শুক্রবার, ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮

শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় মৌলবাদের কালো ছায়া ঘনীভূত..... ।। অনাবিল সেনগুপ্ত


 "অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই – প্রীতি নেই – করুণার আলোড়ন নেই;
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।"

অসংলগ্নতার বহর:-
'বিমানের আবিষ্কারক রাইট ভ্রাতৃদ্বয়, এটি ঐতিহাসিক ভুল'। বিজেপি সরকারের মানবসম্পদ উন্নয়ন দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী সত্যপাল সিং দাবি করেছেন, 'বিমানের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় হিন্দু পুরাণ রামায়ণে'। ‘আর যদি বর্তমান যুগের কথা ধরা হয়, তাহলে বিমানের আবিষ্কারক হলেন শিবাকর বাবুজি তালপাঢ়ে!’
'রাইট ভাইয়েদের আট বছর আগেই বিমান আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন শিবাকর বাবুজি তালপাঢ়ে' ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্রদের একটি পুরষ্কার বিতরণী সভায় এক ভাষণে এ কথা বলেন সিং।
খোঁজ পড়ে গেছে কে এই তালপাঢ়ে, যিনি বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসে সম্পূর্ণ 'অজানা'ই রয়ে গেছেন! খুঁজে পাওয়া যায়নি এখনও। বিভিন্ন  বিজ্ঞান সম্মেলনেও চললো এই গুলগল্প!                                                    
       এতো গেল বিমানের প্রসঙ্গ। ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ঐতিহ্য যে কত মহান আর সুপ্রাচীন, তা বোঝতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালেই বলেছিলেন, প্রাচীন ভারতেও 'কসমেটিক সার্জারি'র প্রচলন ছিল। উদাহরণ হিসাবে মোদি তুলে ধরেছিলেন হিন্দুদের দেবতা গণেশের কথা। ‘আমরা ভগবান গণেশের পুজো করি। সেই সময়ে নিশ্চই এমন একজন প্লাস্টিক সার্জেন ছিলেন যিনি একটি হাতি মাথা একজন মানুষের শরীরে লাগিয়েছিলেন। তখন থেকেই প্লাস্টিক সার্জারির প্রচল হয়’- মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালের চিকিৎসকদের সামনে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, ভগবান শিব একটি হস্তিশাবকের মাথা একটি শিশুর দেহে জুড়ে দিয়ে ভগবান গণেশকে সৃষ্টি করেছিলেন।
                    চিকিৎসা বিজ্ঞানের ঘটনা থেকে আবারও ইঞ্জিনিয়ারিং এ ফেরত যাওয়া যাক। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রূপাণী একটি ইঞ্জিনিয়ারিং গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে হিন্দুদের ভগবান রামের ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যার উদাহরণ দিয়েছিলেন। হিন্দু পুরাণ রামায়ণে উল্লেখিত আছে, নিজের অপহৃত স্ত্রী সীতাকে শ্রীলঙ্কার দৈত্যরাজ রাবণের হাত থেকে যখন উদ্ধার করে আনতে গিয়েছিলেন, তখন লংকায় পৌঁছানোর জন্য তিনি সমুদ্রের ওপরে একটি সেতু নির্মাণ করেছিলেন। পক প্রণালী নামে পরিচিত ভারত মহাসাগরের যে সরু ও অগভীর অংশটি ভারতের দক্ষিণতম প্রান্ত আর শ্রীলঙ্কার মধ্যে আছে, তারই ওপরে ওই সেতু তৈরি হয়েছিল বলে অনেক হিন্দু ধর্মাবলম্বী এখনও বিশ্বাস করেন। পক প্রণালীর ওই অংশে কিছু পাথরের অবশেষ এখনও দেখা যায়। সেটিকেই সবাই রামের তৈরি সেতুর ভগ্নাবশেষ বলে মনে করে থাকেন। ‘চিন্তা করে দেখুন সেই কোন যুগে ভারত আর শ্রীলঙ্কার মধ্যে সেতু বানিয়েছিলেন ভগবান রামচন্দ্র! তার কাছে কী উন্নত মানের প্রকৌশলীরা ছিলেন সেযুগে। এখনও সেই সেতুর ভগ্নাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়’- বলেছিলেন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী।

ইঞ্জিনিয়ারিং আর চিকিৎসা বিজ্ঞান হলো, কিন্তু গরু কি না এসে পারে এই বিজ্ঞানমনস্কতার মধ্যে?

বি জে পি শাসিত রাজস্থানের শিক্ষা মন্ত্রী বাসুদেব দেবনানী জানুয়ারী মাসে বলেছিলেন, ‘গরুর বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব কতটা তা বুঝতে হবে। পৃথিবীতে গরুই একমাত্র প্রাণী, যারা অক্সিজেন প্রশ্বাস নেয়, আবার নিঃশ্বাস ছাড়ার সময়েও অক্সিজেনই ফিরিয়ে দেয় প্রকৃতিতে।’

বিজেপির নেতা-মন্ত্রীরা নিত্যনতুন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব দিচ্ছেন, তো বিচারপতিরাই বা বাদ যান কেন আর প্রজনন বিজ্ঞানই বা পিছিয়ে থাকবে কেন!
ময়ূরকে কেন জাতীয় পাখি হিসাবে ঘোষণা করা হবে না, কারণ  ময়ূর হচ্ছে একমাত্র ব্রহ্মচারী প্রাণী!  রাজস্থান হাইকোর্টের বিচারপতি মহেশ শর্মা সাংবাদিকদের ব্যাখ্যা করেছিলেন ময়ূরের প্রজনন প্রক্রিয়া সম্বন্ধে। একটি ময়ূরী গর্ভবতী হয় কীভাবে তাহলে? বিচারপতির যুক্তি, ময়ূর যখন তার চোখের জল ফেলে, ময়ূরী সেই অশ্রু পান করেই নাকি গর্ভবতী হয়ে পড়ে। সেজন্যই ময়ূরের ব্রহ্মচর্য কখনও ক্ষুন্ন হয় না, সে আজীবন কৌমার্য রক্ষা করতে সক্ষম হয়। এরকম এক ব্রহ্মচারী পাখিরই জাতীয় পাখির মর্যাদা পাওয়া উচিত ভারতে। বর্তমানে ভারতের জাতীয় প্রাণী বাঘ। তার বদলে গরুকে জাতীয় পশুর মর্যাদা দেয়ার পক্ষেও সওয়াল করেছিলেন ওই বিচারপতি। এই সবই তিনি অবশ্য আদালতের বাইরে, নিজের কর্মজীবনের শেষ দিনে, সাংবাদিকদের সামনে বলেছিলেন।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছিলেন ময়ূরের চোখের জল খেয়ে ফেলে ময়ূরী গর্ভবতী হয়ে পড়ার এই কল্পকাহিনী অনেক পুরনো। বহুদিন ধরেই এটা চলে আসছে। অন্য সব প্রাণীর মতোই শারীরিক মিলনের মাধ্যমেই যে 'ব্রহ্মচারী' ময়ূর কোনও ময়ূরীকে গর্ভবতী করে, সেটাই বিজ্ঞান।
ভারতে বিজেপিশাসিত অসমের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা ক্যানসারকে 'পাপের ফল' বলে মন্তব্য করায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন। সম্প্রতি
শিক্ষকদের নিয়োগপত্র প্রদান অনুষ্ঠানে হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেন, ‘এই যে অনেকের ক্যানসার হয়, কারো তরুণ সন্তান দুর্ঘটনায় অকালে মারা যায় এসবই হল পাপের ফল। এই জন্মে বা পূর্বজন্মে করা পাপের জন্যই এসব ঘটনা ঘটে। নিজে পাপ না করে থাকলেও বাবা-মা অথবা পরিবারের অন্য কেউ পাপ করলেও তার ফল সন্তানকে ভুগতে হতে পারে!’ অসম সরকার পরিচালিত ক্যানসার হাসপাতালের সুপার বি বি বোর ঠাকুর স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই বলে মন্তব্য করেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা অবশ্য তার সাফাইতে বলেছেন, ‘কর্মফল হিন্দুধর্মের সনাতন বিশ্বাস। তা থেকে বাঁচা যায় না! আমি কোনও নতুন কথা বলিনি। বলেছি, আমাদের সব কষ্টই কর্মফল। আগের জন্মের কর্মফল এ জন্মে ভোগ করতে হয়, এটাই হিন্দু বিশ্বাস। সেই সুপ্রাচীন দর্শনকেই তুলে ধরেছি মাত্র।’ হিমন্ত বলেন, ‘হিন্দু দর্শনের মূলেই রয়েছে কার্মিক দর্শন। আমি তা বদলে ফেলতে পারব না। হিন্দু হিসেবে সেই মতবাদই আমি মেনে চলব।’
আসামে সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা তুলে দিতে এটাই যথেষ্ট!
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হিন্দুত্ববাদী বিজেপি এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা ভারতের ইতিহাস এবং হিন্দু ধর্মীয় গ্রন্থ যে কত মহান ও বিজ্ঞান। আর বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান, পশু বিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং- সব কিছুতেই প্রাচীন ভারত যে বাকি পৃথিবীর থেকে অনেক এগিয়ে ছিল, সেটাই প্রমাণ করার চেষ্টা করে চলেছেন নানাভাবে।
 কিন্তু এই হিন্দুত্ববাদী বিজেপি এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ সুচতুরভাবে এড়িয়ে যায় বৈদিক সাহিত্যে ছ'টি শ্রেণীর নাস্তিকদের যথা - ১. মাধ্যমিক, ২. যোগাচার, ৩. সৌত্রান্তিক, ৪. বৈভাষিক, ৫. চার্বাক ও ৬. দিগম্বর।
সাংখ্য দর্শন,  মীমাংসা দর্শন, স্বভাববাদ, বৌদ্ধ মতবাদ এর কথা, কারণ তখন এরা সামাজিক এবং ধর্মীয় অন্ধত্বকে প্রশ্নবাণে জ্বরিত করে। সমাজের কুসংস্কার উপর প্রশ্ন উঠায়।
গণিতজ্ঞ আর্যভট্ট, বরাহমিহির, গুপ্তযুগের একজন চিকিৎসাবিজ্ঞানী ধন্বন্তরি, চরকের মেডিসিন বিষয়ক ‘চরক সংহিতা’, শল্যবিদ সুশ্রুত রচিত ‘সুশ্রুত সংহিতা’  থেকে রামমোহন বিদ্যাসাগর। যারা এই বিজ্ঞান তথা তৎকালীন যুক্তিবাদী চিন্তা ধারায় আমূল পরিবর্তন এবং উচ্চতায় নিয়ে যায়। এরাই সমাজের ধর্মীয় অভ্রান্ততা প্রশ্নচিহ্ন তোলে এবং সমাজে যুক্তির পথ দেখায়।  পৃথিবীতে নাস্তিক্যবাদের উপস্থাপন এবং প্রসারিত হয় এই ভারতেই।  যার ফলে বহু অত্যাচার  এবং অজ্ঞতার অন্তরালে রাখাবার চেষ্টা এখনো চালিয়ে যাচ্ছে ওইসব ধর্মীয় সংগঠন বা তল্পিতল্পাবাহকরা।
এর ফলে বিজ্ঞানের বা ইতিহাসে কতটা ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, তা এখনই বলা কঠিন, কারণ ওই সব মতামত বৈজ্ঞানিক মহলে মোটেই মান্যতা পাচ্ছে না, তবে সামাজিক মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে হাসির খোরাক হচ্ছে।  কিন্তু তলে তলে শাষকের আসনকে কাজে লাগিয়ে চলছে শিক্ষাব্যবস্থাকে অন্ধত্বের আস্তাকুরে পর্যবসিত করার প্রয়াস।
   
   "রাজা জানেন মগজ ধোলাই মন্ত্র,
খিদে পেটেও হাসছে প্রজা এটাই প্রজাতন্ত্র"

যতই কথার খোরাক থাকুক, ওই বক্তব্যই স্কুল থেকে কলেজের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্তি চলছে যাকে শিক্ষার গৈরিকীকরণ(কুসংস্কার আর ধর্মীয় অন্ধত্বের বোঝা) বলছে সমালোচকরা | ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে বিদেশী প্রভাব মুক্ত করে (হাস্যকর) দেশীয়(গৈরিকীকরণ) ইতিহাস লেখায় মন দিয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বা আর এস এস | শিক্ষায় ‘রামরাজত্ব’ আনার লক্ষ্যে স্কুলের পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ পড়তে চলেছেন নিউটন, গ্যালিলিও, পিথাগোরাস বা বাবর, আকবর, হুমায়ুন |
বিজেপি শাসিত রাজ্য রাজস্থান থেকে এই লক্ষ্যে কাজ শুরু করল আর এস এস | নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রে বিজেপি সরকার আসার পর থেকেই শিক্ষা ব্যবস্থায় হিন্দুত্বের প্রভাব বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিল তারা | রাজস্থানের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষামন্ত্রী এবং আর এস এস সদস্য বাসুদেব দেবনানী জানিয়েছেন, এখন থেকে ইতিহাস বইতে কেবলমাত্র জায়গা পাবেন নেতাজী, ভগত সিং, মাস্টারদা সূর্য সেন, রানা প্রতাপ, শিবাজী এঁদের মতো দেশীয় চরিত্র | আর বাদ পড়বেন বিদেশীরা | মন্ত্রীর বক্তব্য – ‘আমাদের সন্তানরা কেন আকবর দ্য গ্রেট পড়বে? কেন মহারানা প্রতাপ দ্য গ্রেট পড়বে না? আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরা চিরকাল বিদেশী শাসক, গণিতজ্ঞ ও বিজ্ঞানীদের অবদান পড়ে আসছে | আমি শিক্ষা দপ্তরের দায়িত্ব নেওয়ার পরই সব পাঠ্যপুস্তক থেকে বিদেশীদের অবদান বাদ দিয়ে নতুন করে ইতিহাস লেখার উদ্যোগ নিয়েছি |’
আর এস এস-এর এই পদক্ষেপ নিয়ে বিতর্কের তুমুল ঝড় উঠেছে দেশ জুড়ে | অন্যান্য কোনো রাজ্য এখনো এই জাতীয় কিছু না করলেও আশঙ্কার মেঘ ঘন হয়ে আসছে ক্রমশ | যদি শুধু বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতেই এ ব্যবস্থা চালু হয়ে যায়, তবে ভারতবর্ষের অর্ধেকের বেশি স্কুল পড়ুয়াই শিখবে এক নতুন ইতিহাস |
দেরি না করে রাজস্থানের পথ অনুসরণ করছে মহারাষ্ট্র।  রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ইতিহাস বিভাগের স্নাতকোত্তর শ্রেণির জন্য নির্ধারিত পুস্তকতালিকায় এমন একটি বইকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল, যাতে হলদিঘাটের যুদ্ধে মহারানা প্রতাপকে বিজয়ী এবং সম্রাট আকবরকে পরাজিত দেখানো হয়েছিল। এ বার মুঘল সাম্রাজ্যের কথা সম্পূর্ণ মুছে দিতে চলেছে মহারাষ্ট্র শিক্ষা পর্ষদ।
মুম্বই মিররের একটি রিপোর্টে জানা গিয়েছে পর্ষদের অন্তর্ভুক্ত স্কুলের সপ্তম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির বইয়ের সিলেবাসে মুঘল সাম্রাজ্যের কথাই মুছে দিতে চলেছে পর্ষদ। উল্লেখ থাকবে না কোনো মুঘল স্থাপত্যেরও। তার বদলে মরাঠা সম্রাট শিবাজিকে আরও বেশি করে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
বাজপেয়ীজীর সময়ে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মুরলী মনোহর যোশী যা শুরু (বৈদিক জ্যোতিষ শাস্ত্র (যা অন্ধ কুসংস্কার)কে বিজ্ঞান রূপে সিলেবাসে পা০ড়ানোর চেষ্টা বিফলে যায় যুক্তিবাদীদের চ্যালেঞ্জ এর সামনে) করেছিলেন, মোদীজীর সময়ে মন্ত্রকে এসেই স্মৃতি ইরানিও সেই পথে এগোচ্ছেন। মন্ত্রীর গদিতে বসেই স্মৃতি রামলাল, সুরেশ সোনি, কৃষ্ণগোপালদের মতো আর এস এস-র প্রথম সারির নেতাদের সঙ্গে বসেছেন, সঙ্ঘের শিক্ষা সংক্রান্ত সংগঠনগুলির সঙ্গে বৈঠক হয়েছে এবং তারা নির্দিষ্ট নির্দেশিকাও দিয়ে দিয়েছে মন্ত্রীকে। আর এস এস নেতারা স্কুল পাঠ্যবইয়ে যে ইতিহাস পড়ানো হয় তা ‘সংশোধন’ করে নিতে বলেছেন। হিন্দু সংস্কৃতি এবং হিন্দু রাষ্ট্রনায়কদের গৌরবগাঁথা বেশি বেশি করে পড়ানোর পরামর্শও দিয়েছেন সঙ্ঘ নেতারা। ইতোমধ্যেই ভারতীয় ইতিহাস গবেষণা পরিষদের মাথায় বসানো হয়েছে ওয়াই সুদর্শন রাওকে যিনি মহাকাব্য এবং ইতিহাসকে একই জিনিস বলে মনে করেন।
কেন্দ্রীয় মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপেই হয়তো খানিকটা ঠাহর করা যায়, বি জে পি সরকার কোন হাওয়ার সওয়ারি। শুরুতেই এই সরকার ভারতীয় শিক্ষা নীতি উদ্যোগ (বি এস এন এ) তৈরির অনুমোদন দিয়েছে। যেখানে জায়গা করে দেওয়া হয়েছে সঙ্ঘের শাখা সংগঠন, শিক্ষা সংস্কৃতি উত্থান ন্যাসের লোকজনকে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ‘ভারতীয়করণ’ করতে এরা ইতিহাস ‘সংশোধনের’ পরামর্শ দিয়েছেন। এর মাথায় বসানো হয়েছে দীনানাথ বাটরার মতো বিতর্কিত লোককে। সেই বাটরা যাঁর একের পর বইতে মহাকাব্য ও পৌরাণিক উদাহরণগুলিকে বাস্তব বলে প্রচার করা হয়েছে। শিক্ষাবিদ ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের আপত্তি অগ্রাহ্য করে মোদীর সময়কালে গুজরাটের স্কুলে সেই সব বই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সঙ্ঘ ঘনিষ্ঠ এই শিক্ষাবিদের পরামর্শেই মধ্য প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান স্কুল পাঠক্রম থেকে জীবন শৈলী শিক্ষাকে বাইরে রাখায় উদ্যোগী হয়েছেন।
একইভাবে গত কয়েক মাসে ভারতীয় ইতিহাস বদল ও শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্গঠনের জন্য বেশ কিছু প্রচেষ্টা হয়েছে, যেখানে এদেশের প্রধান সমস্যা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে সংখ্যালঘুদের। মুসলিম, খ্রীষ্টান ও পার্সী সকলকেই বহিরাগত হিসেবে দেখানো হচ্ছে। আর স্বাধীনতা সংগ্রামকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। বি জে পি-র আগের বারের শাসনকালেও এই একইভাবে এই সবই ধীরে ধীরে করা হয়েছিল জাতীয়তাবাদ ও জাতীয় গৌরবের নামে। মুরলী মনোহর যোশীর সেই লাগামছাড়া গৈরিকীকরণের পথেই এগোচ্ছেন স্মৃতি ইরানিও। সমালোচনা আন্দোলন প্রতিরোধ ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে বিস্তর,  কিন্তু বাঘের পিঠে সাওয়ারকে রুখছে না! পূর্বসূরি এন সি ই আর টি-র বইয়ে বদল থেকে শুরু করে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজ, এন সি ই আর টি এবং ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব হিস্টোরিক্যাল রিসার্চের স্বীকৃত শিক্ষা সংস্থায় বি জে পি, আর এস এস-র লোক ঢুকিয়েছিলেন। স্মৃতিও এসেই ক্লাস এইট, নাইন, টেনের পাঠক্রমে বেদ, উপনিষদসহ প্রাচীন হিন্দু গ্রন্থ ঢোকানোর তোড়জোর শুরু করেছেন। কেউ হয়তো বলতেই পারেন প্রাচীন গ্রন্থ পড়ানোর মধ্যে তো আর সাম্প্রদায়িকতা নেই। কিন্তু কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে তা পড়ানো হচ্ছে, জ্ঞানচর্চার জন্য যুক্তিবাদী চিন্তায় বস্তুনিষ্ঠ ভাবে নাকি জাতীয়তাবাদের বিকৃত ধারণা তৈরি জন্য প্রশ্ন সেখানেই।
২০০০সালের ১৯শে জানুয়ারি গুজরাট শিক্ষা দপ্তর একটা সরকারী নির্দেশে সমস্ত স্কুলে আর এস এ—এর মাসিক পত্রিকা ‘সাধনা’ রাখা বাধ্যতামূলক করে। ঠিক যেমনভাবে দীনানাথ বাটরা মতো লেখকের লেখা উগ্র জাতীয়তাবাদী, উদ্ভট চিন্তার বইগুলি সেরাজ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে পড়ানো বাধ্যতামূলক করা হয়। এমনকি গান্ধী-হত্যাকেও বৈধতা দেওয়া হচ্ছে গুজরাটের ইতিহাস বইয়ে।

এটাকে শিক্ষার গৈরিকীকরণ বলুন, বা শিক্ষার সাম্প্রদায়িকীকরণ অথবা শিক্ষার রাজনীতিকরণ যে নামেই উল্লেখ করুন মূল সত্যটা হলো যে কোনো ভাবে কচি মনেই ধর্মীয় মৌলবাদের গবেষণাগার গড়ে তোলো, নিরীহ মনে একটা উগ্র চিন্তা গেঁথে দাও। যা থেকে তৈরি হবে অর্ধ সত্য জানা, অর্ধ শিক্ষিত এক উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী প্রজন্ম তৈরি করা। এই বিপদের সামনে দাঁড়িয়ে দেশ।
ধর্মীয় মৌলবাদী সংঘ পরিবারের কাছে গৈরিকীকরণ হলো সেই দরকারকেই পূরণ করার একটি অন্যতম মাধ্যম। তাই বিজ্ঞান কংগ্রেস থেকে ইতিহাস সংসদ, গৈরিকীকরণের সুনামী আছড়ে পড়ছে বারবার। তবে গৈরিকীকরণের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্রটি অবশ্যই শিক্ষাক্ষেত্র। হিটলার একসময় বলেছিলেন “Let me control the school text books, 3rd reich will rule for the next 20 years without any internal threat.” ঠিক এই কারণেই শিক্ষাক্ষেত্রটি সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র গৈরিকীকরণের। এই গৈরিকীকরণ আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় এক মধ্যযুগীয় উল্লাসের মধ্যে। যার থেকে ফুটে বেরোয় সামন্ততান্ত্রিকতা। আর ঐ মধ্যযুগীয় উল্লাসের পেছেনেই থাকে শিক্ষার বেসরকারিকরণের চাল। কারণ শিক্ষায় ধর্মীয় মৌলবাদ  মানেই রাষ্ট্রের সাথে কর্পোরেট এর  চুক্তি। আর বেসরকারিকরণ ছাড়া বহুজাতিক কর্পোরেট গুলির মুনাফা বৃদ্ধির রাস্তা বন্ধ। তাই শিক্ষার বেসরকারিকরণ চলে গৈরিকীকরণের সাথে হাতে হাত ধরে।
গোটা দেশে ছড়াতে :-
বেনারস ইউনিভার্সিটি ২০১৫ সালেই  ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্রছাত্রীদের বেদ, পুরাণ, বৈদিক শাস্ত্র, ধর্মানুরাগ শেখানোর দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে সিলেবাসে ঢুকিয়েছে। সেই বেনারস ইউনিভার্সিটির ডিরেক্টরকে সিলেবাস কমিটির মাথায় রেখে এই সদ্য ঘোষণা করা হল,  এবার থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং-এর গোটা দেশের ছাত্রছাত্রীদের পড়তে হবে বেদ-পুরাণ। অল ইন্ডিয়া কাউন্সিল ফর টেকলিক্যাল এডুকেশন(এআইসিটিই)-র নতুন নির্দেশিকায় একথা উল্লেখ করা হয়েছে। গত ২৪শে জানুয়ারি'১৮ ওই নির্দেশিকা প্রকাশিত হয়েছে।
শুধু বেদ, পুরাণ, তর্কশাস্ত্রই নয়, এবার থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্রদের জানতে হবে সংবিধানও। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই এই পাঠ চালু হবে বলে জানা গিয়েছে। বাধ্যতামূলকভাবেই পড়ানো হবে এইসব বিষয়গুলি। মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকর জানিয়েছেন, ক্যারিকুলাম আপডেট ছাত্রছাত্রীদের অধিকার। তাই এইসব বিষয়ের মধ্যে ভারতীয় সংস্কৃতির ছোঁয়া থাকবে বলে জানা গিয়েছে। অর্থাৎ, পড়ানো হবে ভারতীয় দর্শন, যোগা, ভাষাবিদ্যা ইত্যাদি। এর ফলে ছাত্রছাত্রীদের জ্ঞান বাড়বে বলছে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রক। ভারতের ৩০০০-এরও বেশি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রত্যেক বছর ৭ লক্ষ ইঞ্জিনিয়ার পাশ করে। তবে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দেখা যায় মাত্র অর্ধেক চাকরি পাচ্ছে। এআইসিটিই-র ওই বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বেদ, পুরাণ ছাড়াও সিলেবাসে ‌যোগ হচ্ছে পরিবেশবিদ্যা, সংবিধান, ভারতীয় দর্শন, ভাষাবিদ্যার মতো বিষয়।
ইতিমধ্যে খড়গপুর আই আই টি-তে স্থাপত্যবিদ্যার পাঠ্যক্রমে বাস্তুশাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই ধরনের চিন্তাভাবনা বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের আরও পিছিয়ে দেবে বলেই মনে করছে অ্যাসোসিয়েশন অব স্টেট ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড টেকনিকাল অফিসার্স (অ্যাসেটো) ওয়েস্ট বেঙ্গল-এর নেতৃবৃন্দ। সংগঠনের বক্তব্য, বিজ্ঞানমনস্কতা, যুক্তি, ন্যায্যতা প্রমাণ, মুক্তচিন্তা ও আধুনিকতার ওপরে নামিয়ে আনা হচ্ছে পরিকল্পিত আক্রমণ। বিজ্ঞান ও অন্ধ বিশ্বাসের মধ্যে বিভাজন মুছে ফেলে দেশকে পুরোপুরি হিন্দুরাষ্ট্র বানানোর ছক চলছে। ইঞ্জিনিয়াররা বলছেন, বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে অন্ধ বিশ্বাসের বিষয়গুলিকেও ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে আগামী দিনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ছাত্রছাত্রীদের অগ্রগতি ও গবেষণায় ক্ষতি হবে।
মনেরাখা দরকার যেসব ছাত্রছাত্রী পড়বে সবাই প্রথাগত শিক্ষায় ১০+২ পাস করে, প্রফেশনাল কোর্সভিত্তিক (নির্দিষ্ট জীবিকাভিত্তিক) পড়াশোনা করেতে এসেছে! তাই খুবই বিপদজনক অভ্যাস তৈরি চেষ্টা হচ্ছে। এইসব প্রফেশনাল কোর্সে ওইসব অবৈজ্ঞানিকী বা মনোনিবেশ অন্যত্র নিয়ে গেলে, ভুলচর্চার অভ্যাস তৈরি করালে সমাজের সরাসরি ক্ষতিকারক বা বিপদজনক। কারণ নাগরিক সমাজের সমস্ত রকম পরিকাঠামো উন্নয়নে এরা সরাসরি যুক্ত। তাই জ্ঞান এখানে একমাত্র পেশাগত হওয়াই আবশ্যিক।  যেমন একজন চিকিৎসকের অজ্ঞানতায় বা ভুল চিকিৎসায়য় একজন রুগির মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তেমনি একজন ইঞ্জিনিয়ার এর অজ্ঞানতায় সরাসরি প্রাণনাশ অনেক গুণ বেশী হতে পারে। মনেপরে কলকাতার বড়বাজারের উড়ালপুল নির্মাণকাজ সময়ে ভেঙ্গে যাওয়ার ঘটনা, কারণ অনেক হতে পারে কিন্তু ভবিষৎকালে এটাই হবে নাতো!
 বর্তমানে ভারতের উৎপাদিত খাদ্যাপণ্য উন্নত দেশে রপ্তানি করা দায় (ভেজাল) মানদণ্ডে আটকে যায় বারবার ! এরপরে এই শিক্ষা ব্যবস্থা চললে দেশের ইঞ্জিনিয়ারদেরও উন্নত দেশগুলো বয়কট করবে ভেজাল ইঞ্জিনিয়ার তকমা দিয়ে।  যে কর্মসংস্থানের কথা বলা হচ্ছে, তাতে মগজধোলাইকৃত কিছু সস্তা শ্রমিক পওয়া যাবে!

সুস্থ মূল্যবোধ এবং যুক্তিবাদী বৈজ্ঞানিক শিক্ষার প্রসারে রাজ্যসরকার গুলো এগিয়ে আসবে আশাকরি।  ভারতের সংবিধানে শিক্ষাকে কেন্দ্র রাজ্য যৌথভাবে দেখাবার দায়িত্ব দিয়েছে। সেই অধিকার থেকে রাজ্যসরকার এই ধর্মীয় মৌলবাদী অবৈজ্ঞানিক কুসংস্কারগ্রস্থ শিক্ষার গৈরিকীকরণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।  শিক্ষায় স্থানীয় সংস্কৃতি ভাষা মূল্যবোধের অপরিসীম স্থান,  একে বাদ দিয়ে শিক্ষার পরিপূর্ণতা সম্ভব নয়। আর আমাদের ভারতীয় সংবিধানের ৪নং অনুচ্ছেদের 51/h "বৈজ্ঞানিক মানুসিকতার বিস্তার, মনুষ্যত্ব এবং সমাজে সত্যের খোঁজ"কে দেশের প্রত্যেকটি মানুষের সাংবিধানিক আবশ্যিক পালনীয় দায়িত্ব বা কর্তব্য দিয়েছে। তাই প্রত্যেক দেশবাসীর দায়িত্ব, এই অবৈজ্ঞানিক শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গর্জে উঠে আমাদের দেশের সংবিধানকেই সন্মান জানানোর, ধর্মনিরপেক্ষতার মৌলিক অধিকারকে সুরক্ষিত রাখবার । "শিক্ষা আনে চেতনা", চেতনাই পারে শাষকের মুখোশ খুলে দিতে।  কবি সাহিত্যিক নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর নিচের কবিতাটি  শেষকরি;
''বরং দ্বিমত হও,আস্থা রাখো দ্বিতীয় বিদ্যায়।
বরং বিক্ষত হও প্রশ্নের পাথরে।
বরং বুদ্ধির নখে শান দাও,প্রতিবাদ করো।
অন্তত আর যাই করো, সমস্ত কথায়
অনায়াসে সম্মতি দিও না।
কেননা, সমস্ত কথা যারা অনায়াসে মেনে নেয়,
তারা আর কিছুই করে না,
তারা আত্নবিনাশের পথ পরিস্কার করে।''
                                         
                                    ।।সমাপ্ত।।

শুক্রবার, ১৯ জানুয়ারী, ২০১৮

সাপে কাটায় বাংলা দ্বিতীয়


"সাত মাসে ২৩,৬৬৬ জন, সাপে কাটায় বাংলা দ্বিতীয়"

...... সংবাদ প্রতিদিন,  ১৯/১২/২০১৭
====================================

সুমিত্রা : সাপে কতজনকে কেটেছে তার পরিসংখ্যান পেয়েছি। কিন্তু সাপে কাটায় মৃত্যুর নিরিখে, পশ্চিমবঙ্গের স্থান ঠিক কোথায় তার পরিসংখ্যান নেই। এর সাথে আরো এক পরিসংখ্যান খুঁজবো। গত পাঁচ বছরে ঠিক কতজনকে সাপে কামড়েছে? তাহলে আলোচনায় আরো সুবিধা হয়। সাথে জানতে চাইব সাপ কেন ছোবল মারে? তাহলে এই আলোচনায় সাপেদের প্রতিও সুবিচার করতে পারব। সাপ তো আমাদের শত্রু নয়। 
আগে তো কাছাকাছি হাস্পাতালগুলিতে AVS রাখতে হবে। 
গরম পড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা কর্মসূচী নেওয়া যায়, গ্রামের দিকে জেলা হাসপাতালে কয়েকজন মিলে গিয়ে খোঁজ নেওয়া---- দাদা AVS দেওয়ার ব্যবস্থা আছে?.... তার সঙ্গে ওই পেপার CUTTING এর কপি দিয়ে জানিয়ে দেওয়া। আমরা সাপ নিয়ে সচেতনতা র কাজ করি।
এখন শুনলাম সরকার জেগে উঠেছে। তাহলে AVS রাখা এবং দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়ে যথাযোগ্য সাহায্য পাওয়া যেতে পারে।  সাপে কাটার কথা আছে, কিন্তু মৃত্যুর কথা লেখেনি।

অরিন্দম : ঠিক। কামড়ালে মৃত্যু হতে পারে, বাংলায় এমন সাপের শতকরা হিসাব কত। শুনেছি, দশ ভাগ বা তারও কম।

রাণা : তারপরেও বেশিরভাগ মৃত্যু ঘটে হার্ট ফেলিওরে অথবা ওঝা গুনীনদের কাছে সময় নষ্ট করে। এখানে সচেতনতা বৃদ্ধিও জরুরি।

অরিন্দম : ক্যানিং যুক্তিবাদী সংস্থা সাপ নিয়ে অনেক কাজ করত। এই বিষয়ে ওরা একটা বেশ মোটা বই বার করেছিল। ৫০০/- মতন দাম। শুনেছিলাম ওরা নাকি ফান্ডেড এনজিও। ঠিক জানিনা।
ঠিক।  রানা/ অনাবিল, পারলে একটু ছানবিন কর। হয়ত তোদের কাছে আছে এগুলো। সঠিক তথ্য হাতে থাকা জরুরি। প্রয়োজনে, আমার কিছু ডাক্তার বন্ধুদেরও সাহায্য নেব।

রাণা : 🤔🤔🤔🤔 আমার মনে হয় অন্য দিকেও আলোকপাত করতে পারি। জমি মাফিয়া ও সরকারের আগ্রাসী মনোভাবে সাপেদের স্বাভাবিক বাসস্থান কমে যাচ্ছে। ফলে মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে যে বিরোধের প্রক্রিয়া তাও তরান্বিত হচ্ছে। সাপের কামড় সেই প্রক্রিয়ারই অন্তর্গত। আমার মনে হয় সাপ নিরীহ ও বাস্তুতন্ত্র সহায়ক জীব। ভয় পেলে বা আক্রান্ত হলেই তারা আক্রমণ করে। সাপেদের স্বাভাবিক বাসস্থান বজায় রাখা বা প্রকৃতির ভারসাম্যকে স্থিতিশীল রাখাও আমাদের সচেতনতা প্রসারের অঙ্গ হতে পারে। সাপ আমাদের শত্রু নয়।

অরিন্দম : ঠিক। এটা একটা নতুন angle।

মৃণাল : নামটা খুব সম্ভবত দীপক মিত্র। সাপ নিয়ে সচেতনতার কাজ করেন। নিজস্ব সাপের ফার্ম আছে। প্রায় বছর 20 আগে রেডিওতে কলকাতা ক চ‍্যানেলে ওনার একটা সাক্ষাৎকার শুনেছিলাম। মূলত বৃষ্টি হয় এমন সব জায়গায় সাপের আধিক‍্য বেশী। সেই সুবাদে সাপের কামড়ে মৃত‍্যুও বেশী। যেমন- ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি। মজার কথা এটাই- আমাদের দেশে 80% এর বেশী সাপ নির্বিষ। আবার সাপে কাটার রোগীর 85% এর ও বেশী ভয় ও আতঙ্কজনিত কারনে মারা যায়। পৃথিবীতে বোধহয় দ্বিতীয় অন‍্য কোনো প্রনী নেই যার ক্ষেত্রে এমনটা ঘটে। শুধুমাত্র ভয়ের কারনে সাপ নিয়ে প্রচুর গল্পগাথা চালু আছে। প্রথমত এই কুসংষ্কারজনিত ভয় দুর করা জরুরি। সাপ সম্বন্ধীয় বিভিন্ন তথ‍্য সঠিকভাবে প্রচার করা জরুরী। যে কাজটা ক‍্যানিং যুক্তিবাদী সমিতি করে। দ্বিতীয়ত: সুমিত্রাদি যেটা বলল যে গ্ৰামীন হাসপাতালে গিয়ে AVS এর ব‍্যাপারে খোঁজ নেওয়া। আপাতত এটুকুই মাথায় আসছে।

অরিন্দম : দীপক মিত্রর স্নেক পার্ক ছিলো, মধ্যমগ্রামে বাদু বলে একটা জায়গায়। সম্ভবত এখন নেই।  এভিএস দেবার একটা বিশেষ পদ্ধতি আছে বলে শুনেছি। এই ট্রেনিং এর অভাবেও অনেক ডাক্তার এভিএস থাকলেও দেবার ঝুঁকি নিতে চায় না। এই নিয়ে কর্মশালাও হতে পারে। ডঃ অমিয় কুমার হাটি এই সংক্রান্ত ব্যাপারে একজন বিশেষজ্ঞ।

অনাবিল : বিভিন্ন বিজ্ঞান সংগঠন এবং যুক্তিবাদী সমিতির একটা লাগাতার প্রচার আছে। সংঙ্গে সরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র গুলো ব্যতিক্রম নাহলে ASV রাখা হচ্ছে।  সরকারের কিছু প্রচারের প্রয়াস আছে।  কিন্তু কিন্তু  কিন্তু দীর্ঘ কুসংস্কারের দাগ লেগে রয়েছে গ্রামবাংলায়।  সাপের কাটা রুগীর সাথে প্রথার নামে (যেটা ঝাড়ফুঁক হোক বা অন্যকিছু কিছু অবৈজ্ঞানিক) ব্যবস্থা নিচ্ছে আত্মীয় পরিজন (অনেক ক্ষেত্রে সব জানবার পরও) পরিস্থিতি ঘোরালো করে দিচ্ছে। এবং হাসপাতালে গেলেও রুগীরর মৃত্যু হচ্ছে। তখন আবার উনারা ছড়াচ্ছে সাপেকাটা রুগীরর বাঁচানোর ক্ষমতা নেই চিকিৎসক বা ব্যবস্থা নেই হাসপাতালের।।  
এখানে দুটি জিনিষ ঘটছে, ১)  একটা ইচ্ছা/অনিচ্ছা কৃত মৃত্যুর অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।,  ২) কুসংস্কারের ভীত অক্ষত রয়ে যাচ্ছে প্রথার রূপে।
আবার,  ১) প:ব: সরকার অন্য বিপর্যয় মৃত্যুর জন্য ২লক্ষ টাকাও দিচ্ছে সাপেকাটা রুগীদের পরিবারদের। শুধু পোষ্টমোর্ডাম রিপোর্টে হার্ট ফেল বা অন্য অবহেলা নয়, সাপে কেটেছে দিলেই হল।, ২)  আর ওইসব ওঝা, গুনিন বা জানগুরুরা ব্যবহৃত হচ্ছে কন্টেক কিলার বা সুপারি কিলার রূপে।  
 সরকারের কোন উদ্যোগ নেই,  যেমন চলছে চলুক ১)এলাকার ওইসব ওঝা,জানগুরু বা গুনীনদের এই সুপারি কিলালের প্রকাশ্যে বন্ধ করার আইন প্রয়োগ।, ২) সঠিকতর পুলিসি তদন্তের ব্যবস্থা যেখানে কি কারনে রুগীর পরিবারবর্গ সরাসরি হাসপাতাল করলো না সঠিক শিক্ষা নেই, প্রথায় অনড় না সত্যি কোন হত্যার পরিকল্পনা কাজ করেছে।,  ৩)  এবং টাকা পাবার পর পরিবারবর্গ এর থেকে মুছেলেখার বা স্বাগরক্তি লেখার ব্যবস্থা নেই,  যে এরপর এই ভুল বা ভুলচর্চা নিজে বা কাউকে করতে দেবেনা। এদের দিয়েই সরকারের যদি প্রচার করে তাদের নিজস্ব অঞ্চলে  ভালো ফলপ্রসূ ফল পাওয়া যাবে।  এই সমাজের অনিচ্ছাকৃত মৃত্যুর মিছিল একধাপে অনেক কমে যাবে। যেরকম চমকপ্রদ ফল পাওয়া গেছে পোস্ত চাষের ক্ষেত্রে, সরকারের নির্দেশ যে গ্রামে কোথায় অবৈধ পোস্ত চাষ হলে গ্রাম পঞ্চায়েতের সদ্যস্যকেই ধরা হবে বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে  যদিনা আগে খবর দেয়। এই ব্যবস্থা করলে উক্ত মৃত্যুর হার শূন্যতে নেমে যাবে আশা রাখি।

শুক্রবার, ১২ জানুয়ারী, ২০১৮

উচ্চ শিক্ষায় পড়ুয়া বেড়েও পিছিয়ে, ২৭তম পশ্চিমবঙ্গ


-: সাপ্তাহিক আলোচনার টেবিল :- 
                                           ====================================
 "উচ্চ শিক্ষায় পড়ুয়া বেড়েও পিছিয়ে, ২৭তম পশ্চিমবঙ্গ "......  এইসময়, ০৯/০১/২০১৮

"পরিসংখ্যানেও প্রকাশ, গত ছ’বছরে পশ্চিমবঙ্গে উচ্চশিক্ষায় ছাত্রছাত্রীদের নথিভুক্তকরণ (গ্রস এনরোলমেন্ট রেশিও বা জিইআর) ৬ শতাংশ বেড়েছে৷ তাতে কী! এখনও যে তা জাতীয় গড়ের (২৫.২ শতাংশ) চেয়ে ঢের কম, বেরিয়ে এল সত্যিটা৷ ৩৬টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে এ রাজ্যের ঠাঁই খুবই নীচের দিকে, ২৭তম স্থানে৷ পশ্চিমবঙ্গের (১৮.৫ শতাংশ) পরে আছে শুধু বিহার, ঝাড়খণ্ড, অসম ছাড়া নাগাল্যাণ্ডের মতো ছোট রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল৷"

"রাজ্য উচ্চশিক্ষা সংসদের প্রাক্তন ভাইস চেয়ারম্যান পবিত্র সরকারের বক্তব্য, ‘এই ধরনের পরিসংখ্যান অনেক বিষয়ের উপর নির্ভর করে৷ উত্তরপ্রদেশে আমাদের চেয়ে জনসংখ্যা বেশি৷ উচ্চমাধ্যমিক বা সমতুল পরীক্ষায় পাশের হারও বেশি৷ ফলে স্নাতকে ভর্তিও বেশি৷ আবার কেরালায় স্বাক্ষরতার হার অন্য সব রাজ্যের চেয়ে বেশি৷’ প্রাক্তন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী সুদর্শন রায়চৌধুরীর আবার পর্যবেক্ষণ, ‘প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন ফাঁকা থেকে যাচ্ছে৷ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের হালও তথৈবচ৷ সেই সঙ্গে নিত্যদিন কলেজে-কলেজে অশান্তি৷ তা ছাড়া নতুন শিল্প ও কলকারখানা কোথায় ? উচ্চশিক্ষার পর অনিশ্চিত ভবিষ্যত্ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা না থাকায় পড়ুয়ারা ভিন্ রাজ্যে চলে যাচ্ছেন৷ সে জন্যই উচ্চশিক্ষায় জিইআর কমছে৷"

রাণা : আমার মনে হয়, পশ্চিবঙ্গের মানুষ মানসিকতায় অনেক উন্নত। মূল্যবোধ ও প্রগতিশীল যুক্তিনিষ্ঠ চিন্তাও অনেক বেশি। তাই উচ্চশিক্ষা ও কাজে বাইরেও তারা নাম করে। তবে এটা স্বীকার করতেই হয়, নতুন নতুন স্কুল কলেজের মান অত্যন্ত নিচু। ডিসিপ্লিন ও নেই,  পবিত্র সরকারের কথা সঠিক।

সুমিত্রা : পশ্চিমবঙ্গের মানুষ উচ্চশিক্ষায় পিছিয়ে নেই। বাঙালিদের শিক্ষার প্রতি চাহিদা অন্য অনেক রাজ্যের থেকে বেশি। দক্ষিণ ভারতের সঙ্গে তুলনায় আমরা অনেক পিছিয়ে। আমাদেরই ছেলে মেয়েরা হায়দ্রাবাদ চেন্নাই গিয়ে ওখানকার infrastructure , seriousness দেখে মুগ্ধ। এমনকি উড়িষ্যতেও!

রাণা : মহারাষ্ট্রের পুণে বা নাগপুরের কলেজগুলো দেখলে মনে হয় আরো একবার পড়াশোনা শুরু করি!

সুমিত্রা : সত্যি। কত নতুন subject, research lab world standard এর,  আমারো ইচ্ছা করে। আমাদের কোথাও একটা কমতি আছেই। দেখনদারী আর সংখ্যা দিয়ে কী হবে, seriousness না থাকলে।

রাণা : আমাদের এখানে আমরা সেই মুখস্ত করার যুগে পড়ে ছিলাম। যত বড় লিখতে পারব তত বেশি মার্কস জুটবে। শিক্ষাকে যা রাজনীতি মুক্তের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তারই বা বাস্তবায়ন হল কই।  

সুমিত্রা : সেটাই মনে হয় মূল কারণ নিম্নমানের। গুণের বা প্রতিভার কদর নেই।

অরিন্দম : ১। ছাত্র-ছাত্রীরা রাজনৈতিক ভাবে সচেতন হোক, কিন্তু বাংলায় দলীয় রাজনীতির খবরদারির প্রভাব ভয়ঙ্কর খারাপ। নিজে সক্রিয় ভাবে ছাত্র রাজনীতি করেছি। দেখেছি এর পেছনে থাকে বিশাল দুর্নীতির প্রলোভন। বহু কলেজের প্রিন্সিপাল, প্রফেসর এর বিরোধিতা করার সাহস পায় না, শাসক দলের কৃপাধন্য থাকার জন্য।

রাণা : সাউথে দেখেছি কর্পোরেট কায়দায় কলেজগুলো চলে। শিক্ষায় বেসরকারিকরণের জন্য এমন সম্ভব হয়েছে। শিক্ষায় ব্যাপক বেসরকারিকরণ কি সমর্থনযোগ্য?

অরিন্দম : ২। কলেজের সিলেবাস এর কোনো মাথামুন্ডু নেই। এমন সিলেবাস বানানো হয়, যা একজন ছাত্র/ছাত্রী টিউটোরিয়ালে না গিয়ে শেষ করতে পারে না। তাহলে মাইনে করে এত প্রফেসর রাখার কি দরকার?

সুমিত্রা : একটাই ভয়, ব্যবসার খাতিরে fees অনেক সময় খুব বেশি হয়ে যায়। তবে loan এর সুযোগ থাকে বোধহয়। --- এটা রানার উত্তর,  আমার current syllabus সম্পর্কে জানা নেই।

অরিন্দম : ৩। দক্ষিণ ভারতে বিশেষ করে কর্ণাটকে প্রাইভেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছড়াছড়ি। বিশাল ক্যাপিটেশন ফিস দিয়ে ভর্তি হতে হয়।

সুমিত্রা : সঠিক ডাক্তারের মত, সঠিক কলেজ চিনে নেওয়া একটা আর্ট।

রাণা : ঠিক। সব জায়গায় ঠকে যাওয়ার ভয়।

অরিন্দম : ৪। এই যে এতো আই আই টি। কিন্তু, প্রায় সমস্ত টেকনোলজি বিদেশ থেকে আমদানি। ব্রেন-ড্রেন!!! কারণ, সেই পরিকাঠামোর অভাব।

সুমিত্রা : অনেকেই ৭-৮ লাখ খরচ করে ভুলভাল জায়গায় ভর্তি হয়ে........  চাকরীর জন্য ঘুরচ্ছে!

অরিন্দম : ৫। মেধার অভাব নেই। কিন্তু, সেই মেধাকে তো যত্ন করতে হবে। অনেক ডিগ্রি নিয়ে রিলায়েন্সের মতন কোম্পানিতে চাকরি। মাস গেলে মোটা টাকার মাইনে। ব্যাস!!!

রাণা : কেন শিক্ষার দরকার সেই বোধটা বোধ হয় হারিয়ে ফেলেছি। শিক্ষা মানে অর্থের আগমণ না জ্ঞানের আগমন সেই সংজ্ঞা ভুলে গেছি। শিক্ষা নিয়ে আমাদের মননও গোলকধাঁধায়য় চরকি কাটছে!

অরিন্দম : এই নিয়ে 'থ্রি ইডিয়টস' সিনেমাটা, গোটা শিক্ষাব্যবস্থার ঘাড়টা ধরে ঝাঁকিয়ে দিয়েছিলো। যদি শুধু চাকরির কথাও ভাবি, কোথায় পাবে এত ছেলেমেয়ে চাকরি???

অনাবিল : পশ্চিমবঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষায় একটা দিক দেখা যাচ্ছে, সেটা হচ্ছে নারী পুরুষ রেশিও তে নারীরা অনেক এগিয়েছে। এবং সংখ্যার দিক থেকেও অনেক এগিয়ে চলে।  মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক এবং স্নাতকস্তরে এখন নারীর সংখ্যাই বেশী। শুধু সংখ্যায় নয় মানেও এগিয়ে চলছে। সেখানে ছেলেদের গতি নিন্মে।  গ্রামীণ বাংলার উচ্চশিক্ষা এখন মেয়েদের দখলে। ছেলেরা উচ্চমাধ্যমিকেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। পিছনে অবশ্যই গ্রামীণ বাংলার অনিশ্চিত জীবনযাপন।

রাণা : তবে কি এটা হতে পারে যে মেয়েরা সরকারি স্কুলমুখী, আর ছেলেরা রোজগেরে হবে ভেবে বেশি খরচা করে বেসরকারি স্কুল বা কলেজে পড়ছে। এতেই কি পশ্চিমবঙ্গ বোর্ডের ক্ষেত্রে এইরকম পার্থক্যগুলো আসছে। 

অনাবিল : কিছুটা ঠিক। কিন্তু উচ্চশিক্ষায় পশ্চিমবঙ্গে মেয়েরা বেশী যাচ্ছে।  সঙ্গে একটা বিরাট অঙ্কের ছেলেরা গ্রাজুয়েশনের আগে বা পরে গজিয়ে উঠা চাকারী পাইয়ে দেবার সেন্টার গুলোতে চলে যাচ্ছে।  যেমন রাইস, জাইস, জর্জ ইত্যাদি।  যেগুলো কোন রকম সরকারি পরিসংখ্যানে আসছে না।  এদের ফিও কিন্তু আকাশছোঁয়া এবং চলছে প্যারালাল ভাবে বেসরকারি কলেজ বা ইউনিভার্সিটির মতো। একটা সময় পর্যন্ত (২০০৫ সাল)  পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির    মারপ্যাচে পড়ে কাহিল হয়েছিল। তারপরে চাপে না অন্যকিছুরর উত্তাপে বেসরকারি শিক্ষার আস্বাদন পায় বাংলার মানুষ। পরিসংখ্যান বলছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প:ব:-এ অনেক কম। যেহেতু পরে এসেছে তাই এদের মানও অন্যান্য রাজ্যের কাছে পৌচ্ছায়নি।  কিন্তু  পারিপাশ্বিক পরিবেষ্টন (রাজনৈতিক সহ) কাঙ্ক্ষিত মানে পৌছতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অরিন্দম : হয়ত এই আলোচনায় একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। তবুও, একটা বিশেষ পেশার সাথে যুক্ত থাকা এবং সরকারি/ বেসরকারি সংস্থায় 'কাজ' করার খানিকটা অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি-এখানে কাজের চেয়ে বেশি চাকরি তৈরি হয়। এটাই হয়ে এসেছে। ফলে বিপুল মেধার অপচয় যার সাথে শিক্ষা গভীরভাবে সম্পর্কিত।

অনাবিল : এই প্রসঙ্গে একটা কথা না বললে হয় না।  সেটা প্রথাগত  শিক্ষা এখন চাকরী পাওয়ার জায়গায় দাঁড়িয়েছে।  তাই সেটা গজিয়ে উঠা ওইসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গুলো করছে আরো ভালো করে সেখানেই ভিড়, যারা ডিগ্রি বা সার্টিফিকেট দেয়না। দেয় চাকরী পাওয়ার যোগসূত্র। কিন্তু এই দুইয়ে মেল বন্ধন করে বাইরের রাজ্যের প্রথাগত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো। তাই ওখানে উচ্চশিক্ষায় এই ডপ আউট অনেক কম।  এই রাজ্যে তা বেসরকারি প্রথাগত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোও এই পরিসেবা দিতে অপারগ। সেই ইংরাজ বণিকদল এর নীতি এখনো বর্তমান!  কেরানী গড়ার শিক্ষা। রবীন্দ্রনাথ যে শিক্ষার কথা বলেগেছে।  তা আমাদের পাঠ্যবই এ রয়েগেছে,  আজকাল শিক্ষা আর উৎকোচ সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে।  এটি বলার কারণ টাকাই আমার আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা তৈরি করে দিচ্ছে।

অরিন্দম : ঠিক তাই। তাই বোধহয় সায়েন্স শুধুই একটা সাবজেক্ট, দৈনন্দিন জীবনের অনেক ক্ষেত্রেই তার কোনো প্রতিফলন নেই।

অনাবিল : এই আলোচনা শুরু তে পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে।  প:ব: এর শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থানের কারণ উপরের প্রতিটি আলোচনা থেকে পাওয়া যাবে আশাকরি।

রাণা : ভারতে মনে এইসব ব্যবসার মূল পুঁজি ভয়। ধর্ম বেঁচে আছে এই ভয়কে পুঁজি করে। হাসপাতালগুলো এই ভয়ের ব্যবসা করে। যত বেশি খরচা করবেন আপনি তত নিরাপদ। সরকারি হাসপাতাল মানেই মৃত্যু নিশ্চিত। এমন ভয় ঢোকানো হয়েছে ধীরে ধীরে। তাই লোকে ঘটি-বাটি বেচে বাইপাসের ধারের হাসপাতালে ভিড় করে। শিক্ষাতেও সেই ভয়কে পুঁজি করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো রমরম করে বিজনেস করছে। আপনার ছেলে বা মেয়ে কিন্তু ইঁদুর দৌড়ে পিছিয়ে পড়বে কিন্তু - ব্যস ভয় পেয়ে ছুটলেন কোন দামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে। এখানে যুক্তি নেই, ভয় আছে। কেউ পরখ করে দেখে না, কেন ঐ প্রতিষ্ঠানে যাব। পাশের বাড়ির অমুকের ছেলে যাচ্ছে তো আমাকেও যেতে হবে।

সুমিত্রা : একদম.....  মধ্যবিত্তরা ভয়ের দ্বারাই চালিত হয়..... অবশ্য বুদ্ধি থাকলে এতো বোকাবোকা ভয় পাবে না।  

অনাবিল : একদম সহমত,  এইসব মৌলিক চাহিদা গুলোতে চিকিৎসা, শিক্ষা, আইনি পরিসেবাতে ভয়ের চাদরে চেপে দুর্নীতির পাহাড় তৈরি হচ্ছে।

অরিন্দম : আর একটা সমস্যা... অনেক ছেলে-মেয়ে সাবজেক্ট বাছছে, 'ভালো চাকরি' পাবে বলে। তাদের ওই সাবজেক্ট এর ওপর এমনিতে কোনো আগ্রহ নেই। তাই অনেকে ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার ইত্যাদি হয় 'বাই ডিফল্ট', 'বাই চয়েস' নয়।

রাণা: তবুও পরিসংখ্যান বাদ দিয়েও বলতে পারি গড় ভারতের তুলনায় শিক্ষার চাহিদা পশ্চিমবঙ্গে খানিকটা বেশি।

অনাবিল : সমস্যার শেষ নেই,  প:ব: তথাকথিত  ভালো ছাত্রছাত্রীরা সরকারি পরীক্ষা মাধ্যমে স্কুলকলেজ এর শিক্ষক হচ্ছেন। তারাই স্কুলকলেজ এ না পড়িয়ে (বা দরকার পড়ে না) প্রাইভেট শুধুই নোট দিয়ে যাচ্ছে।  এরাই প্রাইভেট স্কুলকলেজ এর সামনে লাইন দিচ্ছেন,  এইসব স্কুলকলেজ এর শিক্ষকদের শিক্ষকতা যোগ্যতা নিয়ে এরাই প্রশ্ন তোলে।  আজব শিক্ষা ব্যবস্থা এবং তার মান!  আমরা নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, বর্তমান সময় এমএ পাশ ছেলে মেয়েরা নিজেরা যে চাকরীর পরীক্ষায় বসছে তার ফর্মই নিজেরা ফিলাপ করতে পারেনা। সাধারণ জ্ঞানের মান খুবই নিন্মে পৌচেছে।  পরীক্ষায় বমি করেই এমে অবধি টেনে দিয়েছে!!!  সংখ্যার সাথে মানের হার ক্রমেই নিন্মগামী।

সোমবার, ৮ জানুয়ারী, ২০১৮

মিচিও কাকুর ঈশ্বর দর্শনের বিভ্রাট ও আমাদের ঈশ্বর।। বিপ্লব সৎপতি


এর আগে দু'টি সংখ্যায় লিখেছিলাম 'আইনস্টাইন' ও 'হকিং'এর ঈশ্বর বিশ্বাস নিয়ে। সেখানে লিখেছিলাম, "কোনো বিজ্ঞানী ব্যক্তিগত ভাবে ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন কি না, এটা কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হওয়ার কথা ছিলো না। যে বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন, সেই বিষয়ের উপর কতটা যুক্তি প্রমান দিতে পারছেন, সেটাই আলোচ্য বিষয় হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বর্তমান পেক্ষাপটে বিজ্ঞানের ক্রম-বর্ধমান উন্নতির সাথে সাথে 'সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কিত ধর্মীয় তত্ত্বগুলির' দূরত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকায় ধর্মীয় ব্যবসায়ীদের কাছে 'বিষয়'টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে । বিজ্ঞানীরা তার প্রচলিত ধর্মে বিশ্বাসী, এটা দেখাতে পারলেই যেন পায়ের নীচে মাটি খুঁজে পায়। "
জাপানী বংশোদ্ভূত  মিচিও কাকু একজন আমেরিকান পদার্থ বিজ্ঞানী। তিনি সিটি কলেজ অব নিউ ইয়র্কের একজন হেনরি সিম্যাট অধ্যাপক, একজন ভবিষ্যতদ্রষ্টা, বিজ্ঞান প্রচারনাকারী এবং জনপ্রিয়কারী । তিনি বিজ্ঞান এবং তদসংশ্লিষ্ট বেশ কিছু বই রচনা করেছেন।মহাবিশ্বেরগঠন সম্পর্কিত 'স্ট্রিং তত্ত্বের' সহ-প্রতিষ্ঠাতা।
তাহলে দেখা যাচ্ছে 'মিচিও কাকু'র নাম মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক ছাত্রছাত্রীদের শোনার কথা নয়, সাধারন মানুষদের না হয় বাদেই দিলাম। কিন্তু ধর্মীয় ব্যবসায়ীদের হাত ধরে 'মিচিও কাকু'র নাম এখন, যারা টুকটাক বাইরের খবর রাখেন, প্রত্যেকের কাছে পৌঁছে গেছে। তবে তার গবেষণারর জন্য নয়, একজন ধর্মবিশ্বাসী বিজ্ঞানী হিসেবে।ধর্মীয়  বিশ্বাসের পক্ষে এমন একজন বিজ্ঞানীকে পেয়ে রীতিমতো উল্লসিত তার পাশাপাশি বেশকিছু ঈশ্বরে অবিশ্বাসীরা ঘটনাটি চেপে যেতে চাইছে যাতে বিশ্বাসে চিঁড় না ধরে। 
এমন অবস্থায় আমার লেখার উদ্দেশ্য হল, মিচিও কাকু'র ইশ্বর কী আমাদের ইশ্বরের মতো? না অন্য কিছু?
প্রথমে একাজ করা হয় 'খ্রীস্টান টুডে' নামক একটি ওয়েব পোর্টালে, সেখানে দাবী করা হয়, 'মিচিও কাকু বলেছেন এই মহাবিশ্ব 'ঈশ্বর' নামক কোনো এক ম্যাথমেটিশিয়ানের তৈরী। এরপরেই বিভিন্ন বাংলা 'ওয়েব পোর্টালে ' ও দু-একটি প্রিন্ট মিডিয়ার শুরুহয় দড়ি টানাটানি।
কোথায় হেডিং হচ্ছে, "মিচিও কাকু দেখা পেলেন ইশ্বরের। "
আবার কোথাও,"অবশেষে মিচিও কাকু'র হাত ধরে প্রমাণিত হল,যে ঈশ্বর আছেন।"
একজায়গায় দেখলাম, " নাস্তিকদের মুখে ঝাঁমা ঘষে মিচিও কাকু প্রমাণ করলেন ঈশ্বরের অস্তিত্য। "
যে বক্ত্যবের খণ্ডাংশ নিয়ে এত আলোড়ন, সেই বক্তব্যের ক্ষুরধার বিশ্লেষণ করেছেন অনেকেই। তবে সমস্যাটা হচ্ছে এই বিশ্লেষণ বিপক্ষে গেলে কেওই তা মানতে চান না, তাই সে সমস্যার সমাধানকল্পে এগিয়ে হলেন খোদ মিচিও কাকু নিজেই। ২৭শে মার্চ ও ১৬জুন পর পর দু'বার  প্রকাশিত এক্সক্লুসিভ সাক্ষাতকারে পরিষ্কার করলেন তার অবস্থান। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন পল ফ্রেঞ্চ। আসুন দেখি কী বলেছেন তিনি,

"I&T Today: সাম্প্রতিক সময়ে আপনি অনেকগুলো খবরের শিরোনাম হয়েছেন, যেখানে দাবী করা হয়েছে আপনি এমন কিছু পেয়েছেন, যার ফলে উচ্চ মাত্রার বুদ্ধিসম্পন্ন কোনো কিছুর অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়। আপনি ঠিক কী পেয়েছেন, তা কী ব্যাখ্যা করবেন?
মিচিও কাকু: কিছু ওয়েবসাইট আমার কথার ভুল ব্যাখ্যা করেছে। জনসমাজের অংশ হওয়ার একটা অসুবিধা আছে, আর তা হলো: মানুষ কখনো কখনো তোমাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করবে। তাদের একাজটি করার কারণ হিসেবে আমি অনুমান করতে পারি, যখন কোনো ব্যক্তি সাধারণ জনতার আকর্ষণের কেন্দ্রে আসে, তখন দেখা যায়, মানুষ তাকে, তার কথাকে ভুলভাবে উদ্ধৃত করে।সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, আমি বলেছি, ঈশ্বর আছেন তা তুমি প্রমাণ করতে পারো কিন্তু আমার দৃষ্টিকোণ ভিন্ন ছিল। এই বিষয়ে আমার বক্তব্য ছিল, ঈশ্বর আছেন তা যেমন তুমি প্রমাণ করতে পারবে না, ঈশ্বর নেই, তাও তুমি প্রমাণ করতে পারবে না।
যা পরীক্ষণযোগ্য, পুন:উৎপাদনযোগ্য এবং যা মিথ্যা প্রমাণ করা যায়, এই তিন ভিত্তির উপরেই দাড়িয়ে রয়েছে বিজ্ঞান। কিন্তু এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যা মিথ্যা প্রমাণ করা যায় না, পরীক্ষা করা যায় না,যেমন ঈশ্বর। "

এখানে দর্শন শাস্ত্রে Burden of Proof টার্ম'টি তুলে দেওয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না।  যার মর্মার্থ হল, যে কোনো উটকো দাবির যথার্থতা প্রমাণ করার দায়িত্ব দাবিদারের। আপনি যদি ভুতে বিশ্বাসী হন, ঈশ্বরে বিশ্বাসী হন, পূর্বজন্মে বিশ্বাসী হন, অ্যালিয়েনে বিশ্বাসী হন– তাহলে আপনাকেই এই সমস্ত বিষয়ের অস্তিত্বের যথার্তা প্রমাণ করতে হবে। যারা এগুলোতে বিশ্বাস করে না, তাদের দায়িত্ব নয় ‘অঙ্ক কষে’ আপনার দাবি ভুল প্রমাণ করা কিংবা নস্যাৎ করা। কার্ল স্যাগানের কথায়--
Extraordinary claims require extraordinary evidence.
অথাৎ আপনি ঈশ্বরে বিশ্বাসী হলে তার প্রমাণ আপনাকেই করতে হবে।
এখন আসি নেতিবাচক অস্তিত্বের প্রস্তাবনার ব্যাপারে। যিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন অথচ ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ চাইলেই উল্টে প্রতিপক্ষের কাঁধে দায়ভার চাপিয়ে দিয়ে বলেন, ‘প্রমাণ করুন তো, ঈশ্বর বলে কিছু নেই’– তিনি আসলে নিজের অজান্তেই একটি যৌক্তিক ভ্রান্তিতে (logical fallacy) আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন, দর্শনে যার একটি সম্ভ্রান্ত নাম আছে– Shifting the Burden of Proof, সহজ বাংলায় যাকে বলে ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ চাপানো। এই ভ্রান্তিটিকে দর্শনশাস্ত্রে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে–
The burden of proof is always on the person asserting something. Shifting the burden of proof is the fallacy of putting the burden of proof on the person who denies or questions the assertion. The source of the fallacy is the assumption that something is true unless proven otherwise.
[Ref: The Atheism Web, Logic & Fallacies] 
দর্শনশাস্ত্র আমাদের শেখাচ্ছে  যে, নেতিবাচক অস্তিত্বের প্রস্তাবনা (negative existential proposition) কখনওই প্রমাণযোগ্য নয়।

আবার ফিরে যাই মিচিও কাকু'র সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন,"ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, আইনস্টাইনের যে ঈশ্বর তার মধ্যেই প্রজ্ঞা লুকিয়ে রয়েছে। আইনস্টাইনের কাছে ঈশ্বর মুলত দুই ধরনের ছিল। একটি ঈশ্বর হলো ব্যক্তি ঈশ্বর, যার কাছে প্রার্থনা করা হয়, যে ঈশ্বর ফিলিস্তিনীদের উপর অত্যাচার নীরবে অবলোকন করেন। যে ঈশ্বর জলের উপরে হাটেন। এটা হচ্ছে প্রথম ঈশ্বর। কিন্তু আরো এক ঈশ্বর এর কথা তিনি ভাবতেন। আর তা হলো স্পিনোজীয় ঈশ্বর। যে ঈশ্বর অত্যন্ত সরল, যার মধ্যে সুর নিহীত, যার মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে সৌন্দর্য।
এই মহাবিশ্ব অত্যন্ত চমৎকার। এই মহাবিশ্ব অনেক সাদামাটা(simple)। কিন্তু এই মহাবিশ্ব এমন নাও হতে পারত। এই মহাবিশ্ব হতে পারত বিশৃঙ্খল, হতে পারত নিকষ কালো, অন্ধকার। হতে পারত ইলেক্ট্রন-প্রোটনের কতগুলো বিশৃঙ্খল সমন্বয়। কোনো জীবন নেই, কোনো প্রাণ-প্রাচুর্য নাই। আকর্ষণ তৈরী হবে এমন কিছু নাই। শুধুমাত্র ইলেক্ট্রন-প্রোটনের কুয়াশাছন্ন এলোমেলো কিছু সমন্বয় মাত্র। মহাবিশ্ব এমনটাও হতে পারত, কিন্তু এমনটা হয় নি। আমাদের মহাবিশ্ব সমৃদ্ধ, সে সুন্দর, সে পরিচ্ছন্ন।"
অথাৎ 'আইনস্টাইন' মহাবিশ্বের সুশৃঙ্খলতা কে ঈশ্বর বলতে চেয়েছেন। তারেই অনুগামী মিচিও কাকু। এই ঈশ্বর রুপক মাত্র এটাকে আপনি প্রাকৃতিক নিয়ম বা রাম, শ্যাম, যদু, মধু যা খুশি নামে ডাকলেও এর নিয়ম পরিবর্তন হয় না('আইনস্টাইনের ঈশ্বর বিশ্বাস' নিয়ে আমার একটি লেখা আগের সংখ্যা নিয়ে পড়তে পারেন বা 'মুক্তমন ও মুক্তনয়নের' ফেসবুক পেজ দেখতে পারেন।)
যে সব ধর্ম ব্যবসায়ী ও শিক্ষিত ধার্মিক'রা উল্লসিত হচ্ছেন, তাদের প্রতি আমার প্রশ্ন

★মিচিও কাকু'র ঈশ্বর কী 
আমাদের ঈশ্বরের মতো ৪২০০০ ধরনের নিয়ম তৈরী করেনআমাদের? ধর্ম পাল্টালে নিয়মও পাল্টান?
★মিচিও কাকু'র ঈশ্বর কী আমাদের ঈশ্বরের মতো লক্ষ-লক্ষ মন্দির,মসজিদ,চার্চ তৈরী করে পূজো, উপাষণা করতে বলে?খাবার ও পোষাকে ফোতোয়া দেন? 
★মিচিও কাকু'র ঈশ্বর কী আমাদের ঈশ্বরের মতো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে?বিপক্ষ মত সহ্য করতে পারেন না? 
★মিচিও কাকু'র ঈশ্বর কী আমাদের ঈশ্বরের মতো শতশত মানুষ মেরে নিজেকে সর্বশেষ্ঠ প্রমান করেন? রাম-বাবরি মসজিদ নিয়ে নোংরা রাজনীতি করেন?
তালিকা আর দীর্ঘ করলাম না। কী বলতে চেয়েছি আশাকরি বোঝাতে পেরেছি।
এরধুর পড়ে যদি আপনার মনে হয় সবনিয়ম ঈশ্বর নয় মানুষ করেছেন  তাহলে ধরে নেবো আমাদের ঈশ্বরের সবকটি গুনের আপনি উর্দ্ধে। 
এখন ব্যক্তি ঈশ্বর  মিচিও কাকু'র কাছে নিয়তঃ প্রার্থনা করতে হয় তাকে বাদ দিয়ে কেও যদি এমন ঈশ্বরের কথা ভাবে যিনি শুধুমাত্র সুর সঙ্গীত নিয়ে ভাবেন এবং তাকে যদি আস্তিক বলা হয়,(স্পিনোজীসমকে একসময় নাস্তিক্যবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হত) তাহলে আমাদের আর কীই বা বলার থাকতে পারে???


তথ্যসূত্র -  L&K Today, Muktamona blog, Michio Kaku website

শুক্রবার, ৫ জানুয়ারী, ২০১৮

একটি জ্বলন্ত ঘটনা


==================================
" মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় দলিত সংগঠনগুলির বিক্ষোভ ফলে হিংসা ছড়িয়ে পড়েছে। ".... বি.বি.সি.

প্রাথমিকভাবে কয়েকটি হিন্দুত্ববাদী ও দলিত সংগঠনগুলির মধ্যে হিংসায় দলিত একজনের মৃত্যু হয় সোমবার। তারপরেই হাজারে হাজারে দলিত শ্রেণীর মানুষ মুম্বাই শহরের উপকণ্ঠ সহ মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন রাস্তায় নেমে পড়েছেন। মঙ্গলবার প্রায় দেড়শটি বাসে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। বহু জায়গায় দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে। ট্রেন ও বিমান পরিষেবাও বিঘ্নিত থেকেছে সারাদিন।
বুধবার মহারাষ্ট্রে রাজ্যব্যাপী বনধের ডাক দিয়েছেন দলিত নেতা প্রকাশ আম্বেডকার এবং আটটি দলিত সংগঠন।
এই ঘটনার শুরু পুণে শহর থেকে।
সোমবার দলিত সংগঠনগুলি পুণেতে এক বিশাল সমাবেশ করেছিল ২০০ বছর আগের এক যুদ্ধ জয়ের বিজয় দিবস পালন করতে। ভীমা কোরেগাঁও যুদ্ধ নামে পরিচিত ওই যুদ্ধে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনী পুণের ব্রাহ্মণ পেশোয়া রাজাদের পরাজিত করেছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাহিনীতে বেশীরভাগ সদস্যই ছিলেন 'মাহার' নামক দলিত শ্রেণীর মানুষ। ব্রাহ্মণ রাজাদের বিরুদ্ধে সেই যুদ্ধজয়কে দলিত সংগঠনগুলি এখন পালন করতে চাইছে হিন্দুত্ববাদী আর এস এস-এর মতাদর্শের বিরুদ্ধে জয় হিসাবে।
ওই সমাবেশে গুজরাতের দলিত নেতা জিগনেশ মেওয়ানী, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতা উমর খালিদ সহ জাতীয় স্তরের দলিত নেতা নেত্রীরা হাজির ছিলেন।সেখান থেকেই একটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্যরা পাথর ছোঁড়েন - যার জেরে শুরু হয় হিংসা । ধীরে ধীরে তা এখন ছড়িয়ে পড়েছে রাজ্যের অন্যান্য এলাকাতেও। একদিকে মুখ্যমন্ত্রী দেভেন্দ্র ফাদনবীশ, অন্যদিকে দলিত নেতৃত্ব - দুই তরফেই শান্তি বজায় রাখার আবেদন করা হচ্ছে।

          -: নাড়িয়ে দিলো এক আলোচনার টেবিল :-
====================================
সুমিত্রা:  (বম্বে থেকে)এখানকার খেটে খাওয়া মানুষ, যারা অটো ট্রেনে কাজে যায় বহু দূর, তাদেরই একজন খুব রেগে বললো-- সরকারি বাস জ্বালিয়ে কার লাভ? বন্ধ খুব খারাপ জিনিস।... উত্তরে আমি বললাম... কেন বন্ধ ডাকলো কি জানো? বন্ধ তো ডাকাই হয় অসুবিধা সৃষ্টি করে জনতার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যে। শিখিয়েছেন গান্ধীজি স্বয়ং। অসহযোগ। আমি আজ সবজি বেচবো না, আমি আজ অটো চালাব না,  কেন বন্ধ ডাকা হলো? কার কী বলার আছে?.... আমরা রেগে গেছি।   তার সুবিধা নেয় স্থানীয় অসামাজিক /রাজনৈতিক সুবিধাবাদী গুন্ডারা। সেটা শহরেই বেশি হয়। তাতে দলিত নেতার বন্ধ ডাকাটা মিথ্যে হয়ে যায় না।  আর যে কোটি টাকার অপচয় লোকসান ইত্যাদি হয়, তাতে তো গরীব দলিত দেরও ব্যক্তিগত লোকসান হয়। তা সত্বেও কেন তারা মিছিলে যোগদান করে। নিশ্চয়ই তাদের কিছু বলার আছে!   এবার বলো এই আমরা ওরা বিভাজন কী করে শুরু হলো? ঠিক 1st কী ঘটনাটা ঘটেছিল পুণের কাছে?  200 বছরের পুরনো একটা আদিবাসী উৎসব এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো কেন? আর কারাই বা এর বিরোধীতা করল? কে কি জানো বলতো......

অরিন্দম :   সব সংসদীয় দলই জল মাপছে। উদ্দেশ্য ভোট টানা। যদি সামলাতে না পারে, এর পিছনে মাওইস্টদের হাত আছে, বলা হবে। কিছু আর্টিকলটা পড়েছি ওই ভাব দেখা গেছে । এই বিক্ষোভ কে কি শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের সংগ্রাম বলা যাবে? এটা কি একটা বিক্ষোভ না আন্দোলন? আন্দোলন হলে তার নেতৃত্বের লক্ষ বা দর্শন কি? এই ধরণের বিক্ষোভ বা আন্দোলন অর্থনীতিবাদের চোরাবালিতে তলিয়ে যাবে না তো?    

রাণা :  ক্ষোভ ছিল। ক্ষোভ জমেছিল। তা এই ইস্যু নিয়ে উত্তাল হয়েছে। অন্য কিছু নিয়েও হতে পারত। দলিতরা নিজেদের বিচ্ছিন্ন ও নিরাপত্তাহীন ভাবছে।  কিন্তু বিষয়টা 'জাত' ভিত্তিক সংরক্ষণের 'মায়াজালে' না আটকে যায়।   

অরিন্দম : প্রশাসন 'বহিরাগত' তত্ব আমদানি করা শুরু করেছে। তবে এই বছর, এই গণবিক্ষোভের পিছনে, মোদি সরকারের 'নিম্নবর্গীয়' মানুষের উপর প্রবল সন্ত্রাস অনেক যুগের জমে থাকা ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে বলে আমার ধারণা।  

অনাবিল :  আমার মনেহয় ভারতের বিভিন্ন মেট্রো শহর গুলোতে যে বিশাল আর্থসামাজিক বৈষম্য, কেউ কারো কথা শুনতে চায়না।  আর সেই ছোট ছোট ক্ষোভের পুঞ্জীভূত আকার নেয় বিস্ফারণ।  সেই ক্ষোভকে মোভটিভেট বা ডাইভাট করে চলে কিছু মাধ্যম বা ব্যক্তি বিশেষ। সেখান থেকেই তৈরিহয় অচলাবস্থা। সেই সংঙ্গে মেট্রো শহর গুলোর দৈনন্দিন বিশাল অর্থনৈতিক প্রবাহকে আঘাত করে।  এই অবস্থায় কিন্তু  শহরতলী বা গ্রামীণ ভারতকে খুবই কম পড়তে হয়।   আবার,  মেট্রো শহরের কিছু স্বত:স্ফূর্ত নাগরিক জাগরণ এইসব সাময়িক অচলাবস্থাকে ছাপিয়ে সার্বিক নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের রূপ নেয়।  

রাণা  : তবে এইসব আন্দোলনগুলো হয় বুদবুদের মত মিলিয়ে যায় বা কোন রাজনৈতিক দলের কাছে মাথানত করে দেয়। রিজওয়ানুর বা নন্দীগ্রামের নাগরিক আন্দোলন এক বিশেষ রাজনৈতিক দল হাইজ্যাক করে নিল। 

সুমিত্রা:  ঠিক। তারই চেষ্টা হবে। আর এই সুযোগে দলিত বা minority ছাত্রনেতা যারা সরকারের পক্ষে বিপজ্জনক তারা গ্রেপ্তার হবে। 

অরিন্দম : হ্যাঁ। সরকার তথা রাষ্ট্র। শুধু সরকার বিরোধী হলে 'বিরোধী দলের সাহায্য' পেলেও পেতে পারে। কিন্তু এই যুগ-যুগান্তরের হেজিমনির বিরুদ্ধে গেলে...??? 

সুমিত্রা : একদম তাই। বহু তথাকথিত শিক্ষিত মানুষও দলমত নির্বিশেষে রুখে দাঁড়াবে। 

রাণা : যুগ যুগান্তুরের সংস্কারের বিরুদ্ধে গেলে দুটো ঘটনা হতে পারে, ১) কিছুটা পরিবর্তিত হল। যেমন দলিতদের মুখ্যমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি বা অন্য পদে বসানো হচ্ছে। জাতপাতের মাতলামো যেমন কিছুটা দূরীভূত হয়ছে। সেইরকম আরো পরিবর্তনের দিকে এগোবে। দলিতদের মানুষ হিসেবে আরো বেশি কিছু প্রাপ্তিযোগ ঘটবে, ২) মূলস্রোত এই আন্দোলনকে গিলে খেয়ে নিল। আর্যরা যেমন অনার্য সংস্কৃতিকে নিজের মত করে পরিমার্জিত করেছে।  

অনাবিল : ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মানসিকতা বহু বিভেদ; যেমন  জাতপাত, ধর্ম, বর্ণ,  রাজনীতি, ভাষা, জীবনচর্চার এতো বৈষম্য ; যা একমাত্র আবেগ দিয়েই একত্রিত করা সম্ভব।  তার বহু উদাহরণ আছে, আমি আর দিলাম না।  সেই আবেগের অন্ধত্ব বা যৌক্তিকতাই এতো বড় ভারতের সাংস্কৃতিক উত্তরণ বা অবতরণ পথ হয়ে এসেছে।  এই আবেগের সঞ্চারণ এর উপর নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ ভারতের গঠন।

অরিন্দম : রাণা , আমরা অনার্য না বলে, যদি প্রাক-আর্য বলি? আর অনাবিল , তোর কি মনে হয় ভারত আদৌ একটা নেশন?

অনাবিল : না, কোন দিন ছিলনা।  ভবিষ্যৎ এও হবে না।  এবং আজব হলেও এটাই সত্যি  সংবিধানে ভারতকে যুক্তরাষ্ট্র ওই বলেছে। যুক্তরাষ্ট্র কাকে বলে সেটাই জনগণকে জানতে দেয়নি সেই অন্ধ আবেগ। 

অনাবিল : একদম ঠিক। প্রবল বৈষম্য জিইয়ে রেখে 'ঐক্য আর অখণ্ডতার' কীর্তন।   শ্রেণী-শ্রেণী চেতনা-শ্রেণী দ্বন্দ্ব-শ্রেণী-সংগ্রাম...বিপ্লব। কিন্তু কোনো কিছুই তো অনিবার্য ভাবে ঘটবে না। কোনো বিশেষ শ্রেণীতে জন্মালেই যে সেই শ্রেণী-চেতনা গড়ে উঠবে, তার কোনো মানে নেই, তাই না? আজকের প্রেক্ষাপটে শ্রেণীর ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ জরুরি, ও পরিবর্তনশীল।

সুমিত্রা:  সেই। কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে ... সেটাকে নিয়ে তাত্বিক ব্যাখ্যা আর আলোচনা। কিন্তু কী করা উচিত , কী করলে এখন ভাল হয়.... সেটা কে ঠিক করবে? আমরা ভাল ভাল আইডিয়া দিতেই পারি, কিন্তু এই ভয়ঙ্কর অসাম্য আর দুর্নীতির মধ্যে .... 

অনাবিল  : আমি সেটাই বারবার বলছি সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষার দ্বন্দ্বই বড় হয়ে উঠেছে।

সুমিত্রা : কোনও নীতি implement করা দুরূহ। তাই আমাদের চিন্তা, চেতনা কে ছড়িয়ে দেওয়া, মানুষকে প্রভাবিত করা (কট্টর না হয়ে) ... এটাই এখন কাজ।  'gene' এর পাশাপাশি একটা নতুন ধারণা 'meme' .... বিষয়টা memetics। জিনবাহিত হয়ে যেমন শারীরিক বৈশিষ্ট ছড়িয়ে যায়। মীম বা ভাবনা চিন্তা তেমনি মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে যায়। এর থেকে মৌলবাদ , আতংকবাদ, রাষ্ট্রদ্রোহিতা ইত্যাদি সবই ছড়াতে পারে আবার ছড়াতে পারে যুক্তিবাদও। ছড়াচ্ছেও

রাণা  : এক্কেবারে ঠিক। তত্ত্বকথা আপাতত বইয়ে থাক। মানুষের মানবিক সম্মান রক্ষাটুকু রক্ষা করা আশু কর্তব্য।  

সুমিত্রা : সত্যিকারের শিক্ষার অভাবে ভুলভাল চিন্তা এগিয়ে যাচ্ছে। কোনো পুরোনো ঘটনাকে যখন আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ব্যাখ্যা করা হয়, তখন আমাদের প্রেক্ষিত টা দেখতে অনেক সময় ভুল হয়। 200 বছর আগের ভিমা কোরেগাঁও এর ব্যাপারটা ওই যুগে দলিতদের কাছে হয়ত একটা গর্বের ব্যাপার ছিল। সেটাকে স্বাভাবিকতার সঙ্গে দেখা কেন সম্ভব হবেনা? তাতে বাগড়া দেওয়ার অধিকার তো কারুর নেই। 

অনাবিল : একজন মানুষ দলিত ভেবে খুশি হলে এবং সেই অবস্থানে অনড় থাকলে ,  তার উত্তরণ কি সম্ভব?  এটাই চরম দ্বান্দ্বিকতা তার কাছে!  যেটা দেখেছি ডাইনী নিয়ে আদিবাসী সমাজে। একটা চলতি হাওয়া আছে আদিবাসী সংস্কৃতি বজায় রাখার নামে আদিমবাসী করে রাখার প্রক্রিয়া। এইদেখে আমরা একটা কথাই মনে হয়, আমি বা আমরাও তো আদিবাসী(মানবজাতির)। আমরা কি আকাশ থেকে টপ করে পড়েছি ? 

অরিন্দম : ঠিক। আমরা তাই। বাঙালির নৃতাত্বিক ইতিহাস তাই বলে। বাংলায় এই যে মতুয়া মহাসঙ্ঘ...এরা কি 'নিপীড়িত'???

অনাবিল  : নিপীড়িত সংরক্ষণ একটা আজব জিনিস!

অরিন্দম : ঠিক। পদবি, পেশা, জাতি...সব মিলিয়ে একটা সুবিধাবাদী ককটেল। এরপর, বর্ডার গেম, ক্রিকেট...

অনাবিল : আমরা পাশের বাড়ীর বৃদ্ধকে খেপা বলে খাপাই সঙ্গে পাকিস্তানকে গালাগাল দিই কাশ্মীর নিয়ে কথা বলার জন্য।

রাণা : আমরা যে নামেই ডাকি বা যে নামেই তারা খুশি হোক, মোদ্দা কথা এটাই ধর্মের শৃঙ্খলা দেখিয়ে ভারতের আদিম অধিবাসীদের বঞ্চিত করা হয়েছে ও পদে পদে অপমানিত করা হয়েছে......

অনাবিল : এটা আগেই স্বীকার করেনিয়েছি ওনারা অত্যাচারিত।  তাই বলে সাংস্কৃতিক উত্তরণ এর প্রশ্ন এলেই দেখা যায়,  সেই অত্যাচারের সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখবার মগোজধোলাই!  এটা কেন?

সুমিত্রা : রানার কথার সূত্র ধরে বলতে পারি আর্যরা অনার্য সংস্কৃতি কে পরিমার্জিত করেছে কথাটা সম্পূর্ণ ঠিক কি? যতদূর জানি প্রাক আর্য যুগে নারীর অবস্থান প্রায় পুরুষের পাশাপাশি ছিল। নারীর অবমাননা, বধূ বা বিধবা হত্যা... এগুলো ছিলনা। এখনো দ্রাবিড়দের মধ্যে ঘোমটা দিয়ে মুখ নিচু করে  চলার প্রথা নেই। তাই মনে হয় ভাল খারাপ বেছে নিয়ে সবাইকে এগিয়ে যেতে হবে।  খারাপকে খারাপ বলে মেনে নিতে হবে। সেই জন্যই তো লাগাতার সাংস্কৃতিক আন্দোলন এত জরুরি। 
ব্যক্তিজীবনেও প্রতিটি কর্মী মানুষ, পরিবর্তন কামী মানুষকে মনে রাখতে হবে, দোষ ত্রুটি নিয়েই মানুষ। অনেকের অনেকের খুঁত চোখে পড়বে। শহুরে মানুষের মধ্যে ভন্ডামী বেশি।
সকলেরই ছোট ছোট দোষ আছে, ছোট ছোট খুঁত, লোক দেখানো ভদ্রতা, ন্যাকা কথা, অযথা খরচ, সময় নেই, তাই শর্ট কাট এ খুশি করা, অপ্রয়োজনীয় উপহার, সম্পদ জাহির হয়তো। 
তবু ভালোবাসা কি নেই? সঠিক বন্ধু খুঁজে নেওয়া, খুঁজে চলা আজীবন.... বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে যারা । আছেই তো।
দরকারে সৎ মানুষের কদর করা, আপ্লুত খুশিতে নিজের জিনিস ভাগ করে নেওয়া... তাও আছে।
তাই থাকবে।
ঠিক থাকবে.....

পৃথিবী চলতে থাকবে তাদের নিয়েই নিজের নিয়মে... যে নিয়মে গুহামানুষেরা বিপদের সময় একজোট হত।
হাল ছেড়না বন্ধু।

অযাচিত_বাক্যব্যয়...! পর্ব-♦অচ্ছুৎ_মানব♦।। সব্যসাচী সরকার


"তুই তো জানোয়ার, ছোটলোক, তোর ভাবনাচিন্তা শুনলেই বোঝা যায়, সারাক্ষণ শুধু ঝগড়া-বিবাদ, কথা বললেও দোষ, না বললেও দোষ, আরে তাহলে করবোটা কি, বল তুই, করবোটা কি?"-বিপরীত মনোবিদ্যার বিষয়টি Atiq Nisikto অডিও হতে আমরা সহজেই অনুধাবন করতে পাচ্ছি, আর প্রভাব সম্পর্কে আমরা অবগত; লিংকটি দিচ্ছি-
কোন বিষয়ে কোন মানুষকে যখন বারংবার নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয় তখন মস্তিষ্ক সেই নিষিদ্ধ কর্মটি করতে স্বপ্রনোদিত হয়, অর্থাৎ নেতিবাচক বা সমাজে গ্রহণীয় না হওয়া বিষয়গুলোর প্রতি আমাদের জানার বা সংযুক্ত হওয়ার একটি আগ্রহ প্রাবল্য দেখা যায় হরহামেশাই; যদি আমরা জানি সমাজ ও ব্যক্তি মানসিকতা পরিবর্তনশীল সময়ের সাথে সাথে, তাঁর সাথে দেখা যায় একটা সময় অতিক্রান্ত হলে অনেককিছু হয়তো একসময় গোপনীয় মনে করা হতো, বা পাপ বলে মনে করা হতো, বা নেতিবাচক মনে করা হতো, সেগুলো আজ অনেককিছু সর্বসম্মতভাবে গৃহীত না হলেও "ওপেন সিক্রেট" হিসেবে প্রচলিত; আমাদের মুক্তচিন্তার জগতে তেমনি ঘটে চলেছে নিয়মিতভাবে, তার সাথে সংযোজন করা হয়েছে এমনি একটি বিষয় যার মাঝের পার্থক্যটুকু আমাদের দৃষ্টির আড়ালে চলে গেছে; একটু সহজ করি- মানুষের ব্যক্তিসত্ত্বা ও তাঁর ভাববাচক বিষয়বস্তুর প্রকাশে যে সত্ত্বা- এ দুয়ের মাঝে পার্থক্যকারী একমাত্র বিধেয় হচ্ছে সময়; কিভাবে? মানুষ যা ভাবছে তা হয় লিখে নয়তো অন্যকোন সংরক্ষিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকাশ করছে, সেটি ঐ মানুষটির ঐ সময়ের সাথেই সাযুজ্যপূর্ণ, যা অপরিবর্তনীয়, যেমন লেখকের সৃজনশীল কর্মকান্ড বা প্রামাণ্যচিত্র; কিন্তু ব্যক্তি মানুষ সময়ের সাথে তাঁর বৈষয়িক পরিস্থিতিসৃষ্ট উদ্ভূত কার্যকারণ গুলো তাঁর ভাবনাচিন্তায় প্রভাব ফেলতে পারে, যার ফলে হতে পারে সে তাঁর পূর্ব সৃষ্ট সৃষ্টি হতে আদর্শগত ভাবেই দূরত্ব সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির জন্য তাকে অবশ্যই স্বাভাবিক ভাবেই নন্দিত বা নিন্দিত করা যেতেই পারে; অর্থাৎ ঐ সৃষ্টির দায় তাঁর সৃষ্টিকর্তার; তাহলে বোঝা যায় যে, কোন মানুষের সৃজনশীল সত্ত্বা দিয়ে বিবেচ্য ও অনুসরণ করলে সৃজনের সঠিক যাচাই হবে, ব্যক্তিসত্ত্বা কখনোই সেই সৃজনশীল কর্মকে প্রভাবিত করবেনা অনুসরণকারী বা পাঠক বা দর্শককে; আমরা যদি জন বার্জার-এর "Ways Of Seeing" বইটি দেখি তবে সেখানে আমাদের শিল্পীর শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাধারণের তা যাচাইমানের তারতম্য বোধগম্য হবে, "নগ্নতাই অশ্লীলতা নয়!" এ বাক্যখানার যথার্থ বিচার করার সুযোগ হবে; আবার এম.এন.নুরুল.হক-এর "মৃত্যু" বইটি পাঠককে মৃত্যু নিয়ে তথাকথিত ভাবনার ও ভ্রান্তিপাঠ চর্চার একটি বিশ্লেষণমুখী তথ্যভিত্তিক যাচাই পথ দর্শিত করাবে; আমাদের নিষিদ্ধ বিষয়ের প্রতি আগ্রহ বেশি, হয়তো নয় এ কারণেই পুরোনো বস্তাপচা মতবাদে সৃষ্ট বিশ্বাসে বিশ্বাসীদের তা নিয়ে চিন্তার অন্ত নেই, কারণ হোক সে ৫০০০হাজার বছর পুরোনো বা ১৪৫০বছর পুরোনো মতবাদ, তা যে আজ প্রশ্নবিদ্ধ তা নিয়ে যে বিশাল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পটভূমির ভিত গড়ে উঠছে তাঁর ভিত্তিমূল আজ উৎপাটিত হওয়ার আতঙ্ক সদা বিরাজমান, কখন কে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে হাজার বছরের বিশ্বাসের ভিত গুঁড়ে বালির প্রাসাদের ন্যায় ভেঙে পড়ে, এতে চলমান প্রক্রিয়া যদি বাধাগ্রস্ত হয়, আর তাই সেই বিপরীত মনোবিদ্যার প্রভাবকে কাটানোর প্রক্রিয়া হিসেবে মানুষের ব্যক্তিসত্ত্বাকে প্রাধান্য দিয়ে তাঁর বিতর্কিত সমালোচনার ক্ষেত্র সৃষ্টির প্রয়াস চলছে; আর এজন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার নাম করে সৃজনশীল, প্রগতিশীল, মুক্তচিন্তায় আস্থাশীল মানুষদের বাক স্বাধীনতা হরণ করা হচ্ছে; আর এর জন্য কারণ দেখানো হয়েছে "অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত"; আচ্ছা প্রশ্ন হচ্ছে- অনুভূতির সীমা কি নির্ধারণযোগ্য যে কতটা হলে তা আঘাতপ্রাপ্ত তা সুনিশ্চিত করা সম্ভব; যেমন বর্তমানে একজন রাষ্ট্রসেবকের অভিমান প্রসূত বক্তব্যের রেশ ধরেই বলি- কোন কাজ সঠিকভাবে সম্পাদিত করার লক্ষ্যে কত অর্থ বাড়তি প্রদান করা হলে তা ঘুষ বলে গণ্য হবেনা, বা তা বকশিস হিসেবে প্রদর্শিত হবে, এর কি কোন সীমা নির্ধারণ সম্ভব, হতেও পারে, আমাদের বাঙালিদের পক্ষে যেহেতু চাঁদে মানুষের ছবি দেখা সম্ভব, খাদ্যের মাঝে অলৌকিক অক্ষর সনাক্ত করা সম্ভব, সম্মানহানির নাম করে মানুষ হত্যা সম্ভব, রাগের বশবর্তী হয়ে একটি শব্দ ৩বার উচ্চারিত হলে সারাজীবনের সঙ্গীকে ছুঁড়ে ফেলা গর্বোজ্জ্বল বিষয়, সর্বশ্রেষ্ঠ'র শ্রেষ্ঠত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার জন্য হত্যা জায়েজ, যৌনসম্পর্ক স্থাপনে কোন সম্পর্কের নৈতিকতার ধার ধারেনা, হাজার কোটি টাকার দূর্নীতি কোন বিষয়ই না, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি স্বাভাবিক বিষয়, ভেজালপণ্য কিনে হয় ধন্য টাইপের সমাজব্যবস্থায় হয়তো সম্ভব; সবই সম্ভব; যা অপরাধ, যা অন্যায়, যা অনৈতিক, অসংযম, যা অযাচিত তারই পুনরাবৃত্তি আমাদের বিপরীত মনোবিদ্যারই চর্চাক্ষেত্রই দেখায় না; ছোট্ট শিশুর ক্ষেত্রে এর প্রভাবকে যেমন ইতিবাচকতায় পরিবর্তন করা সম্ভব, কৈশোর হডে পরবর্তী সময়ে এ পরিবর্তন অনেক দুষ্কর; যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম'র জন্য ভয়ঙ্কর এক সমাজব্যবস্থার মাঝে ফেলে দেবে, যেখানে প্রশ্ন ফাঁস করে পরীক্ষা দেয়া, বা উন্মুক্তভাবে সিগারেট, মাদকদ্রব্য সেবনকে স্বাভাবিকতা, অবাধ যৌনতাকে প্রলুব্ধ করা সহ, নৈতিক যে অধঃপতনে নিয়ে যাবে তা ঠেকানো দায় হবে; পাঠ্যপুস্তকের প্রতি অনাগ্রহতা ক্রমবর্ধমান, তার বহির্ভূত বইয়ের প্রতি আগ্রহ প্রকাশনা সংস্থার হৃষ্টপুষ্ট অবস্থা দেখে ভালো মনে হলে অভ্যন্তরীণ অবস্থা কতটা নাজুক তা নতুন প্রজন্মের শর্টকার্ট পথে সেলিব্রেটি হওয়ার চর্চা দেখলেই বোঝা যায়; আমি হয়তো দূর্বল মস্তিষ্কজাত বলেই তালযন্ত্র শিখতে গিয়ে এক ত্রিতাল'কে নিয়ে সাধারণ কিছু জ্ঞান নিতে ১বছরের উপর সময় লেগেছে, আর বইপড়ার কথা বললে সময় সেরম লাগে; রণদীপম বসু'র "নাস্তিক্য ও বিবিধপ্রসঙ্গ" বইটিতে  মানুষের মনোজগতের বৈচিত্র্যময়তা, সাথে বৈষয়িক স্বার্থে মুখের মুখোশ গ্রহণ বর্তমান আলোচনাকে বেশ প্রভাবিত করবে, লেখক সত্ত্বা ও ব্যক্তিসত্ত্বার বিশ্লেষণ স্পষ্টতর হবে পাঠকের; এছাড়া প্রবীর ঘোষ-এর "মনের নিয়ন্ত্রনে যোগ-মেডিটেশন" বইটিতে মানসিকতা কিভাবে পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে, কিভাবে বৈজ্ঞানিক পন্থায় তা হতে উত্তরণ সম্ভব তা নিয়ে যুক্তিযুক্ত আলোচনাও রয়েছে; এছাড়া প্রবোধ সান্যাল-এর "দেবাতাত্মা হিমালয়" ভ্রমণ কাহিনী একজন মানুষের অনুসন্ধিৎসু মানসিকতার অনুপ্রেরণাও যুগাবে; শুরু করেছিলাম কিছু অভিমানের কথা ও বিপরীত মনোবিদ্যা দিয়ে, "না" শব্দটির মাহাত্ম্যকথা নিশ্চয় সবারই কিছুটা উপলব্ধ, তাই "না" করার ক্ষমতার যৌক্তিক প্রয়োগ শেখা আমাদের জন্য জরুরি, স্বার্থের জন্য সব মেনে নেয়ার অনৈতিক চর্চা হতে বেড়িয়ে আসাও জরুরি, সত্যকে টিকতে হয়না কারণ তা স্বমহিমায় উদ্ভাসিত, কিন্তু মিথ্যেকে অনেককিছু করতে হয়ে টিকে থাকতে হলে, আর এর জন্য "না" বলার ক্ষমতা অর্জনও আবশ্যিক; নয়তো আমার মতো অচ্ছুৎ মানুষ হিসেবেই গণ্য হবেন একসময়, আমি এতে গর্বিত- কারণ "চার্বাক" সম্প্রদায় অচ্ছুৎ'ই ছিলো তৎকালীন সমাজব্যবস্থা  ও সমাজবাদীদের চোখে, আমি তাদেরই অনুসারী...!

মঙ্গলবার, ২ জানুয়ারী, ২০১৮

অযাচিত বাক্যব্যয়… কড়চা-ব্লগার, বিতর্কিত বিদ্যা ও সামাজিক বিবর্তন… || সব্যসাচী সরকার

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষত এই ভার্চুয়াল জগতে বৈচিত্র্যময়তা নেহাত চোখে পড়ার মতো; মানুষ বিভিন্নভাবে নিজের চিন্তা ভাবনা, দৈনন্দিন কার্যকলাপ, ভবিতব্য সহ আরো বহু বিষয় নিয়ে প্রতিনিয়ত চর্চারত; সেখানে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে ব্লগ, ব্লগিং ও ব্লগার নিয়ে আলোচনা সমালোচনা অন্তহীন; তাই নিয়েই প্রারম্ভ করছি-

♦ব্লগ নিয়ে খুঁজতে গিয়ে স্যামহোয়ার ব্লগে পেলাম তথ্যটি- Blog শব্দটি মূলগত ভাবে Weblog থেকে এসেছে, জোম বার্গার ১৯৯৭সালে ১৭ডিসেম্বর ওয়েবলগ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন, এর পরবর্তিতে পিটার মেরহোলজ তাঁর PeterMe.com ব্লগে ১৯৯৯সালের মাঝামাঝি সময়ে Weblog শব্দটি ভেঙে We Blog করে ব্যবহার করেন; এর পরপরই পাইরা ল্যাবস্ Blog শব্দটি ক্রিয়া ও বিশেষ্য উভয়রূপে ব্যবহার শুরু করে, যা আজো চলমান; Blog হচ্ছে অনলাইন ভিত্তিক ব্যক্তিগত দিনলিপি বা দিনপত্রিকা; আর যারা সেখানে বিভিন্ন বিষয়াদি সংযোজন করেন তাদের Blogger বলা হয়; আর এটি নিয়মিত চর্চা করাকেই Blogging বলা হয়।

কদিন আগেই ব্লগারদের মাঝে চিরাচরিত পন্থায় যে বিতর্ক (যা অনেকাংশে ব্যক্তিগত কাদা ছোড়াছুড়িতে রূপান্তরিত হয়!) সেখানে কে মুক্তমনা আবার কে বদ্ধমনা (গুগলে সার্চ দিয়ে এর যথার্থ উত্তর পাইনি!) এ নিয়ে সে কি আলোচনা সমালোচনা, যদিও বেশিরভাগ বক্তব্য যেমন ছিলো তাচ্ছিল্যপূর্ণ তেমনি ছিলো নতুন প্রজন্মের জন্য একটি নেতিবাচক দৃশ্যপট প্রদর্শন করার মতই; তাই আবার খুঁজতে শুরু করলাম মুক্তমনা, বদ্ধমনা নিয়ে; আর মুক্তমনা বাংলা ব্লগ হতে যথার্থ উত্তর পেলাম মুক্তমনা সম্পর্কিত।

♦মুক্তমনা- যারা মুক্তচিন্তা বা স্বাধীন চিন্তায় আস্থাশীল, যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী তারাই মুক্তমনা; যারা হাজার বছরের লালিত ভাববাদী, অলৌকিকত্ব পূর্ণ, অবৈজ্ঞানিক দর্শনের ভিত্তিতে গড়া ধর্মীয় ও সামাজিক নিবর্তনমূলক অন্ধ কুসংস্কারের ও অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে বিজ্ঞানমনস্ক ও যুক্তিবাদী সমাজব্যবস্থা গড়নে বদ্ধপরিকর, এরাই মুক্তমনা; আর বদ্ধমনা’র সংজ্ঞা যে এর বিপরীত হবে তা নিয়ে নিশ্চয় দ্বিধা নেই কারো। এর পরেই অনেক কথোপকথন, মুক্তচিন্তক বা মুক্তমনা বা নাস্তিকদের কাজ কি শুধুই ধর্ম পোন্দানি( অশ্লীল শোনালো কিনা জানিনা!); সত্যতা যাচাইয়ে এবার দ্বারস্থ হলাম রণদীপম বসুর “ভারতীয় দর্শন(১ম)” ও “নাস্তিক্য ও বিবিধ প্রসঙ্গ” সম্পর্কিত বইগুলোর দিকে; সাথে অভিজিৎ রায়ের “বিশ্বাসের ভাইরাস” তো ছিলোই; কি বুঝলাম সেখান হতে -

♦মুক্তমনা, যুক্তিবাদী, নাস্তিক, অজ্ঞেয়বাদী, সংশয়বাদী- যে নামেই সম্বোধন করিনা কেন এখানে একটি বিষয় সুস্পষ্ট আগেই হয়েছে যে এরা সবাই বিজ্ঞানমনস্ক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদে আস্থাশীল; এরা কেউ বিশ্বাসে বিশ্বাসী নয়, বরং যুক্তিতে বিশ্বাসী; যেকোন বিষয়ে সংশয় প্রকাশ, তা পর্যালোচনা, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এরপর গ্রহণীয় না অগ্রহণীয় তা বিবেচ্য; ভারতীয় দর্শন নাস্তিক বা চার্বাকদের নিয়ে স্বতন্ত্র কোন গ্রন্থ সেভাবে চিহ্নিত না করা গেলেও বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থগুলোই নাস্তিক বা চার্বাকদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়; ধর্মগ্রন্থগুলোর বিভিন্ন আয়াত বা শ্লোকাদিতে নাস্তিকদের সংগ পরিত্যাগ সহ তাদের সমাজ বহির্ভূত করা সহ হত্যার আদেশও বর্ণিত আছে; যাই হোক ঐ কুটকচালিতে যাচ্ছিনা, এখন প্রাসঙ্গিক আলোচনা করি; মুক্তমনা বা নাস্তিকরা কি ধর্মবিরোধী? এ প্রশ্নের যথার্থ উত্তর যদিও আগে দিলেও তা হয়তো অলক্ষ্য হয়েছে তাই আরো একটু স্পষ্ট করি- ধর্মগ্রন্থগুলো মূলত বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের মূলচালিকা শক্তি, মুক্তমনা বা নাস্তিকরা যেহেতু তাত্ত্বিক ও যৌক্তিক পর্যালোচনায় বিশ্বাসী, তাতে দেখা যায় ধর্মের মাঝে নৃশংসতা, বর্বরতা, বৈষম্য, ব্যভিচার, নারীকে অবমূল্যায়ন সহ বর্তমান বাস্তবতার ভিত্তিতে ওগুলো অগ্রহণযোগ্য, তাই সেই অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধাচরণ স্বাভাবিকতা; স্টিভেন ওয়াইনবার্গের কাছে ধর্মের সংজ্ঞাটি যেমন- “ধর্ম মানবতার জন্য এক নির্মম পরিহাস। ধর্ম মানুক বা নাই মানুক, সবসময়ই এমন অবস্থা থাকবে যে ভালো মানুষেরা ভালো কাজ করছে, আর খারাপ মানুষেরা খারাপ কাজ করছে। কিন্তু ভালো মানুষকে দিয়ে খারাপ কাজ করানোর ক্ষেত্রে ধর্মের জুড়ি নেই।” অপরদিকে ভারতীয় দর্শনে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে- নাস্তিক তাঁরাই যারা বেদের সিদ্ধান্ত প্রমাণরূপে গ্রহণ করেনা, সে অর্থেই বৌদ্ধ ও জৈনগণ পরলোক বিশ্বাস স্বীকার করলেও বেদনিন্দা করে নাস্তিকরূপে আখ্যায়িত হয়েছে; তবে এক্ষেত্রে চার্বাকগণ বেদ ও পরলোক উভয়ই অস্বীকার করে নাস্তিক শিরোমণি আখ্যায়িত হয়েছে; তাই চতুর্দশ শতকের দর্শন সংস্কারক মাধবাচার্য্য তাঁর “সর্বদর্শনসংগ্রহ” গ্রন্থে উদ্ধৃত করেন- “নাস্তিকাশিরোমণিনা চার্বাকেণ” অর্থাৎ নাস্তিক শিরোমণি চার্বাক; উপরোক্ত আলোচনায় একটি বিষয় দৃশ্যমান তা হলো- নাস্তিক বা চার্বাকগণ সামাজিক রীতিনীতির মধ্য থেকে সমাজপতি কর্তৃক সৃষ্ট অলৌকিক সৃষ্টিকর্তা বা আদর্শের নাম ভাঙিয়ে পরলোকের সুখস্বপ্ন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে ভাগ্যবাদ ও সৃষ্টিকর্তার পরীক্ষা নামক মিথ্যে ফাঁদগুলোর যুক্তিযুক্ত সমালোচনা করেছে; প্রত্যাশিত মানবতার মুক্তি, দাসত্বপ্রথা হতে চিরমুক্তি; মুক্তমনারা সেই চার্বাক, নাস্তিক শিরোমণি।

আজকের মুক্তচিন্তার জগতে সংশয়, দ্বিধা, দ্বিমত থাকার পাশাপাশি রয়েছে বিশ্বাসহীনতার চর্চা; তা আলোচনা পূর্বে বাংলাদেশে মুক্তচিন্তার ঐতিহাসিক ও নৃশংস চিত্রগুলো পর্যালোচনা করার জন্য বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া মুক্তচিন্তার চর্চাকারীদের উপর নৃশংস ও বর্বরোচিত হামলা হত্যার ঘটনাগুলো ইন্টারনেট-এ সার্চ করতে গিয়ে কাজী মাহবুব হাসান-এর একটি অনুবাদ পড়লাম, তাই সেই ঘটনাটি মনে দাগ কেটেছিলো; “হিতোশি ইগারাশি” ইসলামিক আর্ট-এর উপর জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় হতে পিএইডি ধারী, পাশাপাশি ইসলামিক বিপ্লবের পূর্ব পর্যন্ত রয়াল অ্যাকাডেমি অফ ইরান, তেহরান-এ ফেলো হিসেবে কর্মরত ছিলেন; ১৯৮৮সালে প্রকাশিত সালমান রুশদি’র “দ্যা স্যাটানিক ভার্সেস”এর জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেন (১৯৯১সালে); ধর্ম অবমাননাকর বইয়ের অনুবাদ করার জন্য ১৯৯১সালে ১২জুলাই তাকে ইরানের ইসলামিক আততায়ীরা তাঁর ৭তলার অফিসের লিফটের সামনে মাথায়, কাঁধে, ঘাড়ে কুপিয়ে হত্যা করে; উল্লেখ্য যে উপরোক্ত বইয়ের প্রকাশক, অনুবাদক, লেখককে হত্যার জন্য তৎকালীন ইরানের ধর্মীয় শীর্ষনেতা আয়াতোল্লাহ রুহুল্লা খোমেনী ফতোয়া দেন ১৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৯-এ; এর আগে ৩জুলাই ১৯৯১-এ ইতালীর মিলানে এ্যাত্তোরি ক্যাপ্রিয়ালো ইতালীয় অনুবাদক এবং ১৯৯৩-এ নরওয়ের একজন প্রকাশক উইলিয়াম নেয়াগার্ড উপরোক্ত কারণে ধর্মান্ধ ইসলামবাদীদের নৃশংস আক্রমণের শিকার হয়ে বেঁচে যান।

এখন আমরা চোখ ফেরাবো বাংলাদেশের দিকে, কি হয়েছে মুক্তচিন্তার জন্য মুক্তমনাদের সাথে-

♦শুরুটা যুদ্ধাপরাধী কসাই কাদের ওরফে কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন রায় দেবার পর ৫ফেব্রুয়ারি ২০১৩ থেকে। রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নেমেছিল কয়েকজন ব্লগার শাহবাগে, গড়ে তুলেছিলো গণজাগরণ মঞ্চ।

♦এরপরেই বিভিন্ন মাধ্যম ঘুরে প্রকাশিত হয় ৮৪জনের হিট লিস্ট; সংগঠনগুলোর দেওয়া এ তালিকাগুলোতে মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও লেখক অভিজিৎ রায়, মুক্তমনা ব্লগের আরেক ব্লগার, লেখক ও ব্যাংকার অনন্ত বিজয় দাশ, গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক ও অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট আহমেদ রাজিব হায়দার শোভন এবং নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয়ের নাম ছিল। তবে অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট ওয়াশিকুর রহমান বাবুর নাম এ লিস্টে ছিল না।

তালিকায় থাকা অন্য ব্লগার হলেন— দূরের পাখি, রাস্তার ছেলে, আরিফুর রহমান, মনির হাসান, বৃত্তবন্দি, সবাক, শয়তান, মনজুরুল হক, কখগ, রাসেল, নাস্তিকের ধর্মকতা, আরিফুল হক তুহিন, তিতি আনা, নাজিম উদ্দিন, আলমগীর কুমকুম, ফরহাদ উদ্দিন স্বপন, দস্যু বনহুর, ফারহানা আহমেদ, ঘনাদা, রাহান, অন্যকেউ, পাপী০০৭, হোরাস, প্রশ্নোত্তর, ভালোমানুষ, ভুপীর, বৈকুণ্ঠ, সত্যান্বেষী, পড়ুয়া, হাল্ক (সানাউল), বিপ্লব০০৭, ঘাতক, বিশাল বিডি, সাহোশি ৬, লাইটহাউজ, মমতা জাহান, রাতমজুর, কৌশিক, মেঘদূত, স্বপ্নকথক, প্রায়পাস, আহমেদ মোস্তফা কামাল, লুকার, নুহান, সোজাকথা, ট্রানজিস্টার, দিওয়ান, রিসাত, আমি এবং আধার, অরণ্যদেব, কেল্টুদা, আমি রোধের ছেলে, ভিন্ন চিন্তা, আউটসাইডার, প্রণব আচার্য্য, আসিফ মহিউদ্দিন, আবুল কাশেম, আলমগীর হোসেন, আশীষ চ্যাটার্জি, বিপ্লব কান্তি দে, দাঁড়িপাল্লা ধমাধম (নিতাই ভট্টাচার্য), ইব্রাহীম খলিল সবাগ (সুমন সওদাগর), কৌশিক আহমেদ, নুরনবী দুলাল, পারভেজ আলম, রতন (সন্ন্যাসী), সৈকত চৌধুরী, শর্মী আমিন, সৌমিত্র মজুমদার (সৌম্য), আল্লামা শয়তান (বিপ্লব), শুভজিৎ ভৌমিক, সুমিত চৌধুরী, সৈকত বড়ুয়া, সুব্রত শুভ, সুশান্ত দাস গুপ্ত, সৈয়দ কামরান মির্জা, তাহসিন, তন্ময়, তালুকদার ও জোবায়ের সন্ধি।

♦গণজাগরণ মঞ্চ-এর আন্দোলন শুরু পূর্বে ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত বইমেলা থেকে বেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিজের বাসায় যাওয়ার পথে ঘাতকদের আক্রমণের শিকার হন লেখক ও শিক্ষক হুমায়ুন আজাদ। বিদেশে নিবিড় চিকিৎসার মাধ্যমে তিনি কিছুটা সুস্থ হন। পরবর্তীতে জার্মানীতে নিজ রুমে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়, সাথে তাঁর পরিবারকে লিখে যাওয়া শেষ ৩টি চিঠিই পাওয়া যায়, সেগুলোই হয়তো তাঁর শেষ লেখা ছিলো; পাক সার জমিন সাদবাদ, নারী বইগুলো তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়।
♦উপরোক্ত লিস্ট প্রকাশের পূর্বেই অনলাইনে ধর্ম নিয়ে কঠোর সমালোচনার জন্য ২০১৩সালের ১৫জানুয়ারি ব্লগার “আসিফ মহিউদ্দিন” ইসলামবাদীদের হামলার শিকার হয়েও প্রাণে বেঁচে যান; তাকে মাথায়, কাঁধে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিলো, কিন্তু ভারী শীতের পোশাক থাকার কারণে বেঁচে গিয়েছিলেন।

♦২০১৩সালের ১৫ফেব্রুয়ারি ব্লগার ও গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংঘটক স্থপতি রাজীব হায়দার শোভন (থাবা বাবা নামে ব্লগে পরিচিত!)’কে চাপাতি দিয়ে মাথায়, কাঁধে, ঘাড়ে এমনভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিলো যে তাঁর পরিবার তাকে সনাক্ত করতে দ্বিধান্বিত হয়ে গিয়েছিলো।

♦২০১৪সালের ১৫নভেম্বর বাউল মতাদর্শী রাবি’র সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক শফিউল ইসলামকে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে; তিনি নারীদের নেকাব ও বোরকা পড়ার বিষয়ে নিষেধ করতেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন ঐসব পোশাক পড়ে শিক্ষার্থীরা নকল করার চেষ্টা করতে পারে।


♦২০১৫সালের ২৬ফেব্রুয়ারি ব্লগার ও স্বনামধন্য মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায় ও তাঁর জীবনসঙ্গী বন্যা আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিক্ষক মিলনায়তন-এর সম্মুখে জনবহুল স্থানে ইসলামবাদী সন্ত্রাসীদের নির্মম শিকার হন; অভিজিৎ রায়কে টার্গেট করে চাপাতি উপুর্যুপরি মাথায়, কাঁধে, ঘাড়ে, হাতে, বগলের নিচে কোপানো হয়, মাথার মগজ বেড়িয়ে আসে এক পর্যায়ে, অভিজিৎ-এর মৃত্যু নিশ্চিত করে, তাকে বাঁচাতে গিয়ে বন্যা নিজেও নির্মমভাবে আহত হয়, হাতের একটি আঙুল হারায়।


♦২০১৫সালের ৩০মার্চ ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু (কুৎসিত হাঁসের ছানা, হাঁসজারু বিভিন্ন ছদ্মনাম দিয়ে লিখতেন!) নৃশংসভাবে খুন হন ধর্মান্ধ মোল্লাগোষ্ঠি দ্বারা; তারা চাপাতি দিয়ে শুধু ওর মাথায়, ঘাড়ে, কাঁধে আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করে; অভিজিৎ মৃত্যুর পর ওর প্রোফাইল ফটো ছিলো “i am avijit” এবং সেই লিখেছিলো “শব্দ কখনো মরেনা” “Words Cannot Be Killed”।


♦২০১৫সালের ১২মে মুক্তমনা’র ব্লগার, যুক্তি সাময়িক পত্রিকার সম্পাদক ও ব্যাংকার অনন্ত বিজয় দাশ’কে উগ্র ইসলামবাদীরা কুপিয়ে হত্যা করে।

♦২০১৫ সালের ৭আগস্ট মুক্তমনা ব্লগার ও বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির সম্পাদক নীলাদ্রী চট্টোপাধ্যায় (নিলয় নীল তাঁর ছদ্মনাম!) নিজ বাসায় পরিবারকে জিম্মি করে মৌলবাদী গোষ্ঠী তাকে নৃশংসভাবে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে, উল্লেখ্য যে, নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশকে জানানোর পরও পুলিশ কোন ব্যবস্থা নেয়নি।

♦২০১৫সালের ৩১অক্টোবর মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী জাগৃতি প্রকাশনার কর্ণধার ফয়সাল আরেফিন দীপন বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তিবাদী লেখক অভিজিৎ রায়-এর “বিশ্বাসের ভাইরাস” প্রকাশের জন্য মৌলবাদীদের চক্ষুশূল হন, তাকে তাঁর কার্যালয়ে মৌলবাদীরা কুপিয়ে নৃশংসতার সাথে হত্যা করে।


♦২০১৫সালের ৩১অক্টোবর ঐ একই দিনে মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী শুদ্ধস্বর প্রকাশনার কর্ণধার আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল অভিজিৎ রায়-এর বই প্রকাশের জন্য নিজ কার্যালয়ে মৌলবাদী কর্তৃক আক্রান্ত হন, সাথে লেখক রণদীপম বসু ও কবি তারেক রহমানও মারাত্মকভাবে আহত হলেও প্রত্যেকে প্রাণে বেঁচে যান, তাদেরকেও চাপাতি দ্বারা কোপানো হয়েছিলো।

♦২০১৬সালের ৬এপ্রিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনবিভাগেরর শিক্ষার্থী নিজাম উদ্দিন সামাদ উদারপন্থী ব্লগার ও সেক্যুরালিজম-এর ধারক হওয়ায় তাকে ইসলামী উগ্রবাদীরা কুপিয়ে হত্যা করে।

গল্পের শুরুটা যেখানে সেখানে আরো কত কি, মুক্তচিন্তা, রাজাকার বিরোধী আন্দোলন ও তৃতীয় লিঙ্গ বৈষম্য সমর্থন করার জের ধরে ধর্মান্ধরা কি হত্যাযজ্ঞে মেতেছিলো-

♦২০১৩ সালের ২ মার্চ শনিবার রাতে সিলেটে গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক, ছাত্রলীগের সাবেক নেতা জগৎজ্যোতি তালুকদার হত্যা করা হয়।

♦২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর বগুড়া জেলা সেক্টরস কমান্ডারস ফোরামের যুগ্ম সম্পাদক, গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সমন্নয়ক, বগুড়ার শেরপুর ডিগ্রি কলেজে গণিত বিভাগের প্রভাষক জিয়াউদ্দিন জাকারিয়া বাবু’কে হত্যা করা হয়।

♦২০১৬সালের ২৩এপ্রিল রাবি’র ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক রেজাউল করিম কে মৌলবাদী সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে হত্যা করে।

♦২০১৬ সালের ২৬এপ্রিল লিঙ্গ সমতা প্রতিষ্ঠার পক্ষে ‘রূপবান’ নামে সাময়িকীর সম্পাদক ইউএসএআইডি’র কর্মকর্তা জুলহাস মান্নান এবং তাঁর বন্ধু তনয় মজুমদার’কে বাসায় ঢুকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা।

এ হত্যাযজ্ঞের তালিকা আরো দীর্ঘতর হতে পারে সে নিশ্চয় সকলেই অবগত; কেন এ তথ্যগুলোর পূনরাবৃত্তি? এ প্রশ্ন আসা স্বাভাবিকতা, আমি সেটিই বলতে চাই আমার মতো করে--

উপরোক্ত ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে প্রতিটি ঘটনার মোটিফ প্রায় একই, আর তা হচ্ছে ধর্ম অবমাননা বা ধর্মানুভূতিতে আঘাত; বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের ধ্বজভঙ্গ অনুভূতি স্বাভাবিকতা; কারণ পর্যালোচনা করলে কি দেখবো- রাষ্ট্রযন্ত্র ক্ষমতায় টিকে থাকার লোভে পড়লে যা হয় তাঁরই লক্ষণ এটি; এ কথা উল্লেখ করলাম একটি ঐতিহাসিক সূত্র ধরে; পাকিস্তানি নাগরিক ফাতিমা ভূট্টোর “সংস অব ব্লাড এন্ড সোর্ড” বইটি পড়তে গিয়ে চোখে পড়েছে, পরবর্তীতে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক-এ বেনজীর ভূট্টোর হত্যাকান্ড নিয়ে একটি প্রামান্য চিত্র দেখতে গিয়ে আমি ঘটনাগুলো উপলব্ধি করি; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান- বাঙালির এক ঐতিহাসিক ভিত্তিমূলের নাম, আজকের বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও অবিসংবাদিত এক নেতৃত্বের নাম, যার নেতৃত্ব বাঙালির মুক্তির সনদ এনে দিয়েছিল, দিয়েছিলো একটি স্বাধীন পতাকা; আজকের করচা শুধুমাত্র একটি ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষাপট নিয়ে, হয়তো এই ঐতিহাসিক সত্য বঙ্গবন্ধু’কে আরো একটু জানতে প্রণোদিত করবে।বাংলাদেশের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর যেমন এক ঐতিহাসিক স্থান দখল করে আছে, একইভাবে পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টো ও তাঁর পরিবারও ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।

২৩জুন, ১৯৪৯ ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম আওয়ামীলীগ’ যা ১৯৫৫’তে এসে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামীলীগ নামকরণ হয়- ভিত্তি ছিল সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা মহাউত্থান আর রাষ্ট্রব্যবস্থার মূলমন্ত্র; এটিই ছিল তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান শাসনমালে একমাত্র বিরোধী দল; বঙ্গবন্ধু এ মহান দলটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ছিলেন ১৩বছর, আর রাজনৈতিক দল হিসেবে তাঁর উপস্থিতিতে যা ঘটেছে তার বাস্তবতা- ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’।
পাঠক মনে প্রশ্ন আসতেই পারে এ আলোচনায় ভুট্টো পরিবারকে টেনে আনার কি কারণ? হ্যাঁ যৌক্তিক প্রশ্ন। ১ডিসেম্বর, ১৯৬৭সালে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু ‘পাকিস্তান পিপলস্ পার্টি'(পিপিপি)’র; পশ্চিম পাকিস্তানে ইয়াহিয়া খান-এর ঘরের শত্রু বলে পরিচিত হচ্ছিলো এ দল; রাজনৈতিক ইতিহাসে এ পরিবারটির হারানোর হিসেবটাও নেহাত কম নয়, জুলফিকার আলী ভুট্টো সামন্তবাদী পরিবারে জন্ম হয়েও সেই সামন্তবাদের বিরুদ্ধে লড়েছেন, আমি তাঁর রাজনৈতিক আদর্শিক আচরণ নিয়ে কথা না বলে বলবো বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক আদর্শিক প্রভাব আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কতটা প্রভাব বিস্তার করেছিলো তাঁরই প্রমাণ জুলফিকার আলী ভুট্টো’র বক্তব্য-
বঙ্গবন্ধু’র ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবীর মধ্যে শুধু ‘স্বতন্ত্র সংসদ ও স্বতন্ত্র বাঙালি মুদ্রা’ ছাড়া সবগুলো নীতিই সমর্থন করেছিলো।
ইয়াহিয়া খান কোনভাবেই চায়নি সমাজতান্ত্রিক কোন দল সে আওয়ামীলীগ বা পিপিপি যেই হোক শাসনতন্ত্র নিবে, তাই পরিকল্পিত ভাবে ১মার্চ ১৯৭১-এ বেসামরিক মন্ত্রীসভা ও জাতীয় সংসদ অধিবেশন দুটোই বাতিল করে।কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান সরকার ভেঙে পড়া শুরু করে যেমন বঙ্গবন্ধু’র নেতৃত্বাধীন দলের কার্যক্রমের জন্য, অপরদিকে জুলফিকার আলী ভুট্টোও তাঁর প্রচারনা কার্যক্রম ত্বরান্বিত করে যা ইয়াহিয়া খানের বিপক্ষে চলে যায়।
২৫মার্চ ১৯৭১- ভুট্টো, ইয়াহিয়া ও বঙ্গবন্ধু’র আলোচনা ভেস্তে যাওয়া, সামরিক জান্তা টিক্কা খান তাঁর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ শুরু করে;
করাচিতে খবর পৌঁছুলো পাকিস্তানি সামরিক জান্তা কর্তৃক মহিলাদের উপর অনৈতিক সহিংসতা ও বুদ্ধিজীবী হত্যার বিষয়ে, অনুরূপ হত্যাযজ্ঞ তারা পশ্চিম পাকিস্তানের সিন্ধুতেও করার পরিকল্পনা করেছে; এ খবরটি সিন্ধুর একজন আইনজীবী আব্দুল ওয়াহেদ কাটপার-এর মাধ্যমে পিপিপি সভাপতি জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে পৌঁছুলে তাঁর ঐ সময়ের অভিব্যক্তি বঙ্গবন্ধু’র নেতৃত্বের গুণাবলিকে এক অন্যরকম উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে; বক্তব্যটি এমন ছিলো-
জুলফিকার ফোন নিয়ে জেনারেল গুল হাসানের সাথে কথা বললেন, গুল হাসান ছিলেন তখনকার সিন্ধুর করপ-কমান্ডার; জুলফিকার আলী ভুট্টো ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন- “আমি শুনেছি আপনারা পূর্ব পাকিস্তানে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছেন; যদি আপনারা এই জঘন্য অপরাধ সিন্ধুতেও সংঘটিত করেন, তবে আমি হবো আপনাদের জন্য দ্বিতীয় মুজিব এবং আপনাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবো”।

উপরোক্ত ঘটনা আমাদের নিশ্চয় আন্দোলিত করবে কিছুটা, আর পাকিপন্থীরা খুব খুশি হবে; আমি এর পরের গল্পে যাই- তৎপরবর্তী রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দোলাচলে জুলফিকার -এর ফাঁসি হয় তাঁর নির্বাচিত প্রতিনিধি সেনাপ্রধান কর্তৃক, অপরদিকে বঙ্গবন্ধুও স্বাধীন বাংলায় আপনজনের মাঝে থেকেও পরিবারসহ নিহত হলেন; একটি যুগের অবসান, উভয় ঘটনার সামঞ্জস্যতা হচ্ছে পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে মৌলবাদী চক্রগুলো সংঘবদ্ধ হচ্ছিলো আর প্রগতিশীল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক দল গুলো আদর্শিক দ্বন্ধে বহুভাগে বিভাজিত হলো; কারো কাছে কার্ল মার্কস, কারো কাছে লেনিন, কারো কাছে স্টালিন, কারো কাছে মাও, কারো কাছে কনফুসিয়াস, আরো কত কি; বামদলগুলো জনসমর্থন হারাচ্ছিলো দিনদিন, আজো তারা একার্থে জনবিচ্ছিন্ন, অথচ উগ্রবাদীরা সমন্বিত জোটবদ্ধ; এরকম প্রশ্নের উত্তর সহজতর হলো আদর্শগত দ্বন্ধ; বামেদের মাঝে যে সমস্যা ছিলো তা আরো প্রকট হলো যখন প্রতিপক্ষ তাদের নাস্তিকদের দল বলে আখ্যায়িত করলো; জনগণ যতক্ষণ অবধি তাঁর মৌলিক চাহিদা মোচন করতে না পারবে তাদের শেষ ভরসা যে ঐ অলৌকিক ঈশ্বর হবে তা নিয়ে দ্বিধার কোন অবকাশ নেই; যাই হোক পশ্চিম পাকিস্তানে বেনজীর পূর্ববর্তী সময় হতে ইসলামিক দল গুলো কর্তৃত্ব পরায়ণ হয়ে উঠে ফলশ্রুতি বেনজীরের অকাল মৃত্যু, শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার নেশায় কতটা বুদ হয়ে থাকলে মানুষ নিজের ভাইকে হত্যার আদেশ দিতে পারে; বাংলাদেশের বর্তমান সরকার একইপথে হাঁটছে, হেফাজত ইসলাম বা ইসলামিক আন্দোলন বা ওলামালীগ-এর মতো কট্টরপন্থীদের একেরপর এক দাবী মেনে নেয়া, শিক্ষাব্যবস্থাকে ইসলামিকরণ করার অপচেষ্টা, সংখ্যালঘু নির্যাতনে নিরব দর্শক, রোহিঙ্গা ইস্যুতে মুসলিম মানবতা প্রদর্শন, প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংসসহ ব্যাংকিং ও অন্যান্য আর্থিক কাঠামোর ভঙ্গুর গঠন, দ্রব্যমূল্যের অস্থিতিশীলতা, বেকারত্ব, বৈষম্য সবমিলিয়ে যে জটিল অবস্থা তার প্রতিবাদে বাম দলগুলো একটুআধটু নড়াচড়া করলেও তা রাষ্ট্রযন্ত্রে এক হাঁচিতেই স্থবির হয়ে পড়ে; এরপর রয়েছে বিচারহীন বিচার।

ব্লগারদের মধ্যকার এত বিচ্ছিন্নতাও কিন্তু আন্দোলনের সফলতার পেছনে ব্যর্থতারই কারণ; এখন অবধি ব্লগার হত্যার বিচার সুসম্পন্ন হয়নি, অপরদিকে প্রতিদিন একের পর এক ইস্যুর মাঝে ক্ষীণ সম্ভাবনা রয়েছে বিচার পাওয়ার; ভার্চুয়াল জগতের যুদ্ধ চলতেই আছে, ধর্মে ধ্বজাধারীরা জোটবদ্ধ হয়ে বিভিন্ন মুক্তচিন্তকদের বাধা প্রদান করছে প্রচারণায়, রিপোর্ট করে বা হ্যাক করে আইডি নষ্ট করছে; এরপরও বারবার জেগে উঠা, অনুপ্রাণিত হয় নতুন প্রজন্ম, কেউ ভিডিও ব্লগার, কেউ লেখালেখি করে ব্লগিং চালিয়ে যাচ্ছে; নাস্তিক বা মুক্তমনা ট্যাগ লাগানো সহজ, কিন্তু এর দায়বদ্ধতাও রয়েছে, মানুষের প্রতি, মানবতার প্রতি; “নাস্তিক্য ও বিবিধ প্রসঙ্গ” বই হতে একটু খন্ডিত অংশ সংযোজন করে শেষ করছি- “যে পাঠকের কাছে লেখক নন লেখাটাই গুরুত্বপূর্ণ, তিনিই সচেতন পাঠক এবং একজন সচেতন পাঠকই কেবল কোনো লেখা গ্রহণ। বা বর্জনের ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু যে পাঠকের কাছে লেখার চাইতেও লেখকই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যান, সে পাঠকের আবিষ্ট মনন-চোখ আসলো গ্রহণ-বর্জনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে প্রিয় লেখক কর্তৃক উৎসারিত সবকিছুই এ ধরনের পাঠকের কাছে অবর্জনীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়। অর্থাৎ তাঁরা একধরনের অন্ধ ভক্তিবাদের ফাঁদে আটকে যান। এই পাঠকদেরই বলা হয় ভক্ত পাঠক। কিন্তু অন্ধবিশ্বাস যেমন আসলে কোনো বিশ্বাসই নয়, অন্ধভক্তও প্রকৃতপক্ষে ভক্ত হয়না। কারণ তাদের কোনো বিবেচনাবোধ থাকেনা এবং এই ভক্তিবাদ বা পীরবাদ থেকেই অতঃপর জন্ম নেয় স্তুতিবাদ। আর অন্ধভক্তরাই রূপ নেয় স্তাবকগোষ্ঠীতে।”
“…পীর যা বলেন, যা করেন, যা দেখান, বিনা প্রশ্নে তাই হয়ে ওঠে তাঁদের কাছে অনুসরণীয়, অনুকরণীয়, পালনীয় দৃষ্টান্ত। যুক্তিবোধ রহিত এসব ভক্তের চোখে তাই পীরই একমাত্র আশ্রয়, বিকল্পহীন অবলম্বন।”

উপরোক্ত প্রবণতা যেমন- ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর মাঝে রয়েছে, তেমনি রয়েছে ব্লগার জগতে, বিশেষ করে বাঙালি ব্লগারদের মাঝেও; মৌলবাদীরা যেমন চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে যুক্তিবাদীদের স্তব্ধ করতে চায়, কথিত মুক্তচিন্তকরা পরস্পরকে হেয় করতে হেন চেষ্টা নেই করতে পারেনা; আর তাদের অন্ধভক্তদের এ কার্য়ক্রম পুরো মুক্তচিন্তার জগতে বিতর্কিত করে তোলে; আজ মুক্তমনা, নাস্তিক গালিতে রূপান্তরিত হয়েছে এদেরই কারণে; সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গোপনীয় বিষয়াদি প্রকাশের নগ্ন হুমকিতো চলছেই, কতক জনতো বিদেশগমন স্বার্থক করতে “গুরু মলমূত্রাদি মোবারক” বিশ্বাসে বিশ্বাসে; কেউ ২মাস, কেউ দেড় বছর মধ্যে নাস্তিক, মুক্তমনা হয়ে গড়ে উঠে; বেশিরভাগ না জেনে, না যাচাই বাছাই করেই অন্ধের মতো সব বিশ্বাস করে নাস্তিক/মুক্তমনা; ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠী যেমন ধর্মের অপব্যাখ্যা করে ধর্মীয় সব অপকর্মকে জায়েজ করার অপপ্রয়াস চালায়, কথিত নাস্তিকরাও ধর্মপোন্দানি যুক্তি ও তথ্যের আলোকে না করে মিথ্যাচার করে, এটা নিশ্চয়ই অনুচিত, ধর্মের ভিত্তিই তো মিথ্যে, তাহলে তা নিয়ে কেন মিথ্যাচার করতে হবে; নাস্তিক বা মুক্তমনা হওয়া, কত সহজ বিষয়টা! এগুলো হতে বেড়িয়ে আসার প্রচেষ্টারত আছে অনেকেই, ধর্মের জন্য ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে মুক্তচিন্তক হতাহত হয়েছে, বাংলাদেশ ধর্মের বিষবৃক্ষ উৎপাটনে পথিকৃৎ বললে হয়তো ভুল হবেনা।

কট্টরপন্থী, উগ্র, জঙ্গি, মৌলবাদী গোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় ভয় আমাদের এ কলম ও মস্তিষ্কজাত নিয়ে, তাই তারা বারবার পেছন থেকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মস্তিষ্ককে আর ভাবনার প্রকাশ করার কলম ধরার আঙুলকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়, কিন্তু আমরাতো জানি- “শব্দ কখনো মরেনা”…!

কৃতজ্ঞতা- অরুণাভ রহমান অঞ্জন ও আবীর রায়হান -এর টাইমলাইন, রণদীপম বসু’র ভারতীয় দর্শন খন্ডসমূহ, এবং সর্বোপরি গুগলসার্চ…!

ভারতবর্ষ ইংরেজ কর্তৃক দখলীকৃত না হলে... || রাণা

অদ্ভুতুড়ে ভাবনা। যদি ইংরেজরা ১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধে বা ১৭৬৪ সালের বক্সার যুদ্ধে হেরে বসত তাহলে ২০১৭ তে এসে পৃথিবীটাকে কেমন দেখতাম। ভৌ...