বুধবার, ৭ জুন, ২০১৭

নকশালবাড়ির পঞ্চাশ বছরঃ এক নির্মোহ বিশ্লেষণ || অরিন্দম ভট্টাচার্য

সেদিন বাতাসে ছিলো বারুদের গন্ধ, দেওয়ালে 'লাল সেলাম'।

তারপর???


তারপর, অন্যের অভিজ্ঞতা অবলম্বন করে, একটা অনুসন্ধানের চেষ্টা।

নকশালদের মূল লাইনে গোলমাল ছিলো না। জনগণতন্ত্র/সমাজতন্ত্র আনার জন্য তাঁরা বেছেছিলেন বিপ্লবী পথ...করেছিলেন সংশোধনবাদের বিরোধিতা, সম্বল করেছিলেন মার্ক্স-লেনিন-মাও এর চিন্তাধারা। হয়ত সেই জন্যই নকশালবাড়ি দীর্ঘ দিন ধরে বঞ্চিত, প্রতারিত হয়ে আসা এদেশের মানুষের একটা বড় অংশের মধ্যে উদ্দীপনার সঞ্চার করেছিলো। হয়ত সেই জন্যই মাও বলেছিলেন, "সি পি আই (এম এল) এর জন্যই ভারতে এখনো আশা আছে।

কিন্তু আন্দোলনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে কতগুলো নীতি অনুসরণ করা হয়েছিলো, যেগুলো ছিলো ভুল।ফলে পার্টি জনবিচ্ছিন্ন ও টুকরো-টুকরো হয়ে গেলো। ১৯৬৭ মার্চের শেষে যখন নকশালবাড়িতে কৃষকরা বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, সেই সময় থেকে ১৯৭২ এর জুলাই মাসে চারু মজুমদার যখন গ্রেপ্তার হন-সময়টা ৫ বছরের সামান্য বেশি। এই সংক্ষিপ্ত ৫ বছর, দেখা গেছে, মূল লাইন এক থাকা সত্বেও নকশালরা এক নীতি অনুসরণ করে চলেন নি। নীতির এই পরিবর্তনগুলোকে ধরতে গেলে, এই সময়কালটাকে ৪ টি পর্বে আমরা ভাগ করতে পারি।

১৯৬৫-৬৭: প্ৰস্তুতি পর্ব

এটাই সেই সময় যখন চারু মজুমদার তাঁর ৮ টা দলিল লিখেছিলেন, তৈরি করেছিলেন নকশালবাড়ি বিদ্রোহের রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত ভিত।নকশালদের মূল লাইন ও বিভিন্ন পর্বে অনুশীলন করা বেশ কয়েকটি ভুল নীতির জন্য দায়ী ঐ ৮ টি দলিল।মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ ও আধুনিক সংশোধনবাদের মধ্যে সেসময় যে বিতর্ক চলছিলো, তাতে চারু মজুমদার ছিলেন মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের পক্ষে এবং সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে লড়াই এর ডাক দেন।

চীন বিপ্লবের বিজয়কে তিনি অভিনন্দিত করেন এবং মাও কে লেনিন পরবর্তী কালের সর্বশ্রেষ্ঠ মার্ক্সবাদী বলে বর্ণনা করেন। তিনি মনে করতেন সোভিয়েত সরকার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একযোগে বিশ্বে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছে এবং ভারত সহ বিশ্বের জাতিগুলোর শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই অবস্থায় সংশোধনবাদ এবং সি পি আই (এম)-এর সংশোধনবাদী নেতৃত্বের বিরূদ্ধে লড়াই করে একটা বিপ্লবী পার্টি তৈরী করা দরকার। তাঁর মতে কৃষি বিপ্লবের রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য রাজনৈতিক কর্মীদের নিয়ে ছোট ছোট গ্ৰুপ গড়ে তোলা প্রয়োজন।

তিনি আরো মনে করলেন যে ভারতীয় বিপ্লবের স্তর নয়া- গনতান্ত্রিক এবং এর মূল অন্তরবস্তু হবে কৃষি বিপ্লব। গরিব ও ভূমিহীন কৃষকরা হবে এর মূল চলিকাশক্তি। তাঁর কথা অনুযায়ী বর্তমান ব্যবস্থাকে উৎপাটিত করতে হবে। আর, এই ক্ষমতা দখল হবে কোনো শান্তিপূর্ণ পথে নয়। পথ হবে-বিপ্লবী হিংসার। অর্থাৎ সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।

ভারতের বিপ্লব কে নিতে হবে চীন বিপ্লবের পথ।গ্রাম ভিত্তিক এলাকা দখল...গ্রামাঞ্চলে ঘাঁটি এলাকার প্রতিষ্ঠা... গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরা... এবং তারপর দেশজোড়া বিজয়ের মধ্যে দিয়ে সংগ্রামের সমাপ্তি। এই পর্বে, আংশিক দাবী পুরণের জন্য গণ-আন্দোলন এবং গণ-সংগঠনের গুরুত্ব চারু মজুমদার স্বীকার করতেন।

১৯৬৫ র প্রথম দিকে লেখা ৮ টা দলিলের মধ্যে দ্বিতীয় দলিলটিতে এবং ১৯৬৬ বা ৬৭ তে লেখা সপ্তম দলিলে চারুবাবু গণ-সংগ্রাম ও গণ-আন্দোলনের গুরুত্বের কথা বলেছেন। বলেছেন অষ্টম দলিলেও।

চারুবাবু মনে করতেন যে, প্রয়োজনে আইনি সংগ্রাম কে ব্যবহার করতে হবে। ১৯৬৭ র সাধারণ নির্বাচনকে বিপ্লবী রাজনীতির ব্যাপক প্রচারের জন্য সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করার ডাক দেন। সঠিকভাবেই উনি বলেন যে, পার্টির সংগ্রাম হবে দীর্ঘস্থায়ী। তিনি মনে করতেন যে নাগা, মিজো ও কাশ্মীরিদের মত জাতিগুলো, যাঁরা আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের জন্য লড়াই করছে, তাঁদের সাথে যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলা উচিত।

হয়ত এগুলো ওনার একার চিন্তা ছিলো না। কিন্তু উনি খোলাখুলিভাবেই এই কথাগুলো কৃষকদের কাছে নিয়ে যান। এটা নিশ্চিতভাবেই ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনে বহুকাল ধরে চলে আসা আপসকামী, সুবিধাবাদের জোয়ার ভেঙে এক নতুন পথের নির্দেশ।

কিন্তু এইসব লেখাপত্রের মধ্যে কিছু অবাস্তব ঝোঁক ও ছিলো। চারুবাবু গণ-লাইন বর্জন করেননি ঠিকই, মূল জোর দিয়েছিলেন 'গ্ৰুপ' ও 'কমব্যাট ইউনিট' তৈরির ওপর। পুলিশ, মিলিটারি, আমলা ও 'শ্রেণী-শত্রু' খতমের ওপর। ওনার কথা অনুযায়ী, এটা মাও এর শিক্ষা। যদিও  সত্যি টা ছিলো ঠিক তার উল্টো। চারু মজুমদার আরো বলেছিলেন...গ্রামে ও শহরে, সর্বত্র খতম করবার জন্য লক্ষ্য স্থির করতে হবে...কৃষকদের জঙ্গি আক্রমণের পদ্ধতি শেখাতে হবে...শ্ৰেণীশত্রুদের ঘরে আগুন লাগাতে হবে। শত্রুদের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেবার ওপর তিনি খুবই গুরুত্ব দিতেন। তাঁর ধারণা ছিলো যদি কোনো এলাকা শ্ৰেণীশত্রু মুক্ত হয়, তাহলেই তা মুক্তাঞ্চল হবে। যদিও সেই মুক্তাঞ্চলের মানুষগুলো কিভাবে বাঁচবে, এই নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিলো না।

১৯৬৬ তে, যখন সি পি আই (এম এল) তৈরি হয়নি, তিনি পার্টিজান সংগ্রামের ডাক দেন। কিন্তু, ইতিহাস সাক্ষী, জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্ৰহণ ছাড়া, কিছু রাজনৈতিক গ্রূপ বা ইউনিটের পক্ষে পার্টিজান যুদ্ধ বা ঘাঁটি এলাকা গড়া অসম্ভব।

এখানে লুকিয়ে ছিলো আর একটা বিপদ। গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা। চারুবাবুর মতে মার্ক্সীয় সত্য এই যে উচ্চস্তরের নেতৃত্ব থেকে আসা নির্দেশ পালন করতেই হবে। এবং উচ্চতর নেতা তিনিই যিনি সংগ্রাম ও তাত্বিক বিতর্কে নিজেকে মার্ক্সবাদী হিসেবে প্রমাণ করেছেন।

এই ভাবনার মধ্যেই ওনার 'বিপ্লবী কর্তৃত্ব' হয়ে ওঠার বীজ ছিলো, যা পরে ভয়ংকর রকম ভাবে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। তথাকথিত গুরুর ওপর এই প্রশ্নাতীত আনুগত্য আসলে সামন্ততান্ত্রিক ধারা বেয়ে আসা মতাদর্শ।

এ ছাড়াও ৮ টি দলিলে বেশ কিছু ভুল ছিলো। যেমন, ১৯৪৬ এর তেভাগা আন্দোলন শ্রেণী সংগ্রামের সর্বোচ্চ স্তর ছিলো না - যদিও চারু মজুমদার সেরকমই ভেবেছিলেন। তেভাগা ছিলো এক জঙ্গি কৃষক সংগ্রাম, একটি অর্থনৈতিক দাবি আদায়ের জন্য। সেই সময়কার রাজনৈতিক ব্যবস্থার উচ্ছেদের জন্য সেই আন্দোলন হয়নি।

চারু মজুমদারের মতে, ১৯৫৯-এ খাদ্য আন্দোলনের সময় কলকাতায় একটি শান্তিপূর্ণ মিছিলে শাসক শ্রেণী যখন গুলি চালিয়ে ৮৯ জন কে হত্যা করে, তখনই ভারতের সমাজতন্ত্রে পৌঁছনোর শান্তিপূর্ণ পথের সমাপ্তি ঘটে। ওনার এরকম মনে হবার কারণ অস্পষ্ট।

১৯৬২ সালে 'ভারতের এলাকা' থেকে চিনা সেনাবাহিনীর একপাক্ষিক সেনা অপসারণের কথা বলেছেন চারু মজুমদার। ঘটনা হলো, ঐ এলাকাটাকে তখন বলা হতো 'নর্থ ইস্ট ফ্রন্টিয়ার এজেন্সি' বা 'নেফা'। চীন যুদ্ধে চিনা সৈন্যবাহিনী ভারতীয় সেনাদের পর্যদুস্ত করার পর যে এলাকা থেকে সেনা সরিয়ে নিয়েছিলো সেটা ছিলো বিতর্কিত এলাকা, ভারতীয় এলাকা নয়।

৮ টি দলিলে এরকম আরো কয়েকটি ছোটখাটো ভুল ছিলো। সম্ভবত অতীতের কমিউনিস্ট পার্টির সুবিধাবাদী আন্দোলনের ছোঁয়াচ চারু মজুমদারকে তাঁর অজ্ঞাতেই প্রভাবিত করেছিলো।

দ্বিতীয় পর্ব

এই পর্বের সময়কাল, ১৯৬৭ মার্চ, অর্থাৎ নকশালবাড়ি অভ্যুত্থানের সাংগঠনিক প্ৰস্তুতি যখন শুরু হয়, তখন থেকে ১৯৬৯ সালের গোড়া পর্যন্ত।


নকশালবাড়ির গণ-লাইনো ছিলো না 'কমব্যাট ইউনিট' দিয়ে খতমের প্রশ্ন। তীর ধনুক নিয়ে হাজার হাজার আদিবাসী কৃষক জমিদার/জোতদারদের জমি ও অন্যান্য সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে তা কৃষকদের মধ্যে বন্টন করে দেবার জন্য সংগ্রাম শুরু করে। তারা কৃষক কমিটি তৈরি করে, গ্রামের সব ব্যাপারে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। জমি ও ক্ষমতার জন্য এই গণসংগ্রাম প্রতিটি কৃষককে যোদ্ধা বানিয়ে দেয়। তরাই রিপোর্টে কানু সান্যাল লিখেছেন, "তরাইয়ের বীর কৃষকদের সংগ্রামের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো চা-বাগানের শ্রমিকদের ও অন্যান্য খেটে খাওয়া মানুষের সমর্থন অর্জন, সামন্ততন্ত্র বিরোধী সংগ্রামে এভাবে যুক্তফ্রন্ট গড়ে সংগ্রামকে আরো জোরদার করে তোলা।"

এই পর্যায়ে 'কমব্যাট ইউনিট' এর কথা শোনা যায় না। ব্যক্তি-শত্রু খতমের কথাও এখানে নেই। বরং এই সময় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিলো গণ-সংগঠন, গণ-আন্দোলন এবং শ্রেণী সংগ্রাম গড়ে তোলার ওপর।

কলকাতায় একটি প্রতিনিধি সভায় সাতটি রাজ্যে সি পি আই (এম)-এর মধ্যে থাকা বিপ্লবীদের নিয়ে 'সারা ভারত কো-অর্ডিনেশন কমিটি' গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

প্ৰথম ঘোষণায় বলা হয়, এই কমিটি কৃষক, শ্রমিক ও অন্যান্য মেহনতি জনগণের 'জঙ্গি ও বিপ্লবী সংগ্রামের বিকাশ ঘটানোর এবং সমন্বিত করার' চেষ্টা করবে। তাদের আর একটা কাজ হবে "সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে মতাদর্শগত সংগ্রাম চালানো, মাও সে তুং এর চিন্তাধারাকে জনপ্রিয় করে তোলা এবং তার ভিত্তিতে সি পি আই (এম) পার্টির ভেতরের ও বাইরের সব বিপ্লবীদের ঐক্যবদ্ধ করা"।

১৯৬৮ মে মাসের সভায় কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সর্বভারতীয় কো-অর্ডিনেশন কমিটি দ্বিধাহীন ভাষায় ঘোষণা করে: ভারতের জনগণের শত্রুদের করতে হলে ষড়যন্ত্রমূলক পদ্ধতি নয়, গণ-লাইন অনুসরণ করেই চলতে হবে।এই কো-অর্ডিনেশন কমিটি তে নেতৃত্বকারী ভূমিকায় ছিলেন চারু মজুমদার। এই পর্বে তিনি জোর দিয়েছিলেন গণ-লাইনের ওপর-গণ-সংগঠন ও গণ-আন্দোলনের ওপর। 'যে সব কমরেড গ্রামে কাজ করছেন তাদের প্রতি' শীর্ষক লেখায় তিনি তাদের বলেছেন শ্রেণী বিশ্লেষণ করতে ও তারপর 'পরিষ্কারভাবে গণ-লাইন' অনুসরণ করতে। কমরেডদের প্রতি লেখায় তিনি বলেছেন যে 'শ্রেণী সংগ্রাম হলো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংগ্রামের সমাহার'। ফসল দখলের মতন অর্থনৈতিক দাবি পূরণের জন্য গণ- আন্দোলনের গুরুত্বের কথা তিনি বলেছেন।

'শ্রেনী বিশ্লেষণ, অনুসন্ধান ও অনুশীলনের সাহায্যে কৃষকের শ্ৰেণী সংগ্রাম গড়ে তুলুন' লেখায় চারু মজুমদার লিখেছেন যে "আমরা যেন আমাদের বক্তব্য কৃষকদের ওপর চাপিয়ে না দিই।প্রথম নীতি হলো জনগণের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনো কিছু চাপিয়ে না দাওয়া।...সামন্ত শ্রেনীর বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা আছে এবং থাকবে।...এই সংগ্রাম কোথায় কি রুপ নেবে তা নির্ভর করছে এলাকার সংগঠন ও রাজনৈতিক চেতনার ওপর।...শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে দরিদ্র ও ভুমিহীন কৃষক ব্যাপক সংগ্রামের ঐক্য গড়ে তুলতে পারবেন এবং এই ঐক্য যত দ্রুত হবে ততই সংগ্রামের চরিত্র বিপ্লবী রুপ নেবে। আমাদের মনে রাখতে হবে মাও-এর শিক্ষা-বিপ্লবী যুদ্ধ হচ্ছে জনগণের যুদ্ধ। এই যুদ্ধ চালানো যায় জনগণকে সামিল করেই। চারু মজুমদার এর মতে "শ্রমিক শ্রেনী ও বুদ্ধিজীবীদের কাজ হলো কৃষকদের শ্রেণী সচেতন করে ব্যাপক শ্রেনী সংগ্রাম গড়ে তোলা।" এখানে লক্ষনীয় যে যখনই চারু মজুমদার মাও- কে উদ্ধৃত করছেন, তখন আর 'কমব্যাট ইউনিটের' অস্তিত্ব থাকছে না।

কর্তৃত্বের কথাও নেই এই পর্বে। বরং রয়েছে বিনয়ের কথা, যে বিনয় হওয়া উচিত একজন কমিউনিস্টের চরিত্রগুণ। এই পর্বে ওনার সবাই তাঁকে প্রশ্নাতীত ভাবে মেনে চলবে, এমন একজন নেতা সাজার চেষ্টা নেই।

'বিপ্লবী পার্টি গড়ার কাজে হাত দিন' লেখায় তিনি লিখেছেন,"এভাবেই দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের মারফত জনতার স্থায়ী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে উঠবে এবং সংগ্রাম জনযুদ্ধের রুপ নেবে। এই কঠিন কাজ করা সম্ভব একমাত্র সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার অস্ত্র কে সঠিকভাবে প্রয়োগ করে। আমরা একত্রিত হয়েছি বিপ্লবের স্বার্থে। সুতরাং সমালোচনায় আমাদের ভয় থাকলে চলবে না। এবং আত্মসমালোচনায় আমাদের আগ্রহ না থাকলে, আমরা আমাদের গুণগত পরিবর্তন ঘটাতে পারবো না"।

'কমরেডদের প্রতি' লেখাটিতে তিনি লিখেছেন, "মাও এর চিন্তাধারা যতই বুঝবার চেষ্টা করছি ততোই নতুন নতুন শিক্ষা হচ্ছে।...জনগণের কাছ থেকে শেখো-এটা খুবই কঠিন কাজ। মনগড়া ধারণা নিয়ে চলা-ও সংশোধনবাদের দান।..."।

ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাবো যে নকশালবাড়ি বিদ্রোহ 'দমন' করা গেলেও, তার গনগনে আঁচ ভারতের নানা দিকে ছড়িয়ে পড়লো। উজ্জীবিত হলো সশস্ত্র কৃষক বিপ্লবের রাজনীতি।

শুরু হলো সংশোধনবাদের বিরূদ্ধে একটি রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত লড়াই। শ্রমিক, কৃষক ও শহুরে পেটি-বুর্জোয়াদের মধ্যে, বিশেষ করে যুব ও ছাত্রদের মধ্যে, সব ধরণের সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু হলো। এই পর্বের লেখাপত্রেও ছোট ছোট গোপন সশস্ত্র দল গড়ে তুলে ব্যক্তি শ্ৰেণীশত্রু খতমের কথা নেই। বরং, জনগণের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোর জন্য তাদের সংগ্রামে যোগ দিয়ে, সেই সংগ্রামকে গণতান্ত্রিক সংগ্রামের বিপ্লবের সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে জনগণকে জাগিয়ে তোলার নীতির কথা বলা হয়েছিলো।

১৯৬৮ অক্টোবরের শেষ দিকে চারু মজুমদারের সাথে দেখা করতে এলেন অন্ধ্রের শ্ৰীকাকুলাম থেকে দুজন প্রতিনিধি-তেজেশ্বর রাও ও পঞ্চাদ্রি কৃষ্ণমূর্তি। শ্রীকাকুলাম জেলার কয়েকটি তালুকে পাহাড়িয়া গিরিজনদের সংগ্রাম একটা অচলাবস্থায় পৌঁছেছিলো। এই গিরিজনরা জমিদার/মহাজনদের হাতে ভয়ানক শোষণ ও অত্যাচারের শিকার হচ্ছিলেন। তাঁরা যখন এই অত্যাচারে বাধা দিলেন, জমিদাররা তাঁদের ওপর গুলি চালিয়ে দুজনকে হত্যা করে। শ্রীকাকুলাম জেলা কমিটি বুঝতে পারছিলেন না যে এই অবস্থায় তাঁদের ঠিক কি করা উচিত। তখন চারু মজুমদার আবার তাঁর ছোট ছোট দল তৈরি ও ব্যাক্তি-জমিদারদের এবং তাদের সাহায্যকারী পুলিশদের খতম করার নীতিতে ফিরে যান।

সেই সময় কমিউনিস্ট বিপ্লবী এবং সি পি আই (এম এল)-এর একটি বড় দুর্বলতা ছিলো এই যে, তাদের পক্ষ থেকে ভারতের গ্রামাঞ্চলে শ্রেণী সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে কোনো গভীর অনুসন্ধান চালানো হয় নি।

কৃষকদের মধ্যে শ্ৰেণী সম্পর্কে সঠিক ধারণা ছাড়া, সঠিক কৃষি নীতি ছাড়া, তাদের সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ করা কার্যত অসম্ভব। এই ঐক্যই সামন্ত্যন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে বিপ্লবে বিজয় অর্জন করার অন্যতম মৌলিক শর্ত।


তৃতীয় পর্ব

এই পর্বটির সময়কাল ছিলো ১৯৬৯ থেকে ১৯৭০-এর শেষ পর্যন্ত।

১৯৬৯-এ জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে পিকিং রেডিও 'কনফেশন অফ এন ইমপাস' শিরোনামে একটি লেখা প্রচার করে। সি পি আই (এম এল)-এর নীতি নির্ধারণে এই লেখাটির ভূমিকা ছিলো অপরিসীম।

পিকিং রেডিওর ওপর অতি-নির্ভরতা, তাতে যাই প্রচারিত হোক, তার ওপর প্রশ্নাতীত আস্থা ছিলো চারু মজুমদারের। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি কোনো মনোলিথিক সংগঠন নয়। কিন্তু পিকিং রেডিও-তে যা-ই বলা হতো সেগুলিকে সমালোচনা ছাড়াই সঠিক বলে ধরে নিতেন চারুবাবু এবং পার্টি নেতৃত্ব।

কিছু উদাহরণ:

১৯৬৭ সালের এপ্রিল মাসে চারু মজুমদার এক সংগঠক কমরেডকে লেখেন: "প্রতিদিন পিকিং রেডিও শোনা প্রত্যেকের একটি প্রয়োজনীয় কাজ। আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব প্রায় প্রতিদিন আমাদের নির্দেশ পাঠাচ্ছেন। সেগুলি আমাদের বুঝতে হবে, পালন করতে হবে।"

১৯৬৭ সালের ২১ আগষ্ট তিনি নকশালবাড়ির এক কমরেডকে লেখেন: "পিকিং রেডিও অবশ্যই শুনবে।"

১৯৭০ সালের প্রথম দিকে লেখা 'সত্তর দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করুন'-এ তিনি লিখেছেন: "১৯৬৭ সালের জয়ের গুরুত্ব বোঝার জন্য বিপ্লবীরা পিকিং রেডিও শোনেন।...এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছিল, কারণ ভারতের বিপ্লবীরা প্রতিদিন পিকিং রেডিও-র প্রচারের মাধ্যমে চেয়ারম্যান মাও সেতুং-এর নির্দেশ পাচ্ছিলেন।।"

এটা দুঃখের যে, মাও চাইতেন যে প্রতিটি কমিউনিস্ট পার্টি তাদের নিজেদের লাইন খুঁজে বার করুক। অন্য পার্টির ব্যাপারে নাক গলানো তাঁর নীতির বিরোধী ছিলো।

যাইহোক, ওই 'কনফেশন অফ এন ইমপাস' লেখাটি প্রচারিত হবার পর, নকশালদের পার্টি লাইন হঠাৎ করে পাল্টে যায়। ওই লেখাটির প্রভাবে চারুবাবু হয়ে ওঠেন চরম হঠকারী। তার স্পষ্ট প্রভাব পড়ে নকশালদের পার্টি লাইনেও। ১৯৭০ সালের মে মাসের পার্টি কংগ্রেসে তা সম্পূর্ণ রুপ পায়।

সেই সময় থেকেই চারুবাবু মনে করতে শুরু করলেন যে গ্রামাঞ্চলে গেরিলা ইউনিট দিয়ে শ্রেণীশত্রু খতমই সংগ্রামের একমাত্র রূপ। এই পর্বে 'কমব্যাট ইউনিট' গুলিই 'গেরিলা ইউনিট' হয়ে ওঠে। যখন কিছু শ্ৰেণীশত্রু খতম করা হলো আর অনেকে পালিয়ে গেলো, তখনই চারুবাবুর মতে এলাকাটি মুক্ত হয়ে গেলো। ওনার বক্তব্য ছিলো যে এই ভাবেই বিস্তীর্ণ এলাকা মুক্ত হয়ে যাবে...রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত বিপ্লবী কর্মীরা তখন ঘাঁটি এলাকা, গণফৌজ তৈরি করবেন...তাঁরাই হবেন সেখানকার শাসক শক্তি। এই প্রক্রিয়া ক্রমাগত চালু থাকলে একটা বিশাল বিদ্রোহ হবে, যার মধ্যে দিয়ে বিপ্লব জয়যুক্ত হবে।

এই পর্বে চারু মজুমদার গণ-সংগঠন ও গণ-আন্দোলনের বিরোধিতা করেন কারণ সেগুলি নাকি সংশোধনবাদের ও শ্রেণী আত্মসমর্পণের জন্ম দেবে। এই সব কারণ দেখিয়ে পার্টি গণ-লাইন পরিত্যাগ করলো, নিজেকে নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে ফেললো। ত্যাগ করলো জনগণকে জাগিয়ে তোলার কঠিন কাজ, যে কাজ করতে পারতো লাগাতার সাংস্কৃতিক আন্দোলন।

পার্টি নেতৃত্বের মধ্যে অভাব ছিলো দ্বন্দ্বমূলক দৃষ্ঠিভঙ্গির। ছিলোনা পরিস্থিতির কোনো বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ। চারু মজুমদার প্রথমে বলেছিলেন, সত্তর দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করুন। কিছুদিন পরেই তিনি মুক্তির দিনটিকে এগিয়ে আনলেন। তিনি নিঃসন্দেহ হয়ে গেলেন যে ১৯৭৫ সালেই ভারতের মুক্তি সম্পূর্ণ হয়ে যাবে। এই প্রত্যয়ের পিছনে যুক্তির বদলে ছিলো একটা আবেগ ও ভিত্তিহীন বিশ্বাস।

কোনো সন্দেহ নেই, চারু মজুমদার ছিলেন একনিষ্ঠ বিপ্লবী...বিপ্লবের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ এক মানুষ...মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন সুবিধাবাদকে। বিপ্লবের স্বার্থে তিনি সব রকম ত্যাগ স্বীকার করেছেন, জীবনও বলি দিয়েছেন।

কিন্তু তাত্ত্বিকভাবে তিনি ছিলেন দুর্বল। যদিও তিনি সবসময় মাও এর নাম করতেন, কিন্তু প্রায়শই তাঁর কাজকর্ম ছিলো মাও এর শিক্ষার বিপরীত। মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ নিয়ে পড়াশোনা করা তিনি অতটা প্রয়োজনীয় মনে করতেন না। তিনি মনে করতেন যে তরুণ বিপ্লবীরা যদি শুধু মাও এর উদ্ধৃতি ও তিনটি লেখা পড়ে, তাহলেই যথেষ্ট। মনে হয়, তাঁর রাজনৈতিক পড়াশোনা ও অভিজ্ঞতায় সীমাবদ্ধতা ছিলো। নয়তো, উনি বিপ্লবের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কৃতিক আন্দোলনকে এভাবে অবহেলা করতেন না। ফলে, অনেক ক্ষেত্রেই তিনি মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ-মাও সেতুং-এর চিন্তাধারা থেকে বিচ্যুত হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই তথ্য থেকে সত্যিটা জানার কোনো চেষ্টা উনি করতেন না। বরং তিনি নির্ভর করতেন ওনার ব্যক্তিগত আকাঙ্খার ওপর। আন্দোলনের একটা গুরুত্বপূর্ণ  স্তরে, উনি বিপ্লবী কর্তৃত্বের ভূমিকা নিয়ে একের পর এক নির্দেশ জারি করতে শুরু করেন। এই পর্বে তাঁর চূড়ান্ত আত্মগত চিন্তা তাঁকে হাস্যকর সব ভাবনার দিকে ঠেলে দেয়। যেমন, ১৯৬৯ সালের জুন মাসে, নকশালবাড়ির এক সংগঠককে তিনি চিঠিতে লিখেছিলেন, "...আমরা যদি পাঁচ থেকে দশজনকে খতম করতে পারি, তাহলে পাঁচ থেকে দশটা বন্দুক আমাদের হাতে এসে যাবে। আর এই রাইফেলগুলো দিয়ে আক্রমণ চালাতে পারলে, তরাইয়ের কৃষক সংগ্রাম ভিয়েতনামের সংগ্রামের স্তরে চলে যাবে।" আন্দোলনে বড় মাপের ধাক্কা এলেও, তিনি তার কারণ বিশ্লেষণ করতে এবং আত্নসমালোচনা করতে চাইতেন না।

এই পর্বে চারু মজুমদার-এর রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায় মার্ক্সবাদ ও পেটি বুর্জোয়া বিপ্লববাদের এক বিচিত্র সমাহার দেখা যায়।

দ্বিতীয় পর্বে, একজন আদর্শ কমিউনিস্ট নেতার মতোই চারু মজুমদার ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী। ফলে, ওই সময় খানিকটা হলেও যৌথভাবে কাজ হয়েছে।

কিন্তু এই পর্বে তিনি আত্মম্ভরী হয়ে ওঠেন। এর ফলে, নিজের  এবং নিজের নীতির ওপর ভিত্তিহীন এক আত্মবিশ্বাস জন্মে যায় তাঁর। ছাত্র ও যুবদের উদ্যেশ্য করে তিনি বলেন, "পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বা পার্টির মুখোপত্রের মাধ্যমে যা যা বলবেন সেগুলো একই ভাষায় মনে রাখতে হবে ও প্রচার করতে হবে...এদেশে একমাত্ৰ এই বিপ্লবী পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বই মার্ক্স-লেনিন-মাও এর চিন্তাধারা বোঝে ও সঠিক প্রয়োগ করে। আর কেউ বোঝে না, কিছুমাত্র বোঝা সম্ভবও নয়।"


চতুর্থ পর্ব

এই পর্বের শুরু ১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসে যখন আর এক শীর্ষস্থানীয় নেতা সৌরেন বসু, পার্টির লাইন সম্পর্কে চৌ-এন-লাই এর বক্তব্য শুনে ফিরে এলেন। সেই সময় চারু মজুমদারের মন একেবারে ভেঙে পড়ে। তিনি আবার পার্টি লাইন পাল্টাতে শুরু করলেন, যাতে চীনা নেতারা যে কথা বলেছিলেন তার সঙ্গে পার্টি লাইন সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।  সেই সময় তিনি একটি নোট তৈরী করেন।তাতে পশ্চিমবঙ্গে 'জনমুক্তি বাহিনী' গঠনের ঘোষণা করা হয়। বলা হয়, সারা রাজ্য জুড়ে স্কোয়াড থাকবে। তৃতীয় পর্বে সংগ্রামের একমাত্র রুপ বলেছিলেন, সেই শ্রেণীশত্রু খতমের ব্যাপারেও পরিবর্তন ঘটলো।

এই সময় তাঁর রচনাগুলো যেমন, "গণমুক্তিফৌজ গঠন করে এগিয়ে চলুন", 'পার্টি কংগ্রেস পরবর্তী এক বছরে', ''পাঞ্জাবের কমরেডদের প্রতি" ইত্যাদিতে সংগ্রামের ধরণ হিসেবে শ্ৰেণীশত্রু খতমের কথা বিশেষ নেই। ১৪ জুলাই, ১৯৭২, অর্থাৎ ধরা পড়ার দুদিন আগে, তাঁর স্ত্রী কে লেখা চিঠিতে তিনি লিখেছেন, "আমরা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম খুব কম করেছি, আর খতমের ওপর খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়ে গেছে। এটি একটি বিচ্যুতি, আমরা সেটা কাটিয়ে উঠেছি"।

এই পর্বে ঘটে গেছিলো আরো একটা পরিবর্তন।"গ্রাম এলাকায় পার্টির কাজ" শীর্ষক নোট-এ চারু মজুমদার লিখলেন, "ফসল দখল করার আন্দোলন একটা গণআন্দোলন।... গণআন্দোলন না করলে আমরা প্রতিটি কৃষককে লড়াইয়ে সামিল করতে পারবো না।" অথচ, এর আগের পর্বে, ১৯৬৯-এর ডিসেম্বরে 'লিবারেশন' এ প্রকাশিত ওনার 'ভারতে বিপ্লবী কৃষক সংগ্রামের অভিজ্ঞতার সারসংকলন ধরে এগিয়ে চলুন' লেখাটিতে উনি লিখেছিলেন একেবারে অন্য কথা। যেমন, "বিপ্লবী কৃষকশ্রেণী তাদের সংগ্রামের মাধ্যমে একথা প্রমাণ করেছেন, গেরিলা যুদ্ধের জন্য গণ-আন্দোলন বা গণ-সংগঠন কোনোটাই অপরিহার্য  নয়। গণআন্দোলন হলো প্রকাশ্য আন্দোলন যা  অর্থনীতিবাদী আন্দোলনের প্রতি ঝোঁক বাড়ায়...বিপ্লবী কর্মীদের শত্রুর কাছে প্রকাশ করে দেয়; ফলে শত্রুর পক্ষে আক্রমণ করা সহজ হয়ে ওঠে। সুতরাং প্রকাশ্য গণ-আন্দোলন ও গণ-সংগঠন গেরিলা যুদ্ধের বিকাশ ও বিস্তৃতির পক্ষে বাধাস্বরূপ।"
এই পর্বে সেই নীতি পরিত্যক্ত হলো।

ধরা পড়ার সপ্তাহ পাঁচেক আগে চারু মজুমদার "জনগণের স্বার্থই পার্টির স্বার্থ"  শিরোনামে একটি লেখা লিখেছিলেন। এই লেখায় তিনি স্বীকার করেছিলেন যে, পিছু হঠতে হয়েছে। তিনি পার্টি গড়ে তুলতে চাইছিলেন কৃষক ও শ্রমিকদের মধ্যে। তাঁর আশা ছিলো যে সংগ্রামকে এবার উচ্চতম স্তরে তোলা যাবে। ওনার বিশ্লেষণ অনুযায়ী সেই সময় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সসমাজিক সাম্রাজ্যবাদ সংকটের মুখোমুখি, এবং আরো একটা বিশ্বযুদ্ধ প্রায় অবশ্যম্ভাবী। তাই তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে, "একটা বিরাট এবং ব্যাপক বিপ্লবী জোয়ার আমাদের জয় ত্বরান্বিত করবে...সারা ভারত জুড়ে ক্ষোভ রয়েছে...দেশব্যাপী ক্ষোভ বিদ্রোহ তৈরী করবে।...এই পরিস্থিতিতে 'বামপন্থী' পার্টিগুলির সাথে ব্যাপক যুক্তফ্রন্ট গড়ে তুলতে হবে...আগে যারা শত্রু ছিলো, তাদের সঙ্গেও।"

এই লেখাটি কি নেতা হিসেবে তাঁর ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি? তিনি "শ্রেণীশত্রু খতমের" লাইন ত্যাগ করলেন, কিন্তু পরিবর্তে কোন লাইন তার জায়গা নেবে, তা বললেন না বা জানতেন না। দেখতে পাচ্ছি, তাঁর মূল আশা বা নির্ভরতা ছিলো, "জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততার" ওপর, যা পার্টিকে জয়ের পথে নিয়ে যাবে।

মনে হয়, চারু মজুমদারের মতোই পার্টি কর্মীদের একটা বড় অংশ তাত্বিকভাবে ছিলেন দুর্বল। এর দায়ও ছিলো চারু মজুমদারের। যুবক ও ছাত্ররা যখন গ্রামে যাচ্ছেন, চারু মজুমদার তাঁদের পড়াশোনা লিন পিয়াওয়ের সংকলিত মাও সেতুং-এর উদ্ধৃতি, মাও এর তিনটি লেখা, লিন পিয়াও-য়ের 'জনযুদ্ধ দীর্ঘজীবী হোক 'এবং মাও এর সামরিক রচনাগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে বলতেন।

মাও সেতুং বলতেন "তীর টা লক্ষ্যে লাগাও।" কিন্তু, রাজনৈতিক পড়াশোনা না থাকলে, তীর কখনোই লক্ষভেদ করতে পারবে না। দেশের ইতিহাস সম্পর্কে, বর্তমান শ্রেণী বিন্যাস সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান না থাকলে, বারবার লক্ষভ্রষ্ট হবো। আমার মন হয়, এটাই ইতিহাসের শিক্ষা ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ।

কোনো কিছু জানা ও বিশ্লেষণ করার মার্ক্সবাদী প্রক্রিয়া হলো দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি। কেউ যদি কেবল একটা দিকই দেখে, তবে তাঁর জ্ঞান হবে একপেশে, আত্মগত। এই 'রোগে' মনে হয়   অনেক নকশাল নেতা ও কর্মীরা ভুগছিলেন।

তাঁদের আরও একটা সীমাবদ্ধতা ছিলো যে তাঁরা বাস্তব অবস্থার অবাস্তব বিশ্লেষণ করতেন। যেমন, ১৯৬৯ সালে অন্ধ্র ঘুরে এসে চারু মজুমদার লিখলেন, "শ্ৰীকাকুলাম হবে ভারতের ইয়েনান।...সত্তরের দশককে ভারতের বিশাল নিপীড়িত মানুষের মুক্তির দশকে পরিণত করুন। আমাদের নেতৃত্বে আছেন চেয়ারম্যান মাও, আমরা সফল হবোই।...সে জন্য এখন ভারতের প্রতিক্রিয়াশীল সরকার পাঁচ লক্ষ সৈন্য নিয়ে এসেও শ্রীকাকুলামের সশস্ত্র সংগ্রাম 'ঘিরে ফেলে দমন করতে' পারছে না।...সেকারণেই আমি বিশ্বাস করি যে, ১৯৭৫ সালের শেষে ভারতের মানুষ তাদের মুক্তির মহাকাব্য রচনা করবেন।"
ওনার এই সব লেখার মধ্যে ভারতের সে সময়কার বাস্তব অবস্থার কোনো যুক্তিনির্ভর বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণ কি আদৌ ছিলো?

আরও অনেক ভুল ছিলো। কিন্তু, এত খামতি সত্বেও নকশালদের একটা বড় অংশই ছিলো সাহসী, জনগণের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ। তারা আমাদের কাছে নিদর্শন রেখে গেছে অনায়াস আত্মত্যাগের, যা ভারতের বিপ্লবী ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে।

"লড়াই করো, ব্যর্থ হও, আবার লড়াই করো, ব্যর্থ হও, আবার লড়াই করো...যতদিন না বিজয়ী হও। এই হলো জনগণের যুক্তি, তাঁরা এই যুক্তির বিরুদ্ধে কখনো যাবে না। এটি আর একটি মার্ক্সবাদী নিয়ম।"

শেষ নয়, শুরু... 

ঋনস্বীকার: 
নকশালবাড়ি একটি মূল্যায়ন, সুনীতি কুমার ঘোষ
প্রকাশক: পিপলস  বুক সোসাইটি,  আগস্ট ২০১০

1 টি মন্তব্য:

Rahul Ganguli বলেছেন...

এমনিতে ভালো।তবে তার পরবর্তী অবস্থান লিখলে ভালো হতো।নকশালবাড়ি সংগ্রাম এখনো চলছে।

ভারতবর্ষ ইংরেজ কর্তৃক দখলীকৃত না হলে... || রাণা

অদ্ভুতুড়ে ভাবনা। যদি ইংরেজরা ১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধে বা ১৭৬৪ সালের বক্সার যুদ্ধে হেরে বসত তাহলে ২০১৭ তে এসে পৃথিবীটাকে কেমন দেখতাম। ভৌ...