ডকুমেন্টারিও বানানো হয়েছিল। তার নাম ছিল- ‘সিক্রেট হিস্ট্রি: শেক্সপিয়র্স’ টোম’। সেটি ২০১৬ সালে প্রথম দেখানো হয়েছিল ব্রিটেনের একটি টেলিভিশন চ্যানেলে। শেক্সপিয়রকে ওই জায়গাতেই সমাহিত করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে অবশ্য ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্যে বিতর্ক ছিল বহু দিন ধরেই। তাঁদের বক্তব্য ছিল, জায়গাটা এতটাই ছোট যে, কোনও পূর্ণবয়স্ক মানুষের কফিন সেখানে রাখা সম্ভব নয়। সন্দেহের আরও একটি কারণ, সেখানে শেক্সপিয়র বা কোনও ব্যক্তির নামও লেখা হয়নি।
                              
কিন্তু শেক্সপিয়রের খুলিটা যে সত্যি-সত্যিই চুরি হয়েছিল, সে ব্যাপারে কী ভাবে নিশ্চিত হয়েছিলেন গবেষকরা?

এক, মাটি খুঁড়ে খুলিটা চুরি করার পর জায়গাটা আবার নতুন করে মাটি দিয়ে যে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল, তার প্রমাণ মিলেছে। এটা করা হয়েছিল, যাতে সেখানকার মাটি না ধসে যায়।

দুই, রাডার দিয়ে এটাও দেখা গিয়েছে, হোলি ট্রিনিটি চার্চের প্রাঙ্গণে যেখানে শেক্সপিয়রের স্ত্রী অ্যানা হ্যাথাওয়ে আর তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যদের সমাহিত করা হয়েছিল, সেই জায়গাটা মাটি থেকে খুব সামান্য নীচে। সাধারণত, কাউকে তার চেয়ে মাটির অনেক গভীরে সমাহিত করা হয়। অথচ শেক্সপিয়ার আর তাঁর স্ত্রীর কফিন দু’টি মাটির এক মিটারেরও কম গভীরে রাখা রয়েছে!

তিন, সম্ভবত কোনও কফিনেও রাখা হয়নি শেক্সপিয়র আর তাঁর স্ত্রীর দেহ দু’টি। কারণ, সেখানে কফিনের কোনও ধাতব বস্ত্তর হদিশ মেলেনি। হয়তো দু’জনের দেহ শুধুই কাগজ বা গাছের ডালপালা, পাতা, ঝোপঝাড় বা আগাছা দিয়ে মুড়ে পুঁতে দেওয়া হয়েছিল।

চার, শেক্সপিয়রের খুলিটি যেখানে রাখা রয়েছে বলে কেউ কেউ দাবি করতেন, ওরসেস্টারশায়ারের সেই সেন্ট লিওনার্ডস’ চার্চেও গিয়েছিলেন ওই গবেষকরা। তাঁরা দেখেছেন, ওই খুলিটি আদৌ শেক্সপিয়রের নয়। তা এক মহিলার। আর সেই মহিলা মারা গিয়েছিলেন ৭০ বছর বয়সে।

দুনিয়ার সব আবিষ্কারই যেমন রক্ষণশীলদের ধারণাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত করেছে, এই আবিষ্কারের ক্ষেত্রেও তার ব্যাতিক্রম ঘটেনি। হোলি ট্রিনিটি চার্চের রেভারেন্ড প্যাট্রিক টেলর বলেছিলেন, ‘‘ওখান থেকে খুলিটা চুরি হয়েছিল, এমন কোনও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য রয়েছে বলে আমার মনে হয় না।’’ শেষে আরও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন টেলর! বলেছিলেন, ‘‘জোর-জবরদস্তি করে সত্যের অনুসন্ধান করায় কোনও বাহাদুরি নেই। বরং থাক না রহস্যটা!’’

গ্যালিলিও গ্যালিলিকেও এক সময় চার্চের কম সমালোচনা শুনতে হয়নি!
                           
(তথ্যসূত্র:
১- Three In One Knowledge: Great Authors - Leo Tolstoy, Charles Dickens, William Shakespeare, Maanu Graphics Publishers.
২- Outlines Of The Life Of Shakespeare, James Orchard Halliwell-Phillipps, Nabu Press (২০১২)।
৩- Shakespeare's Lives, S. Schoenbaum, Oxford University Press (১৯৯১)।
৪- The Lodger Shakespeare: His Life on Silver Street, Charles Nicholl, Viking Adult (২০০৮)।
৫- A Life of William Shakespeare (Cambridge Library Collection - Shakespeare and Renaissance Drama), Sidney Lee, Cambridge University Press (২০১২)।
৬- আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৫শে এপ্রিল ২০১৪ সাল, ২৩শে এপ্রিল ২০১৬ সাল, ২০শে মে ২০১৫ সাল ও ২২শে এপ্রিল ২০১৮ সালে প্রকাশিত প্রবন্ধ।)
                             ©️রানা চক্রবর্তী©️ 

No comments:

অমল শুভ্রতার কারিগর।। রানা চক্রবর্তী

ঠাকুরবাড়ির ছেলে, সমাজ বদলানোর ঝোঁকটাও তো থাকবেই। সময়ের থেকে অনেকখানি এগিয়ে ছিল তাঁর শিল্পী-মন। সব সময়ে নতুন রকম কিছু করার ভাবনায় মেত...