রবিবার, ১৭ জুন, ২০১৮

এই যে এতো বাঙালি বাঙালি করছেন, কোন বাঙালি, কিসের বাঙালি হে...?।। অনির্বাণ দাসগুপ্ত




কয়েক দিন ধরে দেখছি, দুই বাংলাকে এক করে দিয়ে পুরো বাঙালি জাতিটাকেই নির্মূল করে দেওয়ার একটা জোরদার অপপ্রয়াস চলছে। তো, পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের হিন্দুরা কি বাঙালি ছিল না বা বাঙালি নয়? বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে বাঙালি জাতির আত্মত্যাগে এবং বাঙালি জাতির জন্য সৃষ্ট বাংলাদেশেই এদের ঠাঁই হল না কেন ? বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র হিন্দু হওয়ার অপরাধে কেন তাহলে চৌদ্দ পুরুষের ভিটে মাটি ছেড়ে মা বোনের ইজ্জত সহ সর্বস্ব খুইয়ে এপাড়ে পালিয়ে আসতে হল? বাংগালী হয়েও সেই বাংলাদেশে রোজ অত্যাচারিত হতে হচ্ছে, খুন হতে হচ্ছে, ধর্ষিতা হতে হচ্ছে হিন্দু বাংগালীদের। কোন বাংগালী জাত্যাভিমানের কথা বলছেন আপনি?  হিন্দু বাংগালীদের 'বাঙালি' সত্তা কেন বাঙালি (?) মুসলমানদের হাত থেকে এদের রক্ষা করতে পারল না , পারছে না ? বাংলা ভাষার আন্দোলন থেকে বাঙালির জন্য সৃষ্ট সেই ধর্ম নিরপেক্ষ বাংলাদেশ যখন রাষ্ট্র ধর্ম ইসলামের হয়ে যায় , বাঙালি জাত্যাভিমানে টই টম্বুর সেদেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের কতজন বাধা দিয়েছিল? আর কতজন মুসলমান, মুসলমান হিসাবে ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম হিসাবে পেয়ে উল্লাসে ফেটে পড়েছিল? বাঙালি হয়েও কেন রাখাইনে হিন্দু বাঙালি রোহিঙ্গাদের গণধর্ষণ, গণহত্যা করলো বাঙালি রোহিঙ্গা মুসলমানরা? বাঙালি হয়েও রোহিঙ্গা হিন্দুদের কেন ঠাঁই নিতে হল হিন্দু বাড়ির পরিত্যক্ত গোয়াল ঘরে? 



এগুলির একটাই কারণ - মুসলমানদের ধর্মীয় সত্তার প্রাবল্য এদের 'বাঙালি সত্তাকে' কবেই গিলে নিয়েছে। এদের প্রবল ধর্মীয় সত্তা সবার আগে এদের মুসলমান বলে ভাবতে বলে। বাঙালি বা বিহারী, ভারতীয়, জার্মান, রাশিয়ান বা ব্রিটিশ নয়, সবার আগে এরা মুসলমান , শুধুই মুসলমান । এদের ধর্ম এদের এভাবেই ভাবতে শেখায়। নাম, পোষাক, চেহারা, ভাষা, মানসিকতা, বিধর্মীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি আচরণ - কোন দিক দিয়েই এরা বাঙালি দূর, ভারতীয়ই তো নয়। দিনের শুরুতেও এরা মুসলমান, দিনের শেষেও। শুধু মাঝখানে এদের কেউ কেউ সময় বুঝে বুঝে বিশেষ উদ্দেশ্যে দেশকে বিব্রত করার জন্য, দুর্বল করার জন্য তাকিয়া বাজী করে কখনো বাঙালি সেজে বাঙালি জাত্যাভিমানে সুড়সুড়ি দেয় , কখনো দলিত সেজে দলিত আন্দোলনে , কখনো কৃষক সেজে কৃষক আন্দোলনে এমনকি কখনো আদিবাসীদের সঙ্গে মিশে আন্দোলনে সামিল হয়ে যায়। 

এদের নবী পুরো দুনিয়ার মানুষকে পরিষ্কার দু'ভাগে ভাগ করে রেখেছে । ইসলাম বিশ্বাসী অর্থাৎ মুমিন আর ইসলামে অবিশ্বাসী অর্থাৎ কাফের - আর কিচ্ছু নেই। কাফের কাফেরই, ভারতীয় হোক আর মায়ানমারী, বাঙালি হোক আর অবাঙালী, ব্রাহ্মণ - দলিত, উচ্চবর্ণ - নিম্ন বর্ণ, কংগ্রেস - সিপিএম - তৃণমূল - বিজেপি, হিন্দুত্ববাদী - সেকুলার - নাস্তিক, কোন  পার্থক্য নেই, কাফের কাফেরই । যে'ই হোক, প্রত্যেক কাফেরের গলা কর্তণ যোগ্য, কাফেরদের সম্পত্তি গণিমতের মাল, এমনকি এদের ঘরের মহিলারাও গনিমতের মাল হিসেবে ধর্ষণ যোগ্যই । বাঙালি হলেও ওদের পবিত্র গ্রন্থের ৯/৫ আয়াত এবং ৩/২৮ আয়াত দুটি আমাদের উপর প্রয়োগে কোন বাধা নেই। 

ধরুন, রাখাইন প্রদেশকে মুসলিম রোহিঙ্গাদের হাতে তুলে দেওয়া হল। সেই ইসলামিক রাখাইনে কি ঠাঁই হবে হিন্দু রোহিঙ্গাদের, বাঙালি হিসেবে? ঠাঁই হবে বৌদ্ধদের? আজাদ কাশ্মীরে কাশ্মীরী পন্ডিতদের বা বৌদ্ধদের , কাশ্মীরি হিসেবে? বাঙালির আত্মত্যাগে বাঙালির জন্য সৃষ্ট বাংলাদেশে ঠাঁই হয়েছে হিন্দুদের, বাঙালি হিসাবে? এদেশের মুসলমানরা তো আর আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলি সহ সারা পৃথিবীর মুসলমানদের থেকে স্বাদে গন্ধে বর্ণে আলাদা কিছু নয় । আর বাকি দশটা মুসলিম প্রধান রাষ্ট্রের মতোই প্রস্তাবিত এই সংযুক্ত বাংলাও ইসলামিক রাষ্ট্রই হবে, সেখানেও কোনমতেই ঠাঁই হবে না হিন্দুদের। সেই বাংলাস্তান হবে না বাঙালির, সেটা হবে শুধুই মুসলমানদের। বুঝতে হবে সহী মুসলমানদের কাছে ধর্ম সবার উপরে, এর কাছে জাতি, দেশ, সংস্কৃতি - সব তুচ্ছ। 

বাংলাভাষী বলেই মুসলমানদের কি বাঙালি বলা যায়? ইংরেজিতে কথা বললেই বুঝি সবাই ব্রিটিশ হয়ে যায়?  নামেই তো এরা সবাই আরবী, এসব পাল্টে আগে নিজেদের বাঙালি নাম রাখা শুরু হোক। হিন্দু মুসলমান মিলে যে বাঙালি জাতি ছিল, এর একটা বড় যেখানে সুদূর আরবের সংস্কৃতি আপন করে নিয়েছে, বাকি থাকা হিন্দু বাঙালিদের বাঙালি সত্তা যেখানে ঐ অংশের বর্বরতা থেকে রক্ষা করতে পারে নি, পারছে না - সেখানে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই তো আমাদের হিন্দু সত্তাকে আপন করে নিতে হবে। নাহলে বর্বর আরব সাম্রাজ্যবাদের শিকার হতে হবে।

এরাজ্যে বসবাস কারী ৩১ % মুসলমানও তো বাংলাভাষী । এরা ধর্মীয় কারণে সুদূর আরবের সংস্কৃতির(?) সঙ্গে যতটুকু একাত্মতা বোধ করে, এর ছিঁটে ফোঁটাও এদেশ তো দূর, বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গেই করে না। এরা তো নামে, পোষাকে, ভাষায়, আচরণে ও আদব কায়দায়, সবকিছুতেই আরবীয় সংস্কৃতি শুুুধু যে নিজেরা আপন করে নিয়েছে, তা নয়, অন্যদের উপর চাপিয়েও দিচ্ছে ।

স্বাধীনতা আন্দোলনের কথাই ধরুন। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এদের বিশেষ কোন ভূমিকাই তো ছিল না, যেটুকু ছিল সেটাও কিন্তু এ দেশের দিকে চেয়ে নয়,  ব্রিটিশ সরকারের কবল থেকে মুক্ত করে এদেশকে তখনকার ইসলামী দুনিয়ার মালিক তুরস্কের খলিফার নিয়ন্ত্রণে আনাই ছিল উদ্দেশ্য - খিলাফত আন্দোলন।

এদেশের প্রত্যেকটা জাতির নিজস্ব লোকাচার লোকসংস্কৃতি আছে, আছে বিভিন্ন ঋতু ভিত্তিক উৎসব পার্বণ। প্রত্যেকটা জাতির আছে স্বকীয় বৈশিষ্ট্য, পোষাক পরিচ্ছদ। বাঙালিরও আছে, যা হিন্দু হিসাবে আমাদের পালন করতে কোন অসুবিধা হচ্ছে না । নববর্ষ, পৌষ পার্বণের আলপনা, ধামাইল জারি সারি, নবান্ন। আমার হিন্দুত্ব কি আমাকে বাধা দিচ্ছে নববর্ষ পালনে, অহমিয়াদের বিহুতে, ত্রিপুরীদের হজাগিরি বা তামিলদের ভারত নাট্যম নাচতে? এখন পর্যন্ত কিছু 'অসহী' মুসলমান পালন করলেও 'সহী' ইসলাম কিন্তু বাঙালিকে বাধা দিচ্ছে নববর্ষ পালনে, আমি অন্তত আসামবাসী কোন মুসলমানকে দেখি নি বিহুতে নাচতে। তাছাড়া ইসলামে যে সবই হারাম। নাচ গান, যুদ্ধে উপযোগী তীরন্দাজি, ঘোড় দৌড় সহ মাত্র তিনটি খেলা বাদে সব ধরনের খেলা, ছবি আঁকা, যেকোনো রকম বিনোদন - সবই যে হারাম ! শুধু সারা বিশ্বে ইসলাম কায়েমে জেহাদ কর, বিধর্মীদের সম্পত্তি গণিমতের মাল হিসাবে (যার মধ্যে বিধর্মী নারীরাও আছে) লুট করে দখল কর, পুরষ্কার হিসেবে পরকালের জন্নত, নয়তো দোজখের আগুনের চিন্তা কর আর সৃষ্টি কর্তাকে ভয় কর - এছাড়া যে আর কিছু নেই। তাহলে কি ইসলাম সম্পূর্ণ কায়েম হলে মননশীল সংস্কৃতি মনষ্ক বলে পরিচিত বাঙালির জগতও জেহাদ যৌনতা আর জন্নত - এই তিনটি শব্দেই আবর্তিত হবে?   

হিন্দু প্রধান এই বাংলায় হিন্দু ধর্ম বা হিন্দু দেবী নিয়ে অশ্লীল কথা লিখেই এবং সেই বই হিন্দু বাঙালিরা কিনে পড়েছে বলেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। অথচ নবী বা আয়েশা নিয়ে কোন অশ্লীল কথা নয়, স্রেফ ধর্ম হীনতা প্রকাশ করেই মুসলিম প্রধান ঐ বাংলায় চাপাতির কোপ খেতে হয় হুমায়ুন আজাদদের। দুটোই তো বাংলা - তাই না? কিন্তু বাঙালি মানসিকতা আর বাঙলা ভাষীদের মানসিকতা কি এক? বাঙালি আর বাংলাভাষী কি এক? 

বাংলাভাষী একজন মুসলমানকে(নারী বা পুরুষ) পোষাক পরিচ্ছদ, হুলিয়া বা আচার আচরণে একজন গুজরাতি বা মারাঠী মুসলমান, এমনকি সুদূর আরব, পাকিস্তান বা ইরাকের মুসলমান থেকে চট করে আলাদা করতে না পারলেও একজন ভারতীয় বা নিজের ভাষিক গোষ্ঠী বাঙালি থেকে খুব সহজেই আলাদা করা যায়। ঐ যে বললাম, এরা কেউ বাঙালি না, বিহারী না, এমনকি ভারতীয়ই না। সারা পৃথিবীর মুসলমানের একটাই পরিচয়, এরা শুধুই মুসলমান, এরা বাঙালি হয় কি করে? বাঙালিদের সঙ্গে বাংলাভাষী এ কাদের নিয়ে এই সেকু মাকুরা অবিভক্ত বাংলার স্বপ্ন দেখছে, অন্যদের দেখাচ্ছে ? সব জেনেও আল তাকিয়া পালন করা ইসলাম পন্থীদের সঙ্গে সুর মেলাচ্ছে কি উদ্দেশ্যে ?

পানি আর জল শব্দটাকে নাড়াচাড়া করুন, দুটি সম্প্রদায়ের পার্থক্য বেরিয়ে আসবে। পানি অশুদ্ধ না হলেও বাংলা কিন্তু জল। এদেশের বাঙালি হিন্দুরা স্বাভাবিক ভাবেই জল বলে, কিন্তু বাংলাভাষী মুসলমানরা ধর্মীয় সত্তার প্রাবল্যের কারণেই মুসলমানত্ব জাহির করতে, নিজেদের আলাদা করে রাখতে কিছুতেই জল বলবে না। অথচ বাংলাদেশের হিন্দুরা কিন্তু সেদেশের সংখ্যাগুরু মুসলমানদের সঙ্গে মিশে থাকার চেষ্টায় স্বকীয়তা বিসর্জন দিয়ে জল না বলে পানিই বলে। গোসল বলে, নাস্তা বলে, দাওয়াত বলে, সংখ্যাগুরুদের সঙ্গে মিশে থাকতে চেয়ে । মুসলিম প্রধান পাকিস্তানের জাতীয় দলে স্থান পেয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করা দানীশ কানেরিয়াকে কথায় কথায় বলতে শুনেছি ইনশাল্লাহ! পাকিস্তানে মরু তীর্থ হিংলাজের পুরোহিতদের দেখেছি ফেজ টুপি পরতে। এই হল মানসিকতার পার্থক্য । এইভাবে ওই সব দেশে টিঁকে থাকার জন্য মিশে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে একসময় টিঁকে থাকার লড়াইয়ে হেরে গিয়ে বিলুপ্ত হয়ে যায় হিন্দুরা । আর হিন্দু প্রধান দেশে মুসলমানরা নিজেদের সংস্কৃতি অন্যদের উপর চাপাতে চাপাতে একসময় হয়ে যায় নিয়ন্ত্রক।

বাংলায় হিন্দির আগ্রাসনের চিন্তায় যাদের ঘুম উবে যায়, উর্দুর আগ্রাসনে তাদের কিন্তু কোন আপত্তি নেই। কারণ বামপন্থীরা তো আসলে ইসলামেরই গর্ভস্রাব! বাঙালি হয়ে পান গুটখা বা রামনবমী, গণেশ চতুর্দশী এসব পালন যাদের আগ্রাসন বলে মনে হয়, তাদের কাছে জানতে ইচ্ছে করে - এসব তো আমাদের অঞ্চলের না হলেও, আমাদের দেশের। কিন্তু ঈদ, কুরবানী, মহরম, রোজা, ইফতার - কোনটা আমার দেশের? এ অঞ্চলের যারা সুদূর আরবের সংস্কৃতি যারা আপন করে নিয়েছে, সেটা কী?

মাত্র একত্রিশ শতাংশেই ঊন সত্তর শতাংশ সংখ্যাগুরুদের যা অবস্থা, দুই বাংলা মিলিয়ে ৩১ শতাংশ হিন্দু আর প্রায় ৬৯ শতাংশ শান্তি ধর্মী (যা দিনে দিনে অতি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে) - এবার কল্পনা করুন প্রস্তাবিত সেই বাংলায় হিন্দুদের অবস্থা ! মুসলমানরা সংখ্যাগুরু হলে, এদের হাতে শাসন ক্ষমতা থাকলে হিন্দু বা অন্য সংখ্যালঘুদের কী অবস্থা হয়, তা কি আমরা একই দেশ ভেঙ্গে সৃষ্টি হওয়া আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলিতে দেখতে পাচ্ছি না? সুরাবর্দীর অবিচ্ছিন্ন বাংলায় প্রত্যক্ষ করি নি, এই হিন্দু প্রধান ভারতেই কাশ্মীরে দেখি নি ? প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে কিভাবে হত্যা লীলা চালাতে হয়?

অনেকে বলছেন, দুই বাংলা মিলিয়ে হিন্দুদের সংখ্যা তো কম হবে না, তাই হিন্দুদের প্রভাবও থাকবে । কিন্তু বর্তমানে হিন্দু শূন্য পাকিস্তানেও কি একসময় হিন্দু কম ছিল? কর্পূরের মতো কোথায় উবে গেল ওরা? বাংলাদেশে কত শতাংশ ছিল? আটাশ শতাংশ সংখ্যালঘুকে কিভাবে ধীরে ধীরে সাত শতাংশ থেকে আস্তে আস্তে শূন্যে নিয়ে আসতে হয়, এটা মুসলমানদের চেয়ে আর ভালো কারা জানে ! কোথায় এখন কাশ্মীরের চার লক্ষ হিন্দু? এথনিক ক্লিনজিং এরা খুব ভালো পারে।

বাদ দিন সংখ্যা ! ভোট ব্যাংকের ঘনত্ব এবং মানসিকতার সুস্পষ্ট পার্থক্য এতটাই বেশি যে, বর্তমানের ঊন সত্তর শতাংশের অস্তিত্ব বিপন্ন করে একত্রিশ শতাংশের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে রাজ্যটাকে, বলতে গেলে ওরাই তো চালাচ্ছে। আর তখন ত্রিশ শতাংশকে কে পুঁছবে? স্বাভাবিক ভাবেই ঊন সত্তর শতাংশের মানসিকতাই চালিত করবে যে কোন সরকারকে, আর সেই ঊন সত্তর শতাংশের মধ্যে ঊনসত্তর দশমিক নয় নয় শতাংশের মানসিকতা কি, সে আমরা জানি । এই মানসিকতার হদিশ সবচেয়ে বেশি ভালো জানে ভোট বাবুরা অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলি। এদেরই সবচেয়ে বেশি মানুষের মন বুঝে চলতে হয় । তাই বাংলাদেশ পাকিস্তানের মতো মুসলিম প্রধান দেশে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িক মানসিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়েই শাসক, বিরোধী - সবকটি রাজনৈতিক দলকেই করতে হয় ইসলাম বন্দনা, জাহির করতে হয় বিধর্মী তথা কাফের বিদ্বেষ। আর হিন্দু প্রধান এই দেশে সব রাজনৈতিক দল, এমনকি বিজেপির মত হিন্দুত্ববাদী দলকেও করতে হয় মুসলিম তোষণ, বন্দনা করতে হয় ধর্ম নিরপেক্ষতার। ভোট বাবুরা জানে হিন্দু প্রধান দেশে এই নির্লজ্জ মুসলিম তোষণ বা ধর্ম নিরপেক্ষতার বুলি হিন্দুদের মনে কোন বিরূপ প্রভাব ফেলবে না, কারণ হিন্দুরা অসাম্প্রদায়িক মানসিকতার । তাই হিন্দু প্রধান এই দেশ হোক, আর মুসলিম প্রধান দেশ - সবখানেই হয় মুসলিম তোষণ। 

একত্রিশ শতাংশের তোষনেই তো এই বাংলা প্রায় বাংলাস্তান। এই বাংলার 'কাশ্মীর' হওয়া আর এরাজ্যের বাঙালির পরিণতি 'কাশ্মীরী পন্ডিত' দের মতো হওয়া তো মনে হয় শুধুই সময়ের অপেক্ষা। সত্যি করে বলুন তো, এই হিন্দু সংখ্যাগুরু ভারতেই, হিন্দু সংখ্যাগুরু রাজ্যেই কি আমাদের ঐ টুপিধারীদের সমীহ করে চলতে হয় না? এমনকি প্রশাসনকে পর্যন্ত? আর ঊন সত্তর শতাংশ মুসলমানের বাংলায়? তখন কি বাংলার বাংলাদেশ পাকিস্তান হয়ে ইরাক সিরিয়া না হওয়ার কোন কারণ থাকবে? এদেশের মুসলমানরা কি বাংলাদেশ পাকিস্তান বা পৃথিবীর অন্যান্য মুসলমান থেকে মানসিকতায় আলাদা কিছু? 

আসলে পত্র পত্রিকায় যে দেখি, জেএমবি যে গ্রেটার বাংলাদেশ বা ইসলামিক বাংলাস্তান গঠনের চক্রান্ত করছে, এগুলি সেই চক্রান্তেরই অংশ নয় তো? দেশদ্রোহী বামপন্থী আর ইসলাম পন্থীদের এ সম্মিলিত প্রয়াস নয় তো? এরা কি চাইছে, ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই বাংলার ঐ ইসলামিক বাংলাদেশে যোগদান, যাতে ' দার উল ইসলাম' এর ক্ষেত্রটা, হিন্দুদের উপর মুসলমানদের অত্যাচারের ক্ষেত্রটা আরো প্রসারিত করা যায়? নাহলে বাংলাদেশে মুসলমানদের হাতে হিন্দু নির্যাতনের নিত্য নৈমত্তিক ঘটনা গুলি জেনেও, হিন্দুদের দুরবস্থা দেখেও ইসলাম পন্থীদের সঙ্গে মিলে এই বাংলাকে ঐ বাংলার সঙ্গে মিশিয়ে এই বাংলার হিন্দুদেরও একই অবস্থায় ঠেলে দেওয়ার মতো হিন্দু বিরোধী এবং দেশবিরোধী চক্রান্তে সামিল হচ্ছে কেন? 

এসব আর কিছুই না, এগুলি হল বাঙালি সেন্টিমিটারে সুড়সুড়ি দিয়ে ইসলামিক বাংলাস্তানের গঠনের উদ্দেশ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদকে, প্রাদেশিকতাকে উস্কে দেওয়ার চেষ্টা। বামেরা এমনিতে কিন্তু বিশ্ব মানব, দেশের সীমানা, কাঁটাতারের বেড়া এদের চিন্তা ভাবনাকে আটকে রাখতে পারে না। কিন্তু সুযোগ বুঝে নিখাদ বাঙালি সত্তা এদের জেগে ওঠে। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, জন্ম লগ্ন থেকেই যা কিছু এদেশ বিরোধী, যা কিছু হিন্দু বিরোধী এবং যা কিছু ইসলাম স্বার্থ সংশ্লিষ্ট - সেটাই এদের বড় প্রিয় । আর রক্ত ঋণ তো আছেই । দেশভাগের সময় ধর্ম হীন হয়েও মুসলমানদের জন্য আলাদা ধর্মীয় রাষ্ট্রের সমর্থন, বর্তমানে হিন্দু ও বৌদ্ধহীন শুধু মুসলমানদের জন্য ইসলামিক কাশ্মীরের দাবিকে স্বাধীনতা আন্দোলন বা হিন্দু বা বৌদ্ধরা কাশ্মীরী হয়েও এতে সামিল না হলেও কাশ্মীরী দের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আখ্যা দিয়ে এই বিচ্ছিন্নতাবাদকে সমর্থনের মতোই এখন ইসলামিক বাংলাস্তানের চক্রান্তকে সামনে রেখে দেশদ্রোহী বামেরা চক্রান্ত শুরু দিয়েছে। এরা কিন্তু ভুলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের, তিব্বত বা তাইওয়ানীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দাবি করে না। এমনকি উইঘুরদ বা চেচেনদের‌ও না। কারণ শুধু মুসলিম স্বার্থ সংশ্লিষ্ট হলেও তো হবে না, সঙ্গে ভারতের 'টুকরে টুকরে' হওয়ার ব্যাপারটাও যে থাকতে হবে।

মনে রাখবেন, হিন্দু রাষ্ট্র থাকা কালীন সময়ের হিন্দু প্রধান রাষ্ট্র সাম্প্রদায়িক নেপালও তথাকথিত ধর্ম নিরপেক্ষ মানসিকতার বলে প্রচারিত মুসলিম প্রধান বাংলাদেশের থেকে অনেক বেশি অসাম্প্রদায়িক ছিল । আর মুসলিম প্রধান ইসলামিক রাষ্ট্র পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা সহী ইসলামিক রাষ্ট্র পূণ্যভুমি সৌদির তুলনায়...?

আসুন, সমস্বরে গাইতে থাকি -

"মোদের গরব মোদের আশা 
আরবী মিশ্রিত বাংলা ভাষা"! 

(ছবি গুগল থেকে প্রাপ্ত)

কোন মন্তব্য নেই:

হেলানো টাওয়ার আর টেলিস্কোপ।। কে এম হাসান

(ছবি: Palazzo Vecchio,Uffizi Gallery, Exterior,Galileo Sculpture,Florence) বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে -১৫ ফেব্রুয়ারী গ্যালিলিওর জন্মদিনে ...