বুধবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১৭

ভারতের (মতান্তরে বিশ্বের) সবচেয়ে শিক্ষিত মানুষ


এক জীবনে কত কী করতে পারবেন আপনি? চারটি মাত্র মূল একাডেমিক ডিগ্রির পর নিয়োগ পরীক্ষা/বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকুরে হওয়ার পর বিয়ে করে স্থির হবেন? নাকি চারটার পর উচ্চতর একটি বা দুটি ডিগ্রি নিয়ে গবেষণায় মনোযোগী হয়ে স্থির হবেন? মোদ্দাকথা, গড়পড়তা মানুষ হলে ক্ষান্ত আপনি দেবেনই। কিন্তু কিছু মানুষ ভবলীলা সাঙ্গ না হওয়ার আগ পর্যন্ত ক্ষান্ত দেন না। তেমনই একজন হলেন শ্রীকান্ত জিচকার।
প্রকৃত শিক্ষা অর্জনের সংজ্ঞা কী, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সার্বজনীন কদরের ব্যাপারে কারো আপত্তি নেই। আর এদিক থেকেই অনন্য শ্রীকান্ত জিচকার। ভারত, মতান্তরে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিশ্ববিদ্যালয়-ডিগ্রিধারী হলেন তিনি। ৪২টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০টি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ৪৯ বছরের জীবনে তিনি ছিলেন একাধারে চিকিৎসক, আইনজীবী, পুলিশ কর্মকর্তা, কূটনীতিক, চিত্রগ্রাহক, অভিনেতা, চিত্রকর সহ বহু কিছু; এবং সেই সাথে ভারতের সর্বকনিষ্ঠ এমএলএ। তাঁকে নিয়েই আজকের এ লেখা।

জন্ম

১৯৫৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ভারতের মহারাষ্ট্র প্রদেশের নাগপুর জেলার কাটোলের আজামগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শ্রীকান্ত। তিনি সম্ভ্রান্ত কৃষক ‘কুম্বি’ পরিবারের সন্তান ছিলেন। স্ত্রী রাজশ্রী জিচকারের নাম ব্যতীত তাঁর পরিবারের অন্য কোনো সদস্য সম্পর্কে অন্তর্জালের উন্মুক্ত দুনিয়ায় তেমন তথ্য পাওয়া যায় না।

শৈশব থেকেই দারুণ মেধাবী শ্রীকান্ত জিচকারের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিলো চিকিৎসক হবার। সে অনুযায়ীই এগিয়েছিলেন তিনি। চিকিৎসক হলেনও, এমবিবিএস-এর পর এমডি ডিগ্রি নিয়ে পুরোদস্তুর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।
এরপর কেন যেন তাঁর মনে হলো ডাক্তারিতে ঠিক পোষাচ্ছে না। ব্যস, আইনের ওপর ‘এলএলবি’ ডিগ্রি নিয়ে ফেললেন তিনি। আন্তর্জাতিক আইনের ওপর স্নাতকোত্তর ‘এলএলএম’ ডিগ্রি নিয়ে এবার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থেকে বনে গেলেন বিশেষজ্ঞ আইনজীবী।
সমাজের দুটো অভিজাত পেশায় ঢোকবার যোগ্যতা অর্জন করেও পেশাগত জীবনে প্রবেশ না করে তিনি একের পর এক ডিগ্রিই নিয়ে গেছেন। চিকিৎসাবিদ্যা, আইনের পর তিনি এলেন ব্যবসায় শিক্ষার দুনিয়ায়। ব্যবসা-ব্যবস্থাপনার ওপর ডিপ্লোমার সাথে এমবিএ করে ফেললেন এই অতিমানবীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি দারুণ ছবি তুলতে পারতেন এবং অসাধারণ বক্তা ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই সাংবাদিকতার পাঠের প্রতি বাড়তি ঔৎসুক্য ছিলো তাঁর। দেরি না করে সাংবাদিকতায় একটা ব্যাচেলর ডিগ্রিও নিয়ে ফেললেন শ্রীকান্ত।
এখানেই শেষ ভাবছেন? না, এ তো সবে শুরু। চিকিৎসাবিদ্যায় এমডি, আন্তর্জাতিক আইনে এলএলএম ও ব্যবসা-ব্যবস্থাপনায় এমবিএ ছাড়াই এই ব্যক্তির স্নাতকোত্তর (এমএ) ডিগ্রিই আছে আরও ১০টি বিষয়ের ওপর।
  • লোকপ্রশাসন
  • সমাজবিজ্ঞান
  • অর্থনীতি
  • সংস্কৃত
  • ইতিহাস
  • ইংরেজি
  • দর্শন
  • রাষ্ট্রবিজ্ঞান
  • প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পুরাতত্ত্ব
  • মনোবিজ্ঞান
তিনি এসব বিষয়ে যে কোনোমতে মাস্টার্স পাস করেছেন, মোটেও তা নয়। প্রত্যেকটিতে প্রথম শ্রেণী তো পেয়েছেনই, সেই সাথে অধিকাংশ বিষয়েই পেয়েছেন প্রথম স্থান। শিক্ষাজীবনে তিনি স্বর্ণপদকই পেয়েছেন ২৮টি! এসবের সাথে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের ওপর নিয়েছেন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি- ডক্টর অব লিটারেচার। ১৯৭৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত টানা প্রতিটি গ্রীষ্ম ও শীতে তিনি ৪২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কোনো না কোনো পরীক্ষায় বসেছেন। এতোটাই তাঁর একাগ্রতা!

বর্ণিল পেশাজীবনেও সমান কীর্তিমান শ্রীকান্ত

চিকিৎসাবিদ্যা ও আইনের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে চিকিৎসক ও আইনজীবী হিসেবে অল্প কিছুদিন করে দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপর একে একে যখন যেটা করতে বা হতে মন চেয়েছে, তা-ই তিনি করেছেন, তা-ই তিনি হয়েছেন।

পুলিশ কর্মকর্তা

জীবনের ২৪টি বছর টানা পড়াশোনার পর তাঁর একসময় মতি হলো পুলিশের চাকরি করবার। যেই ভাবা সেই কাজ। বসে গেলেন ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস (আইপিএস) পরীক্ষায়। ফলাফল? কী আবার? যথারীতি সেখানেও উতরে গেলেন। সেটা ১৯৭৮ এর ঘটনা। দু’ বছর চুটিয়ে পুলিশের চাকরি করার পর তাঁর আবার ‘নতুনের নেশা’ চেপে বসলো।

প্রশাসনিক কর্মকর্তা

১৯৮০-তে বসলেন ভারতের সবথেকে গৌরবময় সরকারি নিয়োগ পরীক্ষা ‘ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস’-এ। এবার আর ‘বছর’ নয়, মোটে চারটা মাস গড়াতে সে চাকরিও ছেড়ে দিলেন তিনি। কিন্তু এবার স্বপ্ন আরও বড় কিছু হবার।

রাজনীতিক

সমাজসেবার মহান ব্রত সামনে নিয়ে এবার তিনি ঠিক করলেন রাজনীতিতে নামবেন। এমন গুণীকে কে না দলে পেতে চাইবে, আর কে-ইবা আটকে রাখবে! চাকরি ছাড়ার বছরই তিনি তাই কংগ্রেসের হয়ে মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচনে লড়বার টিকিট পান, বয়স তখন তাঁর মাত্র ২৫। মাত্র কয়েক মাসের নির্বাচনী প্রচারণায় নির্বাচনে জিতেও যান শ্রীকান্ত। তারুণ্যের প্রারম্ভেই তিনি বনে গেলেন ভারতের সর্বকনিষ্ঠ বিধায়ক বা এমএলএ।
শুধু কি বিধায়ক হয়েই থামলেন শ্রীকান্ত? ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত প্রথম মেয়াদে বিধায়ক থাকার পর ১৯৮৬-তে দ্বিতীয় মেয়াদে এসে তিনি হন মহারাষ্ট্রের প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য। প্রাথমিকভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকলেও বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, একই সময়ে তিনি সামলেছেন ১৪টা মন্ত্রণালয়ের গুরুদায়িত্ব! সুনিপুণ দক্ষতায় সেই দায়িত্বও সামলেছেন তিনি ১৯৯২ সাল অবধি। এরপর ১৯৯২ সালে নির্বাচনে জিতে ৪ বছর রাজ্যসভার সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

অন্যান্য

  • রাজনীতিক হিসেবে তো বটেই, ভারতের ইতিহাসেই সব থেকে বেশি ‘শিক্ষিত’ মানুষটি হওয়ার সুবাদে কূটনীতির বিশ্বমঞ্চেও ভারত আস্থা রেখেছিলো তাঁর উপর। ইউনেস্কো ও জাতিসংঘে ভারতের প্রতিনিধিত্বও করেছেন শ্রীকান্ত জিচকার।
  • পেশাদার হিসেবে তিনি তরুণ বয়স থেকে প্রৌঢ়ত্ব অবধি ছিলেন তুখোড় ফটোগ্রাফারও
  • প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ও পেশার বাইরে ছোটবেলা থেকে বড়বেলা অবধি যে কাজটি ভালোবেসে তিনি করেছেন, তা হলো ছবি আঁকা। চিত্রশিল্পী হিসেবেও বেশ নাম কামিয়েছিলেন এই গুণী।
  • মঞ্চ ছিলো তাঁর আগ্রহ ও ভালোবাসার অন্যতম জায়গা। অভিনেতা হিসেবে সেই মঞ্চেও সরব উপস্থিতি ছিলো তাঁর।
  • বাগ্মী হিসেবে তাঁর অপরিমেয় খ্যাতি ছিলো। পুরো বিশ্ব ঘুরে দেখেছেন ও গণবক্তা হিসেবে কথা বলেছেন জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি, শিল্প ও ধর্ম বিষয়ে।
  • জ্যোতিষশাস্ত্রের পাশাপাশি পৌরোহিত্যেও পারদর্শিতা ছিলো তাঁর। পৌরোহিত্যের কৃতিত্বের জন্য তিনি ভূষিত হন ‘দীক্ষিত’ উপাধিতে।

সাফল্যের যত স্বীকৃতি

প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রীর সংখ্যাধিক্যের কারণে শ্রীকান্ত জিচকারকে চলতে-বলতে পারা ‘জীবন্ত-পুস্তক’ বলা যেতে পারে। এই ‘জীবন্ত পুস্তক’-এর ব্যক্তিগত সংগ্রহেই ছিলো ৫২,০০০ এর অধিক পুস্তক বা বই। পরবর্তীতে তাঁর নাগপুরস্থ সংগ্রহশালাকেই গণগ্রন্থাগার করা হয়, যার নামকরণ হয় তাঁর নিজ নামে।

১৯৮৩ সালে ‘বিশ্বের সেরা ১০ উদ্যমী তরুণ’-এর একজনের স্বীকৃতি লাভ করেন শ্রীকান্ত।
লিমকা বুক অব রেকর্ডস অনুযায়ী শ্রীকান্ত জিচকার হলেন ভারতের সবচেয়ে ‘শিক্ষিত’ ও ‘যোগ্যতাসম্পন্ন’ ব্যক্তি। অনেকের মতে, তাঁর এ কৃতিত্ব শুধু ভারতেই নয়, বরং বিশ্বমঞ্চেও অদ্বিতীয়। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সকল মানদণ্ড স্থানভেদে সমান না হওয়ায় এবং বিশ্বময় ঐ অর্থে কোনো জরিপ না হওয়ায় এটা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল যে, এই শ্রীকান্ত জিচকারই পৃথিবীর সবথেকে বেশি শিক্ষিত’ বা বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী কিনা।

মৃত্যু

অসামান্য প্রতিভাধর এই মানুষটির বর্ণময় জীবনের ইতি ঘটে ২০০৪ সালের ২ জুন। বিপরীত দিক থেকে আসা দ্রুতগামী ট্রাক শ্রীকান্তের ব্যক্তিগত গাড়িকে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলে মৃত্যু ঘটে তাঁর। দুর্ঘটনার জন্য শ্রীকান্ত জিচকারের পরিবারকে ৫০.৬৭ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। কিন্তু ভারত তথা বিশ্ব যে তার এক রত্নকে হারালো, তাকে কি কোনো মূল্যমানে নির্ধারিত করা যায়?
মাত্র ৪৯টি বছর পৃথিবীতে বিরাজ করে এত এত কীর্তি গড়ে চিরবিদায় নেবার সৌভাগ্য ক’জনের হয়! একাগ্রতা, সংকল্পের দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস দিয়ে যেকোনো অসাধ্য সাধন করার অনুপ্রেরণা তো তাঁর কাছ থেকে নেওয়া যেতেই পারে।

কোন মন্তব্য নেই:

হেলানো টাওয়ার আর টেলিস্কোপ।। কে এম হাসান

(ছবি: Palazzo Vecchio,Uffizi Gallery, Exterior,Galileo Sculpture,Florence) বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে -১৫ ফেব্রুয়ারী গ্যালিলিওর জন্মদিনে ...