Thursday, 11 April 2019

পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের এক আশ্চর্য মাচু পিচু শহরের ইতিবৃত্ত ।। রানা চক্রবর্তী


● ছবিতে - ১৯১১ সালে আবিষ্কারের পরে ইনকা সভ্যতার রহস্যময় মাচু পিচু শহরের ছবি। ছবিটি তুলেছিলেন, মাচু পিচুর আবিষ্কারক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিরাম বিংহ্যাম বা হাইরাম বিংহ্যাম। বর্তমানে এটি পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের এক আশ্চর্য।


পৃথিবীর দীর্ঘতম পর্বতমালা হল দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালা। এই পার্বত্য ভূভাগে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত কয়েকটি প্রাচীন সভ্যতার উদ্ভব ঘটেছিল, যাদের মধ্যে কতগুলি হল অতি প্রাচীন। সম্মিলিতভাবে এসব সভ্যতাকেই মূলত আন্দীয় সভ্যতা বলা হয়ে থাকে। উত্তরে আজকের কলম্বিয়া থেকে দক্ষিণে আতাকামা মরুভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশাল ভূভাগে এই সভ্যতাগুলির বিকাশ ও বিস্তৃতির সাক্ষ্য পাওয়া যায়। বিশেষ করে আজকের পেরু ছিল এইসব প্রাচীন সভ্যতার বিকাশের কেন্দ্রভূমি। অবশ্য তার বাইরেও তিওয়ানাকু প্রভৃতি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতার অস্তিত্বর কথাও আমরা জানতে পারি। ইনকা সাম্রাজ্য ছিল পেরুর স্পেনীয় বিজয়ের পূর্বে এই অঞ্চলের প্রাচীন আমেরিন্ডিয়ান অধিবাসীদের শেষ স্বাধীন রাজনৈতিক অস্তিত্ব। এমনকী তাদের সাম্রাজ্যেও কিন্তু আমরা দেখতে পাই বহু জাতি, ভাষা ও সভ্যতার আলাদা আলাদা অস্তিত্ব বজায় ছিল। এরা যদিও সবাই ইনকাদের শাসনের অধীনেই ছিল, সকলের তাদের প্রতি সমান আনুগত্য ছিল না, সকলের সংস্কৃতিও একইরকম ছিল না। যেমন চিমুরা মুদ্রার ব্যবহার করতো, কিন্তু ইনকা সাম্রাজ্যে তার ব্যবহার ছিল না। সেখানে বিনিময় প্রথার মাধ্যমেই বাণিজ্য চলতো। আবার চাচাপোয়ারা ইনকাদের অধীনতা মানতে বাধ্য হলেও বাস্তবে তাদের প্রতি শত্রুভাবাপন্নই রয়ে গিয়েছিল। এই কারণেই স্পেনীয়দের সাথে তাদের লড়াই শুরু হলে চাচাপোয়া অভিজাতদের এক বড় অংশ ইনকাদের পরিবর্তে স্পেনীয়দেরই সাহায্য করে।

১৫২০'র দশকের শেষের দিকে এই অঞ্চলে স্পেনীয়দের আবির্ভাব ও তারপর থেকে তাদের উপনিবেশের ক্রমাগত বিস্তারের ফলে এই অঞ্চলে সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক যে বিরাট পরিবর্তনের সূচনা ঘটে, তার ফলেই এই অঞ্চলের প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন ঘটে ও ইউরোপীয় ধারার সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটতে শুরু করে।

ইনকাদের আগমন সম্বন্ধে প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্যে হেয়াঁলি লক্ষ্য করা যায়। ইনকারা নিজেদেরকে সূর্যের সন্তান বলে মনে করতো। তাদের মধ্যে প্রচলিত গল্প হচ্ছে, পেরুর টিটিকাকা হ্রদের কাছে তিনটি গুহা ছিল। এর মাঝের গুহাটি থেকে একদিন বেরিয়ে আসে চারটি ছেলে ও চারটি মেয়ে, এরা সবাই ছিল সূর্যদেব ইন্তির সন্তান। ইন্তি আবার স্রষ্টা ভিরাকোচার সন্তান। যা-ই হোক, এদেরই একজন, মানকো কাপাক ও তার বোন মামা ওলেকোকে ইন্তি একটি নিরেট সোনার দন্ড দিয়েছিলেন। মাঝের গুহার দু'পাশের গুহা থেকে বার হয়েছিল ইনকাদের গোত্রগুলোর পূর্বপুরুষেরা। মানকো কাপাক আর তার বোনকে ইন্তি বলেছিলেন, যেখানে স্বর্ণদন্ডটি বিনা আয়াসে মাটির মধ্যে পোঁতা যাবে, সেখানেই যেন তারা বসতি স্থাপন করে।

দ্বাদশ শতাব্দীর দিকে বর্তমান কুজকো শহরের কাছে মানকো কাপাক এই নতুন বসতি স্থাপন করেন। সেখানকার অধিবাসীদেরকে তিনি শেখালেন কৃষিকাজ, মামা ওলেকো শেখালেন চরকায় সুতা কাটা। এভাবেই ইনকা সাম্রাজ্যের পত্তন হয়। আরেকটি কিংবদন্তী অনুসারে টিটিকাকা হ্রদের কাছে কিছু দাড়িওয়ালা শ্বেতবর্ণের মানুষ ইনকাদেরকে কুজকোতে বসতি স্থাপনের নির্দেশ দেয়। স্প্যানিশরা ইনকা সাম্রাজ্যে হানা দিলে বহু ইনকার ধারণা হয় যে, তাদের সেই সাদা বর্ণের পবিত্র পুরুষেরা হাজির হয়েছে। পরে অবশ্য কংকুইস্তাদোরসদের লুঠতরাজ আর খুন খারাবী দেখে তাদের মোহ ভাঙ্গে।

গল্পগাঁথা ছেড়ে বাস্তবে আসা যাক। ইনকা ইতিহাসের কোনো লেখ্যরূপ না থাকায় তাদের উৎপত্তি নির্ধারণ করাটা কঠিন। তবে এটা মোটামুটি নিশ্চিত যে, ইনকারা অতীতে ছিল কোনো পশুপালনকারী ভ্রাম্যমান জাতি। কোথা থেকে তারা এসেছে না জানলেও তাদের সাম্রাজ্যের ইতিহাস অনেকটাই আজ পরিষ্কার। ইনকারা দ্বাদশ শতাব্দীর দিকে কুজকোকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য স্থাপন করে। শ'খানেক বছরের মধ্যে তারা বহু দেশ জুড়ে ইনকা সাম্রাজ্য গঠন করে ফেলে। প্রায় শতাধিক বছর টিকেছিল তাদের রাজ্য।

মজার কথা হচ্ছে, ইনকাদের সাথে সমসাময়িক ইয়ুকাটান, মায়া বা অ্যাজটেকদের কোনো যোগাযোগই ছিল না। যদিও অ্যাজটেকদের উৎপত্তির ইতিহাসের সাথে ইনকাদের কিছুটা মিল আছে। অ্যাজটেকরাও লোনা জমিতে কাঁটাগাছের ওপরে বসে ঈগলে সাপ খাচ্ছে, এই দৃশ্যের খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে বর্তমান মেক্সিকো সিটিতে বসতি স্থাপন করে বলে কথিত আছে। বর্তমান ঐতিহাসিকদের অনেকেই বিশ্বাস করেন, মানকো কাপাক বলে আসলেই এক নেতা ছিলেন এবং তিনিই প্রথম ইনকাদের একত্র করে এক শক্তিশালী সাম্রাজ্য স্থাপন করেন।

ইনকাদের সম্রাটকে বলে হত সাপা ইনকা। ভিকুনা নামের না-উট, না-ভেড়া গোছের এক প্রাণীর দুষ্প্রাপ্য লোম দিয়ে বানানো উষ্ণীষ পরতেন তিনি, তাতে গোজাঁ থাকতো দুটি কোরাকেংকুর পালক। কেরাকেংকু বা ভিকুনা কেবল সম্রাটের জন্যই বৈধ ছিল।

ইনকারা ছলে-বলে-কৌশলে প্রতিবেশী জাতিগুলোকে বশ করেছিল। এদের অনেকেই উন্নত সভ্যতার অধিকারী ছিল। ইনকাদের রাজধানী কুজকো সে আমলে ছিল এক চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার মতো শহর। পাহাড়ের ধাপ কেটে কৃষিকাজ; মরুভূমি, চাষের জমি আর শহরে চমৎকার পানি সরবরাহের ব্যবস্থা, দুর্গম দেশের আনাচে কানাচে রাস্তা বানিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, কিপু নামক গিট পাকানো রঙিন সুতায় হিসেব বা ইতিহাসের রেকর্ড রাখবার পদ্ধতি, কোনোরকম সিমেন্ট জাতীয় উপাদান না ব্যবহার করে স্রেফ পাথরের খাঁজে পাথর বসিয়ে বিরাট বিরাট সূর্যমন্দির আর রাজপ্রাসাদ এবং শক্তিশালী এক সেনাবাহিনী ছিল ইনকাদের।

চাকা ছাড়া কিভাবে তারা এমনভারী কাজ সমাধা করলো, কিভাবে লোহা, তামা বা ইস্পাতের ব্যবহার না জেনেও এত উন্নত শহর বা কৃষিব্যবস্থা ইনকারা গড়লো তা এক রহস্য। লামা বা ভিকুনার লোম থেকে বানানো ইনকা কাপড় ছিল গুণে-মানে অতুলনীয়। কৃষিনির্ভর এই সাম্রাজ্যের শাসন ব্যবস্থায় জমির ফসলের তিন ভাগের এক ভাগ সূর্যমন্দিরে, এক ভাগ সাপা ইনকাকে আর এক ভাগ কৃষককে দেওয়া হত। তবে এরপরেও সমৃদ্ধি ছিল যথেষ্ট। ইনকারা ব্রোঞ্জের ব্যবহার জানতো। তাদের সেনাবাহিনীর শক্তিও ছিল যথেষ্ট। সাকাহুয়াসমান নামক বিরাটকায় দুর্গের মতো অসংখ্য সামরিক ঘাঁটি ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল ইনকাদের এলাকায়। হুয়ানা কাপাক বা পাচাহুতির মতো শক্তিশালী সম্রাট তাদের ধন-গৌরব বহুগুণে বৃদ্ধি করেছিলেন।

পানামা উপনিবেশের নাম ছিল ক্যাস্তিল্লে দে অরো ওরফে সোনার ক্যাস্তিল। স্প্যানিয়ার্ডরা মেক্সিকো আর মধ্য আমেরিকা জয় করে তখন দক্ষিণে পা বাড়াবার তাল করছে। স্প্যানিশ কংকুইস্তাদোরসদের বৈশিষ্ঠ্য ছিল যে তারা সোনা ছাড়া আর অন্য কিছুর খোঁজ করতেন না বললেই চলে। সোনা এবং রুপা, সেই সাথে আদিবাসী ইন্ডিয়ানদের খতম করে দাস বানানো এবং বিরাট বিরাট জমিজমা নিজেদের কব্জায় আনা- এই করেই স্প্যানিশ আমেরিকার অর্থনীতি চলতো। তো এহেন স্প্যানিয়ার্ডরা পানামায় থাকতে খবর পেল দক্ষিণে পাহাড়ের মাথায় নাকি ভয়ানক সমৃদ্ধ এক সাম্রাজ্য আছে, সেখানকার মানুষেরা সবাই সূর্যের সন্তান এবং তারা সোনার থালায় ভাত খায়, সোনার জিনিসপত্র ব্যবহার করে। চরম ধনী এই সাম্রাজ্যের কথা শুনে স্প্যানিশদের তো পাগল বনবার দষা। সেসময়েই ১৫১৪ সালে স্প্যানিশরা প্রশান্ত মহাসাগরের তট আবিষ্কার করে, আবিষ্কার হয় পানামা যোজক।

গাসপের দে এসপিনা নামের এক মহাজনের কাছ থেকে ধার নিয়ে আধবুড়ো এক দুঃসাহসী মানুষ, ফ্রান্সিসকো পিজারো পানামার দক্ষিণে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল ধরে বেশ কিছু অভিযান চালান। এমনই এক অভিযানে পিজারো আর তার দলবল টমবেজ বন্দরে পৌঁছান। টমবেজের সমৃদ্ধি দেখে তারা বুঝতে পারেন বিশাল আন্দিজের ওপরে বিরাট এক সাম্রাজ্য আছে যেটা সোনাদানায় পরিপূর্ণ। তিনি ইনকা শাসনে অসন্তুষ্ট জাতিগুলির সাথে জোট বাধলেন। ১৫৩০ এর দশকের সেই সময়টাতে আবার ইনকা সাম্রাজ্যে চলছে ক্ষমতা নিয়ে যুদ্ধ। একদিকে সাপা ইনকা হুয়াসকার আর আরেকদিকে তার ভাই আতাহুয়ালপা। আতাহুয়ালপা হুয়াসকারকে পরাস্ত ও বন্দী করেন।

এরপরে তিনি স্প্যানিয়ার্ডদেরকে নিজের সাম্রাজ্যের একদম ভেতরে নিয়ে এসে একটা ছোট্ট শহরে থাকতে দেন। ১৮০ জন ইউরোপীয়ান আর ষাটটির মতো ঘোড়ার বিপরীতে আতাহুয়ালপার অধীনে ছিল আশি হাজার পদাতিক সৈন্য। কিছুদিন পরে তিনি বুঝতে পারেন, স্প্যানিয়ার্ডরা আদতে দেবতা নয়, নিছক লুঠেরা। তবে তার আগেই এক বৈঠকের সময় পিজারো আর তার দলবল আতাহুয়ালপাকে বন্দী করে ফেলে। আতাহুয়ালপা বন্দী অবস্থাতেই হুয়াসকারকে খুন করান। এছাড়া পিজারোকে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে দুই মাসের মধ্যে ২২ ফুট লম্বা, ১৭ ফুট চওড়া আর ৮ ফুট উঁচু একটা ঘর ভর্তি করে সোনা আর দুই ঘর ভর্তি রুপা দিবেন। পিজারো ধনদৌলত ঠিকই নিলেন, কিন্তু মুক্তির বদলে আতাহুয়ালপাকে পরে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেন। দোষ? হুয়াসকারকে খুন করা এবং বিধর্মী হওয়া। যদিও আতাহুয়ালপা মৃত্যুর আগে আগে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করায় তাকে আগুনে না পুড়িয়ে ‘করুণা’ দেখানো হয়। সেকালে স্প্যানিশরা বিধর্মীদের আগুনে পুড়িয়ে মারতো কি না।

ইনকারা গৃহযুদ্ধের কারণে এক হতে পারেনি ঠিকই, তাদের হাতে স্প্যানিশদের মতো কামান, বন্দুক বা তরবারিও ছিল না, কিন্তু তারপরেও ইনকা নেতারা একের পর এক বিদ্রোহ আর গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছে বহুদিন। ভিলকাবাম্বার গহীন জঙ্গলের ভেতরে আতাহুয়ালপার বংশধরেরা এক স্বাধীন ইনকা রাজ্য গড়ে তুলে অনেকদিন যুদ্ধ চালিয়েছিলেন। শেষমেষ ১৫৭২ সালে শেষ উল্লেখযোগ্য নেতা তুপাক আমারুর সেনাদল পরাস্ত হলে ইনকাদের ইতি ঘটে। মজার কথা হচ্ছে, গত শতাব্দীর শুরুতে হাইরাম বিংহাম পেরুর মাচুপিচ্চু আবিষ্কার করলে পুরো বিশ্ব অবাক হয়ে যায়। ধারণা করা হয়, দীর্ঘদিন ইনকারা এখানে স্প্যানিশদের অগোচরে বাস করে গিয়েছে।

ইনকাদের গৃহযুদ্ধ, প্রযুক্তিক্ষেত্রে অনগ্রসরতা আর বিরোধী গোত্রগুলোর বিদ্রোহ ইনকা সাম্রাজ্য পতনের অন্যতম কারণ। তবে এর থেকেও গুরুতর সমস্যা ছিল বোধহয় স্প্যানিয়ার্ডসহ ইউরোপীয়দের নিয়ে আসা হাম, স্মল পক্সের মতো অসুখ। তিরিশ থেকে পঞ্চাশ বছরের মধ্যে স্প্যানিশ আমেরিকার ৯৩ ভাগ আদিবাসী মরে সাফ হয়ে যায় এই অসুখে। ফলে ক্রমেই ইনকাসহ আদিবাসী ইন্ডিয়ান বিরোধীদের শক্তি বিলীন হয়ে যায়।

ইনকা সাম্রাজ্য নিয়ে বেশ কিছু সাহিত্যকর্ম আছে। আঠারো শতাব্দীর পেরুতে তুপাক আমারু নামের আরেক দুর্দান্ত নেতা স্প্যানিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। সত্তরদের দশকে এই পেরুতেই আবার তুপাক আমারু নামের একটি উগ্র বামপন্থী গেরিলা দল গড়ে তুলেছিলেন ভিক্তর কাম্পোস নামের এক নেতা।

ইতিহাসের অতলে হারিয়ে যাওয়া এই শক্তিশালী জাতিটির বিলুপ্তির পেছনে রয়েছে এক নিষ্ঠুর গল্প, আর এ গল্পের শুরুটা হয় সাম্রাজ্যে স্প্যানীয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে। বহু জাতিগোষ্ঠীকে পরাজিত করতে পারলেও স্প্যানীয়দের ষড়যন্ত্রমূলক আক্রমনকে ঠেকাতে পারেনি ইনকারা। কারন স্প্যানিয়দের আগমনের ৫ বছর পূর্বেই সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার নিয়ে এক বিধ্বংসী যুদ্ধে ইনকা রাজশক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। রাজশক্তির এ দুর্বলতাই ছিল সাম্রাজ্যের বিলুপ্তির সূচনা বিন্দু। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ইনকার সর্বশেষ স্বাধীন সম্রাট আটাহুয়ালপার প্রানদন্ড- যা ছিল ৩০০ বছরের ইনকা সভ্যতার ইতিরেখা।

১৫০২ খ্রীস্টাব্দে জন্ম নেয়া আটাহুয়ালপা ছিলেন ইনকা সম্রাট হুয়ায়না কাপাকের ছোট ছেলে। হুয়ায়নার মৃত্যুর পর পুরো সাম্রাজ্য দুই ভাইয়ের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যায়।  কালক্রমে এ ঘটনা ভয়ানক এক গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়। ১৫৩২ সালে রাজধানী কুজকোর কাছে সংঘটিত হয় এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, আটাহুয়ালপা পরাজিত করেন তার বৈমাত্রেয় ভাইকে। কিন্তু সর্বশেষ স্বাধীন সম্রাটের এ জয় দীর্ঘস্থায়ী হলনা। ১৮০ জন সৈন্য নিয়ে ইনকায় পাড়ি জমান স্প্যানিশ সৈন্যপ্রধান ফান্সিসকো পিজারো, আটাহুয়ালপা কোন বাধা না দেওয়ায় সাম্রাজ্যে বহিরাগত হস্তক্ষেপের সূচনা হয়।

স্প্যানিশ সৈন্যদের প্রতি আটাহুয়ালপার এ নির্লিপ্ততা কাল হয়ে দাঁড়ায়। ১৫৩৩ সালের ২৯ আগস্ট ইনকার ত্রয়োদশ ও সর্বশেষ সম্রাটকে শ্বাসরোধে হত্যা করে ফ্রান্সিসকো পিজারো র সৈন্যরা।

স্প্যানিয় বংশোদ্ভূত এই পিজারো যুবক বয়সে পশুপালন করে জীবিকা নির্বাহ করত। সৈন্যবাহিনীতে যোগদান করার কিছুদিন পর পিজারো ফ্রান্স থেকে হিসপানিওয়ালার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। ১৫১০ সালে তিনি কলম্বিয়া অভিযানে অংশগ্রহন করেন। এ সময় তিনি স্প্যানিশ বিজেতা অ্যালন্সো দ্যি ওজেদার অধীনে ছিলেন। কয়েক বছর পর, ১৫১৩ সালে ভাস্কো নুনেজ দ্যি বালবুয়া প্রশান্ত মহাসাগর আবিষ্কার করেন, তার সঙ্গী ছিলেন পিজারো।

ঘটনাক্রমে একসময় দক্ষিন আমেরিকার সম্পদ পূর্ন ভূখন্ডের কথা জানতে পারেন এবং ১৫২৪ সালে সহকর্মী  দিয়েগো দি অ্যালমাদোর সাথে আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে পৌছান। নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে পিজারো পানামায় চলে আসেন  এবং পেরু আক্রমনের মাধ্যমে ধনসম্পদ লুন্ঠনের এক ছক আঁকতে থাকেন। কিন্তু স্প্যানিশ গভর্নর তার এ পরিকল্পনায় সায় দেননি। ১৫২৮ সালে পিজারো আবারো স্পেনে ফিরে আসেন, স্পেনের শাসক তখন রাজা পঞ্চম জর্জ। পিজারো তার সেই পরিকল্পনার ব্যাপারে রাজার সহায়তা প্রার্থনা করেন। ঐ সময়ে অ্যাজটেক সাম্রাজ্য জয় করার পর হারনান কর্টেজে প্রচুর স্বর্নমুদ্রা জমা পড়েছিল। তাই নিজের লাভের কথা ভেবে রাজা পঞ্চম জর্জ পিজারোকে অনুমতি দিয়ে দেন এবং সেই সাথে অভিযানের জন্য একটা বড় অংকের অনুদান দিতেও রাজি হয়ে যান। ১৫৩০ সালে পানামায় ফিরে আসেন পিজারো। ১৫৩১ সালে পেরুর উদ্দেশ্যে যাত্রা করে টুম্বেসে এসে পৌছান। সেখান থেকে সৈন্যসামন্ত নিয়ে আন্দিজ পর্বতমালার দিকে যাত্রা শুরু করেন।  অবশেষে ১৫৩২ সালে ১৫ নভেম্বর কাজামারকার সেই সমৃদ্ধ ইনকা শহরে প্রবেশ করেন।

সম্রাট আটাহুয়ালপাও তখন কাজামারকায় ছিলেন। বৈমাত্রেয় ভাই হুয়াস্কারের শাসনাধীন রাজধানী কুজকো আক্রমনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি।

শহরে পৌঁছে পিজারো আটাহুয়ালপা ও কিছু ইনকা অভিজাতদের এক ভোজে নিমন্ত্রণ করেন। সম্রাট এ নিমন্ত্রণ গ্রহন করলেন। কিছুদিন আগেই ৩০০০ সৈন্যের নেতৃত্বে ইনকা সভ্যতার ইতিহাসে এক বড় যুদ্ধে জয়লাভ করেছেন তিনি।  তাই ভেবেছিলেন অস্ত্রধারী এই শ্বেতাঙ্গ আগন্তুক আর তার ১৮০ সহচরকে ভয়ের কিছু নেই। অথচ তিনি কখনো কল্পনাই করেননি এদিকে এই শ্বেতাঙ্গ লোকটি কত ভয়ংকর এক নকশা এঁকে রেখেছে। পিজারোর অস্ত্রধারী সৈন্যরা কৌশলে পুরো কাজামারকাকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছিল।

পরেরদিন, নভেম্বরের ১৬ তারিখ, সরল বিশ্বাসে আটাহুয়ালপা আর তার কয়েক হাজার সৈন্যসামন্ত নিরস্ত্র অবস্থায় ভোজে অংশগ্রহন করে। পিজারো তখন সম্রাটের কাছে এক ধর্মযাজক পাঠায়। নির্দেশানুযায়ী যাজক তাকে রাজা চার্লসের আধিপত্ব মেনে নিয়ে খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহন করতে বলে।

সম্রাট আটাহুয়ালপা এহেন অসম্মানজনক প্রস্তাবনা অস্বীকার করলেন এবং প্রচন্ড রাগ আর ঘৃনায় তার হাতে থাকা যাজকের দেয়া একটা বাইবেল মাটিতে ছুঁড়ে মারলেন। এ ঘটনায় পিজারো ভয়ানকভাবে রেগে গিয়ে তৎক্ষনাৎ আক্রমনের আদেশ দিলেন। পিজারোর ছিল ঘোড়সওয়ার, বন্দুক আর আর এমন কিছু অস্ত্র যা ইনকারা কখনই দেখেনি ! অস্ত্রধারীরা হঠাৎ আক্রমন করে পিষ্ট করল হাজারো ইনকাকে, নৃশংসভাবে হত্যা করল তাদের। বন্দী করা হল আটাহুয়ালপাকে।

বন্দী করার পর আটাহুয়ালপার কাছে পিজারো মুক্তিপণ দাবি করে। মুক্তিপণ হিসেবে সম্রাট ও তার রাজ্যের অভিজাতরা এক ঘরভর্তি স্বর্ণমুদ্রা দিতে রাজি হয়। এসব বিভিন্ন ঘটনার পরিক্রমায় ইনকা সাম্রাজ্য থেকে স্প্যানিশরা মোট ২৪ টনের মত স্বর্ণরৌপ্য লুট করেছিল।

বিশ্বের ইতিহাসে আটাহুয়ালপার দেয়া এ মুক্তিপণই ছিল সবচেয়ে বড় অংকের মুক্তিপণ। কিন্তু তবুও সম্রাট তার দুর্ভাগ্য থেকে মুক্তি পেলেন না। বিশ্বাসঘাতক পিজারো সম্রাটকে মুক্তি দেয়ার পরিবর্তে এক অন্যরকম ষড়যন্ত্র করলেন। বৈমাত্রেয় ভাই হুয়াস্কারকে হত্যা করা এবং কিছু ছোটখাট বিষয়ের দায়ে তাকে স্প্যানিশ বিচারালয়ে পাঠানো হয়। আদালত সম্রাটকে অপরাধী বলে ঘোষনা করে এবং হত্যার আদেশ দেয়।

১৫৩৩ সালের ২৯ আগস্ট, সম্রাটকে তার মৃত্যুর দুটি উপায় জানিয়ে একটি শর্ত দেয়া হয়। সম্রাট যদি খ্রীস্টধর্ম গ্রহন করেন তবে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হবে এবং তা না হলে তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হবে। দুর্ভাগা আটাহুয়ালপা চেয়েছিলেন মৃত্যুর পর তার দেহটি অন্তত মমিতে সংরক্ষিত থাকুক। এ আশায় তিনি প্রথম পথটি বেছে নিলেন। এরপর নিষ্ঠুর আর বিশ্বাসঘাতক পিজারোর আদেশে লোহার শেকল দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় ইনকার সর্বশেষ স্বাধীন সম্রাটকে।

পিজারো তার অভিযান অব্যাহত রাখে এবং ঐ বছরেই স্প্যানিয় সহায়তায় কাজামারকার রাজধানী কুজকো আক্রমন করে। ১৫৩৩ সালের নভেম্বরের দিকে কোনঠাসা হয়ে পড়ে রাজধানী কুজকো। হুয়াস্কারের ভাই মানকো কাপাককে সিংহাসনে বসানো হয় এবং তিনি পিজারোর খেলার পুতুলে পরিণত হন। আক্রমন চলে কুইটো সিটিতে। পিজারো পুরোপুরিভাবে ইনকা দখল করে নেয় এবং স্প্যানিশ শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করতে থাকে। দিয়েগো আলমাগ্রোকে তিনি চিলিতে পাঠিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করেন যাতে পুরো ইনকায় তার একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের তৃষ্ণা ষোলকলায় পূর্ন হয়।

পানামার সাথে যোগাযোগের সুবিধার জন্য ১৫৩৫ সালে উপকূলের কাছাকাছি লিমা নামে এক নতুন শহর প্রতিষ্ঠা করে। পরের বছর নামমাত্র সম্রাট মানকো কাপাক স্প্যানীয় তত্ত্বাবধান থেকে মুক্ত হয় এবং বিদ্রোহ করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তার সে অপরিকল্পিত বিদ্রোহ সফল হয়নি বরং তাকে বন্দী করা হয়। এ ঘটনার মধ্য দিয়েই স্প্যানীয় শাসনের কাছে ইনকা সভ্যতার পতন ঘটে। এই পরাজয়ের মধ্য দিয়েই সর্বশেষ ইনকা সম্রাট ও তার সাম্রাজ্য বিলুপ্ত হয়ে যায়।

এদিকে চিলিতে দারিদ্র্যতায় পিষ্ট হয়ে দিয়েগো আলমাগ্রো ইনকায় ফিরে আসে এবং ইনকা সাম্রাজ্য লুন্ঠনে প্রাপ্ত সম্পদে তার অংশ দাবি করে।  আবারো গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং খুব দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

১৫৩৮ সালে আলমাগ্রো  কুজকো দখল করে নেয়। পিজারো তার বৈমাত্রেয় ভাই হারনান্দোকে কুজকো শহরপুনরুদ্ধার করতে পাঠায়।  হারনান্দো আলমাগ্রোকে পরাজিত ও হত্যা করেন।

১৫৪১ সালে আলমাগ্রোর পুত্র দিয়েগো অ্যাল মোনজ লিমাতে অবস্থিত পিজারোর প্রাসাদে জোরপূর্বক প্রবেশ করে এবং রাতের খাবার খাওয়ার সময় প্রাসাদে গুপ্তহত্যা চালায়, হত্যা করে পিজারোকে । দিয়েগো এরপর নিজেকে পেরুর শাসক বলে দাবি জানায় কিন্তু কিছু স্প্যানীয় তাকে এ স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে। ১৫৪২ সালে দিয়েগো স্প্যানীশদের হাতে বন্দী হলে তাকে হত্যা করা হয়। ১৫৫০ সালের শেষের দিকে স্প্যানীশ ভাইসরয় আন্দ্রেস হার্টেডো দ্যি মেনডোজার শাসন প্রতিষ্ঠার আগে পর্যন্ত পেরুর বিজেতাদের মধ্যে এমন বিরোধ ও ষড়যন্ত্র চলতেই থাকে।

পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে ইনকাদের গড়ে তোলা শহর মাচুপিচু। ১৪৫০ সালে ইনকারা মাচুপিচু শহরটি নির্মাণ করে। এর ঠিক একশ বছর পরই স্প্যানিশদের আক্রমণে ইনকাদের নির্মিত সব শহরই ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু সেদিন স্প্যানিশরা ইনকাদের আর সকল শহরের সন্ধান পেলেও এই শহরটির সন্ধান পায় নি। যার কারণে মাচুপিচু শহরটি ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে যায়। কিন্তু মানুষজন না থাকার কারণে এক সময় শহরটি পরিত্যাক্ত হয়ে যায়। দীর্ঘ চারশ বছর পর ১৯১১ সালে হির‍্যাম বিংহ্যাম নামের এক মার্কিন নাগরিক এই শহরটি আবিষ্কার করেন। আর তা দেখে পৃথিবীবাসী চমকে ওঠে। মেঘের অনেক ওপরে এই শহরের অবস্থান, নিচ থেকে যার অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না! এত আগে এত ওপরে কীভাবে এমন একটা শহর নির্মাণ সম্ভব হল তা এক বিরাট রহস্য হয়ে আছে আমাদের কাছে!

আশ্চর্যের ব্যাপার হল ইনকারা জানতো না লোহার ব্যবহার, না জানত চাকা কি জিনিস! তাদের নিজস্ব কোনো লিপি পর্যন্ত ছিল না। ছিল শুধু কিপু বলে দড়ির মত একরকম জিনিস। এতে ফাঁস পড়িয়ে তারা বিভিন্ন বিষয়ের খবর দূত মারফত আদান প্রদান করতে পারত। এক একটা ফাঁসের এক এক রকম অর্থ থাকত যা শুধু ওরাই বুঝতে পারত। সংবাদ আদান প্রদানের এক অদ্ভুত কৌশল, অনেক জায়গায় আদিবাসীরা মেসেজ আদান প্রদান করে ঢাক বাজিয়ে, অর্থাৎ এক প্রকার সাংকেতিক ভাষার সাহায্য নিত। তারা ভিরাকোচা নামক এক দেবতার পূজা করত, আর সূর্য দেবতা ইনতির পুজা করত। এমন এক জাতির পক্ষে কি করে পাহাড়ের উপরে এমন সমৃদ্ধ ও উন্নত শহর তৈরি সম্ভব হল তা আমাদের জানা নেই।

কালের অমোঘ নিয়মে যদিও ইনকারা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়, কিন্তু থেকে যায় তাদের কীর্তি। যুগে যুগে বিভিন্ন অভিযাত্রী আর স্বর্ণলোভীর দল দক্ষিন আমেরিকার বিভিন্ন জঙ্গল আর পার্বত্য অঞ্চল তন্ন তন্ন করে খুঁজেও ইনকাদের হারিয়ে যাওয়া শহরের সন্ধান পায়নি। সোনার শহর “এল ডোরাডো”র জনশ্রুতি চালু হয়। ১৯১০ সালের দিকে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হির‍্যাম বিংহ্যাম খোঁজ চালাচ্ছিলেন এই শহরের। পেরুর বিভিন্ন পার্বত্য অঞ্চলে চলছিল তাঁর অভিযান। নিজের দেশ, স্ত্রী, সন্তানকে ছেড়ে চালানো সেই অভিযানে এক সময় তাঁর নৈরাশ্য আসছিল। সেই হারিয়ে যাওয়া শহরের সন্ধান তখনও পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষে স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর কাছে আতিথ্য গ্রহন কালে তিনি জানতে পারেন পাশের একটি পাহাড়ের মাথায় নাকি একটি ছোটো পরিত্যাক্ত পাথরের শহর রয়েছে। কিন্তু তা গভীর জঙ্গলে ঢাকা। কাঠ সংগ্রহকারীরা সেই স্থানের কথা বলেছিল, কিন্তু তেমন ভাবে অভিযান সম্ভব হয়নি। ১৯১১ সালের ২৪ শে জুলাই স্থানীয় একটি কৃষক ছেলে কে নিয়ে তিনি হাজির হলেন পাহাড়ের ওপর সেই পরিত্যক্ত শহরে। জঙ্গলে ঢাকা সেই জায়গায় বেশ কিছু পাথরের বাড়িও চোখে পড়ল কিন্তু হির‍্যাম তখনও ভিলাকাবাম্বার মোহে আচ্ছন্ন তাই তিনি যে কিসের সন্ধান সেদিন মানব সমাজ কে দিলেন তার ধারণা হয়ত সেদিন সম্ভব ছিল না। তাই জঙ্গল পরিস্কারের নির্দেশ দিয়ে তিনি চলে গেলেন ভিলাকাবাম্বার সন্ধানে। ১৯১২ সালে তিনি যখন আবার ফিরলেন তখন ঝোপ ঝাড়ের ভিতর থেকে বেড়িয়ে আসা একটা আস্ত শহর ঝলমল করছিল। রোদ আর মেঘের সাথে যে কিনা যুগ যুগ ধরে খেলে এসেছে। ইনকাদের একদম নাম না জানা হারিয়ে যাওয়া শহর “মাচুপিচু”।

স্পেনীয় উচ্চারণে শহরটির নাম মাচু পিচু হলেও অনেকেই এর নাম উচ্চারণ করেন মাচু পিকচু হিসেবে, যার অর্থ “পুরানো চূড়া”। আসলেই বেশ প্রাচীন শহর এটি। এমনকি কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারেরও আগের শহর এই মাচু পিচু। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এই শহরটির উচ্চতা প্রায় ২৪০০ মিটার বা ৭,৮৭৫ ফিট। এটি পেরুর উরুবাম্বা  নামক এক উপত্যকার ওপরে পর্বত চূড়ায় অবস্থিত। বিশ্বাস করা হয় যে মাচু পিচু ইনকা শাসকদের রাজকীয় শহর অথবা ইনকাদের খুবই পবিত্র এক শহর হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বেশিরভাগ পুরাতত্ববিদ বিশ্বাস করেন যে, মাচু পিচুকে পাচাকুতিক (১৪৩৮-১৪৭২) নামক ইনকা রাজার শাসন আমলে গড়ে তোলা হয়েছিল।

বর্তমানে এই মাচু পিচু শহরটিই ইনকা সভ্যতার সবচেয়ে পরিচিত শহর। ১৯৮১ সালে এই এলাকাকে পেরুর সংরক্ষিত ঐতিহাসিক এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় স্থান দেয়। বর্তমানে এটি বিশ্বের সাতটি নতুন বিস্ময়েরও একটি।

১৪৫০ সাল। তখন ইনকা সভ্যতার স্বর্ণযুগ চলছিল। এমনই এক সময় মাচুপিচু শহরটি নির্মাণ করা হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, ১০০ বছরের মাঝেই এ শহরটি কার্যত পরিত্যক্ত হয়ে যায়। ধারণা করা হয় এ শহরের প্রায় সকল মানুষ গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল।

অনেকের মতে মাচুপিচু ছিল ধর্মীয়ভাবে পবিত্র এক জায়গা। তবে এমন অনেকেই আছেন যারা মনে করেন এটি আসলে ইনকা রাজাদের নির্মিত এক জেলখানা ছিল। এখানে রাখা হতো ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর সব অপরাধীদের। ইনকাদের এই শহর নিয়ে অনেক গবেষকই অনেক রকম গবেষণা করেছেন। তাদের মাঝে জন রো এবং রিচার্ড বার্গার তাদের প্রাপ্ত তথ্য থেকে কিছুটা ভিন্ন মত পোষণ করে থাকেন। তাদের মতে এটি ছিল তৎকালীন ইনকা রাজার অবকাশ যাপন কেন্দ্র। বেশিরভাগ পুরাতত্ববিদই আবার তাদের এই মতবাদকেই সমর্থন করে থাকেন।

সে সময় ইনকাদের রাজধানী ছিল কোস্কো। রাজধানী কোস্কো থেকে মাত্র ৮০ কি.মি. দূরেই অবস্থিত ছিল এই মাচুপিচু শহরটি। স্পেনীয়রা যখন ইনকা রাজ্য আক্রমণ করে তখন তারা এ শহরের কথা জানত না। ফলে অন্যান্য ইনকা নগরীর মত এ শহরটি তাদের দ্বারা আক্রান্ত হয়নি। ফলাফল স্বরুপ এ শহরে লুটপাটের কোন ঘটনাও ঘটেনি। এরপর অনেক বছর এ শহর জনমানবহীন ছিল। ফলে শহরটি ধীরে ধীরে ঘন জঙ্গলে পরিণত হয় এবং ঢেকে যায়।

২৪ জুলাই, ১৯১১ ইনকা সভ্যতার বিখ্যাত মাচুপিচু শহর আবিষ্কার করা হয়। যদিও হিরাম বিংহামকেই এর আবিষ্কর্তা মনে করা হয়, কিন্তু কোস্কো শহরের গবেষক সিমন ওয়েসবার্ড বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। অনেকেই দাবী করে থাকেন আগেই মাচুপিচুতে গিয়েছেন এমন কয়েকজন স্থানীয় তাকে সেখানে নিয়ে যান। যদিও হির‍্যাম বিংহাম কখনই স্থানীয় সেসব লোকদের কথা কোথাও উল্লেখ করেননি। এমনকি এ শহর আবিষ্কারে তাদের কোন রকম কৃতিত্বও তিনি দেননি। ১৯১১ সালে এ শহর আবিষ্কারের পর সেখানে কিছু প্রাচীন মমিও পাওয়া গিয়েছিল।

মাচুপিচু অনেক প্রাচীন স্থাপত্যবিদ্যার স্বাক্ষর বহন করে। এখানকার স্থাপনাগুলোর দেয়াল পাথর নির্মিত। মজার বিষয় হল পাথরগুলো একে অপরের সাথে জোড়া দেয়ার জন্য কোন রকম সিমেন্ট বা চুন-সুরকির মিশ্রণ ব্যবহৃত হয়নি। তাদের এই নির্মাণ কৌশলকে বলা হয় অ্যাশলার। এ কৌশলে তারা বেশ দক্ষ ছিল। এই পদ্ধতিতে পাথরের খন্ড কাটা হত খুব নিখুঁতভাবে। তারপর তাদের খাঁজে খাঁজে বসিয়ে দেয়া হত। ফলে সংযোগকারী সিমেন্টের কোন প্রয়োজন ছিল না। তাদের এই পদ্ধতিতে ইনকারা অত্যন্ত দক্ষ ছিল। তাদের নির্মিত পাথর এতই সুনিপুণ হতো যে একটা পাতলা ছুরির ফলাও দুই পাথরের মধ্যবর্তি ফাঁক দিয়ে প্রবেশ করানো কার্যত অসম্ভব।

পেরু বেশ ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। সাধারণ সিমেন্টের জোড়া হলে এই ভূমিকম্পে স্থাপনাগুলো টিকত না। কিন্তু পাথরের খাঁজে খাঁজে বসিয়ে তৈরি করা বলে মাচুপিচুর এই স্থাপনাগুলো বেশ ভূমিকম্পপ্রতিরোধী। এ কারণেই ইনকাদের এই শহর গত ৪০০ বছরে অসংখ্য ভূমিকম্প সহ্য করেও বহাল তবিয়তে টিকে রয়েছে।

আশ্চর্যের বিষয় ইনকা সভ্যতায় চাকার দেখা পাওয়া যায় না। তারা কখনই তাদের ব্যবহারিক কাজে চাকার ব্যবহার করেননি। কিন্তু তাহলে কিভাবে ইনকারা এত বিশাল বিশাল আকৃতির পাথর এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নিয়ে গেছেন তা এক বিশাল রহস্য। যদিও মনে করা হয় এই পাথরগুলো পাহাড়ের সমতল ঢাল দিয়ে ঠেলে ঠেলে ওপরে তোলা হয়েছিল। আর এ কাজে তারা ব্যবহার করেছিল শত শত শ্রমিক। কিছু কিছু পাথরের গায়ে হাতলের মতো গাঁট দেখতে পাওয়া যায়। এমন হয়ে থাকতে পারে যে, এ গাঁটগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল পাথরগুলোকে নির্দিষ্ট স্থানে বসাতে। পাথরগুলোকে নির্দিষ্ট স্থানে বসানোর পর হয়ত হাতলগুলোকে গুড়িয়ে সমান করে দেয়া হয়েছিল।

শহরটিতে মোটামুটিভাবে ১৪০ টি স্থাপনা দেখতে পাওয়া যায়। এর কিছু মন্দির আর কিছু আবাসিক ভবন। এখানে ১০০ টিরও বেশি সিঁড়ি রয়েছে যার মাত্র একটি গ্রানাইট পাথরে তৈরি। রয়েছে পাহাড় কেটে তৈরি করা প্রচুর পরিমাণে ঝরনা। এখানে ইনকাদের দেবতা সূর্যের জন্য সূর্য মন্দিরও ছিল।

সড়ক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ইনকারা মাচু পিচু পর্যন্ত একটি রাস্তা তৈরি করে রেখেছিল। বর্তমানে হাজার হাজার লোক এই পথেই পায়ে হেঁটে মাচু পিচু ভ্রমণ করে থাকেন। ২০০০ সালের মাঝেই প্রায় চার লাখ পর্যটক মাচু পিচু ভ্রমণ করে ফেলেছিল। বর্তমানে এটি পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটি।

তথ্যসূত্র:
১- Lost City of the Incas: The Story of Machu Picchu and Its Builders by Hiram Bingham.
২- The Last Days of the Incas by Kim MacQuarrie.
৩- The conquest of the Incas by John Hemming.
৪- The Incas by Daniel Peters.
৫- উইকিপিডিয়া

No comments:

চীন ভ্রমণের ডায়েরী ।। বিনিতা সাহা

নতুন কোনো শহরে ঘুম থেকে জাগা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আনন্দের অনুভূতি আমার কাছে। কিন্তু রাতের ১২.৩০ এর ফ্লাইটের কথা শুনলেই আমার ভ্রমণের আ...