'নীলকর ও নীলচাষ - প্রাচীন বঙ্গদেশের গ্রাম্যজীবনের অভিশাপ' ।। রানা চক্রবর্তী




১) সপুষ্প নীল গাছ, বিজ্ঞানসম্মত নাম - Indigofera tinctoria, ইংরেজি নাম - Indigofera, এই গাছের চাষই একদা বাংলার চাষী তথা সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছিল এবং এই গাছের বলপূর্বক বাণিজ্যিক চাষকে ঘিরেই শুরু হয়েছিল ভারতের ইতিহাসের বিখ্যাত নীল বিদ্রোহ।



২) অধুনা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গাংনী উপজেলার গাংনী থানার সাহারবাটি ইউনিয়নের ভাটপাড়ায় অবস্থিত নীলকুঠি। গাংনী উপজেলা সদর থেকে সড়ক পথে দুরত্ব ৭ কিমি:। বাস, স্থানীয় যান টেম্পু/লছিমন/করিমন এর সাহায্যে ২০ মিনিটে ভাটপাড়া নীলকুঠিতে পৌঁছানো যায়। ১৮৫৯ সালে স্থাপিত ধ্বংস প্রায় এই নীলকুঠিটি ইঁট, চুন-সুরকি দ্বারা নির্মাণ করা হয়। এর ছাদ লোহার বীম ও ইটের টালি দিয়ে তৈরী। এই কুঠির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কাজলা নদী। গাংনী উপজেলার উত্তর প্রান্ত ঘেঁষে ঐতিহাসিক কাজলা নদীর তীরে অবস্থিত জাতীয় জীবনের ও সভ্যতার স্মারক ভাটপাড়া নীলকুঠি। যা আজও ব্রিটিশ বেনিয়াদের নির্যাতনের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অযত্ন অবহেলায় এবং সংস্কারের অভাবে কুঠিবাড়িটি ধ্বংসের পথে। ভাটপাড়া নীলকুঠিটি কাজলা নদীর তীরে ২৩ একর জমির ওপর অবস্থিত। সাহেবদের প্রমোদ ঘর ও শয়ন রুম সংবলিত দ্বিতল ভবনটি জীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। কাছারি ঘর, জেলখানা, মৃত্যুকুপ ও ঘোড়ার ঘর বিলুপ্ত প্রায়। দামি মার্বেল পাথর আর গুপ্তধনের আশায় একসময় ভেঙে ফেলা হয়। এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের রাজস্ব বিভাগের ওপর ন্যাস্ত। এরই মধ্যে ভবনের ইট ও পাথর চুরি হয়ে গেছে। দামি ও ফলদ বৃক্ষ হয়েছে নিধন। বাকি অংশে গড়ে উঠেছে আবাসন প্রকল্প। ধীরে ধীরে বেদখল হয়ে যাচ্ছে জায়গাজমি। গোটা কুঠি এলাকা বর্তমানে গোচারণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। কুঠিভবন ও নীলগাছ আজও স্মরণ করিয়ে দেয় নীলকরদের অত্যাচার ও নির্যাতনের কথা। স্থানীয় জনশ্রুতি, গভীর রাতে এখানে এসে দাঁড়ালে আজও নাকি শোনা যায় নর্তকীদের নূপুরের আওয়াজ ও চাষিদের বুকফাটা আর্তনাদ। কালের সাক্ষী ভাটপাড়া কুঠিবাড়িতে এখনও অনেক পর্যটক এলেও ধ্বংসাবশেষ দেখে হতাশ হয়েই ফিরতে হয়।

৩) ইতিহাসের এমনি এক পথে জরাজীর্ণ অবস্থায় কালের সাক্ষি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মেহেরপুরে গাংনী উপজেলার ভাটপাড়া নীলকুঠি। জানা যায়, মেহেরপুর অঞ্চলে ১৭৭৮ সালে ক্যারল ব্লুম নামে এক ইংরেজ ব্যক্তি নীলকুঠি স্থাপন করেন। নীলচাষ অত্যধিক লাভজনক হওয়ায় ১৭৯৬ সালে এখানে নীলচাষ শুরু হয়। এ সময় বিখ্যাত বর্গী দস্যু নেতা রঘুনাথ ঘোষালির সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে গোয়ালা চৌধুরী নিহত হলে মেহেরপুর অঞ্চল রানী ভবানীর জমিদারিভুক্ত হয়। রানী ভবানী নিহত হলে কাসিম বাজার অঞ্চলটি ক্রয় করেন হরিনাথ কুমার নন্দী। পরে হাত বদল হয়ে গোটা অঞ্চলটি মথুরানাথ মুখার্জির জমিদারিভুক্ত হয়। একসময় মথুরানাথ মুখার্জির সঙ্গে কুখ্যাত নীলকর জেমস হিলের বিবাদ বাঁধে। তাঁর ছেলে চন্দ্রমোহন বৃহৎ অঙ্কের টাকা নজরানা নিয়ে মেহেরপুরকে জেমস হিলের হাতে তুলে দেয়। চন্দ্র মোহনের ছেলে মহেশ মুখার্জি জেমস হিলের মন্ত্রী নিযুক্ত হন। ইতিহাসে ইনিই নীলদর্পণ নাটকে গুপে দেওয়ান নামে পরিচিত। ১৮১৮ সাল থেকে ১৮২০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে মেহেরপুরের বেশ কয়েকটি স্থানে নীলকুঠি স্থাপিত হয়। তন্মধ্যে গাংনীর ভাটপাড়া নীলকুঠি অন্যতম। নীল গাছ পচা জল জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হতো নীল রঙ। এক বিঘা জমিতে আড়াই থেকে তিন কেজি নীল উৎপন্ন হতো, যা উৎপাদন করতে ব্যয় হতো ১২-১৪ টাকা। অথচ চাষীরা পেতো মাত্র তিন-চার টাকা। নীল গাছ থেকে যে রঙ তৈরি করা হতো তা ছিল চাষিদের বুকের পুঞ্জিভূত রক্ত। ভাটপাড়া নীলকুঠিটি কাজলা নদীর তীরে ২৩ একর জমির ওপর অবস্থিত। সাহেবদের প্রমোদ ঘর ও শয়ন কক্ষ সংবলিত দ্বিতল ভবনটি জির্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। কাচারি ঘর, জেলখানা, মৃত্যুকূপ ও ঘোড়ার ঘর বিলুপ্ত প্রায়। নীলকুঠির মূল ভবন ছাড়াও বিধ্বস্ত ভবনের চার পাশে আগাছার মতো ছড়িয়ে আছে নীল গাছ। কুঠি ভবন ও এ নীল গাছ স্মরণ করিয়ে দেয় নীলকরদের অত্যাচার ও নির্যাতনের কথা। প্রচলিত আছে গভীর রাতে এখানে এসে দাঁড়ালে শোনা যায় নর্তকীদের নূপুরের আওয়াজ ও চাষিদের বুকফাটা আর্তনাদ।

৪) গাংনীর ভাটপাড়া'র নীলকুঠির যে ঘরে বন্দী রেখে অত্যাচার করা হত নীলচাষে অনিচ্ছুক চাষীদের।)
                          ©️রানা চক্রবর্তী©️
ইংরেজরা এদেশে শাসক হয়ে বাণিজ্য করতে এসেছিল।ফলে ব্যবসায়িক বুদ্ধি তাঁদের ভীষণ রকমের ভালো ছিল। নিজেদের মুনাফা লাভের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে তাঁরা ভীষণ রকমের সজাগও ছিল। এই সজাগ বণিকবুদ্ধি যখন বঙ্গদেশের উর্বর ফসল ক্ষেতে প্রযুক্ত হল, তখন তাঁরা সেখানে খাদ্য-ফসলের পরিবর্তে বাণিজ্যিক-ফসলের উৎপাদনে উৎসাহী হয়ে উঠলেন। ইংরেজ পুঁজিপতি ও ব্যবসায়ীরা বুঝতে পেরেছিলেন যে নীল, পাট ইত্যাদি বাণিজ্যিক-ফসল এদেশের মাটিতে প্রচুর পরিমাণে ফলাতে পারলে সেটা সোনা ফলানোর মতন হবে। এদেশের মাটিতে, এদেশের দরিদ্র চাষী-মজুরের সুলভ মজুরীতে বাণিজ্য-ফসল ফলিয়ে, নিজেদের দেশে ইংল্যান্ডে ও অন্যত্র রপ্তানি করতে পারলে তাঁরা পর্যাপ্ত মুনাফা অর্জন করতে পারবেন, যা অন্য কোন ব্যবসার দ্বারা সহজে করা সম্ভব হবে না। ব্রিটিশ ব্যাবসায়ীরা তাই তাঁদের মূলধন বাণিজ্যিক-ফসলের উৎপাদনে নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেন। বঙ্গদেশে বিদেশী মূলধন ও বাণিজ্যিক-ফসলের ইতিহাসে নীল ও পাট দুটো স্বতন্ত্র অধ্যায় জুড়ে রয়েছে। বঙ্গদেশের গ্রাম্য জীবনের সঙ্গে নীলকর ও নীলচাষের সম্পর্ক অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ ছিল। কারণ নীলচাষের ব্যাপারে নীলকর সাহেবরা বাংলার গ্রামাঞ্চলে শুধুমাত্র ব্যবসায়ী রূপে নন, এক অভিনব অত্যাচারী জমিদার রূপেও বিরাজ করতেন - পাট চাষের ব্যাপারে এটা ছিল না। চাষের ক্ষেত থেকে আরম্ভ করে তাঁদের নীলকুঠি পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে তাঁরা এক বিচিত্র রাজ্যের অধীশ্বর হয়ে বসেছিলেন। নীলকর সাহেবরা ছিলেন বিদেশী শাসকদের প্রতিভূ, কাজেই স্থানীয় এদেশীয় জমিদার-তালুকদার-পত্তনিদারদের চেয়ে তাঁদের প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল শতগুণ বেশি। এমনকি দোর্দণ্ডপ্রতাপ জমিদাররাও তাঁদের অধীন নীলকর সাহেবদের যথেষ্ঠ সমীহ ও ভয় করতেন।
                                ©️রানা চক্রবর্তী©️
ইংরেজ শাসনে ১৭৭০ সাল থেকে ১৭৮০ সালের মধ্যে বঙ্গদেশে নীলচাষ আরম্ভ হয়। কোন ব্যক্তি প্রথমে নীলচাষ আরম্ভ করেন, তা নিয়ে মতভেদ থাকলেও, মোটামুটি জানা যায় যে ল্যুই বোনদ (Louis Bonnaud) নামে এক ব্যক্তি মরিশাসে নীলচাষ করে ব্যর্থ হয়ে বঙ্গদেশে আসেন। ১৭৭২ সালে তিনি চন্দননগরের কাছে গোঁদলপাড়া নামে একটি গ্রামে দুটি মাত্র ভ্যাট নিয়ে একটি ছোট নীলকুঠি স্থাপন করেন - এটাই ছিল বঙ্গদেশের প্রথম নীলকুঠি। এরপরে বোনদ, ১৭৭৩ সালে চন্দননগর ও চুঁচুড়ার মাঝামাঝি একটি জায়গায় আরেকটি নীলকুঠি তৈরি করেন। হাওড়ার শ্যামপুকুরে দু'জন ফরাসী চিকিৎসক ঐ একই সময়ে একটি নীলকুঠি স্থাপন করেন। ১৭৮৩ সালের মধ্যে বঙ্গদেশের বিভিন্নস্থানে বেশ কয়েকটি নীলকুঠি স্থাপিত হয় এবং বঙ্গদেশ থেকে ইংল্যান্ডে ঐ বছরে ১২০০-১৩০০ মণ নীল রপ্তানী করা হয়। ১৭৯৫-৯৬ সাল থেকে ১৮০৪-০৫ সালের মধ্যে, বঙ্গদেশে, বছরে ২৪,০০০ থেকে ৬২,০০০ মণ নীল উৎপাদিত হয়। ১৮১৪-১৫ সালে, কলকাতা থেকে লণ্ডনে ৮৫,৪০৮ মণ নীল চালান দেওয়া হয়েছিল। বঙ্গদেশের নীলচাষের জন্য কোম্পানি ও ব্যক্তিগত ব্যবসায়ী উভয়েই মূলধন খাটাতেন। যে দামে বঙ্গদেশে তাঁরা নীল কিনতেন - প্রতি মণ গড়ে ১৬০ টাকা থেকে ২০০ টাকা দামে - তার তিন-চারগুণের বেশি মূল্যে লণ্ডনের বাজারে বিক্রি করতেন। নীলকরদের দাদন দিয়ে নীল সরবরাহের ব্যবস্থা করা হত। ১৮১৯-২০ থেকে ১৮২৬-২৭ সালের মধ্যে কোম্পানি মোট যত মূলধন বঙ্গদেশে নীলচাষের জন্য বিনিয়োগ করেছিল, তাতে তাদের মুনাফা হয়েছিল ৩৪৯,০৪০ পাউন্ড অর্থাৎ তখনকার মূল্যে প্রায় ৪৫ লক্ষ টাকা (A series of the Principal Products of Bengal: No. 1. Indigo: Calcutta 1832, Ch. II, Table XXIV, Jhon Phipps, page- 59)। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দাখিল করা হিসেব থেকে মুনাফার এই অঙ্কটি নেওয়া, কাজেই হিসেবে যে যথেষ্ট গোঁজামিল ছিল তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। মুনাফার অংক অন্ততঃ দ্বিগুণ হওয়া স্বাভাবিক, অর্থাৎ ১৮১৯-২০ থেকে ১৮২৬-২৭ সালের মধ্যে বঙ্গদেশে নীলচাষ থেকে শুধুমাত্র কোম্পানির বাৎসরিক মুনাফা হত প্রায় ১০-১২ লক্ষ টাকার মতন। এছাড়াও যথেষ্ট সংখ্যায় 'প্রাইভেট মার্চেন্ট' ছিলেন, তাঁদের মূলধন ও মুনাফার পরিমাণ কোম্পানির চেয়ে বেশি ছাড়া কম ছিল না। এদেশীয় জমিদারদের মধ্যে অনেকে নীলচাষের মুনাফায় প্রলুব্ধ হয়ে নীলকর হয়েছিলেন এবং নীলকুঠি স্থাপন করেছিলেন - এই প্রসঙ্গে তাঁদের কথাও স্মরণ করতে হয়।
                               ©️রানা চক্রবর্তী©️
নীলচাষের এই প্রথম পর্বের ইতিহাস থেকে বোঝা যায় যে, বঙ্গদেশে অষ্টাদশ শতকের দশক থেকে ঊনবিংশ শতকের প্রথম চতুর্থাংশের মধ্যে বাণিজ্যিক-ফসল নীল বাংলার উর্বর ফসলক্ষেত কতদূর পর্যন্ত জবর-দখল করেছিল এবং নীলকর ও নীলকুঠির প্রভাব বাংলার গ্রামে কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। সমগ্র বঙ্গদেশে এমন কোন জেলা নেই যেখানে নীলকর সাহেবের কথা রোমাঞ্চকর জনকাহিনীতে পরিণত হয় নি। হাওড়া, হুগলী, চব্বিশ পরগণা, মেদিনীপুর, বর্ধমান, বীরভূম, নদীয়া, যশোহর প্রভৃতি জেলার গ্রামে গ্রামে বহু অখ্যাত ও বিখ্যাত স্থানে নীলকুঠির ভগ্নস্তূপ আজও বিদ্যমান। সেগুলো দেখিয়ে স্থানীয় গ্রাম্যলোক ঐতিহাসিক নিদর্শন বলে চিহ্নিত করিয়ে, নীলকর সাহেবের ভূতের ঘোড়ার পিঠে চেপে বেত হাতে ঘুরে বেড়ানোর গল্পকথা শোনায়। ভীষণ ঠাণ্ডার অনুভূতির মতন এখনও নীলকর সাহেবের অত্যাচারের কাহিনী শুনলে শিউরে উঠতে হয় আধুনিক মানুষদের।



ঊনিশ শতকের বাংলা ও ইংরেজি সাময়িকপত্রে নীলকর সাহেবদের দৌরাত্ম আর দুর্বিনীত আচরণের এত কাহিনী প্রকাশিত হয়েছে যে শুধুমাত্র বাংলা পত্রিকার লেখাগুলো সংকলন করলেই কমপক্ষে দু'হাজার পৃষ্ঠার বেশি একটা বই লেখা সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে কয়েকটা নমুনা দিলাম (সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র, বিনয় ঘোষ; ১ম, ২য়, ৩য় ও ৪র্থ খণ্ড দ্রষ্টব্যঃ)।

১২৫৫ বঙ্গাব্দের ৩রা আষাঢ় 'সংবাদ প্রভাকর' পত্রিকা লিখেছিল, নীলকরদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ বা মামলা-মোকদ্দমা কিছু করা যায় না, কারণ ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে তাঁদের ঘনিষ্ঠ পরিচয় থাকে এবং তাঁর প্রায়ই নীলকরদের আতিথ্য গ্রহণ করেন। জেলার কর্তা যদি শিকারে যান, বিলাসে যান, তাহলে স্থানীয় কোন নীলকর সাহেবেরই অতিথি হয়ে নীলকুঠিতে অবস্থান করেন।

'সংবাদ প্রভাকর', ১লা মাঘ ১২৬৫ বঙ্গাব্দ - "এই নীলকুঠি সংক্রান্ত নিষ্ঠুরতা ও হত্যা ঘটিত মোকদ্দমা কতবার সুপ্রিম কোর্টে উপস্থিত হইল, সদর নিজামতের ঘর এ বিষয়ে নথিতে পরিপূর্ণ হইয়াছে কিন্তু তাহাতে এ পর্যন্ত কোন উপকার হইল না। ... কয়েক জিলায় কয়েকজন জাইন্ট ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত হইলেন, অথচ অত্যাচারের কিছুমাত্র খর্বতা হইল না, ইহার তাৎপর্য এক সাদা বর্ণের সর্বনাশ করিয়াছে, সাহেবরা ম্যাজিস্ট্রেট হইলে কি হইবে, ঝাঁকের পায়রা ঝাঁকে মিশিয়া যান। তাহার উপর আবার 'শাদা মুল্লুক জাদা' ...।"

নদীয়া জেলায় নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের প্রসঙ্গে ৬ই মাঘ ১২৬৬ বঙ্গাব্দের 'সংবাদ প্রভাকর' লিখেছিল - "প্রদেশ মধ্যে রাজশাসন প্রণালী নাই বলিলেই হয়। নীলকরেরাই রাজা এবং হর্তা কর্তা, যাহা মনে করেন তাহাই করিতে পারেন।"
                                ©️রানা চক্রবর্তী©️
'মরে' সাহেব বলে এক কুখ্যাত নীলকর ছিলেন, সুন্দরবনে তাঁর নীলের আবাদও ছিল। তাঁরই নামে 'মরেলগঞ্জ' বলে একটা জায়গার নাম হয়। ১২৬৯ বঙ্গাব্দের ২রা বৈশাখ প্রকাশিত 'সোমপ্রকাশ' পত্রিকায় এই কুখ্যাত নীলকর মরে সাহেবের স্বেচ্ছাচারীতার একটা বিস্তারিত বিবরণ - "সুসভ্য ইংরাজবংশাবতসং নীলকর শ্রীযুক্ত মরে হইতে প্রজাদিগের নির্বাসন, ভ্রূণহত্যা, স্ত্রীহত্যা, বালহত্যা, বলাৎকার, জালকারিতা প্রভৃতি' - শিরোনামে প্রকাশিত হয়। বর্ণনা প্রসঙ্গে মন্তব্য করা হয়, "ইংরাজ জাতির মধ্যে যে এতদূর দুরাত্মা, এতদূর নির্দয়, এতদূর নিষ্ঠুর আছে, তাহা আমরা পূর্বে জ্ঞাত ছিলাম না। মরে সাহেব অধুনা যাদৃশ দুষ্কর্ম করিতেছেন তাহাতে বোধ হয়, কি অসভ্য বাঙ্গালি, কি প্রসিদ্ধ নিষ্ঠুর মুসলমান কেহ কখন এতদ্দেশে তাদৃশ ঘৃণিত কার্যে প্রবৃত্ত হন নাই।" নীলকরের অত্যাচারে কাতর এক মুসলমান চাষীর একটি চিঠির অবিকল প্রতিলিপি ১২৭০ বঙ্গাব্দের ১৬ই চৈত্র প্রকাশিত 'সোমপ্রকাশ' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। তার কয়েকটি লাইন নিম্নরূপ -

"হা খোদা! তোর মনে এই ছিল! এই রকম কত করছে। থানার দারোগা ৭০০ টাকা ফুরণ করিয়া নিয়েছে সকল গাঁয় নীল বুনিয়ে দেবে, মেজেষ্টরের নিকট দরখাস্ত করিলে লা মঞ্জুর, সারা বছর না খেয়ে মজুরি করে জমিগুলি চাষ করিয়া রাখিয়াছি, আশমান পানি দিলিই ধান বুনবো তাবে বাল বাচ্চা সমেত খেয়ে জান বাঁচাবো। তাই নীল বুনে নেবে, চুক্তি ভঙ্গ বলে সকলে বেচে কিনে নিল, জমায় তিনচারগুণ বেশী করল, খোদার বান্দা ফাটকে মলো। আরো কত মরে তার ঠেকনা কি? আয়েন্দা ভাত পানির দফা যায়। আল্লা এমন করে মারিসক্যান? তুই তো সকলই পারিস। একদিন কেন সব রাইয়ত গুষ্টি সমেত মেরে ফেলে সাহেবগারে সব দে না? আর তো বরদাস্ত হয় না। দোহাই আল্লা! এই দরখাস্ত করছি তুই আমাদের মেরে ফেল। - আবদুল মতলেব মন্ডল।"

দীনবন্ধু মিত্র রচিত নীলদর্পন নাটকের বিষয়বস্তু প্রসঙ্গে 'সোমপ্রকাশ' পত্রিকার একজন গ্রাহক ১২৬৯ বঙ্গাব্দের ২৪শে ভাদ্র লিখেছিলেন - "নীলদর্পনের বর্ণনায় যদি কোন মহাত্মার সন্দেহ থাকে, তবে বারেক এ প্রদেশে আগমন করিয়া নীলকরের অত্যাচার ও বিচার প্রণালী ও অস্মদের অবস্থা ক্ষণকাল অবলোকন করিলেই বর্ণিত পুস্তকের একটি কথার প্রতিও অবিশ্বাস করিবার অনুমাত্র কারণ থাকিবে না।"
                           ©️রানা চক্রবর্তী©️
একজন বিদেশী শিল্পী বঙ্গদেশে নীলচাষ ও নীলকুঠির বিস্তারিত সচিত্র বিবরণ দিয়েছিলেন (Rural Life in Bengal, London 1866, Letter VIII, Page: 114-136)। সেই বিবরণ থেকে একটা নীলকুঠিতে গড়ে কতজন লোক কি কাজ করত তার একটা হিসেব পাওয়া যায়।

কর্মী- গাড়িচালক (১২০ গো গাড়ি); সংখ্যা- ১২০; মাসিক বেতন- ৭।।০
কর্মী- মাঝি (৪৮ নৌকা); সংখ্যা- ৯৬; মাসিক বেতন- ৯৲
কর্মী- সর্দার; সংখ্যা- ১; মাসিক বেতন- ৪৲
কর্মী- ভ্যাট-কুলি: বুনো সংখ্যা- ৭২, মাসিক বেতন- ৩৲; মেদিনীপুরী সংখ্যা- ৪০, মাসিক বেতন- ৪৲
কর্মী- গাছমাপা; সংখ্যা- ২; মাসিক বেতন- ২৲
কর্মী- চীনা পাম্প-চালম; সংখ্যা- ৩০; মাসিক বেতন- ৩৸০
কর্মী- পিন-কুলি; সংখ্যা- ১; মাসিক বেতন- ৪৲
কর্মী- বয়েলার হাউসের লোক; সংখ্যা- ৬; মাসিক বেতন- ৩৲
কর্মী- স্টোকার; সংখ্যা- ৩; মাসিক বেতন- ৩৸০
কর্মী- দলাই-মাড়াই; সংখ্যা- ৬; মাসিক বেতন- ৩।০
কর্মী- ঘাট-মুটে (মেয়ে); সংখ্যা- ৬; মাসিক বেতন- ২৲
কর্মী- গুদাম-কুলি; সংখ্যা- ৪; মাসিক বেতন- ২৲
কর্মী- কুলি-সর্দার: বুনো সংখ্যা- ২, মাসিক বেতন- ৩৲; মেদিনীপুরী সংখ্যা- ২, মাসিক বেতন- ৫৲
কর্মী- ঘাট-মাঝি; সংখ্যা- ১; মাসিক বেতন- ৪৲
কর্মী- কেক কাটার; সংখ্যা- ১; মাসিক বেতন- ৪৲
কর্মী- ছুতোর; সংখ্যা- ১; মাসিক বেতন- ৪৲
কর্মী- কর্মকার; সংখ্যা- ১; মাসিক বেতন- ৫৲

মোট কুলির সংখ্যা ৩৯৫ জন। লেখক বলেছিলেন, যে বছর ভালো চাষ হত না, সেই বছর কুলির সংখ্যা সাধারণতঃ এইরকমই থাকত, চাষ ভাল হলে কুলির সংখ্যা এর দ্বিগুণ হত। এছাড়া ভদ্রলোক কর্মচারী - নায়েব, গোমস্তা, সরকার ইত্যাদি - এদের সংখ্যাও কম ছিল না।
                                ©️রানা চক্রবর্তী©️
নীলকর সাহেবরা কিভাবে চাষীদের দিয়ে জোর করে নীলচাষ করাত তার একটা নিখুঁত মর্মস্পর্শী বিবরণ 'তত্ববোধনী' পত্রিকার 'অগ্রহায়ণ, ১৭৭২ শক, ৮৮ সংখ্যা' তে প্রকাশিত হয়েছিল - "নীল প্রস্তুত করা প্রজাদিগের মানস নহে; নীলকর তাহারদিগের বলদ্বারা তদ্বিষয়ে প্রবৃত্ত করেন, ও নীলবীজ বপনার্থে তাহারদিগের উত্তমোত্তম ভূমি নির্দিষ্ট করিয়া দেন। দ্রব্যের উচিৎ পণ প্রদান করা তাহার রীতি নহে, অতএব তিনি প্রজাদিগের নীলের অত্যল্প অনুচিত মূল্য ধার্য করেন ... কখন কখন এপ্রকারও ঘটে যে কোন কৃষক শস্য বপনার্থে কোন উৎকৃষ্ট ক্ষেত্র সুচারুরূপে কর্ষণপূর্বক অতি পরিপাটিরূপে পরিষ্কৃত করিয়া রাখিয়াছে, ইতিমধ্যে নির্দয় নীলকরের প্রেরিত নিদারুণ লোকেরা তাহার অজ্ঞাতসারে তথায় উপস্থিত হইয়া নীলের বীজ বপন করিয়া যায় - তাহার আশাবৃক্ষ সমূলে নির্মূল করিয়া প্রস্থান করে।"

নীল উৎপাদন করার পরেও চাষীদের নিস্তার ছিল না। নীল কেটে যখন তাঁরা কুঠিতে উপস্থিত করত তখন তাঁদের 'বিষম বিপত্তির কাল'। 'হিংস্র জন্তুবৎ নৃশংশ স্বভাব আমলারা' দাদন দেবার সময়ে চাষীদের কাছ থেকে টাকা নিত, তারপরেও নানা রকমের ছুতোতে তাঁরা চাষীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করত এবং অবশেষে চাষীরা যখন কুঠিতে নীল নিয়ে আসত তখনও তাঁদের পীড়ন করা হত। পঁচিশ মণ নীল খাতায় পাঁচ মণ লেখা হল এই ভয় দেখিয়ে কুঠির ভদ্রলোক আমলারা টাকা আদায় করতে ছাড়ত না। "একে নীলকর সাহেব তাঁহার দিগের উচিত মূল্যের অর্ধমাত্রও প্রদানে স্বীকৃত হত না, তাহাতে আবার আমলারা তাহাদের উপর ছলে বলে কৌশলে নানা প্রকার অত্যাচার করে। ইহাতে শত শত ব্যক্তি বর্ষে বর্ষে নীলকর সাহেবদের সন্নিধানে নীলের দাদন গ্রহণ করিয়া ক্রমে এপ্রকার ঋণগ্রস্ত হইতে থাকে, যে তাহাদের পৌত্র প্রপৌত্র প্রভৃতিও তৎপরিশোধে সমর্থ হয় না।"

নীলকররা ও তাঁদের অনুচররা যে কেবলমাত্র চাষীদের উপরেই এরকম অত্যাচার করত তা নয়। "যাহারা গাড়ি নৌকা বা মস্তকে করিয়া নীলপত্র বহন করে, ও তৎসম্বন্ধীয় অন্যান্য কার্য করে, তাহারদিগের প্রতিও এই প্রকার ব্যবহার"। চাষীরা যেমন নীলের ন্যায্য মূল্য পেত না, কুঠির কুলিরাও ঠিক তেমন উচিত বেতন পেত না, তার জন্য তাঁরা নীলকরের কাছে কাজ করতে চাইত না। কিন্তু তাঁরা না চাইলে কি হবে, "সাহেবদের অনিবার্য অনুমতি অবশ্যই অবশ্য পালন করিতে হয়"। নীলকুঠির ভদ্রলোক কর্মচারীদের চরিত্র বর্ণনা করে 'তত্ববোধনী' পত্রিকা লিখেছিল -

"তাঁহারা ভদ্রলোক বলিয়া বিখ্যাত বটেন, কিন্তু ব্যবহারানুসারে ভদ্রাভদ্র বিবেচনা করিতে হইলে তাঁহারদিগকে এ আখ্যা প্রদান করা কোনক্রমে উচিত নহে। যতকিঞ্চিত অঙ্কশিক্ষা মাত্র তাঁহারদের বিদ্যার সীমা; তাঁহারা বিদ্যারসের স্বাদ গ্রহণও করেন না, নীতিশাস্ত্রেও শিক্ষিত হয়েন না। বিদ্যা ও ধর্মবিহীন লোকের যে প্রকার আচরণ হওয়া সম্ভব, তাহা কাহার অগোচর আছে? তাঁহারদের মুখশ্রীতে কেবল লোভ ও নির্দয়তার নিদর্শনই স্পষ্টরূপে প্রকাশ পায়, জ্ঞান ও ধর্মের চিহ্নমাত্র দৃষ্টি করা যায় না।"

এঁদের ছেলেপিলেরাও পাঠশালায় কিছু লেখাপড়া শিখে নীলকুঠির যে-কোন কাজে ঢুকে পড়ত, এবং তারপরে বাবাখুড়োর পদাঙ্ক অনুসরণ করে নানা ধরনের কদাচার ও অবিচারে প্রবৃত্ত হত। অনেক পল্লীগ্রামে নীলকুঠির সংশ্লিষ্ট ভদ্রলোক আমলাদের এক-একটা অত্যাচারী গোষ্ঠী গড়ে উঠত, গ্রামের শান্ত ও নিরীহ লোকজন তাঁদের সাক্ষাৎ যমদূত মনে করত (সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র, ২য় খণ্ড, বিনয় ঘোষ, পৃষ্ঠা ১৬৮-১৭০)।
                          ©️রানা চক্রবর্তী©️
বঙ্গদেশে নীলকরদের অত্যাচারের গল্পের কোন শেষ নেই। মনে হয় সারা পৃথিবীর স্বেচ্ছাচারীতার ইতিহাসে বঙ্গদেশের নীলকর সাহেবরা যেন শীর্ষস্থান অধিকার করে আছেন। তাঁদের জীবনের জপতধ্যান ছিল টাকা আর টাকা, মুনাফা আর মুনাফা। তাঁদের খাদ্যফসলের প্রয়োজন ছিল না, নীলের মতন টাকার ফসল তাঁদের দরকার ছিল। তার জন্য চাষীদের উপরে অমানুষিক অত্যাচার করা, ধানী জমিতে জোর করে নীলচাষ করা এবং তার জন্য থানার দারোগা থেকে যে-কোন দুর্বৃত্তের সঙ্গে হাত মিলিয়ে টাকা চুক্তি করা - এসব যেন নীলকরদের জন্মগত অধিকারে পরিণত হয়েছিল মগের মুল্লুক বঙ্গদেশে। এই চরম অত্যাচারের ফলেই বঙ্গদেশে নীলবিদ্রোহ (১৮৬০) হয় (Indigo papers, Bengal Government Records)। এদেশের চিরস্থায়ী জমিদার-পত্তনিদার-তালুকদার ও বিদেশের নীলকররা বাংলার গ্রাম্য সমাজের শান্তি শৃঙ্খলা ধ্বংস করে, তার যুগযুগান্তরের আত্মসমাহিত রূপকে বিকৃত করে, গ্রামের দীনদরিদ্র সাধারণ মানুষকে এই সত্যিই উপলব্ধি করতে বাধ্য করেছিলেন যে সবার উপরে টাকা সত্য, তার উপরে আর কিছু নেই। বর্তমান যুগের 'money economy' বা টাকাপ্রধান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার স্বরূপ যে কতদূর হৃদয়হীন ও বিবেকহীন হতে পারে, বাংলার নীলচাষ তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, এবং নীলকররা তার শ্রেষ্ঠ প্রমাণ। নীলকররা কেন, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পরবর্তী বাংলার জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগীরাও তার ঐতিহাসিক সাক্ষী।
                         ©️রানা চক্রবর্তী©️


(তথ্যসূত্র:
১- বাংলার সামাজিক ইতিহাসের ধারা, বিনয় ঘোষ।
২- A series of the Principal Products of Bengal: No. 1. Indigo: Calcutta 1832, Ch. II, Table XXIV, Jhon Phipps.
৩- সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র, বিনয় ঘোষ; ১ম, ২য়, ৩য় ও ৪র্থ খণ্ড।
৪- Rural Life in Bengal, London 1866, Letter VIII.
৫- Indigo papers, Bengal Government Records.
৬- পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি, বিনয় ঘোষ।)
                             ©️রানা চক্রবর্তী©️

No comments

সোশ্যাল ডিস্টান্সিং বনাম শারীরিক ডিস্টান্সিং ।। সুমিত্রা পদ্মনাভন

সোশ্যাল অর্থাৎ সামাজিক দূরত্ব। ইংরেজীতে দুটো শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে – সোশ্যাল ডিস্টান্সিং আর ফিজ়িকাল ডিস্টান্সিং। একই অর্থে। কিন্তু...