শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭

শুধুই কি মীরজাফর বিশ্বাসঘাতক? ।। অরিন্দম ভট্টাচার্য


১৭৫৭-এ পলাশীর 'যুদ্ধ'... ইংরেজদের হাতে সিরাজদ্দৌলার পরাজয়...বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর।

অনেকের ক্ষেত্রেই দেখেছি, এই 'বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর' শুধু মীরজাফরে আটকে থাকে না। ফরমায়েশি ইতিহাসের মাদকতায় তাঁদের চিন্তাভাবনা স্পাইরাল মোশনের মতন কুন্ডলি পাকিয়ে নির্দেশ করে এক বিশেষ 'ধর্মীয় সম্প্রদায়ের' দিকে। অর্থাৎ, মীরজাফর='ওরা'
মীরজাফর=বিশ্বাসঘাতক
'ওরা'=বিশ্বাসঘাতক।

এই বিষয়ে দুটো তথ্য প্রায় অবিকল টুকে নীচে দিয়ে দিলাম:

১। পলাশীর ষড়যন্ত্রে মুর্শিদাবাদ দরবারের অভিজাতবর্গের মধ্যে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন মীরজাফর ও জগৎশেঠ, যদিও উমিচাঁদ, রায়দুর্লভ, ইয়ার লতিফ প্রমুখও এতে জড়িত ছিলেন। তাই মীরজাফরই একমাত্র 'বিশ্বাসঘাতক', এটা সত্য নয়।জগৎশেঠের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইংরেজরা প্রথমে সিরাজদ্দৌলার জায়গায় নবাব হিসেবে ইয়ার লতিফ খানকে বসাবার মতলব করেছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা জগৎশেঠের মনোনীত প্রার্থী মীরজাফরের দিকে ঝুঁকল কারণ তারা জানত জগৎশেঠদের সাহায্য ছাড়া বাংলায় কোনো রাজনৈতিক পালাবদল সম্ভব নয়। কাশিমবাজারের ফরাসি কুঠির প্রধান জাঁ ল' (Jean Law), যিনি দরবারের নাড়ি-নক্ষত্রের খবর রাখতেন, পরিষ্কার লিখেছেন যে 'ইংরেজরা যা করেছে তা জগৎশেঠদের সমর্থন ছাড়া করতে কখনো ভরসা পেত না।' সুতরাং দেখা যাচ্ছে বিশ্বসঘাতকতার দায় শুধু মীরজাফরের নয়-জগৎশেঠদের দায় মিরজাফরদের চাইতে বেশি বই কম নয়।

আসলে ইতিহাস পরিক্রমায় একটু পিছিয়ে গেলেই দেখা যাবে যে অষ্ঠাদশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলার
সব কটা রাজনৈতিক পালাবদলে জগৎশেঠরাই মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। ওই সময়কার রাজনীতিতে পটপরিবর্তনের চাবিকাঠি ছিল জগৎশেঠদেরই হাতে।

২। 'জগৎশেঠ একজন না' (আমার লেখা)।

অষ্টাদশ শতকের গোড়া থেকেই বাংলার অর্থনীতিতে বণিক রাজারা বিশিষ্ট ভূমিকা নিতে শুরু করেছিলেন।
এই বণিকরাজাদের মধ্যে সবদিক থেকে অগ্রগণ্য ছিলেন জগৎশেঠরা। এঁদের বলা হয় 'Rothchilds of the East'। রাজস্থানের মারওয়ার অঞ্চলের নাগর থেকে এঁদের পূর্বপুরুষ হিরানন্দ সাহু 'ভাগ্যান্বেষণে' ১৬৫২ সালে পাটনা চলে আসেন। তাঁর সাত পুত্রের জ্যেষ্ঠ মানিকচাঁদ তখনকার বাংলার রাজধানী ঢাকায় এসে মহাজনি ব্যবসা শুরু করেন। এঁরা ছিলেন শ্বেতাম্বর জৈন।

ঢাকায় মানিকচাঁদের সঙ্গে নবাগত দেওয়ান মুর্শিদকুলি খাঁর ঘনিষ্ঠতা হয়। মুর্শিদকুলি যখন ১৭০৪ সালে দেওয়ানি দফতর ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত করেন, তখন তাঁর সঙ্গে মানিকচাঁদও ঢাকা ছেড়ে মুর্শিদাবাদে চলে আসেন। তখন থেকেই মুর্শিদকুলির আনুকূল্যে জগৎশেঠদের উন্নতির শুরু। তাঁদের রমরমা এই মানিকচাঁদ ও তাঁর উত্তরসূরী ফতেচাঁদের সময়। ১৭১৪ সালে মানিকচাঁদের মৃত্যুর পর তাঁর ভাগ্নে ফতেচাঁদ গদিতে বসেন। ফতেচাঁদের সময়েই জগৎশেঠরা প্রভাব ও প্রতিপত্তির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছয়। সম্ভবত মুর্শিদকুলির অনুরোধে মুঘল সম্রাট ১৭২২ সালে ফতেচাঁদকে 'জগৎশেঠ' (Banker of the World) উপাধিতে ভূষিত করেন। এই উপাধি বংশানুক্রমিক।

প্রায় তিরিশ বছর ধরে বাংলার বাণিজ্য, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব বিস্তার করে জগৎশেঠ ফতেচাঁদ ১৭৪৪ সালে মারা যান। তাঁর উত্তরাধিকারী হন তাঁর দুই পৌত্র জগৎশেঠ মহতাব রায় ও মহারাজা স্বরূপচাঁদ।

তথ্যসূত্র: 'নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদ'
               সুশীল চৌধুরী
               প্রকাশক: আনন্দ পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ
               প্রথম সংস্করণ,ষষ্ঠ মুদ্রণ ডিসেম্বর ২০১৫
               পৃষ্ঠা: ৩৭ এবং ৭৩

হয়তো অনেকেরই এই বিষয়গুলো জানা, তবুও...

মীরজাফর
ছবি সৌজন্যে: উইকিপিডিয়া

শুক্রবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৭

কুরআনে বিজ্ঞানের উৎস সন্ধানে।। সুষুপ্ত পাঠক


হযরত মুহাম্মদের সমসাময়িক মক্কায় শুধু যে উট আর দুম্মা চড়ানো রাখালই ছিল এমনটা আমাদের অনেকেরই ধারণা। এমন কি “সেই ১৪০০০ বছর আগে” এইরকম একটি বিস্ময় প্রকাশ করে আরবের সামাজিক অবস্থাকে আদিম বানানোর যে প্রয়াস তা সঠিক নয়। কারণ ততদিনে আরবরা অন্যান্য প্রতিভাবাণ জাতির সংস্পর্শে এসে জ্ঞান লাভ করেছিল। তবে হ্যা, আরবদের মধ্যে এই চিন্তা ও জ্ঞানের আলোতে আসা লোকজন খুব কম ছিল। তার মানে এই না তখন আরবদের মধ্যে কেউ চিকিৎসা বিজ্ঞান যেমন ভ্রুণ, মানুষের জন্ম রহস্য, মহাকাশ বিদ্যা, সূর্য, চাঁদ, পৃথিবী সম্পর্কে কোন ধারণা ছিল না। আরবদের মধ্যে সীমিত আকারে কিছু চিন্তাশীল মানুষদের মধ্যে এসবের চর্চা ছিল। তবে সেই সব জ্ঞান এরিস্টটলদের (খ্রিস্টের জন্মের ৩৫০ বছর আগে উনি পৃথিবীতে ছিলেন) মত জ্ঞানী যাদের জন্ম মুহাম্মদের জন্মের বহু বহু বছর আগে তাদের দ্বারা চালিত। এর আগে হিপোক্রেটাস ৪০০ খ্রিস্টপূর্বে চিকিৎসা বিজ্ঞানকে বিপুল সমৃদ্ধ করে ফেলেছেন। তিনি ব্যাখ্যা করে ছিলেন কেমন করে সন্তান জন্ম নেয়। এরিস্টটল ৩৫০ খ্রিস্টপূর্বে মানব শিশুর জন্ম রহস্য ব্যাখ্যা করেছিলেন। এছাড়া ভারতীয় চিকিৎসাবিদ চরক খ্রিস্টপূর্ব ১২৩ সময়ে ভ্রণ সম্পর্কে বিস্তারিত আবিষ্কার করেছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা হযরত মুহাম্মদের চাচাতো ভাই হারিস ইবনে কালাদা ছিলেন একজন সুচিকিৎসক। তিনি এরিস্টটল, হিপোক্রেটাস ও গেলেন লিখিত চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যায়ন করেছিলেন। উনার চিকিৎসাবিদ্যা এতই সুখ্যাতি হয়েছিল যে পারস্য সম্রাট খসরু তাকে রাজ দরবারে ডেকে নিয়ে যান। হারিস থেকে হযরত মুহাম্মদ কুরআনে ভ্রুণ, মানব শিশুর জন্ম রহস্য ও মহাকাশ জ্ঞান বিষয়ে অনেকটাই গ্রহণ করেছিলেন। যেমন কুরআন বলছে-
//৯৬:২ - সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে।
৭৫:৩৬-৩৯ মানুষ কি মনে করে যে, তাকে এমনি ছেড়ে দেয়া হবে? সে কি স্খলিত বীর্য ছিল না? অতঃপর সে ছিল রক্তপিন্ড, অতঃপর আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন এবং সুবিন্যস্ত করেছেন। অতঃপর তা থেকে সৃষ্টি করেছেন যুগল নর ও নারী।//
গেলেন, হিপোক্রেটাস, এরিস্টটল প্রমুখদের ধারণা ছিল এরকমই। হারিসের মত মক্কার প্রসিদ্ধ চিকিৎসকরা যে মেডিকেল সাইয়েন্স তখনকার যুগে পড়েছিলেন সেখানে গেলেনের ২৬টি বই ছিল তাদের পাঠ্য। কুরআনের বিজ্ঞান বিষয়ে আল্লার সমস্ত জ্ঞান এই হারিসদের মত বিদেশ থেকে লেখাপড়া করে আসা মানুষদের কাছ থেকে ধার করা। তবে হারিস হযরত মুহাম্মদের কুরআনের আয়াত নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করতেন। তিনি এসবকে মুহাম্মদের নিজস্ব কবিতা বলতেন। হারিসের মত শিক্ষিত জ্ঞানী লোকের হাসিরপাত্র হয়ে মুহাম্মদ কতখানি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন বুঝা যায় যখন বদরের যুদ্ধে পর হারিসকে বন্দি করে মুহাম্মদ হত্যা করার আদেশ দেন! (সুত্র: সীরাত ইবনে হিশাম)।
কুরআনে মহাকাশ ও চিকিৎসা সম্পর্কে যত আয়াত আছে সবই এরিস্টল ও টলেমির সময়কার জ্ঞান। বলাই বাহুল্য কুপারনিকাসের থিউরীর পর পূর্বাদের থিউরীর মৃত্যু ঘটেছিল। চিকিৎসা বিজ্ঞানের তখনকার সীমাবন্ধ যন্ত্রপাতির দরুণ তখন পর্যন্ত নারী-পুরুষের মিলন থেকে শিশু ভূমিস্ট হওয়া পর্যন্ত ধাপটি সম্পূর্ণ ছিল না। কুরআনে সেই অসম্পূর্ণটিই রয়ে গেছে। কুরআনে তাই রক্তপিন্ড থেকে মানুষের জন্মের দাবী আজকের আধুনিক বিজ্ঞানের আবিস্কারে বাতিল হয়ে গেছে। রক্তপিন্ডে থেকে ভ্রণ সৃষ্টির ধারণা এরিস্টল, গেলেন, হিপোক্রেটাসদের সময় পর্যন্ত প্রচলিত ছিল।
হারিসদের মত উচ্চ শিক্ষিত জ্ঞানী মানুষ যারা প্রাচীন গ্রীক জ্ঞানীদের রচনার সংম্পর্শে এসেছিলেন তারা জুয়ারী আর মদখোরদের ভাষা আরবীতে ধুবই দুর্বল ও ব্যাকরণগতভাবে ভুল কুরআনের বাণী শুনে হাসাহাসি করবে এটা খুবই স্বাভাবিক। এই জন্যই কুরআনে কাফেরদের কুরআন নিয়ে হাসাহাসিকে বার বার সাবধান করা হয়েছে ভবিষ্যতে দেখে নেয়া হবে বলে। আল্লাহ তাদের উপযুক্ত সাজা দিবেন। আল্লাহ উপরন্তু তাদের চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে তার সঙ্গে কাব্য প্রতিভার প্রতিযোগিতায় নামার জন্য! আরবের সামান্য কবিদের আল্লাহ খুবই শিশুসুলভ ভাষায় চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন এভাবে-
//এতদসম্পর্কে যদি তোমাদের কোন সন্দেহ থাকে যা আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, তাহলে এর মতো একটি সূরা রচনা করে নিয়ে এস। তোমাদের সেসব সাহায্যকারীদেরকে সঙ্গে নাও-এক আল্লাহকে ছাড়া, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো। (সুরা বাকারা-২৩)//
আরো-
//তারা কি বলে? কোরআন তুমি তৈরী করেছ? তুমি বল, তবে তোমরাও অনুরূপ দশটি সূরা তৈরী করে নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পার ডেকে নাও, যদি তোমাদের কথা সত্য হয়ে থাকে।(১১:১৩)//
শেক্সপিয়রের কোন লাইনকে যদি দেখিয়ে বলা হয়- যাও, অনুরূপ একটি লাইন লিখে নিয়ে এসো, যাদের পারো সাহায্য নিয়ে- এর অর্থ কি দাঁড়াবে? শ্রেক্সপিয়রের কাব্যগুণ কিভাবে বিচার করা হবে? কবিতার কি কোন সর্বচ্চ বিচারালয় আছে যেখানে লিখিত বৈশিষ্ট ও গুণ থেকে মিলিয়ে নিয়ে কাব্য গুণ কত মার্ক পেলো ঠিক করা হবে? নিঃসন্দেহে শ্রেক্সপিয়র অনেক বড় কবি, কিন্তু তার কোন একটি লাইনের অনুরূপ লিখে আনার চ্যালেঞ্জ কি শ্রেক্সপিয়র যে সব কারণে “বড় কবি” সেরকম কোন নির্ধারিত বৈশিষ্টের সঙ্গে বিচার করে রায় দেয়া যাবে? কুরআন নিয়ে হাসাহাসি কি আরবের লোকেরা এর দুর্বল কাব্য ভাষার জন্য করেছিল? তাহলে এই চ্যালেঞ্জ দিয়ে কি বুঝানো হয়েছে? কুরআন যদি এইরকম বোকা বোকা দাবী করে তার কাব্য গুণ নিয়ে তাহলে অবশ্যই কুরআনকেও বলা যায়- যাও গীতাঞ্জলীর অনুরূপ কোন কবিতা লিখে এনে দেখাও! গীতাঞ্জলীর অনুরূপ লিখতে তোমরা ব্যর্থ হবে!... কি হাস্যকর দাবী! অথচ সারা দুনিয়ার মুসলিমরা না বুঝে আজো দাবী করে, কুরআনের কোন সুরা মানুষ হাজার চেষ্টা করেও লিথতে পারবো না! এটি একটি বোকা বিশ্বাস। আরবী ভাষা জানা যে কেউ কুরআনের সুরার অনুরূপ সুরা লিখতে পারবে। শুধু তাই নয়, একজন ভাল আরবী ব্যাকরণ জানা লোক এক্ষেত্রে কোন রকম ব্যাকরণ ভুল করবে না।
কুরআন বার বার এই আকাশ, এই খেজুর গাছ, জয়তুনের ডাল, মধু ইত্যাদি দেখিয়ে বলছেন, তোমরা কি এসব দেখেও বিশ্বাস করতে পারো না আমিই মুহাম্মদের উপর কুরআন নাযিল করেছি?
//وَجَعَلْنَا فِيهَا جَنَّاتٍ مِن نَّخِيلٍ وَأَعْنَابٍ وَفَجَّرْنَا فِيهَا مِنْ الْعُيُونِ- আমি তাতে সৃষ্টি করি খেজুর ও আঙ্গুরের বাগান এবং প্রবাহিত করি তাতে নির্ঝরিণী
//لِيَأْكُلُوا مِن ثَمَرِهِ وَمَا عَمِلَتْهُ أَيْدِيهِمْ أَفَلَا يَشْكُرُونَ- যাতে তারা তার ফল খায়। তাদের হাত একে সৃষ্টি করে না। অতঃপর তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না কেন?// [সুরা ইয়াসিন-৩৪-৩৫]
এটা কি কোন ধর্মীয় গ্রন্থের ঐশ্বরিকতা প্রমাণ করে? কোন নবী ও তার দাবীকৃত ঈশ্বরের প্রমাণ এতে কিভাবে প্রমাণ হয়? ইহুদী-খ্রিস্টান মায় আরবের পৌত্তলিকরাও তো খেজুর, আঙ্গুর একজন ঈশ্বর তাদের জন্য তৈরি করেছেন বলে তারা বিশ্বাস করত। আবু জাহেল, আবু লাহাবও তো এই সমস্ত ফল তাদের জন্য আল্লাহর নিয়ামত বলে দাবী করতো। যখন হযরত মুহাম্মদকে নবী হিসেবে আল্লাহর তরফ থেকে কোন প্রমাণ হাজির করতে বলা হতো তখনই তিনি এইসব ছেলেভুলানো গান গাইতেন। আর এই জন্যই তথাকথিত কাফেররা কুরআন শুনে হাসাহাসি করতো।
কুরআন দাবী করেছে-
//وَإِنَّهُ لَكِتَابٌ عَزِيزٌ. لَا يَأْتِيهِ الْبَاطِلُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِهِ تَنْزِيلٌ مِنْ حَكِيمٍ حَمِيدٍ.
আর এটি নিশ্চয় এক সম্মানিত গ্রন্থ। বাতিল এতে অনুপ্রবেশ করতে পারে না, না সামনে থেকে, না পিছন থেকে। এটি প্রজ্ঞাময়, সপ্রশংসিতের পক্ষ থেকে নাজিলকৃত’-(সূরা ফুস্সিলাত , ৪১-৪২)।//
অথচ নিচের হাদিস বলছে কুরআনে বাতিল অনুপ্রবেশ করেছে খুবই প্রমাণ সাপেক্ষে!
//আয়শা বর্ণিতঃ পাথর ছুড়ে হত্যার এবং প্রাপ্ত-বয়স্ক পুরুষদেরকে স্তনের দুধ খাওয়ানোর আয়াত নাজিল হয়েছিল এবং একটা টুকরো কাগজে লিখে আমার বালিশের নীচে রাখা হয়েছিল। আল্লাহর নবী যখন মারা যান, তখন আমরা তাঁকে নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ি এবং তখন একটা ছাগল ঘরে ঢুকে কাগজটি খেয়ে ফেলে। (সুনন ইবনে মাজাহ, হাদিস ১৯৪৪)//
ইবনে ইসহাক ছাগলে খাওয়া আয়াতটি সম্পর্কে লিখেছেন (The Life of Muhammad, Karachi, p. 684): //আল্লাহ মুহাম্মদকে প্রেরণ করেন এবং তাঁর কাছে আসমানী কিতাব পাঠান। আল্লাহর প্রেরিত বাণীর অংশ ছিল পাথর ছুড়ে হত্যার আয়াত। ওমর বলতেন, “আমরা তা পড়েছি, আমাদেরকে তা শেখানো হয়েছিল, এবং আমরা তা শুনেছি। আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ পাথর ছুড়ে হত্যা করেছেন, এবং তাঁর মৃত্যুর পর আমরা পাথর ছুড়ে হত্যা করেছি।//
আয়াতটি সম্পর্কে সহিহ বুখারি ৮/৮১৭ বলছেঃ
//(ওমর বর্ণিত) ...আল্লাহ মুহাম্মদকে সত্যবাণী ও আসমানী কিতাব সহকারে প্রেরণ করেন, এবং আল্লাহর নাজিলকৃত বাণীর মাঝে ছিল বিবাহিত নারী ও পুরুষের জন্য পাথর ছুড়ে হত্যার আয়াত... আমার আশঙ্কা দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর কেউ কেউ বলবে, ‘আল্লাহর কসম আমরা আল্লাহর পবিত্র গ্রন্থে পাথর ছুড়ে হত্যার আয়াত খুঁজে পাই নি, এবং এভাবে তারা আল্লাহর নাজিলকৃত একটা বিশেষ বিধান পরিহার করে বিপথে যাবে। পাথর ছুড়ার শাস্তি আরোপিত হবে বিবাহিত নারী ও পুরুষের উপর, যারা অবৈধ যৌনকর্মের লিপ্ত হয়..//
কুরআনের মধ্যে কোন ভুল নেই, বা সেই ১৪০০ বছর আগে কেমন করে কুরআনের মধ্যে বিজ্ঞান, চিকিৎসা, ভ্রুণ সম্পর্কে তথ্য থাকতে পারে- আশা করি এরপর আর কোন দম্ভ বা বিস্ময় থাকবে না এ বিষয়ে। পৃথিবীর আর সব ধর্মীয় গ্রন্থের মত কুরআনেরও প্রচুর ভুল ও অসংগতি আছে- এই সত্যটি মুসলিম শিক্ষিত সমাজে প্রসার লাভ করুক-এটিই কাম্য।
https://m.facebook.com/notes/susupto-pathok/কুরআনে-বিজ্ঞানের-উৎস-সন্ধানে/450509255154483/

শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

এই জেরুজালেম, সেই জেরুজালেম...।।আনসারি মুহম্মদ তৌফিক




এই সেই শহর। যে শহরের এমন কোনো স্থান নেই যেখানটায় মানুষের রক্তের ছাপ পড়ে নি। যুগে যুগে রাজা বাদশাহরা এই শহরের কর্তৃত্ব পাওয়ার জন্য প্রয়োজনে লাখ লাখ নিরীহ মানুষ হত্যা করেছে। এই শহরের প্রতি দূর্বলতা যে শুধুমাত্র রাজা বাদশাদেরই ছিল তা নয়, নিরীহ মানুষরাও এই শহরের জন্য নিজেদের প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছে। ভাবতেই অবাক লাগে, প্রতিষ্ঠার সাড়ে তিন হাজার বছর পরেও এই শহরের চাহিদা বিন্দুমাত্র কমে নি। বরং দিনকে দিন বেড়েই চলছে ! কত কবি এই শহরকে নিয়ে কবিতা লিখেছে, কত ঔপন্যাসিক এই শহরের দৈনন্দিন জীবন নিয়ে উপন্যাস রচনা করেছে, কত শিল্পী এই শহরকে মনের মাধুরী মিশিয়ে তুলির আচড়ে ফুটিয়ে তুলেছে ক্যানভাসে- তার কি কোনো হিসেব আছে ?
.
বিস্ময়কর হলেও সত্য, এই একটিমাত্র শহরই পৃথিবীতে আছে যা ৫২ বার আক্রমনের শিকার হয়েছে। এই শহরের ভাগ্য এতই মন্দ যে, তা ৪৪ বার দখল-পুনর্দখল হয়েছে, ২৩ বার অবরোধের মুখে পড়েছে। আর পুরোপুরি ধ্বংশ হয়েছে কমপক্ষে ২ বার ! তবুও এই শহর টিকে আছে। শুধু টিকে আছে বললে ভুল হবে, সাড়ে তিন হাজার বছর ধরে এই শহর প্রভাবিত করে চলেছে সমগ্র পৃথিবীর মানুষকে। এই শহরকে বলা হয় এক ঈশ্বরের আবাসস্থল, দুই জাতির রাজধানী ও তিন ধর্মের উপাসনালয়। হ্যা, আমি জেরুজালেমের কথাই বলছি। যাকে নিয়ে এখনো মানুষের উন্মাদনার কমতি নেই। ঐতিহাসিকরা বলেন, এই শহর রক্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই শহরের ইতিহাস মানুষের রক্ত নিয়ে উৎসব করার ইতিহাস।
.



সত্যিই তাই। খ্রীষ্টপূর্ব ১১০০ সালে বাদশা ডেভিড (দাউদ) দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র সলোমন (সোলায়মান) এর হাতে সুসজ্জিত জেরুজালেমের ইতিহাস আসলেই মর্মান্তিক সব ট্রাজেডিতে পরিপূর্ণ। এই শহর নিয়ে প্রথমে ইহুদী (বনি ইসরাইল), রোমান ও পারসিকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব হয়। তারপর তাতে যোগ দেয় খ্রীষ্টানরা। সর্বশেষে সেই দখলদারিত্বের প্রতিযোগীতায় অংশ নেয় মুসলিমরা। জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রন ইহুদীদের হাত থেকে একসময় রোমানদের অধিকারে আসে।
মুসলিমদের আগে ৫০০ বছর ধরে এই শহরের নিয়ন্ত্রন ছিল রোমানদের হাতে। রোমানরা ছিল খ্রীষ্টান। তখন ইহুদীদের জেরুজালেমে প্রবেশের অধিকার ছিল না। জেরুজালেমের ঐতিহাসিক দৃশ্যপটে যখন মুসলিমদের প্রতিনিধি হয়ে ওমর বিন খাত্তাব (হযরত ওমর) এই শহর বিজয় করেন তখন তিনি ইহুদীদের এই শহরে প্রবেশ করার অধিকার দেন। হযরত ওমর (রা:) যখন জেরুজালেমে যান, তখন সেখানকার দায়িত্বরত খ্রীষ্টান পাদ্রী সফ্রোনিয়াস তাঁকে পবিত্র উপসনালয়ে (বায়তুল মোকাদ্দাস) নামাজ পড়ার জন্য অনুরোধ করন। কিন্তু ওমর তাতে সম্মতি দেন নি। কারন, তাঁর আশঙ্কা ছিল তাহলে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত এই পবিত্র স্থানটি পরবর্তীতে মুসলিমদের হাতে পড়ে নামাজের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
.
চারশ বছর মুসলিম শাসনের পর তা পুনরায় খ্রীষ্টানদের অধিকারে আসে। উল্লেখ্য, খ্রীষ্টান শাসনামলে জেরুজালেমে কখনোই ইহুদীদের প্রবেশাধিকার ছিল না। কারন, ইহুদীরাই খ্রীষ্টানদের নবী হযরত ঈসা (আ:) [যীশু খ্রীষ্ট] কে হত্যা করেছিল। তবে এক্ষত্রে হযরত ওমর (রা:) যথেষ্ট উদারতার পরিচয় দিয়েছিলেন। ওমরের পরে সুলতান সালাহউদ্দিন পুনরায় জেরুজালেম দখল করেন। সালাউদ্দিনের পরে আবার খ্রীষ্টানরা। এভাবে দখল-পুনর্দখলের খেলা চলছিল মুসলিম ও খ্রীষ্টানদের মাঝে। সর্বশেষ ১৯৪৮ সালে জর্ডান কর্তৃক জেরুজালেম মুসলমানদের অধিকারে আসে। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে তা পুনরায় ইহুদীদের দখলে চলে যায়।
.
ইতিহাস বলে, জেরুজালেমের প্রশ্নে ইহুদী খ্রীষ্টান ও মুসলিম জাতি একে অন্যকে কখনো তিল পরিমাণ ছাড় দেয় নি। বর্তমানে ইব্রাহিমের পুত্র ইসহাকের বনি ইসরাইলদের বংশধর হিসেবে ইহুদীদের প্রতিনিধিত্ব করছে ইসরাইলিরা আর ইব্রাহিমের অপর পুত্র ইসমাইলের উত্তরসুরী আরবদের প্রতিনিধিত্ব করছে ফিলিস্তিনীরা। জানি না, হাজার বছরের সেই প্রতিশোধপরায়ণতা কোথায় গিয়ে শেষ হয়। শুধু এটুকুই বলবো, রক্তপাত বন্ধ হোক। জেরুজালেম আবারো ফিরে যাক তার সুসজ্জিত অতীতে।

বুধবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৭

অনস্তিত্বের_অনাচার...!।। সব্যসাচী সরকার


এক সকালের গল্প বলি-

রৌদ্রজ্জ্বল প্রকৃতিপূজায়,
নিত্য ব্যস্ত আমার হৃদয়;
সবুজপত্র আর হিমেল বাতায়নবর্তিনী,
পরস্পর যেন আনন্দ ক্রীড়াকৌতুকে মত্ত;
হঠাৎ একটি প্রশ্নবাণ ছিন্নকারী এ ভাবনার জাল-
হে মানুষ, তুমি কি ভীতসন্ত্রস্ত?


বিস্ফোরিত নেত্রপাত-
অতিসত্বর অশ্রুস্নাত হয়ে উঠলো;
আমি অনাগত প্রজন্মান্তরে-
নিজেকে তিরস্কৃত হতে দেখলাম!
লজ্জাবোধ করছিলাম ঘটিত ঘটনা বর্ণনে;

আমি আরশির সম্মুখীন-
সত্য ব্যতিরেক মনুষ্যমুক্তি অসম্ভব,
হ্যাঁ, আমি স্বীকারোক্তি দিলাম-
আমি অনস্তিত্বের অস্তিত্ব দেখে আতঙ্কিত,
কার্যকারণে ফল অমানবের এক পৃথিবী!

একজন সন্ত্রাসী সমাজবিরোধীকে যতটা না ভয়-
একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ আজ তাঁর থেকে ভয়ঙ্কর;
যে ধর্মের বাণী জগত জুড়ে শান্তিবৃষ্টি করাবে,
রক্তস্নাত ধর্মের ধ্বজাবাহীগণ;
অস্তিত্বহীন সত্ত্বার নৃশংস রূপদর্শন!

রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে-
ক্ষমতাসীন আর ক্ষমতাহীনের লড়াই কিছু নয়,
জয়বাংলা বাংলাদেশ জিন্দাবাদ তেজহীন আজ,
আল্লাহু আকবার-নারায়ে তাকবীর তেজোদৃপ্ত;
ধর্মান্ধ রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রগতিবিরুদ্ধ চর্চাক্ষেত্র;

মানবতা যেন ধর্মের দাসত্ব নিয়েছে,
সংখ্যালঘিষ্ঠের মতপ্রকাশ আত্মহনন সম;
ধর্মপ্রচারের নামে কুৎসা উগ্রতা ছড়ানো জায়েজ,
ধর্মীয় কুপ্রকৃতি উন্মোচন অনুভূতিতে আঘাতসম;
যেন ধর্মহীনের মানবীয় গুণাবলি অচ্ছুৎ!

যেথায় বিজ্ঞান প্রচার প্রসার নামমাত্র-
যেথায় গ্রন্থাগার স্থাপনে অর্থসংকট-
যেথায় তথ্যপ্রযুক্তি বইয়েই সীমাবদ্ধ-
যেথায় অ্যানরয়েড সেট বদ্ধ জ্ঞান অঙ্গন-
যেথায় আড্ডা মানে একসাথে গেইম বা ফেবু-
যেথায় শিক্ষাব্যবস্থা বাণিজ্যভিত্তিক-
যেথায় সৌদি-পাকি ঘেষা সংস্কৃতিচর্চা হয়-
যেথায় ধর্মের নামে মানুষ হত্যা জায়েজ করা হয়-
যেথায় প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রতি বিদ্বেষ প্রণোদিত-
যেথায় ধর্ষণ বিচারহীনতায় সাধারণ ঘটনা হয়-
যেথায় মাদ্রাসাভিত্তিক পঙ্গু শিক্ষার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক ও উগ্র তরুণ প্রজন্ম সৃষ্টির প্রয়াস-

আমরা কবে মানুষকে মানুষরূপে দেখবো-
আমরা কবে ধর্মের এ জাল ছিন্ন করে বেরুব-
আমরা কবে স্বপ্নের স্বাধীন বাংলার স্বাদ পাবো-

একবারো কি লজ্জা হয়না-
একবারো কি প্রশ্ন জাগেনা-
কোন গ্রন্থ, কোন কিতাব, কোন ধর্ম মানবজাতির বিকাশ সাধন করেছিলো?
আজ পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো কোন ঐশীশক্তির প্রভাবে তাদের অর্থনৈতিক মুক্তি এনেছিলো?
আধুনিক সমাজজীবনে জীবনমান উন্নতকরণে কোনধরনের শিক্ষাব্যবস্থা জরুরি?
মানবতার চর্চা কি ধর্মের বিচারের অধীনস্থ?
কাল্পনিক অনস্তিত্বের অনাচার সৃষ্ট পরিস্থিতি দেখেও কি চোখ বন্ধ করে রাখা সমীচীন?

এমন রক্তাক্ত সকাল আমি চাইনা-
ধর্মের কারণে বন্ধুত্ব হারাতে চাইনা;
এমন সাম্প্রদায়িক সমাজ চাইনা-
পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নীচ হতে চাইনা;
এমন আদর্শ বিস্তার চাইনা-
যা মানুষকে অমানব করে দেয়...!

ইসলাম। বিপদ এবার মুসলমানদের - সুষুপ্ত পাঠক


মুসলমানদের হাতেই একদিন জিহাদ নিষিদ্ধ হবে। মুসলমানরাই নিজেদের বাঁচাতে ইসলামকে বাতিল করে দিবে। কেন কথাটা বললাম বলি, সৌদি আরব সম্প্রতি হাদিসে মুহাম্মদের বাণী অনুসরণ করে যাতে কেউ জিহাদ করতে না পারে (নিজেদের বিপক্ষে গেলেই সেটার নাম হয়ে যায় জঙ্গিবাদ) তার জন্য একটা আলাদা কর্তৃপক্ষ নিয়োগ করেছে। আইএসসহ শিয়া জিহাদীরা সৌদি আরবে রাজতন্ত্র খতম করে ইসলামী খিলাফত বানাতে চায়। তেল পাবার পর বিগত ৫০ বছর এই সৌদি আরবই জিহাদী মাইন্ডের জনগোষ্ঠি তৈরি করতে সারা বিশ্বে প্রেট্টডলার অকাতরে ঢেলে গেছে। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানে পরিচালিত মাদ্রাসাগুলোতে জিহাদী তৈরিতে সৌদি ছক অনুযায়ী কাজ হয়েছে। সারা পৃথিবীকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বর্বর শরীয়া আইন নারীর উপর প্রয়োগ করেছে তারা। এতসব কিছুর মূলেই কুরআন এবং হাদিস। হাদিসগুলো রচিত হয়েছে প্রায় বারোশো বছর আগে। কাজেই তালেবান আইএস বা সৌদি আরব নিজেরা হাদিস বানায়নি। পৃথিবীতে যত জিহাদী দল আছে তারা সবাই কুরআন এবং হাদিসকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। সৌদি আরবের স্বার্থের বিপক্ষে জিহাদ প্রয়োগ হবার কারণেই আজ সৌদি আরব হাদিসের বাণীকে কেউ যাতে ‘জঙ্গিবাদের’ কাজে না লাগালে পারে তার জন্য নজরদারী করবে। অর্থ্যাৎ সৌদি আরবকেই এখন ‘জিহাদী বই’ হিসেবে কুরআন-হাদিস আটক করতে হবে!

ইসলাম ধর্মের বিপদটা অন্য ধর্মের চেয়ে ভিন্ন। অন্য ধর্মগুলোতে প্রথাগতভাবে অনুসারীকে নিপীড়ণের রাস্তা অনেক। হিন্দু ধর্মের ব্রাহ্মণবাদ থেকে রেহাই পেতেই জৈন, বৌদ্ধ ধর্মের সৃষ্টি হয়েছিলো। ইহুদী ধর্ম থেকে বেরিয়ে গিয়েই একদল খ্রিস্টান ধর্ম প্রবর্তণ করেছিলো। একসময় সম্রাট অশোক বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করার ফলে রাজ পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধ ধর্ম ছড়িয়ে পড়েছিলো সারা বিশ্বে। একইভাবে ইউরোপ খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করার কারণে রাজশক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় বিস্তার লাভ করেছিলো। মধ্যযুগে চার্চ রাজনৈতিক ক্ষমতা হাতে পেয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এটা সম্পূর্ণই ছিলো খ্রিস্টধর্মের অথেনটিক সোর্স বর্হির্ভূত। মার্টিন লুথার খ্রিস্টান ধর্মের পূর্ণজাগরণের ডাক দিলেন। লুথারকে বলা যায় খ্রিস্টানদের ‘সালাফি’ মতবাদের প্রবর্তক। কারণ তিনি ভক্তদের বলেছিলেন, চার্চের অপশাসন আর খবরদারী খ্রিস্টানরা মানবে কারণ খ্রিস্টের বাণীতে এসব কিছুই নেই। এইসব চার্চ, পোপ, স্বর্গের টিকিট বিক্রি, আইন ফরমাইন- এসব প্রকৃত খ্রিস্টধর্মে ছিলো না। লুথার খ্রিস্টানদের বললেন, পোপতন্ত্র আর চার্চকে প্রত্যাখান করে প্রভুযীশুর সত্যিকারের খ্রিস্টধর্মে আমাদের ফিরে যেতে হবে। ভারতবর্ষে বুদ্ধ, মহাবীরের মত মহাপুরুষরা বেদকে ভ্রান্ত বলেছিলেন। শ্রেণী বৈষম্য কোন ঈশ্বরের কাজ হতে পারে না। এসব বলেই তখনকার প্রচলিত ধর্মকে (আজকে যেটা হিন্দু ধর্ম হিসেবে ধরা হয়) প্রত্যাখান করে নিজ ধর্মমত প্রবর্তন করেছিলেন। শ্রী চৈতন্যদেব হিন্দুধর্মের জাতপাত বিলোপ করতে যে ডাক দিয়েছিলেন তাও লুথারের অনুরূপ। চৈতন্যদেব সেনরাজাদের প্রবর্তিত শ্রেণী বিভাজন বিলোপ করে আদি সনাতন ধর্মে ভক্তদের ফিরে যেতে উপদেশ দিয়েছিলেন। তথাকথিত নিচু জাতের হিন্দুদের নিয়ে তিনি পূর্বপুরুষদের ধর্মের আবার ফিরে যেতে চেয়েছিলেন।

একই ঘটনা ইসলাম ধর্মের ক্ষেত্রেও ঘটেছিলো। ইসলামী খেলাফত বিশ্বজুড়ে বহু বছর ব্যাপী রাজত্ব করার সময় শাসকদের স্বেচ্ছাচারিতা, ব্যক্তিগত বিশ্বাস ইত্যাদির কারণে ইসলামের মূল লক্ষ্য থেকে ক্রমশ দূরে সরে আসছিলো। এইরকম সময়ই আবদুল ওহাব ডাক দিয়েছিলেন মুসলমানদের অবশ্যই তাদের পূর্বপুরুষদের ধর্মে ফিরে যেতে হবে। নবী এবং তার সাহাবীরা যেভাবে দেশ চালিয়ে ছিলেন, যেভাবে পৃথিবীকে দেখতেন কুরআন হাদিসের দলিল ধরে সেভাবেই চলতে হবে। এই না চলার কারণেই মুসলমানরা খেলাফত হারিয়ে সারাবিশ্বে পরাজিত হয়ে পড়ছে। ওহাবের এই পূর্বপুরুষদের ধর্মে ফেলার ডাককেই ‘স্যালাফি’ বলা হয়। আশ্চর্য যে এটাকে ইসলামের উগ্রপন্থা বলা হচ্ছে। অথচ ওহাব স্রেফ কুরআন-হাদিস মোতাবেক মুসলমানদের চলতে বলেছেন। সেই থেকেই নতুন করে মুসলিমদের মধ্যে জেহাদ চেতনা, খিলাফত, দারুল ইসলাম, দারুল হার্ব, জিজিয়া, গণিমত, বাইতুল মাল ইত্যাদি বিশ্বাস জেগে উঠতে শুরু করেছিলো। আজকের সৌদি আরব, আইএস, তালেবান, লস্কর, আনসারুল্লাহ সবই ইসলামে পূর্ণজাগরণের ফসল। দেখা যাচ্ছে খ্রিস্টান স্যালাফি বা হিন্দু স্যালাফির ডাকে সেই ধর্মগুলো কমণীয় এবং নিরহ দর্শন হয়ে উঠেছিলো। কিন্তু ইসলামের পূর্বপুরুষদের ডাক বা স্যালাফি ডাকে ইসলাম হয়ে উঠেছে ভয়ংকর এক রক্তখেকো দানবে!

এখানেই ইসলাম আর অন্যসব ধর্মের মধ্যে মৌলিক তফাত। ইসলামে সরাসরি ইহুদী খ্রিস্টান হিন্দুদের (পৌত্তলিক) বিরুদ্ধে আজীবন লড়াই করে যেতে বলা হয়েছে। তাদের বন্ধু রূপে গ্রহণ করতে মানা করা হয়েছে। তাদের সম্পত্তি, নারী সমস্ত কিছু মুসলমানদের জন্য মালে গণিমত। ইসলাম পৃথিবীকে মুসলমানদের কব্জায় নিতে জিহাদ করতে বলে এবং অমুসলিমদের মুসলমানদের বশ্যতা শিকার করতে নির্দেশ দেয়। সৌদি আরব নিজে বেকায়দায় পড়েছে এইসব ঘৃণা আর সন্ত্রাসবাদের নির্দেশগুলো থেকেই। মুসলিম কোন শাসককে যদি মনে হয় তিনি ইসলাম অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছেন না তাহলে তার বিরুদ্ধেও জিহাদ করা যাবে দ্বিন প্রতিষ্ঠার জন্য। শিয়া এবং সুন্নী জিহাদীরা মনে করে রাজতন্ত্র কায়েম করে সৌদি আরব খিলাফত থেকে দূরে সরে গেছে। তাই তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ফরজ। তাই বলা যায় এখন খেলা সবে মাত্র শুরু হলো। সৌদি আরবের এখন মাথায় ঘা! মাথার যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে সে ইসলামকে নানাভাবে পঙ্গু করতে বাধ্য হবে। প্রতিটি ইসলামী রাষ্ট্র এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র ইসলামের এইসব ঘৃণা আর রাজনীতি দিয়ে প্রথমে অমুসলিমদের জীবন দুর্বিসহ করে তোলে। এভাবে তাদের নিঃশেষ করে পরে নিজেরাই ইসলামের বড় শিকারে পরিণত হয়। নিজেরাই গৃহহারা হয়ে পড়ে। মিশর, সিরিয়া এসব ছিলো খ্রিস্টানদের দেশ। এখান থেকে এরা নিঃশেষ হয়ে গেছে। এখন মুসলমানরাই এখান থেকে পালাচ্ছে। ইসলাম হচ্ছে ফ্রাঙ্কাইস্টাইন। যে তাকে ডেকে আনবে তাকেই সে শেষ করে দিবে!

শনিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৭

দুনিয়াজাত: সালমান রুশদী।। কাজী মাহবুব হাসান

Illustration by Boris Pelcer for The New Yorker

দুনিয়াজাত : সালমান রুশদী

“Wherever they burn books, in the end will also burn human beings.” – Heinrich Heine

(দ্য নিউ ইয়র্কার ম্যাগাজিনের জুন ১, ২০১৫ সংখ্যায় প্রকাশিত এই গল্পটি সালমান রুশদীর সাম্প্রতিক উপন্যাস, Two years eight months and twenty eight nights এর প্রথম অধ্যায়টি, যা The Duniyazat নামে প্রকাশিত হয়েছিল, এটি সেই অংশটির অনুবাদ প্রচেষ্টা- কাজী মাহবুব হাসান)

১১৯৫ খ্রিস্টাব্দে, মহান দার্শনিক ইব্ন রুশদ (১), সেভিয়ার (২) এক সময়কার বিচারক, আর খুব সাম্প্রতিক সময়ে তার নিজের জন্ম শহর কর্দোবায় (৩) খলিফা আবু ইয়ুসুফ ইয়াকুবের  (৪) ব্যক্তিগত চিকিৎসক, তাঁর উদারনীতিবাদী ধারণাগুলোর কারণে আনুষ্ঠানিকভাবে নিন্দিত এবং অপমানিত হয়েছিলেন, ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকা বারবার (৫) ধর্মান্ধদের কাছে যে ধারণাগুলো অগ্রহনযোগ্য ছিল, আর যারা সেই সময় মহামারীর মত ছড়িয়ে পড়েছিল আরব স্পেনে (৬)।

এবং তাঁকে অভ্যন্তরীণ নির্বাসনে বাস করার জন্য পাঠানো হয়েছিল লুসেনায় (৭) ছোট একটি গ্রামে। সেই গ্রামটি ছিল ইহুদী ঘণবসতিপূর্ণ একটি গ্রাম, যে গ্রামের ইহুদীরা আর কখনোই বলতে পারবেন না যে তারা ইহুদী ছিলেন, কারণ তাদের সবাইকে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করার জন্য বাধ্য করা হয়েছিল। ইবন রুশদ, একজন দার্শনিক, যার কিনা নিজের দর্শন ব্যাখ্যা ও প্রচার করার আর কোনো অনুমতি ছিল না, যার সব লেখাই নিষিদ্ধ আর সব পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল, তাৎক্ষনিকভাবেই বেশ স্বাচ্ছন্দ অনুভব করেছিলেন লুসেনার সেই ইহুদীদের সংস্পর্শে এসে, যে ইহুদীরা আর কখনো বলতে পারবে না যে তারা একসময় ইহুদী ছিলেন। বর্তমান শাসক রাজবংশ, আল-মোহাদ এর খলিফার একজন প্রিয় ভাজন ছিলেন তিনি, কিন্তু প্রিয়রা সব সময় প্রিয় থাকে না, এছাড়া খলিফা আবু ইউসুফ ইয়াকুবও ধর্মান্ধদের অনুমতি দিয়েছিলেন অ্যারিস্টোটলের এই মহান ভাষ্যকারকে তাঁর জন্ম শহর থেকে বিতাড়িত করতে।

দার্শনিক, যিনি তাঁর নিজের দর্শন নিয়ে আর কোনো কথা বলতে পারবেন না, পর্যাপ্ত আলোর অনুপস্থিতির কারণে সর্বক্ষণ ভয়ঙ্করভাবে নিপীড়িত হয়ে সেই গ্রামে বাস করতেন সংকীর্ণ, কাঁচা রাস্তার পাশে ছোট জানালাসহ খুব সাধারণ একটি বাড়িতে। লুসেনায় তিনি চিকিৎসা সেবা দেওয়া শুরু করেছিলেন, স্বয়ং খলিফার প্রাক্তন চিকিৎসক হিসাবে তাঁর পদমর্যাদা তাঁকে রোগী পেতে সহায়তাও করেছিল। উপরন্তু তাঁর যা সম্পদ ছিল সেটি তিনি ব্যবহার করেছিলেন বেশ সতর্কভাবে ঘোড়ার বাণিজ্যে প্রবেশ করার জন্য, এছাড়া তিনি, ‘তিনাজা’, বিশালাকার সেই মাটির পাত্র, বানানোর জন্যেও অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন, যে মাটির পাত্রগুলোর মধ্যে ইহুদীরা, যারা আর ইহুদী ছিলেন না, তাদের বানানো জলপাই তেল আর মদ সংরক্ষণ ও বিক্রি করতো।

ইবন রুশদের নির্বাসন শুরু হবার অল্প কিছুদিন পরেই কোনো একদিন, একটি মেয়ে, হয়তো বয়সে ষোল বছর হবে, তার দরজায় এসে হাজির হয়েছিল, নম্রভাবে হেসে, দরজায় কোনো টোকা না দিয়ে বা তার চিন্তায় কোনোভাবে অনুপ্রবেশ না করে, এবং ধৈর্য্য ধরেই শুধু সে দাড়িয়েছিল, যতক্ষণ না অবধি তার উপস্থিতি সম্বন্ধে তিনি সচেতন এবং তাকে ভিতরে আসতে আমন্ত্রণ না জানান। মেয়েটি তাকে বলেছিল, কেবলই সে অনাথ হয়েছে, তার আয়ের কোনো উৎস নেই, কিন্তু বেশ্যালয়ে কাজ করার ইচ্ছাও তার নেই, আর তার নাম হচ্ছে ‘দুনিয়া’, নামটি শুনতে ইহুদী কোনো নামের মত শোনায়নি যদিও, কারণ তার ইহুদী নামটি উচ্চারণ করার কোনো অনুমতি ছিল না, আর যেহেতু সে অশিক্ষিত ছিল, সে নামটি লিখতেও পারেনি। মেয়েটি তাকে বলেছিল যে এক যাযাবর ভ্রমণকারী তাকে এই নামটি প্রস্তাব করেছিল,এবং বলেছিল এটি গ্রীক শব্দ, যার অর্থ হচ্ছে ‘পৃথিবী’, এবং এই নামটির ধারণা তার বেশ ভালো লেগেছিল। ইবন রুশদ, অ্যারিস্টোটলের অনুবাদক, তার সাথে অযথা কোনো বিতর্কে জড়াননি, বহু সংখ্যক ভাষায় শব্দটির অর্থ যে ‘পৃথিবী’ সেটি যথেষ্ঠ ছিল এই পরিস্থিতিতে পণ্ডিতিপনা দেখানোর বিষয়টিকে অপ্রয়োজনীয় করে তোলার জন্য। ‘তাহলে কেন তুমি তোমার নাম পৃথিবীর নামে রেখেছো?’ তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন এবং মেয়েটি উত্তর দিয়েছিল, কথা বলার সময় তার চোখে চোখ রেখে, ‘কারণ একটি পৃথিবী আমার থেকেই প্রবাহিত হবে, আর যারা আমার থেকে বের হয়ে আসবে তারা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে।’

যুক্তিবাদী মানুষ হবার কারণে, ইবন রুশদ কোনো অনুমান করেননি যে মেয়েটি আসলে অতিপ্রাকৃত একটি প্রাণি, একজন জিনিয়া, নারী জিনদের একটি গোত্র : আর সে ছিল সেই গোত্রেরই প্রধান রাজকুমারী, সার্বিকভাবে মানব পুরুষ সম্বন্ধে তার বিশেষ মুগ্ধতা অনুসরণ করতেই যিনি পৃথিবী অভিযানে এসেছিল, বিশেষ করে সেই সব মানব পুরুষ, যারা অত্যন্ত মেধাবী। ইবন রুশদ তাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন তার ঘরবাড়ি দেখাশোনা ও প্রেমিকা হিসাবে, এবং পরে কণ্ঠরুদ্ধ শব্দহীন এক রাতে মেয়েটি তার কানে কানে তার ‘সত্য’ – যার মানে হচ্ছে, ‘মিথ্যা’ – ইহুদী নামটি উচ্চারণ করেছিলো, এবং সেটি ছিল তাদের দুজনের একটি গোপন কথা।

দুনিয়া নামের এই জিনিয়া, তার ভবিষ্যদ্বাণী যেমন ইঙ্গিত দিয়েছিল, বিস্ময়কর মাত্রায় উর্বর ছিল। দুই বছর, আট মাস আর আঠাশ দিন ও রাত যা অতিক্রান্ত হয়েছিল তাদের দেখা হবার পর, দুনিয়া মোট তিনবার গর্ভবতী হয়েছিল, এবং বহু সংখ্যক শিশুর জন্ম দিয়েছিল, অন্ততপক্ষে সাতটি করে প্রতিটি গর্ভাবস্থায়, এবং একটি ক্ষেত্রে এগারো অথবা সম্ভবত উনিশটি । তবে এই বিষয়ে তথ্যগুলো অস্পষ্ট। সব শিশুই দুনিয়ার সবচেয়ে অনন্য বৈশিষ্ট্যটি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিল: তাদের কারোরই কানে লতি ছিল না।

যদি ইবন রুশদ রহস্যময় গুপ্তবিদ্যায় পণ্ডিত হতেন, তিনি হয়তো অনুধাবন করতে পারতেন, তার সন্তানরা মানুষ নয় এমন একটি মায়ের সন্তান, কিন্তু তিনি এতটাই আত্মমগ্ন ছিলেন যে বিষয়টি তিনি বুঝে উঠতে পারেননি। দার্শনিক, যিনি আর দর্শন চর্চা করতে পারবেন না, শঙ্কিত হয়েছিলেন যে তাঁর সন্তানরা হয়তো তার কাছ থেকে সেই দুঃখের উপহারগুলোও উত্তরাধিকার সূত্রে পেতে পারে, তাঁর জন্য যা ছিল একই সাথে সম্পদ আর অভিশাপ: ‘পাতলা-চামড়ার, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং লাগামহীন জিহবা’ হওয়া মানে তিনি বলেন, ‘খুব বেশী তীক্ষ্মভাবে সব কিছু অনুভব করতে পারার ক্ষমতা, খুব বেশী স্পষ্টভাবে সব কিছু দেখতে পাওয়ার ক্ষমতা, খুব বেশী স্বাধীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করার প্রবণতা। এর মানে এই পৃথিবীতে শত্রুদের কাছে নিজেকে আরো বেশী আক্রম্য করে তোলা, যখন পৃথিবী নিজেকেই অনাক্রাম্য বলে বিশ্বাস করে; পৃথিবীর পরিবর্তনশীলতাকে বোঝা, যখন এটি নিজেকে অপরিবর্তনযোগ্য ভাবে, অন্যরা অনুভব করার আগেই অনুভব করা ভবিষ্যতে কি ঘটতে যাচ্ছে, অনুধাবন করা যে বর্বর ভবিষ্যৎ বর্তমানের দরজাগুলো সব ভেঙ্গে ফেলছে, যখন কিনা অন্যরা অবক্ষয়ী ফাঁপা অতীত আঁকড়ে ধরে পড়ে আছে। আমাদের সন্তানরা যদি ভাগ্যবান হয়, তাহলে তারা শুধু তোমার কানই উত্তরাধিকারসূত্রে পাবে, কিন্তু, দূঃখজনকভাবে, যেহেতু অনস্বীকার্যভাবে তারা আমারও, সম্ভবত তারা খুব শীঘ্রই খুব বেশী চিন্তা করতে শুরু করবে আর খুব আগেই তারা অনেক বেশী কিছু শুনবে, সেই সব কিছু সহ, যা চিন্তা করার অথবা শোনার কোনো অনুমতি নেই।’

‘আমাকে একটা গল্প বলো’, দুনিয়া প্রায়ই বিছানায় শুয়ে দাবী করতো তাদের সহবাসের সেই শুরুর দিনগুলোয়। ইবন রুশদ বেশ দ্রুত আবিষ্কার করেছিলেন যে আপাতদৃষ্টিতে বয়স কম মনে হলেও বিছানায় ও বিছানার বাইরে, দুনিয়া ছিল খুবই চাহিদাপূর্ণ ও জেদী, একরোখা স্বভাবের একজন নারী। ইবন রুশদ বেশ সুগঠিত, আকারে বিশাল পুরুষ ছিলেন, আর দুনিয়া ছিল ছোট পাখি অথবা কোনো কাঠি পোকার মত, কিন্তু প্রায়শই তিনি অনুভব করতেন যে তাদের দুজনের মধ্যে আসলে দুনিয়াই সবচেয়ে বেশী শক্তিশালী।

বৃদ্ধ বয়সে দুনিয়া তাঁর সুখ ছিল ঠিকই, কিন্তু তাঁর কাছে দুনিয়া যে পর্যায়ের প্রাণশক্তি দাবী করতো সেটি অব্যহত রাখা তার পক্ষে খুব কঠিন হয়ে পড়েছিল। মাঝে মাঝে বিছানায় শুয়ে তিনি যা চাইতেন তা হলো শান্তিতে একটু ঘুমাতে, কিন্তু দুনিয়া তার এই ঘুমিয়ে পড়ার প্রচেষ্টাকে দেখতো শত্রুভাবাপন্ন একটি কাজ হিসাবে। ‘তুমি যদি সারারাত জেগে সঙ্গম করো’, সে বলতো, ‘তাহলে ষাড়ের মত বহু ঘন্টা নাক ঢেকে ঘুমালে যতটা বিশ্রাম নিয়েছো বলে অনুভব করতে, আসলেই তার চেয়ে অনেক বেশী বিশ্রাম নিয়েছো বলেই অনুভব করবে। আর সবারই বেশ ভালো করে জানা আছে এটা।’ তাঁর সেই বয়সে, যৌন সঙ্গমের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতিতে পৌছানো সবসময় সহজ কোনো বিষয় ছিলনা, বিশেষ করে পরপর রাতে। কিন্তু দুনিয়া তাঁর লিঙ্গোত্থানের এই বার্ধক্যজনিত সমস্যাকে দেখতো ইবন রুশদের ভালোবাসাহীন প্রকৃতির একটি প্রমাণ হিসাবে। ‘যদি কোনো নারীকে তুমি আসলেই আকর্ষণীয় মনে করো, তাহলে কখনোই সমস্যা হবার কথা না।’ দুনিয়া তাকে বলেছিল, ‘পর পর যত রাতই হোক না কেন। আমি, আমি সবসময়ই  উত্তেজিত। আমি অনন্তকাল অবধি করে যেতে পারবো –থামার কোনো প্রয়োজন নেই আমার।’

দুনিয়ার শারীরিক ব্যগ্রতাকে যে গল্প বলে যে প্রশমন করা যেতে পারে, তাঁর এই আবিষ্কারটি তাকে খানিকটা স্বস্তি দিয়েছিল। ‘আমাকে একটা গল্প বলো’, সে বলতো, তার বাহুর নীচে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে, আর তাঁর হাত বিশ্রাম নিতো দুনিয়ার কপালের উপর। এবং তিনি ভাবতেন, বেশ, আজ আমি মুক্তি পেয়েছি, এবং তিনি অল্প অল্প করে দুনিয়াকে তাঁর মনের গল্প নিবেদন করেছিলেন।  তিনি এমন সব শব্দ ব্যবহার করেছিলেন যেগুলো তাঁর সমসাময়িকরাও ভয়ঙ্কর মনে করতেন, যেমন,  ‘যুক্তি’, ‘তর্ক-বিতর্ক’ আর ‘বিজ্ঞান,’ যেগুলো ছিল তার চিন্তা আর ধারণাগুলোর তিনটি মূল স্তম্ভ , যা তাঁর লেখা সব বইগুলোকে পোড়ানোর মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। দুনিয়া এই সব শব্দগুলো ভয় পেতো বেশ, কিন্তু ভয় তাকে আবার উত্তেজিতও করতো, সে ইবন রুশদের আরো কাছে ঘেষে আসতো আর বলতো, ‘আমার মাথাটা ধরো, যখন তুমি তোমার মিথ্যা দিয়ে আমার মাথা ভরে দিচ্ছো।’

ইবন রুশদের মনের ভিতরে একটি গভীর আর দূঃখের ক্ষত ছিল, কারণ তিনি ছিলেন একজন পরাজিত মানুষ, তাঁর জীবনের বড় যুদ্ধটিতে তিনি হেরে গিয়েছিলেন মৃত পারস্যবাসী এক ব্যক্তির কাছে, তুসের গাজালি (৮), একজন প্রতিপক্ষ, যিনি পচাশি বছর ধরেই মৃত। একশ বছর আগে, গাজালি একটি বই লিখেছিলেন যার নাম ছিল ‘দি ইনকোহেরেন্স অব ফিলোসফারস’ বা দার্শনিকদের অসংলগ্নতা (৯), যেখানে তিনি গ্রীকদের যেমন অ্যারিস্টোটল (১০), নিওপ্লেটোনিস্ট  (১১) ও তাদের মিত্রদের, ইবন রুশদের মহান পূর্বসূরি ইবন সিনা (১২) ও আল-ফারাবীকে (১৩) আক্রমন করেছিলেন। জীবনের একটি পর্যায়ে ধর্ম বিশ্বাসের সংকটে আক্রান্ত হয়েছিলেন গাজালি। কিন্তু তিনি তার বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করেছিলেন এমন আত্মবিশ্বাসের সাথে যে, পৃথিবীর ইতিহাসে তিনি দর্শনের শ্রেষ্ঠতম অভিশাপে পরিণত হয়েছিলেন। ‘দর্শন’, তিনি উপহাস করেছিলেন, ‘ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে অক্ষম অথবা এমনকি দুজন ঈশ্বরের অস্তিত্বের অসম্ভাব্যতাও প্রমাণ করতে পারেনা। দর্শন বিশ্বাস করে কারণ এবং প্রভাবের অবশ্যম্ভাবিতার উপর, যা ঈশ্বরের শক্তির প্রতি অপমান স্বরুপ, যিনি অনায়াসে হস্তক্ষেপ করতে পারেন কারণকে নিষ্ফল অকার্যকর করে দিতে, এবং যদি তিনি চান, কারণের প্রভাবকেও পরিবর্তন করে দিতে পারেন।’

যখন রাত তাদের দুজনকে নীরবতার চাদরে আলিঙ্গন করতো, তারা নিষিদ্ধ বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে পারতো, ইবন রুশদ তখন দুনিয়াকে জিজ্ঞাসা করতেন, ‘কি হয়ে, যখন আগুনের শিখা সহ একটি কাঠি তুলার একটি গোলকের স্পর্শে নিয়ে আসা হয়?’

দুনিয়া উত্তরে বলে, ‘অবশ্যই তুলায় আগুন ধরে যাবে।’

‘আর কেন সেটিতে আগুন ধরবে?’

‘কারণ এভাবেই তো হয় সবসময়’, দুনিয়া বলেছিল, ‘আগুনের শিখা তুলাকে স্পর্শ করবে আর তুলা আগুনের অংশ হয়ে যাবে। এভাবেই সবসময় ঘটে।’

‘প্রকৃতির নিয়ম’, তিনি বলেন, ‘সব কার্যকারণের ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব আছে’, এবং দুনিয়া মাথা নাড়িয়ে সায় দেয় ইবন রুশদের আদর করতে থাকা হাতের নীচে।

‘কিন্তু তিনি ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন.’ ইবন রুশদ বলেছিলেন, আর দুনিয়া জানতো, তিনি তাঁর শত্রু গাজালির কথা বলছেন, ‘তিনি বলেছিলেন যে তুলায় আগুন ধরে কারণ ঈশ্বর এটিকে দিয়ে সেটি করাচ্ছেন, কারণ ঈশ্বরের মহাবিশ্বে একমাত্র আইন হচ্ছে সেটি, যা ঈশ্বর ইচ্ছা করেন।’

সুতরাং যদি ঈশ্বর চান যে ‍তুলাই আগুনকে নিভিয়ে দেবে, বা যদি তিনি চান আগুন তুলার অংশ হয়ে যাবে, তিনি সেটাই করতে পারেন?’

‘হ্যা,’ ইবন রুশদ বলেছিলেন, ‘গাজালির বই অনুযায়ী, ঈশ্বর সেটি করতে পারেন।’

দুনিয়া কিছুক্ষণের জন্য ভাবে, ‘কিন্তু এটাতো বোকার মত কথা হলো’, অবশেষে সে বলে। এমন কি অন্ধকারেও দুনিয়া তাঁর আত্মসমর্পনের মৃদুহাসিটি অনুভব করতে পারে, যে হাসির সাথে মিশে আছে যেমন নৈরাশ্যবাদ, তেমনি আছে কষ্ট, আঁকাবাঁকা হয়ে সেই হাসিটি তাঁর দাড়ি দিয়ে ঢাকা সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ে।

‘তিনি বলতেন এটাই হচ্ছে সত্যিকারের  ধর্মবিশ্বাস’,  দুনিয়াকে তিনি বলেন, ‘এবং এর সাথে ভিন্নমত পোষণ করাই হবে .. অসংলগ্নতা।’

‘তাহলে যে কোনো কিছু ঘটতে পারে যদি ঈশ্বর সিদ্ধান্ত নেন সেটি ঠিক আছে,’ দুনিয়া বলে, ‘যেমন একজন মানুষের পা আর মাটি স্পর্শ নাও করতে পারে, সে বাতাসেই হাটা শুরু করতে পারে।’

‘একটি অলৌকিক ঘটনা’, ইবন রুশদ বলেন, ‘হচ্ছে শুধুমাত্র যখন ঈশ্বর নিয়মগুলো তার ইচ্ছামতন পরিবর্তন করেন, যেভাবে তিনি খেলতে চান, আর যদি আমরা সেটি বুঝতে না পারি, এর কারণ হচ্ছে ঈশ্বর চুড়ান্তভাবে অবর্ণনীয়, যার মানে হচ্ছে এমন কিছু বলা, এটি আমাদের বোঝার ক্ষমতার বাইরে।’

আবারো দুনিয়া চুপ করে থাকে, বেশ কিছুক্ষণ পর সে বলে, ‘ধরো, আমি মনে করলাম যে ঈশ্বরের কোনো অস্তিত্ব নেই। ধরো, তুমি আমাকে মনে করতে সাহায্য করলে যে, ‘যুক্তি’ আর ‘বিজ্ঞানে’ এমন জাদু আছে যা ঈশ্বরকে অপ্রয়োজনীয় করে তুলতে পারে। কেউ কি এমনকি এমন কিছু মনে করতে পারে যে এমন কিছু মনে করা সম্ভব হতে হতে পারে?’

দুনিয়া অনুভব করে, তার শরীর শক্ত হয়ে উঠেছে। সে ভাবে এখন তিনি তার শব্দগুলোকেই ভয় পাচ্ছেন, এবং খুব অদ্ভুতভাবে সেটি তাকে তৃপ্তি দেয়, ‘না,’ ইবন রুশদ খুব রুঢ়ভাবেই বলেন, ‘সেটা খুবই বোকার মত একটি প্রস্তাবনা হবে।’

তিনি নিজেই একটি বই লিখেছিল, ‘দি ইনকোহেরেন্স অব দি ইনকোহেরেন্স’ বা অসংলগ্নতার অসংলগ্নতা (১৪), হাজার মাইল দূরে বসে, শত বর্ষ সময়ের ব্যবধানে গাজালির প্রত্যুত্তরে, কিন্তু এর চমক লাগানো শিরোনাম সত্ত্বেও বইটি পারস্যবাসী সেই মৃত ব্যক্তিটির প্রভাব হ্রাস করেনি এবং অবশেষে ইবন রুশদকেই  অপমানিত হতে হয়েছে, তার বইগুলোই ছুড়ে ফেলে দেয়া হয়েছিল আগুনের শিখায়, যে শিখা তার পৃষ্ঠাগুলোকে গ্রাস করেছিল কারণ ঈশ্বর সেই মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আগুনকে সেটি করতে অনুমতি দেয়া উচিৎ হবে। তার সব লেখায়, ইবন রুশদ চেষ্টা করেছেন ‘যুক্তি’, ‘তর্ক-বিতর্ক’ আর ‘বিজ্ঞান’ শব্দগুলোকে ‘ঈশ্বর’, ‘ধর্মবিশ্বাস’ আর ‘কোরান’ শব্দগুলোর সাথে সমন্বয় করার জন্য, কিন্তু তিনি সফল হতে পারেননি, এমনকি যদিও তিনি খুব সূক্ষ্মতার সাথে দয়া থেকে নেয়া যুক্তি ব্যবহার করেছেন, কোরানের উক্তি ব্যবহার করে প্রদর্শন করেছিলেন যে, ঈশ্বরের অবশ্যই অস্তিত্ব থাকতে হবে, কারণ মানব জাতির জন্য এমন সমৃদ্ধ পৃথিবী তিনি দান করেছেন: আমরা কি মেঘ থেকে পিষ্ট করে বৃষ্টিপাত ঘটাইনি, পর্যাপ্ত পরিমানে পানি ঝরে পড়েছে, যেন তোমরা শস্য আর নানা উদ্ভিদ চাষ করতে পারো এবং বৃক্ষ দিয়ে ঘণ করে রোপন করতে পারো বাগান? তিনি নিজে খুবই আগ্রহী ছিলেন শখের বাগান করতে, এবং দয়া থেকে আসা যুক্তিটি তার কাছে মনে হয়েছিল একই সাথে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করে ও তিনি আবশ্যিকভাবে দয়ালু, উদারনীতিবাদী প্রকৃতির, সেটিও প্রমাণ করে। কিন্তু নিষ্ঠুর কঠোর ঈশ্বরের ধারণার প্রবর্তকরা তাকে পরাজিত করেছিল। এখন তিনি শুয়ে আছেন, বা যেমনটি তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, একজন ধর্মান্তরিত ইহুদীর সাথে, যাকে তিনি বেশ্যালয় থেকে বাঁচিয়েছিলেন, এবং যার ক্ষমতা আছে তার স্বপ্নগুলোর ভিতর প্রবেশ করার, যেখানে তিনি গাজালির সাথে বিতর্ক করেছিলেন অসমন্বয়যোগ্য ভাষায়, বিশুদ্ধ আন্তরিকতার ভাষায়, সবটুকু উজাড় করে দিয়ে, যদি জাগ্রত জীবনে তিনি সেই ভাষা কখনো ব্যবহার করতেন, তাকে জল্লাদের হাতে প্রাণ দিতে হতো অভিশপ্ত হয়ে।

দুনিয়া গর্ভ যখন শিশু দিয়ে পূর্ণ হচ্ছিল আর ছোট বাসায় সে তাদের প্রসব করছিল, তখন সেখানে ইবন রুশদের নির্বাসিত মিথ্যার জন্যে জায়গাও কমে আসছিল। দম্পতিটির অন্তরঙ্গ মুহূর্তের সময়ও ক্রমশ কমতে শুরু করেছিল এবং অর্থ একটি বড় সমস্যা ছিল। ‘একজন সত্যিকারের পুরুষ তাদের কাজের পরিণতির মোকাবেলা করতে পারে,’ দুনিয়া তাকে বলেছিল, ‘বিশেষ করে যে মানুষটি কার্যকারণ ও তার প্রভাবে বিশ্বাস করেন।’ কিন্তু অর্থ উপার্জনের মত কোনো কাজে তার দক্ষতা কখনোই ছিল না। ঘোড়ার বাণিজ্য খুবই অনির্ভরযোগ্য একটি ব্যবসা ছিল, এবং যেখানে প্রতারকেরও কোনো অভাব ছিলনা এবং তার লভ্যাংশ ছিল সামান্য। তিনাজার বাজারেও তার বহু প্রতিদ্বন্দী ছিল, সুতরাং সেখানে দামও কম ছিল। ‘রোগীদের কাছ থেকে আরো বেশী পয়সা নাও,’ দুনিয়া তাকে উপদেশ দিয়েছিল কিছু বিরক্তিসহ, ‘তোমার উচিৎ তোমার অতীতের সুনামকে পুঁজি করে টাকা আয় করা, সেটি যতই কলঙ্কিত হোক না কেন। আর কি আছে তোমার? শুধুমাত্র বাচ্চা পয়দা করার দানব হওয়াই যথেষ্ঠ নয়। তুমি বাচ্চা তৈরী করবে, বাচ্চার জন্ম হবে, এবং বাচ্চাদের অবশ্যই খাওয়াতে হবে। এটাই ‘যৌক্তিক’, ‘এটাই যুক্তিসঙ্গত।’ দুনিয়া  জানতো কোন শব্দগুলো সে তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারে। সে বিজয়ীয় মত চিৎকার করে বলে, ‘আর সেটা না করাই হচ্ছে অসংলগ্নতা বা অযৌক্তিক।’

জিনরা চকচকে জিনিসের বিশেষ ভক্ত হয়ে থাকে, যেমন চকচকে সোনা আর রত্ন ইত্যাদি এবং প্রায়শই তারা তাদের সম্পদ লুকিয়ে রাখে মাটির নীচে কোনো গুহায়। কেন তাহলে জিনিয়া, যে কিনা জিনদের রাজকুমারী, চিচিং ফাক বলে চিৎকার করেনি তার গুপ্তধনের গুহার দরজার সামনে দাড়িয়ে এবং তাদের অর্থনৈতিক সমস্যা এক নিমেষেই সমাধান করেনি? কারণ, সে  মানব জীবন নির্বাচন করেছিল, এক মানুষের ‘মানব’ স্ত্রীর জীবন, তার নিজের নির্বাচনই তাকে সীমাবদ্ধ করেছিল। এই পর্যায়ে তার প্রেমিকের কাছে তার প্রকৃত পরিচয় উন্মোচন, এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতাকেও উন্মোচন করবে, তাদের সম্পর্কের কেন্দ্রে থাকা একটি মিথ্যাকে ‍উন্মুক্ত করে দেবে। সুতরাং দুনিয়া নীরব ছিল সেই শঙ্কায়, তিনি হয়তো তাকে ত্যাগ করতে পারেন সত্যটি জানলে।

পারস্য দেশের একটি বই আছে, ‘হাজার আফসেনেহ’ বা ‘এক হাজার গল্প’, যা আরবী ভাষায় অনূদিত হয়েছিল। আরবী সংস্করণটিতে অবশ্য এক হাজারের চেয়ে কিছু কম সংখ্যক গল্প ছিল কিন্তু পুরো ঘটনাটিকে বিস্তৃত করা হয়েছিল এক হাজার রাতে, অথবা, যেহেতু জোড় সংখ্যাকে কুৎসিৎ বিবেচনা করা হয়, এক হাজার রাতের সাথে আরো একটি রাত বাড়তি যোগ করা হয়েছিল। ইবন রুশদ বইটি দেখেননি, কিন্তু এর বেশ কিছু গল্প রাজসভায় থাকার সময় তাকে বলা হয়েছিল। মাঝি ও জিনের গল্পটি তাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করেছিল, তবে এর বিস্ময়কর জাদুকরী বিষয়গুলোর জন্য ততটা নয় ( প্রদীপের জিন, জাদুর কথা বলা মাছ, মন্ত্রে আচ্ছন্ন রাজকুমার, যিনি অর্ধেক মানুষ আর অর্ধেক মার্বেল), বরং এর কারিগরী সৌন্দর্যের জন্য, যেভাবে এর গল্পগুলো অন্য গল্পগুলোর ভাজে লুকিয়ে থাকে এবং তারপরও আরো অন্য অনেক গল্প সেটি ধারণ করে থাকে এর মধ্যে, যেন গল্পটি জীবনের সত্যিকারের আয়নায় রুপান্তরিত হয়। ইবন রুশদ ভাবতেন, আমাদের জীবনের সব গল্পগুলোই অন্যদের জীবনের গল্প ধারণ করে, আর সব গল্পগুলো নিজেরাই আবার আরো বিশাল কাহিনীরই অংশ, আমাদের পরিবারের অথবা আমাদের জন্মভূমির কিংবা আমাদের বিশ্বাসের। গল্পের মধ্যে গল্পের চেয়ে এমনকি আরো বেশী সুন্দর ছিল গল্প বলিয়ের গল্পটি, শাহরাজাদ বা শেহেরজাদে নামের এক রানী, খুনি এক স্বামীকে তার গল্পগুলো বলছিলেন, উদ্দেশ্য সে যেন তাকে হত্যা না করতে পারে। গল্পগুলো বলা হয়েছিল মৃত্যুকে পরাজিত করার জন্য, একজন বর্বর মানুষকে সভ্য করার জন্য বলা হয়েছিল গল্পগুলো। এবং বিয়ের শয্যায় পায়ের কাছে বসে ছিল শেহেরজাদের বোন, তার সবচেয়ে একনিষ্ঠ নিখুঁত শ্রোতা, আরো একটি গল্পের জন্য সে বায়না করেছে যখনই একটি গল্প শেষ হয়েছে এবং তারপর আরো একটা, তারপর আরো একটা। এই বোনটির কাছ থেকে ইবন রুশদ সেই নামটি পেয়েছিলেন যা তিনি দিয়েছিলেন তার প্রেমিকা দুনিয়ার গর্ভ থেকে বেরিয়ে আসা এক দঙ্গল শিশুদের নাম হিসাবে। কারণ ঘটনাচক্রে বোনটির নাম ছিল দুনিয়াজাদে; ‘যা এখানে আমাদের  আছে, যা অন্ধকার  ঘরটিকে পূর্ণ করেছে এবং আমাকে বাধ্য করেছে লুসেনার অসুস্থ আর দূর্গত মানুষের কাছ চিকিৎসার জন্য থেকে অতিমাত্রায় বেশী ফি আরোপ করতে, সেটি হচ্ছে   দুনিয়াজাতের আবির্ভাব, এর মানে দুনিয়ার গোত্র, দুনিয়ার জাত, দুনিয়া মানুষ, যার মানে  পৃথিবীর মানুষ।’

দুনিয়া গভীরভাবেই অপমানিত বোধ করেছিল, সে বলেছিল ‘তার মানে তুমি বলতে চাইছো, যেহেতু আমরা বিবাহিত নই, আমদের সন্তানরা তাদের বাবার নাম বহন করতে পারবে না?’

তিনি হাসেন, তার দুঃখী, কিছুটা বাঁকা হাসি, ‘এটাই উত্তম যে তাদের নাম দুনিয়াজাত হোক’, তিনি বলেন, ‘এটি এমন একটি নাম যার মধ্যে পৃথিবীর নাম থাকবে, নাম দিয়ে তাদের কেউ বিচার করবেনা। তাদের যদি রুশদী বলা হয়, তাহলে সেটি তাদের কপালে কলঙ্ক এঁকে ইতিহাসের  দিকে পাঠানো হবে।’

শেহেরজাদের বোন হিসাবে দুনিয়া কথা বলতে শুরু করেছিল, সবসময়ই সে গল্প শুনতে চাইতো, শুধুমাত্র তার শেহেরজাদে ছিল একজন পুরুষ – তার প্রেমিক, তার ভাই নয় – আর তাঁর কিছু গল্প যথেষ্ঠ ছিল তাদের দুজনকেই হত্যা করার জন্য, দূর্ঘটনাবশত যদি সেই শব্দগুলো তাদের শয়নকক্ষের অন্ধকার থেকে কখনো বের হয়ে আসতো। সুতরাং ইবন রুশদ এক ধরনের শেহেরজাদে বিরোধী, দুনিয়া তাকে বলেছিল, ‘এক হাজার এক রাতের’ গল্প বলিয়ের ঠিক বিপরীত: তার গল্প তার জীবন বাঁচিয়েছিল, যখন ইবন রুশদের গল্প তাঁর জীবনকে ঝুকির মধ্যে ফেলে দিয়েছিল।

কিন্তু তারপর খলিফা আবু ইউসুফ ইয়াকুব যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছিলেন, তার জীবনের সবচেয়ে বড় সামরিক বিজয়, গুয়াদিয়ানা নদীর কাছে আলারকসে কাস্তিলের খ্রিস্টীয় রাজা অষ্টম আলফনসোর বিরুদ্ধে। আলারকসের যুদ্ধের পর, যেখানে খলিফার বাহিনী খ্রিস্টিয় সেনাবাহিনীর ঠিক অর্ধেক, প্রায় দেড় লক্ষ খ্রিস্টান সৈন্যকে হত্যা করেছিল, আবু ইউসুফ নিজেকে আল-মনসুর- বিজয়ী – দিয়েছিলেন, বিজয়ী বীরের আত্মবিশ্বাসসহ তিনি ধর্মান্ধ বারবারদের আধিপাত্যের পরিসমাপ্তি ঘটান, এবং রাজসভায় ফিরে আসার জন্য ইবন রুশদকে ডেকে পাঠান।

বৃদ্ধ দার্শনিকের কপাল থেকে  লজ্জার কলঙ্ক মোছা হয়, তার নির্বাসনের জীবনের সমাপ্তি হয়। তিনি পুনর্বাসিত হন, তার বিরুদ্ধে সব অপমানের সমাপ্তি হয়, পুরোনো সন্মান নিয়ে আবার রাজসভায় খলিফার ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসাবে তার প্রাক্তন দ্বায়িত্বে ফিরে আসেন, তার নির্বাসন শুরুর দুই বছর, আট মাস এবং আঠাশ দিন ও রাত পরে, তার মানে, এক হাজার দিন ও রাত ও আরো একটি দিন ও রাতের পর। এবং দুনিয়া তখন আবারো গর্ভবতী, অবশ্যই, এবং তিনি তাকে বিয়ে করেননি, অবশ্যই, তার গর্ভজাত সন্তানদের তিনি তাঁর নাম দেননি অবশ্যই, এবং তিনি তাকে তার সাথে আল-মোহাদ রাজসভাতেও নিয়ে আসেননি অবশ্যই, সুতরাং দুনিয়া ইতিহাস থেকে হারিয়ে যায়। যখন তিনি কর্দোবার উদ্দেশ্যে আবার যাত্রা শুরু করেছিলেন তার আলখেল্লাগুলোর সাথে তিনি সঙ্গে নিয়েছিলেন, বুদবুদসহ গলাওয়ালা কিছু কাচের পাত্র, তার পাণ্ডুলিপি, কিছু বাধাই করা, কিছু কাগজের কুণ্ডুলী, অন্যদের বইয়ের কিছু পাণ্ডুলিপি, কারণ তার নিজেরগুলো পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল, যদিও বহু কপি রক্ষা পেয়েছিল, তাকে জানানো হয়েছিল, অন্য শহরে, বন্ধুদের পাঠাগারে, যেখানে তিনি সেগুলো লুকিয়ে রেখেছিলেন তার বিরুপ দূর্দিনে, কারণ একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তি সবসময় খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকেন, কিন্তু যদি তিনি সত্যিকারভাবে বিনম্র হন, তাহলে সৌভাগ্যকে সুযোগ দেন তাকে বিস্মিত করার জন্য।

সকালের খাবার শেষ না করে বা বিদায় না নিয়েই তিনি লুসেনা ত্যাগ করেন, আর দুনিয়াও তাকে কোনো হুমকি দেয়নি, তার সত্যিকারের প্রকৃতিটি উন্মোচন করেনি বা তার ভিতরে লুকিয়ে থাকা শক্তিটিও দেখায়নি, আর বলেনি যে, আমি জানি তুমি তোমার স্বপ্নে জোরে জোরে কি কথা বলো, যখন তুমি এমন কিছু মনে করো যা মনে করা হবে নির্বুদ্ধিতা, যখন তুমি অসমন্বয়যোগ্যতার সাথে সমন্বয় করার প্রচেষ্টা বন্ধ করো এবং ভয়ঙ্কর কিছু বলো, ভয়ঙ্কর সত্য।  ধরে রাখার কোনো চেষ্টা না করে দুনিয়া ইতিহাসকে সুযোগ দিয়েছিল তাকে পরিত্যাগ করতে, ঠিক যেভাবে শিশুরা কোনো বড় মিছিলকে অতিক্রম করতে দেয়, সেটিকে তাদের স্মৃতিতে শুধু ধরে রেখে, এটি তাদের নিজের করে নিয়ে। এবং দুনিয়া তাকে ভালোবাসা অব্যাহত রেখেছিল, যদিও তিনি তাকে খুবই হালকাভাবে পরিত্যাগ করেছিলেন। ‘তুমি ছিলে আমার সব কিছু’, দুনিয়া তাকে বলতে চেয়েছিল, ‘তুমি ছিলে আমার সূর্য এবং চন্দ্র, আর কে এখন আমার মাথায় হাত দেবে, কে আমার ঠোঁটে চুমু খাবে, কে আমাদের সন্তানদের পিতা হবে?’ কিন্তু ইবন রুশদ ছিলেন সেই মহান মানুষদের একজন যার নিয়তি নির্ধারিত ছিল অমরদের বিশাল ঘরে বাস করা, এইসব চিৎকার করা শিশুরা তার যাবার পথে ভার কমানোর জন্য ছুড়ে ফেলা অপ্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

বিশ্বাস করা হয় যে, দুনিয়া মানুষের মধ্যে আরো কিছুদিন বসবাস করেছিল, সে হয়তো আশার বিরুদ্ধে আশা করেছিল ইবন রুশদের ফিরে আসার জন্য। এবং যেহেতু তিনি তাকে টাকা পাঠানো অব্যাহত রেখেছিলেন, হয়তো মাঝে মাঝে তিনি দুনিয়ার সাথে হয়তো দেখাও করেছিলেন। দুনিয়া তার ঘোড়ার ব্যবসায় হাল ছেড়ে দিয়েছিল, কিন্তু অব্যাহত রেখেছিল তাঁর তিনাজার ব্যবসাটি। কিন্তু এখন যখন ইতিহাসের সূর্য ও চন্দ্র তার বাসায় চিরকালের মত অস্ত গিয়েছিল  তখন তার গল্প রুপান্তরিত হয়েছিল ছায়া আর রহস্যের একটি বিষয়ে।সুতরাং হয়তো এটি সত্য, যেমন মানুষরা বলতো, ইবন রুশদ মারা যাবার পর তার আত্মা দুনিয়ার কাছে ফিরে এসেছিল ও তার সাথে এমনকি আরো বেশী সন্তানের জন্মও দিয়েছিল।  মানুষ আরো বলেছিল যে, ইবন রুশদ তাকে একটি প্রদীপ এনে দিয়েছিলেন, যার মধ্যে একটি জিন ছিল, আর তাকে পরিত্যাগ করে তিনি চলে যাবার পর সেই জিনটাই আসলে ছিল দুনিয়ার সন্তানদের পিতা – সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি কিভাবে গুজব সবকিছু ‍ওলট পালট করে দিতে পারে! তারা আরো বলেছিল, খানিকটা নিষ্ঠুরতার সাথে, পরিত্যক্ত সেই নারী যে কোনো মানুষকে সঙ্গ দিয়েছিল, যারা তার বাড়ি ভাড়া শোধ করতে পেরেছিল, এবং প্রতিটি মানুষ যার সাথেই দুনিয়া সম্পর্ক করেছিল, প্রত্যেকেই তাকে দিয়ে গিয়েছিল আরো এক দঙ্গল সন্তান। সুতরাং দুনিয়াজাত, দুনিয়ার সন্তানরা, আর জারজ রুশদী ছিলনা, অথবা তাদের কেউ কেউ তা ছিল না অথবা তাদের অনেকেই সেটি ছিল না। কারণ বেশীর ভাগ মানুষের চোখে দুনিয়ার জীবনের গল্প রুপান্তরিত হয়েছিল তোতলামীপূর্ণ একটি বাক্যে, কতদিন সে বেঁচে ছিল অথবা কোথায় অথবা কার সাথে অথবা কখন ও কিভাবে – অথবা সে কি মারা গিয়েছিল কিনা, সেই তথ্যগুলো উন্মোচন করতে অক্ষম এই বাক্যের বর্ণগুলো নানা অর্থহীন রুপে দ্রবীভুত হয়ে গিয়েছিল।

কেউই লক্ষ্য করেনি কিংবা আদৌ কিছু মনে করেনি একদিন যখন দুনিয়া এক পাশে ফিরে পৃথিবীর একটি ছিদ্র দিয়ে তার পরীস্থানে ফিরে গিয়েছিল, অন্য একটি বাস্তবতায়, স্বপ্নের জগতে, যেখান থেকে জিনরা মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসতো মানবজাতির জন্য জ্বালাতন কিংবা আশীর্বাদ হিসাবে। লুসেনার গ্রামবাসীদের জন্য, দুনিয়া সম্ভবত মিলিয়ে গিয়েছিল, হয়তো আগুনহীন ধোয়ায়।

দুনিয়ার আমাদের পৃথিবী ত্যগ করার পর, জিনদের জগত থেকে আমাদের জগতে অভিযাত্রীদের সংখ্যাও কমে গিয়েছিল, আর তারপরে একসময় তারা পুরোপুরিভাবে আমাদের জগতে আসা বন্ধ করে দিয়েছিল, এবং পৃথিবীর সেই ছিদ্রগুলোকে ঢেকে দিয়েছিল প্রথাগত ভাবনার কল্পনাহীন আগাছা, আর প্রাণহীন নানা বিষয়ের কাটার ঝোপ, যতক্ষণ না অবশেষে সেগুলো পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে যায় এবং জাদুর অভিশাপ বা আশীর্বাদ ছাড়া তাদের পক্ষে যতটা করা সম্ভব ততটা করা ছাড়া আমাদের পূর্বপুরুষদের অবশেষে আর কিছুই করার ছিলনা ।

কিন্তু দুনিয়ার সন্তানরা বেশ ভালো করেছিল। এতটুকু অন্তত বলা যেতে পারে। এবং এর প্রায় তিনশ বছর পর, যখন ইহুদীদের স্পেন থেকে বহিস্কার করা হয়েছিল, এমনকি সেই ইহুদীদেরকে, যারা বলতে পারবে না যে তারা ইহুদী ছিল, দুনিয়ার প্র-পৌত্রদের প্র-পৌত্ররা কাদিজ আর পালোস দে মোগুয়ের থেকে জাহাজে উঠেছিল, অথবা পিরেনিজ পর্বতমালা তারা অতিক্রম করেছিল হেটে, অথবা তাদের জাদুর কার্পেটে চড়ে উড়ে গিয়েছিল, অথবা দানবীয় আকারের শবাধারে চড়ে, যেমন তাদের জিন স্বজাতিরা যাতায়াত করতো। তারা মহাদেশ অতিক্রম করেছিল, সাত সমূদ্র পাড়ি দিয়েছিল, উচু পর্বতে চড়েছিল এবং বিশাল নদী সাতরে পার হয়ে গভীর উপত্যাকায় প্রবেশ করেছিল, এবং যেখানেই তারা পেরেছিল সেখানেই আশ্রয় আর নিরাপত্তা খুঁজে নিয়েছিল, পরস্পরকেও তারা ভুলে গিয়েছিল দ্রুত অথবা মনে রেখেছিল যতদিন তারা মনে রাখতে পেরেছিল এবং তারপর ভুলে গিয়েছিল অথবা কখনোই ভোলেনি, একটি পরিবারে রুপান্তরিত হয়েছিল যা আর ঠিক আর কোনো পরিবারের মত ছিলনা, একটি গোত্র যার আর ঠিক কোনো গোত্রের মত ছিলনা, তারা সব ধর্মকেই গ্রহন করেছিল এবং কোনো ধর্ম ছাড়াই, তারা সবাই ধর্মান্তকরণের বহু শতাব্দী পর, তাদের অতিপ্রাকৃত উৎস এবং জোরপূর্বক ইহুদিদের ধর্মান্তকরণের কাহিনী সম্বন্ধে অজ্ঞ, তাদের কেউ কেউ পাগলের মত ধর্মান্ধ হয়েছিল, যখন অন্যরা হয়েছিল ঘৃণাপূর্ণ অবিশ্বাসী। কোনো জায়গা ছাড়া পরিবার ছিল তারা কিন্তু প্রতিটি জায়গায় তাদের সাথে ছিল পরিবার, কোনো ঠিকানা ছাড়া একটি গ্রাম, কিন্তু পৃথিবীর প্রতিটি জায়গায় সেটি ঘুরে বেড়িয়েছে, শিকড় ছাড়া বৃক্ষের মত, মস অথবা লাইকেন ও লতানো অর্কিডের মত, যাকে অবশ্যই কারো উপর নির্ভর করতে হবে, কারণ একা দাড়ানোর কোনো শক্তি তার নেই।

ইতিহাস তাদের প্রতি খুব নির্দয় হয়, যারা তাকে পরিত্যাগ করে, এবং একইভাবে ইতিহাস নির্দয় তাদের প্রতিও, যারা তাকে তৈরী করে।  পুনর্বাসনের পর মারাকেশে ভ্রমণ করার সময় মাত্র বছরের পার না হতেই ইবন রুশদ মারা গিয়েছিলেন (বার্ধক্যজনিত কারণে, অথবা যেমনটি আমরা বিশ্বাস করি), কখনোই তিনি দেখে যেতে পারেননি কিভাবে তার খ্যাতি বেড়েছিল, কখনো দেখে যেতে পারেনি কিভাবে সেটি তার নিজের জগতে সীমানা অতিক্রম করেছিল আর অবিশ্বাসীদের জগতে প্রবেশ করেছিল, যেখানে অ্যারিস্টোটল নিয়ে তার ব্যাখ্যা রুপান্তরিত হয়েছিল তার শক্তিশালী পূর্বসূরির জনপ্রিয়তা ভিত্তি হিসাবে, অবিশ্বাসীদের ঈশ্বরহীন দর্শনের ভিত্তি হিসাবে, সেকুলারিস, যার অর্থ এমন একটি ধারণা যারা মাত্র একবারই আসে এক সেকুলামে, পৃথিবীর একটি সময়কাল অথবা হতে পারে একটি ধারণা, যে কোনো যুগেরই, আর যা ছিল শুধুমাত্র স্বপ্নে যা তিনি বলেছিলেন তার হুবুহু প্রতিলিপি আর প্রতিধ্বণি। হয়তো, ঈশ্বরভক্ত একজন মানুষ হিসাবে, ইতিহাস তাকে যে আসনে বসিয়েছে, তা নিয়ে ইবন রুশদ হয়তো কখনো খুশি হতেন না, কারণ খুব অদ্ভুত নিয়তি এটি কোনো বিশ্বাসীর জন্য, যিনি কিনা সেই ধারণাগুলোর অনুপ্রেরণা হয়েছিলেন, যার জন্য কোনো বিশ্বাসের প্রয়োজন ছিলনা এবং আরো বিস্ময়কর নিয়তি হচ্ছে কোনো ব্যক্তির দর্শনের জন্যে যা বিজয়ী হয়েছিল তার নিজের জগতের সীমানার বাইরে, কিন্তু তার নিজের জগতের সীমানার মধ্যে যা পরাজিত হয়েছিল, কারণ তিনি যে পৃথিবীকে জানতেন সেখানে তার মৃত প্রতিদ্বন্দী, গাজালির সন্তানরা বংশবৃদ্ধি করেছে, উত্তরাধিকার সূত্রে রাজত্ব পেয়েছিল, অন্যদিকে তার নিজের জারজ সন্তানরা ছড়িয়ে পড়েছিল সারা পৃথিবীতে, তার নিষিদ্ধ নাম পেছনে ফেলে, সারা পৃথিবীকে জনাকীর্ণ করতে।

যারা বাঁচতে পেরেছিল তাদের বড় একটি অংশ মহান উত্তর আমেরিকা মহাদেশে এসে বসতি গড়েছিল এবং আরো অনেকে মহান দক্ষিণ এশিয় উপমহাদেশে, ‘গুচ্ছ’ প্রপঞ্চের সুবাদে, এলোমেলো সজ্জার যা রহস্যময় অযৌক্তিতার অংশ, তাদের অনেকে পরে পশ্চিমে আর দক্ষিণে ছড়িয়ে পড়ে আমেরিকা মহাদেশের মধ্য দিয়ে, আর উত্তর ও পশ্চিমে এশিয়ার পায়ের কাছে সেই মহান হিরকখণ্ড থেকে, পৃথিবীর সব দেশে, কারণ দুনিয়াজাত সম্বন্ধে খুব নিরপেক্ষভাবে বলা যাবে যে অদ্ভুত কান ছাড়াও তাদের পাগুলোও খুব অস্থির ছিল। ইবন রুশদ মৃত, কিন্তু তিনি ও তার প্রতিদ্বন্দী কবর পেরিয়ে এখনও দ্বন্দরত, কারণ মহান চিন্তাবিদদের যুক্তিতর্কের কোনো শেষ নেই। এই বিতর্কটাই মনকে উন্নত করার একটি উপকরণ, সবচেয়ে ধারালো উপকরণ, জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসায় যার জন্ম, যার মানে হচ্ছে, দর্শন।

টীকা:

১ ইবন রুশদ (১১২৬-১১৯৮) ( আবু-ওয়ালিদ মুহাম্মদ ইবন আহমাদ ইবন রুশদ),  আভেরোয়েস নামে পশ্চিমে পরিচিত: আন্দালুসিয়া (আরব স্পেনের) একজন পলিম্যাথ ও দার্শনিক, তিনি যুক্তিবিদ্যা,অ্যারিস্টোটল, ইসলামী দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, ইসলামি আইন দর্শন, মনোবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ভুগোল, গনিত, সঙ্গীত তত্ত্ব, মধ্যযুগীয় চিকিৎসা বিজ্ঞান,জ্যোতির্বিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান সহ নানা বিষয়ে লিখেছিলেন। তিনি জন্মগ্রহন করেছিলেন বর্তমান স্পেনের কর্দোবা শহরে, মারা যান বর্তমান মরোক্বোর মারাকেশ শহরে। তার কাজের উপর ভিত্তি করে গড়েছিল ত্রয়োদশ শতকের খ্রিস্টীয় ও ইহুদি দার্শনিক আন্দোলন (Averroism);

২ সেভিল ( সেভিয়া), বর্তমান স্পেনের সেভিয়া প্রদেশের রাজধানী।

৩ কর্দোবা বা কর্দোভা, দক্ষিণ স্পেনের একটি শহর। অষ্টাদশ শতকে মুসলিম সেনারা এটি দখল করে, এবং পরে এটাই কর্দোবার খিলাফতের রাজধানী ছিল।

৪ আবু ইউসুফ ইয়াকুব আল-মনসুর (১১৬০-১১৯৯), তৃতীয় আল-মোহাদ খলিফা।

৫ বারবার (Berber) উত্তর আফ্রিকা বিশাল একটি অংশ জুড়ে বসবাসকারী আদি জনগোষ্ঠীর একটি গ্রুপ।

৬ আল- আন্দালুস, মুসলিম স্পেন ( সময়কাল ৭১১ – ১৪৯২)

৭ লুসেনা, কর্দোবার ৬০ কিমি দক্ষিণ পূর্বের একটি এলাকা

৮ আবু হামিদ মুহাম্মদ ইবন মুহাম্মদ আল-গাজালি (১০৫৮-১১১১), আল গাজালি নামে আরবী ভাষায় পরিচিত, অত্যন্ত প্রভাবশালী মুসলিম ধর্মতাত্ত্বিক, আইন বিশেষজ্ঞ, দার্শনিক ও মিস্টিক ছিলেন। তিনি বর্তমান ইরানের খোরাসান প্রদেশের টুস জেলার তাবারান শহরে জন্মগ্রহন করেন।

৯ The Incoherence of the Philosophers ( আরবীতে Tahāfut al-Falāsifa)  একাদশ শতকে প্রকাশিত পারস্যের ধর্মতাত্ত্বিক আল-গাজালির যুগান্তকারী একটি বই। ইসলাম দর্শনের আশারাইট ধারণার অনুসারী গাজালি ইবন সিনা ও আল-ফারাবীকে আক্রমন করেছিলেন এই বইটিকে। সব ঘটনা ও ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া প্রাকৃতিক নয় বরং ঈশ্বরের ইচ্ছায় ঘটে, তার এই বিশ্বাসটি মূলত এই বইটির ভিত্তি, এবং নাটকীয়ভাবে এই বইটি সফল হয়েছিল, এবং এটি ইসলাম দর্শন ও ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনায় যুক্তিবাদী ধারাটিকে সফলভাবে প্রতিস্থাপিত করেছিল।

১০ অ্যারিস্টোটল ( ৩৮৪-৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) – গ্রীক দার্শনিক ও বিজ্ঞানী, পশ্চিমা দর্শনে যার কাজের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এখনও অনুভূত হয়।

১১ নিওপ্লেটোনিজম – আধুনিক এই শব্দটি দর্শনের একটি ধারাকে চিহ্নিত করে যা বিকশিত হয়েছি তৃতীয় শতাব্দীতে, এবং এটি টিকে ছিল ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রথম তিন দশক অবধি। নিউপ্লেটোনিস্টরা মূলত প্লেটোর দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তবে নিউপ্লেটোনিষ্ট দার্শনিকরা তাদের চিন্তায় বৈচিত্রময় ছিলেন। সুতরাং মূলত তাদের সংজ্ঞায়িত করা হয় ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে। সেই অর্থে নিওপ্লেটোনিজম হচ্ছে গতিময় একটি দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি যার সূচনা হয়েঠি প্লোটিনাস এর কাজ থেকে।

১২ ইবন সিনা ( ৯৮০ -জুন ১০৩৭) পারস্যের সর্ববিষয়বিদ, ইসলামের স্বর্ণযুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদদের একজন। প্রায় ৪৫০ টি বই লিখেছিলেন তিনি, যার মধ্যে ২৪০ টি টিকে ছিল। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপর ৪০ টি বই লিখেছিলেন। তার ক্যানন অব মেডিসিন পাঠ্যবই হিসাবে ব্যবহৃত হয়েঠে ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দ অবধি।

১৩ আল-ফারাবি (৮৭২-৯৫০/৯৫১), সিরিয়ার দামাস্কাসে জন্ম নেয়া অত্যন্ত বিখ্যাত দার্শনিক ও বিচার দর্শন বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানী। আরব দর্শনে তাকে দ্বিতীয় মাস্টার বলা হয় অ্যারিস্টোটলের পরই। বহু দার্শনিককে তিনি প্রভাবিত করেছিলেন।

১৪  The Incoherence of the Incoherence ( আরবীতে Tahāfut al- Tahāfut ) আন্দালুসিয়ার দার্শনিক ইবন রুশদের লেখা গুরুত্বপূর্ণ একটি বই, যেখানে তিনি অ্যারিস্টোটলের দর্শনকে সমর্থন করেছিলেন ইসলামী দর্শনের পটভূমিতে। বইটি লেখা হয়েছিল সংলাপের ভঙ্গিমায় আল-গাজালির দর্শন বিরোধী বই  The Incoherence of the Philosophers এর প্রস্তাবিত যুক্তিগুলো খণ্ডন করে। বহু ভাষায় বইটি অনূদিত হয়েছে। ইবন রুশদের শ্রেষ্ঠতম গ্রন্হ হিসাবে বিবেচিত, যেখানে তিনি বিশ্বাস ও দর্শনের সমন্বয় করার চেষ্টা করেছিলেন।

১৫ অষ্টম আলফনসো (১১৫৫-১২১৪), আলারকসের আলমোহাদ খলিফার কাছে পরাজিত হবার পর, ১২১২ সালে খ্রিস্টীয় রাজাদের একটি জোটের সফল নের্তৃত্ব দিয়েছিলেন আলমোহাদ সেনাবাহিনীদের বিরুদ্ধে, যা আরব স্পেনে খ্রিস্টীয় আধিপাত্যের সূচনা হয়েছিল।


মঙ্গলবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৭

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে হিন্দুরা কেমন আছে?।।রাণা

দেশভাগে দেশত্যাগ

পাকিস্তান মানেই যেখানে সন্ত্রাসে দীর্ণ এক দেশের কথা ভেসে ওঠে, সেখানে সংখ্যালঘুদের কেমন অবস্থা হবে তা সহজেই অনুমেয়। তারপরেও শুষ্ক-কাষ্ঠং পরিসংখ্যানের দিকে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।
পাকিস্তান ইসলামিক প্রজাতন্ত্র দেশ। এখানে অনেক ক্ষেত্রেই শরিয়তি আইন বলবৎ আছে। ব্লাসফেমি আইনের মত মধ্যযুগীয় কালা আইনও বলবৎ আছে, যে আইনের বলে ইসলাম সম্বন্ধে কটু মন্তব্যকারীকে ফাঁসিতে ঝোলানো অব্দি যেতে পারে। মধ্যযুগীয় আইনের এমন দেশে ওখানের আদি হিন্দু বাসিন্দারা কেমন আছে?
২১ কোটির এই দেশে প্রায় ৯৬% মুসলিম। হিন্দু জনগোষ্ঠী প্রায় ১.৬%।

স্বাধীনতার পূর্বে পাকিস্তানে হিন্দু জনগোষ্ঠী ছিল প্রায় ১৫%। যদিও দেশভাগের উত্তেজনায় দুই দেশের দুই ধর্মের মানব বিনিময় হয়। পাকিস্তান থেকে ভারতে প্রায়  ৪৭ লক্ষ হিন্দু ও শিখ ভারতে পলায়ন করতে বাধ্য হোন, ঠিক একইভাবে ৬৫ লক্ষ মুসলিম ধর্মালম্বীও পাকিস্তানে আশ্রয় নেয়। স্বাধীনতার পরবর্তীতে হিন্দুদের অবস্থা ভাবতে গেলে ১৯৪৭-র পরের পরিসংখ্যানে নজর দিতে হবে। ১৯৫১ সালের জনগণনা অনুযায়ী পাকিস্তানে হিন্দু ধর্মালম্বীদের সংখ্যা দাঁড়ায় ১.৬%। ১৯৯৮-র জনগণনাতেও দেখা যাচ্ছে হিন্দুরা প্রায় ১.৬% আছে। গাণিতিক হিসাবে প্রায় ২৫ লক্ষ হিন্দু পাকিস্তানে বসবাস করে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাস হিসেবে পাকিস্তান পঞ্চম স্থানে আছে।
পাকিস্তানে দিওয়ালি উৎসব

ভারতের দিকে নজর ফেরানো যাক। ১৯৫১ সালের জনগণনা অনুযায়ী হিন্দুদের সংখ্যা ছিল ৮৪%, মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় ১০%। যদিও মুসলিম অধ্যুষিত জম্মু ও কাশ্মীরকে এই গণনায় ধরা হয়নি। নাহলে মুসলিম ধর্মালম্বীদের সংখ্যা শতাংশের হিসেবে আরো একটু বাড়ত।
সাম্প্রতিক জনগণনা অনুযায়ী ভারতের মুসলিম জনসংখ্যা ১৪ শতাংশের কাছাকাছি। ভারত ধীরে ধীরে মুসলিম দেশ হয়ে যাবে বলে যতই প্রচার চলুক, গত ষাট বছরে মুসলিম জনবিন্যাসে বিশেষ পরিবর্তন ঘটেনি।

বাংলাদেশে হিন্দুদের অবস্থান সম্বন্ধে একই সারণী ধরে চর্চা করা যাক। ১৯৫১ সালের জনগণনা অনুযায়ী বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মালম্বীরা দেশের জনসংখ্যার ২২% উপরে স্থান অধিকার করে থাকত। সাম্প্রতিকতম জনগণনা অনুযায়ী বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ৯ শতাংশের নিচে। তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে বাকি ১৩ শতাংশের বেশি হিন্দু ধর্মের মানুষেরা কোথায় গেল?
দেশত্যাহ

ভারতবর্ষ বর্তমানে ধর্মের কারণে তিন ভাগে বিভক্ত। স্বাধীনতার পরবর্তীতে পাকিস্তান ও ভারতে হিন্দু ও মুসলিম জনবিন্যাস মোটামুটি একইরকম আছে। কিন্তু বাংলাদেশে ক্ষেত্রে ভয়াবহ চিত্র সামনে আসছে। প্রায় রোজ বাংলাদেশের কোথাও না কোথাও সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর মুসলিম উগ্রবাদীদের পরিকল্পিত হামলা চলছে। হিন্দু এলাকা ধরে ধরে অগ্নি সংযোগ, মন্দির ভাঙচুর, দৈহিক আক্রমণ, ধর্মান্তরকরণ - সবকিছুর পরিণতিতে হিন্দুরা রোজ একটু একটু করে ভারতে আশ্রয় নিচ্ছে। ফেসবুকের পোস্টকে কেন্দ্র করে এই নভেম্বর মাসেই বাংলাদেশের রংপুরে হিন্দু জনবসতির উপর হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশে এই ঘটনা নিত্যদিনের। দূর্গাপূজা এলেই মন্দির ও মুর্তিতে হামলা চলতে থাকবে। ভারত ১৯৫১-র পর থেকে বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্য শরণার্থী শিবির খুলে বসলে দেখা যেত শিবিরগুলোতে কয়েক কোটি হিন্দু ধর্মের মানুষের ভিড়। বাংলাদেশে হিন্দু বিতাড়ণ ও প্রাণের দায়ে ভারতে আশ্রয় রোজের ঘটনা।  মায়ানমার থেকে ৪ লক্ষের মত রোহিঙ্গা সেনার অত্যাচারে বাংলাদেশে আশ্রয় নিলে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের দাবি ওঠে, তাহলে বাংলাদেশে এই ব্যাপক হিন্দু বিতাড়ণে কোন দেশের হস্তক্ষেপ করা উচিত? রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের মধ্যেই উস্কানি ওঠে মায়ানমারে হামলা করার, তাহলে ভারত যে কয়েক কোটি বাংলাদেশি হিন্দুর ভার বহন করে চলেছে এবং সেই ভার দিনে দিনে বেড়েই চলেছে, তাহলে ভারতের কী করা উচিত? বাংলাদেশের শ্রদ্ধেয় কবি নির্মলেন্দু গুণ রোহিঙ্গাদের সাথে সহমর্মিতায় পারলে মায়নমারের জুন্টা সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেন, তাহলে আপনার দেশের হিন্দুদের সহমর্মিতায় আপনি কি কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে চান? বাংলাদেশের মুসলিমদের হাতে শুধু যে হিন্দুরা আক্রান্ত এমন নয়, সংখ্যালঘু বৌদ্ধ বা চট্টগ্রাম ডিভিশনের পাহাড়িয়ারাও ব্যাপকভাবে আক্রমণের শিকার হন। ভারত বাংলাদেশের চাকমা জনগোষ্ঠীকেও বছরের পর বছর ধরে আশ্রয় দিয়ে চলেছে। দু-তিনমাস আগেই পাহাড়িয়ারা সন্ত্রাসের শিকার হন।
রংপুরে হামলার পরে

যে পাকিস্তানকে নিয়ে ভারতীয় রাজনীতিবিদদের একাংশ রোজ গালমন্দ করেন, সেখানে আর যাই হোক হিন্দু বা অন্য ধর্মাবলম্বীদের রোজ দেশ থেকে পলায়ন করতে হয় না। জনবিন্যাসেও কোন পরিবর্তন হয়নি। পাকিস্তানে হিন্দু ম্যারেজ অ্যাক্টও বিদ্যমান। পাকিস্তান সংসদে হিন্দুদের আলাদা আসন সংরক্ষণও আছে। এছাড়াও হিন্দুদের উপর হামলার ঘটনা ঘটলে সরকারি তরফ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় আলাদা মন্ত্রক আছে। ইসলামিক প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানে রাণা ভগবানদাস সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হতে পারেন। উল্টোদিকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে চরম অসম্মানজনক পরিস্থিতিতে ইস্তফা দিতে বাধ্য করা হয়।
যদিও পাকিস্তানে হিন্দুদের উপর অত্যাচার নিয়ে ভারতের হিন্দুত্ববাদী দলগুলো যতটা প্রচার করে, তার ছিটেফোঁটাও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। বরং তাদের উৎসাহ থাকে কতটা তাড়াতাড়ি এদের বেআইনি ভাবে ভারতের নাগরিকত্ব দিয়ে নিজেদের ভোটব্যাঙ্কে পরিণত করা যায়। বাম থেকে বিজেপি সবাই এক কাজ করে এসেছে।

২০১৩ সালে পাকিস্তান প্রায় হাজারের মত হিন্দু ভারতে এসে আশ্রয়প্রার্থী হলে তা জাতীয় রাজনীতিতে আলোড়ন তোলে। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর লক্ষ হিন্দু ভারতের জনগোষ্ঠীতে মিশে গেলেও তা নিয়ে প্রতিবাদ হয় না। 
পাকিস্তানের সাথে উত্তেজনা তৈরি হলে সামরিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, অস্ত্র আমদানিতে গতি আসবে, ফলে নেতাদেরও পকেটে বাড়তি রোজগার ঢুকবে। উল্টে বাংলাদেশের সাথে যুদ্ধের সম্ভাবনা নেই, তাই বেশি হইচইয়ের দরকার নেই। বরং বাংলাদেশ, শ্রীলংকা হল ভারতীয় শিল্পপতিদের কাছে সোনার খনি। তাই বেশি ঘাঁটানো যাবে না। তাই বিজেপি যতই হিন্দুত্বের জিগির তুলুক, বাংলাদেশ নিয়ে রা কাড়া যাবে না। শিল্পপতিরা যদি রেগে যায়। ভারত সরকারের কেউই বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নিপীড়ন নিয়ে রাষ্ট্রসংঘে টু শব্দটি করবে না। শ্রীলংকার জাফনা উপদ্বীপেও সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী কর্তৃক তামিল হিন্দুদের উপর অকথ্য নির্যাতন হলেও, ভারত সরকারের পক্ষ থেকে কোন কার্যকরী পদক্ষেপ দেখা যাবে না। শিল্পপতিরা ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর অস্তিত্বহহীন হয়ে পড়বে যে।

ধার্মিক হয় বা অধার্মিক যেকোন অঞ্চলে ধর্মের নামে সংখ্যালঘু উৎপীড়ন হলে প্রতিবাদ করা উচিত। ভারতে মুসলিমদের উপর আঘাত নেমে এলে তার প্রতিবাদ যেমন জরুরি, ঠিক তেমনই দ্বিচারিতা ঝেড়ে বাংলাদেশ-পাকিস্তানে হিন্দু সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হলে তার প্রতিবাদও করা দরকার। মানুষকে ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে না ধরে মনুষ্য ন্যায় বিবেচ্য হলে ধর্মীয় হানাহানিও কমে।

বৃহস্পতিবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৭

অক্টোবর বিপ্লব: শতবর্ষ পরেও প্রাসঙ্গিক।। দারা চৌধুরী


মানব সভ্যতার যতটুকু ইতিহাস জানা যায় তাতে দেখা যায় মানব সমাজ তার সভ্যতার উন্মেষ লগ্ন থেকেই শ্রেণিবিভক্ত। একদল অল্পকিছু মানুষ বাকি বেশিরভাগ মানুষকে অত্যাচার করে (দাসপ্রথা যুগে), শোষণ করে (সামন্ত ও পুঁজিবাদের যুগে), ফুলেফেঁপে নিরাশ্রম জীবনযাপন করেছে। শোষণের ও শ্রেণীবিভক্তের এই প্রথাকে টিকিয়ে রাখতে এরা এটিকে ঈশ্বর বা দেবতার আদেশ বা অমোঘ নিয়ম বলে প্রচার করেছে। বিষয়টিকে আরো পাকাপোক্ত করার জন্য নানা দৈববাণী ও গ্রন্থ প্রেরণের নাটক সাজিয়েছে। নিরীহ মানুষগুলি তা নির্দ্বিধায় মেনেও নিয়েছে। সব সময় যে মেনে নিয়েছে তাও নয়। যুগে যুগে কিছু মহাপ্রাণ মানুষ এর বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম করেছে (স্পার্টাকাসের বিদ্রোহ, ভূমি অধিকার আন্দোলন, নানকার বিদ্রোহ ইত্যাদি)। কিন্তু সে আন্দোলন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিফল হয়েছে, আর সফল হলেও তার স্থায়িত্ব ছিল খুবই অল্প। ফরাসি বিপ্লবসহ অন্যান্য বিপ্লবগুলো এক ধরনের শোষণের উচ্ছেদ ঘটিয়ে আর এক ধরনের শোষণ, এক ধরনের বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে আর এক ধরনের বৈষম্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। কারণ তখনো মানুষের জানা ছিলনা শোষণ কিভাবে হয়, শোষয়ণের উৎস কোথায়, সমাজ কিভাবে শ্রেণিতে বিভক্ত হয়।

এই যুগসন্ধিক্ষনে ১৮১৮ সালের ৫ই মে ( প্রুশিয়ার রাইন অঞ্চলের ) ত্রিয়ের শহরে কার্ল মার্কস নামক এক ব্যক্তির জন্ম হয়। তাঁর পিতা ছিলেন আইনজীবী, ইহুদী, ১৮২৪ সালে তিনি প্রটেস্টান্ট খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেন। মাধ্যমিক স্কুল শেষ করে তিনি প্রথমে বন-এ এবং পরে বার্লিনে, আইনশাস্ত্র পড়েছিলেন, বিশেষ করে অধ্যায়ন করেছিলেন ইতিহাস ও দর্শন। এপিকিউরাসের দর্শনের উপর ডক্টর অব ল থিসিস জমা দিয়ে ১৮৪১ সালে তিনি তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ সমাপ্ত করেন। ঐ সময় স্বীয় দৃষ্টিভঙ্গীর দিক থেকে তিনি ছিলেন হেগেলীয় ভাববাদী । বার্লিনে তিনি “বাম হেগেলীয় পন্থী” ( ব্রুনো বাউয়ের ও অন্যান্যরা ) গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন যাঁরা হেগেলের দর্শন থেকে নিরীশ্বরবাদী ও বৈপ্লবিক সিদ্ধান্তসমূহ টানার চেষ্টা করতেন। ১৮৪৭ সালের বসন্তকালে কমিউনিস্টলীগ নামে অভিহিত এক গুপ্ত প্রচার সমিতিতে মার্কস ও তার বনধু এঙ্গেলস যোগ দেন। লীগের দ্বিতীয় কংগ্রেসে (লন্ডন, নভেম্বর ১৮৪৭) তাঁরা বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেন। ঐ কংগ্রেসের অনুরোধেই তাঁরা রচনা করেন সুবিখ্যাত ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’, ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারীতে যা প্রকাশিত হয় । প্রতিভা সঞ্জাত স্পষ্টতা ও চমৎকারিত্ব সহকারে এই রচনাটিতে উপস্থাপিত হয় এক নতুন বিশ্ববীক্ষা। 

সঙ্গতিপূর্ণ বস্তুবাদ, যা সমাজ জীবনের পরিমন্ডলকেও অঙ্গীভূত করে; উপস্থাপিত হয় বিকাশের সর্বাপেক্ষা সহজবোধ্য ও সুগভীর মতবাদ হিসেবে দ্বন্দ্বতত্ত্ব; আর উপস্থাপিত হয় শ্রেণী-সংগ্রামের তত্ত্ব, নতুন কমিউনিস্ট সমাজের স্রষ্টা– সর্বহারা শ্রেণীর বিশ্ব-ঐতিহাসিক বৈপ্লবিক ভূমিকার তত্ত্ব। প্রধানত রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রের অধ্যায়নে গভীরভাবে ব্যাপৃত থেকে, মার্কস বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক রচনায় তাঁর বস্তুবাদী তত্ত্বমতকে আরও বিকশিত করে তোলেন। মার্কস এই রাজনৈতিক অর্থ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিপ্লব সাধন করেন। এবং রচনা করেন ‘রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রের সমালোচনামূলক নিবন্ধ’ এবং ‘পুঁজি’ গ্রন্থ। এখানেই তিনি কিভাবে উদ্বৃত্ত শ্রমের বিপরীতে কিভাবে উদ্বৃত্ত মূল্য আহরিত হয়ে পুঁজির বিকাশ ঘটায় তা তিনি হাতেকলমে অংকের সাহায্যে দেখিয়ে দেন। প্রথম আন্তর্জাতিক ও দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক এর মাধ্যমে তা নিমিষেই পৌঁছে যায় বিশ্বের সকল শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের কাছে। 

আর শ্রমঘন্টা ৮ ঘন্টায় কমিয়ে আনার চলমান সংগ্রাম বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে সবার নিকট গ্রহণযোগ্যতা পায়। তারই ঢেউ এসে লাগে শিকাগোর হে মার্কেটেও। পরের ইতিহাসটুকু অনেকেরই জানা।

কার্ল মার্কস উদ্বৃত্ত মূল্যের পাশাপাশি আরও একটি জিনিস সবাইকে চোখে অঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন যে শোষণের মূলযন্ত্র হচ্ছে উৎপাদনের উপায়সমূহের ব্যক্তিক মালিকানা। এই মালিকানা বিলুপ্তির মধ্য দিয়েই কেবলমাত্র শোষণমুক্তি তথা শ্রেণিবৈষম্য দূর করা সম্ভব। যখন দাসযুগ শেষ হয়ে পৃথিবী সামন্তযুগে প্রবেশ করে তখনো তখনকার উৎপাদনের উপায় (ভূমি)র মালিকানা ভূমিদাস বা কৃষক লাভ করতে পারেনি। ফলে সামন্তপ্রভূরা ভূমিদাসদের শোষণ করে, সমাজ শ্রেণিবিভক্তই রয়ে যায়, রয়ে যায় শ্রেণিসংগ্রামের বিষয়টাও। ঠিক একইভাবে যখন সামন্ত যুগ শেষ হয়ে পৃথিবী পুঁজিবাদের যুগে প্রবেশ করে তখনো এখনকার উৎপাদনের উপায় (শিল্পকারখানা )র মালিকানা শ্রমিকরা লাভ করতে পারেনি। ফলে পুঁজিবাদীরা শ্রমিকদের শোষণ করে, সমাজ শ্রেণিবিভক্তই রয়ে যায়, রয়ে যায় শ্রেণিসংগ্রামের বিষয়টাও। 

তাই শ্রেণিবৈষম্য এবং শোষণমুক্তির জন্য চাই সম্পদের ও উৎপাদনের উপায়সমূহ হতে ব্যাক্তিমালিকানার অবলোপন, সেখানে রাষ্ট্রীয় মালিকানার নিশ্চিতকরণ।&nbsp; কিন্তু মার্কসের যুগে তত্বটির সত্যতা সবাই মেনে নিলেও প্রায়োগিক ক্ষত্রে এটি একটি ইউটোপিয় ধারণা হিসাবেই রয়ে গিয়েছিল, এবং রয়েই যেতো, যদিনা ১৯১৭ খিষ্টাব্দে মহামতি লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় অক্টোবর বিপ্লবের মাধ্যমে তা বাস্তবায়িত হতো। ১৯১৭ খিষ্টাব্দের রুশদেশে নভেম্বর বিপ্লব মানব সমাজের ইতিহাসে সবথেকে বড় সামাজিক বিপ্লব। যদিও এর আগে ফ্রান্সের প্যারিস শহরে প্যারি কমিউন নামে একটা বিপ্লব হয়েছিল যে বিপ্লবের লক্ষ্য ছিল মানব জাতির ওপর চেপে বসা সকল নিপীড়ন ও বৈষম্যের অবসান ঘটানো। ১৮৭১ সালের ১৮ মার্চ থেকে ২৮ মে পর্যন্ত ছিল এই বিপ্লবের স্থায়িত্বকাল। বিশ্বের প্রথম প্রলেতারীয় (সর্বহারা শ্রেণি) বিপ্লব ও শ্রমিক শ্রেণির সরকারকে শোষক শ্রেণি উচ্ছেদ করেছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে। ফলে একটা ভাবনা প্রায় গেঁথেই গিয়ছিল যে প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে স্থায়ী বিপ্লব অসম্ভব। কিন্তু না; রুশ নভেম্বর বিপ্লবই পাল্টে দিয়েছিল সব ভাবনা। এটা ছিল শোষণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রথম সফল বিপ্লব।<br>

সাম্যভিত্তিক মানবিক সমাজের যে স্বপ্ন মানুষ যুগ যুগ ধরে লালন করে আসছিল তার রূপায়নই ছিল এই বিপ্লবের লক্ষ্য। এবং এ লক্ষ্য। অক্টোবর বিপ্লবের পর রাশিয়া বদলেছিল। রাশিয়া ও জারের গড়ে তোলা বিরাট সাম্রাজ্যের অধিভুক্ত দেশগুলো একত্রিত হয়ে সমতার ভিত্তিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন গড়েছিল। অতি অল্প সময়ের মধ্যে কমিউনিস্ট নেতৃত্ব সেই বিশাল ভূখণ্ড থেকে ক্ষুধা তাড়িয়েছিল। সব মানুষের জন্য বাসযোগ্য আবাসন সুযোগ নিশ্চিত করেছিল। সব শিশুর জন্য একই পোশাকে একই মানের শিক্ষা দিয়েছিল। ভেদাভেদ ছিল না মানুষে মানুষে, রুশ আর উজবুকে। নারীকে দিয়েছিল সমমর্যাদা। তখন মজুরের সন্তানও স্বপ্ন দেখতেন, সে দেশের কর্ণধার হবে। অনেকে হয়েও ছিলেন। ক্রীড়াতে তারা অর্জন করেছিল অভূতপূর্ব সাফল্য। সোভিয়েত সিনেমা পশ্চিমা দুনিয়ায় চমক লাগিয়ে দিয়েছিল। দেশটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অসামান্য সাফল্য এনেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের নভোযান সবার আগে চাঁদে পৌঁছেছিল। এসব অর্জনের মূলে ছিল মানুষের শক্তি। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মানুষে মানুষে বিভাজন তৈরি করে। আর সোভিয়েত সেসব বিভাজন মুছে দিয়ে মানুষের শক্তিতে বলীয়ান হয়েছিল। যা এনে দিয়েছিল উৎপাদন ও উন্নয়নে গতিময়তা। এসেছিল মানবতাবোধেরও জাগরণ। 

এর প্রভাব থেকে দূরে থাকতে পারেনি পশ্চিমের পুঁজিবাদী দেশগুলো। বিপ্লব-আতঙ্কিত এসব ধনী দেশ তলার মানুষের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ভাতা ইত্যাদি চালু করে। শ্রমঘন্টা কমানোর সাথে সাথে শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়ণে এরা বাধ্য হয়েছিল বোনাস, পেনশন, প্র্রভিডেন্ট ফান্ড ইত্যাদি চালু করতে। কার্ল মার্কসের শ্রেণি সংগ্রাম ও সামাজিক অস্থিরতা, তার ফলশ্রুতিতে যে সংঘাত অনিবার্য, তা ঠেকাতে পুঁজিবাদ বাধ্য হয়েছিল তার হিংস্ররুপ পরিহার করে কিছুটা মানবিক হতে। তারা বুঝে গিয়েছিল মেহনতি মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি। তাই নিজের পায়ের তলার মাটি রক্ষা করতেই সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে সর্বহারাদের আনতে বাধ্য হয়েছিল।

একে বলা যায়, অক্টোবর বিপ্লব ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পরোক্ষ অবদান। সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সমূহের পতনের পরও, মানব জাতির জন্য একটি মানবিক বিশ্ব তৈরীর সূচনা করে গেছে রুশ বিপ্লব, তা আজও প্রাসঙ্গিক। আজও প্রেরণাদয়ী নব নব মানবিক বিপ্লবে সমূহের।

ব্যবহারকারীদের কাছে নগ্নছবি চাইছে ফেসবুক


ব্যবহারকারীদের কাছে  তাঁদের নগ্নছবি ও ভিডিও চাইছে ফেসবুক , যাতে ছবিটি ভবিষ্যতে ফেসবুকে আপলোড করা হলে ব্লক করা সম্ভব হয় । উদ্দেশ্য প্রতিশোধমূলক পর্ণো প্রতিরোধ করা ।

পরীক্ষামূলক ভাবে প্রক্রিয়াটি চলছে অস্ট্রেলিয়ায়, যে সকল ব্যবহারকারীরা এই নিয়ে চিন্তিত আছেন যে তাদের প্রাক্তন সঙ্গী/সঙ্গিনীরা আপলোড করতে পারেন তাঁদের নগ্ন ছবি, তাঁদের নিশ্চিন্ত করার খাতিরেই ফেসবুক চাইছে উনাদের নগ্ন ও ঘনিষ্ঠ ছবিগুলি । ফেসবুকের সফ্টওয়্যার "হ্যাশ", অর্থাৎ ছবিটির ডিজিটাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট তৈরী করে রাখবে স্মরণে, যাতে পরবর্তীতে যখনই আপলোড করা হবে তখন আপনা-আপনি চিহ্নিত হয়ে ব্লক হয়ে যায় । পরীক্ষাটি শুরু হবে শিঘ্রই কানাডা ও মার্কিনযুক্ত রাষ্ট্রেও ।

ফেসবুক কর্তৃক নগ্নচিত্র ও প্রতিশোধমূলক পর্ণ ব্যান এবং ইউ.কে'তে দুই বছর অব্দি জেল ঘোষণা সত্ত্বেও এখনো এটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বড় একটি সমস্যা । এজন্য প্রতি মাসে 54,000 মামলার মুখোমুখি হতে হচ্ছে ফেসবুককে ।

● এ প্রসঙ্গে জেনে নেওয়া প্রয়োজন প্রতিশোধমূলক পর্ণ বা Revenge Porn কী ?
Revenge Porn বলতে বোঝায়  কোনো ব্যাক্তির অজ্ঞাতে এবং অনুমতি ছাড়াই তার ঘনিষ্ঠ ছবি ও ভিডিও আপলোড ও শেয়ার করা । সোস্যাল মিডিয়ার অগ্রগতির দৌলতে বেড়ে চলেছে প্রতিশোধমূলক পর্ণোও ।

● এটা কী অপরাধ ?
2015-র এপ্রিল থেকে ইংল্যান্ড ও ওয়েলস এ প্রতিশোধমূলক পর্ণো একটি দন্ডনীয় অপরাধ । এই অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের জেলও হতে পারে । অপরাধ ঘোষণার প্রথম বছরের মধ্যেই বিচার হয়েছে প্রায় দু'শ অভিযুক্তের । যদিও Revenge Porn এর শিকার হওয়া অধিকাংশ মানুষই ভয় ও হতবুদ্ধিতার জন্য সামনে আসেননা ।

ফেসবুকের এইপরীক্ষা চলাকালে, দ্বিধাগ্রস্থ ব্যক্তিদেরকে অনলাইন মারফৎ অস্ট্রেলিয়ার ই-সেফটি কমিশনারের সাথে যোগাযোগ করতে হবে । ওখান থেকে ফেসবুকে ছবি প্রেরণ করার পরামর্শ দেওয়া হলে তবেই উনারা ফেসবুকের মেসেঞ্জার এপ এর মাধ্যমে ছবি পাঠাতে পারবেন ফেসবুকের কাছে ।

যদিও ব্যবহারকারীরা প্রায়শ খুব সহজেই ছবি রিসাইজ অথবা ক্রপ করার মাধ্যমে "হেশিং" টেকনোলজির চোখে ধূলো দিচ্ছেন, কিন্তু, Alex Stamos, ফেসবুকের প্রধান সুরক্ষা অফিসার, এই বলে আশ্বস্ত করেছেন যে, এসব ঠেকাতে উপযুক্ত পরিবর্তন আনা হচ্ছে টেকনোলজিতে ।

লিখেছেন :
অভিজিৎ দাস । ইংরেজী সাহিত্যের ছাত্র । গ্রন্থঃ কবিতার বস্ত্রহরণ ইত্যাদী । ওয়েবসাইটঃ www.voiceofabhijit.tk ।

শনিবার, ৪ নভেম্বর, ২০১৭

দ্যা ডুয়েল অফ আলিপুর।। অরিন্দম চ্যার্টাজী


সত্যজিৎ রায়ের লেখা ‘লখনোর ডুয়েল’-ছোট গল্পটি অনেকেই পড়েছেন। গল্পটিকে আলিপুরের একটি ডুয়েলের ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত বলে মনে করা হয়। কলকাতায় ডুয়েল! তাও আবার আলিপুরে! কি হয়েছিল আলিপুরে, কারা মুখোমুখি হয়েছিল সেই ডুয়েলে? একসময়ের সাহেব পাড়া বলে পরিচিত আলিপুরের আনাচেকানাচে আছে অনেক ইতিহাস, যেগুলি হয়তো খুব বেশি প্রচারের আলো পায়নি। আসুন আরও একবার খুঁজে দেখি পুরনো কলকাতার ধুসর হয়ে যাওয়া ইতিহাসের কয়েকটি পাতা।

আধুনিক কলকাতার অন্যতম অভিজাত এলাকা আলিপুরকে যে রাস্তাগুলি জড়িয়ে রেখেছে তার মধ্যে বেলভেডিয়ার  রোড অন্যতম। আলিপুর চিড়িয়াখানার ঠিক সামনে থেকে শুরু হয়ে মহিলা সংসোধনাগার এবং জাতীয় গ্রন্থাগারের পাশ দিয়ে আলিপুর থানা, ট্রাফিক গার্ড ও ভবানী ভবনকে পাশে রেখে হর্টি কালচার পার্ক পেরিয়ে আলিপুর রোডে মিশেছে এই রাস্তা। ম্যাপে দেখলে রাস্তাটির চেহারার সাথে মাছ ধরার বড়শির চেহারার মিল পাওয়া যায়। এই রাস্তার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রাক স্বাধীনতা যুগের ইতিহাস। যা সময়ের প্রভাবে বিবর্ন। এই ইতিহাস সেই সময়ের যখন ভারতের রাজধানী ছিল কলকাতা। আজকে যে বিরাট জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে জাতীয় গ্রন্থাগার সেই জায়গাটি ছিল তৎকালীন ভাইসরয় অব ইন্ডিয়া-এর বাড়ি, নাম বেলভেডিয়ার এস্টেট।

  ১৯১২ সালে কলকাতা থেকে দিল্লীতে রাজধানী চলে যাওয়ার আগে পর্যন্ত ইংরেজ শাসিত ভারতের রাজনীতি আবর্তিত হতো এই ৩০ একর জায়গা জুড়ে বেলভেডিয়ার এস্টেটকে  ঘিরে।  

তবে এই বাড়ি কিন্তু ব্রিটিশরা তৈরি করেনি। যতদূর জানা যায় এই বাড়িটি  তৈরি করেছিলেন মির জাফর, সময় ১৭৬০ সালের শেষ লগ্ন। পরে তিনি বাড়িটি ওয়ারেন হেসটিনস উপহার হিসেবে দেন। বিরাট প্রাসাদ এবং সামনে সবুজ ঘাসের গালিচায় সাজানো বাগান। এই সবুজ গালিচাতেই ঘটেছিল একটি হাড় হিম করা ডুয়েল। যার একদিকে ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিন্স অন্যদিকে ছিলেন তারই ল অফিসার ফিলিপ ফ্রান্সিস। দিনটি ছিল ১৭৮০ সালের ১৭ আগস্ট।

যতদূর জানা যায় এই লড়াইয়ের পিছনে কারণটি ছিল পুরোপুরি রাজনৈতিক মতানৈক্য এবং ব্রিটিশ রাজের অন্দরের অর্ন্তকলহ। ওয়ারেন হেস্টিন্স মনে করতেন মহারাজা নন্দকুমারকে তার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিলেন তারই সহকর্মী ফিলিপ ফ্রান্সিস। অন্য একটি সূত্র থেকে জানা যায় অ্যাংলো-মারাঠা যুদ্ধ নিয়েই দুই ব্রিটিশ কর্তার বিরোধ হয়েছিল। রোমহর্ষক এই লড়াই ছিল একটি পিস্তল যুদ্ধ। যেখানে আহত হয়েছিলেন ফ্রান্সিস।

 তবে ব্রিটিশ কর্তাদের মধ্যে ডুয়েল কিন্তু এটাই একমাত্র নয়। পুরানো কলকাতার ইতিহাস ঘাঁটলে আরও জানা যায় বর্তমানে যেখানে আলিপুর ব্রিজ ঠিক তার বিপরীতে একটি মাঠে দুটি গাছের মাঝে নিয়মিত ডুয়েল লড়াইয়ের আয়োজন করা হতো। লর্ড ক্লাইভ নিজেও একাধিক বার নাকি এই ডুয়েল লড়াইয়ে অংশ নিয়েছেন। তবে বেলভেডিয়ার এস্টেটের লড়াই ছিল অন্যগুলির থেকে একেবারেই ভিন্ন মাত্রার। যা পাল্টে দিতে পারতো ভারতের রাজনিতীর গতিপ্রকৃতি।

এরপর বেশ কয়েকবার হাত বদল হয় বেলভেডিয়ার এস্টেট। বর্তমানে এর মূল অংশটির দায়িত্ব আর্কিওলজিকাল  সার্ভে অফ ইন্ডিয়া-এর। বাকি অংশটি কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের আবাসন। জানা যায় কলকাতার বেলভেডিয়ার এস্টেটের নামে অস্ট্রেলিয়ায় নিজের পারিবারিক সম্পত্তির নাম করন করেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক কনসাল এবং ব্রিটিশ শাসিত ভারতের এক অ্যাডভোকেট জেনারেল, অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক রবার্ট প্রিন্সেস। 


ভারতবর্ষ ইংরেজ কর্তৃক দখলীকৃত না হলে... || রাণা

অদ্ভুতুড়ে ভাবনা। যদি ইংরেজরা ১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধে বা ১৭৬৪ সালের বক্সার যুদ্ধে হেরে বসত তাহলে ২০১৭ তে এসে পৃথিবীটাকে কেমন দেখতাম। ভৌ...