Tuesday, 30 April 2019

কলকাতাই পুরো বাংলা না ।। কৌশিক মাইতি


কলকাতা পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী, কলকাতা পশ্চিমবঙ্গের মূল শহরও। কলকাতার সমস্যা মানেই সারা পশ্চিমবঙ্গের সমস্যা, এটা চিত্রিত হয়। কলকাতায় সমস্যা দেখা দিলেই, গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে গেল গেল রব তোলা হয়, দায়িত্বে থাকে সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যম। কিন্তু গ্রাম বাংলার সমস্যার কথা কলকাতার মানুষের কাছে অজানাই থেকে যায়। কজন চেনে এই বাংলাকে? চেনার চেষ্টাও নেই। গ্রাম-বাংলা, মফঃস্বল খবরের অন্তরালেই থেকে যায়।

গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই জীবনের সাথে লড়াই করছে, শহুরে মানুষ এসব বোঝে না। ছেলে-মেয়েকে লাখ লাখ টাকা ডোনেশন দিয়ে নামী ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করা শহুরে অনেক মানুষের জীবনের সমস্যা হতে পারে, গ্রামের অনেক মানুষ আজও ছেলে-মেয়ের মুখে দু'বেলা অল্প পুষ্টিকর খাবার তুলে দিতে, কিমবা কটা বই কিনে দিতেই হিমশিম খায়। এখনও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলে কিমবা ফসলের মূল্য না পেলে, হাহাকার দেখা যায় গ্রাম-বাংলা জুড়ে। অন্যদিকে অনেক শহুরে মানুষের চিন্তা রেস্টুরেন্টের খাবারে ট্যাক্স বাড়া। শহরের অনেকেই কষ্ট করে বেঁচে আছে, শহরের একটা বড় অংশ নিম্নবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত, কিন্তু আমি বলছি শহরকে যারা রিপ্রেসেন্ট করে তাদের কথা।

এপোলো হাসপাতালে কিছু হলে বা বিল বেশি হলে- সেটা সর্বস্তরে বড় বড় খবর হয়। এদিকে প্রাথমিক চিকিৎসার অভাবে ভুগছে কয়েক কোটি মানুষ। এ রাজ্যের সব কটা বড় হাসপাতালই (সরকারি বা বেসরকারি) কলকাতায়। উত্তরবঙ্গে একটি মাত্র মেডিক্যাল কলেজ। একটু জটিল রোগ হলেই জেলা থেকে চিকিৎসার আশায় কাতারে কাতারে মানুষ কলকাতায় আসতে বাধ্য। কোচবিহার কিমবা পুরুলিয়ার ভরসা শুধু কলকাতাই। অর্থাৎ গ্রাম-বাংলার মানুষের নিজের জেলায় উন্নত চিকিৎসার সুযোগ ও অধিকার কিছুই নেই। গ্রাম বাংলায় সরকারি স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর এমন বেহাল দশা, গ্রামীণ চিকিৎসকের উপর নির্ভর করেই বেঁচে আছে তারা, বড় রোগ হলে ধরতে ধরতেই বেশ কিছুটা সময় পেরিয়ে যায়। গ্রামীণ চিকিৎসকের থেকে মফঃস্বল ও তারপর দরকারে শহরে চিকিৎসার জন্য হন্যে হয়ে ঘোরে। গ্রাম-বাংলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে, মহকুমা বা জেলা হাসপাতাল নিয়ে খবর হয় না কেন? এপোলোর থেকে অনেকগুণ বেশি মানুষ যায় এই হাসপাতালগুলোয়।

ইংরেজি মাধ্যম স্কুল বলে ঝড় উঠেছে। খবর দেখলে মনে হয়, পুরো বাংলায় এই সমস্যা। হ্যাঁ, ইংরেজি মাধ্যম স্কুল বাড়ছে, বাংলা মাধ্যম স্কুল কমছে। কিন্তু সেটা বেশি করে কলকাতা ও অন্যান্য বড় শহরে। এখনও গ্রামের প্রায় সব ছাত্র-ছাত্রীই সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলে পড়ে, মফঃস্বলেও আজকাল কিছু ইংরেজি মাধ্যম স্কুল খুলছে বটে, তবে সংখ্যায় অনেক কম। তাদের জন্যই বাংলা মাধ্যম বেঁচে আছে। স্কুলের পরিকাঠামো উন্নয়ন, সিলেবাসের আধুনিকীকরণ এসবের উপর বেশি করে গুরুত্ব দিতে হবে সরকারকে। এই বাংলা মাধ্যম স্কুল গুলো থেকেই আজও বহু রত্ন জন্ম নেয়। বহু স্কুল দারুণ চলছে আজও। শুধু কলকাতা কলকাতা করা বন্ধ হওয়া দরকার। বহু বছর আগে থেকেই কনভেন্ট স্কুলে পড়া ছেলে-মেয়েদের উঁচু চোখে দেখা হয়। আর কলকাতার কিছু মধ্যবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত মানুষ ছেলে-মেয়েদের বহুদিন আগে থেকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করেন। এখন এটা সর্বস্তরে ছড়িয়েছে মাত্র।

একবার খবরে ভাসে ভাগাড়ের মাংসের গল্প, একবার ভাসে প্ল্যাস্টিক ডিম। কিছু সময় খবরের দখল নেয় ভেজাল দুধ। এই সমস্যা তো শুধু শহরের। গ্রামের মানুষ তরতাজা জিনিস খায়। সে মাছ, মাংস কিমবা সবজি যাই হোক। কিন্তু ভাগাড়ের মাংসের গল্প সংবাদমাধ্যমে এমন ভাবে উঠে আসছে যেন পুরো বাংলায় মহা সংকট দেখা দিয়েছে। বন্যায় কিমবা মহামারীতে লাখ লাখ গ্রামবাসী ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সে জিনিস সংবাদ মাধ্যমকে আকৃষ্ট করে না। কারণ তাদের কাছে কলকাতাই বাংলা। অনেক গ্রামের মানুষ এখনও পরিশ্রুত পানীয় জল পায় না। সে নিয়ে নড়চড় নেই।

পুজোর সময় দেখি, কলকাতার দুর্গাপুজোকে কিভাবে সর্বজনীন বলে দেখানো হয়। কলকাতার মানুষের সমস্যা কোনদিন কোন পোশাক পড়বে তা নিয়ে। সে নিয়ে সংবাদমাধ্যম কত ইন্টারভিউ করে! গ্রামের অনেক ছেলে-মেয়ের গায়েই পুজোর নতুন জামা তুলে দিতে পারে না বাবা-মা। গ্রামেও পুজো হয়, চেটেপুটে আনন্দ করে সবাই। কিন্তু এ জিনিস কেউ জানতেই পারে না। পুজো প্যান্ডেলে সেলিব্রিটি নেই, টাকা ওড়ে না, শিল্পসজ্জায় ঝকমক করে না চারপাশ- তাই হয়তো। পুরুলিয়ার মূল উৎসব টুসু পরব, সে নিয়ে কোনো খবর দেখেছেন টিভির পর্দায়? জানেন টুসু পরব কী? যেন দুর্গাপুজো ছাড়া বাংলায় কিছু হয় না। সুন্দরবনের মূল পুজো বনবিবির পুজো। এ বাংলার নানান জনজাতির উৎসবগুলো নিয়ে কেউ কিছু জানিই না।

কলকাতায় একটা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মিছিল হলে, বুদ্ধিজীবীরা পথে নামলে মনে হয় এনারাই সম্প্রীতির ধ্বজাধারী। এদিকে বেশিরভাগ গ্রামে প্রজন্মের পর প্রজম্ম সবাই মিলে-মিশে চাষবাস করছে। কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে নানা জিনিস উৎপাদন করছে। এ ওর বাড়িতে পুজোয়, ও এর বাড়িতে ঈদে খেতে যায়। একসাথে পীরের পুজো করে। অনেক লৌকিক দেব-দেবীর পুজোয় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অংশ নেয়। তারাই একসাথে ধরে রেখেছে সমাজটা, তারাই আসল সম্প্রীতির সুতো। কিন্তু এসব জিনিস কোনো শহুরে মানুষ জানেন? কোনো পীরের পুজো নিয়ে খবর হয়?

কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণ দরকার, নারীর অধিকার নিয়ে বহু কথা শোনেন। গ্রামে স্বামী-স্ত্রী ও পুরুষ-মহিলা সবাই একসাথে কাজ করে, মাঠে-ঘাটে এ দৃশ্য সবসময়ই দেখা যায়। মেয়েরা নিজেদের মতো করে অংশ নেয় সব কাজে। অনেক জায়গায় মেয়েরাই সংসারের সব, তারাই উপার্জন করেন। এ জিনিস কেউ তুলে ধরে?

স্কুলে সাইকেল দেওয়া কিমবা বই, জামাকাপড় দেওয়া নিয়ে অনেক বিদ্রুপ শোনা যায়। শহুরে মানুষ বোঝে তিন-চার কিমি হেঁটে স্কুলে যাওয়ার কষ্ট? একটা পোশাক পাঁচ বছর পরা, কিমবা অন্যের ব্যবহৃত পোশাক পরে স্কুলে যাওয়ার কথা কেউ জানে? বই কেনার টাকা জোগাড় না হওয়ায় কত ছেলেমেয়ে স্কুল ছেড়েছে সে হিসাব আছে? সংসার চালাতে কত ছেলে মাধ্যমিকের আগেই শ্রমিক হয়ে যায়! আর শহরের মানুষ স্কুলে মিড ডে মিল নিয়ে হাসে! আর কোনোক্রমে বয়স চোদ্দো গড়ালেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় পড়াশোনা করতে চাওয়া লাখ লাখ মেয়েকে। কন্যাশ্রী নিয়ে কিন্তু বিদ্রুপ থামে না শহরে!

কলকাতা রাজধানী, অবশ্যই এ বাংলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু কলকাতাই পুরো বাংলা না। ১.৫ কোটি মানুষের সমস্যা দিয়ে ১১ কোটি মানুষের রাজ্যের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ হয়- যেটা খুব সমস্যার। কলকাতায় একটা ব্রিজ পড়লে তা দিয়ে গোটা বাংলার ভোট নিয়ন্ত্রিত হয়। গ্রাম-বাংলার সুখ-দুঃখের কথা চাপা পড়ে যায় সব সময়ই। বাংলার প্রতিটা প্রান্ত এগিয়ে যাক। শিক্ষা-স্বাস্থ্যে জেলাগুলোর দিকে নজর দেওয়া হোক। গ্রাম-বাংলার সমস্যা নিয়েও কথা হোক। গ্রাম-বাংলায় হাজারো ভালো জিনিস আছে। সেসব তুলে ধরা হোক। গ্রাম এগোলে শহর এগোয়, কিন্তু শহরকেন্দ্রিক উন্নয়ন গ্রামে প্রভাব ফেলে না- সেটা সবাইকে বুঝতে হবে।

No comments:

চীন ভ্রমণের ডায়েরী ।। বিনিতা সাহা

নতুন কোনো শহরে ঘুম থেকে জাগা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আনন্দের অনুভূতি আমার কাছে। কিন্তু রাতের ১২.৩০ এর ফ্লাইটের কথা শুনলেই আমার ভ্রমণের আ...