শুক্রবার, ৯ জুন, ২০১৭

বারুদের উপর বাংলাদেশ || মঞ্জুরুল হক


তাজা বারুদের উপর বসে আছে বাংলাদেশ। সেই বারুদে যে কোনো সময় একটি অগ্নিস্ফূলিঙ্গ মুহূর্তে দাবানল সৃষ্টি করতে পারে। ষাটেঁর দশকে, সত্তরের দশকে যে দাবানল নিপীড়িত মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে সৃষ্টি হয়েছিল, আজ প্রতিক্রিয়াশীলের দাবানল মানুষের মুক্তির আকাঙ্খাকে পদদলিত করতে চাইছে।রাষ্ট্রবিজ্ঞান সম্পর্কে ন্যুনতম ধারণা আছে এমন যে কেউ বলবেন বাংলাদেশ তার জন্মের পর থেকে ধীরে ধীরে যেভাবে মুক্তিকামী জনগণের লড়ে পাওয়া দেশ থেকে ধর্মাশ্রয়ী দেশ হয়ে উঠছে। গত পয়তাল্লিশ বছরের সর্বশেষ সময়, এই গত এক দশকে সেই র‌্যাডিকালাইজেশনের হার মারাত্মকভাবে উর্ধ্বগামী। বিশেষ করে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ তকমাধারী আওয়ামী লীগের আট বছরে র‌্যাডিকালাইজেশন এবং পশ্চাদপদতা রীতিমত চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়েছে। এখন আর বিভিন্ন উপসর্গ, উদাহরণ কিংবা টুকরো-টাকরা ঘটনার বিবরণ দিয়ে প্রমাণ করতে হয়না যে দেশটি ধর্মীয় মৌলবাদের খপ্পরে চলে গেছে। ব্যাপারটা এখন সরকারের তরফে ঘোষণা দিয়েই হয়ে উঠেছে। দেশটির রাষ্ট্রকাঠামো, নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ, সামাজিক বিন্যাস, পররাষ্ট্রনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, শিল্প-সাহিত্য, কৃষ্টি-কালচার, আচার-আচরণ, বিধিনিষেধ, নিষেধাজ্ঞাসহ প্রত্যেকটি দিক দিয়েই দেশটি কুড়ি বছর আগের আফগানিস্তান হওয়ার জন্য যেন মরিয়া! 

১৯৯১ এর পর থেকে যে তথাকথিত গণতন্ত্র কায়েমের অন্তঃসারশূণ্য আশ্বাস দেয়া হয়েছে তা-ই এখন নির্ভেজাল বুলিবাকিশতায় পর্যবেশিত হয়েছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নিয়ম অনুযায়ী অজনপ্রিয় অযোগ্য শাসকরা শেষ আশ্রয় হিসেবে ধর্মকে আঁকড়ে ধরে। জিয়া যেমন বাকশালী তথাকথিত সমাজতন্ত্রকে ওভারটেক করার জন্য ‘বিসমিল্লাহ’ নামক স্পর্শকাতর ধর্মীয় বাণী সংবিধানে আরোপ করেছিলেন, তেমনিভাবে এরশাদও দখল করা ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য সেই চিরচেনা ধর্মীয় স্পর্শকাতর টার্মগুলো ব্যবহার করেন। তিনি সংবিধান সংশোধন করে বাংলাদেশে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ নামে এক অভূতপূর্ব বিশেষণ যোগ করেন। এই অঞ্চলের সামন্ত কালচারে লালিত ধর্মভীরু মানুষ এই সংযোজনকে আর্শীবাদরূপে গ্রহণ করে। আর তাতেই প্রচন্ড অজনপ্রিয় হওয়ার পরও দীর্ঘ নয়টি বছর এরশাদ ক্ষমতাসীন থাকতে পারেন।

আওয়ামী লীগ দেশবাসীকে এইমর্মে আশ্বস্ত করে যে তাদেরকে যতই ‘ভারতের দালাল’, ‘হিন্দুর দালাল’, ‘ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ধর্মবিরোধী’ বলা হোক না কেন, তারা আদতে ওইসব বলনেঅলাদের চেয়েও বেশি পরহেজগার মুসলমান! এটা প্রমাণের জন্য শেখ হাসিনা যেমন তার গেটআপ পরিবর্তন করেন, তেমনি তাদের কোনো কোনো মন্ত্রি রাতারাতি মাথায় টুপি চাপিয়ে ইসলামদরদী বনে যান। আওয়ামী লীগ একের পর এক প্রতিষ্ঠান এবং স্থাপনার ইসলামী নামকরণ করতে থাকে। এতে করে দুদিক থেকে ফায়দা। এক. বিএনপি-জামাতের চেয়েও তারা বেশি ধর্মপ্রাণ সেটা প্রমাণ করা। দুই. প্রতিষ্ঠান আর স্থাপনাগুলোর নাম দেশের বিশিষ্ট ইসলামী পীর-বুজর্গদের নামে নামকরণ হওয়ায় আপামর ধর্মপ্রাণ মানুষও তাদেরকে ধর্মনিরপেক্ষ না ভেবে ধর্মপ্রাণ মুসলিমই ভাবেন। আর এটাই আওয়ামী লীগের কাঙ্খিত ছিল। আওয়ামী লীগ যে ঘোষিত ইসলামী দল জামাতে ইসলামী আর নিজেদের ‘ইসলামের ঠিকাদার’ ভাবা বিএনপি’র চেয়েও বেশি ইসলামপ্রিয় এবং ধর্মপ্রাণ সেটা প্রমাণিত! ইসলামীকরণ শেষ হলে শুরু করে ইসলামবিরোধী মূর্তি/ভাস্কর্য ভাঙ্গা, স্থানান্তরিত করণ।

তার পরও আওয়ামী লীগ জনরোষে ভীত হয়ে ‘পকেট সাপোর্টার’ হিসেবে হেফাজতে তোষণ করছে। তাদের আশা তাদের বিরুদ্ধে জনরোষ বিএনপিকে আবার ক্ষমতায় আনতে চাইলে এই হেফাজতসহ অন্যান্য ধর্মভিত্তিক দল তা ঠেকাবে! তারা যে বোকার স্বর্গে বাস করছেন সেটা গলায় সাপ বেঁধে বললেও বিশ্বাস করবে না। সেটা আমাদের দায়িত্বও না।

তাহলে আগামীতে কী ঘটতে চলেছে? কোনো রকম অলঙ্করণ ছাড়া নির্মোহ বললে- ভোট লীগের অধীনে হোক বা নিরপেক্ষ(!) লীগের জিতে আসার সুযোগ ক্ষীণ। বিএনপি এখনই জামাতকে ছাড়লে তাদের জোটে লীগবিরোধী বামরা যোগ দেবে। জামাত না ছাড়লে বিএনপি-জামাত ক্ষমতায় এসে লীগকে যা-ই করুক, তার চেয়ে বড় কথা লীগ যেভাবে ধর্মকার্ড খেলছে, বিএনপিও তাই করবে। বরং একটু বেশিই করবে। এরশাদ বা কথিত মিলিটারি ব্যাকড কোনো সুশীল গোষ্ঠি আসলেও ওই একই পরিণতি। হেফাজতের লোকারণ্যে যে ভীতি, খাতির, গুণে চলার রেওয়াজ চালু হয়েছে তা ওভারকাম করার সাহস, সামর্থ কারো নেই। বামপন্থীদের গণঅভ্যুত্থান? তাতেও মুক্তি নেই। সংশোধনবাদী নির্বাচনপন্থী বামরাও প্রকারন্তরে ধর্মাশ্রয়ী। তার উপর ক্ষয়িষ্ণু হওয়ায় তাদের পক্ষে কোনো কিছুই সম্ভব নয়। বল প্রয়োগে ক্ষমতা দখলের কমিউনিস্টগণ স্বাধীনভাবে লীগ বিরোধীতা করতে পারেন না। তাদেরকে বিএনপি-জামাত এবং হেফাজতের কোলে বসেই তা করতে হয়। এক সময় তাদের সাথে পার্থক্য কমতে কমতে শূণ্যে নেমে যায়।

এই অবস্থায় দেশকে বাঁচাতে পারে একমাত্র মধ্যবিত্তের প্রগতিশীল অংশ এবং কৃষক-শ্রমিকের ঐক্যফ্রন্ট। বিপ্লবী পার্টির অধীনে কৃষক-শ্রমিকের গণঅভ্যুত্থান। সেটা কারা সংগঠিত করতে পারে, কবে পারবে সে প্রশ্নের উত্তর জানা নেই।

কোন মন্তব্য নেই:

হেলানো টাওয়ার আর টেলিস্কোপ।। কে এম হাসান

(ছবি: Palazzo Vecchio,Uffizi Gallery, Exterior,Galileo Sculpture,Florence) বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে -১৫ ফেব্রুয়ারী গ্যালিলিওর জন্মদিনে ...