সুরের রাজপুত্র || রানা চক্রবর্তী



একদিন সাতসকালে মান্না দে'র কাছে শচীনকর্তার ফোন এল। '‘আজ কি ফ্রি না কি রে ভাই?’’, ‘‘আজ রেকর্ডিং নেই।’’ ‘‘তোর লিগা দরবারির উপর একটা গান বাঁধছি। এক বারটি চইল্যা আয়।’’ দরাবারি। মধ্য রাতের রাগ। খুব মিষ্টি রাগ। মান্না দে'র অসম্ভব পছন্দের। শচীনদেবের মুখে শুনেই রেওয়াজে বসে গিয়েছিলেন। না জানি কী গান পাবেন তাঁর কাছে! বিকেলে কর্তার বাড়ি যেতেই শুনলেন, গানটা মেহমুদের লিপে যাবে। মান্না দে জানিয়েছিলেন, ‘‘দেখি একটা মজার গান শোনাচ্ছেন। বললাম, আরে আমায় কোনটা গাইতে হবে শোনান।’’ ‘‘এই গানটাই গাইবি।’’ কী গান? ‘জিদ্দি’ ছবির ‘পেয়ার কি আগ মে তনবদন জ্বল গয়া’। দরবারি কানাড়ার মতো একটা ভাবগম্ভীর রাগে অমন কৌতুক গান কী করে যে বেঁধেছিলেন উনি! মান্না দে বারবার বলতেন, ‘‘ওটা শচীনদার পক্ষেই সম্ভব।’’ ‘পুছনা ক্যায়সে’ গানটার গল্প এক বার শুনলে ভুলতে পারা মুশকিল। ছবির নাম ‘মেরি সুরত তেরি আঁখে’।

একবার, রাত প্রায় সাড়ে ন’টা। বাড়ির পোশাকে শচীনকর্তা হাজির হলেন মান্না দে'র ‘আনন্দন’-এ। তখন রাতের খাওয়াদাওয়া শেষ। তাতে কী! শচীনদেব এসেই বললেন, ‘‘মনা, হারমোনিয়ামটা লইয়া বইস্যা বড়।’’ শেখালেন আহির ভৈরবী রাগের ওই গান। যাওয়ার সময় বললেন, ‘‘কাল রেকর্ডিং। গানটা তোর মতো করে যে ভাবে ভাল হয় গাইবি।’’ এ ছবির অন্য গান মহম্মদ রফিকে দিয়ে গাইয়েছিলেন শচীনদেব। তাতে মান্না দে'র খুব অভিমান হয়েছিল। ‘পুছনা ক্যায়সে’ গাইতে হবে শুনে বলেছিলেন, ‘‘আবার আমায় কেন! বেশ তো রফি ছিল।’’ এক ধমকে থামিয়ে দিয়েছিলেন শচীনকর্তা, ‘‘তুই অত কথা কস ক্যান? এইডা তর গান। তুই-ই গাইবি।’’ যে বছর এই গান বেরোয়, সে বছর জাতীয় পুরস্কার ঘোষণার সময় শচীনদেব হাসপাতালে। মান্না দে দেখা করতে গিয়েছেন। দেখামাত্র প্রশ্ন, ‘‘কী হইল, পাইলি তুই?’’ ঘটনাটা বলতে গিয়ে মান্না দে জানিয়েছিলেন, ‘‘আমার মুখে ‘না’ শুনে শচীনদা বললেন, ‘এই গানের পরও তরে দিল না! কথা শেষ হতে দেখি, শচীনদার চোখে জল।’’

আর এক রাতে এলেন শচীনকর্তা। অবশ্য ফোন করে। এসেই খুব ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘‘মানা, এক বোতল হুইস্কি, জল আর বৌমাকে বল পাঁপড় আর নানারকম ভাজা করে আনতে।’’ মান্না দে তো শশব্যস্ত হয়ে সব ব্যবস্থা করতে লাগলেন। মনে মনে ভাবছেন শচীনদার আবার কী হল? মাথায় গন্ডগোলটোল হয়েছে নাকি! শচীন কর্তা গ্লাসে দু’চার ফোঁটা হুইস্কি ফেললেন, হোমিওপ্যাথি ডোজের মতো। জল ঢাললেন গ্লাসভর্তি। ততক্ষণে টেবিলও পাঁপড় এবং নানারকম ভাজায় ভর্তি হয়ে গিয়েছে। মান্না দে শচীন কর্তার কাণ্ড দেখছেন। গ্লাসের অতল জলে হারিয়ে যাওয়া কয়েক ফোঁটা হুইস্কি নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন, আর ‘অনেক খাব, অনেক খাব’ ভঙ্গি করে শুধু পাঁপড়ের ছোট্ট একটা টুকরো মুখে দিলেন। রাত একটু বাড়তে ‘বৌমা, আজ আসি গিয়া’ বলে শচীন কর্তার অন্তর্ধান। আসলে হয়েছে কী, সেদিন সন্ধ্যায় এক প্রোডিউসর ও ডিরেক্টরের আসার কথা ছিল শচীন কর্তার বাড়িতে। একটা মালয়ালি ছবিতে সুর করার জন্য। প্রচুর টাকার অফার। শচীন কর্তার কথা ছিল: ‘‘ওই ভাষাটাই বুঝি না, সুর করুম কী কইর‌্যা!’’ তাঁদের কাছ থেকে লুকিয়ে থাকার জন্যই চলে এসেছিলেন মান্না দে'র বাড়িতে।

আরেক বারের ঘটনা, শচীন কর্তা একদিন ডেকে পাঠিয়েছেন মান্না দে কে। একটি গান নিয়ে বসতে হবে। একটু দুপুর করে আসতে বলেছেন। মান্না দে কে দেখে বললেন, ‘‘মানা, আইসা গ্যাছো! ভাল হইছে। তুমি খাইছ?’’ মান্না দে তো খেয়ে আসেননি। দুপুরে আসতে বলেছেন। মান্না দে ‘না’ বলতে শচীনদা বললেন, ‘‘অ! তাইলে তুমি বসো। আমি চারটি খাইয়া লই।’’

আর এক দিন শচীন কর্তা ও মান্নাদা খেতে বসেছেন। হঠাৎ শচীন কর্তা একটা ঘিয়ে রঙের শিশি বের করে নিজের গরম ভাতে ঢালতে লাগলেন। ঢালতে ঢালতে বললেন, ‘‘তোমার বৌদি পাঠাইছে। ঘিয়ের গন্ধ দ্যাখছ? মানা, খাইবা নাকি একটু?’’ মান্না দে কিছু বলার আগেই শচীন কর্তা পরিপাটি করে ঘিয়ের শিশিটা বন্ধ করে বললেন, ‘‘আজ আর তোমার ঘি খাইয়া কাজ নাই।’’

নিজের আত্মজীবনী 'জীবনের জলসাঘরে' গ্রন্থে কিংবদন্তি শিল্পী শ্রী মান্না দে লিখেছেন,

‘‘দু’জন শিল্পীর প্রতি কেন জানি না ভীষণ দুর্বল আমি। একজন রফি সাহাব। আরেকজন শচীন কর্তা। খুব ছোটবেলায় কাকা কৃষ্ণ চন্দ্র দে-র কাছে শচীন দেব বর্মন এসেছিলেন। আমি সেদিন বাড়িতেই। ফুটবল খেলতে যাইনি। কাকার ঘরে শচীন কর্তা বসতেই আস্তে আস্তে প্রায় গা ঘেঁষে বসে পড়লাম। কী সুন্দর দেখতে! টকটক করছে গায়ের রং। আমি অত ফর্সা নই। রীতিমতো কালো| ফলে, এক দেখাতেই শুধু ফর্সা রঙের জন্য কর্তাকে দারুণ পছন্দ হয়ে গেল।

সেদিন গান নিয়ে অনেকক্ষণ আড্ডা মেরেছিলেন কাকার সঙ্গে। আমি এক মিনিটের জন্য সেখান থেকে উঠিনি। এরপর কাকার অনুরোধে গান ধরলেন দেব দাদা। খুব খুঁটিয়ে সব গান শুনলাম| কর্তা চলে গেলেন। আমি পরের দিন কাকার কাছে বসে ওই গানগুলোই ফের গাইলাম। একদম কর্তার মত করে। ওরকম নাকি নাকি গলায়। সঙ্গে সঙ্গে কাকার এক ধমক, ‘মানা, ওভাবে নাকি নাকি গলায় গাইছ কেন? ওটা কর্তার নিজস্বতা। কাউকে নকল কর না জীবনে দাঁড়াতে পারবে না। তোমার মত করে গাও।’ কাকার কথা শুনে সেদিনই অনুকরণ করার অভ্যেস ছাড়লাম। কিন্তু শচীন কর্তা মনের গভীরে রয়েই গেলেন।

ওই দিনের পর শচীন কর্তার সঙ্গে সাময়িক বিচ্ছেদ।
....

শচীন কর্তার প্রতি দুর্বলতার কথা তো শুরুতেই বলেছি। সেই দুর্বলতা আরও বেড়ে গেল মুম্বইয়ে কাজের পর। হিন্দি-বাংলা মিশিয়ে অসাধারণ কম্পোজিশন, অদ্ভুত গায়কী তাঁর। একই সঙ্গে মারাত্মক ভয়ও পেতাম কর্তাকে। ১৯৬৬-র দুর্গা পঞ্চমী। কলকাতায় সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, উৎপলা সেন তাঁদের বাড়িতে জলসার আয়োজন করেছেন। আমি ছাড়াও আমন্ত্রিত হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরি, শ্যামল মিত্র। গিয়ে শুনলাম, কর্তাও নাকি আসবেন।

রাত ঘড়ি ১০-টার কাঁটা ছুইছুই। সবাই এসেছেন। কর্তার দেখা নেই। আমরা মুখ চাওয়াচায়ি করছি। আচমকা ডোর বেল বাজল। সঙ্গে সানুনাসিক কন্ঠ, ‘সতীনাথ আসো নাকি?’ আমি, উৎপলা, সতীনাথ প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে দরজা খুললাম। দেখি, হাসিমুখে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরে কর্তা দাঁড়িয়ে। উৎপলার গলায় আনন্দের কান্না, অভিমানের সুর মিলেমিশে একাকার, ‘এত দেরী করলেন দাদা!’ একহাতে উৎপলাকে জড়িয়ে হাসিমুখে আমাদের সবার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ফ্লাইট লেট করসে। কয়নের আর কিসসু নাই রে!’

সেই সন্ধেয় আমি গাইলাম, ‘তুমি আর ডেকো না’। শ্যামল শোনালো, ‘যা যা রে যা, যা পাখি’। উৎপলা পরিবেশন করল, ‘কিংশুক ফুল হিংসুক ভারী’। যথারীতি সেদিনেও আমাদের গিলে খেয়ে নিলেন ‘রাজা’ কর্তা। আসর জমিয়ে দিলেন, ‘টাকডুম টাকডুম বাজে’ গান দিয়ে। সেদিন বুঝেছিলাম, আরেকজন মান্না দে হতেই পারেন। কিন্তু আরেকজন শচীন কর্তা? কোনওদিন, কেউ হতে পারবে না।’’

‘আমি সেই ত্রিপুরার মাটির মানুষ।’

কোন ত্রিপুরার?

যেখানে ‘‘ধানের খেতে চাষিরা গান গাইতে গাইতে চাষ করে, নদীর জলে মাঝিরা গানের টান না দিয়ে নৌকা চালাতে জানে না, জেলেরা গান গেয়ে মাছ ধরে, তাঁতিরা তাঁত বুনতে বুনতে আর মজুরেরা পরিশ্রম করতে করতে গান গায়। ...আমি সেই ত্রিপুরার মাটির মানুষ — তাই বোধহয় আমার জীবনটাও শুধু গান গেয়ে কেটে গেল।’’

এই মানুষটিকে চিনতে আমাদের বিন্দুমাত্র ভুল হয় না। তিনি আমাদের শচীন কর্তা। শচীন দেববর্মণ। ত্রিপুরার এই মানুষটি না কুমিল্লার, না কলকাতার, না মুম্বাইয়ের। তিনি আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের। রাজনীতিবিদরা দেশ ভাঙতে পারেন। দেওয়াল তুলতে পারেন। সুর আর ছন্দের প্রবাহকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বন্দি করতে পারেন না।

‘ত্রিপুরার রাজবাড়ির রাজকুমার’ ছিলেন শচীন কর্তা। রাজবাড়ির লোকজন চাইতেন, তিনি যেন সাধারণ মানুষদের সঙ্গে মেলামেশা না করেন। অথচ কী লিখলেন শচীন কর্তা? ‘‘আমি তাঁদের এ আদেশ কোনদিনও মেনে চলতে পারিনি। ...মাটির টান অনুভব করে মাটির কোলে থাকতেই ভালোবাসতাম। ...আমার এই আচরণ ও স্বভাব রাজপরিবারের কেউ পছন্দ করতেন না।’’

ত্রিপুরার রাজপরিবারের বিস্তারিত সালতামামিতে যাচ্ছি না। মহারাজা ঈশ্বানচন্দ্র মাণিক্যের দুই পুত্র। ব্রজেন্দ্র চন্দ্র ও নবদ্বীপ চন্দ্র। নবদ্বীপ চন্দ্রের পাঁচপুত্র, চারকন্যা। সবার ছোট ছিলেন শচীন দেববর্মণ। ওই যে বলছিলাম, রাজপরিবারের লোকেরা সাধারণ মানুষজনের সঙ্গে রাজকুমারদের মেলামেশা পছন্দ করতেন না, শচীন কর্তার বাবা নবদ্বীপ চন্দ্র ছিলেন তাঁদের চেয়ে আলাদা। বাবার কথা বলতে গিয়ে শচীন কর্তা লিখেছেন, ‘‘বাবার কিন্তু কোনপ্রকার ‘Pride’ বা ‘Prejudice’ ছিল না।’’

যদি এই সুর ও সংগীত সাধকের জীবনকথা লিখতে হয়, তবে তাকে তিন পর্বে ভাগ করে আলোচনা করতে হয়। কুমিল্লা পর্ব, কলকাতা পর্ব ও মুম্বাই পর্ব। শচীনদেব ‘যেমন গান বাজনায় তেমনি খেলাধুলায় চৌকস, টাউন হলের মাঠে টেনিস খেলায় একজন পয়লা নম্বরের খেলোয়াড়। পড়াশোনায়ও ভালো। মনোযোগী ছাত্র। অবসর সময়ে বাঁশি বাজান, তবলায় সংগত করেন, মাছ ধরার বাতিক প্রচণ্ড।’

শচীন কর্তা ‘আর বাঁশি’ নয়, ‘টিপরাই বাঁশি’ বাজাতেন। নারায়ণ চৌধুরি লিখেছেন, ‘‘গান গাইবেন শচীন দেববর্মণ ও হিমাংশু দত্ত। আমরা সব শ্রোতার দল সার বেঁধে বৈঠকে হাজির। মনে আছে শচীনদেব প্রথমে গাইলেন ‘চেয়ো না সুনয়না আর চেয়ো না এই নয়ন পানে’ — নজরুলের প্রসিদ্ধ গজলগীতি। প্রথম গানেই তিনি আসর মাত করে দিলেন। সে যে কী সুরের সম্মোহন বলে বোঝাতে পারব না। আজও এই বৃদ্ধ বয়সে সেই গানের ভালো লাগার স্মৃতি মনে হলে গায়ে‌ কাঁটা দেয়। ...সেদিন হিমাংশু দত্তও কয়েকটি গান গেয়েছিলেন — তার মধ্যে নিজের সুরারোপিত গান ছিল আবার অন্যবিধ গানও ছিল। অজয় ভট্টাচার্যের লেখা ‘হাসুহানা আজ নিরালা ফুটিলি কেন আপন মনে’ গানটি এবং একটি মীরার ভজনের কথা আজও মনে পড়ে। ...সুর সংযোজনায় তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়... তবে যাকে বলে কণ্ঠশিল্পী তা তিনি ছিলেন না।’’

শুরুতে শচীন কর্তা কয়েকবছর ইউসুফ হাইস্কুলে পড়ে‍‌ছেন। ক্লাস ফাইভ থেকে কুমিল্লা জেলা স্কুলে পড়েছেন। ১৯২০ সালে ম্যাট্রিক পাশ করেন। তারপর তিনি কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হন। ১৯২২ সালে শচীন কর্তা আই এ এবং ১৯২৪ সালে বি এ পাশ করেন। তারপর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পড়া শেষ করেননি। বাবা তাঁকে বিলেত পাঠাতে চেয়েছিলেন। রাজি হননি। শচীন কর্তার কুমিল্লা পর্ব তাহলে কতদিন? ১৯০৬ সালে জন্ম। ১৯২৪ সালে কলকাতায় আসা। বলা যেতে পারে উনিশ বছর।

প্রথম কবে শচীন কর্তা বাইরে গান করেছেন? তাঁর নিজের কথায়, ‘পঞ্চম শ্রেণিতে ছাত্রজীবনে বাবার শেখানো গান আমি সরস্বতী পূজায় আমাদের স্কুলের অনুষ্ঠানে গেয়েছি।’ সে গান খুব ভালো হয়েছিল। স্কুলের প্রধান শিক্ষক প্রশংসা করে নবদ্বীপ চন্দ্রকে চিঠি দিয়েছিলেন। প্রথম শংসাপত্র বা প্রথম সাম্মানিকের কথা কেউ কি কখনও ভুলতে পারে? বলছি বটে আমরা কুমিল্লা পর্ব, কলকাতা পর্ব ও মুম্বাই পর্ব — কোনও স্রষ্টার জীবনে এভাবে স্পষ্ট দেয়াল তোলা যায় না। যখন তিনি কলকাতায়, কুমিল্লায় নিয়মিত আসতেন। যখন তিনি মুম্বাইয়ে, কলকাতায় নিয়মিত এসেছেন। তবে একথা ঠিক, যে সম্ভাবনার উন্মেষ দেখা গিয়েছিল কুমিল্লা শহরে, তা বিস্তার পেয়েছে কলকাতা ও মুম্বাই শহরে। দুই মহানগরে শচীন কর্তা গানের ভুবন গড়ে তুলেছিলেন। সে ভুবন অনন্য, অপরাজেয় ও অবিস্মরণীয়। জীবনের প্রথম লগ্ন থেকেই শচীন কর্তা অর্থের জীবনই বেছে নিতে পারতেন। সে পথে গেলেন না তিনি। একটা সময়ের পর বাবার কাছেও আর্থিক সাহায্য চাননি। কলকাতায় জীবন শুরু করার ছ’বছরের মাথায় ১৯৩০ সালে বাবা নবদ্বীপ চন্দ্র প্রয়াত হন।

যে কোনও সংগীত শিল্পীর কথা উঠলেই জানতে ইচ্ছে করে অনেকের, কে ছিলেন ওই শিল্পীর সংগীত গুরু? কলকাতায় শচীন কর্তার সংগীত শিক্ষা অনেকটাই প্রাতিষ্ঠানিক ছিল বলা যায়। বদল খাঁ, কৃষ্ণচন্দ্র দে এবং ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে গান শিখেছেন। শাস্ত্রীয় ও ধ্রুপদ সংগীতের তালিম নিয়েছেন। যে মানুষ লিখেছিলেন, ‘ভাটিয়ালির সুরে ও কথায় নিজেকে হারিয়ে ফেলতাম’, তাঁর প্রথম দুই গুরু অজানা ও অচেনা ‘মাধব ও আনোয়ার’।

মাধব ও আনোয়ারের পরিচয় দিয়েছেন শচীন কর্তা নিজেই। আর এই পরিচয় যখন তিনি দিয়েছেন তখন শিল্পীর খ্যাতি জগৎময় প্রসারিত। শচীন কর্তা লিখেছেন, ‘‘মাধব নামে আমাদের এক বৃদ্ধ চাকর ছিল। রবিবার স্কুল ছুটির দিনে খাওয়া-দাওয়ার পর দুপুরে এই মাধব আমাদের সুর করে রামায়ণ পড়ে শোনাত। সে যখন সুরে রামায়ণ পড়তো, তখন তার তান খট্‌কি ছাড়া, সরল সোজা গানের ধরন আমাকে পাগল করে দিত। কোন ওস্তাদি নেই, কিন্তু কত অনায়াসে সে গেয়ে যেত। ...আমাদের বাড়িতে আনোয়ার নামে আরেক ভৃত্য ছিল। ...আনোয়ার আর আমি সুযোগ বুঝে ছিপ নিয়ে বসে যেতাম — আর দু’জনে মাছ ধরতাম। তারপর গান গাইতে গাইতে পুকুরের ধারে-ধারে ও বাগানে দু’জনে বেড়িয়ে মনের কথা বলতাম। আনোয়ার রাত্রে তার দোতারা বাজিয়ে যখন ভাটিয়ালি গান করত, তখন আমার ব্যাকরণ মুখস্থ করার দফারফা হয়ে যেত। ...ব্যাকরণ মুখস্থ, অঙ্ক কষা ছেড়ে আনোয়ারের কোল ঘেঁষে বসে তার ভাটিয়ালির সুরে ও কথায় নিজেকে হারিয়ে ফেলতাম। এরাই হলো, লোকসংগীতের আমার প্রথম দুই গুরু — মাধব ও আনোয়ার।’’ তার মানে শৈশ‍‌বে সুরের নির্মাণ হচ্ছে শচীন কর্তার বুকে। কৈশোরেও তাই। তাঁর কথায়, ‘‘পড়ায় তেমন মন ছিল না। পাশের নবাব বাড়িতে প্রতিবছর বড় বড় গাইয়ে, বাজিয়ে ও বাঈজীরা এসে গান বাজনা করতেন। পড়া ফাঁকি দিয়ে লুকিয়ে রাত জেগে সেই সব মজলিশে সময়মতো উপস্থিত হতাম আর রাতের পর রাত তাঁদের গান বাজনা উপভোগ করতাম।’’

এমন এক তরুণের উনিশ বছর বয়সে কলকাতায় আসা। ১৯২৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের এম এ-তে ভর্তি। পরের বছর লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে দিলেন। ১৯২৫ সালে তিনি বদল খাঁ, কৃষ্ণচন্দ্র দে ও ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে গান শিখতে শুরু করেছেন। খুব ধীরে তাঁর সাংগীতিক প্রতিভার পরিচয় বাড়ছে। বেতারে পনেরো মিনিট গাইলেন। নিজের সুরেই গান গেয়েছেন। পেয়েছেন দশ টাকা। শচীন কর্তা লিখেছেন, ‘এ আমার কাছে লক্ষ টাকার থেকেও বেশি মনে হয়েছিল।’

আগেই বলেছি, কলকাতায় থাকলেও নিয়মিত তিনি কুমিল্লা যেতেন। আগরতলায়ও যেতেন। বছরে তিনবার তো যেতেন-ই। রাজপরিবারের পুত্র বা কন্যা যদি লোকগানে ডুবে থাকতে চান তবে তো তাঁকে গান সংগ্রহ করতে হবে। গায়ে গঞ্জে মাঠে ঘাটে যারা গাইছে লোকগান, তাদের কাছে শুনতে হবে সেই গান। শচীন কর্তা এই কাজ সুচারুভাবে করেছেন। গোয়ালপাড়িয়া লোকগানের সম্রাজ্ঞী প্রতিমা বড়ুয়ার সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়। শচীন কর্তার রচনা থেকে জানা যাচ্ছে, ‘‘...ঘুরে বেড়াতাম গ্রামে মাঠে ঘাটে। ভাসাতাম নদীর জলে নৌকা, চাষি ছেলেদের সঙ্গ — বাউল বোষ্টম ভাটিয়ালি গায়ক ও গাজন দলের সঙ্গে ছুটির ফাঁকে কলেজ ফাঁকি দিয়ে সময় কাটাতাম গান গেয়ে। আমরা সবাই যে এক হুঁকোয় তামাক খেতাম, বাবা তা জানতেন না। ...পূর্ববঙ্গের ওই অঞ্চলের এমন কোনও গ্রাম নেই বা এমন কোন নদী নেই, যেখানে আমি না ঘুরেছি। ছুটি ও পড়াশুনার ফাঁকে আমি গান সংগ্রহ করতাম।’’

গায়ক ও সংগীত পরিচালক হিসেবে শচীন কর্তার খ্যাতি যখন শীর্ষে তখন তাঁকে বলতে দেখা গেল, ‘‘আমার এখনকার যা কিছু সংগ্রহ যা কিছু পুঁজি সে সবই ওই সময়কার সংগ্রহেরই সম্পদ। আজ আমি শুধু ওই একটি সম্পদেই সমৃদ্ধ, সে সম্পদের আস্বাদন করে আমার মনপ্রাণ আজও ভরে ওঠে। যে সম্পদের জোরে আমি সুরের সেবা করে চলেছি — তার আদি হলো আমার ওইসব দিনের গানের সংগ্রহ ও স্মৃতি।’’

এখানে মনে পড়ছে আমাদের, শচীন কর্তার সঙ্গে যিনি দীর্ঘকাল তবলাসংগত করেছেন, সেই ব্রজেন বিশ্বাসের কথা। ১৯২৪ সালে তাঁর কুমিল্লা জেলাতেই জন্ম। দৃষ্টিহীন এই সুরসাধক বাঁশের একটি অপূর্ব বাদ্যযন্ত্র তৈরি করেছিলেন যার নাম শচীন কর্তা দিয়েছিলেন ‘ব্রজতরঙ্গ’। এই বাদ্যযন্ত্র দিয়ে ‘ছদ্মবেশী’ ছবিতে ‘প্রিলিউড মিউজিক’ তৈরি করেন শচীন কর্তা। তারপর গাইলেন অজয় ভট্টাচার্যের লেখা সেই বিখ্যাত গান ‘বন্দর ছাড়ো যাত্রীরা সবে জোয়ার এসেছে আজ’।

মুম্বাই (তৎকালীন বম্বে) থেকে কলকাতায় এসেছেন কর্তা। আড্ডা জমেছে সাউথ অ্যান্ড পার্কের বাড়িতে। গান বাজনা জগতের অনেক লোক এসেছেন। কথা বলতে বলতে হারমোনিয়াম বাজাচ্ছিলেন কর্তা। হঠাৎ বাজনা থামিয়ে বললেন, ‘‘আরে জাননি, শক্তি একটা ছবি করতাছে। আমারে কইল সুর দিতে। আরও কইল একটা সেক্সের গান করতে হইব। কী হইল জান, অনেককাল আগের একটা কথা মনে পইড়্যা গেল। এক ব্যাটার বাড়িতে গ্যাছলাম। তারে ডাকতাছি। সাড়া দেয় না। অনেক পরে ঘরের থেইক্যা বাইরইয়া আইল। দিলাম ব্যাটারে বকা। কয় কী, ‘কর্তা মাফ করবেন। পোলাডারে বিয়া দিমু আইজকা, তাই কাপড় পরাইতাছিলাম।’ যখন আমাগো কথা হইতাছে, একটা ছোট্ট মাইয়া দেখি ঝিক লইয়া খেলতাছিল। পোলাডারে সাজাইন্যা দেইখ্যা মাইয়াডা হাইস্যা উঠল। আমি কইলাম, ‘এইটুকু পোলারে বিয়া দিবি কি?’ ব্যাটায় কয়, ‘অহন দেওয়ান-ই ভালা। নইলে বিগড়াইয়া যাইতে পারে।’ শুইন্যা ওই একফোঁটা মাইয়ার কী হাসি। হাসতে হাসতে মাইয়া গাইয়া উঠল, কালকে যাব শ্বশুরবাড়ি/আহ্লাদে খাই গড়াগড়ি/দেখব তোরে প্রাণভরে সুন্দরী।’

শক্তির কথা শুননের পর ওই গানডার কথা আমার মনে পইড়্যা গেল। ঠিক কইর্যাু ফালাইলাম, গানডারে কাজে লাগামু। লয়ডারে কমাইয়া কিশোইরারে গাইতে কমু। আর কমু জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফালাইবি। তাইলেইত সেক্সের গান হইয়া যাইব।’’

কী সেই গান? আরাধনা ছবির ‘রূপ তেরা মস্তানা।’

কেমন করে গানে সুর করতেন শচীন কর্তা? ২০০০ সালের পয়লা অক্টোবর কর্তার জন্মদিনে মান্না দে সংবাদমাধ্যম কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘সুর তৈরি করে সকাল, দুপুর, সন্ধে গাইতেন। পাঁচদিন, ছ’দিন, সাতদিন। বেছে বেছে লোকেদের শোনাতেন। কম কাজ নিতেন।’

কম কাজ নেওয়ার বিষয়ে একটা ঘটনার কথা বলি। গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন। পুলকবাবু তখন মুম্বাইয়ে শচীন কর্তার বাড়িতে গিয়েছেন। তাঁর চোখের সামনেই ঘটনাটি ঘটলো। যেভাবে পুলকবাবু লিখেছেন, সেভাবেই তুলে ধরছি। ‘‘এক ভদ্রলোক আমার সামনেই তার হাতের ছোট টিনের সুটকেস খুলে ওঁকে দেখালেন নোটের গোছা। শচীনদা ওঁর ভঙ্গিতে বললেন, তুম জিতনা রূপাইয়া দেখাও হাম তুমারা পিকচার নেহি করেঙ্গা। ওই ভদ্রলোকের অনেক কাকুতি-মিনতি উপেক্ষা করে শচীনদা তাকে বিদায় দিলেন। ঘরের মধ্যে বসা অন্য এক ভদ্রলোক বললেন, দাদা, সাত সকালে এতগুলো টাকা ছেড়ে দি‍‌লেন? উনি বললেন, কুয়া জান? পাতকুয়া? পাতকুয়া থেকে একসঙ্গে সব জল তুলে নিলে কুয়া শুকিয়ে যায়। কুয়াতে জল জমবার সময় দিতে হয়। মিউজিক ডিরেকশনও তাই। টাকার লোভে একগাদা ছবিতে কাজ করলে আমি ফুরিয়ে যাব। আমার ইয়ারলি কোটা আছে। তার বেশি আমি কাজ করি না। আমার এবছরের কোটা কমপ্লিট। যে যত টাকাই দিক এবছরে আর আমি ছবি করবো না।’’

কলকাতায় ফিরে যাই। ১৯৩০ সালে বাবা নবদ্বীপ চন্দ্র মারা যাওয়ার পর শচীন কর্তা ‘ত্রিপুরা প্যালেস’ ছেড়ে দিয়ে একটা একখানা ঘরের বাড়ি ভাড়া নিলেন। গানের টিউশনি নিলেন। আর সারাক্ষণ রেওয়াজ, ওস্তাদসঙ্গ ও গানবাজনা শুনে সময় কেটে যায়। সংগীতের দুই ঘরানায় শচীন কর্তার দখলদারি। লোকগান ও ধ্রুপদী গানের ঘরানা। ১৯৩২ সালে তাঁর প্রথম গানের রেকর্ড বেরলো। একপিঠে হেমেন্দ্রকুমার রায়ের লেখা গান, ‘ডাকলে কোকিল রোজ বিহানে’, অন্যপিঠে শৈলেন রায়ের লেখা গান ‘এপথে আজ এস প্রিয়া’। দু’টো গানেই সুর দিয়েছেন শচীন কর্তা। প্রথম গানটিতে লোকগানের সুর। দ্বিতীয় গানে ধ্রুপদী সংগীতের সুর। এই রেকর্ড নিয়ে একটা মজার কাহিনি আছে। ভিন্নতর কাহিনিও আছে। ভিন্নতর কাহিনি হলো এই, এইচ এম ভি-তে গান করতে চেয়েছিলেন শচীন কর্তা। ‘অনুনাসিক’ গায়কী বলে বাদ গেলেন। ত্রিপুরার নরেন ঠাকুর ‘হিন্দুস্থান মিউজিক্যাল প্রোডাক্টস’-এর চণ্ডীচরণ সাহার কাছে নিয়ে গেলেন। গান রেকর্ড হলো। রেকর্ড নিয়ে শচীন কর্তা কুমিল্লা গেলেন। এবার মজার কাহিনি শুরু। কুমিল্লার পরিচিতজনদের দেখালেন। বাবা বেঁচে নেই। থাকলে নিশ্চয়ই খুশি হতেন। তারপর রেকর্ড নিয়ে আগরতলা এলেন। তখন মহারাজা বীরবিক্রম মাণিক্যের রাজত্বকাল। আগরতলা ঠাকুরবাড়ির এক বিশিষ্ট চরিত্র জ্যোতিষচন্দ্র দেববর্মণ। শচীন কর্তার পরি‍‌চিত। রেকর্ডটি হাতে নিয়ে তারপর বগলে চেপে দৌড় লাগালেন। শচীন কর্তা তখন পেছনে পেছনে ছুটছেন আর বলছেন, ‘আরে এইডা একটা মাত্র কপি, ভাইঙ্গা গেলে আর পাইমু না।’

গোড়ার দিকে টিউশনির পাশাপাশি কয়েকটি নাটকের গানে সুর দিয়েছেন শচীন কর্তা। তখন নাটকের অভিনেতাদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। এরা কেউ কেউ ছবির বিখ্যাত অভিনেতা ছিলেন। পরিচালক মধু বসুর পত্নী সাধনা বসুকে গান শেখাতেন শচীন কর্তা। তাঁর পরিচালনায় ‘সেলিমা’ নামের এক ছবিতে ভিখারির চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শচীন কর্তা। ভিখারি সেজে একটি গান করেছিলেন। এই ছবিতে অভিনয় করেন গুল হামিদ খান (১৯০৫-১৯৩৬), রাধা, মাজহার খান, মাধবী, নন্দকিশোর মেহরা, ইন্দুবালা দেবী, গুলাম রসুল, হাসান দীন, বসন্ত রাও পেহলওয়ান ও শচীন দেববর্মণ। অভিনয়ের কথা রাজ পরিবারের লোকেরা জানতে পারলে ছিঃ ছিঃ করবে সকলে, এই ভয় তাঁর ছিল। মধু বসু বলেছিলেন, এমন সাজিয়ে দেব যে বুঝতেই পারবে না। মধু বসুর লেখা ‘আমার জীবন’ বইয়ে এসব কথা আছে।

নজরুল ইসলামের কথা আমরা শচীনদেবের লেখা থেকে জানতে পারি। নি‍‌জেকে তিনি কাজী নজরুলের ‘স্নেহধন্য শিল্পী’ বলেছেন। আর বলেছেন, ‘‘তিনিও আমার গান ও সুর খুবই পছন্দ করতেন। আমার বাড়িতে আসতেন। মুগ্ধ করতেন কবিতা ও গানে। ...তাঁর রচিত গান রেকর্ড করতে আমাকে আদেশও দিয়েছিলেন। আমার জন্যই বিশেষভাবে সেগুলি রচনা করেছিলেন তিনি। আমি তা রেকর্ডও করেছিলাম ...অনেকেই আমার গাওয়া ‘চোখ গেল, চোখ গেল কেন ডাকিস রে — চোখ গেল পাখিরে’ গানটি শুনেছেন। এটি কাজীদার রচিত। পাঁচ মিনিটের মধ্যে লিখেছিলেন আমার জন্য, সুর দিয়ে। আমি কাজীদাকে বলেছিলাম, ‘ঝুমুরের ধরনে একটু টিকলিশ সুরে গান দিন আমাকে।’ কাজীদা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দিলেন এই গানটি উপহার।’ নজরুল ইসলামের লেখা চারটি গানের রেকর্ড করেছেন শচীন কর্তা।

স্ত্রী মীরা দেববর্মণের সঙ্গে চারটি গান, একক কণ্ঠে ১২৭টি গান, মোট ১৩১টি বাংলা গান গেয়েছেন শচীন দেববর্মণ। সবচেয়ে বেশি গানের গীতিকার অজয় ভট্টাচার্য। ৪১টি গান। মীরা দেববর্মণের লেখা ১৬টি গান গেয়েছেন তিনি। পরে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার অনেক গান লিখে দিয়েছেন। তাঁর লেখা ১৮টি গান করেছেন শচীন কর্তা। শিল্পী শচীন দেববর্মণ অন্য সুরকারের গান বেশি করেননি। তাছাড়া চলচ্চিত্রে যে কটি নেপথ্য সংগীত গেয়েছেন, কোনও অভিনেতাকে ‘লিপ’ করতে দেননি। চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার এটিই প্রাথমিক শর্ত ছিল।

বাংলা চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেননি শচীন কর্তা, এটা কথা নয়। আসল কথা, বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ তাঁকে স্বাগত জানায়নি। নির্মম হলেও এই ঘটনা সত্যি। দুঃখ করে বলেছিলেন, কোনও চলচ্চিত্র সংস্থা তাঁকে বাংলায় সংগীত পরিচালনার তেমন সুযোগ দিল না। বাংলার মাটি ছেড়ে, কলকাতা শহর ছেড়ে তিনি মুম্বাই যেতে চাননি। ১৯৪২ সালে মুম্বাই চলচ্চিত্র জগতে বিখ্যাত প্রযোজক ও পরিচালক চণ্ডুলাল শাহ তাঁর ‘রঞ্জিত স্টুডিওজ’-এ যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানান শচীন কর্তাকে। শচীন কর্তা সেই আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দেন। মুম্বাই চলচ্চিত্র জগতের একসময় অভিভাবক ছিলেন চণ্ডুলাল।

১৯৪৪ সালে আবার আমন্ত্রণ এলো শচীন কর্তার কাছে। স্ত্রী মীরা দেববর্মণ ও ছয় বছরের পুত্র রাহুলকে নিয়ে তখন তাঁর সংসার। এবার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন মুম্বাইয়ের আরও একজন বিখ্যাত প্রযোজক শশধর মুখা‍‌র্জি। ১৯৪৩ সালে বিখ্যাত সুরকার মদন মোহনের পিতা রায়বাহাদুর চুনীলাল কোহলি, অশোক কুমার, চলচ্চিত্র পরিচালক জ্ঞান মুখার্জি ও শশধর মুখার্জি মিলে তৈরি করেছিলেন ‘ফিল্মিস্তান’ স্টুডিও। এঁরা সকলে শচীন কর্তাকে পেতে চাইছেন। এবার আর আমন্ত্রণ ফিরিয়ে না দিয়ে মুম্বাইয়ের পথে পাড়ি দিলেন শচীন দেববর্মণ। কলকাতায় দশটি চলচ্চিত্রে সুর দিয়েও শচীন কর্তাকে মুম্বাইয়ে চলে আসতে হলো, শুরুতে এই দুঃখ তাঁর ছিল। কলকাতায় নিজের রেকর্ডের গান তাঁর হিট, সুপারহিট। চলচ্চিত্রের গান জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারছে না। সময়টা ছিল ভারতীয় গণনাট্য সংঘের উন্মেষের যুগ। গণনাট্য সংঘের একজন প্রকৃত শুভানুধ্যায়ী হয়ে উঠছিলেন শচীন কর্তা। গণনাট্য সংঘ যখন কোনও নাটক বা নৃত্যানুষ্ঠান প্রযোজনা করছে, সাংস্কৃতিক জগতের যে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা প্রশংসা করতেন সেই তালিকায় ছিলেন উদয়শঙ্কর, শিশিরকুমার ভাদুড়ি, নরেশ মিত্র, হরেন ঘোষ, সতু সেন ও শচীন দেববর্মণ। সুধী প্রধান তাঁর সম্পাদিত ‘মার্কসিস্ট কালচারাল মুভমেন্ট ইন ইন্ডিয়া’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে একথা উল্লেখ করেছেন। এই বইয়েরই অন্য এক জায়গায় সুধী প্রধান লিখেছেন, ‘দু’জনের কথা আলাদা করে বলতে হয়। একজন মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য ও অন্যজন শচীন দেববর্মণ। এঁরা কখনও আমাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকেননি। আমরা কাজের চাপে অথবা সংগঠনগতভাবে বিষয়টিকে নজর দিইনি।’ পরে অবশ্য পরিস্থিতির বদল হয়েছে। কেউ কেউ সংগঠনে এসেছেন। শচীন দেববর্মণ ভারতীয় গণনাট্য সংঘের লোকসংগীত শাখার সভাপতি পদে সম্মতি জানিয়েছিলেন। ১৯৩৯-৪০ সালে শচীন কর্তা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এই সান্নিধ্যের কারণে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র নির্মাণ সংস্থা বা স্টুডিও শচীন কর্তাকে জায়গা না-ও দিয়ে থাকতে পারে, এ আমাদের অনুমান মাত্র।

ফিল্মিস্তান-এর ‘শিকারী’ ছবিতে সুর দান করে মুম্বাইয়ের জগতে শচীন কর্তার হাতেখ‍‌ড়ি হলো। তারপর একের পর এক ছবিতে সুর দিতে থাকলেন। নজর কাড়া প্রশংসা এলো না তেমন। এদিকে দেবানন্দ, চেতন আনন্দ, বিজয় আনন্দ আর গুরু দত্ত মিলে তৈরি করেছেন ‘নবকেতন ফিল্মস’। তাঁদের প্রযোজনায় সুর দিচ্ছেন শচীন কর্তা। সুরের জগতে মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্রে তিন দশক ধরে এক অবিসংবাদিত সম্রাট ছিলেন শচীন দেববর্মণ। কিশোরকুমার, মহম্মদ রফি, মুকেশ, মান্না দে, লতাজী, আশাজী — কেউই রেহাই পেতেন না। রেহাই পেতে চাইতেনও না, এটাই সবচেয়ে বিস্ময়ের।

প্রবীণ বয়সে এসে, যখন তাঁর আশিটি হিন্দি ছবিতে সুর দেওয়া হয়ে গেছে, এবং তার মধ্যে অসংখ্য হিট গান হয়েছে, তখন তাঁর একটি স্বীকারোক্তি আমাদের বিস্মিত করে,

‘সব রকমের সুর আমি রচনা করেছি; কিন্তু লোকসঙ্গীতে আমার আত্মা যেন প্রাণ পায়। আমি যে মাটির মানুষের সঙ্গে, প্রকাশিত হয়েছি, তাই তাদের সহজ-সরল গ্রাম্য সুর আমার গলায় সহজে ফোটে। সে সুরই আমার কল্পনার রাজ্য, আপনা থেকেই জাগে, গলায় আপনা থেকেই তা বেজে ওঠে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা গলায় এসে যায়। এর জন্য কোনও রেওয়াজের প্রয়োজন হয় না- এ সুর নিজের জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে।’

শচীন দেব বোম্বাই চলে যাওয়ায় বাংলা গানের যে অনেকটা ক্ষতি হয়েছিল এ কথা স্বীকার করে নেওয়াই ভাল। বাংলা বেসিক গানের জগতে তাঁর নিজের গাওয়া কয়েকটি গান ছাড়া সুরকার শচীনদেবকে আমরা পাইনি। সলিল চৌধুরী যে ভাবে হিন্দি ফিল্মের জগত এবং বাংলা বেসিক গানের জগতটাকে একসঙ্গে সামলেছিলেন শচীনকত্তা তা করেননি। হয়ত হিন্দি ফিল্মের জগতে তাঁর অতিব্যস্ততা তাঁকে সম্পূর্ণ ভাবে আটকে রেখেছিল তাই বাংলা গানে মন দিতে পারেননি। হয়তো সেই দুঃখটাকে আড়াল করতে চেয়েছেন সেই গানে,

'বাংলা জনম দিলা আমারে
তোমার পরাণ আমার পরাণ এক নাড়ীতে বাঁধারে
মা পুতের বাঁধন ছেঁড়ার সাধ্য কারো নাই
সব ভুলে যাই তাও ভুলি না বাংলা মায়ের কোল।'

১৯৭৫ সালের মে মাস। কুমারবাহাদুর শচীন্দ্র চন্দ্র বর্মণ তখন ষাট বছর বয়সে পৌঁছেছেন। সুর করছেন হৃষীকেশ মুখার্জীর ছবি ‘মিলি’র। এর মাঝে সুর করেছেন শতাধিক ছবির। হিট গানের সংখ্যা অসংখ্য। দেব আনন্দ-গুরুদত্ত থেকে রাজেশ খান্না-অমিতাভ বচ্চন,সুরাইয়া-মধুবালা থেকে শর্মিলা-জয়া দুই প্রজন্মের নায়ক নায়িকারা তাঁর সুরে গানের লিপ দিয়ে হয়ে গেছেন সুপারস্টার। কাশ্মীর থেকে কেরালা, গুজরাট থেকে নাগাল্যান্ডের আমআদমিরা, তাঁর মনোবাঞ্ছা অনুযায়ী, তাঁর সুর করা গান গুন গুন করে গেয়েছেন প্রায় তিন শতক ধরে।

তবু সৃষ্টিশীল মানুষদের জন্যে ষাট বছর কোনও বয়সই নয়। রবীন্দ্রনাথ ষাট বছরের পরে কি অসামান্য সব সুর রচনা করেছেন। বাবা আলাউদ্দিন, ভীমসেন যোশী এই বয়সে চুটিয়ে কাজ করেছেন। শচীন কত্তা অনেক গুলো পাহাড়ের চুড়া ছুঁয়েছেন বটে, তবুও আরও অনেক পাহাড় জয় করা বাকি তখনো। শেষ দিকে তাঁর সঙ্গীতে অর্কেস্ট্রেশনের ধরন পালটাচ্ছিল। পশ্চিমি বাজনা ব্যাবহারের ক্ষেত্রে তাঁর চিরাচরিত minimalist স্টাইল থেকে বেরিয়ে আসছিলেন। অনেকে বলে থাকেন রাহুল দেব বর্মনের মিউজিক্যাল এরেঞ্জমেন্টকে তিনি আরও বেশি করে গ্রহণ করতে আরম্ভ করেছিলেন।

দিব্বি গানের সুর দিচ্ছিলেন মানুষটা। মিউজিক রুমে বসে যাঁরা শুনছিলেন তাঁদের সবার কান-মন কানায় কানায় ভরে উঠছিল সুরের ছোঁয়ায়। অনেক দিন পরে 'মিলি' ছবির গানে নিজেকে যেন নতুন করে উজাড় করে দিচ্ছিলেন শচীন কর্তা। এমনিতেই শচীন দেব বর্মনের গান মানেই মেঠো সুর। মিঠে সুর। বাবা নবদ্বীপ চন্দ্র ছিলেন শচীন কর্তার গানের গুরু। ত্রিপুরা সম্বন্ধে এমনিতেই প্রবাদ আছে, সেখানকার রাজবাড়িতে রাজা-রানি, কুমার-কুমারী থেকে দাস-দাসী পর্যন্ত সবাই গান জানে। গান গায়। সেই পরিবেশে বড় হওয়া রাজকুমার শচীন কর্তা যে সুরের রসে মজে থাকবেন এবং মজাবেন সেটাই তো স্বাভাবিক।

তাহলে হঠাত্‍ এই বিশেষ ছবির গান নিয়ে আলোচনা কেন? আসলে তার বছর খানেক আগে ঘটে যাওয়া দু'টি ঘটনা ভীষণ আহত করেছিল শচীন দেব বর্মনকে। তার পরেই এই ছবির গানে কর্তা নিজেকে আবার নতুন করে প্রমাণ করতে বসেছিলেন নিজের কাছে। বরাবর দু'জনকে নিয়ে খুব গর্ব ছিল তাঁর। এক, ছেলে আর ডি বর্মন। দুই, লতা মঙ্গেশকর। ঘটনাচক্রে দু'জনেই তাঁকে প্রচন্ড আঘাত দিয়েছিলেন। সেই আঘাত এতটাই ছিল যে কর্তা ঠিক করেছিলেন, গান থেকে নিজেকে সরিয়ে নেবেন। কিন্তু ত্রিপুরার রাজকুমার ময়দান থেকে হেরে ফিরবেন, এটাও তো হওয়ার নয়। তাই 'মিলি' তাঁর হাতের শেষ অস্ত্র।

কিন্তু ময়দান ছাড়ার মতো কী এমন ঘটেছিল শচীন কর্তার সঙ্গে? মুম্বইয়ে শচীন কর্তার খুব প্রিয় মহিলা শিল্পী ছিলেন লতা মঙ্গেশকর। লতার কথা উঠলেই তিনি বলতেন, 'আমায় হারমোনিয়াম দে। লতাকে এনে দে। আর আধা ঘন্টা সময় দে। আমি সুর করে দিচ্ছি।' লতাজির ওপর এতটাই ভরসা করতেন যে গীতা দত্ত প্রথম পছন্দ হলেও যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতেন লাতাজির উপর। তাঁর মতে, 'ওই মাইয়া আমায় জাদু করসে। ওরে ছাড়া আঁধার দেহি আমি।' পরে এই লাতাজি-ই প্রচন্ড অপমান করেছেন শচীন কর্তাকে। কোনো সুরকার কখনও নিজের তৈরি স্বরলিপি কাছছাড়া করেন না। শচীন কর্তা-ও এটাই করতেন। কিন্তু লাতাজি যখন সুরের দুনিয়ার মধ্য গগনে তখন বেয়াড়া আবদার করেছিলেন। তাঁর দাবি, গানের নোটেশন তাঁর হাতে ছেড়ে দিতে হবে। প্রয়োজনে তিনি সুর এদিক-ওদিক করে নেবেন। এই দাবি মানা কোনো সুরকারের পক্ষে সম্ভব? বিশেষ করে শচীন কর্তার মতো রাজবংশীয় ঘরানার মানুষ। যিনি বরাবরের স্বাধীনচেতা।

সুরের স্বরলিপির দখলদারি নিয়ে প্রথম দ্বন্দ্বের শুরু। কর্তা লতাজিকে ভালো করে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, এই আবদার মানা সম্ভব না। জিদ্দি লতাজিও অনড় তাঁর চাহিদা থেকে। নিরুপায় কর্তা বাধ্য হয়ে লতাজির বদলে নিলেন তাঁর বোন আশা ভোঁসলেকে। সেই সময় শচীন দেবের মতো অনেকেই লতাজিকে তাদের গান থেকে বাদ দিয়েছিলেন। এই ধাক্কায় মন ভেঙ্গে গিয়েছিল কর্তার।

এর কয়েক মাস পরেই ঘটল দ্বিতীয় ঘটনা। দেব আনন্দ আর শচীন কর্তার জুটি প্রথম থেকেই সুপারহিট। দেব আনন্দ পরিচালনায় আসার পর 'হরে রাম হরে কৃষ্ণ' বানাবেন বলে ঠিক করলেন। সুর দেবার জন্য ডাক পড়ল শচীন কর্তা আর পঞ্চমের। চিত্রনাট্য শোনার পর দু'জনে দু'জনের মতো করে সুর শোনালেন। পঞ্চমের গান বেশি পছন্দ হলো দেবের। তিনি শচীন কর্তাকে খুব নরম গলায় জানালেন, 'এই ছবিতে পঞ্চমের সুর বেশি ভালো মানাবে। তাহলে পঞ্চম সুর দিক।' হাসিমুখে সম্মতি দিলেন কর্তা। ছেলের উন্নতি দেখলে কোন বাবা না খুশি হয়?

আগ্রহ নিয়ে একদিন রেকর্ডিং রুমে ছেলের সুর-ও শুনতে এলেন। পঞ্চম সেদিন 'দম মারো দম' গান তোলাচ্ছিলেন আশাজিকে। দু'লাইন শোনার পরেই রাগে মুখ লাল এস ডি বর্মনের। দু'লাইন শুনেই রাগে মুখ লাল এস ডি বর্মনের। চেঁচিয়ে উঠে পঞ্চমকে বললেন, 'আমি এই গান তরে শিখাইছি? মাঠের গান ভুলে, বাংলার গান ভুলে, তুই ইংরিজি গানের নকল কইরা সুর করস! আমার সব শিক্ষা বৃথা গেল। তুই আমার কুলাঙ্গার ছেলে।' রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে কর্তা যখন মাথা নিচু করে বেরিয়ে এলেন, সবার দেখে মনে হলো, রাজা যুদ্ধে হেরে বেরিয়ে যাচ্ছেন।

রেকর্ডিং রুম ছেড়ে বেরিয়ে এসে ক'দিন গুম হয়ে বাড়ি বসে রইলেন। তারপর শুরু করলেন 'মিলি' ছবির গান। কিন্তু এই রকম একটা সময়ে, যখন এক নতুন ‘বর্মণদাদা’কে ইন্ডাস্ট্রি পেতে চলেছে সেই সময় একদিন মিলির রেকর্ডিং চলার সময়ে তাঁর প্যারালেটিক স্ট্রোক হয়ে গেল। গভীর কোমায় চলে যান তিনি। কিশোর কুমারের জন্যে ‘বড়ি শুনি শুনি হ্যায়’ গানের রিহার্সাল হয়ে গেছে। রেকর্ডিং হবে পরের দিন। পরের দিন রেকর্ডিং হল বটে রাহুলের তত্ত্বাবধানে। কিন্তু বড় কত্তা তখন জীবন মৃত্যুর মাঝখানে অন্য এক ‘শুনি শুনি’ জগতে চলে গেছেন। এই অবস্থায় কোমায় প্রায় পাঁচ মাস বেঁচে ছিলেন। এই সময় পুত্র রাহুল আর স্ত্রী মীরা তাঁর কাছে বসে জোরে জোরে বলতেন কুমিল্লার কথা, পরিবার বন্ধু বান্ধবদের কথা। যদি কিছু সাড়া পাওয়া যায়। কিন্তু কিছুতেই তাঁর সাড়া পাওয়া যেত না। এই সময় কলকাতায় ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের খেলা চলছে। কর্তা আজন্ম ইস্টবেঙ্গল-এর সাপোর্টার। দল হারলে নাওয়া-খাওয়া বন্ধ করে বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কাঁদতেন। কর্তার অসুস্থতার সময় ইস্টবেঙ্গল ৫-০ গোলে হারালো মোহনবাগানকে। রাহুলদেব বলেছিলেন শুধু একবার সেদিনের একটি খবর তাঁর কানের কাছে যখন খুব জোরে বলেছিলেন রাহুল তখন নাকি তিনি একবার চোখ মেলেছিলেন। তারপর সেই যে চোখ বন্ধ করলেন, আর খোলেননি। সঙ্গীতের পর তাঁর দ্বিতীয় প্যাশন ছিল ফুটবল। তাই হয়ত তাঁর প্রিয় ইস্টবেঙ্গল দলের জয়ের কথা শুনে মুহূর্তের জন্যে জীবনের ছোঁয়া পেয়েছিলেন।

১৯০৬ সালের অক্টোবরের প্রথম দিনে তাঁর জন্ম। ১৯৭৫ সালের অক্টোবরের শেষদিনে সত্তর বছর বয়সে তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। আগামী পৃথিবীর জন্যে তিনি রেখে যান এক সঙ্গীতশাস্ত্রের সোনার খনি যা ভাঙ্গিয়ে নতুন সৃষ্টির রসদ পাবে বেশ কয়েক প্রজন্ম, আর তাঁর সুযোগ্য পুত্রকে। যিনি উত্তরিধাকারী হলেন এমন এক সঙ্গীতের ধারাবাহিকতার যা মেলডি-হারমনি-রিদম এর তিন সাংগীতিক ব্রহ্মাস্ত্র সম্বল করে এ দেশের লক্ষ লক্ষ আমআদমীর হৃদয়কে স্পর্শ করার কাজটি করে যাবে নতুন ভাবে।

সব সৃষ্টিশীল মানুষই বোধহয় মৃত্যুর ছায়া অনুভব করতে শুরু করলে সব সৃষ্টি ছাপিয়ে গিয়ে একধরণের নির্লিপ্তির মধ্যে চলে যান। আর কোনও পাহাড়ের চুড়া নয় মাটির ধুলার কাছে থেকে যেতে চান। তিন মহান সাংগীতিক মেধা সম্পন্ন বাঙ্গালির লেখা থেকে এমনই অনুভূতির মিল পাওয়া যায়।

গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন,

'যখন রব না আমি মর্ত্যকায়ায়
তখন স্মরিতে যদি হয় মন
তবে তুমি এসো হেথা নিভৃত ছায়ায়
যেথা এই চৈত্রের শালবন।'

সলিল চৌধুরী লিখেছিলেন,

'ধরণীর পথে পথে ধূলি হয়ে রয়ে যাব এই কামনা, আর কিছু না
আগামীর পায়ে পায়ে আমিও পৌঁছে যাব সেই ঠিকানা, আর কিছু না।'

শচীন কত্তা তাঁর স্মৃতি কথায় লিখে গেছেন,

‘জীবনের সায়াহ্নে আমার শুধু কামনা – আমি আর কিছু চাই না। শুধু চাই, সরগমের নিখাদ হয়ে তলানিতে পড়ে থাকতে।’

 


(তথ্যসূত্র:
১- জীবনের জলসাঘরে (পূর্ণাঙ্গ আত্মকথা), মান্না দে, আনন্দ পাবলিশার্স (২০০৫)।
২- S. D. Burman: The Prince-Musician, Anirudha Bhattacharjee and Balaji Vittal, Tranquebar (২০১৮)।
৩- Incomparable Sachin Dev Burman, R K Chowdhury, Toitambur (২০১৭)।
৪- সুরের কুমার: শচীন দেব বর্মন, মুস্তাফা জামান আব্বাসী, অনন্যা (২০১৭)।
৫- গণশক্তি, ৭ই অক্টোবর ২০১৭ সাল।)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

X

Never Miss an Update!

Join my newsletter to get the latest posts from littlemag.in directly to your inbox.