দাস্তান-ই-গালিব।। রানা চক্রবর্তী



‘লাজিম থা কে দেখো মেরা রস্তা কোই দিন অওর
তনহা গয়ে কিঁউ? অব রহো তনহা কোই দিন অওর।’

হয়তো এক সন্ধেবেলা, নিজের ছোট হাভেলির দাওয়ায় বসে কুপি জ্বেলে এই গজলের প্রথম শেরটি লিখছেন তিনি। বাইরে পুরানি দিল্লির চেনা শোরগোল আর বাজারের টিমটিমে রোশনাই, বাইরে আস্ত একটা পৃথিবী। ভেতরে একটা নিভে-আসা-দুনিয়া গুছিয়ে বসেছেন বৃদ্ধ শায়র। লিখছেন,

‘তোমার উচিত ছিল আরও কিছু দিন আমার জন্য অপেক্ষা করা
একা চলে গেলে কেন?এখন থাকো আরও কিছু দিন একা।’

দুপুরেই যেতে হয়েছিল কবরখানায়। সে আর নতুন কী। কিন্তু এবারের যাওয়ার সঙ্গে আগের বারের যাওয়াগুলোর বেশ বড় একটা তফাত রয়েছে। এর আগে প্রতিবারই কবরখানা থেকে ফেরার পথে ভেঙে যাওয়া মনের কোণে একটু হলেও উম্মিদ-এর রওশনি ছিল। এবার সেটুকুও নেই। কিন্তু সেই অন্ধকারে নিজের সবটুকু ঢেলে দিয়ে ফুরিয়ে যাচ্ছেন না কবি।

মৃত্যুর ধারাবাহিক আক্রমণের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে লিখছেন, হ্যাঁ, আরও একটি গজল। যা তাঁর সারা জীবনের একমাত্র কাজ, কিন্তু কেন লিখছেন এ শের? সে কথায় পরে আসব। আপাতত জেনে নিই বৃদ্ধ এই শায়রের পরিচয়।  তিনি আর কেউ নন, খোদ অসদউল্লা খান বেগ। আমরা যাঁকে চিনি মির্জা গালিব নামে।
                            
"মন্ত্রীর জন্য স্তুতিকাব্য লেখা আমার কাজ নয়। বরং তোমাদের মন্ত্রীকে বোলো, তিনি যেন আমাকে দেখলে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানান। তবেই তাঁর দরবারে যাব আমি।’’

কথাটা যিনি বলছেন, তাঁর বয়স মাঝদুপুর পার করেছে, দাড়িতে পাক ধরছে অল্প, আর শরীরটাও ভেঙে যাচ্ছে নানা কারণে। তিনি অসদউল্লা খান বেগ ওরফে মির্জা গালিব। ভারতবর্ষের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ কবিদের একজন।
১৮৪৫-এর আশেপাশে কোনও একটা সময়, মির্জা তখন লখনউতে বাড়ি ভাড়া নিয়ে আছেন, দিল্লি ছেড়ে কলকাতার উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন বেশ কিছু দিন। ধারদেনায় ডুবে রয়েছেন মাথা পর্যন্ত। মুদিখানা থেকে ফলওয়ালা, তেজারতির কারবারি থেকে মদের দোকান, সর্বত্র দেনা হয়ে আছে তাঁর। দিল্লিতে কবিতার চাইতে ধারের জন্য তখন মির্জাকে বেশি মানুষ চেনেন। রোজগার বলতে পারিবারিক পেনশনের ওপর নির্ভর করা, কিন্তু নবাবি আমল চুকে যাওয়ামাত্র ব্রিটিশ সরকার তাতেও হস্তক্ষেপ করেছে। নতুন করে পিটিশন করতে হয়েছে, কিন্তু কাজ হয়নি। শেষমেশ মির্জার উকিল হীরালাল বললেন, কলকাতায় গিয়ে লর্ড মেটক্যাফের সঙ্গে দেখা করে কথা বলতে পারলে কাজটা হলেও হতে পারে। অগত্যা দিল্লির ভাড়ার হাভেলি ছেড়ে দীর্ঘ সফরে বেরোতে হল মির্জাকে।
                            
সেই সফরে যাবার সঙ্গতিটুকুও ছিল না উর্দু ভাষার সেরা এই শায়রের। এমনকী নিজের দিওয়ান (গজলের পাণ্ডুলিপি) বন্ধক রেখে টাকা ধার নেবার চেষ্টাও করেছেন, কিন্তু কেউ রাজি হননি সে-প্রস্তাবে। শেষে সহৃদয় এক সুদের কারবারি তাঁকে লখনউ অবধি যাবার রসদটুকু জুগিয়েছেন। এবার লখনউ-এর নবাব যদি আর কিছু অর্থ বরাদ্দ করেন তো কলকাতা অবধি যাবার একটা ব্যবস্থা হয়। লখনউতে তখন তাঁর খ্যাতি ছড়িয়েছে অল্পস্বল্প, সেখানে জুটে গেল কয়েকজন শাগির্দ। তাঁদের মুখেই খবর পেলেন, লখনউ-এর নবাব হায়দারের হাতে আর কোনও ক্ষমতাই নেই। উল্টে নবাবের কর্মচারী আঘা মীর ব্রিটিশ সরকারের নির্লজ্জ চাটুকারিতা করে ডেপুটির পদ বাগিয়ে জাঁকিয়ে বসেছে। তাঁকে খুশি করতে পারলেই কাজ হাসিল হতে পারে। সে সময়ে মির্জাকে একজন প্রস্তাব দিয়েছিলেন, আঘা মীরের স্তুতিসূচক দু লাইন-এর একটি শের রচনা করে তাঁর দরবারে গিয়ে শোনাতে। তার উত্তরেই ওই কথাটি বলেছিলেন মির্জা।

দেনায় ডুবে যাওয়া, পদে পদে অপমানিত, হেরে যাওয়া একজন মানুষ। চার সন্তানের মৃত্যু পার করে আসা, দারিদ্রের সঙ্গে যুঝতে থাকা একজন মানুষ। সামান্য ক’টা টাকার জন্য হেনস্থা হওয়া একজন মানুষ। কিন্তু দিনের শেষে তিনি শিল্পী। তিনি কবি। অনাপসী, নির্ভয়, আত্মসম্মানে টইটম্বুর। শেষ হয়ে যাবেন, কিন্তু মাথা নোয়াবেন না।

আশ্চর্য এই যে, আজ থেকে অত বছর আগেও এমন মানুষ সংখ্যায় কমই ছিলেন। তবে চাটুকারদের সংখ্যাটা বোধহয় ক্রমশ বেড়েছে।

যাই হোক, স্তুতি না-করায় নবাবি খাজানার কানাকড়িও জুটল না মির্জার। লখনউতে কয়েক মাস শিক্ষানবিশি করে কিছু টাকা জমিয়ে বুন্দেলখণ্ড অবধি পৌঁছলেন। সেখানে বন্ধুবর জুলফিকার আলি বাহাদুরের আতিথেয়তায় কাটল কিছু দিন। তাঁরই তদবিরে, আমিন চন্দ নামের এক কারবারির কাছ থেকে হাজার দুয়েক মুদ্রা ধার নিয়ে কলকাতার উদ্দেশে ফের বেরোলেন মাথা উঁচু করা একজন মানুষ, কবিদের কবি, মির্জা গালিব। তাঁর মন তখন অন্য কারণে একটু খুশি। দিল্লি ছাড়ার কয়েক দিন আগেই তাঁর বেগম উমরাও জন্ম দিয়েছেন পঞ্চম সন্তানটিকে। মির্জা সেই ছেলের মুখের আধো বুলি কানে নিয়েই পাড়ি দিলেন কলকাতায়।
                            
‘‘মির্জা, তুমি দিওয়ান ছাপাচ্ছ না কেন? এমন অসামান্য লেখার হাত তোমার!’’ ... লালকেল্লার সামনের বিখ্যাত চা দু’ভাঁড় আনিয়ে কথাটা তুললেন হাজি মীর। ১৮৩৫-এর দিল্লি, বদলের হাওয়া কেল্লার রং পাল্টাচ্ছে তখন। গালিব যথারীতি মীর তকি মীরের সংকলনে মুখ ডুবিয়ে রেখেছেন। তাঁর প্রিয় কবি মীর, ইসলামের প্রতি আনুগত্যের অভাবে যিনি দিল্লির শাহী দরবার থেকে বিতাড়িত। অবশ্য নামাজ পড়া, মসজিদে যাওয়া, এসব  মির্জার ধাতেও নেই। বিবি উমরাও আল্লার সঙ্গে বোঝাপড়ায় ব্যস্ত, মির্জা মজে থাকেন মদে, জুয়ায়, গজলে। কোনও দিন না তাঁকেও সাধের দিল্লি ছাড়তে হয়। ‘‘আমার দিওয়ান কে ছাপাবে হাজি সাহেব?’’ ... বই থেকে মুখ তুলে চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন মির্জা, ‘‘তার চেয়ে এই যে আপনার দোকানে বসে দু চারটে শের পড়বার গুস্তাখি করি, সে-ই আমার ভাল।’’ ... ‘‘আর ভাগ্যিস সেসব বহুমূল্য গুস্তাখিগুলো আমি লিখে রাখি! নইলে তোমার কত গজল যে এমনই বয়ে যেত ...,’’ ব’লে এক তাড়া পাতা টেনে বার করলেন হাজি মীর। তাঁরই দ্রুত হাতের লেখায় মির্জার বলে যাওয়া শেরগুলো টুকে রাখা। সব মিলিয়ে অনেকগুলো গজল।

‘ইয়ে ন থি হমারি কিসমত কে ভিসাল-এ-ইয়ার হোতা ...’ কাছেই কোথাও কেউ গাইছে। এ তো গালিবেরই শের! বেশ অবাক হলেন মির্জা। হাজি সাহেব কৌতূহল ভাঙ্গিয়ে বললেন, মেয়েটি নওয়াবজান। মির্জার অন্ধ ভক্ত এক তওয়ায়েফ, মাঝেমধ্যেই হাজির দোকানে এসে মির্জার শের টুকে নিয়ে যায় গাইবে বলে। তাঁর বড় ইচ্ছে, একবার মির্জাকে দ্যাখে। শেষমেশ আলাপ হয়েছিল এই দুজনের। নওয়াবজান মির্জাকে খোলাখুলিই জানিয়েছিলেন তাঁর প্রতি আসক্তির কথা। অপেক্ষা করেছিলেন বহু মেহফিল সাজিয়ে। কিন্তু সংসারে, নেশায়, জুয়ায় আর লেখায় মজে থাকা মির্জা সেই অপেক্ষার উত্তর দিতে একটু দেরিই করে ফেলেছিলেন। তত দিনে মির্জাকে না-পাওয়ার যন্ত্রণা গজলে মুড়ে নিয়ে দিল্লি ছেড়ে চলে গিয়েছে সেই রূপসী। নওয়াবজান। তবে যাবার আগে তিনি করে গিয়েছিলেন এক অমোঘ ভবিষ্যদ্বাণী। তাঁর কোঠায় যাতায়াতকারী এক কোতোয়াল একবার বলেছিল, ‘‘তুমি যে গালিবের প্রেমে পাগল, সে সারা দিল্লির কাছে দেনায় ডুবে আছে, জানো?’’ সামান্য হেসে নওয়াবজান উত্তর দিয়েছিলেন, ‘‘জানি। আর এটাও জানি যে একদিন তামাম দেশ তাঁর শায়রীর দেনায় ডুবে থাকবে।’’ ... সেই তরুণীর কথা বিফলে যায়নি।
                          
দিল্লির দরবারে বাহাদুর শাহ জাফরের সভাকবি ইব্রাহিম জওক। প্রতিভাবান, সন্দেহ নেই, কিন্তু আপসেও তাঁর জুড়ি নেই। শায়রীর চেয়ে জি-হুজুরিতেই তাঁর পারদর্শিতা বেশি। কবিতার পদের চেয়ে নিজের পদ তাঁর বেশি প্রিয়। দরবারে মাঝেমধ্যেই মুশায়েরা বসে, সম্রাটের তোষামোদসূচক কাব্যে কে কত এগিয়ে, তার দৌড় হয়। জওক গুণী মানুষ, কিন্তু পদ চলে যাওয়ার ভয় তাঁর গুণকে আড়াল করে রাখে সারাক্ষণ। গালিবের শের তখন দিল্লির যুবকদের মুখে মুখে ফিরছে। কিন্তু প্রকাশিত সংকলন একটিও নেই। ডাকা হল তাঁকে মুশায়েরায়। আদত ফারসিতে গজল পড়লেন, তারিফের বদলে জুটল পরিহাস। সম্রাটের অনুমতি না নিয়েই সে দিন দরবার ছেড়েছিলেন মির্জা। আবার তাঁকে ফিরতে হল কয়েক বছর পর, যখন স্বয়ং জওক তাঁকে মুশায়েরায় আমন্ত্রণ জানালেন।

এমন আমন্ত্রণ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার, আল্লাকে শুক্রিয়া জানালেন বিবি উমরাও। যদি এই সুযোগে কিছু অর্থ জোটে, দেনা মেটানো যাবে কিছুটা। এমনিতেই তাঁর শোহর সংসারে থেকেও উদাসীন। একবার পেনশনের ৭৫০ মুদ্রা জুটেছিল, মুদিখানায় ধার শোধ করে বাকি টাকা দিয়ে আর্মি ক্যান্টনমেন্ট থেকে হুইস্কি কিনে বাড়ি ঢুকেছিলেন। তার ওপর জুয়ার নেশা তো আছেই। সুতরাং শায়রী যদি দু চার পয়সা এনে দেয়, ক্ষতি কী? মির্জা যদিও জানেন জওক-এর উদ্দেশ্য কী। দিল্লির অলিগলির হাওয়ায় এই যে তাঁর নাম উড়ছে এখন, দরবারের জানলা দিয়ে সে-হাওয়া তো জওক সাহেবের কানেও কথা বলছে। কী এমন লেখে এই গালিব, একবার যাচাই করে নিতে হবে না?

মির্জার কিছু ছিল না। না ধনদৌলত, না শিরোপা, না শাসকের বদান্যতা। বরং বদনামটাই কুড়িয়েছিলেন। কিন্তু যেটা ছিল, সেটা একজন শায়র হিসেবে মাথা উঁচু করা আত্মবিশ্বাস। তাকে সম্বল করেই বাহাদুর শাহ জাফর-এর মুশায়েরায় আসন গ্রহণ করলেন মির্জা। সেই শাম্মা জ্বালানো সন্ধের দরবারি মুশায়েরা দিল্লির কাব্য ইতিহাসে আজও লেখা হয়ে আছে। ‘হর এক বাত পে কহতে হো তুম কে তু ক্যা হ্যায় ...’ এই একটি গজলেই মুশায়েরা মাত করেছিলেন মির্জা। স্বয়ং পোয়েট লরিয়েট বৃদ্ধ জওক-এর হাতও বারবার তারিফে হাওয়া কেটেছিল।
                            
ভেট কিছু না-পেলেও, শোহর-এর শাহী স্বীকৃতিতেই আনন্দে আটখানা অন্ত্বঃসত্তা বিবি উমরাও। এর আগে তিনটি সন্তান খুইয়েছেন তিনি। এবার কি আল্লা মুখ তুলে চাইবেন?

পরদিন সকালে মুখ চুন করে হাভেলিতে ঢুকলেন মির্জার আগরানিবাসী বাল্যবন্ধু বংশীধর। হাজি মীরের কাছ থেকে নিজের শেরগুলো কুড়িয়ে বাড়িয়ে একটি দিওয়ান খাড়া করেছিলেন মির্জা, বংশীধর সেটা নিয়ে গেছিলেন। কিন্তু দিল্লি, আগরা বা লখনউ-এর কোনও প্রকাশক এই অনামী কবির দিওয়ান ছাপতে রাজি নয়। ভাবনায় আর কাজে সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকা একজন মাঝবয়সি মানুষ হাতে তুলে নিলেন নিজের ব্যর্থ পাণ্ডুলিপিখানা। যে সব শের একদিন তামাম হিন্দুস্তানের মুখে মুখে ঘুরবে গজল হয়ে, তাদের কোনও প্রকাশক জুটল না। সময় বরাবর অসফল জহুরি। আসল হিরেকে সে চিরকালই বহু দেরিতে চিনেছে। দিওয়ান ফেলে রেখে গলি কাসিম-এর চেনা রাস্তায় পা রাখলেন মির্জা। তার কয়েক দিন পর আরও একবার মৃত সন্তান প্রসব করলেন উমরাও। দিল্লির এক কোণের এক গরিব হাভেলিতে আরও একটি চিরাগ নিভিয়ে পাশাপাশি বসল এক অসহায় দম্পতি, যাঁদের ভালবাসা তখনও নেভেনি।
                          
শিমলা বাজার, কলকাতা, ১৮৪৬। মানিকতলা গির্জার পিছনে একটা দু কামরার বাসা ভাড়া নিয়ে মাস চারেক হল আছেন এক নরম স্বভাবের প্রৌঢ়। সুদূর দিল্লি থেকে এসেছেন, লাট সাহেবের সঙ্গে কী সব সরকারি কাজের তাগিদে। দাড়ি আর ফেজ টুপিখানা দেখে মনে হয় ধর্মে মুসলমান, কিন্তু মানেন না কিছুই। সন্ধের পর হুইস্কি চাই, মসজিদে যেতে দেখা যায় না একদিনও, হিন্দুদের সঙ্গেও দিব্যি খোশমেজাজে গল্প জোড়েন। এই ক’মাসেই কলকাতাকে ভারী ভালবেসে ফেলেছেন, মনে ধরে গিয়েছে বাঙালিদেরও। একদিন তো বলেই ফেলেছেন, দিল্লিতে স্ত্রী আর ছেলে না থাকলে এই শহরেই আস্তানা পাততেন বাকি জীবনটা। ছেলেটা কত বড় হল? হাজি মীর মাঝেমধ্যে চিঠি লেখে বটে, কিন্তু বাড়ির খবর কিছু দেয় না। পাওনাদাররা কি বেগমকে বড্ড জ্বালাতন করছে? রোজকার রুটি জুটছে কি? আরও একবার নিজেকে ব্যর্থ মনে হল তাঁর। কেবল কলম চালানো ছাড়া কিছুই তো করা হয়ে উঠল না জীবনে। তবু যদি তাঁর কবিতা বিকোত বাজারে ...

'কলকাত্তা কা জো জিকর কিয়া তুনে হাম নসিন।
এক তির সিনে মে মারা কি হায় হায়।' ... কলকাতার নাম শুনেই যেন আমার বুকে তির বিঁধেছে।

মুঘল আমলের শেষ বিখ্যাত কবি দাবির-উল-মুলক, নাজিম-উদ-দৌলা মির্জা গালিব কলকাতায় এসেছিলেন ১৮২৮ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি। নিজের কলম বন্ধক দিয়ে টাকা জোগাড় করে এসেছিলেন তাঁর পেনশনের জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাহেবদের কাছে দরবার করতে। ছিলেন প্রায় দেড় বছর।

কলকাতার কোথায় ছিলেন গালিব?

তাঁর চিঠিতে বারবার সিমলা বাজার, গোল তালাও, চিতপুর বাজারের নাম উঠে এসেছে। চিঠিতে আর আছে একটা কুয়োর কথা। বর্ণনা মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, ১৩৩, বেথুন রো-র বাড়িতে ছিলেন তিনি। সেই কুয়ো বোজানো হয়েছে ১৯৫৫ সালেই। গালিবের চিঠি থেকেই জানা যাচ্ছে, বাড়িওয়ালা মির্জা আলি সওদাগর আর বিলায়েত হুসেনের কাছে ৬ আর ১০ টাকা ভাড়া দিতেন তিনি। গালিব জানিয়েছেন, বাড়িটি বেশ বড়সড়। আরও জানিয়েছেন, তিনি মৌলালির দরগা আর কাঠালবাগান মসজিদে যেতেন। কলকাতায় থাকার সময়েই গালিব গিয়েছিলেন ক্যালকাটা মাদ্রাসা কলেজেও। অংশ নিতেন মুশায়েরায়। তবে তিনি সেখানেই বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন আরেক কবি মির্জা কাতিল ও অন্যান্যদের সঙ্গে। পার্সি ভাষার সঠিক প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক। বিরক্ত হয়ে গালিব মুশায়েরায় যাওয়া বন্ধ করে দেন। তবে সেই সময়েই তিনি লিখেছিলেন তাঁর শায়েরির বিখ্যাত বইটি — 'গুল এ রানা' - সুগন্ধি ফুল।
                          
শেষমেশ লর্ড মেটক্যাফে একটা তারিখ দিলেন মির্জাকে। মির্জার এই দেড় বছরের ক্লান্তিকর সফরে এটাই একমাত্র সুখবর। এরই মধ্যে কলকাতার কয়েকজন সুহৃদ মির্জার সম্মানে এক মুশায়েরার আয়োজন করলেন, তাঁর পড়ে পাওয়া কবিখ্যাতির কিছুটা কলকাতাতেও পৌঁছেছে দেখে বেশ অবাকই হলেন মির্জা। রাজি হলেন মুশায়েরায় যেতে। আর সেখানেই ঘটল বিপত্তি। প্রশ্ন উঠল উর্দু ভাষার সঙ্গে ইসলামের সম্পর্ক নিয়ে। বেশির ভাগেরই মত, উর্দু আসলে মুসলমানদের ভাষা। বেশ বিরক্ত হয়েই বিরোধিতা করলেন মির্জা, ‘‘উর্দুর জন্ম ভারতবর্ষের সেনা ছাউনিগুলোতে। উর্দু শব্দের অর্থই তো ছাউনি। সেই ভাষা আজ কেবল মুসলমানদের সম্পত্তি হয়ে গেল কী করে? ভাষার ওপর ধর্মের মালিকানা হয় কখনও? তাহলে আমীর খসরু অওয়ধি-তে লিখলেন কেন আর ফরিদ কেন লিখলেন পঞ্জাবিতে? উর্দু তামাম হিন্দুস্তানের ভাষা। দয়া করে কেবল ইসলামীদের ভাষা আখ্যা দিয়ে তাকে ছোট করবেন না। হিন্দু আর মুসলমান একই মাটির সন্তান, ভাষার প্রশ্নে তাদের বিরোধ ঘটিয়ে দেশটাকে লুটে নিতে চাইছে সাহেবরা। সেটা কি আপনারা বুঝতে পারছেন না?’’

সেদিন মির্জা শের পড়লেন না আর। মুশায়েরায় হাজির ছিলেন কয়েকজন ব্রিটিশ। মির্জার বক্তব্য লর্ড মেটক্যাফের কানে পৌঁছতে এক দিনও লাগল না। খারিজ হল মির্জার পেনশনের আর্জি। কলকাতার ঠিকানা হাওয়ায় উড়িয়ে ক্লান্ত মির্জা খালি হাতে ফিরে চললেন দিল্লি।

১৮২৯ সালের আগস্টে কলকাতা ছেড়ে যান গালিব। মোল্লাদের সঙ্গে তাঁর শায়েরি নিয়ে বিস্বাদ বিতর্ক আর তাঁর পিটিশন না নেওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়েই। কোম্পানি তাঁকে বলেছিল দিল্লিতে গিয়ে পেনশনের আবেদন জমা করতে। তবে স্মৃতি সবটাই তিক্ত নয়। দিল্লি ফিরে পার্সিতে লেখা একটি চিঠিতে গালিব লিখছেন, সবারই কৃতজ্ঞ থাকা উচিত যে এমন একটা শহর আছে। এমন তাজা শহর দুনিয়ায় কোথায় পাবে।
                             
কবরখানায় নেমে আসা সন্ধে কেবল দেখতে পাচ্ছে, এক প্রায়-বৃদ্ধ ভেজা চোখে মাজারের সামনে বসে অস্ফুটে কী যেন বলে চলেছেন। আসলে তিনি শের পড়ছেন, মৃদু বকছেন অকালে চলে যাওয়া তাঁর পঞ্চম সন্তানটিকে। কাজের ফিকিরে কলকাতায় থাকাকালীন কখন তাঁকে ফাঁকি দিয়ে চুপিচুপি এসে কবরে শুয়ে পড়েছে তাঁর ফুটফুটে ছেলেটি, খবরও পাননি মির্জা। দিল্লি যেদিন পৌঁছলেন, সেদিন সন্ধেবেলাতেই আরও একবার সন্তানের মাজারে চাদর চড়াতে যেতে হল তাঁকে।

‘‘তনহা গয়ে কিউঁ, অব রহো তনহা কোই দিন অওর ..." 
একা একা চলে গেলে কেন? এখন থাকো আরও কিছু দিন একা!

শের-এর বকুনি দিতে দিতে সময়ের কাছে পর্যুদস্ত অথচ অপরাজিত মির্জা ফিরে এলেন গলি কাসিম-এর হাভেলিতে।

বেগমের চুলে পাক ধরেছে, চোখের নীচে কালি। সে-কালির কতখানি অভিমান আর কতখানি অভিযোগ, তা বোঝার চেষ্টা করে আর লাভ নেই। ভাবলেন মির্জা। চার চোখের চাউনি চালাচালি হল একবার, তারপর ক্লান্ত পায়ে দোতলার ছোট কামরাটিতে ঢুকে গ্লাসে পানীয় ঢাললেন মির্জা। বোতলগুলোও বেইমান, সব কটা খালি হয়ে বসে আছে। সকলে মিলে হারিয়ে দিতে চাইছে তাঁকে। সময়, পরিস্থিতি, পারিপার্শ্বিক, মানুষজন আর তাঁর নিজের স্বভাব। নিজের মুদ্রাদোষে নিজে একা তিনি আলাদা হয়ে যাচ্ছেন প্রতি মুহূর্তে। মাথা নিচু করছেন আরও একবার, শুধু লেখার খাতাটার সামনে। লিখছেন,

‘রঞ্জ সে খুগর হুয়া ইনসান তো মিট যাতা হ্যায় রঞ্জ
মুশকিলেঁ মুঝ পর পড়ি ইতনি কে আসাঁ হো গয়ি’
(দুঃখের সঙ্গে সমঝোতা করে নিলেই দুঃখ মিটে যায়
এতরকম মুশকিলে পড়লাম যে শেষমেশ সবটাই সহজ হয়ে গেল)

দিল্লিতে সেই কোন অতীতকালে ইতিহাসের চাদর নিয়ে সন্ধে নেমে আসছে তখন ...
                         
১৮৫৪ বা ৫৫। দেনা। আরও দেনা। হুমকি। শাসানি। শেষে পাওনাদারদের ডিক্রি জারি। শোধ না করতে পারলে আদালতে জবাবদিহি। এদিকে কয়েক মাস হল আগরা থেকে এসে তাঁর বাড়িতেই সপরিবার আশ্রয় নিয়েছেন মির্জার ভাই ইউসুফ খান। মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছেন তিনি, তাঁরও কোনও রোজগার নেই। কীভাবে সমাধান হবে এই পরিস্থিতির? জানেন না মির্জা। বিকেল হলেই বেরিয়ে যান সামনের নুক্কড়ের পাকা জুয়াড়িদের আসরে। কোতোয়াল বহুবার তাঁদের গ্রেফতারের হুমকি দিয়েছে, কিন্তু ওই জুয়াই মির্জার শেষ ভরসা। যদি ভাগ্য ফেরে! 

এমন সময়ে এক প্রভাবশালী বন্ধুর দৌলতে অধ্যাপনার চাকরি পেলেন দিল্লি কলেজে। ফারসি পড়াতে হবে, পাকা চাকরি। বেতন যেরকম বলছে, তাতে ধার শোধ করে সংসার মন্দ চলবে না। প্রথম দিন গিয়ে আর গেলেন না তিনি। তদবিরকারী বন্ধুটি খবর পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন এই বিরাগের কারণ। মির্জা জানালেন, প্রথম দিন যখন তিনি টাঙ্গা থেকে কলেজের দরজায় নামেন, তাঁকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য কেউ সেখানে ছিলেন না। এই অসম্মান তিনি মেনে নিতে পারেননি। বন্ধুটি এ সব শুনেও তাঁর অবস্থার কথা মনে করিয়ে দেওয়ায় তিনি বলেছিলেন, ‘‘দোস্ত, এ বয়সে এসে চাকরি করলে সম্মান অর্জনের জন্য করব। সম্মান খোয়ানোর জন্য নয়।’’

সরীসৃপদের ভিড়ে তাঁর শিরদাঁড়াই তাঁকে আলাদা করে রেখেছিল বরাবর। প্রতিভায়, নীতিবোধে, আত্মমর্যাদাজ্ঞানে সমসাময়িক শিল্পীদের চেয়ে অনেকটাই ঊর্ধ্বে ছিলেন মির্জা। সারাজীবন অভাব আর গঞ্জনা সহ্য করবার পর পাওনাদারের ডিক্রি আর পরিবারের উপোসের মুখে দাঁড়িয়ে পাকা চাকরিকে মর্যাদার প্রশ্নে ফিরিয়ে দিতে একটা জোর লাগে। সত্যিকারের শিল্পীর জোর। বাকিদের, শিল্পের ভণিতাময় লোকজনের সেটা থাকার কথা নয়।
                          
এর মাস ছয়েক পরের কথা। আদালতে হাজিরা দিতে হল ডিক্রির কারণে। তার পরপরই প্রকাশ্যে জুয়া খেলার অপরাধে ছ’মাসের হাজতবাস। স্বয়ং বাহাদুর শাহ জাফরের হুকুমনামাও তাঁকে মুক্ত করতে পারল না।

এক জীবনে যত রকমের বিপদ হতে পারে, দেখে নিলেন মির্জা। ভোগ করে নিলেন সব ধরনের অপমানের মুকুট। ভেঙে গেল শরীর আর মন, পরিবারে এক বেলার জন্যেও এল না সুদিনের রোদ্দুর। তবে হাজতে থাকতেই বন্ধু বংশীধর খবর এনেছিলেন, খোদ লখনউ-এর নামজাদা প্রকাশকের ঘর থেকে বেরিয়েছে গালিবের প্রথম দিওয়ান, কয়েক দিনের মধ্যে তার দ্বিতীয় সংস্করণও ছাপাতে হয়েছে।

অনেক দেখলেন মির্জা। কেবল বিক্রি করলেন না নিজেকে। একবারের জন্যেও মাথা নোয়ালেন না শাসকের সামনে। নোয়ালে আজ তাঁকে মানুষ অন্যভাবে চিনত অবশ্য। ক্ষমতার পায়ের নীচে খোলামকুচি হয়ে মিশে যাওয়া একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে থেকে যেতেন তিনি ইতিহাসে। যেমন মানুষ প্রত্যেক যুগেই বিরাট সংখ্যায় থাকে। দুঃখ এই যে, সময় একদিন হাত ঝাড়ে আর সেইসব সুযোগসন্ধানীদের নামধাম বালির মতোই খসে পড়ে যায়। থেকে যান  মির্জারা।

হাজতবাস শেষ হবার পরেই অবশ্য তাঁকে আপ্যায়ন করে দরবারে ডেকে ‘দবির-উল-মুলক’ খেতাবে ভূষিত করেন বাহাদুর শাহ, সভাকবি জওক-ও উপস্থিত ছিলেন। সঙ্গে প্রচুর উপঢৌকন ও বেশ কিছু মুদ্রা। সংসারের অভাব শেষমেশ কিছুটা হলেও মিটল, ধার শোধ করে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন মির্জা।
                         
১৮৫৭। সিপাহি বিদ্রোহে গোটা দেশ উত্তাল, দিল্লিতে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার আগুন ছড়িয়েছে হু হু করে। কারফিউ চলছে। নিজের উঠোনে বসে মনখারাপের প্রহর গুনছেন মির্জা। এ কোন দিল্লি? এ কেমন ভারতবর্ষ? যাও বা সংসারে সামান্য টাকা এল, প্রিয় শহরটা ছারখার হয়ে গেল চোখের সামনে।

সিপাহি বিদ্রোহ মির্জার কাছ থেকে কেড়ে নিল অনেক কিছু। বেখেয়ালে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে পড়া ভাই ইউসুফ নিহত হলেন ব্রিটিশ পেয়াদার গুলিতে। সারাজীবনের বন্ধু হাজি মীরকে হত্যা করে গাছে টাঙিয়ে দিল হিন্দুরা, জ্বালিয়ে দিল তাঁর বইয়ের দোকান। অগুনতি বইয়ের সঙ্গে চিরকালের মতো ছাই হয়ে গেল  মির্জার বহু শের, যা হাজি নিজের হাতে লিখে রাখতেন রোজ। লখনউ-এর নবাব, সুকবি ওয়াজিদ আলি শাহকে গৃহবন্দি করে রাখা হল কলকাতার মেটিয়াব্রুজে। দিল্লি ছাড়তে বাধ্য হলেন বাহাদুর শাহ জাফর, শেষমেশ তাঁর মৃত্যু হল বার্মায়।

ধর্ম নিয়ে অবশ্য কোনও বাড়াবাড়ি ছিল না তাঁর। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সময় তাঁকে ধরে বেঁধে হাজির করা হয়েছিল এক ব্রিটিশ কর্নেলের কাছে। তাঁর পোষাক দেখে এবাক হয়ে কর্নেল শুধিয়েছিলেন, আপনি কি মুসলিম। গালিবের জবাব ছিল, অর্ধেক। মানে কী, জানতে চাইলেন সেনা অফিসার। গালিব বলেছিলেন, আমি মদ খাই আর শুয়োরের মাংস খাই না।
                            
সেই গলি কাসিম, সেই হাভেলি, সেই নিভে আসা সন্ধে, আর সেই এক দম্পতির বসে থাকা। এ বার অবসানের অপেক্ষায়। ধোঁয়া-ওঠা পুড়ে-যাওয়া দিল্লির রাস্তায় তখন খুব কম পড়ত মির্জার ক্লান্ত দুটো পা। ইয়ার দোস্ত-রা মৃত, গানবাজনা বন্ধ শহরে, মদেও আর তেমন নেশা নেই। ‘নেই’ দিয়ে ঘিরে থাকা ৭০ বছরের দীর্ঘ জীবনে আছে বলতে কেবল লেখা।

আরও একবার কলম তুলে নিলেন মির্জা। লিখলেন,

‘হুই মুদ্দত কে গালিব মর গয়া পর ইয়াদ আতা হ্যায়
উও হর এক বাত পর কহেনা কে ইউঁ হোতা তো ক্যা হোতা ...’

সম্ভবত তিনি দেখতে পেয়েছিলেন, আর এক বছর পর গলি কাসিম-এর দীর্ঘশ্বাস সঙ্গে নিয়ে দিল্লির রাজপথে নামবে তাঁর জনাজা ...

ইতিহাসের পাতায় তারিখটা ছিল ১৫ই ফেব্রুয়ারি ১৮৬৯ সাল।
                            
(তথ্যসূত্র:
১- মির্জা গালিব, সঞ্চারী সেন, উর্বশী প্রকাশন (২০১৩)।
২- The Oxford India Ghalib: Life, Letters and Ghazals (Oxford Indian Collection); Russell Ralph, Oxford University Press (২০০৭)।
৩- Ghalib, 1797-1869: Life and Letters (Unesco Collection; Edited by Ralph Russell & Khvurshidulislam, Allen & Unwin (১৯৬৯)।
৪- Ghalib: The Man, The Times; Pavan K. Varma, Penguin Books (২০০৮)।
৫- Mirza Ghalib: A Creative Biography, Natalia Prigarina, Translated by M. O. Faruqi
Translator, OUP Pakistan (২০০৪)।
৬- আনন্দবাজার পত্রিকা, ৬ই জুন ২০১৫ সাল।)
                           

No comments

যদি উদ্দাম, দস্যু হয়ে উঠি ।। সুবীর সেন

প্রতিদিন বৃষ্টি, বাইরে গুবাক সারি একটা ঠান্ডা আবেশ, মনে হয় যদি তুমি...... উত্তপ্ত পরশের ডালি নিয়ে, স্মিত  তোমার হাসিতে কোন, উত্তাপ...