Wednesday, 10 April 2019

Letter from Brazil - সাও পাওলো ।। চৈতালি চ্যাটার্জি



ভারত ও ব্রাজিল, সম্পূর্ণ ভিন্ন গোলার্ধের দুই দেশ। ভাষা আলাদা, সংস্কৃতিও আলাদা কিন্তু দুটোই তৃতীয় বিশ্বের দেশ যার ফলে অর্থনৈতিক পরিকাঠামো এবং রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা অনেকটাই একই রকমের। দারিদ্রতা, অশিক্ষা, সমবন্টনের অভাব সাথে নারী নির্যাতন বা ভারতের ধর্ম বিদ্বেষীকতার মতোই ব্রাজিলে আছে বর্ণ বিদ্বেষীকতা। অতএব বাহ্যিক আভরণ যতই আলাদা হোক না কেন অন্তর্নিহিত ভাবনাগুলো কোথাও যেন মিলে যায়।

ব্রাজিলে বিগত ১৪ বছর ধরে সরকার ছিল শ্রমিক দল, তাদের প্রধান নেতা লুলা গরীব ভাতা চালু করেছিলেন, নীচু তলার কর্মচারীদের জন্য নূন্যতম মাইনেও ধার্য করেছিলেন। আর বিশ্বের জন্য? সিরিয়া, কঙ্গোর মানুষদের প্রতি দ্বার খুলে দিয়েছিলেন। কত শত শত সিরিয়ার রিফিউজিরা এসেছেন ব্রাজিলে, যে যার নিজের মত উপার্জনের ব্যবস্থাও করে নিয়েছেন। কিন্তু এই আহ্বানকে অর্ধেক শতাংশ ব্রাজিলিয়ান যে মেনে নিতে পারেনি সে কথা বুঝতে পারি গত বছর ভোটের আগে। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, আমি রাজনীতি যে খুব কিছু বুঝি তা নয়, বুঝি মানবিকতা, বুঝি সামাজিক বন্টন।

ব্রাজিলের বর্তমান প্রেসিডেন্ট বোলসোনারোর এক ভক্ত সিরিয়ান রিফিউজিদের প্রবেশ করা নিয়ে বলেছিলেন, “আমাদের দেশে বেকারত্বের সমস্যা আগে থেকেই আছে তার মধ্যে সিরিয়ানদের ডেকে আনার কোন মানেই হয় না। এছাড়া আমেরিকা তো ঠিকই করছে সিরিয়ানদের উপর হামলা করে, যে শক্তিশালী পক্ষ তার সাথে যোগ দেওয়াটাই তো বুদ্ধিমানের কাজ।” সেই সব শুনেই ক্রমশ বোলসানারোকে বিরোধিতা করতে শুরু করি। মনে পড়ে গেল তার কিছুদিন আগেই ভারতে চলছিলো আসামের অধিবাসীদের নাগরিকত্ব হারানোর ঘটনা, যার সাথে খুব মিল পেলাম। কার থেকে যেন শুনেছিলাম , ফ্যাসিবাদের আর এক বৈশিষ্ট্য হল রক্ষনশীলতা।

আর একটা উদাহরণ দিই, ব্রাজিলের ভোটের আগে এই প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, সুরক্ষার খাতিরে তিনি নাকি সবাইকে বন্দুক দেবেন। সেই নিয়ে আমার এক ছাত্রীর সাথে তক্কাতক্কি হয়। সে ছিল বোলসানরোর ভক্ত। তার মতে প্রত্যেক মেয়ে একটা করে বন্দুক রাখলে নাকি খুব সুরক্ষিত থাকবে। সে মেয়েটি রাতে যখন গাড়ি নিয়ে বাড়ি ফেরে তখন গাড়ি চুরি হওয়ার ভয় থাকে, তার কিন্তু বন্দুক আছে জানলে কেউ তার কাছেই আসবে না।

আমি তো এই যুক্তি শুনে অবাক। বন্দুক দিলেই সব সমস্যার সমাধান হবে? বিপদ তো অতর্কিতেই আসে। রাতে আমি যখন বাড়ি ফিরি, আমার ছোট একটা মোবাইল থাকে, তাতেই আমি ভয় পাই। এরপর বন্দুক থাকলে তো সেটাও চুরি হওয়ার ভয় থাকবে। মেয়েটিকে বোঝানোর চেষ্টা করি, বন্দুক নয় সমগ্র জনগণ যাতে উপযুক্ত শিক্ষা পায় তার ব্যবস্থাই করা উচিত সরকারের, সেইখানেই সব সমস্যার সমাধান লুকিয়ে আছে। কিন্তু তাতেও মেয়েটি একেবারেই অনড়, শিক্ষা না তার বেশি চিন্তা ছিল ডলারের দাম নিয়ে।

একইরকমভাবেই আশাবাদী ছিল ব্রাজিলে বসবাসকারী ভারতীয়মহলও। তারাও বোলসোনারোকে সমর্থন করে এসেছে শুধুমাত্র একটি কারণেই, নতুন প্রেসিডেন্ট এলে নাকি ডলারের দাম কমে যাবে সে আশায়। বিদেশে থাকা বেশিরভাগ ভারতীয়কেই দেখেছি গোঁ গোঁ করে পয়সা রোজগার করতে থাকে, তাদের সে দেশের সংস্কৃতি বা জনজীবন সম্পর্কে না জানলেও চলবে। মনে আছে, আসিফার মৃত্যুর কিছুদিন পরেই সাওপাওলোয় থাকা ভারতীয় মহিলাদের গ্রুপে আমি দুঃখ প্রকাশ করেছিলাম, সেটাকে একজন সাজানো ঘটনা বলে তেড়ে এসেছিল, কেউ কেউ বলেছিল অনেক হিন্দুর মেয়েদের প্রতিও এমন অত্যাচার হয় তখন কেন প্রতিবাদ হয় না?

বেশ তো, প্রতিবাদ করতে করতে দৌপ্রদীর বস্ত্রহরণ পর্যন্ত চলে যাই, তাতেও কি আসিফার খুনিদের শাস্তি হবে? সেই থেকেই বিজেপির ভক্তদের উপর আমার তীব্র ঘৃণা জন্মায়। দেখেছি নারী নির্যাতনকেও রাজনীতিবিদরা বরাবরই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।

কৃশাঙ্গ একটি মেয়ে মারিয়েলি ফ্রাঙ্কো, পেশায় তিনি সাংবাদিক ছিলেন। ভোটের আগে বোলসানারোর বিরুদ্ধে তার হাতে কিছু প্রমাণ ছিল, তাকে খুন করা হয়। এই তো কিছুদিন আগে জানা গেছে ঐ খুনের পিছনে বর্তমান সরকার দলের হাত ছিল। কিন্তু তাতে আর কিইবা হল? একেই মেয়ে মানুষ তারপর আবার কৃশাঙ্গ। ঠিক আসিফার মতোই না? এই খুনের বিচার করে হবেই বা কি ?

ভোটে জেতার আগেই বোলসানারো বলেছিলেন আমাজনের অভিবাসীদের জন্য এক কণাও জমি দেবেন না, তাদেরকে মেরে ফেলা হবে। তাতেও জনগণ রেগে যায়নি। ঠিক যেমন ভারতের দলিতদের রোজ পিটিয়ে মারার ঘটনা পড়ি, তাতেও কি ভারতবাসীর মনে সরকারের প্রতি কোন অবস্থানে কোন রদবদল ঘটেছে? ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, আমাজনে গাছ কেটে ফেলে গরু চাষ বাড়ানো হবে। কারণ গোমাংসের দাম খুব বেড়ে যাচ্ছে তো তাই। কিন্তু তাহলে গরু কি খাবে? তার কোন উত্তর যদিও নেই। তবে গরুর প্রতি প্রেমের দিকটা কিন্তু আমাদের সরকারের সাথেও মিল পেলাম।

গত দুসপ্তাহে ব্রাজিলে আমেরিকান ডলারের দাম গগনচুম্বী। বুঝতেই পারছি এই প্রেসিডেন্টের মেয়াদ বেশিদিন নয়। বোলসোনারোর ভক্তরাও এখন চুপ করে গেছে। না গোমাতা কাউকেই বাচাতে পারল না। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা হায় হায় শুরু করেছে। কিন্তু তাই বলে দেশপ্রেম জলাঞ্জলি যাবে নাকি? কেউ কেউ সেই দুঃখ ভুলতে এখন ইন্ডিয়া গেছে মোদী সরকারকে জেতানোর জন্য ভোট দিতে।

‘বৃথা আশা মরিতে মরিতেও মরে না”, তাই আমিও আশা রাখি, ব্রাজিলিয়ানরা যে ভুলটা করেছে ভারতীয়রা সেই ভুলটা করবে না।

No comments:

চীন ভ্রমণের ডায়েরী ।। বিনিতা সাহা

নতুন কোনো শহরে ঘুম থেকে জাগা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আনন্দের অনুভূতি আমার কাছে। কিন্তু রাতের ১২.৩০ এর ফ্লাইটের কথা শুনলেই আমার ভ্রমণের আ...