মঙ্গলবার, ২ জানুয়ারী, ২০১৮

অযাচিত বাক্যব্যয়… কড়চা-ব্লগার, বিতর্কিত বিদ্যা ও সামাজিক বিবর্তন… || সব্যসাচী সরকার

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষত এই ভার্চুয়াল জগতে বৈচিত্র্যময়তা নেহাত চোখে পড়ার মতো; মানুষ বিভিন্নভাবে নিজের চিন্তা ভাবনা, দৈনন্দিন কার্যকলাপ, ভবিতব্য সহ আরো বহু বিষয় নিয়ে প্রতিনিয়ত চর্চারত; সেখানে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে ব্লগ, ব্লগিং ও ব্লগার নিয়ে আলোচনা সমালোচনা অন্তহীন; তাই নিয়েই প্রারম্ভ করছি-

♦ব্লগ নিয়ে খুঁজতে গিয়ে স্যামহোয়ার ব্লগে পেলাম তথ্যটি- Blog শব্দটি মূলগত ভাবে Weblog থেকে এসেছে, জোম বার্গার ১৯৯৭সালে ১৭ডিসেম্বর ওয়েবলগ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন, এর পরবর্তিতে পিটার মেরহোলজ তাঁর PeterMe.com ব্লগে ১৯৯৯সালের মাঝামাঝি সময়ে Weblog শব্দটি ভেঙে We Blog করে ব্যবহার করেন; এর পরপরই পাইরা ল্যাবস্ Blog শব্দটি ক্রিয়া ও বিশেষ্য উভয়রূপে ব্যবহার শুরু করে, যা আজো চলমান; Blog হচ্ছে অনলাইন ভিত্তিক ব্যক্তিগত দিনলিপি বা দিনপত্রিকা; আর যারা সেখানে বিভিন্ন বিষয়াদি সংযোজন করেন তাদের Blogger বলা হয়; আর এটি নিয়মিত চর্চা করাকেই Blogging বলা হয়।

কদিন আগেই ব্লগারদের মাঝে চিরাচরিত পন্থায় যে বিতর্ক (যা অনেকাংশে ব্যক্তিগত কাদা ছোড়াছুড়িতে রূপান্তরিত হয়!) সেখানে কে মুক্তমনা আবার কে বদ্ধমনা (গুগলে সার্চ দিয়ে এর যথার্থ উত্তর পাইনি!) এ নিয়ে সে কি আলোচনা সমালোচনা, যদিও বেশিরভাগ বক্তব্য যেমন ছিলো তাচ্ছিল্যপূর্ণ তেমনি ছিলো নতুন প্রজন্মের জন্য একটি নেতিবাচক দৃশ্যপট প্রদর্শন করার মতই; তাই আবার খুঁজতে শুরু করলাম মুক্তমনা, বদ্ধমনা নিয়ে; আর মুক্তমনা বাংলা ব্লগ হতে যথার্থ উত্তর পেলাম মুক্তমনা সম্পর্কিত।

♦মুক্তমনা- যারা মুক্তচিন্তা বা স্বাধীন চিন্তায় আস্থাশীল, যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী তারাই মুক্তমনা; যারা হাজার বছরের লালিত ভাববাদী, অলৌকিকত্ব পূর্ণ, অবৈজ্ঞানিক দর্শনের ভিত্তিতে গড়া ধর্মীয় ও সামাজিক নিবর্তনমূলক অন্ধ কুসংস্কারের ও অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে বিজ্ঞানমনস্ক ও যুক্তিবাদী সমাজব্যবস্থা গড়নে বদ্ধপরিকর, এরাই মুক্তমনা; আর বদ্ধমনা’র সংজ্ঞা যে এর বিপরীত হবে তা নিয়ে নিশ্চয় দ্বিধা নেই কারো। এর পরেই অনেক কথোপকথন, মুক্তচিন্তক বা মুক্তমনা বা নাস্তিকদের কাজ কি শুধুই ধর্ম পোন্দানি( অশ্লীল শোনালো কিনা জানিনা!); সত্যতা যাচাইয়ে এবার দ্বারস্থ হলাম রণদীপম বসুর “ভারতীয় দর্শন(১ম)” ও “নাস্তিক্য ও বিবিধ প্রসঙ্গ” সম্পর্কিত বইগুলোর দিকে; সাথে অভিজিৎ রায়ের “বিশ্বাসের ভাইরাস” তো ছিলোই; কি বুঝলাম সেখান হতে -

♦মুক্তমনা, যুক্তিবাদী, নাস্তিক, অজ্ঞেয়বাদী, সংশয়বাদী- যে নামেই সম্বোধন করিনা কেন এখানে একটি বিষয় সুস্পষ্ট আগেই হয়েছে যে এরা সবাই বিজ্ঞানমনস্ক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদে আস্থাশীল; এরা কেউ বিশ্বাসে বিশ্বাসী নয়, বরং যুক্তিতে বিশ্বাসী; যেকোন বিষয়ে সংশয় প্রকাশ, তা পর্যালোচনা, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এরপর গ্রহণীয় না অগ্রহণীয় তা বিবেচ্য; ভারতীয় দর্শন নাস্তিক বা চার্বাকদের নিয়ে স্বতন্ত্র কোন গ্রন্থ সেভাবে চিহ্নিত না করা গেলেও বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থগুলোই নাস্তিক বা চার্বাকদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়; ধর্মগ্রন্থগুলোর বিভিন্ন আয়াত বা শ্লোকাদিতে নাস্তিকদের সংগ পরিত্যাগ সহ তাদের সমাজ বহির্ভূত করা সহ হত্যার আদেশও বর্ণিত আছে; যাই হোক ঐ কুটকচালিতে যাচ্ছিনা, এখন প্রাসঙ্গিক আলোচনা করি; মুক্তমনা বা নাস্তিকরা কি ধর্মবিরোধী? এ প্রশ্নের যথার্থ উত্তর যদিও আগে দিলেও তা হয়তো অলক্ষ্য হয়েছে তাই আরো একটু স্পষ্ট করি- ধর্মগ্রন্থগুলো মূলত বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের মূলচালিকা শক্তি, মুক্তমনা বা নাস্তিকরা যেহেতু তাত্ত্বিক ও যৌক্তিক পর্যালোচনায় বিশ্বাসী, তাতে দেখা যায় ধর্মের মাঝে নৃশংসতা, বর্বরতা, বৈষম্য, ব্যভিচার, নারীকে অবমূল্যায়ন সহ বর্তমান বাস্তবতার ভিত্তিতে ওগুলো অগ্রহণযোগ্য, তাই সেই অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধাচরণ স্বাভাবিকতা; স্টিভেন ওয়াইনবার্গের কাছে ধর্মের সংজ্ঞাটি যেমন- “ধর্ম মানবতার জন্য এক নির্মম পরিহাস। ধর্ম মানুক বা নাই মানুক, সবসময়ই এমন অবস্থা থাকবে যে ভালো মানুষেরা ভালো কাজ করছে, আর খারাপ মানুষেরা খারাপ কাজ করছে। কিন্তু ভালো মানুষকে দিয়ে খারাপ কাজ করানোর ক্ষেত্রে ধর্মের জুড়ি নেই।” অপরদিকে ভারতীয় দর্শনে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে- নাস্তিক তাঁরাই যারা বেদের সিদ্ধান্ত প্রমাণরূপে গ্রহণ করেনা, সে অর্থেই বৌদ্ধ ও জৈনগণ পরলোক বিশ্বাস স্বীকার করলেও বেদনিন্দা করে নাস্তিকরূপে আখ্যায়িত হয়েছে; তবে এক্ষেত্রে চার্বাকগণ বেদ ও পরলোক উভয়ই অস্বীকার করে নাস্তিক শিরোমণি আখ্যায়িত হয়েছে; তাই চতুর্দশ শতকের দর্শন সংস্কারক মাধবাচার্য্য তাঁর “সর্বদর্শনসংগ্রহ” গ্রন্থে উদ্ধৃত করেন- “নাস্তিকাশিরোমণিনা চার্বাকেণ” অর্থাৎ নাস্তিক শিরোমণি চার্বাক; উপরোক্ত আলোচনায় একটি বিষয় দৃশ্যমান তা হলো- নাস্তিক বা চার্বাকগণ সামাজিক রীতিনীতির মধ্য থেকে সমাজপতি কর্তৃক সৃষ্ট অলৌকিক সৃষ্টিকর্তা বা আদর্শের নাম ভাঙিয়ে পরলোকের সুখস্বপ্ন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে ভাগ্যবাদ ও সৃষ্টিকর্তার পরীক্ষা নামক মিথ্যে ফাঁদগুলোর যুক্তিযুক্ত সমালোচনা করেছে; প্রত্যাশিত মানবতার মুক্তি, দাসত্বপ্রথা হতে চিরমুক্তি; মুক্তমনারা সেই চার্বাক, নাস্তিক শিরোমণি।

আজকের মুক্তচিন্তার জগতে সংশয়, দ্বিধা, দ্বিমত থাকার পাশাপাশি রয়েছে বিশ্বাসহীনতার চর্চা; তা আলোচনা পূর্বে বাংলাদেশে মুক্তচিন্তার ঐতিহাসিক ও নৃশংস চিত্রগুলো পর্যালোচনা করার জন্য বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া মুক্তচিন্তার চর্চাকারীদের উপর নৃশংস ও বর্বরোচিত হামলা হত্যার ঘটনাগুলো ইন্টারনেট-এ সার্চ করতে গিয়ে কাজী মাহবুব হাসান-এর একটি অনুবাদ পড়লাম, তাই সেই ঘটনাটি মনে দাগ কেটেছিলো; “হিতোশি ইগারাশি” ইসলামিক আর্ট-এর উপর জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় হতে পিএইডি ধারী, পাশাপাশি ইসলামিক বিপ্লবের পূর্ব পর্যন্ত রয়াল অ্যাকাডেমি অফ ইরান, তেহরান-এ ফেলো হিসেবে কর্মরত ছিলেন; ১৯৮৮সালে প্রকাশিত সালমান রুশদি’র “দ্যা স্যাটানিক ভার্সেস”এর জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেন (১৯৯১সালে); ধর্ম অবমাননাকর বইয়ের অনুবাদ করার জন্য ১৯৯১সালে ১২জুলাই তাকে ইরানের ইসলামিক আততায়ীরা তাঁর ৭তলার অফিসের লিফটের সামনে মাথায়, কাঁধে, ঘাড়ে কুপিয়ে হত্যা করে; উল্লেখ্য যে উপরোক্ত বইয়ের প্রকাশক, অনুবাদক, লেখককে হত্যার জন্য তৎকালীন ইরানের ধর্মীয় শীর্ষনেতা আয়াতোল্লাহ রুহুল্লা খোমেনী ফতোয়া দেন ১৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৯-এ; এর আগে ৩জুলাই ১৯৯১-এ ইতালীর মিলানে এ্যাত্তোরি ক্যাপ্রিয়ালো ইতালীয় অনুবাদক এবং ১৯৯৩-এ নরওয়ের একজন প্রকাশক উইলিয়াম নেয়াগার্ড উপরোক্ত কারণে ধর্মান্ধ ইসলামবাদীদের নৃশংস আক্রমণের শিকার হয়ে বেঁচে যান।

এখন আমরা চোখ ফেরাবো বাংলাদেশের দিকে, কি হয়েছে মুক্তচিন্তার জন্য মুক্তমনাদের সাথে-

♦শুরুটা যুদ্ধাপরাধী কসাই কাদের ওরফে কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন রায় দেবার পর ৫ফেব্রুয়ারি ২০১৩ থেকে। রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নেমেছিল কয়েকজন ব্লগার শাহবাগে, গড়ে তুলেছিলো গণজাগরণ মঞ্চ।

♦এরপরেই বিভিন্ন মাধ্যম ঘুরে প্রকাশিত হয় ৮৪জনের হিট লিস্ট; সংগঠনগুলোর দেওয়া এ তালিকাগুলোতে মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও লেখক অভিজিৎ রায়, মুক্তমনা ব্লগের আরেক ব্লগার, লেখক ও ব্যাংকার অনন্ত বিজয় দাশ, গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক ও অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট আহমেদ রাজিব হায়দার শোভন এবং নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয়ের নাম ছিল। তবে অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট ওয়াশিকুর রহমান বাবুর নাম এ লিস্টে ছিল না।

তালিকায় থাকা অন্য ব্লগার হলেন— দূরের পাখি, রাস্তার ছেলে, আরিফুর রহমান, মনির হাসান, বৃত্তবন্দি, সবাক, শয়তান, মনজুরুল হক, কখগ, রাসেল, নাস্তিকের ধর্মকতা, আরিফুল হক তুহিন, তিতি আনা, নাজিম উদ্দিন, আলমগীর কুমকুম, ফরহাদ উদ্দিন স্বপন, দস্যু বনহুর, ফারহানা আহমেদ, ঘনাদা, রাহান, অন্যকেউ, পাপী০০৭, হোরাস, প্রশ্নোত্তর, ভালোমানুষ, ভুপীর, বৈকুণ্ঠ, সত্যান্বেষী, পড়ুয়া, হাল্ক (সানাউল), বিপ্লব০০৭, ঘাতক, বিশাল বিডি, সাহোশি ৬, লাইটহাউজ, মমতা জাহান, রাতমজুর, কৌশিক, মেঘদূত, স্বপ্নকথক, প্রায়পাস, আহমেদ মোস্তফা কামাল, লুকার, নুহান, সোজাকথা, ট্রানজিস্টার, দিওয়ান, রিসাত, আমি এবং আধার, অরণ্যদেব, কেল্টুদা, আমি রোধের ছেলে, ভিন্ন চিন্তা, আউটসাইডার, প্রণব আচার্য্য, আসিফ মহিউদ্দিন, আবুল কাশেম, আলমগীর হোসেন, আশীষ চ্যাটার্জি, বিপ্লব কান্তি দে, দাঁড়িপাল্লা ধমাধম (নিতাই ভট্টাচার্য), ইব্রাহীম খলিল সবাগ (সুমন সওদাগর), কৌশিক আহমেদ, নুরনবী দুলাল, পারভেজ আলম, রতন (সন্ন্যাসী), সৈকত চৌধুরী, শর্মী আমিন, সৌমিত্র মজুমদার (সৌম্য), আল্লামা শয়তান (বিপ্লব), শুভজিৎ ভৌমিক, সুমিত চৌধুরী, সৈকত বড়ুয়া, সুব্রত শুভ, সুশান্ত দাস গুপ্ত, সৈয়দ কামরান মির্জা, তাহসিন, তন্ময়, তালুকদার ও জোবায়ের সন্ধি।

♦গণজাগরণ মঞ্চ-এর আন্দোলন শুরু পূর্বে ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত বইমেলা থেকে বেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিজের বাসায় যাওয়ার পথে ঘাতকদের আক্রমণের শিকার হন লেখক ও শিক্ষক হুমায়ুন আজাদ। বিদেশে নিবিড় চিকিৎসার মাধ্যমে তিনি কিছুটা সুস্থ হন। পরবর্তীতে জার্মানীতে নিজ রুমে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়, সাথে তাঁর পরিবারকে লিখে যাওয়া শেষ ৩টি চিঠিই পাওয়া যায়, সেগুলোই হয়তো তাঁর শেষ লেখা ছিলো; পাক সার জমিন সাদবাদ, নারী বইগুলো তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়।
♦উপরোক্ত লিস্ট প্রকাশের পূর্বেই অনলাইনে ধর্ম নিয়ে কঠোর সমালোচনার জন্য ২০১৩সালের ১৫জানুয়ারি ব্লগার “আসিফ মহিউদ্দিন” ইসলামবাদীদের হামলার শিকার হয়েও প্রাণে বেঁচে যান; তাকে মাথায়, কাঁধে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিলো, কিন্তু ভারী শীতের পোশাক থাকার কারণে বেঁচে গিয়েছিলেন।

♦২০১৩সালের ১৫ফেব্রুয়ারি ব্লগার ও গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংঘটক স্থপতি রাজীব হায়দার শোভন (থাবা বাবা নামে ব্লগে পরিচিত!)’কে চাপাতি দিয়ে মাথায়, কাঁধে, ঘাড়ে এমনভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিলো যে তাঁর পরিবার তাকে সনাক্ত করতে দ্বিধান্বিত হয়ে গিয়েছিলো।

♦২০১৪সালের ১৫নভেম্বর বাউল মতাদর্শী রাবি’র সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক শফিউল ইসলামকে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে; তিনি নারীদের নেকাব ও বোরকা পড়ার বিষয়ে নিষেধ করতেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন ঐসব পোশাক পড়ে শিক্ষার্থীরা নকল করার চেষ্টা করতে পারে।


♦২০১৫সালের ২৬ফেব্রুয়ারি ব্লগার ও স্বনামধন্য মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায় ও তাঁর জীবনসঙ্গী বন্যা আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিক্ষক মিলনায়তন-এর সম্মুখে জনবহুল স্থানে ইসলামবাদী সন্ত্রাসীদের নির্মম শিকার হন; অভিজিৎ রায়কে টার্গেট করে চাপাতি উপুর্যুপরি মাথায়, কাঁধে, ঘাড়ে, হাতে, বগলের নিচে কোপানো হয়, মাথার মগজ বেড়িয়ে আসে এক পর্যায়ে, অভিজিৎ-এর মৃত্যু নিশ্চিত করে, তাকে বাঁচাতে গিয়ে বন্যা নিজেও নির্মমভাবে আহত হয়, হাতের একটি আঙুল হারায়।


♦২০১৫সালের ৩০মার্চ ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু (কুৎসিত হাঁসের ছানা, হাঁসজারু বিভিন্ন ছদ্মনাম দিয়ে লিখতেন!) নৃশংসভাবে খুন হন ধর্মান্ধ মোল্লাগোষ্ঠি দ্বারা; তারা চাপাতি দিয়ে শুধু ওর মাথায়, ঘাড়ে, কাঁধে আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করে; অভিজিৎ মৃত্যুর পর ওর প্রোফাইল ফটো ছিলো “i am avijit” এবং সেই লিখেছিলো “শব্দ কখনো মরেনা” “Words Cannot Be Killed”।


♦২০১৫সালের ১২মে মুক্তমনা’র ব্লগার, যুক্তি সাময়িক পত্রিকার সম্পাদক ও ব্যাংকার অনন্ত বিজয় দাশ’কে উগ্র ইসলামবাদীরা কুপিয়ে হত্যা করে।

♦২০১৫ সালের ৭আগস্ট মুক্তমনা ব্লগার ও বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির সম্পাদক নীলাদ্রী চট্টোপাধ্যায় (নিলয় নীল তাঁর ছদ্মনাম!) নিজ বাসায় পরিবারকে জিম্মি করে মৌলবাদী গোষ্ঠী তাকে নৃশংসভাবে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে, উল্লেখ্য যে, নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশকে জানানোর পরও পুলিশ কোন ব্যবস্থা নেয়নি।

♦২০১৫সালের ৩১অক্টোবর মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী জাগৃতি প্রকাশনার কর্ণধার ফয়সাল আরেফিন দীপন বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তিবাদী লেখক অভিজিৎ রায়-এর “বিশ্বাসের ভাইরাস” প্রকাশের জন্য মৌলবাদীদের চক্ষুশূল হন, তাকে তাঁর কার্যালয়ে মৌলবাদীরা কুপিয়ে নৃশংসতার সাথে হত্যা করে।


♦২০১৫সালের ৩১অক্টোবর ঐ একই দিনে মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী শুদ্ধস্বর প্রকাশনার কর্ণধার আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল অভিজিৎ রায়-এর বই প্রকাশের জন্য নিজ কার্যালয়ে মৌলবাদী কর্তৃক আক্রান্ত হন, সাথে লেখক রণদীপম বসু ও কবি তারেক রহমানও মারাত্মকভাবে আহত হলেও প্রত্যেকে প্রাণে বেঁচে যান, তাদেরকেও চাপাতি দ্বারা কোপানো হয়েছিলো।

♦২০১৬সালের ৬এপ্রিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনবিভাগেরর শিক্ষার্থী নিজাম উদ্দিন সামাদ উদারপন্থী ব্লগার ও সেক্যুরালিজম-এর ধারক হওয়ায় তাকে ইসলামী উগ্রবাদীরা কুপিয়ে হত্যা করে।

গল্পের শুরুটা যেখানে সেখানে আরো কত কি, মুক্তচিন্তা, রাজাকার বিরোধী আন্দোলন ও তৃতীয় লিঙ্গ বৈষম্য সমর্থন করার জের ধরে ধর্মান্ধরা কি হত্যাযজ্ঞে মেতেছিলো-

♦২০১৩ সালের ২ মার্চ শনিবার রাতে সিলেটে গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক, ছাত্রলীগের সাবেক নেতা জগৎজ্যোতি তালুকদার হত্যা করা হয়।

♦২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর বগুড়া জেলা সেক্টরস কমান্ডারস ফোরামের যুগ্ম সম্পাদক, গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সমন্নয়ক, বগুড়ার শেরপুর ডিগ্রি কলেজে গণিত বিভাগের প্রভাষক জিয়াউদ্দিন জাকারিয়া বাবু’কে হত্যা করা হয়।

♦২০১৬সালের ২৩এপ্রিল রাবি’র ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক রেজাউল করিম কে মৌলবাদী সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে হত্যা করে।

♦২০১৬ সালের ২৬এপ্রিল লিঙ্গ সমতা প্রতিষ্ঠার পক্ষে ‘রূপবান’ নামে সাময়িকীর সম্পাদক ইউএসএআইডি’র কর্মকর্তা জুলহাস মান্নান এবং তাঁর বন্ধু তনয় মজুমদার’কে বাসায় ঢুকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা।

এ হত্যাযজ্ঞের তালিকা আরো দীর্ঘতর হতে পারে সে নিশ্চয় সকলেই অবগত; কেন এ তথ্যগুলোর পূনরাবৃত্তি? এ প্রশ্ন আসা স্বাভাবিকতা, আমি সেটিই বলতে চাই আমার মতো করে--

উপরোক্ত ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে প্রতিটি ঘটনার মোটিফ প্রায় একই, আর তা হচ্ছে ধর্ম অবমাননা বা ধর্মানুভূতিতে আঘাত; বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের ধ্বজভঙ্গ অনুভূতি স্বাভাবিকতা; কারণ পর্যালোচনা করলে কি দেখবো- রাষ্ট্রযন্ত্র ক্ষমতায় টিকে থাকার লোভে পড়লে যা হয় তাঁরই লক্ষণ এটি; এ কথা উল্লেখ করলাম একটি ঐতিহাসিক সূত্র ধরে; পাকিস্তানি নাগরিক ফাতিমা ভূট্টোর “সংস অব ব্লাড এন্ড সোর্ড” বইটি পড়তে গিয়ে চোখে পড়েছে, পরবর্তীতে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক-এ বেনজীর ভূট্টোর হত্যাকান্ড নিয়ে একটি প্রামান্য চিত্র দেখতে গিয়ে আমি ঘটনাগুলো উপলব্ধি করি; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান- বাঙালির এক ঐতিহাসিক ভিত্তিমূলের নাম, আজকের বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও অবিসংবাদিত এক নেতৃত্বের নাম, যার নেতৃত্ব বাঙালির মুক্তির সনদ এনে দিয়েছিল, দিয়েছিলো একটি স্বাধীন পতাকা; আজকের করচা শুধুমাত্র একটি ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষাপট নিয়ে, হয়তো এই ঐতিহাসিক সত্য বঙ্গবন্ধু’কে আরো একটু জানতে প্রণোদিত করবে।বাংলাদেশের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর যেমন এক ঐতিহাসিক স্থান দখল করে আছে, একইভাবে পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টো ও তাঁর পরিবারও ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।

২৩জুন, ১৯৪৯ ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম আওয়ামীলীগ’ যা ১৯৫৫’তে এসে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামীলীগ নামকরণ হয়- ভিত্তি ছিল সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা মহাউত্থান আর রাষ্ট্রব্যবস্থার মূলমন্ত্র; এটিই ছিল তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান শাসনমালে একমাত্র বিরোধী দল; বঙ্গবন্ধু এ মহান দলটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ছিলেন ১৩বছর, আর রাজনৈতিক দল হিসেবে তাঁর উপস্থিতিতে যা ঘটেছে তার বাস্তবতা- ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’।
পাঠক মনে প্রশ্ন আসতেই পারে এ আলোচনায় ভুট্টো পরিবারকে টেনে আনার কি কারণ? হ্যাঁ যৌক্তিক প্রশ্ন। ১ডিসেম্বর, ১৯৬৭সালে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু ‘পাকিস্তান পিপলস্ পার্টি'(পিপিপি)’র; পশ্চিম পাকিস্তানে ইয়াহিয়া খান-এর ঘরের শত্রু বলে পরিচিত হচ্ছিলো এ দল; রাজনৈতিক ইতিহাসে এ পরিবারটির হারানোর হিসেবটাও নেহাত কম নয়, জুলফিকার আলী ভুট্টো সামন্তবাদী পরিবারে জন্ম হয়েও সেই সামন্তবাদের বিরুদ্ধে লড়েছেন, আমি তাঁর রাজনৈতিক আদর্শিক আচরণ নিয়ে কথা না বলে বলবো বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক আদর্শিক প্রভাব আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কতটা প্রভাব বিস্তার করেছিলো তাঁরই প্রমাণ জুলফিকার আলী ভুট্টো’র বক্তব্য-
বঙ্গবন্ধু’র ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবীর মধ্যে শুধু ‘স্বতন্ত্র সংসদ ও স্বতন্ত্র বাঙালি মুদ্রা’ ছাড়া সবগুলো নীতিই সমর্থন করেছিলো।
ইয়াহিয়া খান কোনভাবেই চায়নি সমাজতান্ত্রিক কোন দল সে আওয়ামীলীগ বা পিপিপি যেই হোক শাসনতন্ত্র নিবে, তাই পরিকল্পিত ভাবে ১মার্চ ১৯৭১-এ বেসামরিক মন্ত্রীসভা ও জাতীয় সংসদ অধিবেশন দুটোই বাতিল করে।কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান সরকার ভেঙে পড়া শুরু করে যেমন বঙ্গবন্ধু’র নেতৃত্বাধীন দলের কার্যক্রমের জন্য, অপরদিকে জুলফিকার আলী ভুট্টোও তাঁর প্রচারনা কার্যক্রম ত্বরান্বিত করে যা ইয়াহিয়া খানের বিপক্ষে চলে যায়।
২৫মার্চ ১৯৭১- ভুট্টো, ইয়াহিয়া ও বঙ্গবন্ধু’র আলোচনা ভেস্তে যাওয়া, সামরিক জান্তা টিক্কা খান তাঁর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ শুরু করে;
করাচিতে খবর পৌঁছুলো পাকিস্তানি সামরিক জান্তা কর্তৃক মহিলাদের উপর অনৈতিক সহিংসতা ও বুদ্ধিজীবী হত্যার বিষয়ে, অনুরূপ হত্যাযজ্ঞ তারা পশ্চিম পাকিস্তানের সিন্ধুতেও করার পরিকল্পনা করেছে; এ খবরটি সিন্ধুর একজন আইনজীবী আব্দুল ওয়াহেদ কাটপার-এর মাধ্যমে পিপিপি সভাপতি জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে পৌঁছুলে তাঁর ঐ সময়ের অভিব্যক্তি বঙ্গবন্ধু’র নেতৃত্বের গুণাবলিকে এক অন্যরকম উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে; বক্তব্যটি এমন ছিলো-
জুলফিকার ফোন নিয়ে জেনারেল গুল হাসানের সাথে কথা বললেন, গুল হাসান ছিলেন তখনকার সিন্ধুর করপ-কমান্ডার; জুলফিকার আলী ভুট্টো ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন- “আমি শুনেছি আপনারা পূর্ব পাকিস্তানে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছেন; যদি আপনারা এই জঘন্য অপরাধ সিন্ধুতেও সংঘটিত করেন, তবে আমি হবো আপনাদের জন্য দ্বিতীয় মুজিব এবং আপনাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবো”।

উপরোক্ত ঘটনা আমাদের নিশ্চয় আন্দোলিত করবে কিছুটা, আর পাকিপন্থীরা খুব খুশি হবে; আমি এর পরের গল্পে যাই- তৎপরবর্তী রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দোলাচলে জুলফিকার -এর ফাঁসি হয় তাঁর নির্বাচিত প্রতিনিধি সেনাপ্রধান কর্তৃক, অপরদিকে বঙ্গবন্ধুও স্বাধীন বাংলায় আপনজনের মাঝে থেকেও পরিবারসহ নিহত হলেন; একটি যুগের অবসান, উভয় ঘটনার সামঞ্জস্যতা হচ্ছে পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে মৌলবাদী চক্রগুলো সংঘবদ্ধ হচ্ছিলো আর প্রগতিশীল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক দল গুলো আদর্শিক দ্বন্ধে বহুভাগে বিভাজিত হলো; কারো কাছে কার্ল মার্কস, কারো কাছে লেনিন, কারো কাছে স্টালিন, কারো কাছে মাও, কারো কাছে কনফুসিয়াস, আরো কত কি; বামদলগুলো জনসমর্থন হারাচ্ছিলো দিনদিন, আজো তারা একার্থে জনবিচ্ছিন্ন, অথচ উগ্রবাদীরা সমন্বিত জোটবদ্ধ; এরকম প্রশ্নের উত্তর সহজতর হলো আদর্শগত দ্বন্ধ; বামেদের মাঝে যে সমস্যা ছিলো তা আরো প্রকট হলো যখন প্রতিপক্ষ তাদের নাস্তিকদের দল বলে আখ্যায়িত করলো; জনগণ যতক্ষণ অবধি তাঁর মৌলিক চাহিদা মোচন করতে না পারবে তাদের শেষ ভরসা যে ঐ অলৌকিক ঈশ্বর হবে তা নিয়ে দ্বিধার কোন অবকাশ নেই; যাই হোক পশ্চিম পাকিস্তানে বেনজীর পূর্ববর্তী সময় হতে ইসলামিক দল গুলো কর্তৃত্ব পরায়ণ হয়ে উঠে ফলশ্রুতি বেনজীরের অকাল মৃত্যু, শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার নেশায় কতটা বুদ হয়ে থাকলে মানুষ নিজের ভাইকে হত্যার আদেশ দিতে পারে; বাংলাদেশের বর্তমান সরকার একইপথে হাঁটছে, হেফাজত ইসলাম বা ইসলামিক আন্দোলন বা ওলামালীগ-এর মতো কট্টরপন্থীদের একেরপর এক দাবী মেনে নেয়া, শিক্ষাব্যবস্থাকে ইসলামিকরণ করার অপচেষ্টা, সংখ্যালঘু নির্যাতনে নিরব দর্শক, রোহিঙ্গা ইস্যুতে মুসলিম মানবতা প্রদর্শন, প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংসসহ ব্যাংকিং ও অন্যান্য আর্থিক কাঠামোর ভঙ্গুর গঠন, দ্রব্যমূল্যের অস্থিতিশীলতা, বেকারত্ব, বৈষম্য সবমিলিয়ে যে জটিল অবস্থা তার প্রতিবাদে বাম দলগুলো একটুআধটু নড়াচড়া করলেও তা রাষ্ট্রযন্ত্রে এক হাঁচিতেই স্থবির হয়ে পড়ে; এরপর রয়েছে বিচারহীন বিচার।

ব্লগারদের মধ্যকার এত বিচ্ছিন্নতাও কিন্তু আন্দোলনের সফলতার পেছনে ব্যর্থতারই কারণ; এখন অবধি ব্লগার হত্যার বিচার সুসম্পন্ন হয়নি, অপরদিকে প্রতিদিন একের পর এক ইস্যুর মাঝে ক্ষীণ সম্ভাবনা রয়েছে বিচার পাওয়ার; ভার্চুয়াল জগতের যুদ্ধ চলতেই আছে, ধর্মে ধ্বজাধারীরা জোটবদ্ধ হয়ে বিভিন্ন মুক্তচিন্তকদের বাধা প্রদান করছে প্রচারণায়, রিপোর্ট করে বা হ্যাক করে আইডি নষ্ট করছে; এরপরও বারবার জেগে উঠা, অনুপ্রাণিত হয় নতুন প্রজন্ম, কেউ ভিডিও ব্লগার, কেউ লেখালেখি করে ব্লগিং চালিয়ে যাচ্ছে; নাস্তিক বা মুক্তমনা ট্যাগ লাগানো সহজ, কিন্তু এর দায়বদ্ধতাও রয়েছে, মানুষের প্রতি, মানবতার প্রতি; “নাস্তিক্য ও বিবিধ প্রসঙ্গ” বই হতে একটু খন্ডিত অংশ সংযোজন করে শেষ করছি- “যে পাঠকের কাছে লেখক নন লেখাটাই গুরুত্বপূর্ণ, তিনিই সচেতন পাঠক এবং একজন সচেতন পাঠকই কেবল কোনো লেখা গ্রহণ। বা বর্জনের ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু যে পাঠকের কাছে লেখার চাইতেও লেখকই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যান, সে পাঠকের আবিষ্ট মনন-চোখ আসলো গ্রহণ-বর্জনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে প্রিয় লেখক কর্তৃক উৎসারিত সবকিছুই এ ধরনের পাঠকের কাছে অবর্জনীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়। অর্থাৎ তাঁরা একধরনের অন্ধ ভক্তিবাদের ফাঁদে আটকে যান। এই পাঠকদেরই বলা হয় ভক্ত পাঠক। কিন্তু অন্ধবিশ্বাস যেমন আসলে কোনো বিশ্বাসই নয়, অন্ধভক্তও প্রকৃতপক্ষে ভক্ত হয়না। কারণ তাদের কোনো বিবেচনাবোধ থাকেনা এবং এই ভক্তিবাদ বা পীরবাদ থেকেই অতঃপর জন্ম নেয় স্তুতিবাদ। আর অন্ধভক্তরাই রূপ নেয় স্তাবকগোষ্ঠীতে।”
“…পীর যা বলেন, যা করেন, যা দেখান, বিনা প্রশ্নে তাই হয়ে ওঠে তাঁদের কাছে অনুসরণীয়, অনুকরণীয়, পালনীয় দৃষ্টান্ত। যুক্তিবোধ রহিত এসব ভক্তের চোখে তাই পীরই একমাত্র আশ্রয়, বিকল্পহীন অবলম্বন।”

উপরোক্ত প্রবণতা যেমন- ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর মাঝে রয়েছে, তেমনি রয়েছে ব্লগার জগতে, বিশেষ করে বাঙালি ব্লগারদের মাঝেও; মৌলবাদীরা যেমন চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে যুক্তিবাদীদের স্তব্ধ করতে চায়, কথিত মুক্তচিন্তকরা পরস্পরকে হেয় করতে হেন চেষ্টা নেই করতে পারেনা; আর তাদের অন্ধভক্তদের এ কার্য়ক্রম পুরো মুক্তচিন্তার জগতে বিতর্কিত করে তোলে; আজ মুক্তমনা, নাস্তিক গালিতে রূপান্তরিত হয়েছে এদেরই কারণে; সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গোপনীয় বিষয়াদি প্রকাশের নগ্ন হুমকিতো চলছেই, কতক জনতো বিদেশগমন স্বার্থক করতে “গুরু মলমূত্রাদি মোবারক” বিশ্বাসে বিশ্বাসে; কেউ ২মাস, কেউ দেড় বছর মধ্যে নাস্তিক, মুক্তমনা হয়ে গড়ে উঠে; বেশিরভাগ না জেনে, না যাচাই বাছাই করেই অন্ধের মতো সব বিশ্বাস করে নাস্তিক/মুক্তমনা; ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠী যেমন ধর্মের অপব্যাখ্যা করে ধর্মীয় সব অপকর্মকে জায়েজ করার অপপ্রয়াস চালায়, কথিত নাস্তিকরাও ধর্মপোন্দানি যুক্তি ও তথ্যের আলোকে না করে মিথ্যাচার করে, এটা নিশ্চয়ই অনুচিত, ধর্মের ভিত্তিই তো মিথ্যে, তাহলে তা নিয়ে কেন মিথ্যাচার করতে হবে; নাস্তিক বা মুক্তমনা হওয়া, কত সহজ বিষয়টা! এগুলো হতে বেড়িয়ে আসার প্রচেষ্টারত আছে অনেকেই, ধর্মের জন্য ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে মুক্তচিন্তক হতাহত হয়েছে, বাংলাদেশ ধর্মের বিষবৃক্ষ উৎপাটনে পথিকৃৎ বললে হয়তো ভুল হবেনা।

কট্টরপন্থী, উগ্র, জঙ্গি, মৌলবাদী গোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় ভয় আমাদের এ কলম ও মস্তিষ্কজাত নিয়ে, তাই তারা বারবার পেছন থেকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মস্তিষ্ককে আর ভাবনার প্রকাশ করার কলম ধরার আঙুলকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়, কিন্তু আমরাতো জানি- “শব্দ কখনো মরেনা”…!

কৃতজ্ঞতা- অরুণাভ রহমান অঞ্জন ও আবীর রায়হান -এর টাইমলাইন, রণদীপম বসু’র ভারতীয় দর্শন খন্ডসমূহ, এবং সর্বোপরি গুগলসার্চ…!

কোন মন্তব্য নেই:

ভারতবর্ষ ইংরেজ কর্তৃক দখলীকৃত না হলে... || রাণা

অদ্ভুতুড়ে ভাবনা। যদি ইংরেজরা ১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধে বা ১৭৬৪ সালের বক্সার যুদ্ধে হেরে বসত তাহলে ২০১৭ তে এসে পৃথিবীটাকে কেমন দেখতাম। ভৌ...