সোমবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

বাস্তবতার নিরিখে রোহিঙ্গা।। দারা চৌধুরী

বাস্তবতার নিরিখে রোহিঙ্গা - ১
------------------------------------------------
রোহিঙ্গাদের উৎপত্তি, সমস্যা, ইতিহাস, নির্যাতন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে অনলাইনে প্রচুর লেখালেখি হচ্ছে। আবার পাঠকরাও স্বপ্রণোদিত হয়ে গুগল সার্চ করে এবিষয়ে বিস্তারিত পাঠ করছেন কৌতুহল বশত। সুতরাং এনিয়ে কিছু বলা বা লেখা মানে চর্বিতচর্বণ নয়ত বাহুল্য মনে হবে। তাই একাডেমিক কিছু না লিখে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু বিষয় পর্যালোচনা করব।
আশা করি এতে পাঠকরা বিষয়টি নিয়ে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ পাবেন।

আমার প্রেষণ
---------------------
আমি যখন ১৯৯২ সালে বিসিএস করে প্রথম সরকারি চাকুরিতে ঢুকি তার কিছুদিন পরই আমাকে রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবিরে প্রেষনে কাজ করার জন্য আদেশ করা হয়। প্রথমবার আমি অসুস্থ থাকায় (তখন আমি সবেমাত্র একটি বড় অপারেশনের ধকল সেরে উঠেছি) অর্ডারটি ক্যানসেল করাই। কিন্তু ছমাস পরেই আবারো অর্ডার আসে। আমি বাধ্য হয়েই সেথানে যোগদান করি। আমার কপাল কিছুটা ভালই বলতে হবে আমার যে ক্যাম্পে ডিউটি সেটি ছিল কক্সবাজার টেকনাফ সড়কের ধারেই। ফলে দুর্গম এলাকায় যেতে হয়নি, ক্যাম্পেও থাকতে হয়নি। আমি থাকতাম টেকনাফ হেলথ কমপ্লেক্সের একটি রুমে, আমার যাতায়াত ও ব্যবহারের জন্য একটি জিপ দেয়া হয়েছিল। যেহেতু ডাক্তারদের একটি বড় সুবিধা মানুষের খুব কাছাকাছি যাবার, সেই সুবাদে আমি কিছুদিনের মধ্যেই রোহিঙ্গাদের খুব আস্থাভাজন হই। এবঙ তাদের সুখদুঃখের অনেক কথাই জানতে পারি।

রোহিঙ্গাদের স্বপ্ন
------------------------
খুব জটিলতায় না যেয়ে বা ইতিহাসের কপচানি না কচলায়ে এটা সহজ করে বলা যায় নিকট অতীতে রোহিঙ্গাদের মূল সমস্যাটা তৈরি হয় ১৯৬২ সালে নে উইন কর্তৃক বার্মায় সামরিক শাসন জারির পর থেকেই। কারণ অতীতে অনেকবারই রোহিঙ্গা তথা আরাকনিরা চট্রগ্রামে চলে এসেছে, চলে এসে আবার কেউ কেউ ফেরতও গেছে। আবার বিপরীতক্রমে চট্রগ্রাম থেকেও ক্ষনে ক্ষনে বাঙালিরা আরাকানে গেছে। তাই সেই প্রসঙ্গ  আর তুলতে চাচ্ছিনা। বার্মার সামরিকজান্তা ক্ষমতায় এসে এক সামরিক ফরমান বলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়। ফলে এরা সবধরনের নাগরিক সুযোগসুবিধা (রেশন, পাসপোর্ট, ন্যাশনাল আইডি, জমি ক্রয়, লাইসেন্স, পারমিট, ভোটাধিকার প্রভৃতি) ও রাষ্ট্রীয় সেবা (পড়ালেখা, চিকিৎসা) থেকে বঞ্চিত হয়। আর আধুনিক বিশ্বের  কোনকিছুই ওরা ভোগ করবে দূর থাক, নামই হয়ত শুনেনি কোনদিন। এর ফলে ওরা নিজ দেশেই উদ্বাস্তুর মত বসবাস করতে থাকে। এই কষ্ট আরো চরমে উঠে যখন এক অসভ্য, বর্বর প্রথা 'গেটো' চালু করা হয়। এই প্রথায় রোহিঙ্গারা একটি নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে যেতে পারবেনা। এবং বিয়ে, সন্তান, এমনকি ভেঙ্গে যাওয়া ঘরটুকু ছাওয়াতেও অনুমোদন নিতে হয়। অন্যের ক্ষেতে খামারে সস্তা শ্রম বিক্রি ও বাসাবাড়িতে চাকরের কাজ ছাড়া ওদের আর কোন গত্যন্তর নাই। অনেকটা ক্রিতদাসের মত।

ফলে সকল রোহিঙ্গাদের কাছেই ঐ দূরে নদীর পারের বাংলাদেশকে ওদের নিকট স্বপ্নের দেশ মনে হতে থাকে। কোনোক্রমে নদী বা সীমান্ত পার হয়ে এপারে এলেই ওরা নিজেকে সফল মনে করে, যেমন আমরা যেকোনভাবে ইউরোপ আমেরিকায় ঢুকতে পারলে মনে ককরে থাকি। গেটোর নির্মম পেষণ থেকে মুক্তিলাভ, নির্মল বাতাসে এক স্বস্তির নিশ্বাস ফেলা।

বাস্তবতার নিরিখে রোহিঙ্গা- ২
--------------------------------------------
রোহিঙ্গা ঢল
------------------
যার কারণে সারা বছরেই রোহিঙ্গারা বিচ্ছিন্নভাবে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এবং নানান কায়দায় এখানে মিশে যায় ও থেকে যায়। এটি খুব কঠিন কাজ নয়। আমাদের বিজিবি ও মায়ানমারের বিজিপি (পূর্বতন নাসাকা) উভয়েরই চরিত্র ফুলের মত পবিত্র বিধায় কিছু টাকা খরচ করলে খুব সহজেই বর্ডার পাড়ি দেওয়া যায়। আর এপারে আসলে স্থানীয় চেয়ারম্যানদের সহায়তায় অল্পকিছু খরচে সহজেই নাগরিকত্ব সার্টিফিকেট নিয়ে চাকরিবাকরিতে ঢুকে পড়তে পারে, ব্যবসাবাণিজ্য করতে পারে। এছাড়াও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রায় নয়টির মত রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠন প্রশিক্ষণ নিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে RSO, ARSA, ARIF ইত্যাদি অন্যতম।

এই বিচ্ছিন্নভাবে অনুপ্রবেশ একদিকে যেমন শ্লথ, একটু কঠিন অপরদিকে ব্যয়সাপেক্ষ। তাদের এই মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করার একধাপ এগিয়ে দেয় এসব সশস্ত্র সংগঠনগুলি। এরা মাঝে মধ্যেই সীমান্ত পেরিয়ে মায়ানমারের বিভিন্ন পুলিশফাঁড়ি ও সেনাচৌকিতে হামলা চালায়। আর তখনই বর্মিসেনারা পাগলা কুত্তার মত নিরীহ রোহিঙ্গাদের উপর গুলি, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ধর্ষণ-নির্যাতন চালাতে শুরু করে। এতে অবশ্য কিছু সাধারণ রোহিঙ্গা মারা গেলেও বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঢল নামে, যা সরকারের পক্ষে আটকানো কঠিন হয়ে পড়ে। প্রথমদিকে একটুআধটু কষ্ট হলেও একবার যদি শিবিরে ঠাঁই মেলে তাহলে কথাই নাই। রাজার হালত। ফ্রি খাদ্য, ফ্রি বাসস্থান, ফ্রি চিকিৎসা, ফ্রি এডুকেশন। তখন মুফতে খাও আর বাচ্চা প্রোডাকশন দাও। ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে দুটি বড় ঢলে প্রায় পাঁচলাখ রোহিঙ্গা এসেছিল, যারা এখনো আছে। এর মাঝে আরোও ছোটখাটো ঢলে লাখখানেক এবং সর্বশেষ ঢলে জাতিসংঘের হিসাবেই তিনলাখ (বাস্তবে আরো বেশি) প্রবেশ করেছে।

রোহিঙ্গা চরিত্র
----------------------
দীর্ঘদিন লেখাপড়া ও আধুনিক শিক্ষাদীক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকার ফলে রোহিঙ্গাদের মধ্যে সভ্যতা, নৈতিকতা বা সৌজন্যবোধ কিছুইগড়ে উঠে নাই। সামান্য কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে এদের বেশিরভাগ মানুষই প্রচন্ড মিথ্যুক, গোঁয়ার, রাগী, অকৃতজ্ঞ। কখনো কখনো এরা প্রচন্ড হিংস্র হয়ে উঠে। নীতিবিবর্জিত বলে সহজেই চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, মাদকপাচার সহ নানা অপরাধের সাথে সহজেই জড়িয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে এদোর দোসর ও পৃষ্টপোশকতা করে থাকে স্থানীয় অপরাধীচক্র ও রাজনৈতিক নেতারা। যদিও জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী ক্যাম্পের বাইরে যাওয়া এদের নিষেধ কিন্তু এই সব সম্ভবের দেশে কোন শালাই বা আইন মেনে চলে যে রোহিঙ্গারাও আইন মানবে? শিক্ষা বলতে ওখানে গড়ে উঠা মাদ্রাসায় আলিফ, বা, তা, সা পর্যস্ত। নোয়াখালী, চট্রগ্রাম ও উত্তরপ্রদেশ থেকে আগত কিছু মুন্সিরা এসব মাদ্রাসা পরিচালনা করে থাকে।

শোনা যায় গণতান্ত্রিক শাসনামলে যখন সংসদে রোহিঙ্গা সংসদসদস্যও ছিল, তখন রোহিঙ্গাদের অঞ্চলে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল কিন্তু রোহিঙ্গাদের প্রবল আপত্তির মুখে তা বাস্তবায়ন হয়নি। বরং সরকারি উদ্যোগে ওদের আগ্রহে কিছু মাদ্রাসা তৈরি করা হয়েছিল। ফলে ওরা ধর্মীয় ব্যাপারে অতিশয় গোঁড়া। আর সেইজন্যই সহজেই ওরা জামাত শিবিরসহ মৌলবাদী দলগুলির টার্গেট। এদেরকে ভোটার বানিয়ে ভোট ভাগানো থেকে শুরু করে রাজনৈতিক সহিংসতা সহ নানা জঙ্গি তৎপরতায় ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি পার্বত্যচট্টগ্রামের গহীন অরণ্যে ওদের একাধিক সংগঠনকে আইএস এর পোষাক পরে, আইএস এর পতাকা নিয়ে ইসলামী খেলাফতের ও জিহাদের প্রতিজ্ঞা নেয়ার ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ফলে এই সশস্ত্র গ্রুপগুলির সাথে আন্তর্জাতিক শীর্ষ জঙ্গি সংগঠনগুলির যোগাযোগের অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া যায়না। লক্ষ্য করে থাকবেন, এই মানব ঢলে কোন যুবক বা তরুণ পুরুষ নেই। আছে কেবল বৃদ্ধ, নারী ও শিশু।

বাস্তবতার নিরিখে রোহিঙ্গা- ৩
--------------------------------------------
রোহিঙ্গা নিয়ে
--------------------
এরকম লাখো বাস্তুভিটাহীন মানব সমাজ নিয়ে দেশে বিদেশে যে নানা রকম ষড়যন্ত্র ও খেলা শুরু হবে তা বলাই বাহুল্য।
১) একটি তৎপরতার কথা (ধর্মীয় রাজনীতিতে ব্যবহার) তো ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছি।
২) দ্বিতীয় ব্যবহারটির কথা (নানারকম অসামাজিক কাজকলাপে স্থানীয় টাউট বাটপার কর্তৃক ব্যবহার) ও বলা হয়েছে।
৩) যুদ্ধে সংঘাতে সবচেয়ে করুণরুপে ব্যবহৃত হয় নারী ও শিশু। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটছেনা। এখানে রোহিঙ্গা নারী ও শিশু সস্তায় যৌনপণ্য হিসাবে সহজলভ্য হবে, এটাই স্বাভাবিক।
৪) তার পরবর্তী লাভ আমলা ও সরকারি কর্মকর্তাদের। কোটি কোটি ডলার আসবে ত্রাণ আসবে যার একটিভাগ যাবে ওদের পেটে নানা কায়দায়।
৫) আর এদের দেখিয়ে এখন ভিক্ষায় নামবে এনজিও নামধারী মানবতাবাদীরা। তারাও টুপাইস কামিয়ে ওদের পকেট ভারী করবে।
৬) শরনার্থী শিবিরকে ঘিরে একদল ঠিকাদার ফুলেফেঁপে উঠবে।
ফলে দেশে এদের আগমনকে অনেকেই যার যার স্বার্থে স্বাগতম জানাবে এটি বোধহয় আর ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই।

এবার আসুন একটু আন্তর্জাতিক খেলার দিকে নজর দিই। ব্যক্তিগতভাবে কেউ কেউ ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য কিছু একটা করে নোবেলের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।  তুরষ্কের ন্যায় কট্টর মৌলবাদী দেশ যারা দেশে দেশে ইসলামী বিপ্লব রফতানি করে বেড়ায় এরা রোহিঙ্গা জঙ্গিদেরকে দিয়ে এখানে জিহাদের কল্পনায় ভাসছে। রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান যিনি নতুন করে তুর্কি অটোমান সাম্রাজ্য গড়ে তুর্কি সালতানাতের স্বপ্নে বিভোর তার তৎপরতা সেজন্যে একটু বেশি স্পষ্ট। মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিতারিত হয়ে ইসলামী জঙ্গি সংগঠনগুলির এখনকার নজর বাংলাদেশ, তার ভৌগলিক অবস্থানগত কারণ। এখানে ওরা ঘাটি গাড়তে পারলে দক্ষিন এশিয়া ও দক্ষিনপূর্ব এশিয়ায় এরা হবে এক চমৎকার বিষফোঁড়া। ফলে সহজ হয়ে উঠবে দর কষাকষির খেলাটা। আর দেশের অভ্যন্তরে যে জঙ্গি তৎপরতা রয়েছেই সেটি আরও বেগবান হবে। এরই মধ্যে সুইসাইডাল ভেস্ট পরা দুই রোহিঙ্গা র্যব এর হাতে ধরাও পড়েছে।

রোহিঙ্গা সংগ্রাম
-------------------------
মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশ করা এসব লোকদের সহায়তার জন্য বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের নানা সংগঠন রয়েছে। রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও), রোহিঙ্গা লিবারেশন পার্টি (আরএলএফ), রোহিঙ্গা পেট্রিয়টিক ফ্রন্ট (আরপিএফ), আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (আরনো), ন্যাশনাল ইউনাইটেড পার্টি অফ আরাকান (নুপা), আরাকান রোহিঙ্গা ইসলামিক ফ্রন্ট (আরিফ), রোহিঙ্গা ন্যাশনাল আর্মি (আরএনএ) নামের অনেক সংগঠন রয়েছে। অনেক সংগঠন আর্থিকভাবে রোহিঙ্গাদের সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে। এরমধ্যে আরএসও সশস্ত্র প্রশিক্ষণ, অর্থ সহায়তা ও মানবাধিকারের নামে রোহিঙ্গাদের নিয়ে সশস্ত্র সংগঠন গঠনের অভিযোগ রয়েছে। দেশি-বিদেশি বেসরকারি সংগঠনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের আর্থিকভাবে সহায়তা দিয়ে আসছে ‘আরএসও’। টেকনাফ ও উখিয়ায় রোহিঙ্গা বস্তিতে আরএসও সক্রিয় ছিল। বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্পে আরএসও’র কার্যক্রম ছিল। ধর্মীয় অনুভূতি ও মানবিক সহায়তার নামে সক্রিয় ছিল। রোহিঙ্গা বস্তিতে এখনো বিক্ষিপ্তভাবে আরএসও’র সদস্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে আরএসও’র কার্যক্রম বেশি পরিলক্ষিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের কঠোরতার কারণে কার্যক্রম স্তিমিত ছিল। আরএসও’র সদস্যরা মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশে পালিয়ে যায়। কিন্তু গোপনে তাদের কার্যক্রম ছিল। বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমারে জঙ্গি হামলা চালানোর খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে পেয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে অনুপ্রবেশকারীদের সহায়তার নামে আবারো সক্রিয় হয়ে উঠছে আরএসও।

বাস্তবতার নিরিখে রোহিঙ্গা- ৪
--------------------------------------------
আরএসও কি চায়?
-----------------------------
আরাকানে রোহিঙ্গা জনসংখ্যার পরিমান ৮ লক্ষের মত। ১৪,২০০ বর্গমাইলব্যাপী রাখাইন রাজ্যে মোট জনসংখ্যা ৩১,১৯,০০০ এর মত। এখানে রোহিঙ্গা ছাড়াও রয়েছে রাখাইন, বাঙালি হিন্দু, কামান সম্প্রদায়ের লোকজন, যারা সংখ্যায় তিন চতুর্থাংশ। এরা কেউই রাখাইন অর্থাৎ আরাকানের স্বাধীনতা চায়না। তাহলে কিভাবে আরাকানের স্বাধীনতা সম্ভব? তবুও আরএসও সহ কিছু রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠনগুলি অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে। এটা কতটা বাস্তবানুগ বলে মনে হয় পাঠক, আপনাদের? ইদানীং কোন কোন পন্ডিত এদের সংগ্রামকে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে তুলনা করেন যা হাস্যকর। মায়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে মুখোমুখি যুদ্ধ তো দূরের কথা গেরিলা যুদ্ধ করতে হলেও দেশের শতভাগ মানুষের সমর্থন দরকার যা আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে ছিল। বরং এই আক্রমনের কোন আন্তর্জাতিক সমর্থন নেই, নেই সুনির্দিষ্ট রুপরেখা বা দিকনির্দেশণা। ফলে এটি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসাবেই বিবেচিত হবে।

রোহিঙ্গা সমস্যা কি ধর্মীয়?
-------------------------------------
একটি বিষয় লক্ষ্য করার মত, আমাদের সাম্প্রদায়িক শক্তিসমূহ নানাভাবে রোহিঙ্গাদের উপর বার্মা সামরিক জান্তাদের এই নির্যাতনকে বৌদ্ধ কর্তৃক মুসলিম নির্যাতন বলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টায় রত। কিন্তু আসলেই কি তা? মায়ানমারে মোট ২৪ থেকে ২৫ লক্ষ মুসলমান রয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে আগত মুসলিমরা, কারেন সম্প্রদায়ের মুসলিম, মধ্যপ্রাচ্য ও তুরষ্ক থেকে আগত মুসলিম এবং বার্মিজ জনগোষ্ঠী থেকে ধর্মান্তরিত মুসলমান। অন্য কোন মুসলমানদের সাথে সংঘর্ষ না হয়ে যখন কেবলমাত্র রোহিঙ্গা মুসলমানদের সাথে হচ্ছে তখন বুঝতে হবে সমস্যাটা অন্য জায়গায়।

চলমান রোহিঙ্গা সঙ্কটের পিছনে রোহিঙ্গাদের দুইটি রাজনৈতিক ভুল, একটি রাজনৈতিক অপরিণামদর্শিতা ও একটি পাপ রয়েছে- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বৃটিশদের সমর্থনে জাপানি তথা বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগদান, আন্তর্জাতিক ধর্মীয় রাজনীতির শিকারে পরিণত হয়ে মোজাহিদ বাহিনী নামক ধর্মভিত্তিক বিচ্ছিন্নতাবাদী গঠণ করে স্বাধীনতাকামী আন্দোলন পরিচালনা (এই মুজাহিদ বাহিনী ৭১এ তদানীন্তন পাকিস্তানী আর্মিদের সহযোগীতা করেছিল বলে অভিযোগ আছে), মিয়ানমারের গণতন্ত্রের আন্দোলনে সুচির এনএলডিকে সমর্থন দান এবং বৌদ্ধ রমনীকে বলাৎকার ও হত্যা। ইতিহাসের ঘটনা পরম্পরায় বিচার্য যে, রোহিঙ্গাদের কোন আন্দোলন কখনোই ধর্মীয় আন্দোলন ছিল না, ধর্ম রক্ষার্থে কখনো তারা কোন সংগ্রাম করেনি। বরং প্রতিটি কর্মকাণ্ডে তারা বিচ্ছিন্নতাকামীর পাশাপাশি ধর্মীয় উগ্রপন্থি হিসেবে নিজেদের আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েছে। ফলে, কালে কালে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে তারা ‘বামার’ বা বার্মিজদের থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। বার্মিজদের জাতিসত্ত্বাবোধ এতটাই প্রবল যে, ‘বার্মা’ থেকে ‘মিয়ানমার’ নাম পরিবর্তনের  সিলভার জুবিলি পার হয়ে গেলেও বার্মিজদের দেশ হিসেবে বার্মা নামটি এখন পর্যন্ত বহাল রয়েছে। বার্মিজ-রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীগত সংঘাত তো এমনিতেই ভয়াবহ ছিল। তদুপরি, যে সকল চাঁদ-তারার ঝাণ্ডাবাহী ও বিভিন্ন দেশে তাদের ‘উপ-ভ্রাতা’গণ এ সংঘাতকে বৌদ্ধ-মুসলিম সংঘর্ষের লেবাসে জনারণ্যে প্রচারাভিযান চালিয়েছেন তাদের মনোবাঞ্ছা আর যা-ই হোক না কেন, তারা কোনদিনও রোহিঙ্গাদের শুভাকাঙ্খী ছিলেন না। তারা বরাবরই বিরোধকে দ্বন্দ্বে, দ্বন্দ্বকে সংঘাতে আর সংঘাতকে সংঘর্ষে রূপান্তরিত করেছে- সরল, ধর্মপ্রাণ মানুষকে ধোঁকা দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটেছে।

 অতি সাম্প্রতিককালে মিয়ানমারে বার্মিজ–রোহিঙ্গা কোন জাতিগোষ্ঠীগত সংঘর্ষ হচ্ছে না। তারপরেও ঐ সকল ‘উপ–ভ্রাতা’গণ ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শ্রীলংকার তামিল হত্যাকাণ্ড, সিরিয়া, ইয়েমেন, আফ্রিকা বা অন্যান্য অঞ্চলের বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড, দুর্ঘটনা, শ্মশানের লাশ পোড়ানো ইত্যাদি ছবি ও তিব্বতীয় বৌদ্ধ ধর্মগুরুদের বিভিন্ন ভিডিও কম্পিউটারে পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করে প্রচার করছে। এ ধরণের চক্রান্ত উদ্দেশ্যহীন হতে পারে না– আমাদেরকে অবশ্যই কক্সবাজারের রামু, উখিয়া ও চট্টগ্রামের পটিয়ায় সাম্প্রদায়িক হামলার কথা মনে রাখতে হবে।

৩টি মন্তব্য:

সুশান্ত কর বলেছেন...

লেখাটি এক পক্ষীয়, লীগ পন্থী মনে হচ্ছে! নিছক কিছু ঐতিহাসিক অবস্থান ভুল আর ধর্মীয় গোঁড়ামীর জন্য এসব হচ্ছে বলা ভুল! সেরকম হলে বহু আফ্রিকী দেশে এমন অশিক্ষা গোঁড়ামী মিলবে! লেখক বাংলাদেশের লীগ সরকারের অবস্থানের সমর্খক মনে হচ্ছে! যদিও জামাতি বা বহু মৌলবাদিদের খেলাটাও সত্য!এখন কোনো জাতিগত সংঘাত নেই, সেটাই বা কে বলল?

নামহীন বলেছেন...

সুশান্ত কর, আপনার কাছে এটা লীগপন্থি মনে হওয়া স্বাভাবিক, যেমনটা স্বাভাবিক প্রগতির কথা বললেই সে হয় বামপন্থি, না হয় নাস্তিক! উপরোক্ত লেখনিতে লেখক ঐতিহাসিক কিছু সত্যের অভিজ্ঞ পর্যালোচনা দিয়েছেন, আপনিও একটু যাচাই করুন না, আপনার অবগতির জন্য জানাই লেখাটির শেষ অংশ আসলে আশা করবো আপনার বিভ্রান্তি কাটবে...!

Admin বলেছেন...

সুশান্ত কর মহাশয়, আপনি আমাদের এই নিয়ে তথ্যসমৃদ্ধ লেখা দিলে ভালো লাগবে। আমাদের ব্লগ সমৃদ্ধ হবে।

ভারতবর্ষ ইংরেজ কর্তৃক দখলীকৃত না হলে... || রাণা

অদ্ভুতুড়ে ভাবনা। যদি ইংরেজরা ১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধে বা ১৭৬৪ সালের বক্সার যুদ্ধে হেরে বসত তাহলে ২০১৭ তে এসে পৃথিবীটাকে কেমন দেখতাম। ভৌ...