Sunday, 18 August 2019

বেদের ইতিহাস ।। উপেন পাত্র

দেবনাগরী অক্ষরে ঋকবেদের পান্ডুলিপির অংশ : ছবি সৌজন্যে- উইকিপিডিয়া


আদি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় লেখার হরফ ছিল না। তাই মনে রাখার কথাগুলিকে ছন্দোবদ্ধ করে রাখা হতো। তাই ভাষাটিকে "ছান্দস" বলা হয়। যারা এই ছন্দবন্ধনের কাজটি করতেন, তাদের ঋষি বলা হতো। ঋষিরা কিছু উচ্চমানের কবিতা রচনা করেন, যা ঋক নামে পরিচিত হয়। কয়েকটি ঋকের সমষ্টিকে সূক্ত বলা হয়। তাই ঐ ভাষার আদি কবিতাগুলিকে ঋকবেদ নামে অভিহিত করা হয়। ঋকগুলিতে কিছু জ্ঞান (বিদ) থাকায় এই নামকরণ। সূক্তগুলি বংশ পরম্পরা বা শিষ্য পরম্পরায় স্মৃতিতে ধরে রাখা হতো। তাই বেদের অপর নাম হয় "শ্রুতি"।
 
প্রকৃতি পূজক ঐ গোষ্ঠী প্রাকৃতিক নানা শক্তিতে দেবত্ব আরোপ করে এবং দেবতাদের তুষ্টির জন্য যজ্ঞ শুরু করে। অগ্নিদেবের মাধ্যমে নানা দেবতার উদ্দেশ্যে আহুতি দেওয়া হয়। আহুতি কালে ঋক সূক্তগুলি আবৃত্তি করা হতো। কিছু সূক্তে সুর দিয়ে গীত হতো,যা প্রবন্ধ নামে পরিচিত হয়। প্রবন্ধগুলির সংকলনই সামবেদ।

পরবর্তীকালে যজ্ঞের বিধানাদি গদ্যে সংকলিত হয়, যা যজুর্বেদ নামে খ্যাত। অথর্ববেদে কিছু প্রাচীন  সূক্ত থাকলেও অধিকাংশ পরে সংকলিত হয়। খৃঃ পূর্ব দেড় হাজার বছর থেকে পঞ্চম শতাব্দ পর্যন্ত বেদসকল রচিত হয়। ঋষি অঙিরা চার বেদের সূক্তগুলি সুবিন্যস্ত করেন। তারপরও চার বেদের মধ্যে নানা সূক্ত প্রক্ষিপ্ত হতে থাকে।

বেদের প্রক্ষিপ্ততা রোধ করে সুনির্দিষ্ট অনুক্রমণী রচনা করার জন্য ব্যাসদেব তাঁর চার শিষ্যকে দায়িত্ব দেন। পৈল ঋকবেদ, জৈমিনি সামবেদ, বৈশম্পায়ন যজুর্বেদ ও সমন্তু অথর্ববেদের অনুক্রমণী রচনা করেন। যজুর্বেদের অনুক্রমণী রচনাকালে যাজ্ঞবল্ক্যের সাথে বিতর্কের কারণে যজুর্বেদকে শুক্ল ও কৃষ্ণ দুই ভাগে ভাগ করা হয়। এই অনুক্রমণী অনুযায়ী ঋকবেদে ১০২৮, সামবেদে ১৮৯৩, যজুর্বেদে ১৯৭৫ ও অথর্ববেদে ৫৯৭৭টি সূক্ত স্থিরীকৃত হয়।

প্রতি বেদের দু'টি অংশ- সংহিতা ও ব্রাহ্মণ। সংহিতা হলো সূক্ত সংকলন এবং ব্রাহ্মণ হলো ব্যাখ্যা। প্রধান ব্রাহ্মণ হলো- ঋকবেদের কৌষীতকী, সামবেদের তাণ্ড্য, শুক্ল যজুর্বেদের শতপথ, কৃষ্ণ যজুর্বেদের তৈত্তিরীয়, অথর্ববেদের গোপথ। ব্রাহ্মণের পরবর্তী অংশ আরণ্যক ও উপনিষদ। উপনিষদে দার্শনিক তত্ত্ব আলোচনা আছে। প্রধান উপনিষদগুলি হলো- ঋকবেদের ঐতরেয়, সামবেদের ছান্দোগ্য ও কেন, শুক্ল যজুর্বেদের বৃহদারণ্যক ও ঈশ, কৃষ্ণ যজুর্বেদের কঠ ও শ্বেতাশ্বতর এবং অথর্ববেদের মণ্ডক ও মাণ্ডুক্য।

পরবর্তী কালে ছান্দস ভাষাকে দৃঢ় ব্যাকরণ বিধি অনুযায়ী সংস্কার করে সংস্কৃত ভাষার উদ্ভব হয়।
(সংস্কারীকৃত ইতি সংস্কৃত)

খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দে যক্ষ লিখিতভাবে বেদ ভাষ্য রচনা করেন। তার আগে পর্যন্ত সমস্ত বেদ মৌখিক সাহিত্য ছিল। ঐ বেদ ভাষ্য সম্পুর্নরূপে পাওয়া যায় না। তারপর চতুর্দশ শতাব্দে সায়নাচার্য চার বেদের পূর্ণাঙ্গ ভাষ্য লিখেন। ১৭৮০ সালে উইলিয়াম জোন্স ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের বেদ অভিজ্ঞ পণ্ডিতদের সহায়তায় চার বেদের লিখিত রূপ দেন।

এই সময় থেকে ইউরোপের পণ্ডিত সমাজে বেদ বিষয়ে জানার জন্য প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি হয়। ইউরোপীয় পণ্ডিতরা, বিশেষত জার্মান পণ্ডিতরা নানাভাবে বেদ বিশ্লেষণ শুরু করেন। রথ সাহেব আদি ইন্দো ইউরোপীয় ভাষা বিবর্তনের  ক্রম অনুযায়ী বেদ বিশ্লেষণ করেন এবং চার বেদের নানা প্রক্ষিপ্ত অংশকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করেন।



তথ্যসূত্রঃ-
১।খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
২।সুকুমারী ভট্টাচার্য
৩।সাধন দাশগুপ্ত

No comments:

চীন ভ্রমণের ডায়েরী ।। বিনিতা সাহা

নতুন কোনো শহরে ঘুম থেকে জাগা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আনন্দের অনুভূতি আমার কাছে। কিন্তু রাতের ১২.৩০ এর ফ্লাইটের কথা শুনলেই আমার ভ্রমণের আ...