শনিবার, ২৭ মে, ২০১৭

হাওড়ের ইতিকথা || শুক্লা পঞ্চমী



ভাল করে খেয়াল করুন তো এসব ছবি দেখলে ভয় লাগে কিনা? আমি হাওড় পাড়ের কন্যা। জন্ম আমার জলের শব্দে। সাপ খোপ আর ডাকাতের সাথে সন্ধি করে টিকে থাকা এক আদিম প্রজাতি। ফেইসবুকের দৌলতে অনেক কিছুই দেখতে পাচ্ছি ভালও লাগছে ভেবে যে, এইবার বোধ হয় বাঙালী হাওড় নামটা জানবে ভাল করে। আমার বড় ভাইরা ক্ষমা করবেন আপনারাও টকশোর জন্য ভাল একটা বিষয়বস্তু পেলেন।জানিনা হাওড় সম্পর্কে কতটুকু বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে। এর আগে হাওড় নিয়ে কোন রব উঠেছে বলে আমার জানা নেই। অনেকে বলেন হাওড় আবার কি? যাইহোক উনাদের আমি গুনতির মধ্যে ধরি না। এই ফসল ডুবা নতুন কিছু না প্রতিবছর এই মানুষ গুলো ভয়ে ভয়ে থাকে এই বুঝি " জাঙ্গাল " ( মাটির দেয়া বাঁধ। যেটা আটকে হাওড় অঞ্চলের কৃষকেরা ধান চাষ করে) ভাঙলো। বাবাকে প্রতিবার দেখতাম ফসল ঘরে আসার আগে পর্যন্ত ঘুমাতেন না। পালা করে গ্রামের লোকেরা জাঙ্গাল পাহারা দিতেন। এইভাবে যখন ভাগ্যদেবী সুপ্রসন্ন থাকতেন তখন ঘরে ফসল উঠত নয়তো বা "তলায় নমঃ"।


হাওড়ের মানুষ কিন্ত মরে না কারন তাদের আছে মাছ।  নয়া পানির মাছ বেঁচে, কলার ভেরেল, পাটপাতা,শাপলা,কেউরালি এসব খেয়ে গরীব লোকজন দিনাতিপাত করতো।  কেউ খোঁজ নেয়নি কোনদিন।  কোন সরকারি সাহায্য শুনিনি। এক ফসলির দেশ একটা ফসল নষ্ট মানে একবছর অপেক্ষা। শুধু কি তাই পাঁচ দিন, সাত দিন, দশ দিন ধরে যখন অনবরত বাতাস আর বৃষ্টি হতে থাকে, হাওড় তখন উলঙ্গ নৃত্যে মাতে। মাছ ধরা তো দূরের কথা ঘরে টেকা দায় হয়ে যায়। আমার মনে আছে স্পষ্ট আমাদের পাশের ঘরের সুধেন্দু কাকা তার স্ত্রী তখন দশ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ব্যথায় প্রাণ যায়। গ্রামের ধাই বলল উনার উল্টা সন্তান উনার পক্ষে প্রসব করানো সম্ভব না। ঈশ্বর ও মুখ ফিরিয়ে নিলেন।  এই ভরা হাওড় উত্তাল ঢেউ পাড়ি দিতে কেউ সাহস পেল না। এইভাবে তিন দিন পর যখন কিছুটা স্তিমিত হয়ে আসলো হাওড় দেবীর রাগ রওয়ানা দিল সবাই, দৌড়ে নাও নিয়ে কমর কাছা দিয়ে।  বিধি বাম মাইল দশেক যেতে পেরেছিল তারপর ই নৌকা ঘাটে ফিরে এলো। এইগুলো আমার নিজের জীবন থেকে নেয়া।


তবে এইবার হাওড় বাসীরা কতটুকু টিকতে পারবে আমি সন্দিহান। কারন যেটার উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতো সেই মাছ, তারাও অভিমান করে চলে যাচ্ছে। মানুষের অবহেলা আর দুর্মতি যখন বাড়ে তখন প্রকৃতি কঠিনভাবে শোধ নেয় আমি অন্তত বিশ্বাস করি। এই যে এখন উন্নয়নের নামে হাওড়কে যা ইচ্ছা তাই বানানো হচ্ছে এতে না থাকছে হাওড় না হচ্ছে কোন উন্নয়ন। এই দুর্ভোগ ভোগান্তি আমাদের কপাল থেকে কোনদিনই যাবে না। কি যুদ্ধ নিত্য নৈমিত্তিক চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা নেই,সেনেটারির ব্যবস্থা নেই, স্কুল কলেজ তো দূরের কথা। আমার অন্তর সব সময় এই নিরীহ মুখগুলির জন্য কাঁদে।আমি বলতে কখনো দ্বিধা করি না এখনো আমার গায়ে আসটে গন্ধ লেগে আছে। আমি যতদিন বেঁচে থাকব তাই যেন থাকে।  হাওড়বাসীদের জন্য হয়ত কিছু করতে পারব তবুও বলি বাপ দাদার সম্পত্তির এক কানা কড়িও আনিনি। গাছের ফলমূল, শাকপাতা সব তারাই খায় কোনদিন হিসাবও চাইনি। তবুও মানুষ বেঁচে থাকুক। আমার হাওড় আমার কাছে পূর্বের মত করে দাও যেন জাঙ্গাল আটকিয়ে মানুষ ফসল বাঁচাতে পারে। উন্নয়নের নামে ধ্বংস চাই না।

কোন মন্তব্য নেই:

শবর কথা || বিপ্লব দাস

কচি সেগুনপাতা ঘষলে রক্তের মতো লাল রস বের হয়। এরকম এক লোককথার সাথে শবরদের অরণ্যে বাস করার কাহিনী জড়িয়ে রয়েছে। শবর এবং অসুরদের স্বর্ণয...