বৃহস্পতিবার, ৩১ আগস্ট, ২০১৭

বলি বা কুরবানি || আনসারি মুহম্মদ তৌফিক


প্রাচীন গ্রীক দেবতা ‘জিউস’কে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে একসময় লাখ লাখ শিশু সন্তানকে হত্যা করা হয়েছিল। তখন পিতারা তাদের সন্তানকে অবলীলায় ধারালো ছুরি দিয়ে জবাই করতো। পাশেই হয়ত শিশু সন্তানটির মা মুখ চেপে নি:শব্দে কাঁদতে থাকতো। কিন্তু কিইবা করার ছিল ! আগে ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করতে হবে তো ? মানুষ ধরেই নিয়েছিল ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করার সবচেয়ে ভাল উপায় হলো নিজের সন্তানকে হত্যা করা। যাকে ধর্মীয় লেভেলে মুড়িয়ে নাম দেওয়া হয়েছে ‘বলি’ বা ‘কোরবানি’।

দেবতা জিউসের আমলে এভাবে লাখ লাখ নিরীহ নিরপরাধ শিশুর রক্তে পৃথিবী রক্তাক্ত হয়েছে, সবাই প্রশ্নহীন আনুগত্যে তা মেনেও নিয়েছে। কিন্তু পৃথিবীতে গ্রীকদের প্রভাব কমে গেলে একসময় গ্রীক ঈশ্বরের প্রতীক জিউসের জনপ্রিয়তাও কমে যায়। কিংবা বলা যায় জিউসের পরিচিতি বা গ্রহণযোগ্যতাও কমে আসে। অন্যদিকে তখন সেমিটিক (আরবীয়) অঞ্চলে আল ও লাত নামক দুটি দেবতার রাজত্ব চলছিল। উল্লেখ্য, প্রাচীন সব দেবতার মত আল-লাতের নির্দেশিকাতেও সন্তান বলি দেওয়ার রেওয়াজ ছিল।

একই সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশেও সন্তান বলি দেওয়াটা একপ্রকার উচ্চশ্রেণীর ধর্মীয় কাজ বলেই গৃহীত হতো। কিন্তু হাজার হাজার বছরের ব্যবধানে অন্যান্য সব দেবতাদের অনুসারীরা ধীরে ধীরে নীতিগতভাবে অসাড় প্রমাণিত ও মানসিকভাবে দূর্বল হয়ে এলেও আল-লাত দেবতার অনুসারীরা তাদের সন্তুান বলি দেওয়ার বিবর্তিত রুপ পশু বলি দেওয়ার রীতিটা ধরে রেখেছে। যা মূলত: ‘কোরবানি’ হিসেবে পরিচিত। তাছাড়া, সনাতন দেবতাদের অনুসারীদের মধ্যে বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে এখনো কিছু কিছু জায়গায় সন্তান বলি দেওয়া হয়।
.
প্রশ্ন আসে, মানুষ কিরুপে এতটা নির্বোধ ও অবিবেচক হতে পারে ? এর জবাবে বলা যায়, প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্যের কারনেই মানুষ এতটা নির্বোধ ও অবিবেচক হয়। সেই প্রাচীন গ্রীক দেবতা জিউস থেকে শুরু করে উত্তর-আধুনিক দেবতা ‘আল-লাত’ এর বিবর্তিত রুপ ‘আললাহ’ বা ‘আল্লাহ’র নির্দেশিকাতেও একইরুপে সন্তান বলি দেওয়ার রীতি ছিল। এটা ঐতিহাসিকভাবেই প্রমাণিত। যদিও পরে তা পশু বলিতে রুপান্তরিত হয়। কিন্তু এর সবই একটা যোগসূত্রে বাধা। যোগসূত্রটা হলো, এদের সবাই বলি বা কোরবানি তে সন্তুষ্ট হবার কথা ব্যক্ত করেছেন।

যাইহোক, এই বলিপ্রথার কারনেই ধর্মগুলোর সত্যতা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। একজন বাবা কখনোই তার এক সন্তানকে দেখিয়ে আরেক সন্তানকে বলবে না, তুমি তাকে আমার উদ্দেশ্যে হত্যা করলে আমি সন্তুষ্ট হবো। আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহ ঈশ্বর বা ভগবান সমস্ত কিছুরই সৃষ্টিকর্তা। তিনি একইসাথে মানুষেরও সৃষ্টিকর্তা, গরুরও সৃষ্টিকর্তা, ভেড়া, দুম্বা, মহিষ, উট বা ছাগলেরও সৃষ্টিকর্তা। অথচ তিনিই তার এক সৃষ্টিকে বলছেন আরেক সৃষ্টিকে ‘বলি’ দিতে বা হত্যা করতে। এতে নাকি তিনি সন্তুষ্ট হবেন। এরচেয়ে হাস্যকর ব্যাপার আর কি হতে পারে ?
.
একজন জিউস মৃত। কিন্তু শত শত মানবসৃষ্ট দেবতা জিউস আজ রাজত্ব করছে মানুষের মননে ও চিন্তায়। প্রশ্নহীন আনুগত্য এখানে কেড়ে নিয়েছে চিন্তা করার সমস্ত সুযোগ। এখানে ভাবা যায় না, বিবেচনা করা যায় না, দ্বিমতও করা যায় না। তাইতো এখনো আফ্রিকার অনেক জায়গায় সন্তানকে বলি দেওয়া হয়, এখনো আমরা নিরীহ পশুর রক্তাক্ত লাশকে অবজেক্ট বানিয়ে উৎসব মুখর পরিবেশ সৃষ্টি করি।

কোন মন্তব্য নেই:

হেলানো টাওয়ার আর টেলিস্কোপ।। কে এম হাসান

(ছবি: Palazzo Vecchio,Uffizi Gallery, Exterior,Galileo Sculpture,Florence) বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে -১৫ ফেব্রুয়ারী গ্যালিলিওর জন্মদিনে ...