নিয়েনডার্থালঃ আদি না আধুনিক মানব?।। রাণা



ঠিক চারপুরুষ আগে আমার পূর্বপুরুষের একটা অংশ জীবিকার সন্ধানে পূর্ব বাংলা থেকে কলকাতায় চলে আসে। গ্রাম্য জীবন থেকে নাগরিকতায় অভ্যস্ত এই কলকাত্তাইয়া অংশ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অংশে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করেছে। কিন্তু পূর্ববঙ্গের সেই শাখা এখনো গ্রামেই বংশবিস্তার করে চাষাবাদ নিয়ে আছে। চারপুরুষ চিক্কন গায়ের নাগরিকেরা আদি শাখার মত হলেও আদি শাখা ঠিক নয়। ওরা ওরা। আমরা আমরা। 

আজ থেকে ৫-৬ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকার আদি মানুষেদের একটা অংশ উত্তরের দিকে যেতে যেতে সুয়েজের মাটি পেরিয়ে এশিয়া ঢুকব ঢুকব করেও আরো একটু উত্তরে ইউরোপের অংশে ঢুকে পড়ে। আফ্রিকার আদি মানুষেরা অভিযোজিত হতে হতে হোমো স্যাপিয়েন্স বা আমাদের মত মানুষে পরিণত হয়। আর আরেক শাখা নিয়েনডার্থাল হয়ে বিকশিত হয়। এতদিন ধরে মনে করা হত হোমো স্যাপিয়েন্স ও নিয়েনডার্থাল একেবারে স্বাধীনভাবে বিকশিত প্রজাতি। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা ও জিন মানচিত্র আমাদের পূর্বপুরুষ বিকাশের ধারণাতে আঘাত করেছে। নিয়েনডার্থাল মানুষেরা দক্ষিণ ইউরোপ জুড়ে প্রায় তিনলক্ষ বছর ধরে একাকী বাস করত। আমাদের সাথে তাদের তখনো দেখা হয়নি। 

আজ থেকে প্রায় এক লক্ষ বছর আগে আফ্রিকার থেকে আধুনিক মানুষেরা এশিয়ার উপকূল ধরে আবার পদযাত্রা শুরু করে। বাস, ট্রেন বা এরোপ্লেন হলে তারা কয়েকদিনে ইউরোপ পৌছে যেত। কিন্তু আফ্রিকা থেকে ইউরোপে পৌছাতে প্রায় ৩০-৪০ হাজার বছর সময় লেগে যায়। ইউরোপে আফ্রিকানদের উপনিবেশ স্থাপন শুরু হয় আজ থেকে মাত্র ৬০ হাজার বছর আগে। তখনো নিয়েনডার্থাল মানুষেরা বহাল তবিয়তে শিকার করছিল। আমরা ও ওরা প্রায় ৩০ হাজার বছর একসাথে সহাবস্থান করেছিলাম। ম্যামোথ শিকারে অভ্যস্ত ইউরোপিয়ানরা বেশ শক্তপোক্ত ও পরিশ্রমী প্রজাতি ছিল তা তাদের বাসস্থান দেখেই বোঝা যায়। তাদের জিন মানচিত্রে ভাষা জিনের সন্ধান পাওয়া গেছে। অতএব বোঝা যায় ইংরেজি বা স্প্যানিশে না হলেও তাদের আদি ভাষা ছিল। আগুনের ব্যবহার জানত। যদিও তাদের হাড়ের বিশ্লেষণে পাওয়া যায় যে কাঁচা মাংসেও অরুচি ছিল না। পরজন্ম, ঈশ্বর বা প্রার্থনার কোন চিহ্ন তাদের মধ্যে দেখা যায় না। যদিও তাদের আফ্রিকান ভাইয়েরা প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রার্থনাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এদের কোন গুহাচিত্র আজ অব্দি পাওয়া যায় না।

তিন লক্ষ বছরে তারা নিজেদের সেভাবে বিকশিত করেনি। জামা পরত, ১০-২০ জন মিলে গোষ্ঠীবদ্ধ ভাবে থাকত, ওইটুকুই। বাকিটুকু আগেও যেমন ছিল তিন লক্ষ বছর পরেও ঠিক তারা তেমনই ছিল। নিয়েনডার্থাল প্রথমে গোষ্ঠীবদ্ধভাবে বসবাস করলেও পরে খাবারের অভাব দেখা দিলে একান্নবর্তী থেকে নিউক্লিয়ার পরিবার গঠন করে। ঠিক আমরা যেমন ছোট পরিবার সুখী পরিবারে অভ্যস্ত। এতে গোষ্ঠীর সাথে গোষ্ঠীর মেলামেশার সুযোগ কমে, সাথে ছোট পরিবারে বংশবিস্তার কম হতে থাকে। এমনকি শেষের দিকে এসে এরা নিজেরা নিজেদের মাংস খেতে শুরু করে।

যদিও নৃতত্ত্ববিদরা তাদের সভ্য মানুষই মনে করেন। সমবেদনা, সহযোগিতা এগুলো তারা শিখে গেছিল। এক নিয়েনডার্থাল মানুষে বাম হাত কোন কারণে ভেঙ্গে গেলেও সে বহুদিন বেঁচে ছিল। নৃতত্ত্ববিদরা পরীক্ষা করে দেখেছেন যে বাম হাত প্রায় অকেজো ছিল, কিন্তু ডান হাত বাম হাতের থেকে বেশি বিকশিত হয়েছিল। জীবজগতে এমন পঙ্গুত্বে কেউ বেশিদিন থাকে না, যদি না কেউ তাকে দেখাশোনা না করে। এদের গড় আয়ু ছিল চল্লিশ বছরের মত। এই চল্লিশ বছর নিয়েই তারা সন্তুষ্ট ছিল। ওষুধ আবিষ্কার করে জীবনকে দীর্ঘায়িত করার কথা ভাবেনি।

জার্মানির নিয়েনডার্থাল অঞ্চলে ওদের প্রথম অবশেষ মেলে তাই এইরূপ নামকরণ। শিল্পবিপ্লবের আগে অব্দি জার্মানির এই অঞ্চল ছিল প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে লোভনীয় স্থান। গুহা, জঙ্গল, গিরিখাত নিয়ে তা ছিল আদি প্রকৃতি। যেন মনে হতে পারে এই তো কিছুদিন আগেও তারা সেখানে ছিল। শিল্পবিপ্লবের লোভ সব কিছু ধ্বংস করে দেয়। আদি ইউরোপিয়ান মানবেরা থাকলে নিশ্চয় এই লোভী হোমো স্যাপিয়েন্সদের দিকে কয়েকটা পাথরের তৈরি বল্লম ছুড়ে মারত। আকরিকের লোভে মানুষে শুধু তাদের পূর্বপুরুষদের বাসস্থান ধ্বংস করেনি, তাদের অবশেষকেও বিনষ্ট করেছে। ক্রোয়েশিয়া সহ ইউরোপের অন্যান্য দেশে এমন দেহাংশ প্রচুর পাওয়া গেছে।

৩০-৪০ হাজার বছর আগেই নিয়েনডার্থাল এই পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ লুপ্ত হয়ে যায়। এতদিন ভাবা হত হোমো স্যাপিয়েন্সরা তাদের নিকেশ করে। কিন্তু বর্তমানে নৃতত্ত্ববিদ ও জিন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে যুদ্ধ নয় বরং ভাব ভালোবাসা কোন কোন ক্ষেত্রে গড়ে উঠেছিল। এই প্রেম ইউরোপের মাটিতে হয়েছিল। তিন লক্ষ বছরে হিমযুগের ইউরোপিয়ানরা আর পরিবর্তিত পরিবেশে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেনি। এছাড়া ছোট ছোট গোষ্ঠীতে ভাগ হওয়ার কারণে বংশবিস্তার কমতে থাকে, জিনের আদানপ্রদান কমতে থাকে। অন্যদিকে হোমো স্যাপিয়েন্সরা বৃহৎ গোষ্ঠীতে বাস করত এবং  নিয়েনডার্থালদের থেকে আমরা তখন অনেক বেশি সংবেদনশীল ও মানবিক ছিলাম। ফলে নিজের কারণে নিয়েন্ড্রাথালরা নিজেরাই ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়। আমাদের আর ওদের মধ্যে কোন পানিপথ বা ওয়াটারলু যুদ্ধ হয়নি। বিকাশের ধারা অনুসরণ করেনি বলে এই ধ্বংস অনিবার্য ছিল। আমরা নিয়েনডার্থাল খুনে দায়ী নয়। বরং আমার জিনেও নিয়েনডার্থাল বাস করে। হ্যা, আপনার জিনেও। নিয়েনডার্থাল সাম্প্রতিক জিন মানচিত্র তাই বলে।

ওরা দেখতে কেমন ছিল? ওরা ছিল অনেকটাই আমাদের মত দেখতে। আমরাও অনেকটাই ওদের মত দেখতে। তবুও যমজ ভাই নয়।

আরো অনেকটা এগিয়ে এসে আমরা যদি ভারতের পশ্চিম প্রান্তে ৫ হাজার বছর আগে আসি। তখনো ঐতিহাসিকেরা মোটামুটিভাবে নিশ্চিত আর্য ও হরপ্পায়িনদের মধ্যে কোন যুদ্ধবিগ্রহ হয়নি। বরং আর্যদের বেশ কিছু আগেই হরপ্পা সভ্যতা প্রাকৃতিক বা কোন মহামারী বা বহুবিধ কারণে এই সভ্যতা ধ্বংস হয় এবং আর্য সভ্যতা বিকশিত লাভ করে। 

যুদ্ধ-ঘৃণা-হত্যা দিয়ে শুধু ধ্বংসই রচিত হয়। সভ্যতা বিকশিত হয় পারস্পরিক সহাবস্থানে। যে তীর আজ অন্য জাতির দিকে তাক করা থাকে, তা অন্য জাতির অভাবে নিজ জাতির দিকেই ঘুরে যায়। অস্ত্র দিয়ে প্রাকৃতিক বিকাশ সম্ভব নয়৷ নিয়েনডার্থাল আমাদের থেকেও যোদ্ধা জাতি ছিল, কিন্তু প্রকৃতির কাছে তাদের আত্মসমর্পণ করতে হয়। আমাদের হয়তো অতদিন অপেক্ষা করতে হবে না। ধর্মীয় ঘৃণা ও জাতিগত বিদ্বেষে নিজেরাই লুপ্তশ্রেণিতে নাম লিখিয়ে ফেলব। আর সেটাই হয়তো সুবিচার হবে। প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে আমরা যেভাবে স্বাভাবিক অভিযোজনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি, তাতে আমাদের উপস্থিতিতে জীবকুলের স্বাভাবিক বিকাশ রুদ্ধ হবে। বরং নতুন কেউ এসে এই বাস্তুতন্ত্রে জায়গা করে নিক।

আধুনিক গবেষকেরা মনে করেন নিয়েনডার্থালদের মস্তিষ্ক আমাদের থেকে খানিকটা বড় ছিল। হয়ত একটু বেশি বুদ্ধিমান ছিল। তবে নিয়েনডার্থালদের বিনাশ আমাদের এইটুকু শিক্ষা দিতে পারে বুদ্ধিমত্তা সবকিছু নয়। পারস্পরিক দ্বন্দ, অনুভূতিহীন জীবেরা বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নিজেদের বিনাশ বন্ধ করতে পারে না। অনুভূতিহীন শিক্ষার বিনাশ অবশ্যম্ভাবী।

Post a comment

0 Comments