হিন্দু ধর্মে বর্ণ পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত (অথেন্টিক তথ্য প্রমাণ সহ)

 


বর্ণ প্রথাকে হিন্দু ধর্মের  অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। হাজার হাজার বছর ধরে বর্ণপ্রথার নামে, জাতপাতের নামে মানুষের উপর অত্যাচার করা হয়েছে; এই সত্যটি অনস্বীকার্য। একটা সময় ছিল যখন কোনো বর্ণ বা জাতিতে জন্মগ্রহণ করা ব্যক্তির কর্মের স্বাধীনতা ছিল না, সে তার অনিচ্ছাসত্ত্বেও  বংশগত কর্ম করতেই বাধ্য হত। কিন্তু সবসময় কি এই অবস্থাই ছিল?

বিস্ময়কর হলেও সত্য যে একসময় বর্ণপ্রথা বেশ নমনীয় ছিল। এর অসংখ্য প্রমাণ বিদ্যমান।  কঠোর, জঘন্য বর্ণপ্রথা এবং জাতিভেদ নিয়ে আমি আগে অনেকগুলো প্রবন্ধ লিখেছি। প্রাচীন ভারতের বর্ণ প্রথা, জাতিভেদ আমার আগ্রহের বিষয়। এই বিষয়ে বেশ কিছু বছর সাধ্যমত পড়াশোনা করছি।  এই বিষয়ে পড়াশোনা করার সময় আমি মূলত দুইধরণের মানসিকতার মানুষ এবং লেখকদের সম্মুখীন হয়েছি।

 ১) প্রথম প্রকারের লোকেরা মনে করেন হিন্দু সমাজের বর্ণ প্রথা সর্বদাই ভীষণ উৎকৃষ্ট ছিল। মানুষেরা গুণ এবং কর্ম অনুসারে সর্বদা নানা বর্ণ লাভ করতো।  হিন্দু ধর্মে কোনোদিন কোনো জাতিভেদ ছিল না। দুষ্টু  ব্রিটিশরা হিন্দুদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে রাজত্ব করার জন্য জাতিভেদের সৃষ্টি করেছিল। আর অন্য বদ লোকেরা ব্রিটিশদের অপপ্রচারেরই প্রচার করে চলেছে। ২)দ্বিতীয় প্রকারের ব্যক্তিরা  মনে করেন হিন্দু ধর্ম সর্বদাই জাতপাতে জর্জরিত ছিল।  বর্ণ সর্বদা জন্মগত ছিল। কখনোই গুণ বা দক্ষতা অনুযায়ী কেউ বর্ণ লাভ করতো না।  কেউ কোনো প্রমাণ দেখাতে পারবেন যে অন্য বর্ণের লোক কোনোদিনো ব্রাহ্মণ হয়েছে বা কেউ কখনো বর্ণ পরিবর্তন করেছে?

এই দুইধরণের মানসিকতাই ভ্রান্ত এবং অসম্পূর্ণ। হিন্দু ধর্মে প্রাচীনকাল থেকেই যে জঘন্য জাতিভেদ বিদ্যমান ছিল এই বিষয়ে আমি আগে অনেকবার আলোচনা করেছি, সুতরাং বর্তমানে সেই আলোচনায় আর যেতে চাইছি না।  হিন্দু ধর্মে বর্ণ প্রথা যে একসময় বেশ নমনীয়  ছিল, ইচ্ছামতো কর্ম অনুসারে বর্ণ পরিবর্তন করা যেত এই বিষয়েই আলোচনা করতে চলেছি। হিন্দুশাস্ত্রে বর্ণ পরিবর্তনের এবং কর্ম অনুসারে বর্ণ গ্রহণের প্রচুর প্রমাণ আছে, এমন অনেক প্রমাণ আছে যা প্রচলিত জাতপাতের সম্পূর্ণ বিপরীতে অবস্থান করে।

বর্ণ প্রথার দুটি রূপ ছিল। একটি অনুদার, শোষনে পূর্ণ ; অপরটি ছিল উদার এবং নমনীয়। এই দুটি রূপের কোনো একটি যদি কারোর অজানা থাকে, তাহলে এই বিষয়ে তার সম্পূর্ণ ধারণা তৈরি হবেনা।  তাই বর্ণ প্রথার নমনীয় রূপটি নিয়ে আজ আলোচনা করতে চলেছি।

ঋগ্বেদের অনেক ঋষি ক্ষত্রিয় ছিলেন

জাতপাত যখন হিন্দু সমাজে জেঁকে বসেছিল তখন বংশানুসারে সকলের কর্ম নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল। ব্রাহ্মণ , ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র সকলের কাজ নির্দিষ্ট হয়ে গিয়েছিল। শাস্ত্র, পূজা পাঠ এবং ধর্মে ব্রাহ্মণেরা তাদের আধিপত্য বিস্তার করেছিল।  বর্তমানেও এসবে ব্রাহ্মণদেরই প্রভাব। কিন্তু অবাক করার মত বিষয় হল শাস্ত্র এবং ধর্মে সর্বদা ব্রাহ্মণদের আধিপত্য ছিল না। বিষয়টি ভালোভাবে বোঝানো যাক। বেদ হিন্দুদের সর্বোচ্চ শাস্ত্র রূপে পরিগণিত হয়ে থাকে । আর ঋগ্বেদ হল বেদগুলোর মধ্যে প্রাচীনতম। এই ঋগ্বেদের রচনা কারা করেছিল বলে আপনার মনে হয়? হয়তো আপনি অনুমান করবেন, ‘ব্রাহ্মণেরা’! আপনি যদি ভেবে থাকেন কেবল ব্রাহ্মণদের হাতে এর রচনা হয়েছিল তাহলে আপনার ধারণা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। ঋগ্বেদের অনেক সুক্তের রচিয়তা ছিলেন নানা রাজারা, যারা ছিলেন ক্ষত্রিয়। উদাহরণ দিয়ে প্রমাণ করা যাক। ঋগ্বেদের ১ম মণ্ডলের প্রথম দশটি সুক্তের রচয়িতা হলেন মধুচ্ছন্দা। তিনি বিশ্বামিত্রের পুত্র ছিলেন। বিশ্বামিত্র যে একসময় ক্ষত্রিয় ছিলেন তা হয়তো অনেকেই জানেন। এছাড়া  চন্দ্রবংশীয় রাজা পুরুরবাকে ঋগ্বেদে ঋষি হিসাবে দেখা যায়। [1]  ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ৯৮ সুক্তের ঋষি হলেন দেবাপি। এই স্থল হতে জানা যায় দেবাপি আর্ষ্টিসেনের পুত্র ছিলেন। [2]  মহাভারতের বন পর্বের ১৫৮ তম অধ্যায়ে দেখা যায় আর্ষ্টিসেন হলেন একজন রাজর্ষি।[3] এই অংশ পড়ে হয়তো সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত যে, ঋগ্বেদ সুক্তের রচয়িতা ঋষি দেবাপি একজন রাজপুত্র ছিলেন, কিন্তু মহাভারতের শল্য পর্বে আছে অন্য তথ্য।  শল্যপর্বে কপালমোচন তীর্থের মাহাত্ম্যকীর্তনের সময় বলা হয়েছে, “ সেই স্থানে সংশিতব্রত ঋষিসত্তম আর্ষ্টিসেন সুমহান তপোবলে ব্রাহ্মণ্যলাভ করেছিলেন, রাজর্ষি সিন্ধুদ্বীপ, মহাতপা দেবাপি এবং মহাতপস্বী ভগবান বিশ্বামিত্র মুনিও ব্রাহ্মণ্যলাভ করেছিলেন।“ প্রথম তথ্য, ঋগ্বেদ সুক্তের রচয়িতা দেবাপি রাজপুত্র বা ক্ষত্রিয়বংশোদ্ভুত ছিলেন, এটাই সবাইকে অবাক করতে যথেষ্ট ছিল। কিন্তু পরে দেখা যাচ্ছে দেবাপি ক্ষত্রিয় বংশে জন্মে ব্রাহ্মণও হয়েছিলেন। 


বর্ণ পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত

শ্রেণী জিনিসটি পৃথিবীর নানা সমাজেই বিদ্যমান কিন্তু ভারতবর্ষে এই শ্রেণী জন্মগত হয়ে পড়েছিল। যখন কর্ম অনুসারে সমাজে উপরে ওঠার সুযোগ থাকে তখন সমাজটি সচল থাকে, গতিশীল থাকে, প্রাণবন্ত থাকে। কিন্তু যখন জন্মের সাথেই কারো শ্রেণী স্থির হয়ে যায়, মেধার দ্বারা উপরে ওঠার সুযোগ থাকে না, তখন সমাজ বদ্ধ জলাশয়ের মত স্থবির , দূষিত হয়ে পড়ে। ভারতবর্ষের এই স্থবিরতাই তার দীর্ঘ অবনতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বংশগত দুষ্ট বর্ণপ্রথা ভারতকে অন্ধকার যুগের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু সবসময় এমন অবস্থা ছিল না। একসময় বর্ণ বিদ্যমান থাকার পরেও সমাজ সচল ছিল, কর্মের মাধ্যমে মানুষ শ্রেয়ত্ব লাভ করতে পারতো। বর্ণ পরিবর্তনের অনেক প্রমাণ এখনো হিন্দুশাস্ত্রে বিদ্যমান আছে। নিচে সেই প্রমাণ গুলো এক এক করে তুলে ধরা হচ্ছে।

ক্ষত্রিয় বিশ্বামিত্রের ব্রাহ্মণত্ব লাভ

বিশ্বামিত্র হিন্দু ধর্মের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঋষি ছিলেন। কিন্তু তিনি ব্রাহ্মণ বংশে জন্মান নি, তার জন্ম হয়েছিল ক্ষত্রিয়বংশে কিন্তু পরবর্তীতে তিনি ব্রাহ্মণত্ব লাভ করেছিলেন। তাহলে বিশ্বামিত্রের ব্রাহ্মণত্ব লাভের গল্প বলা যাক-

পূর্বে কুশ নামে এক রাজা ছিলেন। তার পুত্র কুশনাভ। কুশনাভের পুত্র গাধী। গাধীর পুত্র ছিলেন বিশ্বামিত্র। একবার রাজা বিশ্বামিত্র চতুরঙ্গ সেনা নিয়ে পৃথিবী পর্যটনে বের হয়েছিলেন। পৃথিবী পর্যটন করতে করতে একসময় বিশ্বামিত্র  ঋষি বশিষ্ঠের আশ্রম দেখতে পান। ঋষি বশিষ্ঠের সাথে বিশ্বামিত্রের সাক্ষাৎ হয়।

বসিষ্ঠ বিশ্বামিত্র এবং তার সেনাকে আপ্যায়ণ করার প্রস্তাব দেন। বশিষ্ঠের শবলা নামে একটি কামধেনু ছিল। নাম যেমন এই ধেনুর কাজও তেমন। এই ধেনুর কাছে যা কামনা করা হত ঠিক তাই পাওয়া যেত। বিশ্বামিত্র এবং তার সেনা যে যে খাবার খেতে চাইলো বশিষ্ঠের গরু শবলা সেইসবেরই যোগান দিল। বশিষ্ঠের আপ্যায়ণে বিশ্বামিত্র ভীষণ সন্তুষ্ট হলেন।

বিশ্বামিত্র বশিষ্ঠকে বললেন, “ আমি আপনাকে লক্ষ ধেনু দিচ্ছি, তার বিনিময়ে আপনি এই শবলাকে দান করুন। আপনার এই ধেনুটি রত্ন। আর রত্নে রাজারই অধিকার রয়েছে।“

বশিষ্ট শবলাকে দান করার কথায় সম্মত হন না। বশিষ্ঠ বিশ্বামিত্রকে বলেন, “ তুমি লক্ষ কেন, যদি শতকোটি ধেনুও দাও তাহলেও আমি শবলাকে পরিত্যাগ করতে পারবো না।“

বশিষ্ঠের গরু শবলাকে পাওয়ার জন্য  বিশ্বামিত্র বশিষ্ঠকে নানা রকমের প্রস্তাব দেন কিন্তু কোনো প্রস্তাবেই বশিষ্ঠ রাজি হন না। শেষমেশ বিশ্বামিত্র বশিষ্ঠের গরুটি জোর করে নিয়ে যেতে থাকেন। কিন্তু ধেনু শবলা বশিষ্ঠের কাছে ফিরে চলে আসে।

বশিষ্ঠকে শবলা দুঃখিতমনে জিজ্ঞেস করে, “ ভগবান! রাজভৃত্যরা কেন আমাকে জোর করে নিয়ে যাচ্ছে, আপনি কি আমাকে ত্যাগ করেছেন? “ একথা শুনে বশিষ্ঠ বলেন, “ শবলা, আমি তোমাকে পরিত্যাগ করিনি। এই শক্তিশালী রাজা তোমাকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যাচ্ছে। আমার তার মত শক্তি নেই। ইনি রাজা, বলবান, ক্ষত্রিয় ও পৃথিবীর অধীশ্বর।“ একথা শুনে শবলা বশিষ্ঠকে বলে, “ ক্ষত্রিয়ের বল অত্যন্ত সামান্য,  ব্রাহ্মণ তার চাইতে অধিক বলবান, এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিশ্বামিত্র অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও আপনার চেয়ে শক্তিশালী নয়। যাইহোক, আমি ব্রহ্মার মত আশ্চর্যজনক কাজ করতে পারি, আপনি বরং আমাকেই বলুন, আমি ঐ দুরাত্মার দর্প চূর্ণ করবো।“

বশিষ্ঠ শবলাকে অনুমুতি দিলে শবলা তার শরীর থেকে শক, পহ্লব, যবন, কম্বোজ, ম্লেচ্ছ প্রভৃতি সেনা উৎপন্ন করতে থাকে। এই সেনারা বিশ্বামিত্রের সৈন্যকে পরাস্ত করে। নিজের সৈন্যকে বশিষ্ঠের সৈন্যের হাতে বিধ্বস্ত দেখে বিশ্বামিত্র তার শত পুত্রের সাথে বশিষ্ঠের দিকে ধেয়ে যান। কিন্তু বশিষ্ঠের হুঙ্কার মাত্রই বিশ্বামিত্রের শতপুত্র ভস্ম হয়ে যায়। অবশেষে বিশ্বামিত্র পরাস্ত হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হন।

পরাজিত বিশ্বামিত্র মহাদেবকে সন্তুষ্ট করার জন্য তপস্যা করতে থাকে। তপস্যায় প্রসন্ন হয়ে মহাদেব উপস্থিত হলে বিশ্বামিত্র মহাদেবের কাছে অস্ত্র প্রার্থনা করেন। মহাদেব বিশ্বামিত্রের প্রার্থনা পূর্ণ করেন। অস্ত্র পাওয়ার পর বিশ্বামিত্র অহংকারে পূর্ণ হয়ে ওঠেন। বশিষ্ঠকে ধ্বংস করার জন্য বিশ্বামিত্র তার আশ্রমে উপস্থিত হন, তার তপোবন দগ্ধ করতে থাকেন। বসিষ্ঠ উপস্থিত হলে বিশ্বামিত্র তার দিকে নানা অস্ত্র নিক্ষেপ করতে থাকেন, কিন্তু বশিষ্ঠ কেবলমাত্র তার ‘ব্রহ্মদণ্ড’ দিয়ে বিশ্বামিত্রের সকল অস্ত্রের নিবারণ করেন।

বশিষ্ঠের কাছে এবারো পরাস্ত হয়ে বিশ্বামিত্র বলেন, “ ক্ষত্রিয়বলে ধিক, ব্রহ্মবলই যথার্থ বল। “ একথা বিবেচনা করে বিশ্বামিত্র ব্রাহ্মণত্ব লাভের জন্য অত্যন্ত কঠোর তপস্যা  করতে থাকেন।  এরপর এক হাজার বছর অতিক্রম হলে ব্রহ্মা বিশ্বামিত্রের সামনে আবির্ভূত হয়ে বলেন, “ হে কৌশিক [4], তুমি তপোবলে সকল রাজর্ষিলোক অধিকার করেছ, তুমি আজ থেকে রাজর্ষি হলে।“

বর প্রদান করে ব্রহ্মা চলে গেলে বিশ্বামিত্র ভাবেন, “ আমি এত কঠোর তপস্যা করলাম, কিন্তু দেবতা ও ঋষিরা আমাকে রাজর্ষি ছাড়া আর কিছুই করলেন না!” একথা ভেবে বিশ্বামিত্র আবার তপস্যা করতে শুরু করেন। তপস্যার মাধ্যমে বিশ্বামিত্র এবার ঋষিত্ব লাভ করেন। এরপর বিশ্বামিত্র আরো সহস্র বছর তপস্যা করেন। তপস্যায় সন্তষ্ট হয়ে ব্রহ্মা বিশ্বামিত্রকে মহর্ষিত্ব প্রদান করেন। কিন্তু এতেও বিশ্বামিত্র সন্তুষ্ট হলেন না,  আরো হাজার হাজার বছর তিনি কঠোর তপস্যা করলেন। বিশ্বামিত্রের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে ব্রহ্মা এবং দেবগণ উপস্থিত হন। তারা বিশ্বামিত্রকে বলেন, “ ব্রহ্মর্ষি, আমরা তোমার এই কঠোর তপস্যায় ভীষণ সন্তুষ্ট হলাম । এর প্রভাবেই তুমি ব্রাহ্মণ হলে। তোমার বিঘ্ন দূর হোক এবং তুমি অতি দীর্ঘকাল জীবিত থাক।“ একথা শুনে বিশ্বামিত্র বলেন, “ যদি আমি দীর্ঘায়ুর সাথে ব্রাহ্মণত্ব লাভ করে থাকি, তাহলে ওঁকার, বষটকার ও বেদসমুদায় আমাকে বরণ করুন, মহর্ষি বশিষ্ঠও আমার ব্রাহ্মণত্বপ্রাপ্তি বিষয়ে অনুমোদন করুন।” বিশ্বামিত্রের কথা শুনে দেবতারা বশিষ্ঠকে প্রসন্ন করেন। বশিষ্ঠও বিশ্বামিত্রের ব্রাহ্মণত্ব প্রাপ্তি বিষয়ে অনুমোদন করেন।  [ বাল্মীকি রামায়ণ/ বালকাণ্ড/ ৫১- ৬৫ সর্গ] [5]

এই বিশ্বামিত্র ঋগ্বেদের একজন অতি গুরুত্বপূর্ণ ঋষি ছিলেন। হিন্দু ধর্মের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ গায়ত্রী মন্ত্রও ঋষি বিশ্বামিত্রই রচনা করেছিলেন। এই মন্ত্রটি ঋগ্বেদের ৩য় মণ্ডলের ৬২ সুক্তের ১০ম ঋকে আছে। মন্ত্রটি হলঃ
“তৎ সবিতুর্বরেণ্যং ভর্গো দেবস্য ধীমহি । ধিয়ো য়ো নঃ প্রচোদয়াৎ”। এর অর্থ হল, ” যিনি আমাদের ধীশক্তি প্রেরণ করেন, আমরা সেই সবিতাদেবের সেই বরণীয় তেজ ধ্যান করি।”

ক্ষত্রিয় বীতহব্যের ব্রাহ্মণত্ব লাভ

শুধু বিশ্বামিত্র নয় ক্ষত্রিয় বীতহব্যের ব্রাহ্মণত্ব লাভের কাহিনীও অত্যন্ত বিখ্যাত। বিশ্বামিত্রের ব্রাহ্মণত্ব লাভের যে কাহিনী উল্লেখ করা হয়েছে, তাতে বিশ্বামিত্রের কঠোর পরিশ্রমেরই প্রমাণ মেলে কিন্তু বিশ্বামিত্রের ব্রাহ্মণ্য লাভের কাহিনীতে অনেকসময় ব্রাহ্মণের প্রভাব বিস্তার করার প্রবণতাও দেখা যায়। সেইসব কাহিনীতে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে বিশ্বামিত্র ব্রাহ্মণের কারণেই ব্রাহ্মণত্ব লাভ করেছিলেন, তেমনি বীতহব্যের ব্রাহ্মণত্বলাভের পেছনেও ব্রাহ্মণের মহিমাই দেখানোর চেষ্টা হয়েছে। যাইহোক, ক্ষত্রিয় বীতহব্যের ব্রাহ্মণত্ব লাভের কাহিনী বর্ণনা করা যাক-

রাজা বৎস্যের হৈহয় ও তালজঙ্ঘ নামে দুই পুত্র জন্মেছিল। হৈহয় বীতহব্য নামেও প্রসিদ্ধ ছিলেন। তার সময়কালে বারাণসীতে হর্য্যশ্ব নামে এক রাজা ছিলেন। বীতহব্যের পুত্রেরা রাজা হর্য্যশ্বের সাথে যুদ্ধ করে তাকে হত্যা করেছিল। হর্য্যশ্ব নিহত হলে তার পুত্র সুদেব রাজ্যের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। কিন্তু বীতহব্যের পুত্রেরা তাকেও হত্যা করেছিল। সুদেব নিহত হলে সুদেবের পুত্র দিবোদাস সিংহাসনে আরোহণ করে। এবারও বীতহব্যের পুত্রেরা দিবোদাসের সাথে যুদ্ধ শুরু করে। যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে দিবোদাস পলায়ন করেন।পরবর্তীতে দিবোদাসের প্রতর্দ্দন নামে এক পুত্র জন্মায়। দিবোদাসের আজ্ঞায় প্রতর্দ্দন বীতহব্যের পুত্রদের বিনাশ করেন। পুত্রদের মৃত দেখে আত্মরক্ষা করার জন্য বীতহব্য মহর্ষি ভৃগুর শরণ নেন। বীতহব্যকে খুঁজতে খুঁজতে প্রতর্দ্দনও ভৃগুর আশ্রমে উপস্থিত হন। বীতহব্য কোথায় লুকিয়েছে তা ভৃগুর কাছে জানতে চান প্রতর্দ্দন । কিন্তু বীতহব্যের উপর ভৃগুর কৃপা হয়। তিনি তাই প্রতর্দ্দন বলেন, “ আমার আশ্রমে ক্ষত্রিয় কেউই নেই, সবাই ব্রাহ্মণ।” একথা শুনে প্রতর্দ্দন বলে্ন, “দুরাত্মা বীতহব্য ক্ষত্রিয়। সে আপনার আশ্রয় গ্রহণ করাতে আপনি তাকে ক্ষত্রিয় থেকে ব্রাহ্মণ বানালেন। আমারই প্রভাবে সে জাতিচ্যুত হল, আমি এতেই নিজেকে কৃতকার্য বলে মনে করছি।“  ভৃগুর এই কথাতেই বীতহব্য ব্রাহ্মণত্ব লাভ করেছিলেন। ভৃগু ওই কথা বলামাত্রই বীতহব্য ব্রহ্মর্ষি এবং ব্রহ্মবাদীতে পরিণত হয়েছিলেন। বীতব্যের গৃৎসমদ নামে এক পুত্র হয়েছিল। তার রূপ অবিকল ইন্দ্রের মত ছিল। একবার দৈত্যরা তাকে দেবরাজ ইন্দ্র মনে করে নিপিড়ন করেছিলেন। ঋগ্বেদে তার গুণ কীর্তিত হয়েছে। ব্রাহ্মণেরা তার সবিশেষ শ্লাঘা করে থাকেন। তার সুচেতা নামে এক পুত্র জন্মে। সুচেতার পুত্র বর্চ্চা, বর্চ্চার পুত্র বিহব্য। বিহব্যের পুত্র বিতত্য। বিতত্যের পুত্র সত্য, সত্যের পুত্র সন্ত। শন্তের পুত্র শ্রবা। শ্রবার পুত্র তম। তমের পুত্র প্রকাশ। প্রকাশের পুত্র বাগিন্দ্র। বাগীন্দ্রের পুত্র প্রমতি। প্রমতির ঔরসে ঘৃতাচীর গর্ভে রুরু নামে এক পুত্র জন্মে। রুরুর ঔরসে প্রমদ্বরার গর্ভে শুনকের জন্ম হয়। মহাত্মা শৌনক সেই শুনকের পুত্র। এরা সকলেই ব্রাহ্মণ হয়েছিলেন।   [মহাভারত/ অনুশাসন পর্ব/ ৩০ অধ্যায়]

মহাভারতের দৃষ্টান্ত

মহাভারত হতে বীতহব্য এবং বিশ্বামিত্রের ব্রাহ্মণত্ব লাভের কাহিনী ছাড়াও আরো অনেকের ব্রাহ্মণত্ব লাভের কাহিনী জানা যায়। যেমনঃ

মহাভারতের শল্য পর্বের ৪১ তম অধ্যায়ে আছে,  আর্ষ্টিসেনের তীর্থে দেবাপি ও বিশ্বামিত্র তপস্যার প্রভাবে ব্রাহ্মণ্য লাভ করেছিলেন।

আদিপর্বের ৭৫ তম অধ্যায়ে আছে,  রাজা নহুষের ছয় পুত্রের মধ্যে যতি তপস্যার বলে ব্রহ্মের মত হয়েছিলেন। [6] তবে ক্ষিতিমোহন সেন এই অংশের অনুবাদে লিখেছেন,  নহুষের ছয় পুত্রের মধ্যে যতি তপস্যার বলে  ব্রাহ্মণত্ব লাভ করেছিলেন’ 

সবার সামনে ভীম যখন কর্ণের জাতি তুলে অপমান করলেন, বললেন ‘ সুতপুত্র! রথের বলগা ধর’, তখন দুর্যোধন এর ভীষণ প্রতিবাদ করেছিলেন। দুর্যোধন বলেছিলেন, “ ‘ হে ভীম , কর্ণের প্রতি এমন কটূক্তি প্রয়োগ করা তোমার উচিত হচ্ছে না। ক্ষত্রিয়দের বলই শ্রেষ্ঠ এবং ক্ষত্রিয়দের সাথেই যুদ্ধ করবে ; বীরদের ও নদীদের উৎসস্থল নিতান্ত দুর্জ্ঞেয়।  …যারা ক্ষত্রিয় কুলে জন্মেছিলেন কালক্রমে তারাও ব্রাহ্মণ হয়েছেন; বিশ্বামিত্র প্রভৃতি ক্ষত্রিয় হয়েও অক্ষয় ব্রহ্মত্ব লাভ করেছিলেন। মহানুভব দ্রোণাচার্য কুম্ভ থেকে জন্মেও অদ্বিতীয় শস্ত্রধারী হয়েছেন । গৌতম বংশে শরস্তম্ভ হতে গৌতম উৎপন্ন হন; আর তোমাদের যেভাবে জন্ম হয়েছে, আমাদের তা অজানা নেই।“ [ আদিপর্ব/ ১৩৭ অধ্যায়] [7]

হরিবংশের দৃষ্টান্ত

হরিবংশ পুরাণে বর্ণ পরিবর্তনের অনেক দৃষ্টান্ত আছে। নিচে তার বর্ণনা করা হচ্ছে –

“ নাভাগারিষ্টের দুই পুত্র। তারা উভয়েই পূর্বে বৈশ্য ছিলেনকিন্তু কালক্রমে ব্রাহ্মণত্ব প্রাপ্ত হন। করুষের পুত্রেরা কারুষ নামে বিখ্যাত। তারা সকলেই ক্ষত্রিয়জাতীয় সুতরাং যুদ্ধদুর্মদ ছিলেন। তাদের মধ্যে পৃষধ্র নামে একজন নিজের গুরুর গোহত্যা করাতে শাপগ্রস্ত হয়ে শূদ্রত্ব প্রাপ্ত হন।“ [হরিবংশ/ ১১ অধ্যায়]

“গৃৎসমদের পুত্র শুনকের বংশীয়রা শৌনক নামে বিখ্যাত। শুনকের বংশে ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বৈশ্য ও শূদ্র চার বর্ণেরই উদ্ভব হয়েছিল। “ [ হরিবংশ/২৯ অধ্যায়]

২৯ তম অধ্যায়ে আরো আছে, “… ভার্গব বংশে অঙ্গিরার এই সমস্ত পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বৈশ্য এই তিন রকমের হাজার হাজার পুত্র জন্মেছিল।”

“সুতপার পুত্র বলি, ইনি পূর্বকালে মানবকূলে জন্মগ্রহণ করে কাঞ্চন নির্মিত ইষুধি ( তূনীর) ব্যবহার করতেন এবং পরম যোগী নৃপতি ছিলেন। তার বংশধর পাঁচপুত্র জন্মে, প্রথমত অঙ্গ, এরপর বঙ্গ, সুহ্ম, পুণ্ড্র ও কলিঙ্গ, এরাই মহারাজ বলির ক্ষত্রিয় সন্তান কিন্তু তার ঐ বংশধর পুত্ররা কালক্রমে ব্রাহ্মণত্ব লাভ করেন। একসময় ব্রহ্মা প্রীত হয়ে বালীকে বর প্রদান করেন যে তুমি মহাযোগিত্ব লাভ করে কল্পপরিমিত আয়ু প্রাপ্ত হবে। সংগ্রামে অজেয়তা, ধর্মে প্রাধান্য, ত্রিলোক পরিদর্শন শক্তি ও পুত্রবানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতা লাভ করবে। বলে অপ্রতিম ও ধর্মতত্ত্বের দর্শক হবে। বর্ণচতুষ্টয়ের স্থাপয়িতা হবে “ [ হরিবংশ/ ৩১ অধ্যায়]

“বৃহদ্দর্ভ রাজার বৃহন্মনা এক পুত্র ছিল।বৃহন্মনার দুই স্ত্রী। একের নাম যশোবতী, অপরের নাম সত্যা, এরা উভয়েই বৈনতেয় সূতা , এদের বংশধর পুত্রও আছেন। যশোদেবীর গর্ভে জয়দ্রথের জন্ম হয়।  সত্যার পুত্র বিজয়। এই বিজয় ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্র উভয় ধর্মাবলম্বী ছিলেন। বিজয়ের পুত্র ধৃতি, ধৃতির পুত্র ধৃতব্রত , ধৃতব্রতের পুত্র মহাযশা সত্যকর্মা। সত্যকর্মার পুত্র সূত অধিরথ। এই সূত কর্ণকে প্রতিগ্রহ করিয়াছিলেন বলিয়া কর্ণকে লোক সূতজ বলিত।“  [ হরিবংশ/ ৩১ অধ্যায়]

মহাভারতের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন কর্ণ। কর্ণকে সূত অধিরথ লালন পালন করেছিলেন। কর্ণের পালক পিতা অধিরথের পূর্বপুরুষেরা একসময় যে রাজা ছিলেন তা উপরের অংশ হতে বোঝা যাচ্ছে। কর্ম প্রভাবেই হয়তোবা অধিরথ বা তার কোনো পূর্ব পুরুষ ক্ষত্রিয় থেকে সূতে পরিণত হয়েছিলেন। এখানেও কর্ম অনুসারে বর্ণ পরিবর্তনের আভাস মেলে। 

“ একরাট নামক মহীপতির পুত্র রাজর্ষি ঋচেয়ু অতি দুর্ধর্ষ সম্রাট ছিলেন। ঋচেয়ু তক্ষক নন্দিনী জ্বলনা নাম্নী কন্যার পাণিগ্রহণ করেন। ঐ মহিষীর গর্ভে রাজর্ষি মহীপতি মতিনারের জন্ম হয়। মতিনার নৃপতির তংসু, প্রতিরথ ও সুবাহু নামক পরম ধার্মিক তিন পুত্র এবং গৌরী নাম্নী এক কন্যা হয় , এই কন্যা মান্ধাতার জননী। পুত্রগণ সকলেই বেদার্থদর্শী ব্রহ্মনিষ্ঠ, সত্যপরায়ণ , বলবান, অস্ত্রধারী ও যুদ্ধবিশারদ ছিলেন। প্রতিরথের পুত্র নৃপতি কন্ব, কন্বের পুত্র মেধাতিথি। এই মেধাতিথি হতে কন্ব নৃপতির ব্রাহ্মণত্ব লাভ হয়।“ [ হরিবংশ/ ৩২ অধ্যায়]

 “ এরপর ঐ ভরদ্বাজ হতেই ভরতের পুত্র জন্মাল, তার নাম বিতথ রাখলেন। এই বিতথ জন্মগ্রহণ করলেই ভরত ত্রিদিব প্রস্থান করলেন। কিছুকাল পরে বিতথকে রাজ্যে অভিষিক্ত করে মহামুনি ভরদ্বাজও বনে প্রস্থান করেন। এরপর বিতথের সুহোত্র, সুহোতা, গয়, গর্গ ও মহাত্মা কপিল এই পাঁচ পুত্র জন্মে। সুহোত্রের দুই পুত্র হয়। প্রথম পুত্র মহাবল কাশিক দ্বিতীয় নৃপতি গৃৎসমতি । গৃৎসমতির পুত্ররা ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বৈশ্য এই তিন বর্ণে বিভক্ত হয়েছিলেন।“ [ হরিবংশ/ ৩২ অধ্যায়]

“ বৎস্য হতে বৎস্যভূমি ও ভার্গব হতে ভৃগুভূমি উৎপন্ন হয়েছে। এরা সকলেই অঙ্গীরার পুত্র ভৃগু বংশে জন্মগ্রহণ করে ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বৈশ্য শূদ্র চতুর্বর্ণে বিভক্ত হয়েছিল “ [ হরিবংশ/৩২ অধ্যায় ]

“ এদের বৈবাহিত সম্বন্ধ অন্যান্য ঋষিদের সাথে সম্পাদিত হত। … পুরুবংশীয় রাজন্যগণ ও ব্রহ্মর্ষি বসিষ্ঠ এই দুই ক্ষত্রিয় ও ব্রাহ্মণকুলের সম্বন্ধ বিলক্ষণ বিখ্যাত আছে।“ [ হরিবংশ/৩২ অধ্যায়]

“মুদ্গলের পুত্র মহাযশা মৌদ্গল্য। এরা সকলেই ক্ষত্রধর্মাবলম্বী দ্বিজাতি ছিলেন , এরা কন্ব ও মুদ্গল বংশে জন্মগ্রহণ করে অঙ্গীরার পক্ষ আশ্রয় করেছিলেন। মৌদ্গল্যের পুত্র সুমহাযশা ব্রহ্মর্ষি ইন্দ্রসেনা।  [ হরিবংশ/৩২ অধ্যায়]

“ দিবোদাসের পুত্র ব্রহ্মর্ষি মিত্রসু নামে এক রাজা ছিলেন। এই বংশে মৈত্রায়ণ সোম নামা নৃপতি জন্মগ্রহণ করেন, তা হতেই মৈত্রেয় বংশ উৎপন্ন হয়েছে । এরা সকলেই ক্ষত্রগুণোপেত ভার্গব। [ হরিবংশ/৩২ অধ্যায়]

বিষ্ণু পুরাণের দৃষ্টান্ত

বিষ্ণু পুরাণেও বর্ণ পরিবর্তনের অনেক দৃষ্টান্ত আছে। নিচে তার বর্ণনা করা হচ্ছে –

“ রথীতরের বংশীয়েরা ক্ষত্রিয় অথচ আঙ্গিরস বলে তাদের ক্ষত্রোপেত ব্রাহ্মণ বলা যায়।“ [ বিষ্ণু পুরাণ/৪ / ২/২]

“ গৃৎসমদের পুত্র শৌনক, এই শৌনকই চতুর্বর্ণের প্রবর্তন করেন। [ বিষ্ণু পুরাণ/৪/৮/১]

“ ভার্গের পুত্র ভার্গভূমি। এই ভার্গভূমি হতে চতুর্বর্ণ প্রবর্তিত হয়।“ [ বিষ্ণু পুরাণ ৪/৮/৯ ]

“ পৃষধ্র গুরুর গো বধ করে শূদ্রত্ব লাভ করেন। করুষ হতে কারুষ নামে মহাবল ক্ষত্রিয়গণ উৎপন্ন হন। নেদিষ্টপুত্র নাভাগ বৈশ্যত্ব প্রাপ্ত হন। “ [ বিষ্ণুপুরাণ/ ৪/১]

“ গর্গের পুত্র শিনি। এই শিনি হতেই গার্গ্য ও শৈন্য নামে কীর্তিত ক্ষত্রোপেত ব্রাহ্মণগণ জন্মগ্রহণ করেছেন। মহাবীর্যের উরুক্ষয় নামে এক পুত্র হয়। এই উরুক্ষয়ের ত্রয়্যারুণপুষ্করিণ্য ও কপিল নামে তিনজন পুত্র হন এবং এই তিন পুত্রই পরে ব্রাহ্মণত্ব প্রাপ্ত হন। “ [ বিষ্ণু পুরাণ ৪/১৯/৯-১০]

“ অপ্রতিরথের পুত্র কণ্ব, তার পুত্র মেধাতিথি । এই মেধাতিথি হতেই কাণ্বায়ণ নামে দ্বিজেরা ব্রাহ্মণেরা)  উৎপন্ন হন।“ [ বিষ্ণু পুরাণ ৪/১৯/২ ]

“ মুদ্গল হতে জাত ক্ষত্রিয়গণ কোনো কারণে ব্রাহ্মণত্ব লাভ করে মৌদ্গল্য নামে অভিহিত হন। [ বিষ্ণুপুরাণ ৪/১৯/১৬ ]

বায়ুপুরাণের দৃষ্টান্ত

বায়ু পুরাণে বর্ণ পরিবর্তনের যেসকল দৃষ্টান্ত আছে তা নিচে উল্লেখ করা হচ্ছে-

বায়ুপুরাণ ৯৩/১৪ শ্লোকের দুই ধরণের অনুবাদ আমি পেয়েছি।

একটি ক্ষিতিমোহনের অনুবাদ, “ রাজা নহুষের পুত্র সংযাতি মোক্ষ মার্গ অবলম্বন করে তপস্যা বলে ব্রাহ্মণত্ব লাভ করলেন।

আরেকটি  “ সংযাতি মোক্ষ মার্গ অবলম্বন করে মৌনভাবে ব্রহ্মস্বরূপে অবস্থান করেন।“  [8]

“ বহু ক্ষত্রোপেত দ্বিজাতি তপস্যার আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং তপস্যা বলেই সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। বিশ্বামিত্রমান্ধাতাসঙ্কৃ্তিকপিপুরুকুৎসসত্যঅনুবাহনঋতুআর্ষ্টিসেনঅজমীঢ়কক্ষীবশীজয়রথীতররুন্দবিষ্ণুবৃদ্ধ প্রভৃতি ক্ষত্রোপেত নরপতি তপোবলে ঋষিত্ব প্রাপ্ত হয়েছিলেন। এইসকল রাজর্ষি সুমহতি সিদ্ধি লাভ করেছিলেন।“ [ বায়ুপুরাণ/৯১ অধ্যায়] 

“ গৃৎসমদের পুত্র শুনক। শুনকের পুত্র শৌনক। এই শৌনকের বংশে বিভিন্ন কর্মফলে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চতুর্বর্ণই উৎপন্ন হইয়াছিল । শলের পুত্র আর্ষ্টিসেন, তার পুত্র চরন্ত। শৌনক ও আর্ষ্টিসেন ক্ষত্রোপেত দ্বিজাতি ছিলেন। “ [ বায়ুপুরাণ/৯২ অধ্যায় ]

 “ দেবী সুদেষ্ণা ঋষিকে অন্ধ  এবং বৃদ্ধ দর্শনে নিজে তার কাছে গেলেন না। নিজ ধাত্রেয়িকাকে বিভূষিত করে তার কাছে পাঠিয়ে দিলেন। ধর্মাত্মা ঋষি সেই শূদ্রার গর্ভে দুটি মহৌজা পুত্র উৎপাদন করলেন। ঐ পুত্রদ্বয়ের নাম কক্ষীব ও চক্ষুস। বলিরাজা দেখলেন কক্ষীব ও চক্ষুস নামে দুইটি যথাবিধি বেদাধ্যায়ী ও ব্রহ্মবাদী জ্ঞানী পুত্র জন্মেছে। তা দেখে তিনি ঋষিকে বললেলেন – আমার এই দুটি শ্রেষ্ঠতম প্রত্যক্ষধর্মা পুত্র উৎপন্ন হয়েছে। ঋষি বলিলেন- না, এরা তোমার নয়, আমার পুত্র, তোমার ব্যপদেশে আমারই এই পুত্রদ্বয় শূদ্রযোনি হতে জন্মেছে।“ [ বায়ু পুরাণ/ ৯৯ অধ্যায় ]

“ ধূর্য্যের পুত্র কণ্ঠ , তৎপুত্র মেধাতিথি ; তার পুত্রগণ এই মেধাতিথি হতেই কাণ্ঠায়ণ দ্বিজ নামে খ্যাতি লাভ করিয়াছিলেন। … রন্তিনন্তন ত্রসুর পুত্র ইলিন । ইনি ব্রহ্মবাদী ছিলেন।“  [ বায়ু পুরাণ/ ৯৯ অধ্যায়]

“ গার্গ্যের পুত্রগণ গার্গ্য নামে পরিচিত। এরা ক্ষত্রোপেত দ্বিজাতি বলে অভিহিত। “ [ বায়ুপুরাণ/ ৯৯ অধ্যায় ]

“ কণ্ঠের ক্ষত্রিয়)  পুত্র মেধাতিথি। এই মেধাতিথি হইতেই কাণ্ঠায়ণ দ্বিজগণের প্রসিদ্ধি।“ [ বায়ুপুরাণ/ ৯৯ অধ্যায়]

“ সুপার্শ্বের পুত্র ধার্মিক সুমতি । তার পুত্র ধার্মিক রাজা সন্নতিমান। তার পুত্র সনতি। এই সনতির পুত্র কৃত। ইনি কৌথুমশাখী মহাত্মা হিরণ্যনাভের শিষ্য ছিলেন। ইনিই চতুর্বিংশতি প্রকার সামসংহিতার বক্তা । তার প্রবর্তিত সংহিতা গুলো প্রাচ্য নামে অভিহিত। ইনি সামসংহিতার প্রণেতা ; তাই তার বংশীয়েরা সামগায়ী।“ [ বায়ু পুরাণ/ ৯৯ অধ্যায়]

“ মুদ্গলের বংশধরেরা মৌদ্গল্য নামে পরিচিত। তারা ক্ষত্রোপেত দ্বিজাতি। তারা কণ্ঠমৌদ্গল নামে অভিহিত হয়ে সর্বদা অঙ্গীরার পক্ষে অবস্থিত। মুদ্গলের জ্যেষ্ঠ পুত্র মহাযশা ব্রহ্মিষ্ঠ। রাজ্ঞী ইন্দ্রসেনা তার ঔরসে এক পুত্র প্রসব করেন। তার নাম বধ্যশ্ব। আমরা শুনেছি ঐ বধ্যশ্ব হতে মেনকার গর্ভে এক মিথুন উৎপন্ন হয়।  ঐ  মিথুনের একজন রাজর্ষি দিবোদাস এবং অপর যশস্বিনী অহল্যা। শারদ্বৎ হতে অহল্যার গর্ভে এক পুত্র উৎপন্ন হয় । এই পুত্র ঋষিশ্রেষ্ঠ শতানন্দ।“ [ বায়ুপুরাণ/ ৯৯ অধ্যায়]

“ দিবোদাসের পুত্র রাজা মিত্রয়ু। ইনি ব্রহ্মিষ্ঠ ছিলেন। তার পুত্রের নাম মৈত্রেয়। এই দিবোদাসবংশীয়গণ ক্ষত্রোপেত ও ভার্গবের পক্ষাশ্রয়ী বলে ভার্গব। “ [ বায়ু পুরাণ / ৯৯ অধ্যায়]

ব্রাহ্মণ হতে ক্ষত্রিয় হওয়ার কাহিনী

হিন্দু শাস্ত্রে শুধুমাত্র অন্যান্য বর্ণ হতে ব্রাহ্মণ হওয়ার কাহিনী মেলে না বরং ব্রাহ্মণ হতে ক্ষত্রিয় হওয়ার কথাও মেলে। বায়ুপুরাণে ব্রাহ্মণ থেকে ক্ষত্রিয় হওয়ার একটি দৃষ্টান্ত আছে। নিচে তার বর্ণনা করা হলঃ

পূর্বে অশীজ নামে এক ঋষি ছিলেন । তার স্ত্রী ছিলেন মমতা। অশীজের ভাই ছিলেন ঋষি বৃহস্পতি। ভ্রাতৃবধূ  মমতার সাথে বলপূর্বক সহবাসের ফলে ঋষি ভরদ্বাজের জন্ম হয়। মমতা এই সন্তানকে স্বীকার করেন না, পরিত্যাগ করেন। এই পরিত্যক্ত বালককে দেখে মরুদ্গণের মনে করুণা হয়। এমন সময় রাজা ভরত পুত্রলাভের জন্য বারবার যজ্ঞ করছিলেন কিন্তু তার পুত্রলাভ হচ্ছিল না। অবশেষে পুত্রলাভের জন্য মরুদ্গণের উদ্দেশ্যে ভরত যজ্ঞ শুরু করেন। মরুদ্গণ ঋষি বৃহস্পতির পরিত্যক্ত শিশু ভরদ্বাজকে রাজা ভরতের পুত্র করে দেন। ভরত ভরদ্বাজের নাম বিতথ রাখেন। ‘ এভাবে সেই ভরদ্বাজ দিব্য ব্রাহ্মণ হয়েও ব্রাহ্মণ হতে ক্ষত্রিয়ত্বে উপনীত হয়েছিলেন। ‘ [ বায়ুপুরাণ/ ৯৯ অধ্যায়]

শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের দৃষ্টান্ত

শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণে বর্ণ পরিবর্তনের যেসকল দৃষ্টান্ত আছে তা নিচে উল্লেখ করা হচ্ছে-

“ ঋষভদেব ও জয়ন্তীর উপরোক্ত ঊনবিংশতি পুত্রের কনিষ্ঠ আরও একাশি জন পুত্র ছিল। তাদের পিতার আদেশ অনুসারে তারা অত্যন্ত বিনীতবেদনিপুনযজ্ঞপরায়ণ ও সদাচাররত আদর্শ ব্রাহ্মণ হয়েছিলেন।“ [ শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ/স্কন্ধ ৫/ অধ্যায় ৪ / শ্লোক ১৩] [9]

“ শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- হে ভারত, যে বংশে আপনি জন্মগ্রহণ করেছেন, যে বংশে বহু রাজর্ষি ও ব্রাহ্মণগণের আবির্ভাব হয়েছে , আমি এখন সেই পুরুবংশের বর্ণনা করবো।“ [ শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ/ স্কন্ধ ৯/ অধ্যায় ২০/ শ্লোক ১ ]

“ রথীতরের পত্নীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করার ফলে তারা রথীতর গোত্র ; কিন্তু যেহেতু তাহারা অঙ্গীরার বীর্য থেকে উৎপন্ন হয়েছিলেন , তাই তারা অঙ্গীরা গোত্রও। রথীতরের সমস্ত সন্তানদের মধ্যে এরাই শ্রেষ্ঠ , কারণ জন্মসূত্রে তারা ছিলেন ব্রাহ্মণ।“ [ শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ/৯/৬/৩ ]

“ গর্গ হতে শিনি এবং শিনি হতে গার্গ্য জন্মগ্রহণ করেন। গার্গ্য ক্ষত্রিয় হলেও তার থেকে এক ব্রাহ্মণবংশের উদ্ভব হয়। মহাবীর্য থেকে দুরিতক্ষয় নামে এক পুত্রের জন্ম হয়, যার পুত্রদের নাম ত্র্যয়ারুণিকবি এবং পুষ্করারুণি । যদিও দুরতিক্ষয়ের এই পুত্ররা ক্ষত্রিয়বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেনতবুও তারা ব্রাহ্মণত্ব লাভ করেছিলেন । বৃহৎক্ষেত্রের হস্তী নামক পুত্র হস্তিনাপুর নগরী ( দিল্লি) স্থাপনা করেন। হস্তীর অজমীঢ়, দ্বিমীঢ়, পুরমীঢ়, এই তিন পুত্র। প্রিময়মেধ আদি অজমীঢ়ের বংশধরগণ সকলে ব্রাহ্মণ হয়েছিলেন। [ শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ/৯/২১/১৯-২১]

“ শান্তির পুত্র সুশান্তি, সুশান্তির পুত্র পুরুজ, পুরুজের পুত্র অর্ক। অর্ক থেকে ভর্ম্যাশ্ব এবং ভর্ম্যাশ্ব থেকে মুদ্গল, যবীনর, বৃহদ্বিশ্ব, কম্পিল্ল এবং সঞ্জয় নামক পাঁচ পুত্রের জন্ম হয়। ভর্ম্যাশ্ব তার পুত্রদের বলেছিলেন, “ হে পুত্রগণ, তোমরা আমার পাঁচটি রাজ্যের ভার গ্রহণ কর , কারণ তোমরা সেই কার্য সম্পাদনে সমর্থ। এই কারণে তার পঞ্চপুত্র পঞ্চাল নামে অভিহিত হন। মুদ্গল থেকে মৌদ্গল্য ব্রাহ্মণবংশের উৎপত্তি হয়।“ [ শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ/ ৯/২১/৩১-৩৩]

“ রাজা নীপ শুকের কন্যা কৃত্বীর গর্ভে ব্রহ্মদত্ত নামে এক পুত্র উৎপন্ন করেন । ব্রহ্মদত্ত ছিলেন একজন মহান যোগী …“[ শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ/ ৯/২১/২৫ ]

শ্রীমদ্ভাগবত পুরাদণের ৯/২/১৬ শ্লোকের  দুই ধরণের অনুবাদ আমি পেয়েছি।

একটি ক্ষিতিমোহনের অনুবাদ, “ করুষ ক্ষত্রিয়, তাহার বংশধরগণ ব্রহ্মণ্য প্রাপ্ত হয়েছেন।“

আরেকটি প্রভুপাদের অনুবাদ, “ মনুর আর এক পুত্র করুষ থেকে কারুষ নামক এক ক্ষত্রিয়জাতি উৎপন্ন হয়। কারুষ ক্ষত্রিয়েরা ছিলেন উত্তরদিকের রাজা । তারা ধর্মনিষ্ঠ এবং ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির রক্ষকরূপে বিখ্যাত ছিলেন।

 ধৃষ্ট নামক মনুর পুত্র হতে ধার্ষ্ট নামক ক্ষত্রিয়জাতির উৎপত্তি হয় যারা পৃথিবীতে ব্রাহ্মণত্ব প্রাপ্ত হয়েছিলেন।“ [ শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ/ ৯/২/১৭]

“ দিষ্টের নাভাগ নামে এক পুত্র ছিল। … এই দিষ্টপুত্র নাভাগ কর্মের দ্বারা বৈশ্যত্ব প্রাপ্ত হয়েছিলেন।“ [ শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ/ ৯/২/২৩]

ব্রহ্ম পুরাণের দৃষ্টান্ত

ব্রহ্ম পুরাণে বর্ণ পরিবর্তনের যেসকল দৃষ্টান্ত আছে তা নিচে উল্লেখ করা হচ্ছে-

 “ নাভাগ এবং ধৃষ্টের বংশধরগণ ক্ষত্রিয় হলেও বৈশ্যত্ব লাভ করেছিলেন। [ ব্রহ্মপুরাণ/ অধ্যায় ৭] [10]

“ কুশিকের পুত্র গাধী। গাধীর পুত্র বিশ্বামিত্র। ইনি ব্রহ্মর্ষি ছিলেন এবং বিশ্বরথ নামেও ইনি পরিচিত ছিলেন। “ [ ব্রহ্মপুরাণ/ ১০ অধ্যায়]

“ উষদ্রথ পরাক্রমশালী রাজা ছিলেন। উষদ্রথের ফেন নামে এক পুত্র হয়। ফেনের পুত্র সুতপা। সুতপার পুত্র বলি। এই বলি মহাযোগী ছিলেন। বলির পাঁচটি পুত্র হয়, তাদের নাম- অঙ্গ, সুহ্ম, পুণ্ড্র, কলিঙ্গ ও বঙ্গ। এদের মধ্যে অঙ্গ বড় ও বঙ্গ ছোটো। এরা বালেয় নামে বিখ্যাত ছিলেন। বালেয় নামক ব্রাহ্মণেরাও বলি রাজার বংশধর বলে পৃথিবীতে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। [ ব্রহ্মপুরাণ/ ১৩ অধ্যায়]

“ পুত্রেষ্টি যজ্ঞ করার পর যে পুত্র জন্মগ্রহণ করে ভরত তার নাম রাখেন বিতথ। বিতথের জন্মের পরই রাজা ভরত স্বর্গারোহণ করেন। বিতথের রাজ্যাভিষেক হওয়ার পর ভরদ্বাজও বনে চলে যান। যথাসময়ে বিতথের সুহোত্র, সুহোতা, গয়, গর্গ ও কপিল নামে পাঁচটি পুত্র জন্মায়। তাদের মধ্যে সুহোত্রের কালিক ও গৃৎসমতি নামে দুটি পুত্র জন্মগ্রহণ করে।  গৃৎসমতির যে সব পুত্র জন্মায় তাদের মধ্যে কেউ কেউ ব্রাহ্মণ ,কেউ কেউ ক্ষত্রিয়কেউ কেউ বৈশ্য হয়েছিল। “ [ ব্রহ্মপুরাণ/ ১৩ অধ্যায়]

“ বৎস থেকে বৎসভূমি ও ভর্গ থেকে ভর্গভূমির উৎপত্তি হয়। এই যাদের কথা আপনাদের বললাম এরা সবাই অঙ্গীরার বংশে জন্মগ্রহণ করেন। এরা সবাই ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বৈশ্য ও শূদ্র হয়েছিলেন। [ ব্রহ্মপুরাণ/ ১৩ অধ্যায়]

সত্যযুগে বর্ণই ছিল না!

 পূর্বে বর্ণ পরিবর্তনের নানা উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। এসব উদাহরণ অনেককেই আশ্চর্যান্বিত করে থাকতে পারে। তাহলে এখন আরো অবাক করা কথা জানানো যাক। বায়ু পুরাণ মতে সত্যযুগে কোনো বর্ণই ছিল না। বায়ুপুরাণের অষ্টম অধ্যায়ে আছে,  “ সত্যযুগে শুভ অশুভ কোনো রকম কর্মের প্রবৃত্তিই ছিল না , বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা ছিল না ; পরন্তু বর্ণশঙ্করও হত না।“ [ ৮/৬১]

বর্ণ প্রতিষ্ঠিত হয় গুণ ও কর্ম অনুসারে!

বায়ু পুরাণের অষ্টম অধ্যায় হতে আমরা জানতে পেরেছি ‘সত্যযুগে কোনো বর্ণপ্রথাই ছিল না’। কিন্তু একসময় তো বর্ণপ্রথার সৃষ্টি হয়েছিল! তাহলে কিভাবে বর্ণপ্রথার সৃষ্টি হয়েছিল? এর উত্তরে বায়ুপুরাণ জানাচ্ছে, “ শুভাশুভ কর্মের গুরুত্ব লঘুত্ব অনুসারে যথাক্রমে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও এই তিন বর্ণের দ্রোহকারী শূদ্র – এই চতুর্বিধ প্রজা সৃষ্টি হয় । তাদের মধ্যে যারা বলবান, সত্যবাদী, অহিংসক, নির্লোভ, জিতেন্দ্রিয় তারা সেইসকল পুরাদিতে বাস করতে থাকেন। যারা এদের থেকে  দুর্বল তারা এদের কাছে প্রতিগ্রহ করে তাতে বাসস্থাপন করেন।  যারা এর থেকেও দুর্বল তারা এদের কর্ম করে জীবিকা নির্বাহ করতে থাকে। এর চাইতে হীনবল জনগণ এদের পরিচর্যা দ্বারা জীবন যাপন করে।“ [ বায়ু পুরাণ/ ৮ম অধ্যায়]

এই অধ্যায়ে আরো আছে, “ সেই প্রজাদের জীবিকার উপায় বিহিত হলে ভগবান ব্রহ্মা তাদের মধ্যে বিবাদ বিঃসম্বাদ নিবারণ করার জন্য কতগুলি বিধি ব্যবস্থা প্রণয়ন করেন। তাদের মধ্যে যারা বলবান ও ভূপরিগ্রহিতা সেই ক্ষত্রিয়দের ইতর সাধারণের পরিত্রাতা কার্যে নিয়োগ করলেন। সেই সকল ক্ষত্রিয়ের কাছে যারা গমনাগমন করতেন , অথচ সর্বদা ভয়হীন, সত্যবাদী সর্বভূতে ব্রহ্মজ্ঞানবান ছিলেন , তারা তখন ব্রাহ্মণ সংজ্ঞায় অভিহিত হলেন। আর যারা এদের অপেক্ষা দুর্বল অথচ ক্রুরকর্মে নিরত ; আর যারা যৎপূর্বে যমের মত অনলসভাবে স্বার্থ সাধনের উদ্দেশ্যে প্রজাপুঞ্জের হিংসা করত , সেই কিনাশপদবাচ্য প্রজাবর্গকে বৈশ্য শব্দে অভিহিত করে সর্বসাধারণের বৃত্তিসাধনকার্যে নিয়োগ করলেন। যারা শোকও করত এবং ইতস্ততঃ ভ্রমণ অর্থাৎ ছোটাছুটি করত, অথচ নিস্তেজা ও অল্পবীর্য সেই সকল প্রজাকে শূদ্র শব্দে অভিহিত করে অপর বর্ণত্রয়ের পরিচর্যায় নিয়োগ করলেন। প্রভু ব্রহ্মা তাদের ধর্ম কর্মেরও বিধান প্রণয়ন করেন, তার সাহায্যে চতুর্বর্ণ আপন আপন কর্তব্য সকল পালন করতে থাকে। পরে আবার ক্রমে ক্রমে তারা মোহবশে সেইসকল নিয়মে অনাদর করে পরস্পর বিরুদ্ধাচরণে প্রবৃত্ত হয়। প্রভু ব্রহ্মা প্রজাবর্গের সেই ব্যতয় যথাযথ অবগত হয়ে মর্যাদা রক্ষার জন্য ক্ষত্রিয়দের বল , শাসন , যুদ্ধ – এই তিন জীবিকা নির্দিষ্ট করে দিলেন। তিনি ব্রাহ্মণদের যাজন অধ্যাপন ও প্রতিগ্রহ এই তিনটি বৃত্তি নির্দেশ করলেন। পশুপালন, বাণিজ্য ও কৃষি এই তিনটি বৃত্তি বৈশ্যদিগকে প্রদান করলেন; ও শূদ্রদের জন্য শিল্প ও দাসত্ব এই দুইটি বৃত্তি ব্যবস্থা করে দিলেন। তিনি ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এই বর্ণত্রয়ের যাজন, অধ্যয়ণ ও দান – এই তিনটি সাধারণ বৃত্তি বিধান করে দিলেন।“ [ বায়ুপুরাণ/৮ম অধ্যায়]

শেষের অংশ পড়ে আমার একটি ধারণা হয়েছে। একসময় গুণ কর্মের ভিত্তিতে বর্ণ গড়ে উঠলেও, একসময় বর্ণাশ্রম বিদ্রোহের সম্মুখীন হয়, বর্ণাশ্রম ব্যবস্থার টলমল অবস্থা হল তখন একে দৃঢ়তর করার জন্য বংশগত করে দেওয়া হয়। এই যে মত প্রকাশ করলাম এই মত বর্ণ সম্বন্ধীয় যাবতীয় তথ্যের ভিত্তিতে সামগ্রিক মত নয়, কেবল বায়ুপুরাণের এই অংশের প্রেক্ষিতেই এই মত প্রকাশ করলাম। বর্ণ ব্যবস্থার প্রণয়ন ঠিক কিভাবে হয়, এটা ঐতিহাসিক গবেষণার বিষয়, নিশ্চয় কোনো নির্ধারিত গ্রন্থ পড়েই এই বিষয়ে চূড়ান্ত মত প্রদান করা যায় না।

উদার বর্ণব্যবস্থা

নানান জাতিবাদী গ্রন্থে বর্ণাশ্রম সম্বন্ধে কঠোর নিয়ম কানুন দেখা যায়, কিন্তু সেইদিক থেকে ব্রহ্মপুরাণের ২২৩ তম অধ্যায়ে তুলনামূলক উদার বর্ণ ব্যবস্থার প্রমাণ মেলে, এখানে সদাচারী শূদ্রকে ব্রাহ্মণের উপরে রাখা হয়েছে। এখানে মহাদেব বলছেন, “ ব্রাহ্মণত্ব অত্যন্ত দুর্লভ বস্তু। কেউ ব্রাহ্মণ হয়ে জন্মগ্রহণ করলেও দুষ্কৃতির ফলে তা থেকে ভ্রষ্ট হয়। ক্ষত্রিয় বা বৈশ্য যদি ব্রাহ্মণ ধর্ম অবলম্বন করে জীবিকা নির্বাহ করে তবে সে ব্রাহ্মণত্ব লাভ করে। যে ব্যক্তি ব্রাহ্মণত্ব ত্যাগ করে ক্ষত্রিয়ত্ব অবলম্বন করেসে ব্রাহ্মণত্ব থেকে ভ্রষ্ট হয়ে  মৃত্যুর পর ক্ষত্রিয়রূপে জন্মগ্রহণ করে। দুর্লভ ব্রাহ্মণ জন্ম লাভ করেও যে বৈশ্য কর্ম করেসে বৈশ্যত্ব লাভ করে। এরকম হীন কর্ম করলে বৈশ্যও শূদ্রত্ব লাভ করে। স্বধর্ম চ্যুত ব্রাহ্মণও এভাবে শূদ্র হয়ে পড়ে। সে বর্ণ ধর্মচ্যুত হয়ে ব্রহ্মলোকে যেতে পারে না , নরকে গমন করে, পরে শূদ্র হয়ে জন্মায়।  কি ক্ষত্রিয়কি বৈশ্য সকলেই নিজের কর্ম পরিত্যাগ করে শূদ্রের কাজ করলে শূদ্রত্ব লাভ করে থাকে। তারা নিজ নিজ কাজ থেকে ভ্রষ্ট হয়ে বর্ণ সঙ্করতা লাভ করে এবং ক্রমে শূদ্রত্ব লাভ করে। যে শূদ্র নিজের ধর্ম পালন করে জ্ঞানী, পবিত্র, ধর্মজ্ঞ ও ধর্মনিরত হয় , সে অবশ্যই সে ধর্মফল ভোগ করে থাকে। শূদ্র যথাবিধি সমস্ত কার্য করবে, বাড়িতে যে অতিথিই আসুক না কেন সাধ্যমতো তাকে অভ্যর্থনা জানাবে, তার সেবা করবে, তারপর নিজে সবার শেষে খাদ্য গ্রহণ করবে। সযত্নে শ্রেষ্ঠ তিন বর্ণের যথাযোগ্য পরিচর্যা করবে। সর্বদাই সৎ পথে থেকে ঋতুকালে স্ত্রীসঙ্গ করবে , সাধু সঙ্গ ভজনা করবে এবং বৃথা মাংস পরিত্যাগ করবে – এরকম আচরণ করলে শূদ্রও বৈশ্যত্ব লাভ করতে পারে। বৈশ্য যদি সত্যবাদী, নিরহঙ্কারী, মধুরভাষী, বেদাধ্যয়ণকারী, পবিত্র এবং সংযতচিত্ত হয় এবং সে যদি শীত গ্রীষ্ম, সুখ দুঃখকে সমানভাবে সহ্য করতে পারে , ব্রাহ্মণদের যথোচিত সৎকার করে, দুবেলা মাত্র আহার করে, কাউকে ঈর্ষা না করে, ব্রত পালন করে , যথাবিধি যজ্ঞের অনুষ্ঠান করে এবং দক্ষিণ, গার্হপত্য এবং আহবনীয় এই ত্রিবিধ বৈদিক অগ্নির উপাসনা করে অতিথি সেবার পর ভোজন করে, তবে সে ব্রাহ্মণত্ব লাভ করতে পারে। এরকম আচরণকারী বৈশ্য মহান ক্ষত্রিয়বংশে নিষ্ঠাবান হয়ে জন্মায়। যথাকালে উপনয়ন হবার পর সমৃদ্ধ এবং বহু দক্ষিণাযুক্ত যজ্ঞের অনুষ্ঠান করে এবং আর্তজনের পরিত্রাতা , ধর্মানুসারে প্রজাপালক, সত্যবাদী এবং ন্যায় মার্গগামী রাজা হয় । ধর্ম কার্যে ব্যাপৃত থেকে প্রজাদের কাছ থেকে পাওয়া ষষ্ঠভাগ করের দ্বারাই নিজের বৃত্তি নির্বাহ করে। ঋতুকালেই নিজের স্ত্রীর সাথে সহবাস করে । উপবাস এবং বেদাধ্যয়ণ করে এবং অতিথি পরায়ণ হয় । স্বার্থ বা কামবশে কোনো কর্তব্য কাজে অবহেলা করে না । পিতৃকার্য এবং দৈব কার্যে অবহেলা করে না । দিনে দুবার অগ্নিহোত্র  উপাসনা করে । শেষে কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে বা সম্মুখযুদ্ধে বা মন্ত্রপূত ত্রেতাগ্নিতে প্রবেশ করে এবং মৃত্যুর পরে ব্রাহ্মণ হয়ে জন্মায়।

যথাবিধি জাতকর্ম প্রভৃতি সংস্কারে সংস্কৃত এবং বেদজ্ঞ হলে ধর্মপ্রাণ বৈশ্যও নিজের কর্মফলে ক্ষত্রিয় হতে পারে। নীচ কুলে জাত শূদ্রও যথাবিধি সংস্কারযুক্ত ও বেদজ্ঞ হলে এসব কর্মের ফলে ব্রাহ্মণত্ব লাভ করে। অসচ্চরিত্র ব্রাহ্মণ অন্যান্য বর্ণের যে কর্ম সেই কর্মের অনুষ্ঠান করলে ব্রাহ্মণত্ব থেকে চ্যুত হয়ে শূদ্রত্ব লাভ করে। যে শূদ্র সৎকর্মের অনুষ্ঠান করে যে স্বভাবতই পবিত্র জিতেন্দ্রিয়ব্রাহ্মণের মতই তাকে শ্রদ্ধা করা উচিত। যে শূদ্র স্বাভাবিক কর্ম করে জীবনযাত্রা অতিবাহিত করেআমার মনে হয় সে সাধারণ ব্রাহ্মণদের থেকেও পবিত্র। বংশসংস্কারবেদজ্ঞান কিংবা সন্তানবাহুল্য – কোনো কিছুর দ্বারাই ব্রাহ্মণত্ব লাভ করা যায় নাএকমাত্র সুচরিত্রই ব্রাহ্মণত্ব লাভে সহায়ক। জগতে যত প্রকৃত ব্রাহ্মণ দেখা যায় সদাচারই তাদের ব্রাহ্মণত্বের কারণ। সদাচার পরায়ণ শূদ্রও ব্রাহ্মণত্ব লাভ করতে পারে। সমস্ত প্রাণীতে সমদর্শনই ব্রাহ্মণের চরিত্র বৈশিষ্ট্য। যে ব্যক্তির মধ্যে নির্গুণ বিমল ব্রহ্ম বিষয়ক জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়সেই ব্যক্তিই ব্রাহ্মণ পদবাচ্য। মর্ত্যলোকে ব্রাহ্মণ একটি মহৎ ক্ষেত্রস্বরূপ ; ওই ক্ষেত্রে যে বীজ পতিত হয় ; সেই বীজই পরকালে বিশেষ ফল প্রদান করে। তাই প্রত্যেকেরই উচিত ব্রাহ্মণোচিত আচার পালন করা। গৃহস্থ ব্যক্তি প্রতিদিনই বেদপাঠ করবে। বেদাধ্যয়ণকে জীবিকা না করে , যে সর্বদাই সদাচার পরায়ণ ও অধ্যয়ণ সম্পন্ন হয় , সে ব্রহ্মত্ব লাভ করতে পারে।“ [ ব্রহ্মপুরাণ/ ২২৩ অধ্যায়]

ব্রহ্ম পুরাণ থেকে তুলনামূলকভাবে নমনীয় বর্ণ ব্যবস্থার পরিচয় আমরা পেলাম কিন্তু ভবিষ্যপুরাণের ব্রাহ্মব্রহ্মের ৪১ তম অধ্যায়ে বর্ণ ব্যবস্থাকে ভীষণভাবে আক্রমণ করা হয়েছে এমন দেখা যায়-

“ ব্রহ্মা বললেন, যদি বেদাধ্যয়ণের মাধ্যমে ব্রাহ্মণ হওয়া যেত, তাহলে ব্রাহ্মণের মত বেদ পাঠ করা ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যদেরও ব্রাহ্মণ বলা হোক কিন্তু দেখা যায় বেদ পড়েও রাবণ রাক্ষস হয়ে গিয়েছিল। একইভাবে কুকুরমাংসভোজী চণ্ডাল, দাস, শিকারী, অহীর, মল্লাহ, শূদ্র প্রভৃতিরাও বেদ পাঠ করে থাকে। যেমনঃ শূদ্ররা বিদেশে গিয়ে কোনো ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয়ের অধীনে থেকে তাদের অনুসারে কাজ করে,  ভাষা শিখে চারটি অথবা একটি বেদ পড়ে ফেলে এবং কোনো ব্রাহ্মণের মেয়েকে বিয়ে করে ফেলে।  অনেক ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্য বেদপাঠ করার পরেও দক্ষিণের গৌড় বা দ্রাবিড় জাতির সাথে মিশে যায় এবং শূদ্রও লোকের অজ্ঞাতসারেই ব্রাহ্মণ হয়ে যায়। সুতরাং বেদাধ্যয়ণের দ্বারা জাতি নির্ণীত হয় না। এজন্য সজ্জন পুরুষেরা ন্যায়পথের পথিক শাস্ত্রকারদের বাক্যানুসারে কারো প্রতি বৈরিতা রাখে না। ষড়ঙ্গ বেদ অধ্যয়ণ করা কোনো ব্রাহ্মণ যদি আচারহীন হয়ে পড়ে তাহলে বেদ তাকে পবিত্র করতে পারে না। বেদাধ্যয়ণই ব্রাহ্মণদের শিল্পকর্ম এবং লক্ষণ বলে বর্ণিত হয়েছে। কেউ যদি বেদ অধ্যয়ণ করে কিন্তু তার বৃত্ত ধর্ম ( কর্ম)  পালন না করে তাহলে এতে কোনো লাভ হয়না, যেমন স্ত্রীরত্ন পাওয়ার পর হিজড়ার কোনো লাভ হয়না। শিখা, সন্ধ্যোপাসনা, মেখলা, দণ্ড এবং মৃগ চর্ম এসব ব্রাহ্মণের মত শূদ্ররাও গ্রহণ করতে পারে। শূদ্রের ব্রাহ্মণ হওয়া  ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং মহেশ্বরও আটকাতে পারে না যখন, তখন সামান্য মানুষেরা কিভাবে আটকাবে? তাই মানুষের যজ্ঞোপবীত সংস্কার, মেখলা, শিখা এসব দ্বারা জাতি বোঝা সম্ভব নয়। তন্ত্র, মন্ত্র এবং আকস্মিক বক্তৃতার মাধ্যমে যদি ব্রাহ্মণকে চেনা যায়, তাহলে এসবে প্রবৃত্ত শূদ্রকে ঠিক কিভাবে চিনবে? তপ, সত্য এবং মন্ত্রের শক্তি (শূদ্র প্রভৃতি) সকল মানুষেই দেখা যায়। কটূ ভাষণকারীকে সকলেই অপছন্দ করে, সুতরাং শূদ্র এবং ব্রাহ্মণে কোনো প্রকার পার্থক্য সম্ভব নয়। অন্য দেশে অন্য সময়ে শ্রেষ্ঠ বলে পরিচিত ব্রাহ্মণদের মধ্যে কুকর্মকারী থাকলেও কলিযুগে ব্রাহ্মণদের মধ্যে কুকর্মকারী না থাকলেই ভালো। অভিশাপ এবং ক্ষমার শক্তিও ( শূদ্র প্রভৃতি ) সকল মানুষে অভিন্ন। একইভাবে চোর, বিশ্বাসঘাতক, রাজপুত্র বা কোনো দুর্জন দ্বারা নিপীড়িত মানুষদের মধ্যেও কোনো পার্থক্য দেখা যায় না। যেমনি শূদ্ররা তার দুঃখের নিবৃত্তি এবং আত্মীয়ের রক্ষা করতে অক্ষম, তেমনি ব্রাহ্মণেরাও সেসবে অক্ষম। কলিযুগে ব্রাহ্মণদের মধ্যে কেউ কুকর্মকারী না হলেই ভালো। অভিশাপ, ক্ষমা, আধ্যাত্মিক বিচারের সামর্থ্যকেই অনেকে ব্রাহ্মণত্বের লক্ষ্মণ বলে মনে করেন। কিন্তু সাংসারিক বিষয়ে অনুরক্ত থাকার কারণে এবং মোহের অন্ধকারে ডুবে থাকার কারণে সকল মানুষই বিবশ হয়ে নরকের আগুনে পতঙ্গের মত পতিত হয়ে থাকে। কিন্তু  জাতি ধর্মের কিছু বিশেষত্ব শোনা যায়, শূদ্ররা অসিদ্ধ এবং ব্রাহ্মণেরা প্রসিদ্ধ। সংস্কার, সংস্কারের সামগ্রী অথবা কারণ অন্যান্য মানুষের মধ্যে সাধারণত্ব উৎপন্ন করে  কিন্তু এসবই শূদ্রের মধ্যে বিশেষত্ব উৎপন্ন করে। পণ্ডিতেরা ব্রাহ্মণদের মধ্যে পাঁচ প্রকারের ভেদের কল্পনা করেছেন কিন্তু তা যুক্তিযুক্ত নয় … সামগ্রীর দ্বারা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শূদ্রও ব্রাহ্মণের সমান হয়ে যায়, শূদ্র এবং ব্রাহ্মণের মধ্যে আধ্যাত্মিক কোনো ভেদ নেই। … যদি সংস্কারই ব্রাহ্মণ হওয়ার মুখ্য কারণ হয়, তাহলে সকল সংস্কারযুক্ত কাউকে ব্রাহ্মণ বলা যায়। কিন্তু   সংস্কারহীন ব্যাস প্রভৃতিদের সাথে এরা তুলনীয় নয়। এজন্য জাতির সমর্থনে কোনো কারণই থাকতে পারে না। যদিও জাতিকে নিত্য বলা হয়ে থাকে, কিন্তু অধ্যয়ণ করলে এর কোনো বিশেষত্ব দেখা যায় না। আর যে বিশেষত্ব থাকা সম্ভব তা বেদসংস্কার দ্বারাও হয় না। শরীরের কারণেও কেউ ব্রাহ্মণ হতে পারে না … ব্রাহ্মণ, নাস্তিক, যবন, ম্লেচ্ছ প্রভৃতি সকলের শরীরই একইরকম। একইভাবে দুশ্চরিত্র, দুষ্ট, ক্রুর এবং ঘাতকদের মধ্যেও বেদে বর্ণিত ধার্মিক হওয়ার গুণাবলি  পাওয়া যায়।সুতরাং সংস্কারের ফলে ব্রাহ্মণ প্রভৃতি জাতি হতে পারে না। এজন্য বাইরের এবং ভেতরে সুখ দুঃখ, ঐশ্বর্য, আজ্ঞা, নির্ভয়, শরীর, জুয়াখেলা, ব্যবসা, আয়, শরীরের পুষ্টি, দুর্বলতা, স্থিরতা, চঞ্চলতা, বুদ্ধি, বৈরাগ্য, ধর্ম, পরাক্রম , ত্রিবর্গ, চতুরতা, রূপ, রঙ, ঔষধ, স্ত্রীর গর্ভ, মৈথুন, শরীরের মল, শরীরের হাড়, শরীরের ছিদ্র, প্রেম, উচ্চতা, স্থূলতা, রোম এসবে   ব্রাহ্মণ এবং শূদ্রতে কোনো ভেদ নেই। এভাবে বিচার পূর্বক যা প্রতিপাদিত করা হল তা বৃদ্ধ জ্ঞানী, কিংবা ইন্দ্র প্রভৃতি দেবতার ভুল প্রমাণ করতে পারবে না। ব্রাহ্মণ চন্দ্রের কিরণের মত শ্বেতবর্ণ নয়, ক্ষত্রিয় কিংশুক ফুলের মত লাল রঙের নয়, বৈশ্য হরিতালের মত পীত বর্ণ নয়, শূদ্র পোড়া কাঠের ( কয়লার) মত কালো নয়। মানুষের পায়ের মাধ্যমে চলা, গায়ের রঙ, চুল, সুখ-দুঃখ, রক্ত, চামড়া, মাংস , মেদ হাড় এবং রস একই রকম হওয়ার ফলে চার প্রকারের ( ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র) কিভাবে হতে পারে; যেহেতু রঙ, উচ্চতা, স্থূলত্ব, শরীর রচনা, গর্ভে নিবাস, বাণী, বুদ্ধি, কর্মেন্দ্রিয়, জীবন, বল, ত্রিবর্গ, রোগ এবং ঔষধে জাতিদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। প্রমাণ, দৃষ্টান্ত, নীতির দ্বারা, কোনো প্রকারেই একে ভুল প্রমাণ করা সম্ভব নয়।  কোনো পিতার চার পুত্র থাকলে তাদের একই জাতি হয়ে থাকে। একইভাবে সবাইকে উৎপন্ন করা পিতা একজন, পিতা (স্রষ্টা)  একজন হওয়ার ফলে পুত্রদের মধ্যে কিভাবে জাতিভেদ করা সম্ভব? কোনো  ডুমুর গাছের উপরে, মাঝখানে,  নিচে সব জায়গাতে যেমন  ডুমুর ফলই ধরে, তেমনি একজন হতে উৎপন্ন মানুষদের মধ্যে জাতি কল্পনা করা অনুচিত। … অনেকে দেহকে ব্রাহ্মণ মনে করেন, কিন্তু দেহ একসময় নষ্ট হয়ে যায়, তাই দেহকে কখনো ব্রাহ্মণ বলা যায় না। একইভাবে দেহের এক এক অঙ্গকে ব্রাহ্মণ কল্পনা করা উচিত নয়। দেহ যদি ব্রাহ্মণ হয়ে থাকে, তবে যে পঞ্চভূত দ্বারা দেহ গঠিত হয়, তাদেরও ব্রাহ্মণ বলতে হবে। অজ্ঞানীরা দেহকে ব্রাহ্মণ বলে স্বীকার করে থাকে, কিন্তু দেহতে ব্রাহ্মণত্ব স্বীকার করা যায় না ,কারণ অনেক খোঁজার পরও দেহতে ব্রাহ্মণত্ব দেখা যায় না।  দেহকে ব্রাহ্মণ মানা হলে অধম, নীচ,  চণ্ডাল, কুকুরভোজীদের দেহ ব্রাহ্মণ বলে পরিগণিত হওয়া উচিত।  … “   [ ভবিষ্য পুরাণ/ ব্রাহ্ম পর্ব/ ৪১ অধ্যায়; মূল হিন্দি অনুবাদক- বাবুরাম উপাধ্যায়; হিন্দি হতে বাংলায় অনুবাদিত ]

ভবিষ্য পুরাণের ব্রাহ্ম পর্বের ৪২ তম অধ্যায়ে নিম্ন বর্ণের নারীর গর্ভজাত বিভিন্ন ঋষিদের উল্লেখ করা হয়েছে। দেখানো হয়েছে জন্ম নিম্ন বর্ণে হলেও তপস্যার দ্বারাই এই ঋষিরা শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছিলেন-  

“ঋষি ব্যাস ব্যাস কৈবর্ত নারী থেকে, পরাশর চণ্ডালিনী থেকে, ঋষি শূক শূক পাখি থেকে, কণাদ উল্লুক পাখি থেকে, শৃঙ্গ ঋষি মৃগ থেকে, বসিষ্ঠ বেশ্যা থেকে, মন্দপাল নাবিকা থেকে, মাণ্ডব্য ব্যাঙ থেকে  জন্মেছেন। কিন্তু এরা সবাই ব্রাহ্মণত্ব লাভ করেছেন। তাই সুন্দর চরিত্রের অধিকারী এনারা যে উপদেশ দিয়ে গিয়েছেন তা অনুসরণ করে যারা কর্ম করেন তারাই তেজস্বী হন। কেননা হরিণীর গর্ভ হতে জন্মানো শৃঙ্গ ঋষি তপস্যার দ্বারা ব্রাহ্মণত্ব লাভ করেছিলেন। সুতরাং ব্রাহ্মণত্ব লাভে সংস্কারই মুখ্য। একইভাবে ব্যাসের পিতা পরাশর চণ্ডালিনীর গর্ভ থেকে , কণাদ উল্লুকের গর্ভ থেকে , মহামুনি বসিষ্ঠ বেশ্যার গর্ভ থেকে , মহামুনি মন্দপাল নাবিকার  গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণ করে তপোবল দ্বারা শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ হয়েছিলেন। …“   [ ভবিষ্য পুরাণ/ ব্রাহ্ম পর্ব/ ৪২ অধ্যায়; মূল হিন্দি অনুবাদক- বাবুরাম উপাধ্যায়; হিন্দি হতে বাংলায় অনুবাদিত ]

তথ্যসূত্র ও টীকাঃ


[1] ১০ম মণ্ডল/৯৫ সুক্ত/ ১,৩,৬,৮,৯,১০, ১২, ১৪, ১৭ ঋক  ; বিষদে কোলব্রুক দ্রষ্টব্য, Asiatic transactions, vol 8, 393

[2] ৫ম ঋক

[3] এছাড়াও বন পর্বের ১৫৯ অধ্যায় দ্রষ্টব্য

[4]  বিশ্বামিত্রের অপর নাম

[5] আর্ষ্টিসেনের তীর্থে দেবাপি ও বিশ্বামিত্র তপস্যার প্রভাবে ব্রাহ্মণ্য লাভ করিয়াছিলেন। [ শল্য পর্ব/ ৪১ অধ্যায়]

বিশ্বামিত্রের ব্রাহ্মণ্য লাভের কাহিনী [ অনুশাসন পর্ব/ ৪ অধ্যায়]  

[6] কালিপ্রসন্নের অনুবাদ

[7] কালিপ্রসন্নের অনুবাদ

[8] বেনামি ভার্সনের অনুবাদ ; মূল সংস্কৃতে ব্রাহ্মণ নেই, ব্রহ্ম আছে

[9] শ্রীমদ্ভাগবতের সকল অনুবাদ ভক্তিবেদান্ত শ্রীল প্রভুপাদের

[10] অনুবাদক- অন্নদাশঙ্কর পাহাড়ী

প্রবন্ধ সম্পাদনায় ও লেখনীতে: শুদ্ধবুদ্ধি

মূল লেখা আপডেট পেতে নিম্নোলিখিত লিংক প্রযোজ্য

https://thehinduwebsite.wordpress.com/2021/01/09/%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%81-%e0%a6%a7%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a7%87-%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a3-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a7%8d-2/

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ