বুধবার, ১৬ আগস্ট, ২০১৭

প্রসঙ্গ আইনস্টাইন এবং... || বিপ্লব সৎপতি


পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের মধ্যে আইনস্টাইনের সমান প্রচার বোধহয় কোনো বিজ্ঞানী পাননি। ওনাকে নিয়ে এত বেশি মিথ রচিত রচিত হয়েছে যে উনি বিরক্ত হয়ে  বলেছেন ''ওরা এত  বাড়াবাড়ি  করছে  কেন ?'' আইনস্টাইনের  ঈশ্বর বিশ্বাস একটি বহুল আলোচিত বিষয়। ধর্মীয় বিশ্বাসের পক্ষের ধর্মীয় বিশ্বাসের  বিপক্ষের  সকলেই তাঁকে নিজেদের একজন ভাবতে ভালবাসে।  আইনস্টাইনের  জগদ্বিখ্যাত  উক্তি  ''Science without religion is  lame , religion  without science  is  blind.''  অর্থাৎ   ধর্মবিহীন  বিজ্ঞান  খোঁড়াবিজ্ঞানবিহীন ধর্ম অন্ধ, এই  উক্তিটি  ধর্মীয়  এপলোজেটিকদের একটি অত্যন্ত প্রিয় উক্তি। তিনি আদতেই কোনো ঈশ্বর বিশ্বাস করতেন কিনা এটা কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হওয়ার কথা ছিলো না। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিজ্ঞানের ক্রমউন্নতির সাথে-সাথে সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কিত  ধর্মীয়  তত্ত্বগুলির   ক্রমশ   দূরত্ব  বাড়তে থাকায় এপলোজেটিকদের কাছে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।  বিজ্ঞানীরা   ঈশ্বরে  বিশ্বাস  করেন  এটা  দেখাতে পারলেই তারা যেন পায়ের নিচে মাটি খুঁজে পায়।বিশেষ করে আইনস্টাইনের মতো বিজ্ঞানী হলে তো কথাই নেই !

                 আমার লেখার উদ্দেশ্য আইনস্টাইন যে নাস্তিক ছিলেন সেটা প্রমাণ করা  নয়  বরং  তাঁর নিয়ে ধর্ম সংক্রান্ত যে মিথগুলি  রচিত  হয়েছিলো  তা  যাচাই করা। উপরের ধর্মীয় সম্পর্কে  উক্তিটি  বিচ্ছিন্ন  ভাবে ভাবলে আইনস্টাইনের চিন্তা-ভাবনার প্রতি অবিচার করা হয়। আইনস্টাইন বারবার বলেছেন তিনি ঈশ্বরের মন বুঝতে চান অর্থাৎ তিনি ঈশ্বর নামক রূপকটি দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন  মহাবিশ্বের  সুশৃঙ্খলতার রহস্য জানতে চান। এই সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটাতে ২০১২ সালে নিলামে ওঠা আইনস্টাইনের নিজের হাতে লেখা শেষ চিঠিটার কথা বলব।  চিঠিটি  -বে  ডট  কম  নামক  ওয়েবসাইটে নিলাম করা হয়। এই ব্যক্তিগত চিঠিটি সর্বমহলে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে  বিবেচিত  হয়েছে। কারণ  এই  চিঠিতে আধুনিক বিজ্ঞানের  এই মহারথী  ঈশ্বর এবং ধর্ম সম্পর্কে তাঁর মতামত ব্যক্ত করেছেন।  ইহুদি  ধর্মাবলম্বী   দার্শনিক   গুটকিন্ড  তাঁকে নিজের  লেখা  একটি  বই পাঠিয়েছিলেন পড়ার জন্য। বইটির নাম  ছিলো  'চুজ  লাইফ, দ্য  বাইবেল  কল টু রিভোল্ট'। এই বইটি  পড়ার  পর  আইনস্টাইন  ১৯৫৪  সালের  ৩ জানুয়ারি জার্মান  ভাষায় এরিখ গুটকিন্ডের উদ্দেশ্যে লেখা চিঠিতে ঈশ্বর   ধর্ম  সম্পর্কে  তাঁর   মতামত  ব্যক্ত করেছেন।  এই  চিঠি সম্পর্কে  যারা  আগেই  অবগত  আছেন  তাদের  কাছে চিঠিটি 'ঈশ্বর চিঠি' নামে পরিচিত।

           মূল চিঠিতে যাওয়ার আগে আর একটি কথা বলতেই হয়প্রখ্যাত বিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স  তাঁর  নিজস্ব  ওয়েবসাইটে চিঠি  সম্পর্কে  তাঁর  মতামত ব্যক্ত করেছেন। পাঠকদের  জন্য ডকিন্সের সেই মতামতটি তুলে দিলাম---

''এ্যালবার্ট  আইনস্টাইনকে  নিজেদের  একজন  ভাবার কারণে ধর্মীয়  এপোলজিস্টিদের পুরোপুরি দোষ দেওয়া যাবে না। উনি কিছুটা  দায়িত্বহীনভাবেই  'ঈশ্বর'-কে  কাব্যিক  রূপক  হিসাবে উদ্ধৃত  করতে  পছন্দ   করতেন।  তবে  আইনস্টাইনের  প্রতি পক্ষপাতহীন হয়ে বলতেই হয় যে আজকের  দিনের এই অসৎ উদ্দেশ্যে উদ্ধৃতি ব্যবহার করা সম্পর্কে অনুমান করা তাঁর পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব ছিলো না। তাই তাঁর মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে লেখা এই চিঠিটা দেখে ভালো লাগছে যা চিরদিনের জন্য আইনস্টাইন  ঈশ্বরে বিশ্বাস  করতেন  এই  কল্পকথাকে নিস্তার দেবে। অন্যান্য  আরো  সূত্রের  সাথে  এই  চিঠিও  শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত করে যে পৃথিবীর যে কোনো বাস্তববোধের পরিপেক্ষিতে আইনস্টাইন  ছিলেন  একজন  নাস্তিক।''--- রিচার্ড ডকিন্স ডট কম নেট।

ঈশ্বর চিঠির কিছু অনুচ্ছেদ :--
           ...আপনার  বইয়ের বেশিরভাগ অংশই আমি পড়েছি এবং আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি বইটি আমাকে পাঠানোর জন্য। এই ব্যাপারে আমি যে জিনিসটি  অনুধাবন করছি যে, 'ঈশ্বর' শব্দটি মানুষের দুর্বলতা থেকে সৃষ্টি এবং ভাব  প্রকাশের  জন্য ব্যবহৃত একটি  শব্দ  ছাড়া   আর  কিছুই  না।  বাইবেল  হলো  কিছু গৌরবাম্বিত পৌরাণিক কাহিনীর সমাহার যা অত্যন্ত শিশুতোষযে কোনো নিগূঢ় অর্থই করা হোক না  কেন  আমার ভাবনায় কোনো  পরিবর্তন  আসবে  না।  এই  নিগূঢ়  অর্থগুলি  স্বভাব অনুযায়ীই নানা ধরণের হয়ে থাকে এবং প্রকৃত পাঠ্যাংশের সাথে কোনো সামঞ্জস্য থাকে না। অন্যান্য সর্বধর্মের মতো ইহুদি ধর্মও প্রধানত  শিশুতোষ  কু-সংস্কারের  অনুরুপ।আমার  অভিজ্ঞতা থেকে এইটুকু বলতে পারি  অন্যান্য  জনগোষ্টির তুলনায় ইহুদি জাতির আলাদা কোনো বিশেষ  গুণাবলি  আছে বলে মনে করি না। অন্যান্য জনগোষ্টির তুলনায়  তারা খুব বেশি উন্নতও না। এছাড়া আমি তাদের মধ্যে এমন কিছু  দেখিও-না  যাতে তাদের নির্বাচিত ( ঈশ্বর কতৃক ) বলে মনে হবে। সাধারণ অর্থে আমার  জন্য  এটা  ভাবা  কষ্টদায়ক যে , আপনি নিজেকে বিশেষ অধিকারপ্রাপ্ত দাবি করেন এবং  আত্মঅহমিকার দুটো দেওয়াল দ্বারা সেটাকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। বাইরের দেওয়ালটি একজন মানুষ হিসেবে এবং  ভেতরের  দেওয়ালটি একজন ইহুদি হিসেবে। মানুষ হিসেবে  আপনি  সাধারণ  ভাবে স্বীকৃত কার্যকারণের প্রয়োগ থেকে অব্যাহতি দাবি করেন এবং ইহুদি  হিসেবে  একেশ্বরবাদের   বিশেষ   সুবিধা  দাবি  করেন। সম্ভবত  আমাদের  বিষ্ময়কর  স্পিনোজা  সর্বপ্রথম  সব-ধরনের ব্যবচ্ছেদের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে  সীমিত  কার্যকরণ আসলে কোনো  কার্যকরণই  না।  এবং  প্রকৃতি  সম্পর্কিত  ধর্মগুলির এনিমিস্টিক   বিশ্লেষন  নীতিগত   ভাবেই  একচেটিয়াকরণের কারণে বাতিল হয়ে যায় না। এই ধরনের দেওয়ালের  মাধ্যমে আমরা নির্দিষ্ট কিছু আত্মপ্রবঞ্চনাই  লাভ  করি  অন্যথায়  এতে করে আমাদের নৈতিক প্রচেষ্টার আরও উন্নয়ন সাধিত হয় না।
সর্বোচ্চ শুভ-কামনা এবং বন্ধুত্বপূর্ণ ধন্যবাদ। বিনীত আইনস্টাইন।

                            এর পরও বলি যুক্তিবাদীদের ক্ষেত্রে কে বললেনএর চেয়ে কী  বললেন  সেটা বেশি গুরুত্ব পায়।তাই যদি আইনস্টাইন ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন তার থেকে এটা প্রমাণ হয় না যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে । বড়ো জোর এটা  প্রমাণ হয় আইনস্টাইন  ঈশ্বরে  বিশ্বাসী  ছিলেন। আইনস্টাইনের একটি বিখ্যাত উক্তি দিয়ে লেখাটি শেষ করবো--- ''আমার সূত্র ভুল প্রমাণের জন্য একশোজন তাবড়-তাবড় বিজ্ঞানীর স্বাক্ষর নয় , একটি যুক্তি-প্রমাণই যথেষ্ট ।''

তথ্যসূত্র:-- রিচার্ড ডকিন্স ডট কম-বে ডট কমমুক্তমনা ব্লগ-অভিজিৎ রায় ।

কোন মন্তব্য নেই:

ভারতবর্ষ ইংরেজ কর্তৃক দখলীকৃত না হলে... || রাণা

অদ্ভুতুড়ে ভাবনা। যদি ইংরেজরা ১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধে বা ১৭৬৪ সালের বক্সার যুদ্ধে হেরে বসত তাহলে ২০১৭ তে এসে পৃথিবীটাকে কেমন দেখতাম। ভৌ...