Monday, 14 January 2019

পুরানো সেই দিনের কথা: বাংলা পত্রিকার ইতিহাস ও কালানুক্রমিক সূচি (১৮০০ খ্ৰীস্টাব্দ থেকে ১৮৪৩ খ্ৰীস্টাব্দ)।। রাণা চক্রবর্তী


● ছবিতে- ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট কলকাতা থেকে প্রকাশিত অমৃৎবাজার পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠা (ভলিউম - ৭৯, ইস্যু - ২২৭)। এই পত্রিকা এখন ইতিহাস।

পত্রিকা প্রকাশের কথা উঠলেও প্রথমে মনে উঠে আসে মুদ্রণযন্ত্র বা ছাপাখানার কথা। ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে পর্তুগিজ ধর্ম প্রচারকগণ ভারতের পশ্চিম উপকূলের গোয়া নগরে প্রথম মুদ্রণযন্ত্র স্থাপন করেন। ১৭৬৬ খ্রিষ্টাব্দে উইলিয়াম বোল্টস নামে জনৈক ইউরোপীয় কলকাতা থেকে একটি সংবাদপত্র প্রকাশ করার জন্য ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু কোম্পানি সেই অনুমতি দেয় নি। সম্ভবত এই সময় কলকাতায় মুদ্রণযন্ত্র ছিল। তা না হলে বোল্টস সংবাদপত্র প্রকাশের উদ্যোগ কীভাবে নিয়েছিলেন। তবে এই মুদ্রণযন্ত্র সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। ১৭৮০ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় স্থাপিত হয় ইংরেজি ভাষা প্রকাশের উপযোগী ছাপখানা।

বাংলা প্রকাশনা ও বাংলা পত্রিকার প্রথম অধ্যায়
১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে হুগলীর ‘শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশন প্রেস’ স্থাপিত হয়। এটি ছিল বাংলা ভাষার প্রথম ছাপাখানা। এই ছাপখানার উদ্যোক্তাতারা ছিলেন জোওয়া মার্শম্যান (১৭৬০-১৮৩৭),  উইলিয়াম কেরি (১৭৬১-১৮৩৪) ও উইলিয়াম ওয়ার্ড (১৭৬৯-১৮২১)। ১৮১৬ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় ফোরিস কোম্পানি প্রেস স্থাপিত হয়। গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় এই প্রেস থেকে প্রথম বাংলা মুদ্রিত বই অন্নদা মঙ্গল প্রকাশিত হয়।

১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে মার্শম্যান-এর প্রচেষ্টায় হুগলীর শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে প্রথম মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকার নাম ছিল দিগদর্শন।

● দিগদর্শন। এটি বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম মাসিক পত্রিকা। শ্রীরামপুরের ইংরেজ মিশনারিরা ধর্ম প্রচারের জন্য দেশীয় ভাষা চর্চার জন্য যে সকল উদ্যোগ গ্রহণ  করেছিল, এরই একটি উদ্যোগ ছিল সংবাদপত্র প্রকাশ। এই সময় লর্ড ওয়েলেসলি'র সংবাদপত্র প্রকাশের উপর নিষেধাজ্ঞা বলৎ ছিল। এছাড়া মিশনের কর্মাধ্যক্ষ উইলিয়াম কেরি পত্রিকা প্রকাশের ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। তাই মিশনারিরা চিঠিপত্র, সারকুলার, হিসাব বই এবং পুস্তিকা ছাপতে লাগলেন। এই অবস্থা থেকে বেরিয়া আসার জন্য জসুয়া মার্শম্যানের পুত্র জন ক্লার্ক মার্শম্যান উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এবং তাঁরই উদ্যোগে এবং সম্পাদনায় বাংলাভাষায় প্রথম সাময়িক পত্র দিগ্‌দর্শন প্রকাশিত হয়, ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে। 
প্রথম সংখ্যা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে কলকাতার শিক্ষিত মহলে পত্রিকাটি আলোড়ন তুলল। সে সময়কার হিন্দু কলেজের ছাত্ররা এই পত্রিকা সাগ্রহে পড়তে লাগল। পত্রিকা কর্তৃপক্ষ, প্রতিমাসে দুই কপি পত্রিকা বিদ্যালয়গুলোতে পাঠিয়ে দিত।  ২৪টি পৃষ্ঠার এই পত্রিকার প্রতি সংখ্যার মূল্য ছিল আট আনা। 'কলিকাতা স্কুল বুক সোসাইটি' প্রতি মাসে এক হাজার কপি কিনতেন। বাংলাতে এই পত্রিকার বিপুল জনপ্রিয়তা লক্ষ্য করে, ক্যাপ্টেন গোয়ান দু'জন পণ্ডিতকে শ্রীরামপুর মিশনে পাঠান দিলেন। তাঁদের চেষ্টায় দেবনাগরী অক্ষরে হিন্দিতে দিগ্‌দর্শন প্রকাশিত হল। এর ১৬টি বাংলা দিগদর্শন প্রকাশিত হওয়ার পর 'কলিকাতা স্কুল বুক সোসাইটি'র তাগিদে এর ইংরেজি সংস্করণ বের হল। প্রথম সংখ্যা দিগদর্শন-এর ভূমিকায় প্রচার করা হয়েছিল ২৪ সংখ্যা পত্রিকা প্রকাশ করা হবে কিন্তু ২৬ সংখ্যা পর্যন্ত এই পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর ১৮২১ সালে এই পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। এই পত্রিকায় ব্যবহৃত হয়েছিল বিলিতি কাগজ। পাদ্রী লঙ সাহেবের বিবরণ অনুযায়ী জানা যায় মোট ১০৬৭৬টি পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল।
এই পত্রিকার মলাটে সম্পাদকের নাম ছাপা থাকত না। 'স্কুল বুক সোসাইটি'র রিপোর্ট থেকে জানা যায়, জসুয়া মার্শম্যানের পুত্র জন ক্লার্ক মার্শম্যান এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। দিগদর্শন-এর লেখকদের মধ্যে কয়েকজনের নাম পাওয়া যায়। রেভারেণ্ড টমসন এই পত্রিকায় জ্যোতির্বিদ্যা-বিষয়ক প্রবন্ধ লিখতেন। গুরু নাভাজি লিখতেন ভূগোল বিষয়ক নিবন্ধ। রাজা রামমোহন রায় এই পত্রিকার লেখক ছিলেন। তাঁর লিখিত 'অয়স্কান্ত অথবা চুম্বকমণি'এবং 'মকর মাসের বিবরণ' এই পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এছাড়া এই পত্রিকায় থাকতো কলকাতার বহু ধরনের সংবাদ প্রকাশিত হতো।

একই বছর 'সমাচার দর্পণ' নামে একটি পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেন। এই পত্রিকাটি প্রকাশের সময়ে মিশনারিদের মধ্যে মতভেদ হয়েছিল। বিশেষ করে উইলিয়াম কেরি পত্রিকা প্রকাশ করে সরকারের বিরাগভাজন হতে চান নি। পরে স্থির হয় যে, প্রথম সংখ্যাটির ইংরাজি অনুবাদ-সহ একখানি কপি সরকারকে পাঠান হবে এবং অনুমতি পেলে তবেই পত্রিকা প্রকাশ চালিয়ে যাওয়া হবে। সেই সিদ্ধান্ত অনুসারে মার্শম্যান, ভাইস প্রেসিদেন্ত মিঃ এডমনস্টোন, চিফ সেক্রেটারি ও গভর্ণর জেনারেল লর্ড হেস্টিংস-এদের প্রত্যেককে অনুবাদ-সহ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা পৌঁছে দেবার জন্য কলকাতায় রওনা হন। লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস স্বহস্তে চিঠি লিখে মার্শম্যানকে এদেশে জ্ঞানের প্রসার ঘটানোর সঙ্কল্পে পত্রিকা প্রকাশের জন্য প্রশংসা করেন। এরপরে পত্রিকাটি নিয়মিত প্রকাশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

● সমাচার দর্পন। এটি ছিল বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম সাপ্তাহিক পত্রিকা।  উল্লেখ্য বাংলাভাষায় প্রথম প্রকাশিত মাসিক পত্রিকা দিগদর্শন, প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে। এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন জন ক্লার্ক মার্শম্যান। এই বছরের  ২৩শে মে (১২২৫ বঙ্গাব্দের ১০ই জ্যৈষ্ঠ) শনিবার প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক 'সমাচার দর্পণ'।
এই পত্রিকাটি প্রকাশের সময়ে মিশনারিদের মধ্যে মতভেদ হয়েছিল। বিশেষ করে উইলিয়াম কেরি পত্রিকা প্রকাশ করে সরকারের বিরাগভাজন হতে চান নি। পরে স্থির হয় যে, প্রথম সংখ্যাটির ইংরাজি অনুবাদ-সহ একখানি কপি সরকারকে পাঠান হবে এবং অনুমতি পেলে তবেই পত্রিকা প্রকাশ চালিয়ে যাওয়া হবে। সেই সিদ্ধান্ত অনুসারে মার্শম্যান, ভাইস প্রেসিডেন্ট এডমনস্টোন, চিফ সেক্রেটারি ও গভর্ণর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস-এদের প্রত্যেককে অনুবাদ-সহ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা পৌঁছে দেবার জন্য কলকাতায় রওনা হন। লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস স্বহস্তে চিঠি লিখে মার্শম্যানকে এদেশে জ্ঞানের প্রসার ঘটানোর সঙ্কল্পে পত্রিকা প্রকাশের জন্য প্রশংসা করেন। এরপরে পত্রিকাটি নিয়মিত প্রকাশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
যাঁরা বাংলা ভাষা জানতেন না, তাদের জন্য একটি ফার্সি সংস্করণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই মে থেকে এই ফার্সি সংস্করণ প্রকাশিত হওয়া শুরু হয়, তবে এটি দীর্ঘকাল স্থায়ী হয় নি। 

১৮২৯ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই জুলাই থেকে 'সমাচার দর্পণ' ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় প্রকাশিত হতে থাকে। চাহিদা বৃদ্ধির কারণে, ১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই জানুয়ারি থেকে শনিবার ছাড়াও প্রতি বুধবারও পত্রিকাটি প্রকাশিত হতে থাকে। এই সময় পত্রিকার দাম ধার্য হয় মাসিক দেড় টাকা।

জন ক্লার্ক মার্শম্যান নামে মাত্র সম্পাদক ছিলেন। মূলত বাঙালি পণ্ডিতরাই আসলে সমাচারদর্পণ সম্পাদনা করতেন। বিষয়টি পরিষ্কার বুঝা যায় ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৬শে অক্টোবর সংখ্যায় প্রকাশিত একটি বিজ্ঞপ্তি। বিজ্ঞপ্তিটি ছিল−

“আমারদের পণ্ডিতগণ আগামি সোমবারপর্য্যন্ত স্ব ২ বাটী হইতে প্রত্যাগত হইবেন না অতএব এই কালের মধ্যে দর্পণে নূতন২ সম্বাদ প্রকাশ না হওয়াতে পাঠক মহাশয়েরা ত্রুটি মার্জ্জনা করিবেন।"

ধর্ম-প্রচারের উদ্দেশ্যে প্রকাশিত এই পত্রিকাটি ধর্মীয় বির্তকে না জড়িয়েই, খ্রিষ্টধর্মের বাণী প্রচার করতো। এটি প্রকাশের কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে প্রথম সংখ্যায়; বিজ্ঞপ্তি ছিল এই রকম:

“সমাচার দর্পণ। - কথক মাস হইল শ্রীরামপুরের ছাপাখানা হইতে এই ক্ষুদ্র পুস্তক প্রকাশ হইয়াছিল ও সেই পুস্তক মাস ২ ছাপাইবার কল্পও ছিল তাহার অভিপ্রায় এই যে এতদ্দেশীয় লোকেরদের নিকটে সকল প্রকার বিদ্যা প্রকাশ হয় কিন্তু সে পুস্তকে সকলের সম্মতি হইল না এই প্রযুক্ত যদি সে পুস্তক মাস২ ছাপা যাইত তবে কাহারও উপকার হইত না অতএব তাহার পরিবর্ত্তে এই সমাচারের পত্র ছাপাইতে আরম্ভ করা গিয়াছে। ইহার নাম সমাচার দর্পণ।”

এছাড়া পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় সাতটি উদ্দেশ্যের কথা উল্লেখ করেছিলেন। এই উদ্দেশ্যের ভিতরে সমাজ-নিয়মের কোনো পরিবর্তনের কথা ছিল না। সরকারি আদেশ প্রচার, বাণিজ্যের বিবরণ, নতুন প্রকাশিত বইয়ের বিবরণ, নতুন কলকারখানা স্থাপনের সংবাদ প্রচারকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল এই পত্রিকায়। উল্লেখ্য, পত্রিকাটির পরিচিতি লাভের জন্য প্রথম তিন সপ্তাহ এটি বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছিল।
সংবাদপত্রের ডাকমাশুল বৃদ্ধির কারণে পত্রিকাটি আবার শনিবার-ভিত্তিক সাপ্তাহিক পত্রিকায় পরিণত হয়। নব পর্যায়ের সাপ্তাহিক 'সমাচার দর্পণ' প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ৮ই নভেম্বর শনিবার।এ বিষয়ে পত্রিকায় পাঠকদের উদ্দেশ্য একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞপ্তি হলো−

“পাঠক মাহাশয়েরদিগকে অতিখেদপূর্ব্বক আমরা জ্ঞাপন করিতেছি যে ইহার পূর্ব্বে এতদ্দেশীয় সম্বাদপত্রে যে মাশুল নির্দ্দিষ্ট ছিল তাহা সম্প্রতি গবর্ণমেন্টের হুকুমক্রমে দ্বিগুণ হওয়াতে ইহার পর অবধিই আমারদের বুধবাসরীয় দর্পণ প্রকাশ রহিত করিতে হইল।”

১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দের ১লা জুলাই, জন ক্লার্ক মার্শম্যান-এর উপর 'গবর্মেন্ট গেজেট' নামক একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। এই কাজের জন্য মার্শম্যান ‘সমাচার দর্পণ’ থেকে পদত্যাগ করেন। উপযুক্ত সম্পাদক না পাওয়ায়, ‘সমাচার দর্পণ’- সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এই পর্যায়ে এর শেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৮৪১ সালের ২৫শে ডিসেম্বর। 
১৮৪২ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে, রামগোপাল ঘোষ ও তাঁর কয়েকজন বন্ধুর চেষ্টায় পত্রিকাটি পুনরায় প্রকাশিত হয় ইংরিজি ও বাংলা ভাষায়। ইংরিজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই সম্পাদক ছিলেন ‘জ্ঞানদীপিকা’ পত্রিকার সম্পাদক ভগবতীচরণ চট্টোপাধ্যায়। এই পর্যায়ের ‘সমাচার দর্পণ’ ১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাস সংখ্যা পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিল। 
এরপরে শ্রীরামপুর মিশন পত্রিকাটি পুনরায় প্রকাশ করবার ব্যবস্থা করে। এই পর্যায়ে ১৮৫১ খ্রিষ্টাব্দের ৩রা মে, শনিবার থেকে এর প্রকাশনা শুরু হয়। বছর দেড়েক এটি চলেছিল; পরে চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।

এই বছরে বাঙালি গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য কলকাতায় বাংলা মুদ্রণযন্ত্র স্থাপন করেন। এ মুদ্রণযন্ত্রটির নাম ছিল ‘বাঙ্গালা গেজেট প্রেস’। তিনি হুগলীর শ্রীরামপুর মিশন প্রেসে কম্পোজিটার হিসেবে কাজ শিখে কলকাতায় প্রেস স্থাপন করেন। ‘বাঙ্গাল গেজেট প্রেস’ থেকে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য 'বাঙ্গালা গেজেট' নামে সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। এ দিক থেকে বলা যায়, গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য প্রথম বাঙালি পেশাদার সাংবাদিক, মুদ্রাকর ও প্রকাশক। ভবানীচরণ ব্যানার্জী, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত প্রমুখের লেখায় এর প্রকাশ ও অস্তিত্বের কথা জানা যায়। “ওরিয়েন্টাল স্টার” পত্রিকার সূত্রে জানা যায় বাঙ্গাল গেজেট ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই মে তারিখে পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধায়ের মতে, এই তারিখ ১৪ই মে থেকে ৯ই জুলাইয়ের মধ্যে। এবং এক বছর চলার পর পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

● বাঙ্গাল গেজেট। এটি ছিল কোনো বাঙালি সম্পাদকের সম্পাদনায় প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র। এর সম্পাদক ছিলেন গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য।

১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য কলকাতায় বাংলা মুদ্রণযন্ত্র স্থাপন করেন। এ মুদ্রণযন্ত্রটির নাম ছিল ‘বাঙ্গালা গেজেট প্রেস’। তিনি হুগলীর শ্রীরামপুর মিশন প্রেসে কম্পোজিটার হিসেবে কাজ শিখে কলকাতায় প্রেস স্থাপন করেন। এই প্রেস থেকে তিনি 'বাঙ্গালা গেজেটি' নামে সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। এ দিক থেকে বলা যায়, গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য ছিলেন প্রথম বাঙালি পেশাদার সাংবাদিক, মুদ্রাকর ও প্রকাশক। উল্লেখ্য এই বছরেই হুগলীর শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে মার্শম্যান-এর সম্পাদনায় বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকা  'সমাচার দর্পণ' প্রকাশিত হয়েছিল।

'ওরিয়েন্টাল স্টার' পত্রিকার সূত্রে জানা যায় বাঙ্গাল গেজেটি ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই মে তারিখে পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু এর কোনো কপি এখন অব্দি পাওয়া যায় নি।  ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধায়ের মতে, এই তারিখ ১৪ই মে থেকে ৯ই জুলাইয়ের মধ্যে। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধায় এ অনুমান করেছেন গভর্নমেন্ট গেজেটের একটি বিজ্ঞাপন অনুসরণে। ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই মে প্রকাশিত গভর্নমেন্ট গেজেটের একটি বিজ্ঞাপন থেকে এ ধরনের একটি পত্রিকা প্রকাশের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানা গেছে। আবার ওই বছরের ১লা জুলাই-এর একটি বিজ্ঞাপন থেকে জানা যায় যে, সাপ্তাহিকটি ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। দুটি বিজ্ঞাপনই প্রকাশিত হয়েছিল হরচন্দ্র রায়-এর নামে। তবে ১৮২০ ‌খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত ‘The Friend of India’ এবং ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই জুন প্রকাশিত সমাচার দর্পণ পত্রিকার দুটির প্রতিবেদনে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যকে বাঙ্গাল গেজেটির প্রকাশক এবং সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর সাধারণ মূল্য ছিল এক টাকা ও সডাক মূল্য ছিল দু'টাকা। পত্রিকাটি এক বছর চলার পর বন্ধ হয়ে যায়।

১৮২১ খ্রিষ্টাব্দের ১লা সেপ্টেম্বর, 'সমাচার দর্পণ' পত্রিকায়  “কোন বিজ্ঞ ব্যক্তি দূর দেশ হইতে কয়েক প্রশ্ন সম্বলিত” শিরোনামে হিন্দু ধর্মের উপর আঘাত হেনে একটি পত্র ছাপা হয়। এর প্রতিবাদস্বরূপ রামমোহন রায় তাঁর গুরু শিবপ্রসাদ শর্মার নামে পত্রে প্রকাশিত প্রশ্নের জবাব ' সমাচার দর্পণ'-এ পাঠান। পত্রিকার সম্পাদক এই প্রতিবাদ কাটাছাট করে ছাপানোর মনোভাব ব্যক্ত করলে, রামমোহন রায় একটি পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেন। এই সূত্রে রামমোহন রায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় 'Brahmunical Magazine. The Missionary and the Brahmun No. 1 ব্রাহ্মণ সেবধি ব্রাহ্মণ ও মিসিনরি সম্বাদ সং ১ 1821’ পত্রিকা। এর প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৮২১ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে। এই বছরে প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক 'সম্বাদ কৌমুদী'। পত্রিকার পরিচালনায় ছিলেন তারাচাঁদ দত্ত ও ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

● ব্রাহ্মণ সেবধি ব্রাহ্মণ ও মিসিনরি সম্বাদ। তৎকালীন খ্রিষ্টান মিশনারিদের হিন্দু ধর্মের উপর আক্রমণাত্মক লেখালেখির সূত্রে এই পত্রিকার সূচনা হয়েছিল। ১৮২১ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই জুলাই ' সমাচার দর্পণ' পত্রিকায় একটি পত্র প্রকাশিত হয়। এই পত্রের শিরোনাম ছিল “কোন বিজ্ঞ ব্যক্তি দূর দেশ হইতে কয়েক প্রশ্ন সম্বলিত”। রাজা  রামমোহন রায় এই পত্র পাঠ করে অনুমান করেন যে, এই পত্রটির দ্বারা মিশনারিরা হিন্দু ধর্মের উপর আক্রমণ করেছে। এর প্রতিবাদস্বরূপ রামমোহন রায় তাঁর গুরু শিবপ্রসাদ শর্মার নামে পত্রে প্রকাশিত প্রশ্নের জবাব ' সমাচার দর্পণ'-এ পাঠান। ১৮২১ খ্রিষ্টাব্দের ১লা সেপ্টেম্বর ' সমাচার দর্পণ' সম্পাদক মন্তব্য লেখেন। মন্তব্যটি হলো-

“অজিজ্ঞাসিতাভিধান দোষ বহিষ্কৃত করিয়া কেবল সাময়িক সাহিত্য ষড়দর্শনের দোষোদ্ধার পত্র ছাপাইতে অনুমতি দেন তবে ছাপাইবার বাধা নাই অন্যথা সর্ব্ব সমেত অন্যত্র ছাপাইতে বাসনা করেন তাহাতেও হানি নাই ।”

এরপর রামমোহন রায় শিবপ্রসাদ শর্মার নামে একটি পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেন। এর নাম ছিল

''Brahmunical Magazine. The Missionary and the Brahmun No. 1 ব্রাহ্মণ সেবধি ব্রাহ্মণ ও মিসিনরি সম্বাদ সং ১ 1821’

এই পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৮২১ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে। এরপর এই বৎসরে এর আরো দুটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। পত্রিকাটির এক পৃষ্ঠায় বাংলা এবং অপর পৃষ্ঠায় এর ইংরেজি অনুবাদ থাকতো। পত্রিকটি কত মাস প্রকাশিত হয়েছিল, সে বিষয়ে জানা যায় নি।

● সম্বাদ কৌমুদি। খ্রিষ্টীয় ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা। তারাচাঁদ দত্ত ও ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর তত্ত্বাবধানে এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৮২১ খ্রিষ্টাব্দের ৪ঠা ডিসেম্বর। এই পত্রিকার শিরোদেশে থাকতো

দর্পণে বদনং ভাতি দীপেন নিকটস্থিতং । 
রবিন ভুবনং তপ্তং কৌমুদ্যা শীতলং জগৎ॥

পত্রিকাটি প্রকাশিত হতো প্রতি মঙ্গলবার। পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ৮।

এর প্রথম ১৩টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর তত্ত্বাবধানে। এরপর পত্রিকাটির সম্পাদক হন তারাচাঁদ দত্তের পুত্র হরিহর দত্ত। ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে তিনি স্বেচ্ছা-অবসর নিলে, পত্রিকার সম্পাদক হন গোবিন্দচন্দ্র কোঙার। এরপর কয়েক মাস পত্রিকাটি বন্ধ থাকে। ১৮২৩ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে পত্রিকাটি পুনরায় আনন্দচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত হতে থাকে। ১৮৩০ খ্রিষ্টাব্দের শুরুর দিকে পত্রিকাটি সপ্তাহে দুই বার প্রকাশিত হতো। এই সময়ের ভিতরে হলধর বসু ও রাধাপ্রসাদ রায় কিছুদিনের জন্য পত্রিকাটির সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।  

এই পত্রিকায় হিন্দু ধর্মের প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে লেখা প্রচারের জন্য এর গ্রাহক সংখ্যা কমে যায়। এর সাথে সহমরণ প্রথার বিরুদ্ধে তীব্রভাবে লেখা প্রকাশের কারণে, পত্রিকাটির জনপ্রিয়তা বেশ নিচে নেমে যায়। শেষ পর্যন্ত এই পত্রিকটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।

১৮২২ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা স্কুলবুক সোসাইটি থেকে প্রাণীবিষয়ক পত্রিকা 'পশ্বাবলী' প্রকাশিত হয়। এর ২২টি সংখ্যা প্রকাশের পর পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। এই বছরে প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য পত্রিকা ছিল 'সমাচার চন্দ্রিকা'। এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজা রামমোহন রায় যখন সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত করার জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন, সেই সময়ে রামমোহনের বিরোধিতা করার জন্য এই পত্রিকা প্রকাশ করা হয়েছিল। মূলত এটা ছিল হিন্দু ধর্মসভার মুখপত্র। কত সংখ্যা প্রকাশের পর এই পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তাঁর পুত্র রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় পত্রিকার সম্পাদক হন। কিন্তু রাজকৃষ্ণ বিভিন্নভাবে ঋণাগ্রস্ত হয়ে পড়লে, তিনি ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দে ভগবতী চট্টোপাধ্যায়ের কাছে পত্রিকার স্বত্ব বিক্রি করে দেন। 

১৮২২ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে শ্রীরামপুর থেকে প্রকাশিত হয় মাসিক 'খ্রীষ্টের রাজ্যবৃদ্ধি'। পত্রিকাটি প্রকাশিত হতো 'খ্রিষ্টধর্মের প্রচারের জন্য।

● পশ্বাবলী। এটি ছিল বাংলা ভাষায় প্রকাশিত মাসিক পত্রিকা।  

কলকাতা স্কুলবুক সোসাইটির তত্ত্বাবধানে এই মাসিক পত্রিকাটি প্রকাশনা শুরু হয় ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দের ২২শে ফেব্রুয়ারি থেকে। এর প্রতি সংখ্যায় থাকতো একটি প্রাণীর বিবরণ। পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় থাকতো ওই প্রাণীর কাঠখোদাই চিত্র। এই পত্রিকার বিষয় সংকলন করতেন পাদরি লসন এবং অনুবাদ করতেন ডব্লিউ, এইচ পীয়ার্স। এর কাঠ খোদাইয়ের কাজ করতে লসন। ১৮২৭ খ্রিষ্টাব্দের দিকে লসনের মৃত্যু হলে, পশ্বাবলী ছয় সংখ্যার পর বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে পশ্বাবলী প্রকাশিত হয়েছিল হিন্দু কলেজের শিক্ষক রামচন্দ্র মিত্রের সম্পাদনায়। তিনি মোট ১৬টি সংখ্যা প্রকাশ করেছিলেন। পরে এই পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।

● সমাচার চন্দ্রিকা। এটি ছিল বাংলা ভাষায় প্রকাশিত সাপ্তাহিক পত্রিকা।  

এই পত্রিকা প্রকাশের পিছনে  সাপ্তাহিক সম্বাদ কৌমুদী-এর বিশেষ ভূমিকা ছিল।  উল্লেখ্য, ১৮২১ খ্রিষ্টাব্দের ৪ঠা ডিসেম্বর থেকে সম্বাদ কৌমুদী প্রকাশিত হতে থাকে। এই পত্রিকায় হিন্দু ধর্মের প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে লেখা প্রচার করা হয়। বিশেষ করে, সহমরণ-প্রথার বিরুদ্ধে রাজা রামমোহন রায়-এর আন্দোলনকে এই পত্রিকা সমর্থ করতে থাকে। সহমরণ-প্রথার বিরুদ্ধে এই পত্রিকা ক্রমাগত বহু রচনা প্রকাশ করে। ফলে রক্ষণশীল হিন্দুরা, এর প্রতিবাদের জন্য একটি পত্রিকা প্রকাশের প্রয়োজন অনুভব করে। এই সূত্রে ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই মার্চে আত্মপ্রকাশ করে সমাচার চন্দ্রিকা।

সম্বাদ কৌমুদী-এর প্রথম সম্পাদক ছিলেন ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর পরিচালনায় এই পত্রিকার প্রথম ১৩টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। পরে তিনি এই পত্রিকা থেকে সরে দাঁড়ান। সমাচার দর্পণ পত্রিকা প্রকাশের সময় তিনি এই পত্রিকার সম্পাদক হন।

এই পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যার শিরোনামে থাকতো:

"সদা সমাচারঞ্জুষাং ফলার্পিকা, পদার্থচেষ্টাপরমার্থদায়িকা
বিজৃম্ভতে সর্ব্বমনোনুরঞ্জিকা শ্রিয়া ভবানীচবণস্ত চন্ত্রিকা।"

১৭৫১ শকাব্দের বৈশাখ (এপ্রিল ১৮২৯) থেকে এই পত্রিকা সপ্তাহে দুই বার প্রকাশিত হতো। রক্ষণশীল হিন্দুরা এই পত্রিকাটি সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। এই কারণে দ্রুত এর গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু  ১৮২৯ খ্রিষ্টাব্দের ৪ ডিসেম্বরে সতীদাহ প্রথা আইন দ্বারা বিলুপ্ত হয়ে গেলে আনুষ্ঠানিকভাবে সতীদাহের পক্ষে লেখা দুষ্কর হয়ে পড়ে। এরপর থেকে পত্রিকাটি রক্ষণশীল হিন্দুদের জন্য হিন্দুধর্মের অন্যান্য প্রথার বিষয়ে লেখা হতো। এই অবস্থায় গ্রাহক সংখ্যা কমতে থাকে।

১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তাঁর পুত্র রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় পত্রিকার সম্পাদক হন। কিন্তু রাজকৃষ্ণ বিভিন্নভাবে ঋণাগ্রস্ত হয়ে পড়লে, তিনি ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দে ভগবতী চট্টোপাধ্যায়ের কাছে পত্রিকার স্বত্ব বিক্রি করে দেন। ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই মে এই পত্রিকায় ভগবতী চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রকাশক হিসেবে পাওয়া যায়। ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে অল্প দিনের জন্য পুরাতন সমাচার দর্পণের কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। এর সর্বশেষ সংখ্যা কবে প্রকাশিত হয়েছিল, তা জানা যায় না।

■ পত্রিকা আইন
১৮২৩ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বে প্রকাশনার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট আইন ছিল না। এই সময়ের ভিতরে সিল্ক বার্কিংহামের 'ক্যালকাটা জার্নাল'-এমন কিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছিল যা, তাতে লর্ড হেস্টিং-এর প্রবর্তিত আইনের বিরুদ্ধে ছিল। এছাড়া ধর্ম বিষয়ক রচনা প্রকাশের ইংরেজ যাজকদের আপত্তি উঠেছিল প্রবলভাবে। এই প্রেক্ষিতে বড়োলাটের মন্ত্রণাসভায় সংবাদপত্রের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দের ১০ অক্টোবর উইলিয়াম বাটারওয়ার্থ বেলি ইংরেজি, বাংলা, ফার্সি পত্রিকার বিষয়াবলি নিয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা দেন।  এর ভিতরে তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন সম্বাদ কৌমুদী' ও 'সমাচার চন্দ্রিকা' নিয়ে। তাঁর মতে এই দুটি পত্রিকায় ত্রিত্ববাদ নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য প্রকাশ করা হয়। সভার অন্যান্য সভ্যদের আপত্তির কারণে, ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই অক্টোবর, লর্ড হেস্টিংস সংবাদপত্রগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ক্ষমতা প্রার্থনা করেন। এই প্রার্থনা অনুসারে ১৮২৩ খ্রিষ্টাব্দের ৪ঠা মার্চ একটি প্রেস-আইন তৈরি করে সুপ্রিম কোর্টে পেশ করা হয়। এই বছরের ৪ঠা এপ্রিল সুপ্রিপ কোর্টের অনুমোদনে আইনটি বৈধতা পায়।

এই নতুন আইন অনুসারে, কোনো প্রকাশনা পরিচালনার আগে স্বত্বাধিকারী, মুদ্রাকর এবং প্রকাশককে সরকারে অনুমতি নিতে হবে এবং তা লাইসেন্স হিসেবে গণ্য হবে। এক্ষেত্রে কোনো ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হলফনামা পেশ করে, ওই হলফনামা গবর্মেন্ট চিফ সেক্রেটারির কাছে পাঠানোর পর, লাইসেন্স পাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে লাইসেন্স পাওয়ার জন্য কোনো অর্থ ব্যয় করতে হবে না। এই নতুন আইনে রাজা রামোহন রায়ের ফার্সি পত্রিকা 'মীরাৎ-উল্-আখ্‌বার' বন্ধ হয়ে যায়।

■ বিধি মোতাবেক প্রকাশিত বাংলা পত্রিকা (বাংলা পত্রিকার দ্বিতীয় অধ্যায়)
নতুন প্রেস-আইনের পর প্রথম বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকা 'সম্বাদ তিমিরনাশক' যাত্রা শুরু করে ১২৩০ বঙ্গাব্দের কার্তিক (অক্টোবর ১৮২৩ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে। ১২৩৭ বঙ্গাব্দে এই পত্রিকাটি সপ্তাহে দুই বার প্রকাশিত হতো। এই পত্রিকায় রক্ষণশীল হিন্দু সম্প্রদায়ের মনোতুষ্টির জন্য প্রকাশিত হতো। এই সূত্রে পত্রিকাটি উদারপন্থীদের উপর অশালীন শব্দ ব্যবহার করতো। কখনো কখনো গালিগালাজ করতেও পিছপা হতো না। এই কারণে ১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দের দিকে সরকার পত্রিকাটিকে বাজেয়াপ্ত করেছিল।

● সম্বাদ তিমিরনাশক। খ্রিষ্টীয় ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা। 

১২৩০ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসে (অক্টোবর ১৮২৩) এই সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। হিন্দুধর্মের প্রচলিত প্রথা, আচার ইত্যাদির প্রচারণায় এই পত্রিকা প্রবলভাবে উঠে পড়ে লেগেছিল। এর ফলে রক্ষণশীল হিন্দু সমাজে প্রচুর জনপ্রিয়তা লাভ করতে সক্ষম হয়। এই কারণে ১২৩৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রতি সপ্তাহে দুই বার প্রকাশের ব্যবস্থা করা হয়। 

ক্রমে ক্রমে এই পত্রিকাটি ধর্মীয় উদ্দীপনায়, উদার পন্থীদের উপর গালগালিজ বর্ষণ করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১৮২৩ খ্রিষ্টাব্দের মুদ্রণ আইনের দ্বারা এই পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

১৮২৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক বঙ্গদূত পত্রিকা। প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ৯ই মে শনিবার। পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন নীলরত্ন হালদার। এই পত্রিকার বিষয়, শেষ সংখ্যা কবে প্রকাশিত হয়েছিল ইত্যাদি সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় নি।

১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দ

সংবাদ প্রভাকর। ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে প্রথম প্রকাশিত হয়। এর সম্পাদক ছিলেন ইশ্বর গুপ্ত। সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে এক বৎসর প্রকাশিত হওয়ার পর, পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। ১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দের আগষ্ট মাস থেকে। এবারে পত্রিকাটি প্রকাশিত হতো সপ্তাহে তিন বার। সত্যিকার অর্থে এটাই বাংলা ভাষার প্রথম সাহিত্য-পত্রিকা। এই পত্রিকায় অনেকে কবি-সাহিত্যিকদের রচনা প্রকাশিত হয়েছে। এঁদের ভিতর উল্লেখ্যযোগ্য ব্যক্তিরা ছিলেন অক্ষয়কুমার দত্ত, ঈশ্বরগুপ্ত, দীনবন্ধু মিত্র, বঙ্কিমচন্দ্র, মনোমহন বসু, রঙ্গলাল প্রমুখ।

সমাচার সভা রাজেন্দ্র। দ্বিভাষিক (বাংলা-ফার্সি) মাসিক পত্রিকা। ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই মার্চ প্রথম প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন শেখ আলীমুল্লাহ।

১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দ
তত্ত্ববোধিনী (মাসিক): তত্ত্ববোধিনী সভার মুখপত্র হিসেবে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্মধর্মের মুখপত্র হিসাবে এই পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর আত্মজীবনীতে এই পত্রিকার উদ্দেশ্য সম্পর্কে লিখেছেন-

  "আমি, ভাবিলাম তত্ত্ববোধিনী সভার অনেক সভ্য কার্য্যসূত্রে পরস্পর বিচ্ছিন্নভাবে আছেন। তাঁহারা সভার কোন সংবাদই পান না, অনেক সময় উপস্থিত হইতেও পারেন না। সভায় কি হয় অনেকেই তাহা অবগত নহেন। বিশেষতঃ ব্রাহ্মসমাজে বিদ্যাবাগীশের ব্যাখ্যান অনেকেই শুনিতে পান; তাহার প্রচার হওয়া আবশ্যক। আর রামমোহন রায় জীবদ্দশায় ব্রহ্মজ্ঞান বিস্তার উদ্দেশ্যে যে সকল গ্রন্থ প্রণয়ন করেন, তাহারও প্রচার আবশ্যক। এতদ্ব্যতীত, যে সকল  বিষয়ে লোকের জ্ঞান বৃদ্ধি ও চরিত্র শোধনের সহায়তা করিতে পারে, এমন সকল বিষয়ও প্রকাশ হওয়া আবশ্যক। আমি এইরূপ চিন্তা করিয়া ১৭৬৫ শকে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা প্রচারের সংকল্প করি"

১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ আগষ্ট (১৭৬৫ শকাব্দ, ১ ভাদ্র)-এ এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। এর চারমাস পরে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন।

পত্রিকাটি ছিল মাসিক, এবং এর প্রথম সম্পাদক ছিলেন অক্ষয়কুমার দত্ত। ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে ইনি এই পত্রিকার সম্পাদক পদ থেকে ইস্তফা দেন। এরপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যক্তির সম্পাদনায় পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়েছে। পরবর্তীকালের সম্পাদকরা ছিলেন- সত্যেনন্দ্র্রনাথ ঠাকুর, অযোধ্যানাথ পাকড়াশী, হেমচন্দ্রবিদ্যারত্ন, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ও ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত।

(তথ্যসূত্র:
১- ঊনবিংশ শতাব্দীর সম্পাদক ও সাহিত্যপত্র। ভবতোষ দত্ত। দেশ সাহিত্য সংখ্যা, ১৩৯৭।
২- নজরুল ও ধুমকেতু। সারোয়ার জাহান। দেশ সাহিত্য সংখ্যা, ১৩৯৭।
৩- মানসী, মর্মবাণী এবং মানসী ও মর্মবাণী। বিনয়ভূষণ রায়। দেশ সাহিত্য সংখ্যা, ১৩৯৭।
৪- রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় ও প্রবাসী। শঙ্করীপ্রসাদ বসু। দেশ সাহিত্য সংখ্যা, ১৩৯৭।)

No comments:

চীন ভ্রমণের ডায়েরী ।। বিনিতা সাহা

নতুন কোনো শহরে ঘুম থেকে জাগা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আনন্দের অনুভূতি আমার কাছে। কিন্তু রাতের ১২.৩০ এর ফ্লাইটের কথা শুনলেই আমার ভ্রমণের আ...